স্থিরবিন্দু ও প্রবহমান নদী : ‘ভালো মানুষ’ ধারণার পুনর্মূল্যায়ন

অনেকদিন ধরেই মনের নিভৃত কোণে একটি সংশয় ডালপালা মেলছে, যা আজ এই গদ্যের আকার নিল। মাঝেমধ্যেই যখন কেউ আমাকে ‘ভালো মানুষ’ বলে এক ধরনের মুগ্ধতার তকমা এঁটে দিতে চান, তখন কৃতজ্ঞতা প্রকাশের চেয়েও আমার অন্তরে এক গভীর কৌতুক আর শঙ্কার উদয় হয়। আমি নিজেকে প্রশ্ন করি – এই যে ‘ভালো মানুষ’ অভিধা, তা কি সত্যিই কোনো ধ্রুব সত্য, নাকি এক মায়াবী কুহক?

‘ভালো মানুষ’ – সভ্যতার এই ব্যাকরণ শুনতে আমাদের অভ্যস্ত কানে বেশ মোলায়েম ঠেকে বটে, কিন্তু দর্শনের নিরাভরণ আলোকে একে বিশ্লেষণ করলে এক গভীর ও বাস্তবসম্মত সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। নীতিবিদ্যা কিংবা আধুনিক মনস্তত্ত্বের সূক্ষ্ম নিক্তিতে বিচার করলে দেখা যায়, ‘ভালো’ আসলে কোনো ধ্রুবপদ নয়, কোনো স্থিরবিন্দুতে সে নিশ্চল হয়ে থাকে না; বরং তা এক সতত পরিবর্তনশীল আপেক্ষিক অবস্থা মাত্র।

সভ্যতা আমাদের অত্যন্ত সহজ এক ব্যাকরণ শিখিয়েছে – মানুষকে দুটি নিñিদ্র প্রকোষ্ঠে ভাগ করে দেওয়া; একদিকে ‘ভালো’ আর অন্যদিকে ‘মন্দ’। কিন্তু দর্শনের গভীরে প্রবেশ করলে এই বিভাজনরেখাগুলো অস্পষ্ট হয়ে মিলিয়ে যায়। সেখানে ‘ভালো মানুষ’ নামক কোনো শাশ^ত সত্তার অস্তিত্ব নেই। যা আছে, তা শুধু গুটিকয় ‘ভালো কাজ’ কিংবা পরিস্থিতির চাপে নেওয়া কিছু  ‘নৈতিক সিদ্ধান্ত’।

কান্ট কিংবা অ্যারিস্টটলের মতো মনীষীরাও এই সত্যে সায় দিয়ে গেছেন যে, মানুষের চরিত্র কোনো নিশ্চল শিলাখণ্ডে খোদাই করা তুচ্ছ লিপিকা নয়। সারাজীবনের পুণ্যবান ব্যক্তিটিও জীবনের গোধূলিবেলায় এসে একটি প্রকাণ্ড ভুল করে বসতে পারেন; আবার চিরকালের অপরাধীটিও কোনো এক অভাবিত মুহূর্তে নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারেন।

মানুষ আসলে তার পারিপার্শ্বিকতারই এক বিচিত্র ক্রীড়নক। যাঁকে আমরা সাদামাটা ভাষায় ‘ভালো মানুষ’ বলি, তিনি সম্ভবত সেই বিরল ব্যক্তি, যিনি জীবনের অধিকাংশ মোড়েই নৈতিক পছন্দগুলো বেছে নিতে সমর্থ হয়েছেন। অথচ তাঁর মনের অন্ধকার কুঠুরিতেও ‘মন্দ’ হওয়ার আদিম সম্ভাবনাটি চিরকালই সুপ্ত থেকে যায়। তাই ভালোত্ব কোনো চিরস্থায়ী তকমা নয়, বরং এক অনিঃশেষ ও পিচ্ছিল প্রক্রিয়া।

‘সাইকোলজিক্যাল ইগোইজম’ বা মনস্তাত্ত্বিক অহমবাদ আমাদের এই রূঢ় সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় যে, মানুষের প্রতিটি কর্মের মূলে কাজ করে তার এক গোপন আত্মসুখ। আমরা যখন দয়া দেখাই কিংবা পরোপকারে ব্রতী হই, তখনো অলক্ষে আমরা নিজের মনে এক ধরনের অপ্রকাশ্য প্রশান্তি কিংবা সামাজিক স্বীকৃতির ঘ্রাণ খুঁজে ফিরি। থমাস হবস ঠিক এই জায়গাতেই তাঁর অমোঘ যুক্তিটি গেঁথে দিয়েছিলেন  – মানুষের প্রতিটি স্পন্দনের ভেতরে থাকে আত্মস্বার্থের এক দুর্লঙ্ঘ্য টান। দাতা যখন দান করেন, তখন তিনি আসলে নিজের সক্ষমতা বা শ্রেষ্ঠত্বের এক মদির আস্বাদ উপভোগ করেন। এমনকি যে বীর অন্যের জন্য অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিচ্ছেন, তিনিও হয়তো নিজের ভেতরের এক ‘আদর্শিক লক্ষ্য’ পূরণ করছেন কিংবা এক বিজাতীয় অপরাধবোধ থেকে নিজেকে মুক্তি দিচ্ছেন।

তবে কি ‘ভালো মানুষ’ শুধুই এক কাব্যিক ধারণা? কোনো রক্ত-মাংসের বাস্তব চরিত্র নয়?

হবস যেখানে মানুষকে মজ্জাগতভাবে স্বার্থপর মনে করতেন, ইমানুয়েল কান্ট সেখানে আঁকড়ে ধরেছিলেন ‘নৈতিক কর্তব্যবোধ’কে। তাঁর মতে, মানুষ শুধু আবেগের তাড়নায় নয়, বরং এক পরম দায়িত্ববোধ থেকে ভালো কাজ করে। অর্থাৎ, আমি ভালো কাজ করছি কারণ এটি করা আমার দায়িত্ব, এর থেকে আমি শান্তি পাব কি পাব না তা বিবেচ্য নয়। সমাজবিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে আবার উদ্দেশ্যের চেয়ে ফলাফলই সত্য। উদ্দেশ্য যদি হয় ব্যক্তিগত তুষ্টি, কিন্তু তার পরিণাম যদি হয় জগতের মঙ্গল, তবে সেই কর্মীকে ‘ভালো’ না বলার কোনো হেতু নেই।

অন্যদিকে কার্ল ইয়ুং মানুষের ভেতরে এক ‘ছায়া’ বা ‘শ্যাডো’র অস্তিত্ব অনুভব করেছিলেন। আমাদের যাবতীয় অবদমিত ক্রোধ আর স্বার্থপরতা সেই ছায়ারই অংশ। আমরা যাকে সুজন বলে ভুল করি, তিনি আসলে সেই ব্যক্তি যিনি তাঁর এই অন্ধকারাচ্ছন্ন সত্তাকে নিপুণ দক্ষতায় শাসন করতে শিখেছেন। বিখ্যাত ‘স্ট্যানফোর্ড প্রিজন এক্সপেরিমেন্ট’ আমাদের দেখিয়েছে, ক্ষমতার সামান্য মদ আর অশুভ পরিবেশ কীভাবে একজন সাধারণ মানুষকেও এক নিমিষে নিষ্ঠুর করে তুলতে পারে। অর্থাৎ, আমাদের তথাকথিত সাধুতা অনেকখানিই নির্ভর করে আমাদের পারিপার্শ্বিক অনুকূলতার ওপর।

আবার অস্তিত্ববাদী দার্শনিক জঁ পল সার্ত্র আমাদের এই সংশয়ের এক অদ্ভুত সমাধান দিয়েছেন। তাঁর মতে, মানুষের কোনো পূর্বনির্ধারিত সারসত্তা বা এসেন্স নেই। অর্থাৎ, আমরা কেউ জন্মগতভাবে সাধু কিংবা আজন্ম পাপী হয়ে এই পৃথিবীর মঞ্চে অবতীর্ণ হই না। মানুষের চরিত্র কোনো পাথরে খোদাই করা নিয়তি নয়, বরং মানুষ প্রতিক্ষণ তার প্রতিটি কাজের মধ্য দিয়ে নিজেকে নতুন করে নির্মাণ করে। আজ যাঁর কর্মে মহত্ত্বের বিচ্ছুরণ, কাল তিনি যদি ক্ষুদ্রতার পরিচয় দেন, তবে তাঁর সেই বর্তমান কর্মই তাঁকে সংজ্ঞায়িত করবে। এই যে মুহূর্তে মুহূর্তে নিজেকে বেছে নেওয়া, এই যে নিরন্তর গড়ে তোলা – এটাই মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা, আবার এটাই তার সবচেয়ে বড় দায়।

‘মানুষ যা করে, সে তা-ই’ – অস্তিত্ববাদের এই অমোঘ সূত্রের ওপর দাঁড়িয়ে বলা যায়, যদি কেউ নিজের ক্ষতি স্বীকার করেও অপরের হিতসাধন করে, তবে ফলাফল অনুযায়ী তাকে ‘ভালো’ হিসেবেই বরণ করে নেওয়া সমীচীন। নিজের সত্তার চেয়ে অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মধ্যে যদি এক ধরনের সূক্ষ্ম আত্মতৃপ্তিও লুকিয়ে থাকে, তবে তাকে

‘পরিণতিবাদ’-এর নিরিখে অস্বীকার করার উপায় নেই। মানুষের অবচেতন মনে গচ্ছিত সেই গোপন তৃপ্তির চেয়ে তাঁর কাজের দ্বারা অর্জিত সামাজিক উপযোগিতা অনেক বেশি দামি। আমরা যদি প্রতিটি মহৎ কাজের ছত্রে ছত্রে শুধু ‘নিখাদ নিঃস্বার্থতা’ খুঁড়ে বেড়াতে চাই, তবে মানুষের মানবীয় সীমাবদ্ধতাকেই সম্ভবত অসম্মান করা হবে।

পরিশেষে এই সত্যটি মেনে নিতেই হয় যে, এই ‘ভালোত্ব’ কোনো আজীবনের জন্য পাওয়া রাজমুকুট নয়; বরং এ এক সতত চলিষ্ণু সংগ্রাম। মানুষের অস্তিত্ব যেহেতু প্রবহমান, তাই প্রতিটি মুহূর্ত তার সামনে ছুড়ে দেয় এক একটি নতুন নৈতিক দ্বৈরথ। আজ যে-ব্যক্তি নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে অন্যকে রক্ষা করছেন, কালকের প্রতিকূল হাওয়ায় তিনি হয়তো এক সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষে রূপান্তরিত হতে পারেন  – এ-কথা ভাবলে যেমন শিহরণ জাগে, তেমনি এক ধরনের মুক্তিও মেলে। অস্তিত্ববাদের এই পিচ্ছিল পথে মানুষের অতীত তার ভবিষ্যতের জন্য কোনো জামিনদার হতে পারে না; কোনো ধ্রুব গ্যারান্টি বা চিরস্থায়ী তকমা এখানে অচল। যেহেতু মানুষ প্রতিক্ষণ পরিবর্তনশীল, তাই তাকে একটি নির্দিষ্ট নিগড়ে চিরতরে আটকে রাখা সম্ভবত অসম্ভব। ‘ভালো মানুষ’ হওয়া তাই কোনো স্থির গন্তব্য নয়, বরং এক চিরকালীন যাত্রা – যার কোনো শেষ নেই, কোনো জিরোবার ঠাঁই নেই। হয়তো এই অনিশ্চয়তাই মানুষের জীবনের চরম ট্র্যাজেডি, আবার হয়তো এটাই তার একমাত্র গৌরব। জীবনের এই বিচিত্র নাট্যমঞ্চে আমাদের পরিচয় কোনো স্থির সংজ্ঞায় নয়, বরং ধুলোয় লেখা আমাদের প্রতি মুহূর্তের কর্মের ভেতরেই অলক্ষে রয়ে যায় – যার প্রকৃত হদিস মেলে শুধু জীবনের শেষ নিশ্বাসের ওপারে।