দীর্ঘকাল রোগযন্ত্রণার অবসান ঘটিয়ে বিদায় নিলেন শিল্পচর্চায় নিবেদিতপ্রাণ একজন শিল্পী। তিনি চারুকলার অধ্যাপক শামসুল ইসলাম নিজামী। ধর্মপ্রাণ একজন মানুষ ছিলেন, সস্ত্রীক হজব্রতও পালন করেছেন। মানবতাবাদী একজন উদার অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তির মাঝে আপন ধর্মের প্রতি গভীর নিষ্ঠা ও আনুগত্য সত্যি বিরল। বারো আউলিয়ার চারণক্ষেত্র ও পুণ্যভূমি চট্টগ্রামের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি ঐতিহ্য রয়েছে। শিল্পী নিজামী মানুষকে মানুষ হিসেবেই ভালোবাসতেন, সম্মান করতেন। তাঁর চরিত্রে অনেক মানবিক গুণের সমাহার ঘটেছিল, যা আমরা অনেকেই জানতাম না। একজন পরোপকারী সমাজসেবী ও শিক্ষানুরাগী হিসেবেও তিনি পরিচিত। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের মতো একজন মহৎপ্রাণ ব্যক্তি ও সংগঠকের সান্নিধ্য তিনি পেয়েছিলেন প্রায় তিন দশক কাল। জয়নুল আবেদিন যখন বাংলার গৌরবময় যুগের রাজধানী সোনারগাঁওয়ে লোকশিল্প-জাদুঘর এবং শিল্পীদের জন্য আবাসস্থল নির্মাণ-পরিকল্পনা করছিলেন, তখন তরুণ শিল্পী নিজামী তাঁর শিল্পগুরুকে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা দিয়েছেন। এই সময় মৃৎশিল্প বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মীর মোস্তফা আলীও শিল্পাচার্যের পাশে থেকে উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছিলেন।
পঞ্চাশের দশকে যখন পাকিস্তানি তাহজীব্ তমদ্দুনের ব্যাপক প্রভাব সমাজজীবনে – তখন একটি বাঙালি মুসলিম পরিবার থেকে ধর্মীয়ভাবে প্রায় নিষিদ্ধ জীবনধারা বেছে নেওয়া এবং গ্রহণ করা একটি দুরূহ ব্যাপার ছিল এতে কোনো সন্দেহ নেই। তখনকার মুসলিম-জাগরণের উদ্বেল স্রোতে জ্ঞান-বিজ্ঞান-আহরণের একটি মানসিকতা সমাজজীবনে হয়তো স্থিতি পাচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু সাধারণভাবে ধর্মপ্রাণ মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমানের সন্তান চিত্রকর হয়ে মানুষ ও প্রাণিকুলের ছবি আঁকবে – এটি মোটেই অনুমোদন পেত না। কিন্তু যুবক নিজামী অদম্য মানসিক শক্তি ও অধ্যবসায়ের ফলে জয়নুলের উৎসাহ ও স্নেহের পরশে পরবর্তীকালে দেশের একজন খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
শিল্পী নিজামীর চিত্রকলা, তাঁর ভাস্কর্য, তাঁর মৃৎশিল্প, তাঁর ক্যালিগ্রাফি – এই সবকিছু মিলে তাঁর শিল্পজীবন গড়ে উঠেছে। শিল্পীর জীবনযাপন, জীবন-ভাবনা এবং সর্বোপরি তাঁর শিল্পভাবনা ও বিবর্তন, তাঁর কাজে জানা ও অজানা প্রভাব – এসব নিয়ে আলোচনা হয়তো পরবর্তীকালে আরো হবে।
আমি বলব, একজন আধুনিক কবি বা চিত্রশিল্পীকে সম্পূর্ণভাবে বা আংশিকভাবে চিনে জেনে নেওয়া খুব সহজ ব্যাপার নয়। আমাদের মাঝে থেকেও তিনি তাঁর নিজের গড়া অচিন দেশের বাসিন্দা। সামাজিক পরিবেশ-পরিস্থিতিতে তিনি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন, তবে সেটি তাঁর মতো করে, তাঁর নিজস্ব ভাষায়। এটি ঠিক, শিল্পকর্মেরব্যাখ্যা-ব্যবচ্ছেদ খুবই কঠিন ও স্পর্শকাতর বিষয়। অপরিসীম ধৈর্য ও ভালোবাসার পরশেই এর গভীরে প্রবেশ করা সম্ভব। নতুবা সমস্ত অন্বেষণই পণ্ডশ্রম। একজন শিল্পী প্রথমত নিজের জন্য আঁকেন। চীনের প্রাচীরের মতো এক দুর্ভেদ্য বাধাকে ভেদ করে তাঁকে আলোর সন্ধান লাভ করতে হয়। তাঁর আরাধ্য মাণিক্য, তাঁর ভাষা তখন হয়ে ওঠে সকলের। এক্ষেত্রে শিল্পী একজন Puritan -ও বটে, একজন fundamentalist। শিল্পের ক্ষেত্রে তিনি কোনো আপোস করেন না। আর যিনি আপন কর্মে ও চিন্তায় কখনো দ্বিধা করেন না তিনিই একজন স্বার্থক মৌলবাদী! সেই অর্থে চিত্রশিল্পী নিজামী সত্যিকারের একজন আদর্শবাদী। শিল্পের মূলনীতি ও আদর্শের প্রতি ছিল তাঁর গাঢ় বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা।
এদেশে রাজনীতি নীতিহীন-আদর্শহীন হয়ে গেলে তথাকথিত শিক্ষিতসমাজও নষ্ট হয়ে পড়ে। আমরা একে অপরের গায়ে সুবিধেমতো রং চড়াতে থাকি। স্বগোত্রীয় কেউ কেউ শিল্পীকে একজন মৌলবাদী হিসেবে চিহ্নিত করে আনন্দ পেতেন। তবে চিত্রশিল্পী হিসেবে তিনি একজন বিশুদ্ধবাদী ছিলেন, এতে কোনো সংশয় নেই। ইলাসট্রেশনকে তিনি কখনো পেইন্টিংয়ের মর্যাদা দেননি। কোনো ভড়ঁহফ ড়নলবপঃ, কোনো artificial texture তৈরি বা অন্য কিছু সেঁটে ইলিউশন সৃষ্টি করা – এসব তিনি পছন্দ করতেন না। এসবের মাঝে তিনি শিল্প খুঁজে পাননি। আসলে তিনি কোনো ঘরানায় belong করতেন না।
নিজেই নিজেতে মগ্ন থেকে সারাজীবন ছবি এঁকে গেছেন। বড় বড় ক্যানভাসে কাজ করতে ভালোবাসতেন। তিনি কারো তোয়াক্কা করতেন না, তাঁর ছবির কদরও ছিল না। আর কেউ তাঁকে পুরস্কৃতও করতেন না। তবে, তিনি একাধিকবার তিরস্কৃত হয়েছিলেন কারো কারো দ্বারা। এ-প্রসঙ্গে অভিযোগ আছে, আমাদের দেশে কখনো কখনো ছবি পুরস্কৃত না হয়ে ব্যক্তি পুরস্কৃত হয়েছে। নিজামী সাহেব মোসাহেবিতে কখনো পারঙ্গম ছিলেন না এবং দলবাজি করতেও পছন্দ করতেন না। এই পরিপ্রেক্ষিতে হৃদয়ের সকল কষ্ট ধারণ করে বিশালায়তন ক্যানভাসে তিনি আশ্রয় গ্রহণ করেছেন।
বিশুদ্ধ বিমূর্ত চিত্রকলার শিল্পী নিজামীর যে-চোখ এবং হাত গড়ে উঠেছিল, যে-মুন্শিয়ানা তিনি অর্জন করেছিলেন, তা আমাদের অনেক বড় বড় শিল্পীর মাঝেও ক্বচিৎ পরিলক্ষিত হয়। প্রয়াত শিল্পী কাজী আবদুল বাসেতের কিছু বিমূর্ত কাজের ছায়া শিল্পীর অজান্তেই হয়তো তাঁর উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তবে বর্ণ-বিন্যাস ও প্রয়োগ এবং কম্পোজিশন-কাঠামো সম্পূর্ণই শিল্পীর নিজস্ব। তাঁর স্টাইল ও ভাষা তাঁকে অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে পরিচিত করেছিল। তিনি ছিলেন তাঁর ক্যানভাসগুলোর মতোই বিনম্র, স্বল্পভাষী ও কন্টুরবিহীন।
মানুষটি কখনো জোরে কথা বলতেন না, উচ্চকিত হতেন না। কখনো কাউকে একটি মন্দ কথাও বলতেন না। ধরিত্রীর মতো সহনশীল একজন ভদ্র-বিনয়ী মানুষ ছিলেন শিল্পী নিজামী।
বিশিষ্ট নাট্যকার ও চিত্র-সমালোচক সাঈদ আহমদের লেখা এক সমালোচনা-তথ্যে জানা যায়, পাকিস্তান-আমলে পূর্ব জার্মানি ভ্রমণকালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার ওপর অঙ্কিত শিল্পীর তিনটি তৈলচিত্র East Berlin National Museum গ্যালারিতে সযত্নে রক্ষিত আছে। একজন বাঙালি চিত্রশিল্পীর জন্যে এটি নিঃসন্দেহে গৌরবের কথা। শিল্প-সমালোচক সাঈদ আহমদ শিল্পী নিজামীকে এভাবে দেখেছেন, Ò…The urge to express the happenning of surroundings, the incomprehension of the mystical world and the smallness of ownÕs existence in this vast void, had given Ni“ami tremendous thrust all along his mature career”
শিল্পী নিজামী বেশ কিছুদিন ইনস্টিটিউটের মৃৎশিল্পের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। পাকিস্তান-আমলে যুক্তরাজ্যে তিনি মৃৎশিল্পের ওপর উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন বার্নস্লি কলেজ অফ আর্টস অ্যান্ড ক্রাফট্স থেকে। তাঁর মৃৎশিল্প সম্পর্কে অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘…his ceramic works represent a subtle balance of utility and aesthetics.’
সামাজিক প্রতিপত্তিসম্পন্ন একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও শেষ জীবনে ব্যয়বহুল দুরারোগ্য ব্যাধি (ব্লাড জাইলাসিস) তাঁর পরিবারটিকে কপর্দকশূন্য করে দেয়। স্ত্রী মোসাম্মৎ রোকেয়া বেগমের নিরলস সেবা-শুশ্রƒষা শিল্পীকে সাময়িকভাবে স্বস্তি দিলেও সমগ্র অসহায়তা তাঁকে শেষ সময়ে বিপন্ন ও নিস্তব্ধ করে তুলেছিল। শিল্পী যেমন কারো দয়ার ভিক্ষা গ্রহণ করতে নারাজ ছিলেন, তেমনি শিল্পীমহল বা বিশ্ববিদ্যালয় মহল থেকেও কেউ এই দুঃসময়ে কোনো আর্থিক সাহায্যের হাত বাড়ায়নি। জানি না কেন এমন হলো! একমাত্র সাজু আর্ট গ্যালারির মালিক রমিজ আহমেদ চৌধুরী শিল্পীর চিকিৎসা-খরচের জন্য তাঁর ছবির একটি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছিলেন। শিল্পী বীরেন সোম ও অধ্যাপক আবদুস শাকুর নানাভাবে এই প্রদর্শনীতে সাজু গ্যালারিকে সহযোগিতা করেছেন। ছবির সংগ্রাহক ও শিল্পপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আবেদন রেখে উদ্বোধনী বিকেলে ভাষণ দিলেন প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব ফারুক সোবহান ও গ্রামীণফোনের কর্মাধ্যক্ষ মেহবুব চৌধুরী। পত্রপত্রিকা ভালো কভারেজ দিল। এই প্রদর্শনীর বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়ে শিল্পীর জীবনের শেষ কয়েকদিনের চিকিৎসা-ব্যয় সম্ভব হয়েছিল। আজ তিনি নেই, তাঁর কাজ রয়ে গেছে। আমরা তাঁর চিকিৎসার জন্যে কোনো ভূমিকা রাখতে পারিনি; আমাদের অক্ষমতার জন্য আমরা তাঁর বিদেহী আত্মার কাছে করজোড়ে ক্ষমাপ্রার্থী। যাঁরা এদেশের শিল্প-আন্দোলনের ভাগীদার বলে নিজেদের অংশ দেখে বুঝে নিয়েছেন, তাঁরা কী বলবেন জানি না, তবে শিল্পী নিজামীকে যদি চারুকলার একজন একনিষ্ঠ সেবক হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে মরণোত্তর পুরস্কার বা পদকে ভূষিত করা হয়, সেটি একটি সঠিক পদক্ষেপ হবে বলে আমি মনে করি। আর মরণোত্তর সম্মানে আমাদের কারো এতটুকু ঈর্ষার উদ্রেক না হওয়ারই কথা।
শামসুল ইসলাম নিজামী ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রবীণ শিল্পীদের শিল্পচর্চা-প্রতিষ্ঠান ঢাকা আর্ট সার্কেলের (প্রতিষ্ঠা-সাল ১৯৯৪) একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে আমরা প্রতিষ্ঠানের একজন নিবেদিতপ্রাণ শিল্পীকে হারালাম। হে প্রয়াত শিল্পীবন্ধু, আমরা তোমার জন্যে কিছুই করতে পারিনি। তোমার এতটুকু কষ্টও লাঘব করতে পারিনি। আমাদের তুমি ক্ষমা করে দিও।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.