পাঠকের চিঠি

অধ্যাপক অমিয়কুমার দাশগুপ্ত

কালি ও কলমে অধ্যাপক অমিয়কুমার দাশগুপ্ত : শতবার্ষিকী শ্রদ্ধার্ঘ্য নামে স্মারকগ্রন্থটির ওপর অনবদ্য একটি রচনার জন্য সনৎকুমার সাহাকে ধন্যবাদ। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অশোক মিত্রের প্রকাশনায় কলকাতা থেকে ছাপানো এই বইটি, সত্যিকথা বলতে গেলে, পুস্তকপ্রেমিকদের কাছে একটি সংগ্রহের বস্তু (collector’s item) বলে বিবেচিত হতে পারে। অমিয়বাবুর বেশ কয়েকজন ছাত্রছাত্রী, পরিবারের সদস্য, অনুরাগী এবং অধ্যাপক অমিয়কুমার দাশগুপ্তের নিজের কয়েকটি রচনা-সমৃদ্ধ এই বইটি সম্পর্কে বেশ বড় এবং বিশদ একটি আলোচনা করে সনৎবাবু সকলের কৃতজ্ঞতা অর্জন করেছেন।

সনৎকুমার সাহার লেখাটি পড়লেই বাংলাদেশের তথা সমগ্র উপমহাদেশের অর্থনীতিশাস্ত্রের গুরুস্থানীয় এক মহত্তম শিক্ষক সম্পর্কে সম্যক ধারণা হবে। এই পত্রলেখকের সৌভাগ্য হয়েছিল এই মহৎ শিক্ষক এবং অসাধারণ মানুষটিকে কয়েকদিনের জন্যে বেশ কাছে থেকে দেখার।

 সেটা সম্ভবত ১৯৭৪ সাল। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়-মঞ্জুরি কমিশনের সচিব। একদিন চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ চৌধুরী, সংক্ষেপে ‘ম্যাক’ স্যার, আমাকে ডেকে বললেন, ‘বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে অধ্যাপক অমিয় দাশগুপ্ত ঢাকায় আসছেন কয়েকদিনের জন্য। আমরা গ্র্যান্ট্স কমিশন থেকে ওঁর দেখাশোনা করব। আপনি রাজ্জাক স্যারের কাছে চলে যান, স্যারের কাছ থেকে কী করতে হবে সব জেনে আসুন।’ বলাবাহুল্য, আমি অর্থনীতির ছাত্র ছিলাম না এবং তখনো অমিয়বাবুর নাম শুনিনি। রাজ্জাক স্যারের কাছে গেলাম। তিনি যেভাবে অধ্যাপক অমিয়কুমার দাশগুপ্তের বর্ণনা দিলেন তাতে অবাক হয়ে গেলাম। এতদিন আমি ‘স্যার’কেই গুরুদের গুরু বলে জানতাম। কিন্তু সেদিন জানতে পারলাম ‘স্যারে’রও একজন স্যার আছেন। এর কয়েকদিন পর অমিয়বাবু সপরিবারে এলেন এবং মঞ্জুরি কমিশনের অতিথি ভবনে না থেকে রাজ্জাক স্যারের বাসাতেই উঠলেন। আমাকে মাঝে মধ্যে একাজে-সেকাজে ফুলার রোডের সেই বাড়িতে যেতে হতো। সেখানে এই একদা-গুরুশিষ্য এবং পরবর্তীকালে একদা-সহকর্মীর মধ্যে যে-অপূর্ব সম্পর্ক দেখেছি, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। একদিন দুপুরে স্যার তাঁদের বাড়িতে আমাকে তাঁদের সঙ্গে খেতে ডেকেছিলেন। আরো অনেকে ছিলেন। ওঁরা যেসব কথাবার্তা বলছিলেন মুগ্ধ হয়ে শোনা ছাড়া আমার কিছু করার ছিল না। মনে আছে ‘স্যার’ নিজে ঢাকার বাজার থেকে এতবড় কৈ মাছ এনেছিলেন, যা এর আগে আমি কোনোদিন খাওয়া তো দূরের কথা, দেখিইনি।

ওঁরা চলে যাওয়ার পর স্যারের কাছে অমিয়বাবুর সম্বন্ধে আরো অনেক গল্প শুনেছি। দিনে দিনে অমিয়বাবু সম্পর্কে আমার কৌতূহল বেড়েছে। অবশেষে অশোক মিত্রের আপিলা চাপিলা পড়ে এই মহান শিক্ষক সম্পর্কে আরো অনেক কিছু জানার সৌভাগ্য হয়েছে। জানতে পেরেছি যে, অর্থনীতির এই বিশিষ্ট শিক্ষককে কীভাবে কলকাতার বিদ্যোৎসাহী মহলে, বিশেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে, প্রায় অবহেলাই করা হয়েছে। অবাক হয়ে যাই যখন দেখি যে, কলকাতা থেকে প্রকাশিত সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান বইটিতে অমিয়বাবু সম্পর্কে (সংসদ বাঙালি অভিধান, দ্বিতীয় খণ্ড, জানুয়ারি ১৯৯৬) যে-ভুক্তিটি আছে তাতে তিনি পৃথিবীর কোন কোন জায়গায় পড়িয়েছেন, গবেষণা করেছেন এবং কাজ করেছেন সব সন-তারিখসহ দেওয়া আছে। শুধু নেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম এবং তিনি যে ১৯২৬ থেকে ৪৬ সাল পর্যন্ত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এ-বিষয়ে বিন্দুমাত্র উল্লেখ।

সনৎবাবুর লেখাটিতে ওই বইয়ের বিভিন্ন লেখকের স্মৃতিচারণ থেকে এই একনিষ্ঠ শিক্ষক এবং অত্যন্ত বড়মাপের অর্থনীতিবিদের ব্যক্তিগত জীবন এবং অর্থনীতিচর্চার অনেক কিছুই জানতে পারলাম। 

সবগুলো লেখাই তথ্য-সমৃদ্ধ। তবে   অম্লান দত্ত, এস আর সেন, অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায় এবং জামাতা আই জি প্যাটেল Ñ এঁদের লেখায় একজন অর্থনীতিবিদের    তত্ত্বচিন্তাগুলোও কীভাবে ধীরে ধীরে তাঁর পড়াশোনা, গবেষণা এবং শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে তা বেশ ভালোভাবেই বোঝাগিয়েছে। যদিও পুত্র পার্থ দাশগুপ্ত পিতা সম্পর্কে লিখেছেন, ‘ঞযব ঃবধপযবৎ রহ যরস ড়িহ ড়াবৎ ঃযব ংপরবহঃরংঃ. টহষরশব ধহু ড়ঃযবৎ ংপরবহঃরংঃ ও যধাব শহড়হি, বাবহ ঢ়ৎড়ভবংংরড়হধষষু যব ৎিড়ঃব ঃড় বীঢ়ষধরহ, হড়ঃ ঃড় পৎবধঃব.’ তবু অম্লান দত্ত, এস আর সেন এবং অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়ের লেখাগুলো পড়ে মনে হয়েছে ছাত্রদের মধ্যে অর্থনীতির নানান তত্ত্ব ব্যাখ্যা করার মধ্য দিয়ে অমিয়কুমার দাশগুপ্ত বোধহয় কিছু তত্ত্বকে নবরূপে সৃষ্টিও করে গেছেন। যদিও নিজে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে ‘কবুহবংরধহ ঊপড়হড়সরপং ধহফ টহফবৎফবাবষড়ঢ়বফ ঈড়ঁহঃৎরবং’ (বক্তৃতা, লক্ষেèৗ বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৪৯ এবং পরে ইকনমিক উইকলিতে ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত) লেখাটির জন্য কোনো বিশেষ কৃতিত্ব দাবি করেননি, তবু ওই লেখাটি যে শুধুমাত্র রিকার্ডোর তত্ত্বের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ তা বিশ্বাস করা কঠিন। মনে হয়, নোবেল কমিটিও তা মানেনি। তা নাহলে আর্থার লুইসকে ১৯৭৯ সালে প্রায় একই তত্ত্বের জন্য, বোধহয়, নোবেল পুরস্কার দেওয়া হতো না। এখানে বলে নেওয়া ভালো, আমি এই স্মারকগ্রন্থটি হাতে পেয়েছি এবং পড়েছি।

দু-একটি জিনিসের অনুপস্থিতি মনটিকে একটু অতৃপ্ত করেছে। যদিও মেয়ে অলকানন্দা এবং আরো অনেকের লেখা থেকে ওঁর জীবনের প্রায় সবগুলো পর্যায় সম্পর্কে অনেক জানা গেছে, তবু একটি সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি থাকলে বইটি পূর্ণাঙ্গ সুন্দর হয়ে উঠত। আরেকটি জিনিস, যার হয়তো নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে, না থাকায় মনটা খুঁতখুঁত করছে, তা হচ্ছে অধ্যাপক অমিয়কুমার দাশগুপ্তের আর এক মহৎ শিষ্য এবং পুত্রবৎ অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের লেখার অনুপস্থিতি।

অধ্যাপক সনৎকুমার সাহাকে আরেকবার ধন্যবাদ। এমন একটি সুন্দর লেখা প্রকাশনার জন্যে কালি ও কলমকে কৃতজ্ঞতা জানাই।

এ জেড এম আবদুল আলী

উত্তরা, ঢাকা

 সনৎকুমার সাহাকে ধন্যবাদ

অধ্যাপক সনৎকুমার সাহা উপমহাদেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতনামা অধ্যাপক অমিয়কুমার দাশগুপ্তের শতবার্ষিক-শ্রদ্ধাঞ্জলি-বিষয়ক একটি গ্রন্থ-আলোচনা-প্রসঙ্গে অধ্যাপক দাশগুপ্তের জীবনদর্শন বৃহৎ পরিপ্রেক্ষিতে কালি ও কলমের পাঠকের জন্যে তুলে ধরেছেন। সেজন্যে তাঁকে ধন্যবাদ জানাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কৃতী অধ্যাপককে আমাদের নিকট নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিলেন অধ্যাপক সনৎকুমার সাহা। 

অধ্যাপক অমিয়কুমার দাশগুপ্তের কাছে অসংখ্য শিক্ষার্থীর অর্থনীতির জটিল বিষয়ে হাতেখড়ি হয়েছিল। ভারতবর্ষে নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে তাঁর অনেক ছাত্রছাত্রী ছড়িয়ে আছে। অনেকে আজ খ্যাতিমান অধ্যাপক, কেউ যোজনা কমিশনে, কেউ বিদেশে কর্মরত। তাঁর পুত্র-কন্যা-জামাতা Ñ তিনজনই আজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত। 

শ্রীদাশগুপ্ত আন্তর্জাতিক মুদ্রাভাণ্ডার, রেনারস বিশ্ববিদ্যালয়, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করলেও যৌবনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কোনোদিন ভোলেননি। বরং বাংলাদেশের উন্নয়ন, স্ব-উদ্যোগ, সম্ভাবনা ও কল্যাণচিন্তা নিয়ে তিনি সর্বক্ষণ চিন্তা করেছেন। সেজন্যে এক ভাষণে তিনি উল্লেখ করেছিলেন বাংলাদেশ-ভারতের অর্থনৈতিক সমস্যাবলি নিয়ে দুদেশের অর্থনীতিবিদরা যদি একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন তাহলে খুব ভালো হয় ও দুদেশের অর্থনীতিচর্চা প্রাণসঞ্চার করে। বিষয়টি ভেবে দেখতে পারেন আমাদের দেশের অর্থনীতিবিদরা। 

রোকসানা মাজেদ লিজা

অগ্রণী কলেজ, ঢাকা

চন্দ্রভূক অমাবস্যার গল্প

একটি অসাধারণ গল্পগাথা। ১ম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যায় প্রকাশিত সব্যসাচী কথাশিল্পী রফিকুর রশীদের গল্প ‘চন্দ্রভূক অমাবস্যার গল্প’ নামক ছোটগল্পে সমাজের সবচেয়ে নিগৃহীত, অস্পৃশ্য এক শ্রেণির একটি মেয়ের জীবনযাপনের করুণ ছবি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী লেখনীতে তুলে ধরেছেন। সাধারণত এই শ্রেণির মানুষদের কথা আমাদের কথাসাহিত্যে খুব কমই দেখা যায়। চন্দ্রভূক অমাবস্যার নিকষ কালো অন্ধকার যেন জড়িয়ে আছে লাইলী নাম্নী মেয়েটির জীবনে। পিতৃমাতৃ-স্বজনহীন লাইলী মানুষের সহানুভূতি, ভালোবাসা কিছুই পায়নি, উলটো সমাজের কিছু জানোয়াররূপী, বিবেকহীন মানুষ বোবা, প্রতিবাদহীন, নিঃস্ব মেয়েটিকে দিনের পর দিন অত্যাচার, রক্তাক্ত, বিবস্ত্র করেছে। সমাজের কেউ কেউ যদিও লাইলীর জন্যে এগিয়ে এসেছে কিছু সহানুভূতি দেখাতে, পরক্ষণেই সামাজিক সংস্কারে দূরে সরে গেছে। সাহসী হয়ে সত্যিকারের অনুকম্পা কেউ দেখায়নি তাকে। এই ট্র্যাজেডি লাইলীর জীবনকে টেনে নিয়ে গেছে করুণ পরিণতি ও পঙ্কিলতার আবর্তে। গল্পটির চমৎকার গাঁথুনি লাইলীর প্রতি মনকে আর্দ্র করে দিয়েছে। গল্পটি পড়তে-পড়তে সীমাহীন মমতায় বুকের কোথায় যেন বেজেছে। 

শক্তিশালী লেখক রফিকুর রশীদের অন্যান্য গল্পের মতো এই ছোটগল্পটিও প্রশংসার দাবিদার। বিশেষ করে কালি ও কলমের সম্পাদককে ধন্যবাদ জানাচ্ছি এই সুন্দর গল্পটি আমাদের উপহার দেওয়ার জন্য। 

পরিশেষে, লেখককে সাদর অভিনন্দন। 

মিলি চৌধুরী

পাইকপাড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

নবীনদেরও সুযোগ দিন

কালি ও কলমের জন্য নতুন করে স্তুতির আর অবকাশ নেই। নিঃসন্দেহে বর্তমানে দুই বাংলার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ও নেতৃত্বস্থানীয় সাহিত্যপত্রিকা। বিংশ শতাব্দীর তিনের দশকে কল্লোল ও প্রগতির সঙ্গে যেমন নেতৃত্ব দিয়েছিল কালিকলম, এখনো তেমনই। তবে, দুই শতাব্দীর প্রধানতম পত্রিকা এই দুটির সবচাইতে বড় পার্থক্য হলো Ñ প্রথমটি অর্থাৎ কালিকলম ছিল নবীন লেখকদের পরিচিত, প্রতিষ্ঠিত এবং বাংলা সাহিত্যে নতুন ধারা সৃষ্টির চেষ্টায়, আর দ্বিতীয়টি অর্থাৎ কালি ও কলম প্রবীণ, পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত লেখকদের Ñ যাঁরা বর্তমানে দুই বাংলারই সাহিত্যের প্রধানতম ব্যক্তি Ñ তাঁদের রচনা পরিবেশনে মনোযোগী। কালি ও কলমে নবীন লেখকরা এখনো প্রকাশিত হওয়ার সুযোগ পায়নি। নতুন লেখকদের লেখা আহ্বান করে যদি তাদের কোনো লেখা কালি ও কলম (স্বকীয়তায় ছাপার উপযোগী বিবেচনা করে) প্রকাশ করে, তবে তা হবে নিঃসন্দেহে নবীনদের জন্য সাহিত্য-পুরস্কার পাওয়ার মতো সমান আনন্দের। পত্রিকাটি নবীন প্রজন্মকে উৎসাহিত করবে, শুধুমাত্র যদি নবীনদের লেখা ছাপানোর যথার্থ সুযোগ কালি ও কলম দেয়। আশা করি সম্পাদনা-পরিষদ বিষয়টি বিবেচনা করবেন। 

আরিফ আহমেদকেরানীগঞ্জ, ঢাকা