আসুন, জ্যৈষ্ঠের এই বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যায় আমরা নিথুয়া মংমার গল্প শুনি। গল্পটি শুধু নিথুয়া মংমার নয়, সুশাং নকরেকেরও। এক বাসন্তী জ্যোৎস্নার রাতে, যখন শিমুল ফুলের মনমাতানো ঘ্রাণ আসছিল জানালাপথে, সুশাংয়ের মনে পড়ে গিয়েছিল নিথুয়া মংমার কথা। বহুদিন আগে, এমনই এক বাসন্তী জ্যোৎস্নার রাতে, নিথুয়া মংমাকে সুশাং দেখতে পেয়েছিল শিমুলতলায় – আহত, রক্তাক্ত দশায়। সুশাং বুঝতে পারছিল না এই হাতি সেই হাতি কি না, যে এসেছিল মেঘালয়ের দুর্গম পাহাড় থেকে। একা নয়, পালের সঙ্গে। পাহাড় থেকে কোনো হাতি কখনো একা আসে না, আসে পালে পালে। কোনো পালে থাকে আটটি, কোনো পালে তেরোটি, আর কোনো পালে কুড়ি-পঁচিশটি। এসে ধান খেয়ে যায়, ফলফলাদি খেয়ে যায়, গাছগাছড়া ঘরদোর তছনছ করে দিয়ে যায়, এমনকি মানুষকেও হতাহত করে।
সেবার যে-পালটি এসেছিল, তারা লিয়াং রিছিলের বাড়িতে হানা দিয়ে ধান-চাল সব সাবাড় করে, হাঁড়ি-পাতিল
কাঁথা-বালিশ চেয়ার-টেবিল সব ছিত্তিসান করে রাতারাতি আবার ফিরে গিয়েছিল। শুধু ফিরতে পারেনি একটি একদন্তী হাতি। দলছুট হয়ে ঢুকে পড়েছিল বালিজুরি বাজারে। গজারিবনের ভেতর দিয়ে জিন্দাপীরের টং হয়ে চলে গিয়েছিল নকশিবাজার। বাঙালিদের ধাওয়া খেয়ে আবার ঢুকে পড়েছিল গজারিবনে। বনপথ ধরে চলে যেতে পারত উত্তরের পাহাড়ে তার স্বজনদের কাছে, যদি না ফের আচিকদের ধাওয়া খেত। ধাওয়া খেয়ে উঠে পড়েছিল
গজনী-ঝিনাইগাতী সড়কে। এবার শুধু ধাওয়াই খেল না, শিকার হলো নৃশংস হামলারও।
লাঠিসোটা-ধামা-যাত্থা-বল্লম নিয়ে মানুষ হামলা চালায় তার ওপর। খবর পেয়ে যাত্থাটা নিয়ে সুশাং নকরেকও ছুটে গিয়েছিল। ততক্ষণে আহত হাতিটা ঢুকে পড়েছিল শালবনের গহিনে।
সন্ধ্যায় হাটে গিয়েছিল সুশাং। ফিরতে ফিরতে রাত। আটটা-নটা হবে বুঝি। তার পা ধরে আসছিল। সারাদিন হাতির পিছে ছুটতে ছুটতে জিরানোর সময় পায়নি। ভেবেছিল খেয়েই শুয়ে পড়বে। বাড়ির ঘাটায় শিমুলগাছটার কাছাকাছি এসে দেখে রাস্তার ওপর পড়ে আছে মস্ত এক গাছের গুঁড়ি। সুশাং ভেবে পাচ্ছিল না গুঁড়িটা কে এনে রাখল এখানে! কয়েক পা এগিয়ে তার ভ্রম ভাঙে। না, গাছের গুঁড়িটুড়ি কিছু নয়, যেন তেরপলে ঢাকা বালির স্তূপ। কী কাণ্ড! রাস্তার ওপর এভাবে কেউ বালি রাখে! সুশাং আরো কয়েক পা এগোয়। আবারো তার ভ্রম ভাঙে। এবার মনে হয়, তেরপলে ঢাকা বালি নয়, যেন কালো মাটির একটা টিলা গজিয়েছে। তার ধন্দ লাগে। সে কি পথ ভুল করে ফেলল! বাড়ির পথে না গিয়ে অন্য কোনো পথে চলে এলো! এই ভরা পূর্ণিমায় কোনো দেও-দানো কি তার পথ ভুলিয়ে দিলো! কিন্তু এই যে শিমুলগাছ। হ্যাঁ, শিমুলগাছই তো। এই গাছ তো তারই বাড়ির গাছ। ওই যে দেখা যাচ্ছে উঠানের কোনায় খড়ের গাদা। এ তো তারই বাড়ির গাদা।
ভয়ে ভয়ে সুশাং আরো কয়েক পা এগোয়। এবার সে আঁতকে ওঠে। গুঁড়ি নয়, তেরপলে ঢাকা বালি নয়, এমনকি টিলাও নয় – গোটা রাস্তা দখল করে শুয়ে আছে মস্ত এক হাতি! মৃত অজগরের মতো শুঁড়টা পড়ে আছে শেকড়ে। নকগুবা নকগুবা! আতঙ্কে সুশাংয়ের কলিজা শুকিয়ে যায়। সে চিক্কুর দিতে চেয়েছিল, চিক্কুর দিয়ে মান্দি জড়ো করতে চেয়েছিল, অথচ গলাটা এতটাই কাঠ হয়ে গিয়েছিল যে, কোনো স্বরই বেরোচ্ছিল না। সদাইয়ের থলেটা নিয়ে সে গাদার বাঁশের মতো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে।
ক্রমে তার ভয় কেটে যায়। তার বদলে জ¦লে ওঠে প্রতিশোধের আগুন। যেন সেই পুরনো আগুনে কেউ তুষ মেরে দিয়েছে। আগুনটা নেভানোর উপায় খোঁজে সুশাং। ঘরে গিয়ে মংরেংটা নিয়ে আসার কথা ভাবে। এই সুযোগ সুশাং, এই সুযোগ। ধারালো মংরেংয়ের এক কোপে দ্বিখণ্ডিত করে দাও তোমার শত্রুর শুঁড়। শত্রু, কেননা হাতি তার পুত্রহন্তা। মাত্র সাত বছর বয়সে তার বেটা সীমন নকরেক নিহত হয়েছিল বুনো হাতির আক্রমণে। বৈশাখ মাস ছিল তখন। সূর্যদেবতা মিসি সালজং নেমে এসেছিলেন শিলংচূড়ায়। তার তেজে ঘামছিল জগৎ-সংসার। পুবের ছড়ায় পাড়ার ছেলেপিলেদের সঙ্গে হুটোপুটি করছিল সীমন। হঠাৎ মংমা মংমা বলে শোর করে ওঠে সবাই। মূর্ছা খেতে খেতে নেংটা-মোংটা সবাই ছুট দেয়, শুধু সীমন ছাড়া। হাঁটুজলে সে দাঁড়িয়ে থাকে একা। বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকে বাঁকা দাঁতের বিশাল মংমাটির শুঁড়ের দিকে। এতদিন সে মংমার কথা শুনেছে, কিন্তু কখনো দেখেনি। কল্পনায় মংমার যে-ছবি এঁকেছিল, বাস্তবে মংমা তার চেয়েও বিশাল। সেই বিশালতা হরণ করে নিয়েছিল তার বুদ্ধি। তার মনে হচ্ছিল, আকাশ থেকে মংমার রূপ ধরে নেমে এসেছে রাক্ষস নাওয়াং কিংবা শক্তিদেবতা গোয়েরা।
খানিক পর, ছুটতে ছুটতে ছেলেপিলেরা যখন প্রতাব নকমার পুকুরপাড়ে গিয়ে দাঁড়ায়, সীমন তখন প্রথমে গোয়েরা গোয়েরা, তারপর নাওয়াং নাওয়াং বলে চিৎকার করে ওঠে। সেই চিৎকার বাতাসে মেলানোর আগে, তার বিস্ফারিত চোখ আরো বিস্ফারিত করে দিয়ে, বিশাল মংমা তার বিশাল দাঁত ঢুকিয়ে দেয় সীমনের বগল বরাবর। চট করে উপরে তুলে মারে আছাড়। আছাড়ের চোটে চেতন হারায় সীমন। তার অচেতন শরীর মাড়িয়ে খাল পেরিয়ে শালবনে ঢুকে পড়ে হাতির পাল।
সেই থেকে হাতির সঙ্গে সুশাংয়ের ঘোর শত্রুতা। যখনই সে খবর পেয়েছে কোথাও বুনো হাতির পাল হানা দিয়েছে, তখনই সে যাত্থা বা মংরেংটা নিয়ে ছুটে গেছে; যদিও কখনো পায়নি কোনো হাতির নাগল। এ তার বড় খেদ। একবার, শুধু একটিবার কোনো হাতির শুঁড়ে যদি একটা কোপ দিতে পারত, শুধু একটিবার কোনো হাতির পেট যদি যাত্থায় বিদ্ধ করতে পারত, তবে কিছুটা হলেও প্রশমিত হতো তার ক্রোধ, তার খেদ।
ক্রোধমত্ত সুশাংয়ের শরীরে কাঁপন ধরে গিয়েছিল। আমতলা থেকে লম্বা একটা বাঁশের লাঠি এনে হাতিটার পেটে মারল বাড়ি। হাতিটা অনড়। সুশাংয়ের খটকা লাগে। হার্মাদটা কি মৃত! দিনভর মানুষের ঠ্যাঙানি খেয়ে ক্ষতবিক্ষত হয়ে এখানে এসে বুঝি শেষ নিশ্বাস ছেড়েছে। নইলে যে আঘাত সুশাং করেছে, তাতে একবার হলেও তো নড়ে ওঠার কথা।
হোক মৃত। জ্যান্ত হাতির নাগাল তো সুশাং কখনো পায়নি, আদৌ পাবে কি না সন্দেহ – মরা হাতির ওপরই সে শোধ নেবে। প্রথমে তার শুঁড় কাটবে, তারপর পা। চার পা আলাদা করে পেট চিরে নাড়িভুঁড়ি বের করে শূকরকে খাওয়াবে।
মাথাটা থেঁতলে মগজ বের করে হাঁস-মুরগিকে খাওয়াবে। যত দিন লাগে লাগুক, এই হার্মাদের হাড়-মাংসের একটা কণাও সে আস্ত রাখবে না। তবে এখন নয়, এখন রাত হয়ে গেছে, তাকে ঘুমাতে হবে – যা করার কাল সকালে করবে।
হঠাৎ দমকা হাওয়া ওঠে। সরে যায় গাছের ছায়া, আরো প্রখর হয় চাঁদের আলো। সুশাং খেয়াল করে হাতিটার সামনের বাঁ পায়ে বিঁধে আছে একটা কালো বল্লম। রক্তের গন্ধ টের পায় সুশাং। সদাইয়ের থলেটা নামিয়ে রেখে একটানে সে বল্লমটা বের করে নেয়। সেই বল্লম দিয়ে ফের ক্ষতস্থানে আঘাত করতে গিয়ে থেমে যায়। না, এখন নয়, কাল সকালে। সকালে এই বল্লম দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তার পুত্রহন্তার নাড়িভুঁড়ি সব বের করবে। উন্মত্ত সুশাং বল্লমটা ছুড়ে মারে উঠানে। খোঁয়াড়ের চালে পড়ে ঝনঝনাৎ শব্দ ওঠে। ঘর থেকে আসে তেনুনী মৃর হাঁক। সুশাং পাল্টা হাঁক দেয়, আঙা।
হারিকেন হাতে বেরিয়ে আসে তেনুনী। বাড়ির ঘাটায় মস্ত হাতি দেখে বুক চেপে ধরে বলে ওঠে, নকগুবা নকগুবা!
সুশাং তাকে অভয় দেয়, মরা মংমা, ভয়ের কিছু নেই। কাঁপা হাতে হারিকেনটা বাড়িয়ে ধরে তেনুনী। সুশাং এবার
খেয়াল করে হাতিটার পেছনের পায়ে মান্দিআত্তি কি মংরেংয়ের কোপ। এখনো রক্ত গড়াচ্ছে। হাতিটা কি তবে জ্যান্ত! মরা হলে তো রক্ত পড়ার কথা নয়। কে জানে, হয়তো মরেছে খানিক আগে। আরো খানিকক্ষণ রক্ত ঝরে তারপর হিম হয়ে যাবে।
খেয়েদেয়ে সুশাং শুয়ে পড়েছিল। তেনুনী মৃ শুয়ে শুয়ে মৃত পুত্রের জন্য কাঁদছিল। তার কান্নার বেলা-অবেলা নেই। সকাল, দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যা বা গভীর রাত – যখন মন চাইল একটু কেঁদে নিল। মরা হাতিটা জাগিয়ে দিয়েছে তার পুত্রশোক, না কেঁদে এখন উপায় নেই। কাঁদতে কাঁদতে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। তার নাক ডাকার মৃদু শব্দ টের পাচ্ছিল সুশাং। প্রতিশোধের উত্তেজনায় তার ঘুম আসছিল না। মনে তার প্রশ্ন, এত ভোরে হাতিটার ওপর শোধ নেওয়া কি ঠিক হবে? কেউ তো জানে না জানোয়ারটা জ্যান্ত, না মরা। কাউকে না জানিয়ে শোধ নিতে গেলে সবাই তাকে হাতিটার খুনি ভাববে। তাতে ফরেস্টারবাবু ঝামেলা করবে। বলা যায় না, মামলাও দিয়ে বসতে পারে। তার চেয়ে বরং সকালে সবাই হাতিটা দেখুক। হাতিটা যে মৃত, সবাই জানুক। তারপর যা করার সে করবে।
সুশাংয়ের উত্তেজনা ক্রমশ প্রশমিত হতে থাকে। দখিনা বাতাস এসে মুদে দিয়ে যায় তার চোখ। আর তখন আত্মার দেশ মাংরু মাংরাম থেকে পুবের ছড়ায় নেমে আসে সীমনের আত্মা। সাঁতরে বেড়ায় কিশোর মান্দির রূপ ধরে। আচমকা মস্ত এক মংমা এসে তার বাঁকা দাঁত ঢুকিয়ে দেয় সীমনের বগল বরাবর। ঘুমের ঘোরে সুশাং চিৎকার করে ওঠে। সেই চিৎকারে জেগে যায় তেনুনী। সুশাংয়ের বুকে জ¦লে ওঠে সেই পুরনো আগুন। চট করে সে দরজাটা খুলে চালে গোঁজা মংরেংটা নিয়ে ছুটে যায় শিমুলতলায়। প্রচণ্ড ক্রোধে শেকড়ের মতো বাঁকা হয়ে পড়ে থাকা শুঁড়টায় যখন সে কোপ মারতে যাচ্ছিল, অমনি ডেকে উঠল হাতিটা। বড় করুণ ডাক। যেন পাঁজরের হাড় দুমড়ে-মুচড়ে উঠে আসা আর্তনাদ। সুশাং চমকে ওঠে। এই হার্মাদ জীবিত! সুশাংয়ের চোখেমুখে খেলা করে আনন্দের ঝিলিক। যাক, শোধটা তবে জ্যান্ত হাতির ওপর নেওয়া যাবে। এবার বুঝি ঘুচবে তার অতৃপ্তি।
কিন্তু হাতিটাকে ঠিক জ্যান্ত বলা যাবে? সে তো জীবন-মরণের মধ্যিখানে। এই আধমরা হাতি মেরে সুশাংয়ের কী লাভ? তাতে তো পুরোপুরি দমবে না তার মনের দহন। মারতে হবে এমন হাতি, যে কি না সুস্থ-সবল, যে কি না মত্ত, যে কি না লেজ নাড়িয়ে শুঁড় নাচিয়ে ছুটতে পারে। কেননা সীমনকে মেরেছিল তেমনই এক মত্ত হাতি। তেমন একটা হাতির ওপর শোধ নিতে পারলেই তো সে শান্তি পাবে, তার বেটা মাংরু মাংরামে বসে প্রাণ খুলে হাসতে পারবে।
এই হাতিকে বাঁচিয়ে তুলতে হবে, সারিয়ে তুলতে হবে, সুশাং ভাবে। বাঁচিয়ে তোলার জন্য বুনো লতাপাতা জোগাড় করে এনে ছেঁচে দুই পায়ের ক্ষতে লাগিয়ে কাপড়ে বেঁধে দেয়। তারপর বাড়ির পেছন থেকে কলাগাছ কেটে আনে। ছড়া থেকে বালতি ভরে জল আনে তেনুনী। হাতিটা খায় না। না জল, না কলাগাছ। কীভাবে খাবে? সে তো শরীরটাই নাড়াতে পারছিল না। সে যতটা না আহত, যেন তার চেয়ে বেশি ক্লান্ত। তেনুনী বলে, ক্লান্তি কাটলে বেটা নিশ্চয়ই উঠে দাঁড়াবে। তারপর খাবে।
কিন্তু সুশাংয়ের শঙ্কা, খেয়েদেয়ে শরীরে বল ফিরে পেয়ে হার্মাদটা যদি পালিয়ে যায়! হাতির পালটি দূরে চলে যায়নি, এত জলদি যাওয়ার কথা নয়, উত্তরের বনে কিংবা পুবের টিলার কোথাও হয়তো থান নিয়েছে। রাত গভীর হলে তারা আবার লোকালয়ে নামবে। ধান খেয়ে যাবে, গাদার খড় খেয়ে যাবে, ক্ষেত-ফসল নষ্ট করে দিয়ে যাবে। যাওয়ার সময় তাদের আহত স্বজনটিকেও নিয়ে যাবে।
তেনুনী আশ^স্ত করে, মনে হয় না পালাতে পারবে। শরীরের যে দশা, দু-তিন দিনেও নড়তে-চড়তে পারবে কি না সন্দেহ।
সুশাং মাথা নাড়ায়। বউয়ের কথা ঠিক মনে হয়।
ঘরে গিয়ে ফের শুয়ে পড়ে দুজন। এবার ঘুমাতে আর দেরি করে না তেনুনী। সুশাং কান খাড়া করে রাখে শিমুলতলার দিকে। শুধুই মনে হচ্ছিল, হাতির পাল এসে বুঝি নিয়ে যাচ্ছে হাতিটাকে। কোথাও গাছের শুকনো ডাল-পাতা খসলেও সে সতর্ক হয়ে উঠছিল। এই বুঝি হাতির পাল এলো! নাকি এরই মধ্যে এসে হাতিটাকে নিয়ে চলে গেল! মনে হয় না এসেছে। এলে নিশ্চয়ই সে টের পেত। তার কানে অবিরাম বেজে চলে হাতিটার করুণ ডাক। সেই ডাক খানিকটা গলিয়ে দেয় তার মন। কে জানে কীসের একটা বিন্দু টপ করে গড়িয়ে পড়ে বুকে। বিন্দুটা হয়তো করুণার, কিংবা মায়ার, কিংবা ক্ষমার। মনে পড়ে ফাদার এলিয়াস হেব্লমের গাওয়া সেই গান –
সবাই যে তোর মায়ের ছেলে
রাখবি কারে, কারে ফেলে
একই নাওয়ে সকল ভাইয়ে
যেতে হবে রে ওপারে
সবারে বাসরে ভালো
নইলে মনের কালো ঘুচবে নারে …।
পুত্রকে হারিয়ে নিয়মিত গির্জায় যাতায়াত শুরু করেছিল সুশাং। ফাদারের কথা শুনে অশান্তচিত্তে প্রশান্তি আনার চেষ্টা করছিল। ফাদার এলিয়াস প্রায়ই গানটি গাইতেন। কখনো গানের মাঝখানে, কখনোবা গাওয়া শেষ করে বলতেন, ক্ষমা করো, প্রবল শত্রুকেও ক্ষমা করো। ঘৃণার বদলে ভালোবাসো। ক্ষমা আর ভালোবাসা – এই তো যিশুর শিক্ষা। তুমি যেমন প্রকৃতি মায়ের ছেলে, তোমার পুত্রহন্তা সেই মংমাও তাই। সে তো তোমারই ভাই। ক্ষমা করে দাও তাকে। শান্তি পাবে, অনাবিল প্রশান্তি। নইলে কখনো ঘুচবে না মনের কালো।
ফাদারের এসব কথা সুশাংয়ের শুনতে ভালো লাগত, মানতে নয়। পরে আর কথাগুলো মনে থাকত না, ভষ্ম হয়ে যেত প্রতিশোধের আগুনে। সুশাং জগতের সব মানুষ কিংবা মনুষ্যতর প্রাণীকে ক্ষমা করতে পারে, কিন্তু কোনো হাতিকে নয়। তার প্রাণধনকে খুন করে হাতির জাত যে অপরাধ করেছে, তা ক্ষমার যোগ্য নয়। যদিও মুমূর্ষু, তবু হাতের নাগালে পাওয়া এই হাতিকে ক্ষমা করা তার পক্ষে অসম্ভব। যেমন করে হোক হাতিটাকে সে সারিয়ে তুলবেই। রাতে রক্তপাত বন্ধ হলে তো হলো, না হলে সকালে সে ফরেস্ট অফিসে যাবে। ফরেস্টবাবুর কাছে ঝিনাইগাতীর ভেটেরিনারি টিমের ফোন নম্বর আছে। টিমের লোকেরা ফ্রিতে পশুপাখির চিকিৎসা দেয়। বছর দুই আগে তারা সারিয়ে তুলেছিল এক আহত হাতিকে। খবর পেলেই তারা চলে আসবে।
কিন্তু ফরেস্টবাবু কি আছেন? তিনি কখন অফিসে থাকেন, কখন সদরে চলে যান, তার কোনো ঠিক থাকে না। তাকে পাওয়া না গেলেও রেস্টহাউসের কেয়ারটেকারকে অবশ্য পাওয়া যাবে। তাকে বললে ফোন করে সে বাবুকে জানাবে। আর বাবু জানিয়ে দেবেন টিমের লোকদের।
কিন্তু তাতে তো আরেক সমস্যা। ফরেস্টবাবু বা টিমের লোকেরা জেনে গেলে তো পরে আর হার্মাদটাকে খুন করা যাবে না। করলে মামলা হয়ে যেতে পারে, জেল-জরিমানা হয়ে যেতে পারে। কী মুশকিল! সুশাংয়ের মাথা ঠিক কাজ করে না। হঠাৎ সে টের পায় বুকের ভেতরে কে জানে কীসের বিন্দুটা নড়ছে, গড়িয়ে পড়ার জন্য ঝুলছে।
ভোরে মান্দিদের শোরগোলের শব্দে ভেঙে যায় সুশাংয়ের ঘুম। কারা এত ভোরে শোরগোল করছে! উঠানে গিয়ে সুশাং দেখতে পায় দক্ষিণের টিলায় মান্দিদের জটলা। সবার হাতে লাঠিসোটা, যাত্থা আর মান্দিআত্তি। তার বুঝতে বাকি থাকে না মান্দিরা কেন জড়ো হয়েছে এখানে। সে ছুটে যায় শিমুলতলায়। গিয়ে দেখে হাতিটা শোয়া থেকে উঠে বসেছে, একটু একটু করে কলাগাছটা খাচ্ছে। মান্দিরা হইহই করে ওঠে। হিংস্র এই বুনো হাতির কাছে না যাওয়ার জন্য সুশাংকে বারণ করে। কারো কথা কানে তোলে না সুশাং। হাতিটার সামনে গিয়ে ঘৃণায় আক্রোশে ক্ষতস্থানে মারে প্রচণ্ড লাথি। হাতিটা ডেকে ওঠে করুণ স্বরে। ডাকটা গিয়ে ধাক্কা খায় সুশাংয়ের বুকে। বুকটা কেঁপে ওঠে। তাতে নড়ে ওঠে কে জানে কীসের বিন্দুটা। দ্বিতীয়বার লাথি মারতে গিয়েও মারে না। সে মান্দিদের বোঝায় যে, এই মংমা গুরুতর আহত, দুই পায়ে মারাত্মক জখম। কেউ যেন তাকে কোনো আঘাত না করে। কেননা এই মংমা তার শিকার। ক্ষতগুলো শুকাক, হারানো বল ফিরে পাক, তারপর তাকে খুন করে সুশাং পুত্রহত্যার শোধ নেবে।
কিছুটা কাটে মান্দিদের ভয়। একজন একজন করে শিমুলতলার কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়। কেউ হাতিটার কাছে যাওয়ার সাহস পায় না। আহত হলে কী হবে, বুনো হাতি বড়ই ক্ষ্যাপাটে। আচমকা কখন উঠে কাকে তাড়া করে তার কোনো ঠিক নেই। কাছে যায় কেবল সুশাং। ডাল-পাতা এনে দেয়, কলাগাছ এনে দেয়, কাঁচা কিছু কলাও এনে দেয়।
লিয়াং রিছিল হাসতে হাসতে বলে, যারে খুন কইরা পুত্রহত্যার শোধ নিবা, তারে কিনা বাঁচায়ে তুলছ! হা হা, বড়ই মজার ব্যাপার! আচ্ছা, তুমি কী করে বুঝলা এই মংমাই যে তোমার তিসাকে খুন করেছিল?
সুশাং বলে, তা কী করে বলব! কিন্তু মংমা তো। আমার তিসাকে তো মংমারাই খুন করেছিল। এই মংমাকে খুন করে আমি সেই খুনের বদলা নেব।
– খুবই অন্যায্য কথা। তোমার তিসাকে যদি প্রতাব নকমা খুন করত, তবে কি তুমি আমারে খুন করতে চাইতা? একজনের দোষ আরেকজনের ওপর চাপায়ে দিচ্ছ, এ কেমন কথা!
এবার আর উত্তর খুঁজে পায় না সুশাং। বলতে চেয়েছিল, হাতি তো আর মানুষ নয়, অথচ বলতে পারেনি।
বালতিটা নিয়ে জোর পায়ে হেঁটে উঠানের দিকে চলে যায়। ঘরে ঢুকে বসে থাকে চুপচাপ। এক বসাতেই কাটিয়ে দেয় দুই ঘণ্টা।
রোদ তেতে ওঠার পর ছোটভাই পীরেন নকরেককে পাঠিয়ে দেয় ফরেস্ট অফিসে। ফরেস্টবাবু অফিসেই ছিলেন। ভেটেরিনারি টিমের লোকদের তিনি ফোন করে আহত হাতিটার কথা জানালেন। টিমের লোকেরা গেছে মধুটিলায়। সেখানে জরুরি কাজ, সারাদিন লোগে যাবে। আজ আর আসা হবে না এদিকে, আসবে কাল সকালে।
সুশাং বড় হতাশ হয়। কাল সকালতক হাতিটা কি থাকবে? কোনোমতে দাঁড়াতে পারলে হাঁটতেও পারবে। হাঁটতে পারলে কি শিমুলতলায় বসে বসে আরাম করবে? সুশাং ভরসা পায় না। তাই হাতিটার পায়ে মোটা রশি লাগিয়ে বেঁধে রাখে শিমুলগাছের সঙ্গে। সারাদিন গেল, হাতিটা উঠে দাঁড়াল না। সারারাত গেল, তবু হাতিটা একটিবার দাঁড়াতে পারল না।
শেষরাতে সুশাংয়ের স্বপ্নে আবারো দেখা দেয় পুত্র সীমন। মাংরু মাংরাম থেকে শিমুলতলায় নেমে আসে সীমনের আত্মা। কিশোরের রূপ ধরে হাতিটার শুঁড়ে হাত রেখে বলে, নিথুয়া মংমা! চট করে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে হাতিটা। সীমন চড়ে বসে তার পিঠে। তাকে নিয়ে হাতিটা রওনা হয় উত্তরের উঁচু উঁচু গারো পাহাড়ের দিকে। পুত্রের জন্য সুশাং কাঁদতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতে জেগে যায়। জেগেও থামাতে পারছিল না কান্না। স্বামীর কান্না তেনুনীকেও স্পর্শ করে। সে-ও শুরু করে কান্না। দুজনের অশ্রুতে সিক্ত হয়ে পৃথিবীতে ভোর নামে। শিমুলতলায় গিয়ে সুশাং দেখে, হাতিটা উঠে দাঁড়িয়েছে। বাঁ
পা-টা ঠিক নাড়াতে পারছে না। শুঁড় দিয়ে কোনোমতে কলাগুলো একটা একটা করে খাচ্ছে। সুশাংকে দেখে শুঁড়টা তুলে ডেকে উঠল। কে জানে কীসের আরো একটা বিন্দু টপ করে গড়িয়ে পড়ল সুশাংয়ের বুকে। ধীর পদক্ষেপে সে হাতিটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তারপর শুঁড়ে হাত বুলায়। হাতিটা আবার ডেকে ওঠে। সুশাং আবার শুঁড়ে হাত বুলিয়ে ঠোঁটে শুকনো হাসি টেনে বলে, নংনি দিমুং নিথুয়ামা?
হাতিটি আবার ডেকে ওঠে শুঁড় তুলে। যেন সায় দেয়, হ্যাঁ, তার নাম নিথুয়া। কে জানে কীসের আরো কয়েকটা বিন্দু গড়িয়ে পড়ে সুশাংয়ের বুকে। বুকটা বড় কাঁপছে। কেন যে কাঁপছে! কাঁপন থামাতে সে আমতলার মাচায় গিয়ে বসে। খুব কান্না পায় তার। জোর করেও পারে না ঠেকিয়ে রাখতে। বসে বসে কাঁদে। কেন যে কাঁদে! বুঝিবা পুত্রশোক জেগে উঠেছে।
যন্ত্রপাতি আর ওষুধপথ্য নিয়ে ভেটেরিনারির লোক এলো দুপুরে। তারা যখন দুই পায়ের ক্ষতে ওষুধ লাগাচ্ছিল, নিথুয়া তখন চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। একটুও নড়ছিল না। যেন সে চিকিৎসার প্রতীক্ষায় ছিল। যেন সে জানে চিকিৎসা দেওয়ার সময় যে নড়তে হয় না। নড়ল ভেটেরিনারির লোকেরা চলে যাওয়ার পর। কলাগাছটা খেতে লাগল। খাওয়া শেষ করে একনাগাড়ে তিন বালতি জল খেল। তারপর চুপচাপ বসে পড়ল আগের জায়গায়।
পরদিন ভোরে সুশাং দরজা খুলে দেখে উঠানের কোনার পেঁপেগাছাটা ভেঙে পেঁপেগুলো একটা একটা করে গিলছে নিথুয়া। ছেঁড়া রশিটার কিছু অংশ পায়ে বাঁধা। সুশাং হইহই করে ওঠে। কিন্তু কোনো লাভ হয় না, নিথুয়া নড়ে না। সুশাংও আর বাধা দেয় না। সে বারান্দার মোড়ায় গিয়ে বসে। টের পায় বুকের কাঁপন। কে জানে কীসের বিন্দুটা বড় ঝামেলা করছে, গড়িয়ে পড়ার জন্য টলমল করছে।
সব পেঁপে খেয়ে নিথুয়া আবার শিমুলতলায় গিয়ে বসে পড়ে। যেন ওখানেই তার ঘর। ওখানে থাকলেই সে জলদি সেরে উঠবে।
শুয়ে-বসে আর আশপাশে ঘুরেফিরে টানা এগারো দিন সে কাটিয়ে দেয় শিমুলতলায়। এই এগারো দিন সুশাং বসে বসে তার ক্ষতের মাছি তাড়িয়েছে, ভেটেরিনারির লোকেদের দিয়ে যাওয়া ওষুধ লাগিয়েছে এবং ছড়া থেকে জল, বন থেকে গাছ-পাতা আর গাদা থেকে খড় এনে খেতে দিয়েছে। সে ভুলে গেছে প্রতিশোধের কথা। কেন যেন বুকের ভেতর জ¦লন্ত আগুনের আঁচটা আর টের পাচ্ছিল না।
বারো দিনের দিন সকালে সুশাং গিয়েছিল বড়ইকুচি মেয়েজামাইর বাড়ি। সেদিন পড়ন্ত দুপুরে, তেনুনী যখন ভাতঘুম দিয়েছিল, নিথুয়া তখন উঠানে দাঁড়িয়ে ডাকতে লাগল। ডাকছিল বুঝি সুশাংকে। বুঝিবা শেষবারের মতো দেখা করতে চেয়েছিল। দরজা খুলতেই শুঁড়টা বাড়িয়ে দেয় তেনুনীর কাঁধে। তেনুনী হাত বুলিয়ে আদর করে। নিথুয়া আবার ডাক দেয়। তারপর ধীর পা ফেলে হাঁটা ধরে উত্তরের পাহাড়ের দিকে। তেনুনীর আন্দাজ ভুল হয় না। শরীরের প্রায় শুকিয়ে আসা জখম নিয়ে নিথুয়া ফিরে যাচ্ছে চেনা আবাসে, ফিরে যাচ্ছে স্বজনদের কাছে। জীবনভর বয়ে বেড়াবে মানুষের দেওয়া ক্ষতচিহ্ন। আর কখনো আসবে না লোকালয়ে, কখনো দাঁড়াবে না হন্তারক মানুষের মুখোমুখি। তেনুনীর খুব কান্না পায়। বারান্দার মোড়ায় বসে কেঁদে কেঁদে সে বুক ভাসায়।
নিথুয়া মংমা লোকালয়ে আর আসেনি বটে। টানা এক বছর কোনো হাতির পালও দেখা যায়নি এদিকে। অন্তত সীমান্তের এপারে কেউ দেখেনি। এসেছিল পরের বছর ধানের মৌসুমে। একুশটি হাতি এসে প্রতাব নকমার ক্ষেতের অর্ধেক ধান সাবাড় করে দিলো, তজু মিয়ার বাঙ্গিক্ষেত উজাড় করে দিলো। মানুষ আবার ছুটল মশাল, বল্লম, যাত্থা আর লাঠিসোটা নিয়ে। আচিকপাড়ার সবাই গেল, কেবল সুশাং নকরেক ছাড়া। যেতে তার মন সায় দিচ্ছিল না। প্রতিশোধের যে আগুন তাকে পুড়িয়ে মারছিল, সেই আগুন নিভে গেছে। বুঝি সে পুত্রশোকও ভুলে গেছে। বুঝিবা পুত্রহন্তা হাতিকেও ক্ষমা করে দিয়েছে।
তারপর কেটে গেল কত বসন্ত, কত জ্যোৎস্না। কত হাতির পাল এলো আর গেল। সুশাং নকরেক ভুলে গিয়েছিল নিথুয়া মংমার কথা। মাঝেমধ্যে মনে পড়ত। মনটা তখন দহনকালের পোড়া টিলার মতো খাঁ-খাঁ করে উঠত। ভাবত, কে জানে নিথুয়া কোথায় আছে, কেমন আছে। মুহূর্তকাল ভেবে আবার ভুলে যেত।
কিন্তু সেদিন, বসন্তের সেই ভরা জ্যোৎস্নার রাতে, বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিল নিথুয়ার কথা। বহুদিন পর নিথুয়ার সেই করুণ ডাক আবার তার কানে বাজছিল। বহুদিন পর আবার কে জানে কীসের বিন্দুটা বুকে বড় টলমল করছিল। তেনুনী মৃ বলছিল এলাকায় ডাকাত পড়ার কথা। কদিন ধরে ঝিনাইগাতীর গ্রামে গ্রামে হানা দিচ্ছে ডাকাতদল। পরশু রাতে বনরানি ফরেস্ট রিসোর্টে হানা দিয়ে ম্যানেজারকে বেঁধে লুট করে নিয়ে গেছে আশি হাজার টাকা আর দুটি দামি মোবাইল ফোন। তার আগের রাতে বালিজুরি বাজারের এক মুদিখানার তালা ভেঙে লুট করে নিয়ে গেছে নগদ টাকা ও মালামাল। কে জানে কখন আবার এদিকে হানা দেয়! তেনুনীর কণ্ঠে ভয়। সুশাং অভয় দেয়, ভয়ের কিছু নেই। এদিকে আসবে না ডাকাত। তারা জানে, আচিকদের ঘরে নেওয়ার মতো কিছু থাকে না।
ঠিক তখন শব্দ উঠল ঘরের চালে। যেন কেউ টোকা দিয়েছে টিনে। ঠিক টোকা নয়, যেন পচা কাঁঠালমুছি কিংবা পচা আম পড়েছে ঝড়ে। সুশাংয়ের ঘুম পাচ্ছিল। হারিকেনের সলতেটা সে কমিয়ে দিলো। তখন আবারো শব্দ হলো টিনে। সুশাং জানালাপথে বাইরে তাকায়। দু-হাতে জ্যোৎস্না ছড়াচ্ছেন চন্দ্রদেবী সুসিমে, পুবের টিলায় ডাকছে শেয়াল। সুসিমেকে প্রণাম করে সুশাং শুয়ে পড়ে।
এবার শব্দ ওঠে দরজায়। যেন কেউ ধাক্কা দিচ্ছে। তেনুনী মৃ আঁতকে ওঠে। নির্ঘাত ডাকাত এসেছে। নইলে এত রাতে কে দরজা ধাক্কাবে! সুশাং উঠে সন্তর্পণে চকির তলা থেকে যাত্থা আর মংরেংটা বের করে আনে। যাত্থাটা বউয়ের হাতে দিয়ে মংরেংটা নিয়ে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। দরজায় আবার শব্দ ওঠে, আগের চেয়ে আরেকটু জোরে। মংরেংটা উঁচিয়ে ছিটকিনিতে হাত রাখে সুশাং। তখন আবারো শব্দ ওঠে দরজায়। একটানে সুশাং ছিটকিনি নামিয়ে কপাট খুলে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়। একটা কালো শুঁড় এসে ঠেকে তার কাঁধে। কোপ মারতে গিয়ে থেমে যায় তার হাত। শুঁড়টা সরে যায় ধীরে ধীরে। সুশাং এবার দেখতে পায় উঠানে দাঁড়িয়ে আছে একদন্তী মস্ত এক হাতি। এ কোন হাতি, চিনতে তার মুহূর্তকাল দেরি হয় না। তবু নিশ্চিত হতে হারিকেনটা বাড়িয়ে ধরে হাতিটার পায়ের কাছে। পেছনের পায়ে স্পষ্ট দেখতে পায় সেই কাটা দাগ।
সুশাংয়ের বুকের ভেতরে কে জানে কীসের বিন্দুটা জল হয়ে গড়িয়ে পড়ে দুই চোখের কোণ বেয়ে। সামনের দুই পা মুড়ে হাতিটা বসে শুঁড় তুলে ডেকে ওঠে উচ্চৈঃস্বরে। সেই ডাক প্রতিধ্বনি তোলে জ্যোৎস্নামাখা ইথারে ইথারে।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.