রবীন্দ্রনাথের মরণদর্শন

আবদুশ শাকুর

মৃত্যুদর্শনকে মরণদর্শন লিখলাম, বিষয়টা জীবনদর্শনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বিধায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) মরণদর্শন গড়ে ওঠে তাঁর প্রায়-তেইশ বছর বয়সে লোকান্তরিতা নতুন বউঠাকুরাণী কাদম্বরী দেবীর মৃত্যু (১৮৮৪) থেকে, কবির তেরো বছর দশ মাস বয়সে প্রয়াতা মাতা সারদা দেবীর মৃত্যু (১৮৭৫) থেকে নয়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনস্মৃতির ‘মৃত্যুশোক’ অধ্যায়ে লিখেছেন, ‘আমার চব্বিশ বছর (আসলে বাইশ বছর এগারো মাস তেরো দিন) বয়সের সময় মৃত্যুর সঙ্গে যে-পরিচয় হইল তাহা স্থায়ী পরিচয়। তাহা তাহার পরবর্তী প্রত্যেক বিচ্ছেদশোকের সঙ্গে মিলিয়া অশ্রুর মালা দীর্ঘ করিয়া গাঁথিয়া চলিয়াছে। শিশুবয়সের লঘু জীবন বড়ো বড়ো মুত্যৃকেও অনায়াসেই পাশ কাটাইয়া ছুটিয়া যায়Ñকিন্তু অধিক বয়সে মৃত্যুকে অত সহজে ফাঁকি দিয়া এড়াইয়া চলিবার পথ নাই।’ রবীন্দ্র-রচনাবলী, খ ১৭, পৃ ৪২৩।

তাছাড়া তেতালায় মাতার মৃত্যুর সময় রবীন্দ্রনাথ ছিলেন নিচের তালায় নিদ্রিত, বড়ো বউঠাকুরাণী সর্বসুন্দরী দেবীর মৃত্যুর (১৮৭৮) সময় কবি আমেদাবাদে অবস্থান করছিলেন, শিলাইদহে জ্যেষ্ঠ ভগ্নীপতি সারদাপ্রসাদের মৃত্যুর (১৮৮৩) সময় রবীন্দ্রনাথ কলকাতায় নিজের বিবাহবাসরে। কিন্তু বিয়েটির মাত্র চার মাস দশ দিন পর প্রায়-দুদিনের করুণ সংগ্রামে পরাজিতা (কবি যাঁকে ‘জীবনের ধ্রুবতারা’ বলে সম্বোধন করেছিলেন, সেই) নতুন বৌঠানের মৃত্যু ঘটল, বলতে গেলে, তাঁর চোখের সামনে। রবিজীবনীকার প্রশান্তকুমার পাল লিখেছেন, ‘কাদম্বরী দেবীর চিকিৎসা বিষয়ে যে ব্যাপক ও বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায় তাতে মনে হয়, সুনয়নী দেবীর বর্ণনা-মতো আফিম-সেবনের ফলে মৃত অবস্থায় তাঁর দেহ আবি®কৃত হয়নি, তাঁর জীবনরক্ষার জন্য বহু ডাক্তার প্রাণপণ চেষ্টা করার সুযোগ পেয়েছেন … ৮ ও ৯ বৈশাখ দুদিন ডাক্তাররা তাঁর জীবন রক্ষার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সম্ভবত ৯ বৈশাখ [রবি ২০ Apr] রাত্রে বা ১০ বৈশাখ [সোম ২১ অঢ়ৎ] প্রভাতে তাঁর জীবনাবসান ঘটে।’ রবিজীবনী, খ ২, পৃ ২০৬। অর্থাৎ রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় বর্ণিত ও বহুলপ্রচলিত ৮ বৈশাখ ১২৯১ বা ১৯ এপ্রিল ১৮৮৪ তারিখটি তথ্যসমর্থিত নয়। মৃত্যু-তারিখটি নিয়ে বিভ্রান্তির অন্যতম কারণ এই যে আত্মহত্যাকারিণীর মৃত্যুসংবাদটি কোনো সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়নি। সেটা না-হওয়ার কারণ হয়তো ‘নূতন বধূঠাকুরাণীর মৃত্যু হওয়ায় খবরের কাগজে উক্ত সম্বাদ নিবারণ করার জন্য ব্যয় বিঃ ১ বৌচর … ৫২’ (প্রাগুক্ত, পৃ ২০৭)। যাহোক, কাদম্বরী দেবীর  অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময়ে সোমেন্দ্রনাথ, দ্বিপেন্দ্রনাথ এবং অরুণেন্দ্রনাথের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথও শ্মশানে উপস্থিত ছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের সবিস্তার প্রত্যক্ষ করা এবং তাঁর সর্বসত্তাকে নাড়া দেওয়া এই মৃত্যুটি থেকে পাওয়া প্রথম শোক অপরিশ্রুত রূপ পরিগ্রহ করে ‘পুষ্পাঞ্জলি’ শীর্ষক সমসাময়িক রচনায় (র-র, খ ১৭, পৃ ৪৮৬-৯৬)। কাদম্বরী দেবীর স্মৃতি-সুরভিত এই সব অনুচ্ছেদ, কবিতা বা গান লেখা হয়েছিল শোকের গমকে গমকে বিভিন্ন সময়ে, তাঁর মৃত্যুর তিন মাসের মধ্যে Ñ যদিও ছাপা হয়েছিল এক বছর পর ভারতীর বৈশাখ ১২৯২ সংখ্যায়। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুদর্শন অথবা তত্ত্বজ্ঞান উপলব্ধ হওয়ার অবকাশ তখনও হয়নি বলে লেখাগুলিতে যথার্থ সাহিত্যগুণ বর্তায়নি। এ-কারণেই লেখক ‘পুষ্পাঞ্জলি’কে তাঁর কোনো গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত করেননি।

মৃত্যুশোকের এই ফুটন্ত ‘ইমোশন রেকালেক্টেড ইন ট্র্যাংকুইলিটি’ হয়ে প্রশান্ত রূপ লাভ করার পরেই কেবল পরিণত রচনা উপহার দিতে পারে। যেমন ‘পুষ্পাঞ্জলি’র কিছু রচনা ৩৫ বৎসর পরে লিপিকার   ‘সন্ধ্যা ও প্রভাত’, ‘সতেরো বছর’, ‘প্রথম শোক’-এ পরিণতি লাভ করে রবীন্দ্রনাথের গদ্যকবিতার পূর্বসূরি বলে উদ্যাপিত হয়েছে। শেষোক্ত গদ্যিকাটির শেষ সংলাপটি (‘যা ছিল শোক, আজ তাই হয়েছে শান্তি’) কবির বিমূর্ত সেই প্রথম শোকের, যে-শোকটি এখানে মূর্তিমতী শান্তি (র-র, খ ২৬, পৃ ১০৭)। শোকের এমনি শান্তিতে রূপান্তরণ রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুদর্শনের একটা অঙ্গ। শান্তিরূপিণী সেই প্রথম মৃত্যুশোক কবিকে দিয়ে কাব্য রচিয়ে গিয়েছে জীবনের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত। উদাহরণ আকাশপ্রদীপ কাব্যগ্রন্থের ‘শ্যামা’ (১৯৩৮), ‘বধূ’ (১৯৩৮) এবং ‘কাঁচা আম’ (১৯৩৯) প্রভৃতি কবিতা যা আজকের পাঠকের মনকেও স্পর্শ করে। প্রসঙ্গত, কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তকে সম্বোধন করা এই কবিতার বইটির উৎসর্গপত্রের দুটি বাক্য স্মরণযোগ্য : ‘আমার রচনা তোমাদের কালকে স্পর্শ করবে আশা করে এই বই তোমার হাতের কাছে এগিয়ে দিলুম। তুমি আধুনিক সাহিত্যের সাধনক্ষেত্র থেকে একে গ্রহণ করো।’ র-র, খ ২৩, পৃ ৭৩।

এই পর্যায়ে আমরা রবীন্দ্রনাথের মরণদর্শনের গঠনপ্রক্রিয়াটি অনুধাবন করার চেষ্টা করব। ‘পুষ্পাঞ্জলি’-তে মৃত্যুশোকের উচ্ছ্বাসটুকু বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাসের মধ্যেই উপচে-পড়ে যাওয়ার পর থেকে-যাওয়া অবশেষটুকু গাঢ়ীভূত হতে থাকে এবং মাসদুয়েক পরেই রবীন্দ্রনাথের জীবন-মৃত্যু সম্পর্কিত প্রাথমিক ভাবনা একটা অবধারণীয় রূপ পরিগ্রহ করে ‘ঘাটের কথা’ (ভারতী, কার্তিক, ১২৯১) এবং ‘রাজপথের কথা’ (নবজীবন, অগ্রহায়ণ, ১২৯১) নামের দুটি গদ্য কথিকায় (পরে গল্পগুচ্ছ-ভুক্ত)। সুকুমার সেন লিখেছেন, গল্প ‘দুইটিতেই বিরহিনী নারীর মৌন অন্তর্বেদনা মুখরিত। সদ্য-প্রিয়জন-বিরহী কবি এই দুই কাহিনীর মধ্যে নিজেরই অন্তর্গূঢ় বেদনার প্রতিধ্বনি তুলিয়াছেন। গল্প দুইটি রবীন্দ্রনাথের জীবনভাবনার দুই প্রধান সিম্বল বহন করিতেছে। ঘাট অচল, পথ সচল কিন্তু দুইই বহমান জীবনস্রোতের সাক্ষী।’ (বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, খ ৩, পৃ ৩০৭)।

এই ‘অচল ঘাট আর সচল পথ’Ñ ভাববন্ধই পরবর্তী ভাববন্ধে উত্তীর্ণ হয়েছে মাস-দশেক পরে রচিত ‘রুদ্ধ গৃহ’ শীর্ষক ‘বিচিত্র প্রবন্ধ’টিতে (বালক, আশ্বিন-কার্তিক, ১২৯২, র-র, খ ৫, পৃ ৪৭৭-৭৮)। এই ভাববন্ধটি হলো : মরণ অচল আর জীবন সচল। তবে সিদ্ধান্তটির অনুসিদ্ধান্তটিই আসল। সেটি হলো : মৃত্যু, গতিময় জীবনের যতি হলেও, বস্তুত জীবনকাব্যের অর্থবোধক দাঁড়ি। প্রবন্ধটির পটভূমি স্মর্তব্য। জাহাজি ব্যবসা শুরু করার পর জ্যোতিরিন্দ্রনাথের বেশির ভাগ সময় কাটত বরিশাল প্রভৃতি কর্মস্থলে। কলকাতায় অবস্থানকালেও তাঁর প্রধান আস্তানা ছিল মেজ বৌঠান জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর লোয়ার সার্কুলার রোডের বাড়িটি। তাই মহর্ষিভবনের বাহির-তেতালার তাঁর আবাসগৃহটি স্ত্রী কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুর পর দীর্ঘ দিন অব্যবহারে পড়ে ছিল রুদ্ধরূপে। এই স্মৃতিবিজড়িত রুদ্ধ কক্ষটিকে মনেরেখেই রবীন্দ্রনাথ ‘রুদ্ধ গৃহ প্রবন্ধটি লেখেন, যা তাঁর জীবনমরণ-ভাবনার স্থায়ী দিক্-নির্দেশক।

প্রবন্ধটিতে তিনি লিখেছেন, ‘এ জগতে অবিশ্রাম জীবনের প্রবাহ মৃত্যুকে হু হু করিয়া ভাসাইয়া লইয়া যায়, মৃত্যু কোথাও টিঁকিয়া থাকিতে পারে না … পৃথিবী মৃত্যুকেও কোলে করিয়া লয় জীবনকেও কোলে করিয়া রাখে, পৃথিবীর কোলে উভয়েই ভাইবোনের মতো খেলা করে। … পৃথিবীতে যাহা আসে তাহাই যায়। এই প্রবাহেই জগতের স্বাস্থ্য রক্ষা হয়। কণামাত্রের যাতায়াত বন্ধ হইলে জগতের সামঞ্জস্য ভঙ্গ হয়। জীবন যেমন আসে জীবন তেমনি যায়। মৃত্যুও যেমন আসে মৃত্যুও তেমনি যায়। তাহাকে ধরিয়া রাখিবার চেষ্টা কর কেন? হৃদয়টাকে পাষাণ করিয়া সেই পাষাণের মধ্যে তাহাকে সমাহিত করিয়া রাখ কেন? তাহা কেবল অস্বাস্থ্যের কারণ হইয়া উঠে। ছাড়িয়া দাও, তাহাকে যাইতে দাওÑজীবনমৃত্যুর প্রবাহ রোধ করিয়ো না।’

পত্রিকায় প্রবন্ধটি পড়ে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের (১৮৪৯-১৯২৫) বন্ধু এবং রবীন্দ্রনাথের গুণগ্রাহী অক্ষয়চন্দ্র চৌধুরী (১৮৫০-৯৮) লেখকের বক্তব্যের বিরুদ্ধ মতবাদ জানিয়ে একটি চিঠি লেখেন। সোলাপুর থেকে লিখিত দীর্ঘ প্রত্যুত্তরে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘রুদ্ধ গৃহ’ প্রবন্ধের মূল ভাবটি ব্যাখ্যা করেন। দুটি পত্রই ‘উত্তর প্রত্যুত্তর’ শিরোনামে পৌষ সংখ্যা বালক-এ মুদ্রিত হয়। পত্র-দুটি থেকে দীর্ঘ উদ্ধৃতি জরুরি। কারণ দুই অসমবয়সী বন্ধুর এই বাদানুবাদের সুবাদে জীবন-মৃত্যু সম্পর্কিত রবীন্দ্রনাথের তত্ত্বজ্ঞানের মূল ভাবটি পূর্ণ সম্প্রসারিত হয়েছে।

অক্ষয়চন্দ্র লিখেছিলেন, ‘রুদ্ধ গৃহে’র ভাব ধরিতে পারিলাম না। একজনের মধ্যে রুদ্ধ হইয়া থাকা, একজনকে লইয়াই চিরদিন শোক করা আপনি গর্হিত বলিয়াছেন। কিন্তু কী করা যায় বলুন! … একদিকে চাহিয়া থাকা, একের চারি দিকে ঘোরাই প্রকৃতির নিয়ম, তাহাই প্রকৃতির বন্ধনের কারণ। আজ যদি পৃথিবী বলিয়া বসে, আমি সূর্যের চারি দিকে ঘুরিব না, কেননা সূর্যকে মেঘে ঢাকিয়াছে, সূর্য আমাকে আর আলো দেয় না, আমি অন্য আলোকের চেষ্টা দেখি, তাহা হইলে প্রকৃতির বন্ধন ছিন্ন হয়, পৃথিবীর মৃত্যু হয়।’

প্রত্যুত্তরে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘জগতের মধ্যে আমাদের এমন ‘এক’ নাই যা আমাদের চিরদিনের অবলম্বনীয়। প্রকৃতি ক্রমাগতই আমাদিগকে ‘এক’ হইতে একান্তরে লইয়া যাইতেছেÑএক কাড়িয়া আর-এক দিতেছে। আমাদের শৈশবের ‘এক’ যৌবনের ‘এক’ নহে। যৌবনের ‘এক’ বার্ধক্যের ‘এক’ নহে। ইহজন্মের ‘এক’ পরজন্মের ‘এক’ নহে। এইরূপ শতসহস্র ‘একে’র মধ্য দিয়া প্রকৃতি আমাদিগকে সেই এক মহৎ ‘একে’র দিকে লইয়া যাইতেছে। সেই দিকেই আমাদিগকে অগ্রসর হইতে হইবে, পথের মধ্যে বদ্ধ হইয়া থাকিতে আসি নাই। … কিছুই থাকিতে চায় না, অথচ আমরা রাখিতে চাই, ইহাই আমাদের যত শোকদুঃখের কারণ। সকলকে যাইতে দাও, এবং তুমিও চলো-জগতের সহিত নিষ্ফল সংগ্রাম করিয়ো না … যখন আমরা নিতান্ত এক জনের মধ্যেই আচ্ছন্ন হইয়া থাকি তখন আমরা জানিতেই পারি না আমাদের কতখানি ভালোবাসিবার ক্ষমতা। একটি ক্ষুদ্র বস্তুও যখন চোখের নিতান্ত কাছে ধরি তখন মনে হয় সেই ক্ষুদ্র বস্তুটি ছাড়া আমাদের আর কিছুই দেখিবার ক্ষমতা নাই। সেই ব্যবধান অপসারিত করিয়া দাও, বৃহৎ জগত তাহার সৌন্দর্যরাশি লইয়া তোমার সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইবে।’

মৃত্যুর একটি অনুষঙ্গ বিস্মৃতি (লোকান্তরিতা নতুন বৌঠানকে ‘হে জগতের বিস্মৃত, আমার চিরস্মৃত’ বলে সম্বোধন করেছিলেন কবি ‘পুষ্পাঞ্জলি’তে)। তাই ‘প্রত্যুত্তরে’ তিনি শোকদুঃখের অনুষঙ্গ থেকে চলে গেলেন বিস্মৃতির অনুষঙ্গে এবং লিখলেন, ‘মৃত্যুকে আমরা যেমন ভয় করি বিস্মৃতিকেও আমরা তেমনি ভয় করি। কিন্তু অনেক সময় সে ভয় অকারণ। বিস্মৃতি মাঝে মাঝে আসিয়া স্মৃতির শৃঙ্খলা কাটিয়া দিয়া যায়। আমাদিগকে কিছুক্ষণের মতো স্বাধীন করিয়া দেয়। যখন কোনো কার্য বা ঘটনা হইতে তাহার সমস্ত ফললাভ করিয়া চুকাইয়া দিয়াছি বা তাহারা নিষ্ফলভাবে আমাদের কাছে ¯তূপ বাঁধিয়া আছে, তখন বিস্মৃতি আসিয়া সেই-সমস্ত উচ্ছিষ্ট-অবশেষ ও আবর্জনা ঝাঁটাইয়া ফেলিয়া দেয়। শাবক বাহির হইয়া গেলে ডিমের খোলা ফেলিয়া দেয়, …। বিস্মৃতি আমাদের জীবনগ্রন্থের ছেদ, দাঁড়ি; মাঝে মাঝে আসিয়া উত্তরোত্তর আমাদের জীবনবিকাশের সহায়তা করে। একটি গ্রন্থের মধ্যে সহস্র দাঁড়ি আছে, তবে তো তাহাতে ভাব ব্যক্ত ও পরিস্ফুট হইয়াছে। একটি জীবনের মধ্যেও শতসহস্র বিস্মৃতি চাই, তবেই জীবন সম্পূর্ণ হইতে পারে। অতএব ব্যাকরণবিরুদ্ধ একটিমাত্র দীর্ঘস্মৃতি লইয়া জীবন শেষ করিলে জীবন শেষই হয় না।’ র-র, খ ৫, পৃ ৫৬০-৬৪।

স্মৃতি-বিস্মৃতি সম্পর্কিত রবীন্দ্রনাথের এই বক্তব্যের সমর্থন তাঁর জীবনের বিভিন্ন পর্বেই প্রাপ্তব্য। আলোচ্য পর্বেই দেখা যাবে যে কবি ‘পুষ্পাঞ্জলি’র কিছু রচনার মাধ্যমে কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুর বেদনাবিধুর ঘটনাটিকে কিছুটা ‘চুকাইয়া’ দিয়েছেন। কিন্তু তারপরও সে-মৃত্যুর স্মৃতিটি তাঁর কাছে ‘¯তূপ বাঁধিয়া’ থাকে ‘নিষ্ফলভাবে’ (এ-অর্থে যে স্মৃতির এই ঢিবিটি তাঁর পরলোকগত বন্ধুটিকে আর কখনও ফিরিয়ে আনতে পারবে না)। তখনই বিস্মৃতি এসে পড়ে আসরেÑশাবক বের হয়ে যাওয়া ‘ডিমের খোলা ফেলিয়া’ দিতে। বিস্মৃতির এহেন তৎপরতা প্রত্যক্ষ করা যায় কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুর মাত্র এক মাস পরে রচিত ‘সরোজিনী প্রয়াণ’ নামক বিচিত্র প্রবন্ধটিতে (রচনা ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১২৯১, র-র, খ ৫, পৃ ৪৮৬-৯৭)। রচনাটির তারিখে জাহাজি-ব্যবসায়ী জ্যোতিরিন্দ্রনাথের প্রথম জাহাজ ‘সরোজিনী’ কলকাতার কয়লাঘাট জেটি থেকে বরিশালে তাঁর কর্মস্থলে যাত্রা শুরু করে সকালে। তাঁর সঙ্গে চলেন কবি ও পুত্র কন্যাসমেত মেজ বউঠাকুরাণী জ্ঞানদানন্দিনী দেবী। দুপুর না-হতেই কল নষ্ট হয়ে জাহাজটি থেমে পড়ে। মেরামতশেষে বিকেলে সচল হলেও লোহার বয়ার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে অক্কাই পায় ‘সরোজিনী’Ñঅন্যকথায় অনির্দিষ্টকালের মেরামতের অপেক্ষায় মাঝগঙ্গায় স্থিতি লাভ করে। এইটুকু হ্রস্ব ভ্রমণের দীর্ঘ বয়ান ‘সরোজিনী প্রয়াণ’, তবে আদ্যোপান্ত সাহিত্য ও হাস্যরসোজ্জ্বল।

রচনাটির উপচে পড়া হাস্যরস ‘পুষ্পাঞ্জলি’র উথলে ওঠা করুণ রসের তুলনায়, বিশেষত অমন মৃত্যুশোকের একটি মাসের ব্যবধানে, বিসদৃশ ঠেকেছে রবীন্দ্রজীবনীকারের কাছে। লঘু মেজাজের একটি উদাহরণ : ‘জাঁতার মধ্য হইতে যেমন বিমল শুভ্র ময়দা পিষিয়া বাহির হইতে থাকে, তেমনি বউঠাকুরাণীর চাপা ঠোঁটজোড়ার মধ্য হইতে হাসিরাশি ভাঙিয়া বাহির হইতে লাগিল।’ বর্ণনাটিকে করিৎকর্মা ‘বিস্মৃতি’র কর্মদক্ষতা বলতেই হয়। তাই বলে ‘স্মৃতি’ও অমন চটজলদি পলায়ন করে না। রবিজীবনীকার ঠিকই বলেছেন যে হাস্যরসই রচনাটির শেষ কথা নয় এবং সেটি ‘বিচিত্র প্রবন্ধ’টি থেকে বর্জিত অংশগুলিতে বেশি বোঝা যায়। ভাদ্র-সংখ্যার ভারতী-তে লেখাটি শুরুই হয়েছে এইভাবে : ‘আবার কেমন হৃদয়ের মধ্যে মেঘ করিয়া আসেÑলেখার উপরে গম্ভীর ছায়া পড়ে, … আমার মনের মধ্যে যাহাই হোক, আমি নিজের মেঘে পাঠকের সূর্যকিরণ রোধ করিয়া রাখিতে চাই নাÑ সুতরাং নিশ্বাস ফেলিয়া আমি সরিয়া পড়িলাম, আর সমস্ত প্রকাশ হউক।’ রবিজীবনী, খ ২, পৃ ২১১। 

গভীর গহিন থেকে উঠে এসে নিমজ্জমান স্মৃতির ঘাই মারার স্বাক্ষর সংক্ষিপ্তীকৃত প্রবন্ধটির ভাষ্যেও আছে। যেমনÑ‘এই যে-সব গঙ্গার ছবি আমার মনে উঠিতেছে এ কি সমস্তই এইবারকার স্টীমার-যাত্রারই ফল? তাহা নহে। এ-সব কতদিনকার কত ছবি, মনের মধ্যে আঁকা রহিয়াছে। ইহারা বড়ো সুখের ছবি, আজ ইহাদের চারি দিকে অশ্রুজলের স্ফটিক দিয়া বাঁধাইয়া রাখিয়াছি। এমনতরো শোভা আর এ জন্মে দেখিতে পাইব না।’ র-র, খ ৫, পৃ ৪৯২। এর পাশাপাশি, পৃষ্ঠা চারেক আগে বর্ণিত, ভ্রাতৃজায়া জ্ঞানদানন্দিনীর সুশৃঙ্খল কেশরাশির পবনপ্ররোচিত উচ্ছৃঙ্খল আচরণের ‘মক এপিক’-শৈলীর কৌতুকপ্রদ বর্ণনাটি পাঠের সময় লেখকচিত্তে রসের দ্বন্দ্বযুদ্ধটিই যেন দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। যুদ্ধটির এক পক্ষ ‘স্মৃতি’, সে শোকের বিষণ্নতাকে ধরে রাখতে চায়, অপর পক্ষ ‘বিস্মৃতি’, যে তাকে ছেড়ে দিয়ে প্রসন্নতা আনতে চায়। অন্যদিকে লক্ষণীয় যে শোক এখানে পাতন-প্রক্রিয়াধীন, বরং ইতোমধ্যেই শান্তির তীর্থযাত্রী।

শোকের এই চোলাই-কর্মটিকে শোকাহতের নিজস্ব ভাষ্যের সাহায্যে বুঝে নিতে সুবিধে হবে। কারণ, পাতনটি এতো দ্রুত সম্পন্ন হয়েছে যে মনে হয় এর সঙ্গে একটি ক্যাটালিস্ট কিংবা অনুঘটক জড়িত হয়েছে। স্মরণ করুন, ‘পুষ্পাঞ্জলি’র এলোমেলো রচনাগুলি এমন একটি সময়ের লেখা, যে-সময়টি সম্পর্কে কবি নিজেই বলেছেন, ‘কিছুকালের জন্য আমার একটা সৃষ্টিছাড়া রকমের মনের ভাব ও বাহিরের আচরণ দেখা দিয়েছিল … কে আমাকে কী মনে করিবে, কিছুদিন এ-দায় আমার মনে একেবারেই ছিল না। আহারের ব্যবস্থাটাও অনেক অংশে খাপছাড়া ছিল।’ র-র, খ ১৭, পৃ ৪২৫। সে সময় মহর্ষিও উদ্বিগ্ন হয়ে চুঁচুড়া থেকে পত্রযোগে পুত্রকে লিখেছেন, ‘তোমার শরীর অসুস্থ ও দুর্বল হইয়া পড়িয়াছে, মাথার মধ্যে এক প্রকার কষ্ট ও বুক ধড়ফড় করে। তুমি একেবারে পুষ্টিকর আহার ছাড়িয়া দিয়াছ। তাহার জন্যই তোমার এই দুর্বলতা ও পীড়া। মৎস্য মাংস আহার না করিলে তোমার শরীর পুষ্ট হইবে না।’ রবীন্দ্রজীবনী, খ ১, পৃ ১৯৬। শোকক্লিষ্ট লেখকের এহেন সৃষ্টিছাড়া মনের এলোমেলো রচনার মধ্যে ‘সরোজিনী প্রয়াণ’-এর মতো রসোত্তীর্ণ ও গোছালো রচনা ‘আকস্মিক’ কোনো মানসিক পরিবর্তন ছাড়া হয় না। তা-ও কোনো দৈবমুহূর্তের ‘হৃদয় আজি মোর কেমনে গেল খুলি! জগত আসি সেথা করিছে কোলাকুলি!’-র মতো আকস্মিক বোধিলাভ ছাড়া হয় না। দু’বছর পূর্বে লেখা ‘প্রভাত-উৎসব’-এর পলকে এই দুয়ার-খুলে যাবার মতো, দু’বছর পরের কোনো দুঃখনিশি-ভোরেও হয়তো নিমেষে আরেকবার হৃদয়দুয়ারটি খুলে গিয়েছিল কবির। এবারের লব্ধ বোধিটির কথা    সবিস্তারে বিবৃত হয়েছে ১৯১২ সালে লিখিত কবির জীবনস্মৃতিতে।

জীবনস্মৃতির ‘মৃত্যুশোক’ অধ্যায়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘জীবনের মধ্যে কোথাও যে কিছুমাত্র ফাঁক আছে, তাহা তখন জানিতাম না; সমস্তই হাসিকান্নায় একেবারে নিরেট করিয়া বোনা। তাহাকে অতিক্রম করিয়া আর কিছুই দেখা যাইত না, তাই তাহাকে একেবারে চরম করিয়াই গ্রহণ করিয়াছিলাম। এমন সময় কোথা হইতে মৃত্যু আসিয়া এই অত্যন্ত প্রত্যক্ষ জীবনটার একটা প্রান্ত যখন এক মুহূর্তের মধ্যে ফাঁক করিয়া দিল, তখন মনটার মধ্যে সে কী ধাঁধাই লাগিয়া গেল। … যাহা গেল তাহার পরিবর্তে কী আছে … এই দুঃসহ দুঃখের ভিতর দিয়া আমার মনের মধ্যে ক্ষণে ক্ষণে একটা আকস্মিক আনন্দের হাওয়া বহিতে লাগিল, তাহাতে আমি নিজেই আশ্চর্য হইতাম। জীবন যে একেবারে অবিচলিত নিশ্চিত নহে, এই দুঃখের সংবাদেই মনের ভার লঘু হইয়া গেল। আমরা নিশ্চল সত্যের পাথরে-গাঁথা দেয়ালের মধ্যে চিরদিনের কয়েদি নহি, এই চিন্তায় আমি ভিতরে ভিতরে উল্লাস বোধ করিতে লাগিলাম। যাহাকে ধরিয়াছিলাম তাহাকে ছাড়িতেই হইল, এইটাকে ক্ষতির দিক দিয়া দেখিয়া যেমন বেদনা পাইলাম তেমনি সেইক্ষণেই ইহাকে মুক্তির দিক দিয়া দেখিয়া একটা উদার শান্তি বোধ করিলাম। … একেশ্বর জীবনের দৌরাত্ম্য কাহাকেও বহন করিতে হইবে নাÑ এই কথাটা একটা আশ্চর্য নূতন সত্যের মতো আমি সেদিন যেন প্রথম উপলব্ধি করিয়াছিলাম। … জগৎকে সম্পূর্ণ করিয়া এবং সুন্দর করিয়া দেখিবার জন্য যে-দূরত্বের প্রয়োজন মৃত্যু সেই দূরত্ব ঘটাইয়া দিয়াছিল। আমি নির্লিপ্ত হইয়া দাঁড়াইয়া মরণের বৃহৎ পটভূমিকার উপর সংসারের ছবিটি দেখিলাম এবং জানিলাম তাহা বড়ো মনোহর।’ র-র, খ ১৭, পৃ ৪২৩-২৫।

এই উপলব্ধিটিই পুনর্ব্যক্ত হয়েছে শ্রীযুক্ত অমিয়চন্দ্র চক্রবর্তীর জ্যেষ্ঠভ্রাতার আত্মহত্যার পর তাঁকে লিখিত রবীন্দ্রনাথের ১৯১৭ সালের ২৫ অক্টোবরের সান্ত্বনাপত্রে। তিনি লিখেছেন, ‘এক সময়ে যখন আমার বয়স তোমারই মতো ছিল তখন আমি যে নিদারুণ শোক পেয়েছিলামসে ঠিক তোমারই মতো। আমার যে-পরমাত্মীয় আত্মহত্যা করে মরেন … তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে … আমার জগত শূন্য হল … সেই শূন্যতার কুহক কোনোদিন ঘুচবে, এমন কথা আমি মনে করতে পারিনি। কিন্তু তারপরে সেই প্রচণ্ড বেদনা থেকেই আমার জীবন মুক্তির ক্ষেত্রে প্রথম প্রবেশলাভ করলে। আমি ক্রমে বুঝতে পারলুম, জীবনকে মৃত্যুর জানলার ভিতর থেকে না দেখলে তাকে সত্যরূপে দেখা যায় না। মৃত্যুর আকাশে জীবনের যে বিরাট মুক্তরূপ প্রকাশ পায় প্রথমে তা বড়ো দুঃসহ। কিন্তু তার পরে তার ঔদার্য মনকে আনন্দ দিতে থাকে। তখন ব্যক্তিগত জীবনের সুখ-দুঃখ অনন্ত সৃষ্টির ক্ষেত্রে হালকা হয়ে দেখা দেয়।’ র-র, খ ১৭, পৃ ৪৮৫-৮৬, চিঠিপত্র ১১, পৃ ৮।

মৃত্যুর এই ঔদার্য রবীন্দ্রনাথের ‘মনকে আনন্দ দিতে’ শুরু করেছিল বৌঠানের প্রয়াণের মাসখানেকের মধ্যেই, যে-আনন্দের দ্বিধাগ্রস্ত প্রথম প্রকাশ ‘সরোজিনী প্রয়াণ’-নামক ভ্রমণবৃত্তান্ত রচনায়। ‘জীবনকে মৃত্যুর জানলার ভিতর থেকে’ ‘সত্যরূপে দেখা’র দ্বিধাহীন প্রথম প্রকাশ আরো পনেরো মাস পরে লেখা ‘রুদ্ধ গৃহ’-শীর্ষক বিচিত্র প্রবন্ধে। শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘যে-ভাবাবেগ অশ্রান্ত ও অদম্য দীর্ঘশ্বাসরূপে আপনাকে অপচয় করিতেছিল, তাহাই এক গভীর জীবনসত্যের আধারে বিধৃত হইয়া আর্টের অবিনশ্বরতা লাভ করিল। মৃত্যুর প্রেতায়িত নিশ্চলতার সহিত জীবনের সবল আনন্দপ্রবাহের যোগ হইয়া জীবন ও মৃত্যু পরস্পরের স্বাভাবিক সুস্থ সম্পর্কে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হইল। … মর্মান্তিক দুঃখের আঘাতে লেখকের দার্শনিক ও শিল্পিমনের অর্ধরুদ্ধ কপাট পূর্ণভাবে উন্মোচিত হইল।’ রবীন্দ্র-সৃষ্টি-সমীক্ষা, খ ১, পৃ ২৩৬, সুবর্ণজয়ন্তী সংস্করণ।

মৃত্যুর অভিঘাত নির্ভর করে সম্পর্কের গুণগত ও মানগত ধরনের উপরে। এর একটি প্রমাণ হাতের কাছেই আছে। কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুর একমাস তেইশ দিন পরেই একই বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন রবীন্দ্রনাথের সেজদাদা হেমেন্দ্রনাথ মাত্র ৪০ বৎসর বয়সে (যিনি স্বকালের ইংরেজি পড়ানোর তরঙ্গভঙ্গ করে ঠাকুরবাড়ির বালকদের বাংলা শেখাবার ব্যবস্থা করেছিলেন)। অথচ তাঁর এই অকালমৃত্যুটি সম্পর্কে কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেননি রবীন্দ্রনাথ। হতে পারে, মৃত্যু-যে জীবনকে মুক্ত ও সত্যরূপে দেখার একটি জানলামাত্র, সেটি তিনি এরি মধ্যে উপলব্ধি করে ফেলেছিলেন। তাঁর সেই উপলব্ধিকে স্বচ্ছ থেকে স্বচ্ছতর করে তুলেছিল মহর্ষি পরিবারের আরো তিনটি মৃত্যু -ভ্রাতুষ্পুত্রী (হেমেন্দ্রনাথের কন্যা) সুগায়িকা অভিজ্ঞা দেবীর মৃত্যু (১৮৯৬), ভ্রাতুষ্পুত্র (বীরেন্দ্রনাথের পুত্র) সুসাহিত্যিক বলেন্দ্রনাথের মৃত্যু (১৮৯৯) এবং রবীন্দ্রনাথের ‘লালবাড়ি’র স্থপতি, ভ্রাতুষ্পুত্র (দ্বিজেন্দ্রনাথের তৃতীয় পুত্র) নীতীন্দ্রনাথের মৃত্যু (১৯০১)। সম্ভবত এইজন্যই নতুন বৌঠানের মৃত্যুতে রবীন্দ্রনাথের মধ্যে যে-সাময়িক ‘একটা সৃষ্টিছাড়া রকমের মনের ভাব ও বাহিরের আচরণ’ দেখা দিয়েছিল, স্ত্রীর মৃত্যুতে (১৯০২) তাঁর মধ্যে সে-ধরনের কিছু দেখা যায়নিÑএমনকী মৃণালিনী দেবীর মৃত্যুর মাত্র দশ মাস পর নববিবাহিতা দ্বিতীয়া কন্যা বারো বছরেরও কমবয়সী রেণুকার মৃত্যুতেও না (১৯০৩)।

বরঞ্চ স্ত্রীর মৃত্যুর একমাস পর রবীন্দ্রনাথ পুত্র-কন্যাদের নিয়ে শান্তিনিকেতনে মহাসমারোহে ব্রাহ্মোৎসব পালন করেন ৭ পৌষ। রাধিকাপ্রসাদ গোস্বামী, শ্যামসুন্দর মিশ্র, অক্ষয়কুমার মজুমদার, ও কাঙালীচরণ সেন প্রমুখ খ্যাতনামা বহিরাগত গায়কগণ উৎসবের শোভাবর্ধন করেন (রবিজীবনী, খ ৫, পৃ ১০১)। ‘উপাসনান্তে পূর্ববৎ নানারূপ বাজী হইয়াছিল। বলা বাহুল্য, কবিপত্নীর মৃত্যুজনিত শোক তাঁহার চিত্তে বিষাদ সৃষ্টি করিয়া এই উৎসবের কোনো অঙ্গের কিছু ত্রুটি ঘটায় নাই’ (রবীন্দ্রজীবনী, খ ২, পৃ ৭৩)। তবে অন্তরে একেবারেই নির্বিকার ছিলেন না রবীন্দ্রনাথ। বৌঠানের মৃত্যুর পরে তাঁকে হারানোর বেদনার সঙ্গে যেমন ‘মুক্তির দিক দিয়া দেখিয়া একটা উদার শান্তি বোধ’ করেছিলেন, স্ত্রীর মৃত্যুর পরে কেবল সেই উপলব্ধিতেই সুস্থিত থাকতে পারেননি কবি। উপলব্ধিটি পরবর্তী স্তরে উন্নীত হয়ে গিয়েছিল। এই উত্তরণের কথা রবীন্দ্রনাথ মৃণালিনীর মৃত্যুর দুই সপ্তাহ পরে   শান্তিনিকেতন থেকে মোহিতচন্দ্র সেনকে লিখেছেন, ‘ঈশ্বর আমার শোককে নিষ্ফল করিবেন না। তিনি আমার পরম ক্ষতিকেও সার্থক করিবেন তাহা আমার হৃদয়ের মধ্যে অনুভব করিয়াছি। তিনি আমাকে আমার শিক্ষালয়ের এক শ্রেণী হইতে আর এক শ্রেণীতে উত্তীর্ণ করিলেন।’ রবিজীবনী, খ ৫, পৃ ৯৬-৯৭।

কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুপরবর্তী-স্তরের উপলব্ধিটি ছিল এ রকম : জগৎটা আমাদের জীবনের সঙ্গে ত্বকের মতো অবিচ্ছেদ্য নয়, মরণের মাধ্যমে জগৎ থেকে জীবনের বন্দিত্ব ঘুচে যায় এবং জীবন মুক্তি লাভ করে। মৃণালিনী দেবীর মৃত্যুপরবর্তী-স্তরের উপলব্ধিটি হলো এ রকম : মুক্তিজনিত উল্লিখিত ‘উদার শান্তি’ লাভের জন্য কবি তাঁর দৈহিক মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারবেন না, জীবনের মধ্যেই তাঁকে ‘একবার সম্পূর্ণ মরতে হবেÑতবেই নূতন করে ভগবানে জন্মানো যাবে … পুনর্জন্মের পূর্বে এখন সেই মৃত্যুবেদনা … এসো মৃত্যু এসোÑএসো অমৃতের দূত এসোÑ’ (মরণ, র-র, খ ১৪, পৃ ৩৬৭)। স্পষ্টতই রবীন্দ্রনাথ এখানে তাঁর ‘আমি’টি ঈশ্বরকে দিয়ে ফেলে নিজে     অন্তর্যামীতে লীন হয়ে যেতে চাচ্ছেন। কারণ, ‘তাঁর মধ্যেই যদি আমাকে পাই তবে একসঙ্গে তাঁকেও পাই আমাকেও পাই’ (প্রাগুক্ত, পৃ ৩৬৪)। চেতনার এই স্তরে উন্নীত হতেই জাগতিক রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু হলো এবং আধ্যাত্মিক রবীন্দ্রনাথের জন্ম হলো। ‘উৎসর্গ’-কাব্যের ৯ নম্বর কবিতাটির (‘কুঁড়ির ভিতরে কাঁদিছে গন্ধ’) ব্যাখ্যা-প্রসঙ্গে কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তকে লিখেছিলেন যে ওটা গন্ধের পুষ্পগর্ভ থেকে বেরিয়ে আসার বেদনাজনিত কান্না : ‘বাহিরে যাহার সার্থকতা, বাহিরে আসিবার পূর্বে সে তীব্র বেদনা অনুভব করেÑবস্তুত এই বেদনাই জানায় যে তাহাকে বাহিরে আসিতে হইবে, ইহাই গর্ভবেদনাÑএবং মৃত্যুবেদনারও নিঃসন্দেহ এই তাৎপর্য।’ (র-র, খ ১০, পৃ ৬৪৬)। অন্য কথায়, মানবীগর্ভ থেকে জগতে ভূমিষ্ঠ হতে যে-যন্ত্রণা, পৃথিবীগর্ভ থেকে মহাজগতে ভূমিষ্ঠ হতেও সে-যন্ত্রণা।

রবীন্দ্রনাথের এই উপলব্ধিটি জেগেছে স্ত্রীর মৃত্যুর পরপরই,   শান্তিনিকেতনে বাসকালে। সেখান থেকে কবি নিজের উপলব্ধ এই মানসিক পরিবর্তনটির কথা মোহিতচন্দ্র সেনকে সবিস্তারে জানিয়েছেন ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯০৩ সালে, তথা মৃণালিনী দেবীর মৃত্যুর ২ মাস ১০ দিন পরে : ‘জীবনের সমস্ত ঘটনাবলী ও সুখদুঃখের সমস্ত পরিবেষ্টন হইতে আমি নিজেকে একেবারে আস্ত বাহির করিয়া লইব এই আমার ইচ্ছা। আমাদের এই সংসার-জরায়ুবেষ্টনের বাহিরে যে এক অগোচর অপরূপ জগৎ আলোকে প্লাবিত হইয়া আছে তাহারই মধ্যে ভূমিষ্ঠ হইবার জন্য উৎসুক হইয়াছি। জড় জগতে জড় শরীর লইয়া জন্মিয়াছিÑ অধ্যাত্মজগতে আর একটা জন্মলাভ করিতে হইবে তাহা অনুভব করিতেছি। … বেদনার দ্বারা সেই আগামী জন্মলাভের দিকে অগ্রসর হইয়াছিÑ এখন মাঝে মাঝে সে লোকের অপরিস্ফুট পরিচয় যেন পাই … এখন আমি প্রত্যক্ষ আমাকে এবং প্রত্যক্ষ জগৎকে প্রায়ই আমার বাহিরে দেখিতেছি।’ রবিজীবনী, খ ৫, পৃ ১০৯। অর্থাৎ কবি নিজেই দেখতে পাচ্ছেন যে তিনি মৃত্যুবরণ করে এই জগজ্জীবনেই একটি জগত-বহির্ভূত জন্ম লাভ করেছেন। নয় দিন পর মোহিতচন্দ্র সেনকে কবি পুনরায় লিখেছেন, ‘জগতে যেমন পিতাকে মাতাকে বন্ধুকে প্রিয়াকে পাইয়াছিÑতাহারা যেমন জগতের দিক্ হইতে ঈশ্বরের দিকে আমাকে কল্যাণসূত্রে বাঁধিতেছেÑতেমনি আমার জীবনের দেবতা আমার অতিজগতের সহচর একটি অপূর্ব নিত্যপ্রেমের সূত্রে ঈশ্বরের সহিত আমার একটি পরম রহস্যময় আধ্যাত্মিক মিলনের সেতু রচনা করিতেছে।’ (প্রাগুক্ত, পৃ ১০৯)।

রবীন্দ্রনাথের সমকালীন মানসিকতা অবধারণের ক্ষেত্রে উল্লিখিত পত্র-দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাঁচটি বৎসরের পরিসরে অভিজ্ঞা-বলেন্দ্র-নীতীন্দ্রর মতো স্নেহভাজনদের মৃত্যুগুলির অব্যবহিত পরেই সদ্য-সাধনসঙ্গিনী হয়ে-ওঠা জীবনসঙ্গিনী মৃণালিনী দেবীর মৃত্যুর প্রচণ্ড অভিঘাতে কবির অধ্যাত্মজগতে জন্মলাভের আকাক্সক্ষা জাগাটা অস্বাভাবিক নয়। দুঃখজাত হলেও, সুখের বিষয় যে, এই আকাক্সক্ষাই তাঁর জীবনের সব চেয়ে বড় পালাবদলটি ঘটায় এবং বঙ্গের কবিকে বিশ্বকবিতে পরিণত করে। বর্ণিত আধ্যাত্মিক আকুতি প্রাধান্য বিস্তার করে খেয়া-র যুগ থেকে, যে-কাব্যের ‘আগমন’ কবিতাটিতে কবি তাঁর শূন্য ঘরে ‘দুঃখরাতের রাজা’-কে অভ্যর্থনা করেন (র-র, খ ১০, পৃ ১০৩-০৫)। অতঃপর এই হৃদয়াবেগ গোরা উপন্যাসসহ গীতাঞ্জলি-গীতিমাল্য-গীতিকা প্রমুখ কাব্যত্রয়ীকে আধ্যাত্মিক আলোকে উদ্ভাসিত করে পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়।

এ তো হলো স্ত্রীর মৃত্যুদুঃখের অন্তঃপ্রবাহের স্বরূপ। তাঁর মৃত্যুশোকের বহিঃপ্রকাশস্বরূপ পাওয়া গেল ‘স্মরণ’ কবিতাগুচ্ছ, যা ‘পুষ্পাঞ্জলি’র তুলনায় ঢের বেশি পরিশীলিত ও শিল্পিত। এমনকী যে-ছয়টি কবিতা ৭ অগ্রহায়ণ মৃণালিনী দেবীর মৃত্যুর পরদিন থেকে পনেরো দিনের মধ্যে রচিত এবং বঙ্গদর্শন-এর অগ্রহায়ণ সংখ্যাতেই প্রকাশিত সেগুলিও যথেষ্ট সংযত ও সংহতÑযথা প্রতীক্ষা, শেষ কথা, প্রার্থনা, আহ্বান, পরিচয় ও মিলন (যথাক্রমে কবিতা সংখ্যা ৩, ৪, ৫, ৬, ৭ ও ৮/ স্মরণ, র-র, খ ৮, পৃ ৭৭)। ড. শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় স্মরণ-এর কবিতাগুলির রসগ্রাহী আলোচনা করেছেন। আলোচনাটি আগ্রহী পাঠক পড়ে নিতে পারেন (রবীন্দ্র-সৃষ্টি-সমীক্ষা, খ ২, পৃ ১১২-১৭)। তাৎক্ষণিক এবং প্রত্যক্ষভাবে নিবেদিত এই স্মারক কবিতাগুলি ছাড়াও পরের বহু গানে এবং কবিতায় মৃণালিনী দেবীর অন্তঃসঞ্চারী উপস্থিতি স্পষ্টরূপে অনুভবনীয়। যেমন ‘আছে দুঃখ আছে মৃত্যু’, ‘দুঃখ রাতে, হে নাথ, কে ডাকিলে’, ‘নিবিড় ঘন আঁধারে’, ‘গভীর রজনী নামিল হৃদয়ে’ প্রভৃতি গানে কবির স্ত্রীবিয়োগব্যথা অনুভব করা যায়। তেমনি মৃণালিনী দেবীর নেপথ্যচারিতা উপলব্ধি করা যায় খেয়া-র ‘প্রভাতে’ এবং ১৩০৯-১০ সনের বঙ্গদর্শন-এর ‘মুক্তপাখির প্রতি’, ‘দুর্ভাগা’, ‘পথিক’, ‘নারী’, ‘বিশ্বদোল’ ও ‘যাত্রিণী’ (‘উৎসর্গ’-কাব্যের যথাক্রমে ৩১, ৪১, ৪২, ৪৩, ৩৮ ও ৪০ সংখ্যক) কবিতায়। বরং এসব গানের ও কাব্যের অপ্রত্যক্ষ স্মরণ অধিক হৃদয়গ্রাহী। তবে সবচেয়ে মর্মস্পর্শী হলো মরণোন্মুখ স্ত্রীর কল্পিত মৃত্যুশোক প্রকাশক দীর্ঘ কবিতা ‘মরণ’ (বঙ্গদর্শন, ভাদ্র ১৩০৯, ‘উৎসর্গ’, ৪৫, র-র, খ ১০, পৃ ৭১-৭৪)। মৃণালিনী দেবীর আসন্ন মরণকে সম্বোধন করে লেখা ‘মরণ’-শীর্ষক এ-কবিতাটি ‘স্মারককাব্যে’র যে-কোনো বৈশ্বিক সংকলনে বিশেষ আসন পাওয়ার যোগ্য।

জায়া-কন্যার মৃত্যুর তুলনায়, ১৯০৫ সালে পিতার মৃত্যুতে অন্তরেও শান্ত ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তবে সেটি এজন্যে নয় যে মহর্ষি মৃত্যুবরণ করেছিলেন ৮৮ বৎসরের পরিপক্ক বয়সে। কারণ কিছুটা অবধার্য কবির নিজের ভাষায় : ‘পরিপক্ক ফল যেমন বৃন্তচ্যুত হয়ে নিজেকে সম্পূর্ণ দান করেÑতেমনি মৃত্যুর দ্বারাই তিনি তাঁর জীবনকে আমাদের দান করে গেছেন। মৃত্যুর ভিতর দিয়া না পেলে এমন সম্পূর্ণ করে পাওয়া যায় না। জীবন নানা সীমার দ্বারা আপনাকে বেষ্টিত করে রক্ষা করেÑসেই সীমা কিছু-না-কিছু বাধা রচনা করে।’ মৃত্যুর প্রকাশ, র-র, খ ১৪, পৃ ৩১১-১২। এ-ছাড়াও, মহর্ষির মৃত্যুকে রবীন্দ্রনাথ দেখেছেনÑ করতে-থাকার অন্তে ‘হয়ে-ওঠা’-রূপে। যেমন অন্যত্র তিনি বলেছেন, ‘করার আদর্শ মানুষের একমাত্র আদর্শ নয়, হওয়ার আদর্শই খুব বড়ো জিনিস। …যখন সমস্তই কেবল চলছে, কেবলই ভাঙাগড়া এবং ওঠাপড়া, তখন সেই হওয়ার আদর্শটিকে সম্পূর্ণভাবে স্থিরভাবে আমরা দেখতে পাই নে Ñ যখন চলা শেষ হয় তখন হওয়াকে আমরা দেখতে পাই।’ (শেষ, র-র, খ ১৫, পৃ ৪৯৩-৯৪)

১৯০৭ সালে বালকপুত্র শমীন্দ্রনাথের আকস্মিক মৃত্যুতে রবীন্দ্রনাথ যেন সমাধি লাভ করেন। তাঁর সেই সমাধির অভ্যন্তরে প্রচুর ভাঙচুর চলে এবং এর ফলে কবির মৃত্যুদর্শনের সকল অঙ্গ বিকশিত ও সমন্বিত হয়। এই মৃত্যুটির আঘাত এত প্রচণ্ড কেন সেটি বোঝার জন্য পিতার হৃদয়ে কনিষ্ঠ পুত্রের জায়গাটা একটু জরিপ করা প্রয়োজন। ইন্দিরা দেবী লিখেছেন, ‘লোকে বলে যে রবিকাকার ছোটোছেলে শমীন্দ্রই বেশি তাঁর মতো দেখতে ছিল। শমী অল্পবয়সেই বিসর্জনের মতো শক্ত নাটকের কবিতাও অনর্গল মুখস্থ বলতে পারত। দুলে দুলে রবিকাকার উপাসনা করাও নকল করত। হেমলতা বউঠানের কাছে শুনেছি, বাপের টেবিলে বসে নাকি তাঁর মতো লেখক হবার অভিনয় করত।’ রবিজীবনী, খ ৫, পৃ ৩৮৭। দু’বছরের বড়ো, পিঠাপিঠি বোন মীরা দেবীও ছোটো ভাই শমী সম্পর্কে অনুরূপ স্মৃতিচারণ করেছেন (মীরা দেবী, স্মৃতিকথা, পৃ ১৮)। পিতৃস্মৃতিতে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘বড় হলে সে যে কবি হবে, বাবার প্রতিভা তার মধ্যেই প্রকাশ পাবে, আমার সন্দেহ ছিল না।’

অনুমিত হয় যে ডাকঘর (১৯১১) নাটকের অমল শমীন্দ্রনাথেরই আদরায় গড়া। বস্তুত সৃজনশীল প্রকৃতির এই পুত্রটির মধ্যে পিতার অনেক গুণই প্রকাশ পাচ্ছিল। তাকে রবীন্দ্রনাথ নিজেও কৌতুক করে ‘রবি ঠাকুর’-এর মতো ‘শমী ঠাকুর’ বলতেন। ছয় বছর বয়সে মাতৃহারা এই শিশুটিকে মনে রেখেই কবি শিশু গ্রন্থের (১৯০৩) কবিতাগুলি লেখেন। গ্রন্থটির কবি-নিয়োজিত সম্পাদক মোহিতচন্দ্র সেনের পত্রে তাঁর স্ত্রী সুশীলা সেনের প্রশ্নের উল্লেখ ছিল যে কবি কেবল খোকার কথা লিখলেন, খুকীর কথা লিখলেন না কেন। প্রশ্নটির উত্তরে অসুস্থ কন্যা রেণুকার স্বাস্থ্যনিবাস আলমোরা থেকে কবি লিখেছিলেন, ‘খোকা এবং খোকার মার মধ্যে যে ঘনিষ্ঠ মধুর সম্বন্ধ সেইটে আমার গৃহস্মৃতির শেষ মাধুরী Ñ তখন খুকী ছিল না Ñ মাতৃশয্যার সিংহাসনে খোকাই তখন চক্রবর্তী সম্রাট ছিল Ñ সেই জন্যে লিখতে গেলেই খোকা এবং খোকার মার ভাবটুকুই সূর্যাস্তের পরবর্তী মেঘের মতো নানা রঙে রঙিয়ে ওঠে।’ রবিজীবনী, খ ৫, পৃ ১৪৩। মৃণালিনী দেবীর স্মৃতি-যে শিশুর কবিতার আবহসুর, সেকথা রবীন্দ্রনাথ মোহিতচন্দ্র সেনকে সপ্তাহখানেক পরে লেখা পত্রেও উল্লেখ করেছেন : ‘শিশুকে উপলক্ষ্য করে ছলনাপূর্ব্বক শিশুর মার সঙ্গ পেয়েছিলেম (প্রাগুক্ত)।’ শান্তিনিকেতনে বসন্তোৎসব উদ্যাপনের রেওয়াজ এই খোকাটিরই সৃষ্টি। তাই কবির পরলোকচর্চার, বা চর্চাটার অন্যতম লিপিকর কবির স্নেহধন্য (দ্র. ভূমিকা, নবজাতক, র-র, খ ২৪) ড. অমিয়চন্দ্র চক্রবর্তীর ভাষায় ‘মহাপৌরুষেয় ছেলেমানুষী’র, সময় প্ল্যানচেটে-আনা শমীন্দ্রনাথের মুখে পরলোকে তার একটা পৃথিবী কিংবা একটা শান্তিনিকেতন গড়ে তোলার কথাই শোনেন পুত্রের গুণগ্রাহী পিতা (অমিতাভ চৌধুরী, একত্রে রবীন্দ্রনাথ, পৃ ৬৮-৬৯)।

পিতার এমনই অমূল্য ধন শমীন্দ্রনাথ তার বন্ধু সরোজচন্দ্রের সঙ্গে (পিতার বন্ধু শ্রীশচন্দ্রের পুত্র) মুঙ্গেরে বন্ধুর মামাবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে ২৪ নভেম্বর ১৯০৭ সালে (৭ অগ্রহায়ণ ১৩১৪), যে-তারিখে পাঁচ বছর পূর্বে তার মাতার মৃত্যু ঘটে। টেলিগ্রাম পেয়ে ছয়দিন আগে কলকাতা থেকে মুঙ্গেরে আসা রবীন্দ্রনাথ পুত্রের শেষকৃত্য শেষ করে সেইদিন রাত্রের ট্রেনেই বোলপুর রওয়ানা হয়ে যান। রবীন্দ্রনাথের সমাধিস্থ ভাব দেখে উপস্থিত সকলেই স্তম্ভিত হন। সেই রাত্রের ট্রেনযাত্রী শোকবিদ্ধ কবির মনের ভাব বিশদভাবে ব্যক্ত হয় পঁচিশ বছর পরে লেখা একটি চিঠিতে। প্রিয় দৌহিত্র নীতীন্দ্রনাথের অকালমৃত্যুতে (১৯৩২) তার শোকাতুরা মাতা মীরা দেবীকে সান্ত্বনা দিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘যে রাত্রে শমী গিয়েছিল সে রাত্রে সমস্ত মন দিয়ে বলেছিলুম বিরাট বিশ্বসত্তার মধ্যে অবাধ গতি হোক্ আমার শোক তাকে একটুও যেন পিছনে না টানে। … শমী যে রাত্রে গেল তার পরের রাত্রে রেলে আসতে আসতে দেখলুম জ্যোৎস্নায় আকাশ ভেসে যাচ্চে, কোথাও কিছু কম পড়েচে তার লক্ষণ নেই। মন বল্লে কম পড়েনিÑসমস্তর মধ্যে সবই রয়ে গেছে, আমিও তারি মধ্যে। সমস্তর জন্যে আমার কাজও বাকি রইল। যতদিন আছি সেই কাজের ধারা চল্তে থাকবে। সাহস যেন থাকে, অবসাদ যেন না আসে, কোনোখানে কোনো সূত্র যেন ছিন্ন হয়ে না যায়Ñ ’। চিঠিপত্র ৪, ১৫২-৫৩।

উপরের পত্রটিতে ব্যক্ত শমীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরের রাত্রের এই উপলব্ধি (থেকে-যাওয়া জন এবং চলে-যাওয়া জনসহ সমস্তর মধ্যে সমস্তর রয়ে যাওয়া) বা ‘রুদ্ধ গৃহ’-কে কেন্দ্র করে ব্যক্ত কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুর পরের বৎসরের সেই উপলব্ধি (সকলকে যেতে দাও এবং তুমিও চলো)Ñমৃত্যুর এই সব দর্শন দিয়ে রবীন্দ্রনাথ মাধুরী-রথী-মীরাদের কচি মনগুলিকে প্রবোধদান করতে পারছিলেন না। মা-বোন-ভাইয়ের উপর্যুপরি অকালমৃত্যুতে বিভ্রান্ত মাধুরীলতা (১৮৮৬-১৯১৮) বন্ধু অনুরূপা দেবীকে (১৮৮২-১৯৫৮) একটি চিঠিতে ১৯১৪ সালে লিখেছিলেন, ‘তাতে সমস্ত হৃদয় জুড়ে একটা তুমুল বিদ্রোহ জেগে উঠেছিল, কেবল মনে প্রশ্ন উঠত, কেন এমন হলো? অসময়ে এদের জীবনপ্রদীপ কেন নিভে গেল? কোন্ মহৎ অপরাধের জন্যে এ কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে? মায়ের মত এমন পুণ্যবতী সতী কেন এত যন্ত্রণা পেলেন? তবে কি ভগবান্ আনন্দময় মঙ্গলময় নন, তিনি কি শুধু ধ্বংস করবার সুখের জন্য জগৎ সৃজন করেছেন? বাবা কত উপদেশ দিয়েছেন, সঙ্গে নিয়ে কত উপাসনা করেছেন, তবু সব সন্দেহ দ্বিধা দূর করতে পারেননি।’ রবিজীবনী, খ ৫, পৃ ৪০২। সেই ‘সন্দেহ দ্বিধা’র উত্তরস্বরূপই হয়তো রচিত হয় দুঃখের দর্শন সংবলিত প্রবন্ধ ‘দুঃখ’। 

মৃত্যুদর্শনের প্রশ্নে দ্বিধাদ্বন্দ্ব রবীন্দ্রনাথের নিজের মনেও অবশিষ্ট ছিল, যা তাঁর বিদ্যালয়টির কল্যাণরূপিণী পত্নীকে অসময়ে হারিয়ে বেড়ে উঠছিল সংগত কারণেই। এবং একই কারণে দুঃখের বিনিময়ে কল্যাণ ক্রয়ের উপদেশমালা একে-ওকে দেওয়ার সময় বস্তুত তা তিনি নিজেকেও দিচ্ছিলেন। এ-বিষয়ে তাঁর স্বীকারোক্তিও পাওয়া যাবে। শমীন্দ্রনাথের মৃত্যুর সাত মাস পূর্বে ১৯০৭ সালের ১৭ এপ্রিল দুঃখিনী বিধবা কাদম্বিনী দত্তকে লেখা কথাগুলি বস্তুত নিজেকেও বলা, ‘ঈশ্বর তাঁহার পরম দানগুলিকে দুঃখের ভিতর দিয়াই সম্পূর্ণ করেনÑতিনি বেদনার মধ্য দিয়া জননীকে সন্তান দেনÑসেই বেদনার মূল্যেই সন্তান জননীর এত অত্যন্তই আপন। … ঈশ্বর যদি তোমাকে বেদনা দেন তবে নিজের দোষে সেই বেদনাকে ব্যর্থ করিয়ো নাÑতাহাকে সফল করিবার জন্য সমস্ত হৃদয়মনকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত করিয়া জাগ্রত হও।’ চিঠিপত্র ৭, পৃ ৯। শমীন্দ্রনাথের মৃত্যুর এক মাস আগে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক ভূপেন্দ্রনাথ সান্যালকে লিখেছিলেন, ‘প্রিয়র চিঠি পাইলাম যে শম্ভুর বোন খেলা করিতে করিতে কাপড়ে আগুন লাগিয়া মরিয়াছে। সেই দৃশ্য দেখিয়া প্রিয় সান্ত্বনার জন্য আমাকে পত্র লিখিয়াছিল। আমি নিজেই তখন বেদনা পাইতেছিলাম। প্রিয়র পত্রের উত্তর দিতে গিয়া আমি নিজের চিত্তকে শান্ত করিতে পারিয়াছি।’ রবিজীবনী, খ ৫, পৃ ৪১০। এ কোন বেদনা? এ কোন অশান্তি? এ-সময়ে তো নিকট-অতীতে কোনো মৃত্যু ছিল না। আসলে মৃত্যুজনিত শোক-দুঃখকে কোনো ব্যাখ্যা দিয়েই তিনি পুরোপুরি চুকিয়ে দিতে তখনও পারছিলেন না (খেয়া-র যুগ শুরু হয়ে গেলেও দুঃখবরণের কাঠামোটি তখনো জারানো হয়নি)।

অল্পবয়সে স্বামী-পুত্র হারানো দুঃখবাদী কবি প্রিয়ম্বদা দেবীকে (১৮৭১-১৯৩৫) লেখা (এবং সংগৃহীত না-হওয়া) এই চিঠিখানিতে সম্ভবত ‘দুঃখ’-প্রবন্ধটির প্রাথমিক ভাবনাগুলি ব্যক্ত হয়েছিল। কবি একই পত্রে ভূপেন্দ্রনাথকে আরো লিখেছেন, ‘কেবল দুঃখই আমাদের নিতান্ত স্বকীয় অতএব আমরা বড় জিনিস যাহা কিছু চাই এই দুঃখ দিয়া কিনিতে হইবে। … দুঃখ দিয়া আনন্দও কিনিতে হইবে। … ঈশ্বর তাঁহার পরিপূর্ণতার ধন লইয়া আছেনÑআমাদেরও অপূর্ণতার ধন আছেÑএই ধনে আমরাও ধনী; ইহাই দুঃখÑএই ধনেরই বিনিময়ে আমরা ঈশ্বরের ধন দাবি করিতে পারিÑআমাদের আর কিছুই নাই (প্রাগুক্ত, পৃ ৪০৩)। দেখা যাবে যে এই ভাবনাই ‘দুঃখ’ প্রবন্ধে পূর্ণ রূপ লাভ করেছে।

প্রিয়জনদের নানারকম দুঃখ-সওয়া এবং দুঃখ-দেওয়া অকালমৃত্যুগুলি প্রত্যেকটিই একটিমাত্র প্রশ্ন করে বসে আছে রবীন্দ্রনাথের মনেÑ মানুষের জীবনে দুঃখের ভূমিকা কী? উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনেক ভাবনাই ভেবেছিলেন তিনি, কিন্তু গুছিয়ে নিতে পারছিলেন না যেন। অবশেষে তাঁর ‘শমী ঠাকুর’-এর মৃত্যু এতো দুঃখ নিয়ে এল যে কবি বুঝি বলে উঠলেনÑআরো দুঃখ রাখবো কোথায়। দুঃখও বুঝিবা বলে ফেললোÑআমাকে আবার রাখবে কি, আমি-যে তোমার প্রাপ্য রাখার আধার। এবার দুঃখকে পুরোপুরি বুঝলেন কবি এবং দুঃখের এই তত্ত্বটি লিখে ফেলতে ধ্যানস্থ হয়েই ফিরলেন মুঙ্গের থেকে। বোলপুরে একরাত থেকেই ফিরলেন কলকাতায়। কিন্তু এই দুঃখ-বেদ রচনার জন্য তো তপোবন প্রয়োজন। তাও নির্বাচন হয়ে গেল, শিলাইদহ। কবি সেখানে চলে গেলেন দিন-দশেকের মধ্যেই, কলকাতার অবশ্য-করণীয় সেরে এবং শান্তিনিকেতনের ভার পত্রযোগে ভূপেন্দ্রনাথকে দিয়ে। উদ্দেশ্য সম্পর্কে কাদম্বিনী দত্তকে লিখলেন, ‘আমার কন্যা দুইটিকে লইয়া কিছুদিনের জন্য শিলাইদহে পদ্মার বক্ষে বাস করিতে প্রস্তুত হইতেছি।’ চিঠিপত্র ৭, পৃ ১১। যাওয়ার পূর্বদিন সুহৃদ মনোরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেবল এইটুকুই লিখেছিলেন, ‘আগামী কল্য শিলাইদহে পদ্মায় বাস করিতে যাইব।’ রবীন্দ্রজীবনী, খ ২, পৃ ২১৭।

৬ ডিসেম্বর ১৯০৭ রবীন্দ্রনাথ কলকাতা থেকে শিলাইদহ যাত্রা করেন এবং ১১ ডিসেম্বর সেখানে দুই কন্যা মাধুরী ও মীরাকে আনিয়ে নেন। অতঃপর মাঘোৎসবে বক্তৃতা করার জন্য কলকাতায় আসা আর প্রাদেশিক সম্মেলনে সভাপতিত্ব করার জন্য পাবনায় যাওয়া ছাড়া তিনি একটানা চার মাস শিলাইদহে কাটান। এমনকী এ-বছরের ২১ ডিসেম্বর তথা ৭ পৌষ শান্তিনিকেতনের সপ্তদশ সাংবৎসরিক ব্রাহ্মোৎসবে যোগদান থেকেও বিরত থাকেন রবীন্দ্রনাথ। দীক্ষাদিবসে অনতিদূরের শিলাইদহে থেকেও আশ্রমে না-যাওয়া কবির তখনকার মানসিক অবস্থার একটা স্বচ্ছ সূচক। মনের এই ভার কবি নামিয়েছিলেন কলকাতায় অষ্টসপ্ততিতম সা¤¦ৎসরিক ব্রাহ্মসমাজ উপলক্ষে সমাজগৃহে প্রাতঃকালীন উপাসনায় যোগ দিয়ে, যেখানে তিনি ১১ মাঘ ১৩১৪ তথা ২৪ জানুয়ারি ১৯০৮ তারিখে ‘একটি অতি হৃদয়গ্রাহী সময়োপযোগী বক্তৃতা করেন’ (তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার সংশ্লিষ্ট সংখ্যা)। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তাঁর ডায়রিতে লেখেন : ‘সকালে রবির বক্তৃতা বেশ হয়েছিলÑ “দুঃখের প্রয়োজন” এই বিষয়ে।’ বক্তৃতাটি শিলাইদহে বসে লেখা ‘দুঃখ’ (র-র, খ ১৩, পৃ ৪০০-১০)। দুঃখের একই দর্শন আলোচিত হয় বছরখানেক পর শান্তিনিকেতন-উপদেশমালার পরম্পরায় ভাষিত কিংবা রচিত ‘দুঃখ’-শীর্ষক প্রবন্ধে (র-র, খ ১৩, পৃ ৪৫৮-৬০)। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুদর্শন অনুধাবনের জন্য জরুরি ‘দুঃখ’ শীর্ষক এই রচনা-দুটি আগ্রহী পাঠক তো আদ্যোপান্তই পাঠ করবেন, হয়তো বারবারও।     উপস্থিত পাঠকের জন্য এখানে কেবল বক্তব্যের চুম্বকই পেশ করা হচ্ছে। 

প্রথমে মাঘোৎসবে দুঃখ-বিষয়ে বক্তৃতার কথা। দুঃখের তত্ত্ব আর সৃষ্টির তত্ত্ব একসঙ্গে বাঁধা। কারণ সৃষ্টি যেমন অপূর্ণ, দুঃখও তেমনি অপূর্ণতাই। (সৃষ্টি যে অপূর্ণ, তার প্রমাণ তো আমরাইÑ‘প্রেজেন্ট কন্টিনুয়াস টেন্সে’র হিউম্যান ‘বীং’, মানে ‘প্রেজেন্ট পারফেক্ট টেন্সে’র পূর্ণতাহীন)। স্রষ্টার বা পূর্ণ-র প্রকাশের জন্যই সৃষ্টি অপূর্ণ। অর্থাৎ সৃষ্টির চির-অপূর্ণতা স্রষ্টার চির-পূর্ণতা প্রকাশেরই নিমিত্ত। অতএব মনে রাখতে হবে : অপূর্ণতা হচ্ছে পূর্ণতার বিকাশ, পূর্ণতার বিপরীত নয় অপূর্ণতা। পূর্ণতার বিপরীত হলো শূন্যতা। তেমনি এই অপূর্ণতার নিত্যসহচর দুঃখও আনন্দের বিপরীত নয়, ওটা আনন্দেরই অঙ্গবিশেষ। অমাবস্যার অন্ধকার যেমন নক্ষত্রলোককে প্রকাশ করে, দুঃখের তমসাও তেমনি আনন্দলোককে প্রকাশ করে। দুঃখ নিজের শেষ প্রান্তে গিয়ে আনন্দের সঙ্গে মিলে যায়। (সুতরাং দুঃখ-তরীতে পাড়ি দিতে দুঃখ কী রে, ওপারেই তো দুঃখানন্দের মিলনকুঞ্জ)। কবি বলতে চান, আনন্দ দুঃখের পরিণাম হলে দুঃখ তো আমাদের মূলধন, অতএব দুঃখকে আমরা বরণ করে নেব। আমাদের কঠিন দুঃখের সোনালী এই পাত্রটি ‘নহিলে তিনি আনন্দ ঢালিবেন কোন্খানে? আমাদের এই আপন ঘরের পাত্রটি না থাকিলে তাঁহার সুধা তিনি দান করিতেন কী করিয়া?’ ‘দুঃখের দ্বারাই আমরা আপন আত্মাকে গভীররূপে লাভ করিÑসুখের দ্বারা আরামের দ্বারা নহে। দুঃখ ছাড়া আর কোনো উপায়েই আপন শক্তিকে আমরা জানিতে পারি না।’ ‘মানুষের ইতিহাসে যত বীরত্ব যত মহত্ত্ব সমস্তই দুঃখের আসনে প্রতিষ্ঠিত।’

অতঃপর শান্তিনিকেতন-উপদেশমালার ‘দুঃখ’ শীর্ষক বক্তৃতার কথা। আমরা স্বাগত জানাই শুধু সুখকরকে, দুঃখকরকে মোটেই নয়। কারণ দুঃখকে বিড়ম্বনা বলেই জ্ঞান করি আমরা। বুঝতে চাই না যে এ-জগতে দুঃখের আঘাত বাঁচিয়ে বাস করা হবে অসম্পূর্ণভাবে বাস করাÑঅর্থাৎ আমাদের স্বাস্থ্য ও শক্তিকে পরিণত করে না-নিয়েই বাস করা। কারণ, তেমনি অপরিণতরূপে বাস করলে আমরা কেবল সুখকরকেই পাবো, কল্যাণকরকে পাবো না। কেননা কল্যাণকর শুধু সুখকর নন, তিনি দুঃখকরও। সুতরাংÑদুঃখমুক্ত সুখ নয়, দুঃখযুক্ত কল্যাণই আমাদের কাম্য হওয়া উচিত। তাই যদি হয়, তবে দুঃখযুক্ত মৃত্যুকে কল্যাণকরজ্ঞানে বরণ করে নেওয়াও উচিত বইকি।অন্তে, রবীন্দ্রনাথের মরণদর্শনের সারকথাটা বলার চেষ্টা করা যাক। আমার বোধে তা হলো : মরণ তার শোক ও দুঃখের মাধ্যমে    জীবনেরÑসত্যের, মুক্তির ও শক্তিরÑত্রয়ীরূপকেই ফুটিয়ে তোলে। সুতরাং সুখের মতো দুঃখকেও স্বাগত জানাও, স্বাগত জানাও জীবনের মতো মরণকেও।