কাজী রাফি
এই অঞ্চলের শেষ প্রভাবশালী ব্যক্তি নুরুল আলম মৃত্যুবরণ করলেন ফাল্গুনের এক শবেবরাতের রাতে।
ঈদগাহ মাঠে জানাজা শেষ করার পর আটমূল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক নুরুল আলমের লাশ নেওয়া হলো কবরস্থানে। তেপান্তরজোড়া মাঠের শুরুতে বড় এক দিঘি। নাম ‘ডোমগাড়ি’। বাঁশগাছে ভরা বড় বনটার ভেতর নতুন কবরস্থানে অনেক নিজে নিজে বেঁচে থাকা গাছ আর আগাছার সমাহার। আখন্দ পরিবারের বড় ছেলে মাজহারুল বাবার কবরের মাধ্যমে এই স্থানটাতেই তাদের পারিবারিক কবরস্থানের নতুন ইতিহাস শুরু করল।
লাশ বহনকারী দলটার একজন হয়ে আয়ান নানার লাশ কাঁধে কবরস্থানের দিকে যাচ্ছে। নন্দাইল গ্রামে নানাবাড়িতে কেটেছে তার পঞ্চম এবং ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার দিনগুলো। কী এক ঘোরের মাঝেই তার মনে হতে থাকল যে, সে বারো কিংবা তেরো বছর বয়সের এক কিশোর।
আয়ানের পাশে হাঁটতে হাঁটতে একজন বললেন, ‘হয়েছে বাবা। এখন আমার কান্ধত দাও।’ বলে তিনি জোর করেই কফিনের এক প্রান্ত নিজের কাঁধে নিলেন। আফসোস করে বললেন, ‘কী এক অদ্ভুত ব্যাপার। মানুষটা এমন এক রাতত মারা গ্যালেন যে রাতত তিনি সবাইকে এক করার চেষ্টা করিচ্ছিলেন। বলিচ্ছিলেন যে, তোরা একত্র না থাকা শিখলে, তোদের ভাগ্যে আর কি জুটবে! কী জানি, এই দুঃখেই লোকটা সেই রাততই মারা গেলেন কি না!’
মানুষটা কী নিয়ে বলতে চাইছে, তা নিয়ে অনাগ্রহ সত্ত্বেও প্রশ্ন করল আয়ান। তিনি যা জানালেন তার সারমর্ম হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আসায় গ্রামে এখন কেউ কাউকে মানে না। ইউটিউব আর ফেসবুক সবাইকেই রাজনৈতিকভাবে এত সচেতন করেছে যে, এক লাইন লেখাপড়া না করা পুঁচকে ছেলেটাও নুরুল আলমের চেয়ে নিজেকে ‘বড়ত্বের’ অহমে মুড়িয়ে রাখে। কাউকে কিছু বলতে গেলেই বিপদ। সে নাকি আরো দশটা যুক্তি খাড়া করে। তিনি জানালেন, তার নানা আজ থেকে সাত বছর আগে শেষবার চেষ্টা করেছিলেন, শবেবরাতের বিকেলে বাড়ি বাড়ি পিঠা পাঠানো এবং আগের দিনগুলোর মতো গ্রামবাসীকে নিয়ে সন্ধ্যায় একসঙ্গে খাবার খেতে। কিন্তু তাঁর সেই প্রচেষ্টা নিয়েও গ্রামে সাড়াশব্দ পাননি।
পৈতৃকসূত্রেই নুরুল আলমের বাড়িতে পিতলের বড় বড় ডেকচি সংরক্ষণ করা। ওগুলোতে উৎসবের এমন দিনগুলোতে সারা গ্রামের মানুষের জন্য রান্না হতো। গ্রামের সক্ষম মানুষ সেসব সামাজিক অনুষ্ঠানে সবাই যার যার মতো অবদান রাখতো। সবাই একসঙ্গে বসে খেতো। কিন্তু বড় বড় পিতলের ডেকচিতে আর বহু বছর রান্না হয় না। নুরুল আলম গ্রামবাসীকে বলতেন, সংস্কৃতি নতুন নতুন রূপ নেয়। আমাদের একে অন্যের সঙ্গে এই সৌহার্দ্য বিনিময়, একসঙ্গে চাঁদজাগা সন্ধ্যায় খাবার খেতে বসা – এসব এখন এই গ্রামের সংস্কৃতি এবং একটা সামাজিক স্মৃতির নমুনা বা প্যাটার্ন। এসব ভেঙে গেলে বিস্মৃতি তৈরি হয়। একাকিত্ব এবং হতাশা জাগে। সংস্কৃতি যত লালন করা যায় ততই সমাজ সুস্থ থাকে। কিন্তু তিনি ব্যথিত হলেন। কেউ তার কথায় কর্ণপাত করল না।
অনেক মানুষের সঙ্গে বনের ভেতর কবরস্থানে লাশটা রাখার পর আয়ান জনস্রোতের দিকে একবার তাকাল। তার কৈশোরকাল সামনে আরো ত্রিশ বছর পাড়ি দিয়েছে। এই বাঁশবাগানের পাশ দিয়ে যে-পথ, সে-পথ ধরে বিকেলের মাঠ থেকে বাড়ি ফেরা কত কত সন্ধ্যার কথা তার মনে পড়ল। এক প্রবল আষাঢ়ের সন্ধ্যায় সে বাড়ি ফিরছিল। এই জঙ্গলটার পাশ দিয়ে চলে যাওয়া পথটায় হাঁটুপানির স্রোত। পা ডুবিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটতেই হাঁটতে আয়ানের গতি বাড়তে থাকে। জঙ্গলটার সব বাঁশ আর গাছে কেমন এক নিশ্ছিদ্র কালচে অন্ধকার। যেন বনজুড়ে একটাই প্রাণ! সেই প্রাণ যেন বিস্তৃত চুল, লতা, চোখ মেলে আয়ানকে দেখছে। নির্জন সন্ধ্যার বনটা তার বুকের ভেতর কাঁপন তুলেছিল। সেই বাঁশবাগানটাই এখন তার নানা এবং শিক্ষক নুরুল আলমের ঠিকানা!
অনেক আগের একটা দৃশ্য তার মনের মধ্যে উঁকি দেয়। নুরুল আলম ছোট্ট এক শিশুকে কাঁধে তুলে এই বনটার পাশ দিয়ে যাচ্ছেন। বাচ্চাটা তাঁর মাথার লম্বা ব্যাকব্রাশ করা চুলগুলো এলেমেলো করে দুই হাতে আঁকড়ে ধরে বসে আছে। সে জিজ্ঞাসা করছে, ‘নানা, এই জঙ্গলে ভূত আছে?’
‘ভূত বলে কিছু নাই, নানাভাই। যা আছে তা হলো ভয়। ভয় পেলেই ভূত বের হয়।’
শিশুটি সেদিন ভয়ে ভয়ে বনটার দিকে তাকিয়ে নিজের ভয়টুকু খুঁজেছিল। সে কি উপলব্ধি করতে পেরেছিল, ভূতটা তার বুকের ভেতর? একজন তার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘হায় আল্লাহ, আয়ান না? কতদিন পর তোমাক দেখনো, বাপ। চেহারা খারাপ হয়ে গেছে, ক্যান? কী সুন্দর মানুষ আছিলা, বা রে! পথ ধরে হেঁটে যাওয়ার সময় মানুষ তোমাকে খুশিমনে দেখিচ্ছিল। ফিরা ফিরা তাকাচ্ছিল। আহা, তোমার নানা তোমার জন্য পাগল আছিল, বাবা …’
হ্যাঁ, নানাই তাকে পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষার আগে নিজের কাছে নিয়ে এসেছিলেন। আয়ান ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেলে সেটাকে তিনি জাতির সঙ্গে নিজের কৃতিত্ব বলে গর্বভরে বলে বেড়াতেন। তিনি বড় জামাই এবং মেয়ের বারণ সত্ত্বেও নাতিকে নিজের স্কুলে ভর্তি করালেন, সে-ও হয়তো স্নেহ প্রাবল্যের চেয়েও তিনি একজন প্রধান শিক্ষক হিসেবে কত প্রতাপশালী এবং অন্য শিক্ষকরা তাঁর ভয়ে কীভাবে প্রকম্পিত থাকে – সেটা দেখানোর জন্য। বড় মেয়ে তাঁকে বোঝাতে চাইলেন, ‘বাবা, নানা-দাদার সঙ্গে বাচ্চাদের আদর-আবদারের সম্পর্ক। আপনার কাছে থেকে, আপনারই স্কুলে ও আর কি পড়বে! সারাদিন মাঠেঘাটে টো-টো করে ঘুরে বেড়াবে। আমি বেড়াতে এলে তো আমার ছোট্ট বাচ্চাটাকে ভোরবেলা কাঁধে করে মাঠে নিয়ে যেতেন। উত্তর-দক্ষিণ শেখাতে হবে। পুবদিক থেকে সূর্য ওঠা দেখাতে হবে। চাঁদের রাতে বড়দিঘির টিলার ওপর তাঁবু টানাতে হবে। রাত চেনাতে হবে … আরো কী যেন বলতেন। ওহ, রাতের স্তব্ধতাতেও গান থাকে। তা খুঁজে বেড়ানো শেখাতে হবে। আরো কী যেন! হ্যাঁ, মনে পড়েছে, পাতার কাঁপনে এক সুর তা চৈত্রের খাঁ-খাঁ নির্জন দুপুরে বনের ভেতর বসে বসে শেখাতে হবে। আব্বা, আমার ছেলের মাথাটা শেষ হয়ে যাবে … নান্দাইলে থাকলে ছেলেটা সারাদিন মাঠে ডাংগুলি, ভলিবল আর দুনিয়ার যত খেলা আছে সব নিয়ে মেতে থাকে …’
মেয়ের কথায় নুরুল আলম হো-হো করে হেসে ওঠেন। তিনি বলেন, ‘মা রে! এই বয়সে এগুলোই আমার নানুভাইয়ের জন্য আসল শিক্ষা। প্রকৃতির মতো করে দুনিয়ায় আর কেউ কি কিছু শেখাতে পারে? আমি যা শিখিয়ে দিচ্ছি, দেখিস, আমার নানুভাই সেইসব দিয়েই জীবনে কতবড় মানুষ হয়। ও জীবনকে যেভাবে উপলব্ধি করতে শিখবে, জীবন নিয়ে ভাবতে শিখবে, স্মৃতি নিয়ে মনে শিহরণ জাগাবে – হাজার বইয়ের পাতা তা করাতে পারবে না। আমি যখন থাকব না, দেখিস কথাগুলো কতটা সত্যি হয়।’
‘আব্বা, দুনিয়া আপনার শেখানো প্রকৃতির মায়া আর অনুভব দিয়ে চলছে না। চলছে গণিত, পদার্থবিদ্যার মতো জটিল সব বিষয়-আশয় দিয়ে।’
‘জগতের জটিল যা কিছু তা আমার নানুভাইয়ের মতো সহজ করে আর কেউ কি বুঝবে? আইনস্টাইন ছাত্রজীবনে সাদামাটা, বোকা ছিলেন; কিন্তু আলোকরশ্মিকে একটা পদার্থ হিসেবে দেখেছিল তাঁর দুই চোখ। প্রকৃতির ভাষা নিবিড়ভাবে না বুঝতে পারলে কেমিস্ট্রি আর ফিজিক্স কিছুই বোঝা যায় না রে, বাবা।’
‘আমার ছেলেকে আইনস্টাইন বানাতে আপনি গ্রামের একটা স্কুলে ভর্তি করাবেন? কি আজব কথাবার্তা! এটা বাংলাদেশ, আব্বা। আমাদের কেরানিসমাজ তো ওসবের জন্য প্রস্তুতই হয়নি।’
‘আচ্ছা, মা। বাচ্চাটা আর একটা বছর আমার কাছে থাকুক। ক্লাস সেভেনে বড় কোনো স্কুলে দিও। কিন্তু আমি বলে রাখলাম, নানাবাড়ির এই দুই বছর, এই মাঠ, দিঘি, দিঘির পাড়ের পাহাড়ের মতো টিলা ওর জীবনে পৃথিবীর যে-কোনো স্কুল-কলেজের চেয়ে বড় স্মৃতি আর শিক্ষামঞ্চ হয়ে থাকবে।’
দুই
মানুষ যাকে ভেতর থেকে খুব ভালোবাসে তার কাছেই মনে হয় নিজের সাম্রাজ্য আর আধিপত্য দেখাতে বেশি আগ্রহী হন। নানাভাই আয়ানকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে নিজের স্কুলে নিজের কাছেই রাখলেন। আর এক বছর পর বাচ্চাটা চলে যাবে ভেবে তাঁর যেন নাতিকে প্রকৃতি দেখানোর উদ্দীপনা আরো প্রবল হয়ে ওঠে। বাড়ির দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে খাল, তার পাশে হাজামজা ডোবা। এসবেরই মধ্যে আলাদা করে রাখা ছোট একটা পারিবারিক পুকুর। ঘন গাছপালায় ঢাকা এলাকাটা যেন নিজেই এক রহস্যময় রাজ্য। ছুটির দিনগুলো সেখানে বড়শি নিয়ে মাছ ধরা আরম্ভ করলেন। অগ্রহায়ণের শীতের শেষ রাতে নাতিকে নিয়ে, মাছধরা জাল নিয়ে ছুটলেন। ডোমগাড়ির কচুরিপানায় বুকপানিতে নেমে দিঘির ফাঁকা, শূন্য জলটায় জাল ছুড়লেন। আধো-আলো অন্ধকারে নিপুণ দক্ষতায় তিনি মাগুর, শোল, কই, পুঁটি মাছে ভরা জালটা টেনে ঘাসঢাকা পাড়ে তুলে আনলেন। আয়ানের চোখে তখন অপার বিস্ময়। অন্ধকারে যে-আলোটুকু ফুটছে – সে খেয়াল করল, পুঁটি আর মোয়া মাছের শরীর তার সবটুকুই একা খেয়ে জ্বলজ্বল করছে। আর মাগুর, শোলের চামড়া আরো অন্ধকারকে টেনে নিয়ে আরো জল-চিকচিকে। নানার ভেজা শরীর শীতে ঠকঠক করে কাঁপছে। ঠান্ডা হিম হাতে আয়ানের কান নিচে নামিয়ে বলছেন, ‘কান খোলা রাখা যাবে না, নানাভাই। ঠান্ডা লাগবে।’
‘উফ তোমার হাত কী ঠান্ডা, নানা …’
হ্যাঁ, সেই রাতেই দিঘির দিকে বাঁকা হয়ে ঝুলতে থাকা খেজুর গাছটার ঠিলা তিনি পাড়লেন এবং কাপড়ের ঝোলা থেকে ছাঁকনি আর গ্লাস বের করলেন। এক গ্লাস ভরে আয়ানের দিকে এগিয়ে ধরে বললেন, ‘রাতের এই সময়টা খেজুরগাছের রস সবচেয়ে স্বাদের হয়। লাল টকটকে … খেজুরের রসে শুধু স্বাদই নয়, নানাভাই, জীবনের মায়া লুকিয়ে আছে।’
স্মৃতিঘোরে ডুবে থাকা আয়ান নানার আত্মাহীন দেহকে কখন কবরের ভেতর রাখল, কখন ওপরে দাঁড়াল, কিছুই যেন টের পেল না। এতক্ষণ পর কানের নিচে ঠান্ডা হাতের স্পর্শের সেই অনুভূতি তাকে চমকে দিলো। কাফনের কাপড়ে তবু কিছুটা উষ্ণতা হয়তো আছে ভেবে স্বস্তি পেল। খায়ের মৌলভি, যিনি নানারই সমবয়সী এবং বন্ধুজন, শুক্রবার মসজিদে খুতবার আগে যিনি পবিত্র কোরানের আয়াতের শানে নজুল বা গল্প বলতেন। গল্পের মাধ্যমে সুন্দর করে জীবনকে ব্যাখ্যা করতেন বলে আয়ান খায়ের মৌলভিকে ডাকত ‘গল্প-নানা’। তাঁর শান্ত ভঙ্গিতে বলা গল্পগুলো এখনো তার স্মৃতিতে উজ্জ্বল। খায়ের মৌলভি দাফন শেষে মোনাজাতের জন্য হাত তুলেছেন। কাঁপা-কাঁপা গলায় আরবিতে উচ্চারণ করছেন, ‘আল্লাহুম্মাগফির লাহু ওয়ারহামহু ওয়া আফিকা ওয়াফু আনহু ওয়া আকরিম নুজুলাহু ওয়া ওয়াসসি মুদখলাহু …’
উপস্থিত জনতা সমস্বরে ‘আমিন’, ‘আমিন’ বলছে। জনতার ঢল বাঁশবাগান পেরিয়ে, ডোমগাড়ির দুই পাড় ছাড়িয়ে গ্রামের অলিগলি, আনাচে-কানাচে পৌঁছেছে। সমবেত মানুষের মাঝে নুরুল আলমের ছাত্ররা, যারা এখন কেউ নিজেও কোনো কোনো স্কুলের প্রধান শিক্ষক, সরকারি অথবা করপোরেট চাকুরে। লম্বা মোনাজাতের সময় আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তাদের কথা খায়ের মৌলভি উল্লেখ করেন, ‘ইয়া রাব্বুল আলামিন সারাদেশ থেকে আগত তাঁর ছাত্ররাও আমার সঙ্গে হাত তুলেছে। তারা সবাই সাক্ষ্য দেবে যে, তিনি একজন মহান শিক্ষক ছিলেন, যিনি কঠোরতার মাঝে কোমলতা লুকিয়ে রাখতেন। সত্যের সঙ্গে তিনি মিথ্যাকে মেশাতেন না। আরো সাক্ষ্য দেবে যে, সারাজীবন তিনি তোমার প্রকৃতিকেই জ্ঞানের আধার বলে জেনেছেন। আজ আমাদেরই সঙ্গে হাত তুলেছে আমাদের একজন কৃতী সন্তান, যার শৈশবকালকে তিনি পরম মমতায় বুকে-কাঁধে করে গড়ে দিয়েছেন। ধারণা করি, এই নাতিকে তিনি প্রকৃতির মতোই জগতে সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছিলেন। যাকে তিনি পাতার আওয়াজে যে জীবনগান লুকিয়ে থাকে তা শুনিয়েছিলেন। তুমি তাঁর আত্মাকে যে-রহস্য খোঁজার জন্য দুনিয়ায় পাঠিয়েছিলে, পরের জীবনে তাই-ই খুঁজে ফেরা যেন তাঁর আত্মার খোরাক হয়ে থাকে। ইয়া রাব্বুল আলামিন, সেটাকেই তুমি তাঁর জন্য জান্নাত বানিয়ে দিও।’
এইটুকু শোনার পর আয়ানের দুই চোখের টলটলে জলটুকু অশ্রুতে রূপান্তরিত হয়ে ঝরতে শুরু করে। দলাপাকা আবেগ, তার কণ্ঠনালির কাছের নোনতা স্বাদ সারা শরীরের স্নায়ুকোষে ছড়িয়ে পড়ে। দোয়া চলতেই থাকে – ‘তার পরমপ্রিয় নাতিকে তিনি তোমার মহান সৃষ্টি সূর্যের জেগে ওঠা আর ডুবে যাওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে তোমার সৃষ্টির স্পষ্টতা এবং সেই সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর যে রহস্যময়তা – তা খুঁজে ফেরার মনন তৈরি করে দিয়েছিলেন। হে রাহমানির রাহিম; জ্ঞানকে আবিষ্কারের জন্য, সত্যকে খুঁজে ফেরার জন্য, তোমার রহস্যময়তাকে উপলব্ধি করার জন্য যে মানুষটা সারাজীবন ব্যয় করে গেলেন, নিজের ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর তেমন অর্জন না থাকলেও অনেকের মাঝে জ্ঞানকে ছড়ানোর জন্য আমার বন্ধু, আমাদের সকলের শিক্ষক এবং আজীবন তোমার প্রকৃতির রহস্যময়তার কাছে বিস্ময়ে মাথা নত করে থাকা এক ছাত্রকে আমরা তোমার প্রকৃতির কাছেই রেখে যাচ্ছি। তুমি তাঁর সকল ত্রুটি ক্ষমা করে তাঁকে কবুল করো। এখানে এই দিঘির পাড়ে তাঁর আত্মা অনন্তকাল পাতার আওয়াজ শুনুক, পাখির কিচিরমিচির শুনুক, জ্যোৎস্নারাতে জলে পড়ে থাকা আলোতে অনন্ত জীবন খুঁজে পাক। ইয়া রাব্বুল আলামিন, মৃত নুরুল আলমের জন্য এই ভূমিকেই তুমি জান্নাতে রূপান্তরিত করে দিও।’
সকলের সমস্বরে কান্নামিশ্রিত আর্তিভেজা ‘আমিন’, ‘আমিন’ ধ্বনিতে মোনাজাত শেষ হয়।
তিন
একে একে সবাই চলে যায়। খায়ের মৌলভি আয়ানের কাছে এসে আলতো করে তার কাঁধে হাত রাখলেন। বয়সের কারণে তাঁর উচ্চতা যেন কমে গিয়েছে। তিনি শান্ত, স্থির কণ্ঠে বললেন, ‘আলম তোকে বড্ড ভালোবাসত।’ তাঁর কথার সূত্র ধরেই আয়ানের চোখের সামনে একটার পর একটা দৃশ্য ভেসে ওঠে। একসঙ্গে হাঁটাপথে আড়াই কিলোমিটার দূরে স্কুলের পথে যেতে যেতে নানা বলছেন, ‘নানাভাই, এই যে উঁচু রাস্তার দুইপাশের মাঠে, তুমি যখন বড় হবে, দেখবে – একই মাঠ ভিন্ন ভিন্নভাবে তোমার চোখের সামনে ভাসতে থাকবে। বর্ষা, শরৎ, হেমন্তে এর এক-একটা রূপ। একেক ধরনের ফসল। মাঠটার নাম জানো তো?’
‘ঢেউয়ের মাঠ …’
‘বাহ। হ্যাঁ, গ্রামের লোক ঢেউয়্যার মাঠ বললেও এটা আসলে ঢেউয়ের মাঠ।’
‘কিন্তু, নানাভাই এই মাঠে তো আলু আর সরিষার ক্ষেত দেখছি। ঢেউ হলে তো পানির ঢল লাগবে।’
‘বর্ষাকালে এই মাঠ ডুবে যাবে। চারদিকে পানি থইথই করবে। বিরাট এক বিলের ঢেউয়ে ঢেউয়ে এই মাঠ তখন অন্য রূপ ধরবে। এই যে সামনে সাঁকো। এই সাঁকো দিয়ে জলের প্রবল স্রোত যাবে। আমরা ভোররাতে জাল নিয়ে এসে এখানে মাছ ধরব। ঠিক আছে, নানু?’
‘আমিও আসব?’
‘হ্যাঁ, অবশ্যই। মেঘ রাতকে কত নিকষ কালো রাতে রূপান্তর করে আর তা ভোরে কেমন দেখায়, তোমাকে তা দেখতে হবে। কালো মেঘ কীভাবে দিগন্তের শেষে অসীম জগৎটাকে দখল করে রাখে, তা-ও তোমাকে বুঝতে হবে। দেখা, বুঝলে নানাভাই, স্রষ্টার এই জগৎকে চোখ আর বুক দিয়ে দেখাটাই মানুষকে বড় করে। যা কিছু দৃশ্য হয় অন্তর দিয়ে তা উপলব্ধি করলেই তুমি জীবনের গোপন রহস্যের সন্ধান পাবে।’
কিশোর আয়ান সেদিন নানার কথার মর্মার্থ না বুঝলেও বয়স যত বেড়েছে অন্তর দিয়ে দেখার বিষয়টি তত গভীরভাবে উপলব্ধি করেছে। আষাঢ়ে ঝমঝম বর্ষা আসে। ঢেউয়্যার মাঠ সত্যিই জলের ঢেউয়ে ঢেউয়ে বিরাট এক টলমলে বিলের মতো দেখায়। দূরে ধানক্ষেতের মাথা কোথাও কোথাও একবার জেগেই পরক্ষণে হারিয়ে যায়। মধ্যরাতে নানার ডাক শুনে গভীর ঘুমে তলিয়ে থাকা আয়ান আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসে।
‘যাবে, নাকি ঘুমাবে নানাভাই? তুমি না হয় ঘুমাও, আমি একা যাই …’
নানাবাড়িতে তাঁর সঙ্গে কাটানো সময়গুলো বড্ড বৈচিত্র্যময়। এই বৈচিত্র্যময়তাই তার আত্মা-সত্তায় তুমুল আনন্দের তুফান হয়ে তার সব আরামকে তুচ্ছজ্ঞান করতে শেখায়। সে কল্পনা করল, এক কালো মেঘে ঢাকা আরো নিকষ কালো রাতে ছাতা মাথায় সে সাঁকোর পাশে বসে নানাকে স্রোতের জলে জাল ফেলে মাছ ধরতে দেখছে। তুমুল অন্ধকারে জালভর্তি সাদা সাদা সোনার মতো ঝকমকে মাছ! সে ধড়মড় করে উঠে বসল, ‘আমি যেতে চাই, নানাভাই।’
ঘোরলাগা এবং ঘোরজাগা সেই নিকষ কালো বৃষ্টিমুখর রাত, সমুদ্রসম ঢেউয়্যার মাঠের প্রবল স্রোতগুলো এত এত বছর পর জীবনস্রোত হয়ে কোথায় বয়ে গেছে! সেই স্রোতের কলকল আজ পাতার মর্মর হয়ে নতুন এক ঘোরের মাঝে তলিয়ে নেয় আয়ানকে। চারদিকের ধূসর আলোটুকু নিভু নিভু করছে। সে এখন কোথায়? চারপাশে তাকায় সে। সবাই চলে গেছে। সে একাই নানার সদ্য সমাপ্ত কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
নানা বলতেন, ‘পাতার আওয়াজকে কেন ‘মর্মর’ বলে জানো নানাভাই?’
‘কেন বলে?’
‘কারণ এর মাঝে জীবনের এক গোপন গান লুকানো থাকে। এক জীবনধ্বনি থাকে, যা মানুষকে চলে যাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়।’
চার
স্কুলে ভর্তির পর প্রাণচঞ্চল, উচ্ছল এবং জীবনের প্রতি আকুল নানাকে আয়ান আবিষ্কার করল অনেকটাই উদ্ধত, বেপরোয়া এবং প্রয়োজনের চেয়ে বেশি রাগী একজন মানুষ হিসেবে। কিন্তু ক্রমেই যখন পুরো স্কুল তাকে তাদের প্রধান শিক্ষকের নাতি বলে চিনে ফেলল, আয়ান অদ্ভুতভাবে খেয়াল করল, টিফিনের সময়, মাঠে খেলার সময় সর্বত্রই তার সামনে প্রধান শিক্ষককে আর কোনো কটু কথা কেউ বলছে না, বরং যে-কোনো ছুতায় তাদের প্রধান শিক্ষকের ভয়ে স্কুলের অন্যান্য শিক্ষক কেমন ভীতসন্ত্রস্ত বিধায় ভালো শিক্ষাদানে ব্রতী, তার বিবরণ শুনতে লাগল। বিদ্যালয়টিকে পুরো অঞ্চলে শ্রেষ্ঠ করে তোলার জন্য তাঁর প্রচেষ্টার কথাও তাদেরই মুখে শুনল। স্কুলের মাঠটায় যেখানে সোম এবং শুক্রবার বিকেলে হাট বসে, তার পশ্চিমপাশে দুই যুগের পুরনো রেইন ট্রির নিচে বাদাম, ফুচকার দোকানিরা ভয়ে ভয়ে টিফিনের সময় এসে জোটে। দোকানিরা জানায়, আলম স্যার শিক্ষক আর ছাত্রদের কাছে রাগী হলেও তাদের মতো গরিব মানুষদের প্রতি সদয়। ফুচকাওয়ালা জানাল, তাকে হেড স্যার নাকি একদিন ‘চামচিকা’ সম্বোধন করে বলেছে, ‘কী রে চামচিকা, তুই কি ফুচকা খেয়েই থাকিস নাকি? খাওয়া-দাওয়া ঠিকঠাকমতো কর।’ বড় ক্লাসের এক ফার্স্ট বয় তখন জানায়, ‘স্যার যে কত কোড নাম দিছে। আল্লারে, আল্লা …। তোরা জানিস, শামসুদ্দিন স্যারকে উনি ডাকেন হটিটি বলে।’ ক্লাস টেনের রাশেদ নামের এক ছাত্র জানাল, ‘ফিচকা (ফিঙে), দোয়েল, ঘুঘু, বক, চামচিকা, বাদুড় স্যারের দেওয়া এইসব নাম। যাকে তিনি একটা পাখির নাম দেন, মানে তাকে আসলে তিনি বকছেন। স্যারকে এই জন্যই সবাই খুব ভয় পায়। ফাঁকিবাজি করলেই একটা নাম জুটে যাবে এবং সেটা হয় কোনো একটা পাখির নামে। হি-হি … ।’ আরেকজন বলে, ‘আচ্ছা, পাখিদের মানুষ আদর করে নাম দেয়। কিন্তু স্যার দিলেই সেটা একটা ভীতিকর ব্যাপার হয় ক্যান?’ অন্যজন উত্তর দেয়, ‘বাবারে …’ তার বাক্যটা আর শেষ হয় না। আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘এই যে, মামা, নাও … নাও … বাদাম নাও।’ বলেই সে প্রসঙ্গ বদলায়, ‘তবে, স্যার কিন্তু কোনো ছাত্রকে বাজে কোনো নাম দেননি।’ এ-কথায় হাসির রোল উঠলেই কি এক ভীতিতে তা ক্ষণিকেই চাপা পড়ে যায়। তারা দূর থেকেই সিংহের চালে চলা মানুষটার ছায়া দেখে চুপ হয়ে যায়। অনেকেই ন্যারেশন আর ভয়েস চেঞ্জ আর একটু দেখে নেওয়া দরকার বলে দ্রুত ক্লাসের দিকে যেতে থাকে। তাজুল নামে নাইনের এক ছাত্র বলে বসে, ‘স্যার, এত ভালো পড়ায়। কিন্তু অযথা দুর্নাম কুড়াইতেছে। কেন বাবা, মানুষকে এত ভয় পাওয়ানোর কী আছে?
তার এই কথায় একজন তাকে কনুই দিয়ে গুঁতো দিয়ে চোখের ইশারায় আয়ানকে দেখিয়ে দেয়। সে আয়ানের কাছে এসে আদর করে তার পিঠে হাত রেখে বলে, ‘না, সমস্যা নেই। মামা এখন আমাদের ভুক্তভোগী পাখিদের দলে।’
এসব শুনতে শুনতেই আয়ান তার শ্রেণিকক্ষের দরজার কাছে পৌঁছায়। এরপর আসবেন রাজ্জাক মৌলভি। ধর্ম ক্লাস নিতে। এসেই তিনি সবার আগে আয়ানের গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে বলবেন, ‘তোর মাকে পড়ানো। তোকেও পড়াচ্চি। দুনিয়ার কি খেলা বারে!’
এই স্যারকে আয়ানের পছন্দ। পাঠ্যবইয়ের বিষয়ের চেয়ে তিনি আয়াত অবতীর্ণের গল্প করতে ভালোবাসেন। এমন মুগ্ধ ছাত্র পেয়ে রাজ্জাক স্যার আনন্দচিত্তে বলেন, ‘একদম মায়ের মতো হইছিস। এমন মনোযোগ দিয়ে তোর মাও আমার কথা শুনতো। আর খালি প্রশ্ন করতো।’
ক্লাস শেষে তিনি আয়ানকে আলাদা করে ডাকেন।
পিতৃস্নেহে পকেট থেকে আট আনা দিয়ে কেনা কয়েকটা (তার ভাষায়) লেবেনচুষের মধ্যে তিনটা লজেন্স আয়ানের হাতে দিয়ে বলেন, ‘তোর মাকে যখন এই লেবেনচুষ দিচ্ছিনু তখন এগলার দাম ছিল দশ পয়সা। এখন আট আনা। কী দিন আইল।’
চার
আয়ান নানার স্কুল থেকে ষষ্ঠ শ্রেণির পাঠ সমাপ্ত করে সপ্তম শ্রেণিতে শহরের স্কুলে ভর্তি হয়। সপ্তম শ্রেণিতে রোল নাম্বার ওয়ান সারা বছরের জন্য অনুপস্থিত হয়ে যায় বলে নুরুল আলম মাঝে মাঝেই দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। স্কুল থেকে মেধাবী এক ছাত্রের চেয়েও তাঁর সারাক্ষণের ভাবনাসঙ্গী নাতির অনুপস্থিতিতে তিনি অনেকটাই বিষণ্ন হয়ে পড়েন। কিন্তু আয়ান পরে জেনেছিল, বড় বড় ফুটবল টিমের সঙ্গে ফুটবল খেলতে গিয়ে নানা তাঁর পা ভেঙে ফেলেছে। আয়ানের কানে এই খবরটাও গেল যে, তার নানার পা ভাঙার কারণ নাকি ‘অনিতা’ নামের দশম শ্রেণির এক মেয়ে। সেই ঘটনার পর নুরুল আলমের জীবনে দেখা গেল নতুন বসন্তের বিপদ। অনিতা রানি রায় হেড স্যারের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে এবং হেড স্যারকে দেখলে জগৎ-সংসার সব ভুলে দূর থেকেই মায়াভরা ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকছে – এমন খবর নাকি ছড়িয়ে পড়েছে স্কুলে। কিন্তু তা কি অনিতার প্রেম ছিল, নাকি ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাশ করানোর মহান পুরুষটার ক্ষমতার দিকে দৃষ্টি ছিল, তা নিয়ে মতভেদ আছে। পরমা সুন্দরী, লম্বা ছিপছিপে গড়নের অনিতার জন্য দশম শ্রেণির রাশেদ, রাসেল স্বপ্নে বিভোর ছিল। অনিতার গ্রামের সদ্য এমবিবিএস পাশ করা এক ডাক্তারও লাইন দিয়ে আছে। এরা সবাই হেড স্যারের ওপর নাকি চরম ক্ষিপ্ত হয়ে পথে তাকে থামিয়ে অপদস্ত করার পরিকল্পনা করতে গিয়ে পরিস্থিতি কেমন দাঁড়াতে পারে – সেই ভয়ে গায়ে জ্বর ধরিয়েছিল।
রাজ্জাক মৌলভি মারা গিয়েছেন প্রায় বিশ বছর আগে। কথাটা মনে হতেই আয়ান আবার বাস্তবে ফিরে আসে। অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে বনে। এই বনে প্রথম কবরস্থানের পাশ থেকে কখন সে দিঘির ধারে জলের কাছে একা দাঁড়িয়ে আছে।
এখানে-সেখানে পাতার ফাঁক দিয়ে গভীর অন্ধকারে তারাভরা আকাশটা উঁকি দিচ্ছে। তারই ছায়া পড়েছে জলের ওপর। সন্ধ্যারাতের তারাগুলোর অস্পষ্ট আলো জগতের সকল বিষণ্নতা আর আনন্দে, সকল পাওয়া আর অপ্রাপ্তির মাঝে অদ্ভুত এক সমীকরণের প্রলেপ হয়ে কাজ করে মনে। আয়ান জলের ওপর নেমে আসা অন্ধকারের সঙ্গে দৃষ্টিবিনিময়ে মগ্ন আবছা আলোর দিকে তাকিয়ে থাকল। রাতের ময়দামাখা চাঁদের আলোয় অথবা অন্ধকার রাতে যে-মানুষ মাছের আঁশে সাদা সাদা সোনা দেখে জগতে নিজের অস্তিত্বকে প্রবলভাবে অনুভব করতে চাইত, গায়ে শিশির আর কুয়াশা মাখতে মাখতেই একটা জীবন পার করে দিত, তারা হঠাৎই নাই হয়ে গেলে শিশির আর কুয়াশার আস্তরণকে কি এত আপন মনে হয়? এই রাতে ‘সময়’ নামক এক যাযাবর চাঁদের রুপালি আস্তরণকে বুকে মেখে কীভাবে, কোথায় হারিয়ে যায়? সেসবের মাঝেই হারিয়ে যাওয়া আত্মাগুলো কি চিরতরে লুকিয়ে যায়?
এই উপলব্ধি স্পষ্ট হওয়ামাত্র এই রাতের কাছে সমর্পিত নিস্তব্ধ প্রকৃতি অথবা প্রকৃতির কাছে সমর্পিত এক রাতকে বড্ড আপন মনে হলো আয়ানের। এতক্ষণ পর যেন আরো একটা বোধ তার কাছে উন্মোচিত হলো। নানার কাঁধে অথবা তার হাত ধরে অথবা তার পেছন পেছন হেঁটে-দৌড়ে কাটানো সময়ের শৈশবের মাঠ, বন-বাদাড়, ঘুটঘুটে অন্ধকার, মেঘলা অথবা জোছনারাত।
কে যেন ফিসফিস করে বলছে, ‘রাত হয়েছে। বাড়ি ফিরে যাও, নানাভাই। তুমি ঘুমাও, আমি তো আমার জগৎকেই পেয়েছি। …’
আর এক কণ্ঠ বলছে, ‘মানুষকে একা থাকার জন্য এক জগৎ আবিষ্কার করতে হয়। কারো সঙ্গে আসলে কেউ থাকে না। নিজেকেই নিজের সঙ্গে থাকতে হয়। যেমন আমার সঙ্গে নিয়ে আসা স্মৃতি আর মায়ার কুহেলিকা বয়ে এনেছি প্রকৃতি আর সেই-ই আমার অনন্তযাত্রার আশ্রয়।’
পাঁচ
আয়ানের চিন্তার ঘোর কেটে যায় কয়েকটা টর্চের অনবরত আলোয়। একসময় কয়েকটা টর্চের আলো তার শরীরে স্থির হয়। কয়েকটা কণ্ঠের সঙ্গে মামার কণ্ঠ সে স্পষ্টই শুনতে পায়, ‘আয়ান , আ … য়া … ন বাড়ি চলো, বাবা। তোমার নানা তোমাকে ছাড়া রাতের খাবার খাচ্ছে না।’ সে আলোর দিকে ফিরতেই অন্ধকারে ঢেকে থাকা চারদিকটা হারিয়ে যায়।
কোথাও কেউ নাই। কোনো আলো নাই, কণ্ঠস্বরটা সে ভুল শুনেছে?
আর তখনই আবার কিছু মানুষকে সে দেখে। মামার কণ্ঠ যাদের মধ্যে খুবই স্পষ্ট। আলো হাতে তারা এগিয়ে আসছে … এক কণ্ঠস্বর বলছে, ‘আচ্ছা, বলো তো, এই সন্ধ্যায় মাত্র মরা মাইনষের কবরের কাছে কেউ থাকে!’ আর একজন বলে, ‘ওর ভয়ডর কিচ্ছু নাই?’
এবার সে মামার কণ্ঠ শুনতে পায়। কবরের কাছে টর্চের আলো ফেলে আয়ানকে না দেখে তিনি হতাশাভরা কণ্ঠে বলছেন, ‘কী ব্যাপার? ছইল কই গেল?’
আর একজনের টর্চের আলো পুরো বন ভেদ করে, গাছগুলোর ফাঁক-ফোকর দিয়ে দিঘির কাছে আয়ানের দাঁড়িয়ে থাকা ছায়াটকে ধরে ফেলে। উচ্ছ্বাসভরা কণ্ঠে কেউ একজন বলে, ‘ওই তো, দিঘির সামনে …’
মামা দ্রুত এগিয়ে আসেন। আয়ানের কাঁধে হাত রাখেন। বলেন, ‘সারাদিন কিছু খাওনি। ঘরে চলো, বাবা।’
মানুষ আসলে কোথায় ফিরে যায়? কোথায় তাদের গন্তব্য? অন্ধকার ঘনিয়ে আসা বনটাকে আরো গহিন মনে হয়। এই গহিন বনে দুই-একটা পাতা ঝরছেই।চৈত্ররাতের ঝরেপড়া পাতার মৃদু আওয়াজে আজ কোনো জীবনধ্বনি নেই!


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.