চার প্রজন্মে বিস্তৃত বর্তমান

ধানমন্ডি ২৭-এর বেঙ্গল শিল্পালয়ের দোতলায় কামরুল হাসান প্রদর্শনালয়ে ‘বিস্তৃত বর্তমান’ নামে চার প্রজন্মের পনেরোজন চারুশিল্পীর চিত্রকর্ম প্রদর্শনী শুরু হয় গত ১৩ই জুন। এতে তাঁদের ৪৬টি চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছে।

প্রদর্শনীতে হাশেম খান, রফিকুন নবী, আবদুস শাকুর শাহ, নাজলী লায়লা মনসুর, ফরিদা জামান, রণজিৎ দাস, মোহাম্মদ ইউনুস, জামাল আহমেদ, আহমেদ সামসুদ্দোহা, শিশির ভট্টাচার্য্য, কনক চাঁপা চাকমা, মোহাম্মদ ইকবাল, মাকসুদা ইকবাল নিপা, কামাল উদ্দিন ও সহিদ কাজীর চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছে। শেষোক্ত দুজন এই শতাব্দীর শূন্য দশকের উত্তরাধুনিক শিল্পী।

আয়োজকরা বলছেন, ষাটের দশকের পর থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত এই পনেরো জন শিল্পীর শিল্পযাত্রা ও অভিজ্ঞতার ভিন্নতাকে একই পরিসরে ধারণ করাই প্রদর্শনীর মূল ভাবনা। এটি কোনো ধারাবাহিক শৈলীর ইতিহাস নয়; বরং সময় কীভাবে শিল্পীর ক্যানভাসে থিতু হয়, তারই এক জীবন্ত অনুসন্ধান।

ষাট ও সত্তরের চিত্রকরদের কাজ, প্রকরণ ও ভাবনায় সহজ জীবন ও ঐতিহ্য সচেতনতার ঐক্য অনুভূত হলেও আশির দশকের শিল্পীদের কাজে উত্তরাধুনিকতার ছাপ, সেটি আরো প্রগাঢ় হয়েছে নব্বই ও শূন্য দশকের শিল্পীদের প্রকাশভঙ্গিতে। আমাদের চারুশিল্পের পঞ্চাশ বছরের একপ্রকার ধারাবাহিক বদলকে দর্শক ও বোদ্ধাদের প্রত্যক্ষ করার সুযোগ এই প্রদর্শনীতে থাকছে।

এখন এদেশের শিল্পীদের মধ্যে বর্ষীয়ান হাশেম খান ও রফিকুন নবী চারুকলা অনুষদের এমেরিটাস অধ্যাপক। তাঁরা নিয়মিত ছবি আঁকছেন, অনুজদের প্রেরণা জোগাচ্ছেন, জনপরিসরে সুরুচি নির্মাণ করে চলেছেন – এটি চিত্রশিল্পী ও শিল্পপ্রেমীদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের!

হাশেম খানের চারটি কাজের একটি ‘দলবদ্ধ কাক’। তাঁর বড় একটি ক্যানভাসে এক আক্রান্ত কাকের বাচ্চাকে বাঁচাতে নীলাভ আকাশ কালো করে একসঙ্গে নেমে আসছে অনেক কাক! রূপদর্শী শিল্পীর কুশলী অংকন, চিত্রের গঠন, বর্ণবিন্যাস আর উপস্থাপনার সম্পন্নতা দর্শক ও বোদ্ধাদের আকৃষ্ট করে। এ-বছরই আঁকা ‘ইলিশের ঘর মেঘনা’ নামের চিত্রে জালবদ্ধ হওয়ার পর একঝাঁক মৃত ইলিশের ছবি। তবে মৃত বলে ইলিশের সেই রুপালি ঝিলিক নেই! শিল্পীর আরেকটি চিত্রকর্ম ‘লাল সংগীত’ – এ-বছরের কাজ।

কাগজে অ্যাক্রিলিক রঙে আঁকা রফিকুন নবীর চারটি চিত্রকর্মের তিনটিতে তাঁর সৃজিত কার্টুন চরিত্র টোকাইয়ের ভিন্ন ভিন্ন কাজ ও সময়ের ছবি। আরেকটি কাজে দেখা গেল সারিবদ্ধ ছাগলের নানা ভঙ্গিমা নিয়ে তাঁর চিত্রগঠন। এগুলো ২০২৪ সালের কাজ। অসামান্য অংকনদক্ষতা আর চিত্রগঠনে সারল্য ও সহজিয়া মনোভঙ্গির সঙ্গে রসবোধ তাঁর চিত্রের প্রধান গুণ।

মৈমনসিংহ গীতিকার লোক গল্পগাঁথার চরিত্র কাজল রেখা, মহুয়া, মলুয়া, নদের চাঁদ, ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমি পাখি,

বাঘ-ব্যাধ এবং গল্পের অংশ সাজিয়ে শিল্পী আবদুস শাকুর শাহ তিন যুগ ধরে তাঁর চিত্রগঠন করে জলরং ও অ্যাক্রিলিক রঙে কাগজে কিংবা ক্যানভাসে আঁকেন। এ-প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া তাঁর তিনটি চিত্রকর্মও অনুরূপ লোকঐতিহ্যকে ধারণ করেছে। বড় কাজটি – কাজল রেখা, অন্য দুটির নাম গ্রামের গল্প; তিনটিই এ-বছরের কাজ।

নাজলী লায়লা মনসুর ধারাবাহিকভাবে কিউবিজমকে কেন্দ্রে রেখে আমাদের দেশের সামাজিক সমস্যা, পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা এসব বিষয়কে সামনে আনেন, এখানেও এনেছেন। তাঁর তিনটি কাজ ২০০৯, ২০১০ ও ২০১৩ সালে আঁকা। এর দুটির নাম – উদ্ভট উট।

ফরিদা জামানও তাঁর অগ্রজ শিল্পীদের মতো বাংলার গ্রামীণ জীবনের বিশেষ একটি গোত্র জেলে সমাজের বিষয় উত্থাপন করেন নিজের চিত্রপটে। জাল, জেলে, জলবিন্দু, মাছ, জেলের কিশোরী কন্যা, মাছ খেতে আসা বিড়াল – এসব তাঁর ছবির চরিত্র হয়ে ওঠে। তাঁর তিনটি কাজের নাম মাছ ধরার জাল, জলের গান ও আমার দেশ।

রণজিৎ দাসের চিত্রকর্মে সমসাময়িক জীবনধারার ছবি দেখা যায়। তিনি যেখানে সমকালের মানুষের জীবনধারার সঙ্গে প্রকৃতির সৌন্দর্যকেও তুলে আনেন। এ-প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া তাঁর তিনটি কাজের শিরোনাম – জীবনের গল্প।

সত্তর দশকের দুই শিল্পী মোহাম্মদ ইউনুস ও জামাল আহমেদ সমসাময়িক হলেও তাঁদের চিত্রকর্ম রচনার ধরন বিপরীতমুখী। ইউনুস প্রকাশবাদী বিমূর্তধারায় ছবি আঁকেন। এ-প্রদর্শনীতে তাঁর তিনটি কাজই অভিনব, প্রায় শাড়ির মতো লম্বা গড়নের ক্যানভাসে নানা বর্ণের আকর্ষণীয় রূপ ও রেখার সঙ্গে বিচিত্র টেক্সচারসমৃদ্ধ। তাঁর তিনটি চিত্রকর্মের নাম – গঠন।

অন্যদিকে ছবি আঁকায় জামাল বাস্তবানুগ। এ-প্রদর্শনীতে তাঁর কাজ – বুড়িগঙ্গা নদী, নৌযান, নদীতীরবর্তী  জনপদের ছবি। তিনটি কাজের শিরোনাম – বেদেনি, বুড়িগঙ্গা ও শাপলা।

সমাজের ভালোমন্দ লোকের বৈপরীত্য, শিল্পীমনের ভেতরের ফ্যান্টাসি আর সমকালীন সমাজের অসংগতি এইসব মিলে চিত্রপটে অগ্রসর হয় শিশির ভট্টাচার্য্যরে অংকননির্ভর মজাদার অথচ শিল্পীত প্রতিবাদী সাবলীল রেখা। ক্যানভাসে মিশ্রমাধ্যমে আঁকা শিশিরের ছোট-বড় তিনটি চিত্রকর্মের নাম – ছবি।

আহমেদ সামসুদ্দোহা বাস্তবানুগ ঘরানার শিল্পী হলেও তাঁর এখনকার কাজ রিয়ালিস্টিকের পরম উৎকর্ষতা প্রকাশ করছে। প্রদর্শনীতে তাঁর দুটি কাজ। দুটি ফুলের একটি বিশাল ক্যানভাসের পেইন্টিং ‘শিমুল’ দর্শকদের অভিভূত করে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী জীবন ও সংস্কৃতির ছবির শিল্পী কনক চাঁপা চাকমার চারটি চিত্রকর্ম স্থান নিয়েছে উল্লিখিত প্রদর্শনীতে। দীর্ঘ চর্চায় তাঁর দক্ষতায় নিজস্বতা যেমন ব্যাপ্ত হয়েছে, কাজও পরিশীলিত হয়েছে। পাহাড়ি পাঁচ নারীর পেছনফেরা অবয়বের সামনে রক্তলাল হওয়া সূর্যাস্তের ছবি শিরোনামহীন। অন্য দুটি চিত্রের নাম – বসন্তের শ্বাস ও শিল্পের সংগীত।

আশির দশকের শিল্পী মোহাম্মদ ইকবাল অবয়বধর্মী কাজ করেন। তিনি এখন আঁকছেন শান্তি আকাঙ্ক্ষার ছবি। অন্য দুটি কাজের শিরোনাম – পবিত্র বৃত্ত। দীর্ঘকাল পর তাঁর শিল্পীজীবনের শুরুর দিককার তেলরঙে আঁকা এক চিত্রকর্মে ঘর-সংসারহীন বোহেমীয় মানুষদের দেখে স্মৃতিতাড়িত হতে হলো।

মাকসুদা ইকবাল নীপা বর্ণের শুদ্ধতাকে ধারণ করেন। এই বিশ্বাস নিয়ে বড় ক্যানভাসজুড়ে অজস্র দাগ ও বিন্দু প্রয়োগ করে দৃষ্টিনন্দন চিত্র আঁকেন। বিংশ শতকের ফরাসি পয়েন্টালিজমকে তিনি ফিগর থেকে বের করে নিসর্গের বৈচিত্র্যে স্থাপন করেছেন। এক বর্ণের ভেতর থেকে অন্য বর্ণের উঁকির মাধুর্য সহজে পাওয়া যায় আধুনিক মনোভঙ্গির এসব চিত্রে। প্রদর্শনীতে শিল্পীর তিনটি চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে।

তরুণশিল্পী কামালউদ্দিন ‘বিশ্বব্যাপী বিপর্যয়’ শিরোনামে মিশ্র মাধ্যমে তিনটি প্রতীকী ছবি এঁকেছেন। এর দুটির একটিতে তৃতীয় বিশ্বের মানুষের শোষিত হয়ে বেঁচে থাকার প্রতীক এক বালিকার অবয়বের ওপরে চুপসে যাওয়া পৃথিবী-গোলক, অন্যটিতে বস্তা আকৃতির মানচিত্রে দেহের ঊর্ধ্বাংশ ঢাকা এক বালক, নিচে একটি কাক। শেষ ছবিতে উন্নত বিশ্বের প্রতীক এক সার্কাসের ভাঁড়ের পায়ের নিচে সেই চুপসানো পৃথিবী-গোলক। সমকালীন

বিশ্ব-বাস্তবতা ও অনাকাক্সিক্ষত যুদ্ধপরিস্থিতি এসবের বিরুদ্ধে শিল্পী বৃহত্তর পৃথিবীবাসীর পক্ষে তাঁর শিল্পীত প্রতিবাদ তুলে ধরেছেন।

আরেক তরুণ কাজী সহিদের তিনটি চিত্রকর্মই বাস্তবানুগ ডিটেইলিংয়ে সমৃদ্ধ। প্রথম দুটি কাজ টেক্সচার ভরপুর তেলরঙে আঁকা। একটি পথের ধারের শুকিয়ে যাওয়া ফুল ও শুঁটকি মাছ। শেষটি বড়-ছোট দুটি ক্যানভাসে শিল্পীর আত্মপ্রতিকৃতি নির্ভর কাজ হলেও শিরোনাম অভিনব – মুখোশাবৃত মৃত অবয়ব! এ যেন কবি তারাপদ রায়ের এক পৃষ্ঠার উপন্যাসের একমাত্র চরিত্র সেই ‘তারাপদ’র  মতো! এই চিত্রটি আঁঠাবিহীন পিগমেন্ট দিয়ে আঁকা।প্রবীণ-নবীন শিল্পীদের কাজের সংযোগসূত্র স্থাপনাকারী প্রদর্শনীটি সমাপ্ত হয় গত ৪ঠা জুলাই।