চিত্রশিল্পী, শিক্ষক ও সুলেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন (২০১০-১৩) অধ্যাপক মতলুব আলী তাঁর শিক্ষার্থী, পাঠক এবং সতীর্থদের কাছে সম্মানীয় এক আপনজন। বিগত পঞ্চাশ দশকেরও অধিককাল ধরে বাংলাদেশের প্রগতিমনা শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী এবং সংস্কৃতিসেবীদের সঙ্গে তাঁর আত্মিক সুসম্পর্ক ও চমৎকার বোঝাপড়া ছিল। ঢাকা চারুকলা মহাবিদ্যালয়ের প্রাক-ডিগ্রি পর্বে তিনি ছিলেন আমাদের শিক্ষক এবং পরিবর্তিত ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের অংকন ও চিত্রায়ণ বিভাগের স্নাতকোত্তর অধ্যয়নে তিনি আমাদের সহপাঠী হয়েছিলেন। অসাম্প্রদায়িক-প্রগতিশীল সংস্কৃতিচর্চার প্রচার ও প্রসারে আমরা ছিলাম সহযাত্রী। ১৯৮৭ সালের পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণি পেয়েই স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ১৯৯৯ সালে তিনি অংকন ও চিত্রায়ণ বিভাগের অধ্যাপক হন। চারুকলা অনুষদের ডিন নিযুক্ত হন ১৬ই মে ২০১০ সালে এবং মর্যাদাপূর্ণ এই পদে তিনি ছিলেন ১২ই ডিসেম্বর ২০১৩ পর্যন্ত। শিক্ষকতা থেকে অবসর গ্রহণের কিছুদিন পর পারিবারিক কারণে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে থাকতে শুরু করলেও প্রতিবছর দেশে আসতেন। ওখানে বসবাসরত বাংলাদেশের শিল্পী ও সংস্কৃতিসেবীদের সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। আর্টক্যাম্প, শিল্পকর্ম প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণসহ নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনে হয়ে উঠেছিলেন অপরিহার্য একজন। নিউইয়র্ক থেকে বাংলাভাষায় প্রকাশিত পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লিখছিলেন তিনি। দেশে ফিরে তাঁর অপ্রকাশিত লেখাগুলোর সংকলন প্রকাশ করা এবং নিজের আঁকা নির্বাচিত চিত্রকর্মের প্রদর্শনী করার তাগিদও ছিল।
গত বছর অক্টোবরে তিনি সস্ত্রীক দেশে ফেরেন। ৪ঠা নভেম্বর ২০২৫ কৃতি এই মানুষটি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে আকস্মিকভাবে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। এর কিছুদিন পর অংকন ও চিত্রায়ণ বিভাগ চারুকলা অনুষদের ওসমান জামাল মিলনায়তনে তাঁর স্মরণসভার আয়োজন করে।
গত ৪ঠা বৈশাখ ছিল তাঁর আশিতম জন্মদিন। এ-উপলক্ষে গত ২৬ থেকে ৩০শে এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারির দুটি কক্ষে অংকন ও চিত্রায়ণ বিভাগ এবং মানব শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি গোষ্ঠীর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় শিল্পী-লেখক অধ্যাপক মতলুব আলীর আঁকা একশ চিত্রকর্মের একটি প্রদর্শনী। এই প্রদর্শনীর কিউরেটর ছিলেন তাঁর কন্যা আলী পুষ্পিতা মউরি। ১৯৬৭ সাল থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আঁকা তাঁর চিত্রকর্মের সমাবেশ ঘটেছিল ওই চিত্রশালায়।
শিল্পী মতলুব আলী ছিলেন তাঁর আঁকায়, লেখায়, প্রগতিশীল জীবনাদর্শে সময়ের একনিষ্ঠ রূপকার। তাঁর চিত্রকর্মের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই বাংলার মাটি, প্রকৃতি ও মানুষের ছবি, অস্তিত্বের দিক দিয়ে যারা পরস্পরের পরিপূরক। ফিগারভিত্তিক গঠন ও অবয়বকেন্দ্রিক বাস্তবতা নিয়ে তাঁর শিল্পীজীবনের শুরু হলেও তিনি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমান্বয়ে রূপকধর্মী অনেক কাজ করেন। শেষমেশ বিগত সাড়ে তিন দশক ধরে তাঁর চিত্রকর্ম ভাবনায় ও গঠনে যেন বিমূর্ত অভিব্যক্তিবাদী হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে চারুকলায় স্নাতকোত্তর পর্যায়ে তাঁর ছাত্রত্বে ফেরার সময় নিরীক্ষামূলক কাজ এক্ষেত্রে তাঁর বিচরণের পথ তৈরি করে দিয়েছিল। এই পর্বে খুব কাছ থেকেই আমি তাঁর রূপান্তর দেখেছি সহ-অধ্যয়নকালে।
রেট্রোস্পেকটিভ এই প্রদর্শনীর শিরোনাম ছিল ‘বর্ণিল অন্বেষণ’। শিল্পীর ছয় দশকের আঁকা চিত্রকর্ম থেকে একশ ছবির এই প্রদর্শনীতে ১৯৬৭ সালে জলরঙে আঁকা মাথায় লাল গামছা জড়ানো এক কর্মী বালকের অবয়ব দেখতে পেলাম; বাজারে মিন্তি নামে ডাকা হয় তাদেরই একজন সে। পেছনে হালকা বর্ণিলতায় বাজারের আবহ দেখা যায়। অনুশীলনধর্মী কাজ হলেও জলরঙের স্বচ্ছতা রক্ষা করা কাজটি সে-সময়েই শিল্পীর পরিমিতিবোধের একটি দৃষ্টান্ত বলা যায়। জলরং ও পেনসিল মাধ্যমে আরো কয়েকটি অনুশীলনধর্মী কাজ দেখে আমরা উপলব্ধি করতে পারি শিক্ষাগ্রহণকালীন শিল্পী মতলুব আলীর কর্মদক্ষতার স্বরূপ।
ছাত্রজীবন থেকেই শিল্পী আত্মপ্রতিকৃতি আঁকতেন। এটি সৃজনশিল্পীদের প্রিয় একটি বিষয়। ২০১১ সালে তিনি জলরঙে যে আত্মপ্রতিকৃতি এঁকেছেন, এর আবহে আমরা দেখতে পাই আকাশে উড্ডীন অসংখ্য ঘুড়ি। এ যেন পুরনো ঢাকার ঘুড়ি ওড়ানোর সাকরাইন উৎসবকে শিল্পী তাঁর ভাবালুতায় তুলে ধরেছেন; আর অবয়বে শিল্পীর দৃষ্টি আকাশ ছাপিয়ে যেন বহুদূরগামী।
বাঙালি শিল্পীদের কাছে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি একটি প্রিয় বিষয়। মতলুব আলী রবীন্দ্রনাথকে এঁকেছেন রেখায় রঙে নানাভাবে। আরো এক বা একাধিক অবয়ব দেখি তাঁর অনেক চিত্রকর্মে। এসবের অন্যতম ‘অডে টু দ্য টেগোর আর্ট স্টাইল-১’। আয়তাকার চিত্রপটের মাঝখানে রবি ঠাকুরের প্রতিকৃতি। এর ডানপাশে কৃষ্ণচূড়া ফুল, তার নিচে রবির হাতের লেখা ও কাটাকুটি, বাঁয়ে রবি ঠাকুরের বাড়ির অংশবিশেষ, এর নিচে ঊর্ধ্বমুখী এক পাখির অবয়ব। আয়োজন ও বর্ণবিভায় কোলাজধর্মী এ এক অনন্য কাজ।
শিল্পী মতলুব আলী শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের প্রতিকৃতি এঁকেছেন সাদাকালোয় – ১৯৮৭ সালে। শিল্পীর শ্রদ্ধাভাজন কাজী মোহাম্মদ ইদরিসের প্রতিকৃতিও এঁকেছেন। আরো কিছু নিরীক্ষামূলক প্রতিকৃতির দেখা পেলাম এই প্রদর্শনীতে। ১৯৮৪ সালে আঁকা ‘মুখমণ্ডল’, ২০১১, ২০১৩ ও ২০১৬ সালে আঁকা তিনটি অবয়বমূলক কাজ। এর প্রথমটির শিরোনাম ‘আলংকারিক টোন ও প্রতিরেখা’; নানা রঙের ফুল ও পাতার সামনে এক প্রোফাইল অবয়ব, যার দৃষ্টি সামনের দিকে। দ্বিতীয়টি গ্রামীণ এক যুবকের আলংকারিক অবয়ব। তৃতীয়টি শিরোনামহীন নারী অবয়ব – গাঢ় নীল রঙের প্রেক্ষাপটে লালচে মুখ। এক কথায় দুর্দান্ত কুশলী কাজ। এগুলো অনেকটা শিল্পাচার্য জয়নুলকৃত অংকনধর্মী কাজের কাছাকাছি যায়। এসবের সঙ্গে অবয়বিক আরো কিছু মজার স্টাইলিক কাজ প্রদর্শনীতে দেখা গেল।
মতলুব আলী সারাজীবন মানুষের মুক্তির স্বপ্ন দেখেছেন। তাঁর এই স্বপ্ন বুনে দিয়েছেন আমাদের মধ্যে। এই শিল্পীর একটি কাজে মুক্তপ্রাণ মানুষের আকাক্সক্ষার কথা বিধৃত হয়েছে। ২০১১ সালে আঁকা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন এক মানবদেহের নিচে তিনি লিখেছেন –
জেগে থাকার কথা যাদের
তারাই যদি ঘুমিয়ে থাকে
ঘুমের দেশের ঘুমের মানুষ
জাগবে বলো কার ডাকে?
২০১২ সালে তাঁর শ্রীলঙ্কা ভ্রমণকালে আঁকা ‘কলম্বো থেকে ভারত মহাসাগর’ চমৎকার পরিণত স্টাইলিক একটি কাজ। চিত্রপটের প্রায় মাঝ বরাবর সমুদ্রতটে এক নারকেল গাছ, পাশে দুটি ফিগার, এরপর সমুদ্রের উথালপাথাল জলরাশি। দূরে দূরে দৃশ্যমান জাহাজ। আকাশ আর সমুদ্রের একাকার মিশে যাওয়ার মধ্যেই জলের রংবদলকে অসাধারণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন।
এখান থেকে শুরু হলেও যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর শিল্পী মতলুব আলী পুরোপুরি বাস্তবানুগ স্টাইলিক চিত্রে ফেরেন। যেমন ২০১৬ সালে কালো বর্ণে আঁকা প্রকৃতিকেন্দ্রিক ছবি শিরোনামহীন, ২০১৮ সালে তাঁর আঁকা ‘নিউইয়র্কে বসন্ত’ ও ২০১৯ সালে আঁকা ‘ফ্লোরিডা ল্যান্ডস্কেপ’। এসব কাজ নতুন এক মতলুব আলীকে উপস্থাপন করে, যিনি সানন্দে ও স্বচ্ছন্দে, মুক্তমনে বর্ণ আর রেখা নিয়ে চিত্রপটে খেলছেন।
গভীর জীবনবোধ সম্পন্ন এই শিল্পী সারাজীবন অসংখ্য কবিতা, গান লিখেছেন, গেয়েছেন, প্রবন্ধ লিখেছেন, গবেষণা করেছেন, ছবি এঁকেছেন, শিক্ষকতা করেছেন। ২০২২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ তাঁকে জয়নুল পদকে ভূষিত করে। ১৯৮৫ সালে পেয়েছিলেন অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরস্কার। নানা সময়ে ঢাকা-রংপুরের কিছু সংগঠন তাঁকে সম্মাননা দিয়েছে। কিন্তু জাতীয়ভাবে তাঁকে আমরা সম্মানিত করতে পারিনি।
শিল্পী মতলুব আলী তাঁর জীবদ্দশায় দশটি একক চিত্র-প্রদর্শনী করেছেন। এই রেট্রোস্পেকটিভ তাঁর একাদশতম একক এবং তাঁর প্রতিভা ও বিপুল কর্মযজ্ঞ দর্শক ও সমঝদারদের সামনে মেলে ধরার অনন্য এক প্রয়াস ছিল। আমরা বিশ^াস করি, এখন না হলেও আগামীতে শিল্পী ও শিক্ষক মতলুব আলীর সামগ্রিক সৃজন ও অবদানকে যথাযথ মূল্যায়ন করবে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.