অনুবাদ : আলম খোরশেদ
চতুর্থ কিস্তি
আমাদের সান্নিধ্যে তার চোখগুলো জীবন্ত ও আনন্দময় থাকত, সেটা যদি তার কোনো প্রচণ্ড ক্রোধের মুহূর্তে রুদ্ধ ও দুষ্প্রবেশ্য হয়ে না পড়ত। সে ছিল সাংঘাতিক রকম নাটকীয় এবং গোটা পরিবারটাকেই শাসন করতে পারত তার মেজাজ দিয়ে, সে তার খেলনাগুলোর সঙ্গে বড় আকারের ও জটিল সব সম্পর্কের নাটক সাজাত, তাকে গল্প পড়ে শোনানোটা পছন্দ করত, আরো বেশি চাইত ছবি দেখতে, এমনসব নাটকীয় গল্প ও চরিত্রসমেত, যা নিয়ে সে আমাদের প্রশ্ন করত, আলাপ করত প্রশ্নের ঝাঁপি খুলে দিয়ে, পাশাপাশি, পুনর্ব্যক্ত করার আনন্দ নিয়েও। একটা সময়ের জন্য সে আস্ত্রিদ লিন্দগ্রেনের মাদিক্কেন চরিত্রটার ব্যাপারে পাগল ছিল, এটা তাকে চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে চোখ বন্ধ করে মেঝেতে শুয়ে পড়তে প্ররোচিত করত, আমাদের তাকে কোলে তুলে নিতে হতো এবং ভাবতে হতো সে মৃত কি না, পরে বুঝতাম সে আসলে বেহুঁশ হয়ে পড়েছিল এবং তার দাঁতকপাটি লেগে গেছে, তাকে বহন করে, চোখ বন্ধ ও হাত ঝুলে থাকা অবস্থায়, তার বিছানায় নিয়ে যেতে হতো, যেখানে সে তিনদিন ধরে পড়ে থাকত, আর আমরা পছন্দমতো এই চলচ্চিত্রের সেই দুঃখের দৃশ্যের সুরটা তার কানে গুনগুন করতাম। তারপর সে উঠে দাঁড়িয়ে, চেয়ারে দৌড়ে গিয়ে আবারও একই জিনিস শুরু করত নতুন করে। নার্সারির ক্রিসমাস পার্টিতে সে-ই একমাত্র তার প্রতি উচ্চারিত প্রশংসাধ্বনির উত্তরে মাথা নত করে অভিবাদন জানিয়েছে, যে কি না তার প্রতি সেই মনোযোগটুকু দৃশ্যতই উপভোগ করছিল। প্রায়শ কোনো একটা কিছুর ভাবনাটা, খোদ সেই জিনিসটার চেয়ে, তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যেমন মিষ্টি ব্যাপারটা; সে তাদের বিষয়ে গোটা একটা দিন কথা বলতে পারত এবং তার জন্য অপেক্ষা করে থাকতে পারত, কিন্তু তার সামনে যখন পাত্র ভরে মিষ্টি দেওয়া হতো, সে একটা মুখে ছুঁইয়েই থুথু করে ফেলে দিত। তবুও সে তার অভিজ্ঞতা থেকে কিছুই শেখেনি: পরবর্তী শনিবারে আবারো তার মিষ্টির প্রতীক্ষা শিখর ছোঁয়। সে এমন করে চাইছিল স্কেটিং করতে যেতে, কিন্তু আমরা যখন রিংকে পৌঁছাই, লিন্দার কেনা ছোট স্কেট তার পায়ে বাঁধা এবং মাথায় ছোট আইস হকির হেলমেটটি, সে রাগে চিৎকার করে ওঠে, যখন সে আর ভারসাম্য রাখতে পারছিল না এবং বুঝতে পারছিল সেটা সে খুব দ্রুত আয়ত্তও করতে পারবে না। তার আনন্দ বরং অধিক ছিল যখন সে দেখতে পারে সে স্কি করতে জানে, যেটার প্রমাণ আমরা পাই যখন আমরা আমার মায়ের বাগানে তার কিছু যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করতে গিয়ে ছোট্ট বরফের স্তূপে পা রাখি। কিন্তু তাতেও স্কি করতে পারা এবং স্কি করার আনন্দের ভাবনাটাই তার কাছে বড় ছিল আদতে স্কি করার চাইতে; সে ওটা ছাড়াই খুব সানন্দে চলতে পারত। সে ভ্রমণ করতে পছন্দ করত, আমাদের সঙ্গে নতুন নতুন জায়গায় যেতে এবং সেখানে যা যা ঘটেছে তা নিয়ে এরপর মাসের পর মাস কথা বলতে পছন্দ করত। তবে সবচেয়ে বেশি সে অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে খেলতে ভালোবাসত, অবশ্যই। এটা তার জন্য দারুণ এক অভিজ্ঞতা ছিল যখন নার্সারির অন্য বাচ্চারা আমাদের বাড়িতে আসত। প্রথম যেদিন বেনইয়ামিনের আসার কথা ছিল, তার আগের দিন সন্ধ্যায় সে তার খেলনাগুলো পরীক্ষা করে দেখছিল এবং দুশ্চিন্তায় ঋজু হয়ে যাচ্ছিল এটা ভেবে যে, সেগুলো তার উপযুক্ত নয়। তার তখন বয়স মাত্র তিন। কিন্তু সে যখন আসে তখন তারা এতটাই মিশে যায় যে মনে হয় ঘরে আগুন লেগেছে, এবং তার পূর্ব দুর্ভাবনাগুলো মুহূর্তে উবে যায় উত্তেজনা ও উল্লাসের ঘূর্ণিপাকে। বেনইয়ামিন তার অভিভাবকদের বলে যে, ভানইয়া হচ্ছে নার্সারির সবচেয়ে ভালো মেয়ে, এবং আমি যখন তাকে সেটা বলি – সে বিছানায় বসে তার বার্বিদের নিয়ে খেলছিল – সে এমন এক আবেগসহকারে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে যা এর আগে কখনো করেনি।
‘তুমি জানো বেনইয়ামিন কী বলেছে?’ আমি দরজার সামনে থেকে বলি।
‘না’, সে বলে, আমার দিকে তাকিয়ে আকস্মিক এক আগ্রহ নিয়ে।
‘সে বলেছে তুমি নার্সারির সবচেয়ে ভালো মেয়ে।’
আমি তাকে এমন আলোতে উজ্জ্বল হয়ে উঠতে কখনো দেখিনি আগে। সে খুশিতে জ্বলজ্বল করছিল। আমি জানি লিন্দা কিংবা আমি কখনোই তাকে এমন কিছু বলতে পারব না, যাতে সে এমনভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়, এবং আমি এমন এক অন্তর্দৃষ্টির তাৎক্ষণিক স্বচ্ছতা নিয়ে উপলব্ধি করি যে, সে আমাদের নয়। তার জীবন, পুরোপুরিই তার।
‘সে কী বলেছে?’ সে উত্তর দেয়, আবারো তা শুনতে চেয়ে।
‘সে বলেছে তুমি নার্সারির সবচেয়ে ভালো মেয়ে।’
তার হাসিটা লাজুক, কিন্তু সুখী ছিল, এবং সেটা আমাকেও খুশি করে, তারপরও একটা ছায়া ঝুলে থাকে আমার সুখের ওপর, কেননা এটা কি আশঙ্কাজনকরকম অসময় নয়, অন্যের ভাবনা ও অভিমত তার কাছে এতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হওয়ার জন্য? আরো একবার সে এটার মতোই আমাকে চমকে দিয়েছিল আমি নার্সারিতে যাওয়ার পর। আমি তাকে তুলতে গিয়েছিলাম এবং সে আমার দিকে করিডোরে দৌড়ে আসে এবং জিজ্ঞেস করে, এরপর স্তেলা তার সঙ্গে ঘোড়ার আস্তাবলে যেতে পারবে কি না। আমি বলি, জিনিসগুলো এভাবে হয় না, এগুলো অনেক আগে থেকেই পরিকল্পনা করে রাখতে হয়, তার বাবা-মায়ের সঙ্গে আমার কথা বলতে হবে প্রথম। ভানইয়া দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাকে এগুলো বলতে শোনে, বলা বাহুল্য হতাশ হয়ে; কিন্তু সে যখন খবরটা স্তেলাকে দিতে যায় তখন সে আমার দেওয়া কারণগুলো দেখায় না। আমি তাকে শুনতে পাই, যেহেতু আমি হলের মধ্যে তার বৃষ্টির পোশাক গুছিয়ে নিচ্ছিলাম।
‘তোমার জন্য এটা একটু একঘেয়ে হবে আস্তাবলে’, সে বলে। ‘কেবল চেয়ে চেয়ে দেখাটা তেমন মজার নয়।’
এই ধরনের চিন্তা, অন্যের ভাবনাকে নিজেরগুলোর আগে স্থান দেওয়া, আমি আমার মধ্যেও লক্ষ করি, এবং আমরা যখন পাবলিক পার্কের দিকে হেঁটে যাই বৃষ্টির মধ্যে, আমি ভাবি সে কীভাবে তা আয়ত্ত করল। এটা কি সেখানেই ছিল, তার মধ্যে, অদৃশ্য কিন্তু বর্তমান, যেমনটি সে তার বাতাসকে শুষে নেয়? নাকি তা বংশাণুক্রমিক?
আমি বাচ্চাদের সম্পর্কে আমার এসব ভাবনা কখনোই প্রকাশ করিনি, লিন্দা ছাড়া অবশ্যই, কেননা এই প্রশ্নগুলো যেখানে থাকার কথা সেখানেই অস্তিত্বমান, আমার মধ্যে এবং আমাদের মাঝখানে। বাস্তবে, ভানইয়া যে-পৃথিবীতে বাস করত সেখানে সবকিছুই সহজ ছিল এবং সহজ অভিব্যক্তির ছিল, জটিলতা তৈরি হয় যখন সব অংশ একত্রিত হয়, যে-বিষয়ে স্বাভাবিকভাবেই সে কিছু জানত না। এবং আমরা যে তাদের নিয়ে এত কথা বলি, সেটা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে কোনো সাহায্য করে না, যেখানে সবকিছুই ছিল অগোছালো এবং প্রায় নৈরাজ্যের প্রান্তে। নার্সারির কর্মচারীদের সঙ্গে আমরা যে প্রথম সুইডিশ ভাষার ‘উন্নতির সংলাপ’ করি সেখানে অনেক কথা ছিল তার শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ না-করা বিষয়ে, তার কোলে না-বসা, পিঠে চাপড় পাওয়া এবং তার লাজুকতা নিয়ে। আমাদের উচিত তাকে আরেকটু শক্তপোক্ত করে তোলা, খেলাধুলায় আরো কর্তৃত্বকর ভূমিকা রাখতে শেখানো, নিজ থেকে উদ্যোগ নেওয়া এবং আরেকটু বেশি কথা বলানো, তারা বলে। লিন্দা জবাব দেয় যে, বাড়িতে সে যথেষ্ট শক্ত, সব খেলায় অগ্রণী ভূমিকা নেয়, সবসময় উদ্যোগী এবং একনাগাড়ে কথা বলতে ওস্তাদ। তারা আমাদের বলে যে, নার্সারিতে সে সামান্য যেটুকু কথা বলে তা অস্পষ্ট, তার সুইডিশ ঠিকঠাক নয়, শব্দভাণ্ডারও তেমন বড় নয়, তাই তারা জানতে উৎসুক আমরা তার জন্য বাচিক চিকিৎসার কথা ভাবছি কি না। আমাদের আলাপের এই সন্ধিক্ষণে তারা আমাদের হাতে শহরের একজন বাচিক পরামর্শকের তথ্যপুস্তিকা তুলে দেয়। তারা সবাই পাগল এদেশে, আমি ভাবি। একজন কথা-বলার ডাক্তার! সবকিছুকেই কি প্রাতিষ্ঠানিক করে তুলতে হবে? তার বয়স মাত্র তিন!
‘না, বাচিক চিকিৎসকের কোনো প্রশ্নই ওঠে না’, আমি বলি। ততক্ষণ পর্যন্ত লিন্দাই সব কথাবার্তা বলছিল। ‘এটা এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে। আমি কথা বলতে শুরু করি যখন আমার বয়স তিন। এর আগে আমি কোনো কথাই বলিনি, এক শব্দের দু-একটি বাক্য ছাড়া, যেগুলো আমার ভাই ছাড়া আর সবার কাছেই দুর্বোধ্য ছিল।’
তারা হাসে।
‘কিন্তু যখন আমি বলতে শুরু করি, তখন লম্বা ও মসৃণ সব বাক্যেই কথা বলতাম। এর সবটাই নির্ভর করে ব্যক্তির ওপর। আমরা তাকে কোনো কথা বলানোর ডাক্তারের কাছে পাঠাচ্ছি না।’
‘সেটা আপনাদের ওপর নির্ভর করে’, ওলাফ বলে, নার্সারির প্রধান যে। ‘তবে আপনারা পুস্তিকাটা রাখতে পারেন এবং এটা নিয়ে একটু চিন্তাভাবনাও করতে পারেন।’
‘ঠিক আছে তাহলে’, আমি বলি।
আমি যখন অন্য লোকদের সঙ্গে থাকি তখন আমি তাদের সঙ্গে বাঁধা থাকি, যে-নৈকট্য আমি অনুভব করি তা প্রবল, সহানুভূতি অসীম। বস্তুত তখন তাদের কল্যাণ আমার মঙ্গলের চেয়ে বেশি হয়ে দাঁড়ায়। আমি নিজেকে অধস্তন করে ফেলি, অনেকটা আমার আত্ম-অবলোপনের কাছাকাছি, কোনো এক নিয়ন্ত্রণ-অযোগ্য আভ্যন্তর প্রক্রিয়া তাদের চিন্তা ও অভিমতকে আমার চেয়ে অগ্রে স্থাপন করে। কিন্তু যেই মুহূর্তে আমি একা হয়ে যাই, তখন অন্যরা কোনো অর্থ বহন করে না আমার কাছে। এটা এমন নয় যে, আমি তাদের অপছন্দ করি, অথবা তাদের প্রতি কোনো বিদ্বেষ পোষণ করতাম, বরং তার উল্টো, আমি তাদের অধিকাংশকেই পছন্দ করতাম, এবং যাদেরকে আসলে পছন্দ করতাম না তাদের মধ্যেও কোনো না কোনো মূল্য দেখতে পেতাম, কোনো বৈশিষ্ট্য, যার সঙ্গে আমি একাত্মতা অনুভব করি, অথবা অন্তত আর্কষণীয় মনে করি, কিছু একটা যা এ মুহূর্তের জন্য আমার চিন্তাকে অধিকার করতে পারে। কিন্তু তাদের পছন্দ করা আর তাদের জন্য দরদ অনুভব করা এক কথা নয়। এটা একটা সামাজিক পরিস্থিতি যা আমাকে তাদের সঙ্গে যুক্ত রাখে, তাদের ভেতরের মানুষেরা নয়। এই দুই পরিপ্রেক্ষিতের মাঝখানে কোনো মধ্যবর্তী ঠিকানা নেই। সেখানে কেবল ক্ষুদ্র আত্ম-অবলোপন এবং বৃহৎ দূরত্ব-সৃষ্টিকারী অবস্থানের অস্তিত্ব রয়েছে। এবং এই দুয়ের মাঝখানে আমার প্রাত্যহিক জীবনের বাস্তবতা। সম্ভবত এ-কারণেই আমার জন্য তা যাপন করাটা এত কঠিন। প্রতিদিনের জীবন, তার রুটিন ও দায়িত্বসমেত, এমন একটা কিছু যাকে আমি সহ্য করি, এমন কিছু নয় যা আমি উপভোগ করি, বা যা অর্থবহ এবং আমার জন্যে সুখকর কিছু। এর সঙ্গে মেঝে ধোয়া কিংবা ডায়াপার পরিবর্তনের অনিচ্ছার কোনো সম্পর্ক নেই, বরং আছে আরো গভীরতর কিছুর : আমার চারপাশের জীবনের কোনো অর্থ ছিল না। আমি সবসময়ই তার থেকে দূরে থাকতে চাইতাম, এবং বরাবর তা-ই করেছি। ফলে যে-জীবন আমি যাপন করেছি তা আমার ছিল না। আমি তাকে আমার নিজের করার চেষ্টা করেছি, এটা আমার যুদ্ধ ছিল, কেননা অবশ্যই আমি সেটা চেয়েছি, কিন্তু আমি ব্যর্থ হয়েছি, অন্যকিছুর জন্য আকাক্সক্ষা আমার সব চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়েছে।
সমস্যাটা তাহলে কী ছিল?
এটা কি সর্বত্র আমি যে অসুস্থ চিৎকৃত শব্দ শুনি, যা আমি সহ্য করতে পারি না, যা সব ছদ্মমানুষ, ছদ্মজায়গা, ছদ্মঘটনা ও ছদ্মসংঘাত থেকে উত্থিত হয়, যার ভেতর দিয়ে আমাদের জীবন প্রবাহিত, যা আমরা দেখি কিন্তু অংশগ্রহণ করি না, এবং যে দূরত্ব এই আধুনিক জীবন আমাদের জীবনের, কার্যত অবিচ্ছেদ্য স্থান ও বর্তমানের মধ্যে তৈরি করে দিয়েছে? যদি তা-ই হয়ে থাকে, যদি আমি আসলে আরো বাস্তব ও আরো সংযুক্তির আকাক্সক্ষা করি, তাহলে আমাকে নিশ্চয়ই এই পরিপার্শ্বকে আলিঙ্গন করতেই হবে? এবং, যা আসলে সত্য, এ থেকে পালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা নয়? অথবা হয়তোবা এটা এই পৃথিবীর পূর্বনির্মিত দিনের বাস্তবতা, আমি যার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছি, যে রুটিনের রেখাকে আমরা অনুসরণ করি, যা সবকিছুকে এত অনুমেয় করে তোলে যে, আমাদের বিনোদনের জন্য কিছু বিনিয়োগ করতে হয়, যাতে করে তার মধ্যে কিছু তীব্রতা সঞ্চারিত হয়? প্রতিবার আমি দরজা দিয়ে বেরুনো মাত্রই আমি জানি আমি কী করতে যাচ্ছি, কী ঘটতে যাচ্ছে। ক্ষুদ্র পর্যায়ে ব্যাপারটা এমনই ছিল, আমি সুপারমার্কেটে যাই এবং বাজার করি, আমি একটা ক্যাফেতে গিয়ে পত্রিকা নিয়ে বসি, আমি নার্সারি থেকে আমার বাচ্চাদের আনি, আর বৃহৎ পর্যায়ে এমন ঘটে, সমাজে প্রথম প্রবেশের পর থেকে নার্সারি থেকে শেষ প্রস্থান বৃদ্ধাবাস অভিমুখে। অথবা এই বিকর্ষণ আমি অনুভব করি তার ভিত্তি এরই সমরূপ, যা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে এবং সবকিছুকে ক্ষুদ্র করে তুলছে? আপনি যদি এখন নরওয়ে ভ্রমণ করেন আপনি সর্বত্র একই জিনিস দেখবেন। একই রাস্তা, একই বাড়ি, একই পেট্রোল পাম্প, একই দোকান। এই ষাটের দশকেও আপনি যখন, ধরুন, গুদব্রান্দসদালেন ধরে গাড়ি চালিয়ে যেতেন, তখন দেখতে পেতেন স্থানীয় সংস্কৃতি কীরকম বদলে যাচ্ছে; উদাহরণত, অদ্ভুত কালো কাঠের বাড়ি, এমন বিশুদ্ধ ও প্রসন্ন, যেগুলোকে এখন ছোট্ট জাদুঘরের রূপ দেওয়া হয়েছে, এমন এক সংস্কৃতিতে যা আপনি ছেড়ে এসেছেন বা যেখানে আপনি যাচ্ছেন তা থেকে কোনোরকম আলাদা নয়। এবং ইউরোপ, যা এখন ক্রমেই একটি বৃহৎ, সমসত্ত্ব দেশে পরিবর্তিত হচ্ছে। সব এক, সব এক, সর্বত্র সব একইরকম। অথবা এমনকি হতে পারে, যে-আলো এই পৃথিবীকে আলোকিত করে অথবা সবকিছুকে দৃশ্যমান করে তোলে, সে-ও তার অর্থ হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে? নাকি হয়তোবা যে অরণ্যরা অদৃশ্য হয়ে গেছে, যে প্রাণীর প্রজাতিরা বিলুপ্ত হয়ে গেছে, যে জীবনধারা আর কোনোদিন ফিরবে না, তার জন্য এমন হয়েছে?
হ্যাঁ, এইসব নিয়েই আমি ভেবেছি, এই সবকিছুই আমাকে বিষাদে পরিপূর্ণ করে তোলে এবং একধরনের অসহায়তায়, এবং সেখানে যদি এমন কোনো পৃথিবী থাকে যেখানে আমি মনে মনে প্রত্যাবর্তন করি, সেটা ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীর; তার বিশাল অরণ্য, তার পালতোলা জাহাজ, ঘোড়ায় টানা গাড়ি, তার বায়ুকল, দুর্গ, আশ্রম, ছোট শহর, তার শিল্পী ও চিন্তক, অভিযাত্রী ও আবিষ্কারক, পাদ্রি ও রসায়নবিদেরা। ব্যাপারটা কেমন হতো যদি আপনি এমন এক পৃথিবীতে বাস করতেন যেখানে সবই আপনার হাতে, বাতাস কিংবা পানির শক্তিতে তৈরি হতো? সে-পৃথিবীটা কেমন হতো যেখানে আমেরিকান ইন্ডিয়ানরা তখনো শান্তিতে বসবাস করত? যেখানে
সে-জীবন সত্যি এক সম্ভাব্যতা? যেখানে আফ্রিকাকে তখনো জয় করা হয়নি? যেখানে সূর্যাস্তের সঙ্গে অন্ধকার আসে আর সূর্যোদয়ের সঙ্গে আলো? যেখানে মানুষের সংখ্যা খুব কম এবং তাদের অস্ত্রেরা খুবই প্রাথমিক যা প্রাণীদের জন্য ক্ষতিকারক নয়, তাকে ধ্বংস করার তো প্রশ্নই ওঠে না? যেখানে আপনি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে পারবেন না নিজেকে কষ্ট না দিয়ে, এবং একটি আরামদায়ক জীবন কেবল ধনীদের করায়ত্ত, যেখানে সমুদ্র তিমিতে পূর্ণ, অরণ্য ভালুক ও নেকড়েতে, এবং অনেক দেশ রয়ে গেছে তখনো যার প্রতি কোনো অভিযানের গল্পই সুবিচার করতে পারবে না, যেমন ধরুন চিনদেশ, যেখানে যেতে কয়েক মাসই শুধু লাগত না, এবং যার অধিকার ছিল কেবল গুটিকয় বণিক ও নাবিকের এবং তা-ও পরিপূর্ণ ছিল বিপদের আশংকায়। স্বীকৃতভাবেই পৃথিবী ছিল কঠিন ও ভাগ্যাহত, নোংরা ও অসুখে আকীর্ণ, মদ্যপ ও অশিক্ষিত, যন্ত্রণায় ভরা, অল্পায়ু, বিপুল কুসংস্কারাচ্ছন্ন, কিন্তু তা জন্ম দেয় সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক শেকসপিয়র, সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পী রেমব্রান্ট, সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী নিউটন, যারা এখনো তাঁদের নিজেদের ক্ষেত্রে অনতিক্রান্ত, এটা কী করে সম্ভব যে, এই সময়টাতে এমন সম্পদ অর্জিত হয়েছিল? এটা কি এ-কারণে যে, মৃত্যু নিকটবর্তী ছিল এবং সে-কারণে জীবন ছিল কঠিন?
কে জানে?
তা সেটা যা-ই হোক, আমরা তো সময়ের বিপরীতে যেতে পারি না, যা আমরা গ্রহণ করি তা অ-ফেরতযোগ্য, এবং আমরা যদি পেছনে তাকাই যা দেখি সেটা জীবন নয়, মৃত্যু। এবং যে-ই বিশ্বাস করে যে শর্ত ও সময়ের বৈশিষ্ট্য আমাদের এই খাপ খাইয়ে নেওয়ার অক্ষমতার জন্য দায়ী, তারা হয় বড়ত্বের মোহে ভুগছে অথবা স্রেফ নির্বোধ এবং উভয় বিষয়েই নিজের সম্পর্কে ধারণাহীন। আমি যেকালে বাস করি সেটাকে এতটাই ঘৃণা করি, কিন্তু সেটাই তো কারণ নয় তার অর্থ হারিয়ে ফেলার পেছনে, এটা তো কখনোই ধ্রুব ছিল না …। যে-বসন্তে আমি স্টকহোমে বদলি হই এবং লিন্দার সঙ্গে পরিচয় হয়, দৃষ্টান্তস্বরূপ, পৃথিবীটা হঠাৎ করে খুলে যায়, এর তীব্রতাটুকু অকল্পনীয় গতিতে বৃদ্ধি পায়। আমি প্রেমে হাবুডুবু খাই এবং তখন সবকিছুই সম্ভব ছিল, আমার সুখ তখন সর্বদাই ফেটে বেরুচ্ছিল এবং তা সবকিছুকেই আলিঙ্গন করছিল। তখন যদি কেউ আমাকে বলত, কোনোকিছুর অর্থ নেই, তাহলে আমি সজোরে হেসে উঠতাম, কেননা আমি তখন স্বাধীন ছিলাম এবং পৃথিবীটা আমার পায়ের কাছে গড়াগড়ি খাচ্ছিল, খোলা, অর্থে ঠাসা, আমার ফ্ল্যাটের নিচের সøাসেন লকটি পারাপার করা যে ভবিষ্যৎবাদী ট্রেনগুলো চকচক করছিল তা থেকে শুরু করে যে সূর্যটা ঊনবিংশ শতাব্দীর ধরনের গির্জার গম্বুজগুলোকে রঙিন করে তুলছিল, রিদ্দেরহলমেন লালে, অশুভ রকম সুন্দর যে সূর্যাস্তসমূহ আমি দেখছিলাম সেই মাসগুলোর প্রতিটি সন্ধ্যায় সদ্য তোলা বেসিলের সুঘ্রাণ থেকে, পাকা টমেটোর গন্ধ থেকে, পাথুরে ঢালু রাস্তায় জুতোর ঠকঠক শব্দে হিলটন হোটেলে যাওয়ার সময় কোনো এক গভীর রাতে যখন আমরা একটা বেঞ্চে বসে হাতে হাত ধরে রেখেছিলাম এটা জেনে যে, আমরা দুজন এখন ও চিরকাল থাকব। এই অবস্থাটা ছয়মাস স্থায়ী হয় এবং এই ছয়মাস আমি সত্যিকারভাবে সুখী ছিলাম, এই পৃথিবীতে এবং নিজের মধ্যে সত্যিকার স্বচ্ছন্দ, ধীরে ধীরে সে তার ঔজ্জ্বল্য হারানোর আগপর্যন্ত এবং তারপর আরো একবার আমার হাত গলে পৃথিবীটা হারিয়ে যায়। একবছর পর সেটা আবারোা ঘটে, তবে খুবই আলাদা পদ্ধতিতে। সেটা যখন ভানইয়ার জন্ম হয়। তখন তো সেই পৃথিবী নয় – আমরা সেটাকে বন্ধ করে রেখেছিলাম, আমাদের মাঝখানে ঘটতে থাকা অলৌকিকতার ওপর পুরোপুরি অভিনিবেশ করার জন্য – আমার নিজের ভেতরেই কিছু একটা খুলে গিয়েছিল। যখন প্রেমে পড়াটা ছিল উদ্দাম ও অফুরন্ত, জীবন ও উল্লাসে পরিপূর্ণ, সেটা ছিল সাবধানী ও নীরব, যা ঘটছিল তার প্রতি অসীম মনোযোগে পূর্ণ। এটা টিকেছিল চার, কিংবা পাঁচ সপ্তাহ। যখন শহরে আমাকে কিছু কেনাকাটা করতে হতো আমি রাস্তায় দৌড়াতাম, যা দরকার তা তুলে নিতাম, কাউন্টারে অধৈর্য হয়ে গজগজ করতাম, এবং আমার হাত থেকে ঝুলন্ত ব্যাগগুলো নিয়ে দৌড়ে বাড়ি ফিরতাম। আমি একটা মিনিটও হারাতে চাইতাম না! রাত ও দিনগুলো একটাতে মিশে যায়, সবই ছিল কোমলতাময়, সবই ছিল সৌজন্যময়, এবং সে চোখ খুলে তাকালে আমরা তার দিকে দৌড়ে যেতাম। আহ, এই তো তুমি! তবে সেটাও অতিক্রান্ত হয়, আমরা তাতেও অভ্যস্ত হয়ে উঠি, এবং আমি কাজ করতে শুরু করি, আমার দালাগাতানের নতুন অফিসে বসি এবং লিখতে থাকি আর লিন্দা বাড়িতে ভানইয়ার সঙ্গে, লাঞ্চের সময় আমাকে দেখতে আসত, প্রায়ই কোনোকিছু নিয়ে উদ্বিগ্ন কিন্তু সুখী, সে বাচ্চার সঙ্গে, ও যা ঘটছিল তার প্রতি, ঘনিষ্ঠ ছিল আমার চেয়ে বেশি, কেননা আমি তখন লিখছিলাম, যেটা শুরু হয়েছিল একটা দীর্ঘ প্রবন্ধাকারে সেটা ধীরে কিন্তু নিশ্চিতভাবেই একটা উপন্যাসের রূপ নিতে থাকে, দ্রুতই সেটা এমন এক জায়গায় পৌঁছে যায় যখন সেটাই সবকিছু ছিল, এবং লেখাই একমাত্র কাজ যা আমি করছিলাম, আমি অফিসেই চলে যাই, রাতদিন লিখতাম, এখানে-ওখানে এক ঘণ্টা করে ঘুমাতাম। আমি একটা অনন্য অনুভূতিতে পূর্ণ ছিলাম, আমার ভেতরে একধরনের আলো জ¦লছিল, গরম ও আগ্রাসী নয়, ঠান্ডা, স্বচ্ছ ও উজ্জ্বল। রাতের বেলায় এক কাপ কফি নিয়ে হাসপাতালের বাইরে বসে বসে সিগারেট খেতাম, আমার চারপাশের রাস্তাগুলো সুনসান, এবং কিছুতেই স্থির হয়ে বসে থাকতে পারতাম না, এতটাই তীব্র ছিল আমার আনন্দের বোধ। সবই সম্ভব ছিল, সবকিছুরই অর্থ ছিল। উপন্যাসের দুটো জায়গায় আমি আমার কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি উচ্চতায় উঠে যাই, এবং সেই দুটো জায়গা একাই, যা আমি বিশ^াস করতে পারছিলাম না আমি নিজে লিখেছি বলে, এবং আর কেউ সেটা লক্ষ করে না এবং কিছু বলেওনি, আমার পূর্ববর্তী পাঁচ বছরের ব্যর্থ লেখালেখিকে একধরনের বৈধতা প্রদান করে। সেগুলো আমার জীবনের দুটো সেরা মুহূর্ত। এর দ্বারা আমি আমার গোটা জীবনের কথাই বলি। যে-সুখ আমাকে পূর্ণ করেছিল এবং
যে-অজেয়তার অনুভূতি দিয়েছিল তারা আমাকে, তা এরপর আমি অনেক সন্ধান করেছি বৃথাই।
উপন্যাসটা শেষ হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পরে গৃহস্বামী হিসেবে জীবন শুরু হয় আবার এবং পরিকল্পনা ছিল সেটা পরের বসন্ত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে, আর এর মধ্যে দ্রামাতিস্কা ইনস্টিটিউটে লিন্দা তার শেষ বছরের প্রশিক্ষণ শেষ করবে। উপন্যাস লেখা ও কাজটা আমাদের সম্পর্কের ওপর মাশুল তুলেছে। ছয় সপ্তাহ আমি অফিসে ঘুমিয়েছি, লিন্দা ও আমাদের পাঁচ মাস বয়সী মেয়েটাকে খুব কমই দেখেছি, এবং সেটা যখন একপর্যায়ে শেষ হয় তখন সে ভারমুক্ত ও সুখী বোধ করে, এবং আমি তার সঙ্গে থাকাটাকে দায়িত্ব মনে করি, স্রেফ একটি ঘরে থাকা নয়, দৈহিকভাবে, উপরন্তু আমার সবটুকু মনোযোগ ও অংশগ্রহণসমেত। আমি সেটা করতে পারিনি। বেশ কয়েকমাস আমি যেখানে থাকতে চাই সেখানে থাকতে না পারার জন্য, শীতল স্বচ্ছ পরিবেশে, এবং আমার ফেরার আকুতি, আমরা যে-জীবন যাপন করেছি তার আনন্দের চেয়ে শক্তিশালী ছিল, বেদনা বোধ করেছি। উপন্যাসটা যে ভালো হয়েছে সেটা কোনো বিষয় ছিল না। প্রতিটি ভালো আলোচনার জন্য আমি বইয়ে একটা ঢ্যাঁড়াচিহ্ন দিই এবং এর পরেরটার জন্য অপেক্ষা করি, প্রকাশকের দপ্তরে এজেন্টের সঙ্গে আমার প্রতিটি আলোচনার পর, যখন কোনো বিদেশি কোম্পানি আগ্রহ দেখায় কিংবা কোনো প্রস্তাব করে, আমি বইয়ে একটা ক্রস দিই এবং পরেরটার জন্য অপেক্ষা করি। সেটা যখন একপর্যায়ে নোরকি কাউন্সিল সাহিত্য পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয় তখনো আমি খুব বেশি উত্তেজিত বোধ করিনি, কেননা গত ছয়মাসে আমি একটা জিনিস শিখেছি এবং সেটা হলো, সব লেখাই আসলে লেখাটার বিষয়েই। সেখানেই তার সব মূল্য নিহিত। তারপরও এটা প্রকাশের পর যা ঘটে আমি আরো বেশি করে তা প্রত্যাশা করি, কেননা জনগণের মনোযোগ একধরনের নেশার মতো, যে-প্রয়োজনটা সেটা মেটায় তা কৃত্রিম, কিন্তু একবার তার স্বাদ পেলে আপনি তা আরো বেশি করে চাইতে থাকেন। আর তাই আমি, স্টকহোমের দুরগার্ডেন দ্বীপে আমার অসংখ্য পথপরিক্রমায় স্ট্রলার ঠেলছি, আর ফোন বাজার জন্য অপেক্ষা করছি যখন একজন সাংবাদিক আমাকে কিছু একটা জিজ্ঞেস করবেন, কোনো অনুষ্ঠানের সংগঠক আমাকে কোথাও যেতে আমন্ত্রণ জানাবেন, একটা ম্যাগাজিন কোনো লেখা চাইবে, একজন প্রকাশক কোনো প্রস্তাব দেবেন, যতক্ষণ না এটা যে অনাকাক্সিক্ষত বিস্বাদ রেখে যায় মুখে, তা অনুধাবন করে তার পরিণামে একইসঙ্গে সবকিছুতেই না বলতে শুরু করি এবং আগ্রহ কমে যাওয়ার পর প্রতিদিনের নিগ্রহের কাছেই ফিরে আসি। তবে যতই আমি চেষ্টা করি না কেন, আমি তাতে পুরোপুরি প্রবেশ করতে পারি না, সবসময় সেখানে এমন কিছু থাকত যা আরো বেশি জরুরি। ভানইয়া গাড়িতে বসে চারদিকে চায় আর আমি শহরের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাই, প্রথমে এখানে, তারপর সেখানে, অথবা কোনো বালুর স্তূপে বসে একটা কোদাল দিয়ে বালু খোঁড়ে, হুসøাগার্ডেনের খেলাপ্রাঙ্গণে, যেখানে লম্বা শীর্ণ স্টকহোম মায়েরা যারা আমাদের ঘিরে রাখে, সারাক্ষণ তাদের ফোনে ব্যস্ত, দেখে মনে হয় তারা বুঝি কোনো ফালতু ফ্যাশন শোয়ের অংশ, অথবা সে তার বাসার রান্নাঘরের হাই চেয়ারে বসে আমি তাকে যে খাবার দিচ্ছি সেটা গিলছে। সবকিছু আমাকে এতটাই ক্লান্ত করে যে, আমি মনের স্থিরতা হারাই। ঘরের ভেতরে হেঁটে হেঁটে তার সঙ্গে গল্প করতে নিজেকে নির্বোধ মনে হয়, কেননা সে কিছু বলছিল না, সেখানে কেবল আমার বোকা বোকা গলা আর তার নীরবতা, সুখী বকবকানি অথবা অসন্তুষ্ট অশ্রুপাত, তারপর তার কাপড় পরাসহ শহরে পথে চলা, স্কেপ্সহল্মেন মডার্ন মিউজিয়ামে, দৃষ্টান্তস্বরূপ, সেখানে অন্তত আমি কিছু ভালো ছবি দেখতে পারি, তার ওপর চোখ রেখে, অথবা শহরের মাঝখানে কোনো বড় বইয়ের দোকানে, অথবা দুরগার্ডেন কি ব্রুন্সভিক্কেন হ্রদে, যেটা ছিল শহরের সবচেয়ে কাছের প্রাকৃতিক দৃশ্য, আমি যদি গাইয়েরকে দেখতে শহরের বাইরে রাস্তাটা না নিই, যার তখনকার অফিস ছিল ইউনিভার্সিটিতে। ধীরে ধীরে, ছোট বাচ্চাদের সম্পর্কিত সকল বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করি, তার সংশ্লিষ্ট একটা কাজও ছিল না যা আমি পারতাম না, আমরা সর্বত্র ছিলাম, তবে তা যত ভালোই চলুক না কেন, এবং তার প্রতি আমার অনুভূত গভীর মায়া সত্ত্বেও আমার একঘেয়েমি ও অনাগ্রহ অনেক বেশি ছিল। অনেক বেশি প্রচেষ্টা চালাতে হতো তাকে ঘুম পাড়ানোয়, যাতে করে আমি পড়তে পারি এবং দিনটাকে পার করতে পারি এবং ক্যালেন্ডারের তারিখটাকে কেটে দিতে পারি। আমি শহরের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ক্যাফেগুলোকে চিনতে শিখি, এবং শহরের পার্কে এমন কোনো বেঞ্চ ছিল না যেখানে আমি কোনো না কোনো সময়ে একবার হলেও বসেছি, একহাতে বই ও অন্যহাতে স্ট্রলার নিয়ে। আমি দস্তইয়েফ্স্কিকে আমার সঙ্গে নিই, প্রথমে ডেমনস, তারপর দ্য ব্রাদার্স কারামাজভ। তার ভেতরে আমি আলো খুঁজে পাই পুনরায়। তবে সেটা স্বচ্ছ, বিশুদ্ধ ও উচ্চাঙ্গের আলো ছিল না, যেমনটা হ্যল্ডার্লিনের ক্ষেত্রে, দস্তইয়েফ্স্কির বেলায় কোনো উচ্চতা, কোনো পর্বত নেই, নেই কোনো স্বর্গীয় পরিপ্রেক্ষিত, সবই মানবীয় অঙ্গনে দস্তইয়েফ্স্কিসুলভ নোংরা, অসুস্থ, দুর্ভাগা, অনেকটা দূষিত মনের মধ্যে কুঁকড়ে থাকা, যা হিস্টিরিয়া থেকে খুব একটা দূরবর্তী নয়। সেখানেই সেই আলোটুকু ছিল। সেখানেই সেই স্বর্গীয় বিলোড়ন। কিন্তু সেটাই কি যাওয়ার জায়গা? এটার কী প্রয়োজন, হাঁটু গেড়ে সেখানে যাওয়ার? স্বভাবতই পড়ার সময় আমি কিছু ভাবি না, কেবল তার মধ্যে বুঁদ হয়ে থাকা, এবং কয়েকশো পৃষ্ঠার পর, যা পড়তে কয়েকদিন লেগে যেত, কিছু একটা ঘটত আচমকা : সমস্ত ডিটেইলস, যা খুব পরিশ্রমসাধ্যভাবে ধীরে ধীরে গড়ে তোলা হয়েছিল, কাজ করতে শুরু করে, এবং তার তীব্রতা এত বেশি যে, আমি ভেসে যাই, একেবারে অভিভূত অবস্থায়, যতক্ষণ না স্ট্রলারের গভীর থেকে ভানইয়া চোখ মেলে চায়, অনেকটা সন্দিহানভাবে, আমার মনে হয় সে বলে : তুমি আমাকে এখন কোথায় নিয়ে এসেছ?
এখন বইটা বন্ধ করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই, তাকে কোলে নেওয়া, চামচ বের করা, খাবারের বয়াম, বিব, যদি আমরা ঘরের ভেতরে থাকি, আর বাইরে থাকলে নিকটবর্তী ক্যাফেতে যাওয়ার কথা ভাবা, একটা হাই চেয়ার নেওয়া, তার মধ্যে তাকে বসানো, তারপর কাউন্টারে গিয়ে লোকটাকে অনুরোধ করা খাওয়াটা একটু গরম করে দিতে, যা তারা অনিচ্ছাতেই করে দিত, কেননা স্টকহোম তখন বাচ্চায় ভরে গিয়েছিল, তখন একটা শিশু-বিস্ফোরণ চলছিল, এবং মায়েদের মধ্যে এমন অসংখ্য নারী ছিল যাদের বয়স ত্রিশের কোঠায় এবং তারা তখনো পর্যন্ত কাজ করে নিজের মতো জীবন কাটাতে অভ্যস্ত ছিল, অনেক ঝলমলে ম্যাগাজিন প্রকাশিত হতে শুরু হলো মায়েদের নিয়ে, শিশুরা তার একটা বড় অনুষঙ্গ, এবং বিশিষ্টজনেরা একের পর এক তাদের ছবি তুলতে এবং তাদের পরিবার বিষয়ে সাক্ষাৎকার দিতে সম্মতি প্রদান করছিল। যেটা আগে ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল, তাকে এখন জনপরিসরে ঠেলে দেওয়া হলো। সবখানেই আপনি গর্ভযন্ত্রণা, সিজারিয়ান, স্তন্যপান, বাচ্চাদের পোশাক, স্ট্রলার, ছোট্ট বাচ্চাদের অভিভাবকদের জন্য ছুটির প্রস্তাব বিষয়ে পড়তে পারতেন, যেগুলো ছাপা হতো গৃহস্বামীদের অথবা তিক্ত মাতাদের দ্বারা রচিত হয়ে, যারা প্রতারিত বোধ করছিল, একই সঙ্গে কাজ করা ও বাচ্চাপালনের ধকলে যারা ধরাশায়ী হয়ে যাচ্ছিল। একসময় যা ছিল অতি সাধারণ বিষয়, যা নিয়ে তেমন কথাবার্তা হতো না আজ একেবারে অস্তিত্বের প্রথম কাতারে চলে এসেছে, যা নিয়ে একধরনের উন্মাদনা তৈরি করা হয়েছে যাতে করে লোকের ভুরু কুঞ্চিত হতেই পারে, কেননা এসবের কী অর্থ হয়? এইসময় পাগলামির মাঝখানে আমি আমার বাচ্চাকে নিয়ে ঘুরে মরছি আরো অনেক পিতার মতো, যারা অন্য সবকিছুর চেয়ে পিতৃত্বকে সবার আগে স্থান দিয়েছে। আমি যখন ক্যাফেতে বসে ভানইয়াকে খাওয়াই, তখন সেখানে অন্তত আরো একজন বাবা থাকেন, সাধারণত আমার বয়সের, অর্থাৎ মধ্য ত্রিশের, তাদের প্রায় সবাই মাথা কামিয়ে ফেলেছে চুলের ঘাটতি ঢাকার উদ্দেশ্যে। আপনি টাকমাথা কিংবা উঁচুকপাল বিশিষ্ট পুরুষদের আর দেখতেই পাবেন না, এবং এইসব পিতার দৃশ্য আমাকে একধরনের অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। আমার পক্ষে কঠিন হতো তাদের এই নারীসুলভ কর্মকাণ্ড গ্রহণ করতে, যদিও আমিও ঠিক একই কাজ করছিলাম এবং তাদের মতোই মহিলায়িত হয়ে উঠেছিলাম। স্ট্রলার-ঠেলা পুরুষদের প্রতি আমি যে কিছুটা হলেও বিদ্বেষ পোষণ করতাম, হালকা করে বলতে গেলে, একটা দ্বিধারী তলোয়ার, যাকে আমি কল্পনায় দেখতে পেতাম যখনই তাদের চোখে পড়ত। আমার সন্দেহ আছে আমার একারই এই অনুভূতি হয় বলে, আমার মনে হয়েছে মাঝেমধ্যে খেলার মাঠে কিছু পুরুষের মুখে আমি একই অস্বস্তি লক্ষ করেছি, এবং তাদের শরীরে একধরনের অস্থিরতা, যা তাদের প্ররোচিত করত বারের ওপরে চট করে দুয়েকটা বুকডন দিতে, বাচ্চারা যখন খেলায় ব্যস্ত। তবে যা-ই হোক, প্রতিদিন খেলার মাঠে বাচ্চাকে নিয়ে কয়েক ঘণ্টা সময় কাটানো সত্যি একটি বিষয় বইকি। তার চেয়ে আরো খারাপ ব্যাপারও ছিল। লিন্দা ভানইয়াকে নিয়ে ক্ষুদে শিশুদের রিদম-টাইম ক্লাসে যাওয়া শুরু করেছিল সরকারি লাইব্রেরিতে এবং আমি যখন তার দায়িত্ব নিই তখন সে চাইছিল ভানইয়া সেটা অব্যাহত রাখুক। আমার কেন জানি মনে হচ্ছিল সাংঘাতিক ভয়ংকর কিছু একটা ঘটবে, আমি তাই বলি, না, এটার প্রশ্নই ওঠে না, ভানইয়া এখন আমার সঙ্গে রয়েছে, ফলে সেখানে কোনো রিদম-টাইম হবে না। কিন্তু লিন্দা প্রায়শই এটার কথা তুলতে থাকে এবং কয়েক মাসের মধ্যে আমার মধ্যে যে একটা প্রতিরোধ ছিল নরম পুরুষদের ভূমিকা বিষয়ে সেটা এমনভাবে অন্তর্ঘাতের শিকার হয়, তার ওপর ভানইয়াও বড় হয়ে ওঠে যাতে করে তারও একটা বৈচিত্র্যের প্রয়োজন পড়ে, তখন একদিন আমি বলে বসি, হ্যাঁ আজকে আমরা রিদম-টাইমের ক্লাসে যাব লাইব্রেরিতে। তাড়াতাড়ি যাওয়ার চেষ্টা করো, লিন্দা বলে, এটা দ্রুতই পূর্ণ হয়ে যায়। আর তাই একদিন সদ্য বিকেলে আমি ভানইয়াকে ঠেলে স্ভিয়াভেগেন ধরে উদেনপ্লানে নিয়ে যাই যেখানে আমি রাস্তা পেরিয়ে লাইব্রেরির দরজা টেনে ভেতরে প্রবেশ করি। কোনো এক কারণে আমি আগে যাইনি সেখানে, যদিও এটা স্টকহোমের অন্যতম সুন্দর দালান ছিল, আস্পøুন্দের নকশা করা, ১৯২০ সালের কোনো একসময়, গত শতাব্দীর যে সময়টাকে আমি সবচেয়ে পছন্দ করি। ভানইয়ার খাওয়া হয়ে গেছে, বিশ্রাম হয়েছে এবং সে পরিষ্কার কাপড় পরিধান করে আছে, এই উপলক্ষের জন্যই সযত্নে পছন্দ করা। আমি স্ট্রলার ঠেলে ভেতরে সম্পূর্ণ গোলাকার ঘরে প্রবেশ করি, কাউন্টারের পেছনের এক নারীকে জিজ্ঞেস করি বাচ্চাদের বিভাগটা
কোথায়, তার নির্দেশনা অনুসরণ করে বাচ্চাদের বইয়ে সীমানাটানা একটা পার্শ্বঘরে ঢুকি, যেখানে একটা দরজার পেছনে পোস্টার ছিল, ২টার সময় রিদম-টাইম ক্লাস শুরু হওয়ার বিষয়ে। তিনটা স্ট্রলার ইতোমধ্যেই সেখানে ছিল। একটু দূরে কয়েকটা চেয়ারে তাদের মালিকেরা বসে ছিলেন, তিনজন নারী পুরু জ্যাকেটে এবং বিধ্বস্ত মুখে, সবারই বয়স পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি, যখন সম্ভবত তাদের দুধের বাচ্চারা মেঝেতে তাদের মাঝখানে হামাগুড়ি দিয়ে যাচ্ছিল।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.