নাথানিয়েল হথর্নের স্কারলেট লেটার – সপ্তদশ শতকের বস্টনে পিউরিটানিজম ধর্মমত

সপ্তদশ শতকে উত্তর আমেরিকার নিউ ইংল্যান্ড অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত ম্যাসাচুসেটস বে কলোনির পিউরিটানদের কঠোর ধর্মভিত্তিক শাসনের তীব্র সমালোচনা রয়েছে নাথানিয়েল হথর্নের স্কারলেট লেটার উপন্যাসটিতে। ১৮৪৯-৫০ সালে হথর্ন এ-উপন্যাস  লেখেন। উপন্যাসটির যিনি কথক তিনি  সালেম কাস্টমহাউসে সার্ভেয়ার পদে চাকরি করতেন। তার সময়ের একশ বছর আগে ওই অফিসে জোনাথান পিউ নামে অন্য একজন সার্ভেয়ার ছিলেন। তাঁর রেখে যাওয়া কিছু কাগজ কথকের হস্তগত হয়। কাগজগুলি লাল রঙের ‘এ’ খোদাই-করা একটা কাপড়ে পেঁচানো ছিল – একটা সত্য ঘটনা নিয়ে লেখা পাণ্ডুলিপি, যাতে সার্ভেয়ার পিউ লিখে রেখেছিলেন তার সময়ের একশ বছর আগে বস্টনে বসবাসকারী হেস্টার প্রিন নামে একজন নারীর জীবনের দুঃখজনক কাহিনি। সার্ভেয়ার পিউর লেখাকে আউটলাইন হিসেবে অনুসরণ করে কল্পিত কথকের জবানীতে নাথানিয়েল হথর্ন তাঁর প্রথম উপন্যাস স্কারলেট লেটার লেখেন। উপন্যাসটিতে সপ্তদশ শতকে নিউ ইংল্যান্ড এলাকার অভিবাসী মানুষের অনুসৃত কঠোর সামাজিক ও ধর্মীয় অনুশাসনের কিছু নির্মম চিত্র উঠে এসেছে। কল্পিত কথক আসলে হথর্নের আত্মজৈবনিক প্রতিভূ।

রাজা অষ্টম হেনরি তাঁর স্ত্রী ক্যাথারিনকে তালাক দিয়ে এন বোলিনকে বিয়ে করতে চান। কিন্তু পোপ যখন ক্যাথারিনকে তালাক দিতে অনুমতি দেয় না, তখন রাজা হেনরি ক্যাথলিক চার্চ থেকে ইংল্যান্ডকে বিচ্ছিন্ন করেন এবং স্বাধীন ইংলিশ প্রটেস্ট্যান্ট চার্চ গঠিত হয়। নতুন এই চার্চের আরো সংস্কার বা পিউরিটি আনা দরকার বলে যেসব প্রটেস্ট্যান্ট মনে করতেন, ইংলিশ চার্চের সেসব সদস্যকে পিউরিটান বলা হতো। পিউরিটানিজমে রয়েছে কঠোর নিয়ম-শৃঙ্খলার ধর্মীয় জীবন। অন্যদিকে ইংলিশ চার্চের সঙ্গে দ্বিমত পোষণের ফলে রাজা জেমসের আমলে

পিউরিটান-বিরোধী নির্যাতনের কারণে পিউরিটানরা ইংল্যান্ড ছেড়ে উত্তর আমেরিকায় পাড়ি জমায়। ১৬২০ সালে ‘মে-ফ্লাওয়ার’ নামে জাহাজে ১০২ জনের একদল পিউরিটান ইংল্যান্ড থেকে উত্তর আমেরিকায় আসে। তারা প্রথমে ম্যাসাচুসেটসে ‘প্লিমেথ কলোনি’ এবং দশ বছর পরে বস্টনকেন্দ্রিক ‘ম্যাসাচুসেটস বে কলোনি’ নামে কলোনি স্থাপন করে। ম্যাসাচুসেটস থেকে পিউরিটান সম্প্রদায়ের মানুষ পরে নিউ ইংল্যান্ড এলাকার অন্যান্য রাজ্যেও কলোনি স্থাপন করে। উল্লেখ্য, উত্তর আমেরিকায় এরাই প্রথম কলোনি স্থাপনকারী নয়, তাদের আগে ১৬০৭ সালে ইংলিশ চার্চের অনুসারীদের একটি দল ভার্জিনিয়ায় ব্রিটিশ কলোনি স্থাপন করেছিল।

ম্যাসাচুসেটস বে কলোনিতে এলিটরা আর ধর্মগুরুরা মিলে ধর্মীয় আইনকানুনের ভিত্তিতে রাষ্ট্র চালাতেন। পিউরিটানদের বিশ^াস, মানুষ প্রধানত পাপী। চার্চের তত্ত্বাবধানে তাদের ভালো রাখতে হবে। বাঁধন একটু শিথিল হলে ওরা পাপের দিকে ধাবিত হবে। তাদের বিশ্বাস ছিল, নারীরা ঈশ্বরের কাছে সমান বিবেচিত হলেও তারা পুরুষের চেয়ে দুর্বল এবং শয়তানের খপ্পরে বেশি পড়ে। তাই তাদের কঠোর শাসনে রাখতে হবে। পিউরিটানিজমে ধর্মীয় ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ নেই। তারা বাইবেলের আক্ষরিক অনুসরণে এবং সরল উপাসনা পদ্ধতিতে বিশ^াসী ছিল। আনন্দ-ফুর্তি, থিয়েটার বা নাচকে তারা পাপ হিসেবে গণ্য করত। তাদের গণতন্ত্রে শুধু চার্চের সদস্যরাই ভোট দেওয়ার অধিকার পেতেন এবং সেই ভোটে নির্বাচিত সরকার দেশ চালাতো। বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস, কানেটিকাট, নিউ হ্যাম্পশায়ার, মেইন, ভারমান্ট এবং রোডস আইল্যান্ড রাজ্যে (সম্মিলিতভাবে নিউ ইংল্যান্ড) এই ধর্মমত বিস্তার লাভ করেছিল।

পিউরিটানদের ভালো দিক বলতে গেলে বলতে হয়, তাদের মধ্যে ব্যক্তির সততা, পারিবারিক বন্ধন, শিক্ষার প্রতি অনুরাগ ছিল। পরিবারপ্রধানের দায়িত্ব ছিল তার পরিবারের সবাই যাতে বাইবেল পড়তে পারে – সেটুকু শিক্ষা নিশ্চিত করা। তাই নিউ ইংল্যান্ডে বসতি স্থাপনের স্বল্পকাল পরেই বিভিন্ন স্থানে গ্রামার স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়, যেখানে ল্যাটিন ভাষা শেখা যেত। এগুলি কালে কালে কলেজ এবং বিশ^বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়েছিল।  ১৭০০ সাল পর্যন্ত পিউরিটানদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত ছিল। তারপর পিউরিটানিজমের বিপক্ষে অনেক গ্রুপ দাঁড়িয়ে যায়, যেমন বাপ্টিস্ট, কোয়েকার, অ্যাংলিকান চার্চ। ১৬৯৯ সালে উইচ ট্রায়েল মামলায় বেশিরভাগ নারীসহ ১৯ জনকে ফাঁসি দেওয়া হয় এবং আরো কয়েকটা অসহিষ্ণুতার ঘটনা ঘটে। অন্য গ্রুপকে নির্যাতনের কারণে পিউরিটানদের প্রভাব ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। ফলে ব্রিটিশ সরকার ক্রমেই নাখোশ হতে থাকে। ১৭৪০ সালে পিউরিটানিজমের উত্তরসূরি একটি যুগোপযোগী কনগ্রিগেশনাল চার্চ গঠিত হলে ধর্মনিয়ন্ত্রিত শাসনব্যবস্থা এবং পিউরিটানিজম বিলুপ্ত হয়।

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র পিউরিটান ধর্মমতের অনুসারী হেস্টার প্রিন তার স্বামী রজার প্রিনকে ইংল্যান্ডে রেখে নিউ ইংল্যান্ডে আসেন। স্বামী পরে আসবে এমন কথা ছিল। কিন্তু রজার প্রিনের আসতে অনেক দেরি হয়ে যায়। তার কথামতে, সে আমেরিকান নেটিভদের কাছে কয়েক বছর বন্দি ছিল। এই সময়ে হেস্টারের একাকিত্বের জীবনে ভালোবাসা আসে। পিউরিটান সমাজর কঠোর ধর্মীয় অনুশাসনের বেড়াজালে আবদ্ধ থাকা সত্ত্বেও হেস্টার প্রিন ও তার ভালোবাসার মানুষের মধ্যে বিবাহবহির্ভূত রোমান্স দানা বাঁধে। ভালোবাসার পরিণতি হিসেবে জন্মলাভ করে একটি কন্যাসন্তান। কট্টর পিউরিটান সমাজে এই অভাবিত নৈতিক স্খলন দেখে ক্ষুব্ধ শাসক গর্ভবতী হেস্টারকে জেলে আবদ্ধ করে। যেদিন তার সন্তানের বয়স তিন মাস, সেদিন তাকে জেল থাকে বের করে আনা হয় বাজারের মধ্যে উন্মুক্ত স্থানে। এখানে সাধারণ মানুষের ঘৃণা বর্ষণের জন্য তিন ঘণ্টা একটি বেদিতে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে তাকে। এছাড়া তাকে সারাজীবন অ্যাডাল্টারির প্রতীক স্কারলেট ‘এ’ অক্ষর-খোদিত একটা কাপড় বুকে জড়িয়ে রাখতে হবে।

হেস্টার পার্লকে কোলে নিয়ে স্কারলেট লেটারসহ এসে দাঁড়ান বেদিতে। প্রচণ্ড রোদ, দুঃসহ গরম। হেস্টার ঘামছেন আর তার সন্তান কাঁদছে। চারদিকে মাঠভর্তি সাধারণ মানুষ নানারকম সমালোচনা ও মন্তব্যে দগ্ধ করছে তাকে। ঠিক তখনই তার হারিয়ে যাওয়া স্বামী ওই স্থানে আবির্ভূত হন এবং স্ত্রীকে স্ক্যাফোল্ডে দাঁড়ানো দেখেন। গ্যালারিতে বসে আছেন গভর্নর, মুখ্য পাদ্রি এবং সহকারী পাদ্রি আর্থার ডিমসডেল। হেস্টার যদি পাদ্রির কাছে দোষ স্বীকার করে অনুতপ্ত হন এবং জানান যে, কে তাঁর কন্যার পিতা, তাহলে পিউরিটান সমাজ কিছুটা অনুকম্পা দেখাতে পারে। চার্চের প্রধান পুরোহিত একটা বক্তৃতা দিয়ে দায়িত্ব দিলেন যুবক পাদ্রি আর্থার ডিমসডেলকে। সে জেরা করবে এবং ধর্মের বাণী শুনিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করবে – কে এই তিন মাস-বয়েসি শিশুর পিতা। কিন্তু জেরার মুখে হেস্টার প্রিন নিরুত্তর। কারণ, তাকে যে যুবক পাদ্রি (আর্থার ডিমসডেল) জেরা করছে – সে-ই তো পার্ল নামে এই নবজাতকের পিতা। স্বীকারোক্তি দিলে তো তার সম্মান ধুলোয় মিশে যাবে। যুবকের প্রতি হেস্টারের ভালোবাসায় তো কোনো খাঁদ নেই যে, তাকে একই নিগ্রহের মঞ্চে তার পাশে এনে দাঁড় করাবেন হেস্টার। সন্তান অবৈধ হলেও সে তাঁদের পবিত্র ভালোবাসার ফসল। হেস্টারের কাছে তাই শিশুটিও পবিত্র। তিনি বরং পিউরিটান সমাজের নিষ্ঠুর শাস্তি মাথা পেতে নেবেন, তবু যুবক পাদ্রিকে ধুলোয় নামিয়ে আনবেন না। অন্যদিকে, দুর্বলচিত্ত আর্থার ডিমসডেল বস্টনবাসী পিউরিটানদের অতি শ্রদ্ধাভাজন মানুষ। তার সামনে একদিকে সমাজের শ্রদ্ধা, অপরদিকে রক্তমাংসের পৌরুষের পদস্খলনজনিত পাপের উত্তরাধিকার-চেতনা। সেইসঙ্গে রয়েছে তার ভালোবাসার মানুষের কষ্ট দেখার যন্ত্রণা। হেস্টার যে শাস্তি সাহসের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন, ডিমসডেল তা পারে না। অনুদার পিউরিটান সমাজের শাস্তি একজন নির্ভীকচিত্তে গ্রহণ করেন, অপরজন শাস্তির ভয়ে সত্য গ্রহণ করতে না পেরে কুঁকড়ে থাকে। ভেতরে ভেতরে মানসিক শাস্তি গ্রহণ করে সে জ্বলেপুড়ে শেষ হয়ে হৃদরোগের শিকার হয় এবং পরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়।

উপন্যাসে পিউরিটান সমাজ, গভর্নর, মুখ্য পাদ্রি, যুবক-পাদ্রি – প্রেমিক ডিমসডেল এবং হেস্টারের পূর্বের স্বামী রজার প্রিন, সকলকে মানব-সত্তা বিবেচনায় হেস্টার প্রিনের কাছে ক্ষুদ্র দেখানো হয়েছে। জনগণের ঘৃণা মাথায় নিয়ে হেস্টার তিন ঘণ্টা মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকার পর মুক্ত হলেও তিনি বস্টন ছেড়ে যান না; শাস্তির প্রতীক স্কারলেট লেটারকে বুকে ধরে তিনি সমাজ থেকে আলাদা এক নির্জন স্থানে বসবাস করেন। তাঁর সেলাইয়ের পারদর্শিতা দিয়ে তিনি সমাজের সঙ্গে সামান্য যোগসূত্র সৃষ্টি করে বেঁচে থাকেন। তাঁর কন্যা ধীরে ধীরে বড় হয়। প্রথমে কোলে চড়ে, তারপর তাঁর হাত ধরে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘোরে। এভাবে সাত বছর কেটে যায়। হেস্টার মানুষের

দুঃখ-দুর্দশার ভাগী হয়, রোগীর সেবা করে, আয়ের উদ্বৃত্ত টাকা দিয়ে গরিবদের খাবার কিনে দেয়। তবুও স্কারলেট লেটার দেখে সমাজের শিশুরা তাকে ও তার মেয়েকে ঢিল ছুড়ে মারে, কটু কথা বলে। আবার প্রেম-ভালোবাসার উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে থেকে হেস্টারের প্রাক্তন স্বামী রজার প্রিন ‘চিলিংওয়ার্থ’ নাম ধারণ করে বস্টনের একজন চিকিৎসক সেজে নিজের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে খুঁজে বেড়ায় তার স্ত্রীর প্রেমিককে। তাঁর আসল কাজ, নিজের পরিচয় গোপন রেখে হেস্টারের প্রেমিকের সন্ধান করা। চিলিংওয়ার্থ নামের আড়ালে আসল মানুষটার পরিচয় একমাত্র হেস্টার প্রিন জানেন; কিন্তু তাঁর কাছ থেকে দুষ্টু লোকটা অঙ্গীকার আদায় করেছে যে, তাদের মধ্যে সম্পর্কের কথা তিনি কাউকে জানাবেন না। একদিন সত্যিই চিলিংওয়ার্থ ধরে ফেলে যে, আর্থার ডিমসডেলই সেই লোক। আর্থার ডিমসডেলের চিকিৎসা করার নামে সে যুবক-পাদ্রির যন্ত্রণাকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে উস্কে দেয়। একদিন রাতের আঁধারে ডিমসডেল এসে সেই স্ক্যাফোল্ডে দাঁড়ায়। গভীর রাতে একজন রোগীর সেবা করে ফেরার পথে হেস্টার এবং পার্ল ডিমসডেলকে ওই অবস্থায় দেখে ফেলেন। তারা দুজনও বেদিতে গিয়ে হাত ধরাধরি করে দাঁড়ায়। তারপর ফিরে যায়। তবে যুবক-পাদ্রি শেষবার যেদিন স্ক্যাফোল্ডে দাঁড়ায়, সেদিন সে সত্যিই জনসমক্ষে নিজের দোষ স্বীকার করে। তবে সেদিন সে আর ঘরে ফিরতে পারেনি। মঞ্চের উপরে হেস্টারের কোলে মাথা রেখে শেষ নিশ^াস ত্যাগ করে।

নাথানিয়েল হথর্ন হেস্টার প্রিনের প্রতি সহমর্মী। সে-যুগের পিউরিটানদের অমানবিক আচরণ আর ধর্মীয় বাড়িবাড়ির কট্টর সমালোচনা রয়েছে এ-উপন্যাসে। যে-সমাজ পরকীয়ার অপরাধে একজন অসহায় নারী ও তার কন্যাকে জনবিচ্ছিন্ন করে রাখে প্রায় এক দশক, সেই সমাজকে দেখতে হয় যে, তাদের ফিলোসফার এবং গাইড হিসেবে কাজ করা চার্চের পাদ্রি নিজেই এই পাপের অংশীদার। স্বাধীনচেতা নারী হেস্টার অনেক সাহসী। সত্যের কুৎসিত রূপ দেখেও তিনি পালিয়ে না গিয়ে ভালোবাসার মর্যাদা দিয়ে প্রেমিক ডিমসডেল বেঁচে থাকা পর্যন্ত বস্টন ছেড়ে যাননি। অপরদিকে তার প্রাক্তন স্বামী রজার প্রিন ওরফে চিলিংওয়ার্থ  প্রতিহিংসার জন্য পরিচয় গোপন করে ঘোরে। তাই তাদের উভয়ের মৃত্যু হয় এ-উপন্যাসে। কিন্তু হেস্টার বেঁচে থাকেন। শেষদিকে পার্লকে নিয়ে হেস্টার ইংল্যান্ডে যান, মেয়েকে বিয়ে দেন এবং আবার বস্টনে ফিরে এসে তার সমাজসেবামূলক কাজ করতে থাকেন। তখনো তার গলায় ঝোলানো থাকতো স্কারলেট লেটার – ‘এ’ অক্ষরের প্রতীকটি। কিন্তু মানুষ স্কারলেট লেটারকে তখন অ্যাডাল্টারির পরিবর্তে সামর্থ্য আর সেবার প্রতীক হিসেবে ভালোবাসতে শুরু করে। হেস্টার প্রিন সে-যুগের অবহেলিত এবং বৈষম্যের শিকার নারী-সম্প্রদায়ের নৈতিক মনোবলের প্রতীক হয়ে মানুষের মনে বেঁচে ছিলেন।

কাহিনির পরম্পরা ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে মিল রেখেই স্কারলেট লেটার উপন্যাসটি রচিত হয়েছে। ১৬২০-২৯ পর্যন্ত কলোনির প্রশাসনিক শহর ছিল প্লিমেথ। ১৬৩০ থেকে সেটা স্থানান্তরিত হয় বস্টন শহরে। সালেম বস্টনের নিকটবর্তী সমুদ্রবন্দর। অতএব, বোঝা যায় যে, উপন্যাসের চরিত্র হেস্টার প্রিন মে-ফ্লাওয়ার জাহাজে উত্তর আমেরিকায় আসেননি। এর দশ বছরের বেশি সময় পরে এসেছিলেন। কেন্দ্রীয় পুরুষ চরিত্র ‘ডিমসডেলের’ সঙ্গে উপন্যাসের কেন্দ্রীয় নারী চরিত্র ‘হেস্টারে’র রোমান্স হয়েছে হেস্টারের আগমনের বেশ কিছুকাল পরে। এরপর হেস্টারের গর্ভে অবৈধ সন্তানের খবরে পিউরিটান সমাজ হেস্টার প্রিনকে জেলে  দেয়। সেখানে তার সন্তানের জন্ম হয় ১৬৪২ সালে। পার্লের বয়স যখন তিন মাস, তখন হেস্টার তাকেসহ বাজারের মাঝখানে অবস্থিত স্ক্যাফোল্ডে এসে দাঁড়ান। পার্লের বয়স যখন তিন বছর, তখন মায়ের সঙ্গে সে গভর্নরের বাসভবনে যায়। পার্লের বয়স যখন সাত, তখন ডিমসডেল স্ক্যাফোল্ডে গিয়ে একদিন স্বীকারোক্তি না দিয়ে তিনজনে একত্রে দাঁড়িয়ে থাকে। এর কিছুদিন পর আর একবার স্ক্যাফোল্ডে উঠে স্বীকারোক্তি দিয়ে ডিমসডেল মারা যায়। তারপর হেস্টার তার মেয়েকে নিয়ে ইংল্যান্ড চলে আসেন। তাদের অনুপস্থিতিতে পার্লের আট বছর বয়সে রজার প্রিন ওরফে চিলিংওয়ার্থ মারা যায়। এর অনেক বছর পরে বস্টনে ফিরে এসে হেস্টার একজন অভিজ্ঞ পরামর্শকের মতো আবার পিউরিটান সমাজের মানুষের সেবা করে ভালোবাসায় সিক্ত হন। তাই তাকে ডিমসডেলের সঙ্গে একই কবরে দাফন করা হয়। বস্টনবাসী একজন নারীর সংগ্রামী জীবনের কথা কবরের ওপর খোদাই করে রাখে ‘এ’ অক্ষর দিয়ে।