মায়ের পর আমার পালা

অমলেন্দু ডাক্তারের চিকিৎসায় মা সেরে উঠলেন। ভুগলেন প্রায় মাসখানেক। তারপর শরীর স্বাভাবিক হতে আরো এক মাস। সংসার চলছে স্বাভাবিক নিয়মে। মায়ের সেরে ওঠাটা কত গুরুত্বপূর্ণ ছিল এখন বুঝি। মা গত হলে আমরা ছ্যাওড় হয়ে যেতাম। এটা ঝামটিয়ার ভাষা। ছ্যাওড় মানে অভিভাবকহীন। আমরা তখন পরপর চার ভাই। সাত থেকে এক। কী দারুণ বা নিদারুণ অবস্থা। আমাদের সামলাতে নানি, মেজোখালা ও মামি হিমশিম খেয়ে যাচ্ছিল। ওদিকে আমাদের মা’র যায় যায় অবস্থা। এই সময় লুৎফর মামা আমাদের অনেকটা সামাল দিয়েছেন। গৃহী মানুষ। কিন্তু অবিবাহিত। সুতরাং লুথুমামাকে এরকম ঈশ্বর-প্রদত্ত রহমত বলতে হবে। কী যত্ন করে আমাদের খাওয়াতেন। ভাবলেও মনটা শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় ভরে ওঠে। কিন্তু কৃতজ্ঞতা জানানোর কোনো সুযোগ নেই। ওই বংশের, মানে নানির বাবা-মা’র বংশের, কারো খবর এখন জানি না। তাঁরা আমার স্মৃতিতে আছেন।

ইহজগতে কেউ বিরাজ করছেন না। এমনকি তাঁদের উত্তরপুরুষদের খবরও জানি না। দেশভাগের অভিঘাত আজো হাড়ে হাড়ে টের পাই। কী কুৎসিত একটা ঘটনা। আমাদের পূর্বপুরুষদের এখন আমার খুব গাল দিতে ইচ্ছা করে। সহজেই বলতে পারি তাঁদের নির্বুদ্ধিতার কথা। সারা ভারতের সব মানুষকেই আমার নির্বোধ মনে হয়। এককভাবে কেউ দোষী নয়। পুরো ভারতবাসী বিশেষ করে বাংলা আর পাঞ্জাবের মানুষের অমানুষিক সীমাহীন দুর্দশা। তাছাড়া বর্তমানে বাংলা ভাষাভাষী অন্য রাজ্যে গেলে পড়ে বিপদে। যারা ভালো হিন্দি জানে না তাদের বাংলাদেশি বলে গ্রেফতার করা হয়। সেই ১৯৪৭-এর দেশভাগের ভূত এখনো তাড়া করে ফিরছে বাঙালিদের। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের বিদেশ ভ্রমণ মানে পশ্চিমবঙ্গ, মেঘালয়, আসাম বা ত্রিপুরা যাওয়া। তারা তো আর লন্ডন, নিউইয়র্ক বা প্যারিস যেতে পারবে না। কম বিত্তের মুসলমানদের প্রাণের আকুতি হজে যাওয়ার উপায়টাও নেই। বাংলাদেশবাসীর এ এক নিদারুণ অবস্থা। পশ্চিমবঙ্গবাসী অন্তত দিল্লি যেতে পারবে। যেতে পারবে রাঁচি বা পাটনা। এছাড়া আছে পুরী-ভুবনেশ্বর। বাংলাদেশিরা নিজ জেলা থেকে অন্য জেলায় গিয়ে বিদেশ ভ্রমণের আনন্দ নেবে। হায় রে বাঙালি! এ-জাতি এত নির্বোধ কেন? জানি, বলবেন পরিস্থিতি। এখানে ভবিষ্যৎ দেখার সুযোগ নেই।

মায়ের অসুস্থতা আমাকেও বড় দায়িত্বে ফেলে দেয়। সাত বছরের আমি, আমার নিজেরই যেখানে কেয়ার দরকার, আমার ওপর ছোট তিন ভাইয়ের দায়িত্ব।

মামি হালিমা খাতুনের মুখটা খুব মনে পড়ছে। চোখে সোনালি গোল ফ্রেমের চশমা, গোল মুখ, নাতি-উচ্চতা, রং গাঢ় শ্যামলা – তবে লাবণ্যে ভরা। তিনি প্রায়ই তাড়া দিতেন, ফজলু ওদের একটু দেখো।

সংসারে বড় সন্তানের দায়িত্ব কতটা যারা বড় তারা ছাড়া কেউ বুঝবে না। বাবাও পুত্র হিসেবে বড়। তাঁর ওপর আমার এক ফুপু ছিলেন। বিয়ের পর অকালে মারা যান। নাম ছিল আনোয়ারা। বাবা অনেক কষ্ট করে এমএ পাশ করে কলকাতায় গোয়েঙ্কা কমার্স কলেজে চাকরি পান এবং সংসারের হাল ধরেন। কিন্তু ১৯৪৮ সালে সবলসিংহপুরে ম্যালেরিয়া আসে মহামারিরূপে। গ্রামে প্রায় তিনশো মানুষ মারা যান। সেই তিনশোর মধ্যে ছিলেন আমার দুই ঠাকুরদা বা বড় দাদা : শেখ ইবশাদ আলী ও নিজ দাদা শেখ মহম্মদ এহিয়া। সুতরাং বাবা হাল ধরার পর সংসার যখন একটু সুখের মুখ দেখছে, তখনি দু-ভাই পনেরো দিনের ব্যবধানে ইহলোক ত্যাগ করেন। বাবার ভারটা মনে হয় দু-ভাই পরামর্শ করে লাঘব করে দিয়ে গেলেন।

এদিকে টাইফয়েড থেকে সেরে ওঠা মা নিজ সন্তানদের দায়িত্ব নিয়েছেন। লুথুমামা চলে গেছেন। এই সময় আমি জ্বরে পড়লাম।

জ্বর হলে দু-তিনদিন দেখতে হয়। তারপর জ্বর না কমলে ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া। আমার জ্বর ওঠানামা করছে না। একই রকম থাকে। এর আগে সবলসিংহপুরে বেশ কয়েকবার ম্যালেরিয়ায় ভুগেছি। ম্যালেরিয়াটা বোঝা যায়। জ্বর বাড়ে কমে। আর জ্বর যখন আসে, শরীরে কাঁপুনি হয়। তাই দেখে ম্যালেরিয়া হয়েছে কি না বোঝা যায়। আমার জ্বরে তেমন কিছু হচ্ছে না। এবার সবার কপালে ভাঁজ। টাইফয়েড নয়তো?

অগত্যা ডাক পড়ল এক এবং অদ্বিতীয়তম ডাক্তার শ্রী অমলেন্দুবাবুর। মানিকমামা ডাক্তারবাবুকে ডেকে আনলেন। বিকেল হয়ে গেছে। আমার মন এখন ছোট বাগানে। খেজুরগাছে খেজুরের কাঁদিতে দু-একটা পাক ধরতে দেখেছিলাম। বিছানায় পড়ে থাকা অসহ্য। কিন্তু জ্বর নিয়ে বাইরে যেতে দিচ্ছে কে?

আর মা ছিলেন জমিদারের মেয়ে। একেবারে দারোগা। চোখ পাকিয়ে ডাক দিলে সুড়সুড় করে কাছে না এসে উপায় নেই। কথায় বলে না, অজগর নাকি তার শিকারকে সম্মোহন করে। আর সেই প্রাণী সুড়সুড় করে অজগরের মুখগহ্বরে প্রবেশ করে। সাপটি মনের আনন্দে প্রাণীটিকে গিলে ফেলে। আমার অবস্থা ছিল তেমন।

তাহলে আমার মা কি নাগকন্যা?

হলেও হতে পারে। শ্রীকৃষ্ণের বড় ভাই বলরাম ছিলেন

শেষ-নাগের প্রতিনিধি।

পরবর্তী জীবনে নৃতত্ত্ব পাঠ করে আমি টোটেম বা গোষ্ঠীচিহ্নের কথা জানতে পারি। প্রতিটি গোষ্ঠী তাদের একজন বা একটি বস্তু বা প্রাণী থেকে উদ্ভূত বলে ধারণা করত। কেউ হয়তো বাঘ, কেউ হরিণ, কেউ ঈগল, কেউ সিংহ এরকম সব প্রাণী বা অপ্রাণীবাচক চিহ্ন ধরে পরিচয় দিত। পদবি হিসেবে সিংহ তো সবার সামনে উপস্থিত। আমি আমাদের গ্রামের নামের হদিস করি : সবলসিংহপুর। দুর্বল সিংহ নয়। সবলসিংহ – পুর মানে নগর বা জনবসতি।

সিঙ্গাপুর : সিঙ্গা ফুঁকেছে, না সিংহপুর – এরকম কিছু একটা হবে। তবে সিংহের চিহ্ন আছে। শ্রীলংকার পতাকা সিংহশোভিত। তো আমার জ্বর। তিনদিন একটানা চলার পর খালনা থেকে অমলেন্দুবাবু তাঁর বহুল ব্যবহৃত হালকা নীল রঙের কোট পরে এলেন এবং জ্বরের ধারা দেখে নিদান দিলেন টাইফয়েড।

সবার মুখ অন্ধকার। মা সেরে উঠতে না উঠতে সন্তানে স্থানান্তরিত। তার ওপর বড় ছেলে। সংসারের হাল যে ধরবে। বাবার অনুপস্থিতি। আরো একটা সংস্কার ছিল : এ-বাড়ির সবার প্রথম সন্তান দশ বছর অতিক্রম করতে পারে না। সব মিলিয়ে দুশ্চিন্তাটা বকপাখির মতো বড়দের মনে গেঁথে গেল।

নিয়মিত ওষুধ ও দুধ-বার্লি চলছে। কোনো উন্নতি নেই। জ্বর বেশি হলে মাথার বালিশের নিচে অয়েলক্লথ মেলে দিয়ে বদনার নাক দিয়ে ধীরে জল ঢালা। যতক্ষণ না জ্বর কিছুটা কমে। প্রায় আধঘণ্টাটাক লেগে যেত। কখনো আরো বেশি।

দিন দিন শরীর শুকিয়ে যাচ্ছে। একেবারে কঙ্কালসার। এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই আর চেনা যায় না। সবার মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। বিশেষ করে মা-নানি-সেজোখালা এরা সবচেয়ে আপনজন। কাছের মানুষ। জন্ম থেকে যাঁদের মুখ দেখে আসছি।

সপ্তাহ শেষে নানা ঘরে এলে পাশে বসতেন। তাঁর ডাক্তারি কোনো কাজে আসত না। কারণ তখনো টাইফয়েডের ওষুধ আবিষ্কার হয়নি। এর বিশ-বাইশ বছর পর মানুষ চাঁদে পা রাখে। কিন্তু তখনো টাইফয়েড প্রতিরোধের ওষুধ আবিষ্কার হয়নি।

নানার ফর্সা মুখে বিষাদের ছাপ দেখে আমার নিজেকে খুব অপরাধী মনে হতো।

ছোট মেয়ের বড় ছেলে। আদর ও আদবকায়দার ছাপ দুই-ই ছিল বেশি। বাকিরা কোলে-কাঁধে উঠত। আমি একমাত্র মুক্ত। নানার সঙ্গে সামান্য দূরত্বও তৈরি হয়েছে। বড় ছেলে তো!

খাওয়া-দাওয়া কিছুই নেই। সেই সাগু ও বার্লি। গায়ে ভারী চাদর। তখনকার দিনের চিকিৎসাসম্মত। আজ এসব বাতিল। ভালো খাবার দাও। গায়ে মোটা কাপড় দেবে না। প্রচুর জল পান করাও। হাঁটাচলাও সম্ভব হলে করাও। এখন চিকিৎসায় বিপ্লব ঘটে গেছে। হৃৎপিণ্ড বের করে চিকিৎসা করা হয়। অন্য হৃদপিণ্ড সংযোজন করা যায়। পোড়া মুখে নতুন চামড়া বসানো যায়। রোবট দিয়ে চিকিৎসা হয়। কত কিছু।

তিন-চার দিন পরে নতুন বিপত্তি দেখা গেল। পায়খানা হয় না। মলদ্বারে এসে মল আটক থাকে। বের হয় না। মল শুকিয়ে রয়েছে। এটা বের না হলে শরীর ভালো হওয়ার কোনো উপায় নেই। সবাই খুব চিন্তিত।

কারণটাও পাওয়া গেল।

আমাদের মানে মামাদের ছোটবাগানে একটি বিলেতি বাবলাগাছ ছিল – যার ফল বক্রাকার। অনেকটা আমৃত্তি বা জিলেপির মতো। প্যাঁচালো। এগুলো প্রথমে থাকে সবুজ। পাকতে শুরু হলে প্রথমে গোলাপি, পরে লাল হয়ে ওঠে। আমি এগুলো লগি দিয়ে পেড়ে লুকিয়ে একা একা খেতাম। এর ফলে পায়খানা কষা হতো। এখন দুর্বল শরীরে তা ঘুঁটের রূপ নিয়েছে। এই গাছটা মনে হয় ক্যাসিয়া গণের গাছ। বাবলাজাতীয়। আমার খুব প্রিয় ফল এই বিলেতি বাবলা। শরীর খারাপ হওয়ায় এখন ফল পাচ্ছি। কোষ্ঠকাঠিন্যে ধরেছে।

কী করা যায়। বড়রা সবাই চিন্তিত। এই সময় মেজোখালা মাকে বললেন, পুঁটি, একটা চা-চামচ নিয়ে আয়।

মা বললেন, কী হবে?

নিয়ে আয় না! মেজোখালা দৃঢ় স্বরে বললেন। তাঁর স্বরের দৃঢ়তা মাকে কাজে যেতে বাধ্য করে।

মা চট করে একটা চা-চামচ এনে খালাকে দিলেন।

মেজোখালা এবার চামচের সামনের দিকটা ধরে, আমাকে পাশ ফিরিয়ে শুইয়ে দিয়ে বললেন, তুমি পায়খানা করার চেষ্টা করো।

আমি খালার হুকুম তামিল করি।

মেজোখালা পশ্চাতদেশের নিচে একটা বাটি ধরে শক্ত পায়খানা চামচের হাতল দিয়ে একটু একটু করে ভাঙতে লাগলেন। এভাবে যতক্ষণ না কাদার মতো মল বেরোলো কাজ চালিয়ে গেলেন। আর আমার মুশকিল আসান।

আমাদের বাঁচানোর জন্য এ ধরাধামে দেবী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন মেজো খালা। তিনি এ-ধরাধাম ছেড়ে গেছেন। তাঁকে আমার হাজার সালাম। আজো মেজোখালার কথা ভাবলে খুব কষ্ট পাই। সারাজীবন দুঃখের মধ্য দিয়ে গেছেন। কিন্তু কি অসীম ধৈর্য ছিল। কখনো ভেঙে পড়েননি। দুই সতীনের ঘর করতে হয়। দেশভাগের পর থেকেই শুরু হয় তাঁর দুঃখের জীবন। সে এক করুণ গাথা। অনেক কথা। বলতে গেলে নিজের কথা বলার সময় পাবো না। মেজোখালা একটা উপন্যাসের বিষয়। শরৎ-সাহিত্যধর্মী।

আমার মা-খালাদের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে সুন্দরী। কিন্তু স্রষ্টা তাঁকেই বেছে নিয়েছিলেন কষ্ট দেবেন বলে।

মেজোখালার এই অপারেশন স্টুল সাকসেসফুল হওয়ায় সবাই হাফ ছেড়ে বাঁচল। আর এরপর গুহ্যদ্বার দিয়ে ডোজ দেওয়া শুরু হলো। অর্থাৎ রেড়ির তেল গুহ্যদ্বার দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করানো হতো। পাম্প করে। তাও তেমন কাজ করত না। তখন মেজোখালার অপারেশন চলত। আমি একটা বড় দায় থেকে মুক্ত হলাম।

মেজোখালা আজ আর এই দুনিয়ায় নেই, কিন্তু তাঁর উপস্থিত বুদ্ধির কথা মনে করে আমি তাঁকে হাজার সালাম জানাই। বলতে গেলে তিনিই আমাকে রক্ষা করেছেন। মনে হয়, তিনি যেন দেবদূত হয়ে এসেছিলেন।

তো পশ্চাৎদেশ দিয়ে তেলের ডোজ দেওয়ার পর্বটি আমার কাছে সবচেয়ে বিরক্তিকর ছিল। কিন্তু কিছুই করার ছিল না। চিকিৎসাশাস্ত্র যখন যেটা উদ্ভাবন করে তা সাফল্যের জন্যেই। কষ্ট লাঘবের জন্যেই কষ্ট সহ্য করা। ছোট কষ্ট বড় কষ্টকে সরিয়ে নিয়ে আনত প্রশান্তি। জীবনের শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত মানুষকে এটা সহ্য করে যেতে হয়। শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে সব যন্ত্রণা থেকে মুক্তি। তাই তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখে গেছেন :

মরণ রে তুঁহু মম

শ্যাম সমান…

মৃত্যু জীবনের পূর্ণতা। সব যন্ত্রণার অবসান। সেই বিশ্বকবির কথা : মরণ বলে, আমি তোমার জীবন তরী বাই …

দেখতে দেখতে এক মাস কেটে গেল। কোনো উন্নতি নেই। দক্ষিণের ঘরের জানালা দিয়ে শুধু এক চিলতে আকাশ দেখতে পাই। ডাকঘরের অমলের সঙ্গে কতজন দেখা করতে আসত। আমার কাছে কেউ আসে না। শুধু ঘরের কয়েকজন চেনামুখ। ছোট ভাইয়েরাও আসে না। তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা। দরজা দিয়ে উঁকি মেরে তারা চলে যায়। আমার সর্বক্ষণের দেখাশোনার ভার মা আর নানির ওপর। একজন না একজন সবসময় থাকত।

এর মধ্যে অমলেন্দু ডাক্তার মশাই প্রায় তিন-চারবার দেখে গেছেন। তিনি ভরসা দিতেন। আর স্রষ্টার স্মরণ নিতে বলতেন। আজকাল ক্যান্সার রোগীদের ক্ষেত্রে ডাক্তাররা যেভাবে থার্ড স্টেজ পার হয়ে গেলে বলেন, প্রে টু গড … অনেকটা কেন, একই ধারা। মানবজীবন কি বদলেছে! একই ধারা। শুধু ধরনটা পৃথক। মানুষ যে একটি প্রাণী, তার ব্যতিক্রম হয়নি। হয়তো অস্তিত্বটাই এমন কোনো ব্যতিক্রম হবে না।

এক মাস হয়ে গেছে। একই রুটিন। জোর করে লেবু দেওয়া বার্লি খাওয়া। নাক বন্ধ করে। গায়ের ওপর সাদা চাদর। কখন এটা শেষ চাদর হবে কেউ জানে না। তখন অবশ্য মুখটাও ঢেকে দেওয়া হবে। না হয় মাছির আগমন ঘটে। তবে বিরক্ত লাগবে না।

দুপুরে কুসুম গরম জলে গা মুছে দেওয়া। তারপর গায়ে সামান্য কিউটিকিউরা বা পন্ডস বেবি পাউডার মাখানো।

এই পারফিউম আমাকে আনন্দ দিত। একমাত্র আনন্দের বস্তু। খাওয়াটা সবচেয়ে কষ্টের। আর মলত্যাগ করা আরো কষ্টের। কোষ্ঠকাঠিন্য কখনো যায়নি। যদিও বিলেতি বাবলা নেই, তবু সেই ধারা এখনো কাটেনি। কারণ খাবার তো বার্লি বা সাগু। তাই মলত্যাগের বেগ আসত কম। হয়তো দু-তিনদিন কেটে যেত বেগ আসতে। আর সেই পুরনো ধারা। আর মেজোখালার দক্ষ হাত। এটা ছিল তাঁর একচেটিয়া দায়িত্ব। তিনতলা বাড়িটা দুটো ইউনিট হওয়ায় খালাকে পেতে অসুবিধা ছিল না। ডাক পড়লেই সব কাজ ফেলে চলে আসতেন। সেই সুন্দর মুখ কি গম্ভীর হয়ে যেত। মেজোখালাকে দেখলে কষ্টের চেয়ে মনের মধ্যে একটা ভালোবাসা জেগে উঠত। তিনি খুব অভাগী। সন্তান হয় আর মারা যায়। তখন একমাত্র মেয়ে আল্লরাখি শুধু বেঁচে। বয়স তিন-চার হবে। দুলে দুলে গান করত বলে নানা ওকে নাম দিয়েছিলেন : দুলমনবিবি।

কোঁকড়া চুল। গোলাকৃতি মুখ। উজ্জ্বল শ্যামলা রং; খুবই কিউট ছিল। ছিল বলছি কারণ আজ আর ও নেই। [পরপর আমরা চার ভাই। একমাত্র আল্লরাখি ছিল আমাদের বোন। খালা ওকে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে রাখত। ববকাট চুল। আবার কোঁকড়া। দেহের তুলনায় মাথা সামান্য বড় দেখাত। খুবই পাতলা। খালা ওকে চুড়িদার পাজামা পরাত বলে বেশ ঢ্যাঙা লাগত। চিবুকটা ছোট। হালিমা মামির মতো। পিতৃধারার ছাপ বেশি। খালু আলী আকবরের মেয়ে।

এক মাস হয়ে গেল।

জ¦র না ছাড়ায় সবাই খরচের খাতায় ধরে নিয়েছে। সবাইকে মনে হলো যেন স্বস্তিবোধ করছে। শুধু মা আর নানিকে তেমনি মলিন মুখে দেখতে থাকি।

একদিন প্রায় সন্ধ্যা হয় হয়। আমার খুব খারাপ লাগছে। মনে হয় দম বন্ধ হয়ে যাবে।

আমি নানিকে ডাকলাম।

নানি দ্রুতপায়ে ছুটে এলো।

– কী হয়েছে?

– নানি, আমার জু কেমন করছে?

নানি কোনো উত্তর দিলেন না, শুধু মাকে বললেন, পুঁটি, পাটি বিছিয়ে নামাজ পড়তে বসে যা।

মা যন্ত্রের মতো ঘরের কোনায় রাখা পাটি বিছিয়ে পশ্চিমমুখী হয়ে নামাজে বসে গেলেন।

নানি আমার কপালে হাত বুলোতে লাগলেন।

বললেন, কেমন লাগছে।

– জু-টা খারাপ লাগছে…

নানি কোনো কথা বললেন না। শুধু মাথায়-কপালে হাত বুলোতে লাগলেন।

আমার কেমন ঘুম ঘুম পেতে লাগল।

আমাকে চুপ করে যেতে দেখে নানি জিজ্ঞেস করলেন, এখন কেমন লাগছে?

আমার কোনো জবাব নেই। দুচোখ বন্ধ হয়ে আসছে। আমার মনে হলো তলিয়ে যাচ্ছি। তারপর আর কিছু মনে নেই। শুধু মনে হচ্ছে আমি চলে যাচ্ছি। কোথায় যাচ্ছি জানি না। ক্রমশ সব বোধ হারিয়ে গেল।

কতক্ষণ এরকম ছিলাম জানি না। খানিক পর চেতনা ফিরল। নানির হাত কপালে টের পেলাম। কিন্তু হাত স্থির।

আমি চোখ মেললাম।

– পানি খাবে?

নানি জানতে চাইলেন।

বললাম : হ্যাঁ।

কতক্ষণ গেছে জানি না। বাড়ির সবাই আমার ওপর ঝুঁকে রয়েছে চোখ মেলে দেখলাম। কেমন লাগছে … কে বলল ঠিক বুঝতে পারলাম না। ক্রমশ চেতনা ফিরতে লাগল। নানির মুখ দেখতে পেলাম – চিনতে পারলাম। মা নয়, নানি ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। সব ঝড়ঝাপটা সামলায় নানি। ঝড়ঝাপটা আসত মায়ের কাছ থেকে। নানি ছিল ঢাল। তবু অনেক সময় কাজ হয়ে যেত নানি পৌঁছানোর আগে। তখন কোনো উপায় থাকত না। তবে সত্যি বলতে কী মায়ের হাতে আমি সবচেয়ে কম মার খেয়েছি। মেজো আর সেজো পিঠটা পেতে দিয়েছে, মানে তাদের ওপর বেশি গেছে চাপটা। বড় হয়ে তারা বলতও : মা, দাদার চেয়ে আমাদের বেশি মার দিয়েছে। পরোক্ষভাবে বোঝাত মা পক্ষপাতিত্ব করেছেন।

অবশ্য সংসারে মায়ের মারের পেছনে সব সময় স্নেহ লুকোনো থাকে। তাই কেউ মাকে পরিত্যাগের কথা ভাবত না। মায়ের মার একমাত্র দেবতারা শুধু খান না। প্রভু কৃষ্ণ মা যশোদার হাতে প্রচুর মার খেয়েছেন। মাখন চুরি করে। কিন্তু কানাই নাছোড়বান্দা। স্বীকার করেননি যে, মাখন খেয়েছেন। উপস্থিত বুদ্ধির জোরে হাজারটা কারণ উপস্থিত করতেন। ঠোঁটে মাখন লেগে আছে, তা-ও বলছেন, ওটা আটা। কৃষ্ণের বাল্যকাল অপূর্ব পারিবারিক নাটক। বৃন্দাবনে আজো বাঁশি বাজে। কৃষ্ণ নেই … কিন্তু বাঁশিটি তার গেছে ফেলে। অনেকটা রবীন্দ্রসংগীতের মতো :  দূরদেশী সেই রাখাল ছেলে…/ বাঁশিটি তার গেছে ফেলে …

কৃষ্ণই উঠে এসেছে রবীন্দ্রনাথের হাতে। এই রাখাল বালক আর কেউ নয় ব্রজের রাখাল।

দেখতে দেখতে আমার চেতনা ফিরে এলো। ফিক করে হেসেছিলাম কি না মনে পড়ে না। তবে সবাইকে একটা সারপ্রাইজ দেওয়ার আনন্দ পেলাম।

সবার বুক থেকে পাথর নেমে গেল।

মা নামাজের পাটি গুটোতে লাগলেন।

মেজোখালা সামনে এসে মাথায় হাত দিলেন – না, গা বেশি গরম নয়, অনেকটা স্বাভাবিক।

সবাই নিজেদের মধ্যে কি বলাবলি করল বুঝতে পারলাম না। তবে তাদের ধড়ে যে প্রাণ এলো, আর আমি যে যমের দুয়ার থেকে ফিরে এসেছি তাই। তাদের মধ্যে চাপা আনন্দ। এখনো বিপদ পুরো কাটেনি। কারণ ডাক্তার না বলা পর্যন্ত অসুখ ভালো হয়েছে নাকি আবার ফিরে আসবে কেউ বলতে পারে না।

কেন জানি সেদিনের পর থেকে জ্বর আর তেমন বাড়েনি। থাকত ১০০০ বা সামান্য বেশি।

একদিন ডা. অমলেন্দুবাবু বললেন : আর ভয় নেই। খোকা এখন সেরে উঠবেন।

সবার বুক থেকে পাষাণ নেমে গেল।

আর জ্বর না আসায় ছোটরা আমার কাছে আসার অনুমতি পেল। তারা এলে আমি খুব খুশি হয়ে উঠতাম। উঠে বসার চেষ্টা করতাম। কিন্তু হাত-পায়ে কণাতম জোর পেতাম না। শুধু শরীরের ভেতরটা উঠে বসত।

আমি তাদের হাত ধরতাম। পেতাম সহোদরের উষ্ণতা। তা-ই ছিল মহৌষধ। আমার উঠে বসার ইচ্ছাটা হতো প্রবল। আর মন তখন ছুটে যেত ছোটবাগানে – বড় বাগানে – বড় খালধারে কত দিন ওদের সঙ্গে দেখা হয়নি। ওরা নিশ্চয় আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে। বিশেষ করে হিজলগাছটি। ঝিলের জলে গোড়া ডুবিয়ে কি সুন্দর হালকা পাটকিলে রঙের ফুলের ঝুরি ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে। কী চমৎকার সুবাস। হাতে বন্ধনি করা যেত। সবাইকে হাত ঘুরিয়ে দেখানো যেত।

বড় বাগানের ঝিলের পর বড়খাল। কুলকুল করে নদীর জল বয়ে চলেছে। দুপারে কাদার ঢালে চ্যাঙচ্যাঙালি মাছ অনেকটা গড়ুই আর চিঁয়োমাছের মতো। লাফিয়ে জলে পড়ছে। আবার জল থেকে উঠে পাখনা দিয়ে হেঁটে বা বুকে হেঁটে প্রবেশ করছে নিজ গর্তে। কখনো মারামারিও করে। মনে পড়ে সেই ডাইনোসরদের কথা। নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ছোটদের গল্পে টিরানোসিরাসদের কথা পড়েছি। সেই ডাইনোসরদের কথা মনে পড়ত। বেচারারা খেতে না পেয়ে সব মরে গেছে। রূপান্তরিত হয়েছে কুমির আর টিকটিকি ও গুইসাপে। বা গিরগিটিতে।  বা সাদাকালো ডোরাকাটা অ্যাঁজলাই-এ। আর সাপ তো আছেই। অজগর আর অ্যানাকোন্ডা বড় উদাহরণ। তাছাড়া কুমির হলো বড় নমুনা। আছে ঘড়িয়াল।

জল, সাগু, বার্লির পর এবার যোগ হলো ডাবের জল। অমলেন্দু ডাক্তারবাবু সব অনুপান দিয়ে গেছেন। তখনো ভাত দেওয়া হয়নি।

আমি আবদার ধরতাম ভাত খাবো।

নানি বুঝিয়ে বলতেন, ডাক্তারবাবু বললেই ভাত দেব। এই তো দুদিন পরই ভাত খাবে।

আমি মুখ ঘুরিয়ে নিতাম। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ত নীরবে। অভিমান হবে না কেন? কতদিন ভাত খাইনি। বার্লি আর সাগু দেখলে বমি আসত। এমন অবস্থায় যে না পড়েছে সে বুঝবে না কষ্টটা। ভাত কত প্রিয় খাবার। অবশেষে ডাক্তার অমলেন্দুবাবুর মুখ থেকে নির্দেশ এলো ভাত খাওয়ানোর। শিঙ্গিমাছের ঝোল। তা-ও আবার গন্ধবাদালি পাতা সহযোগে। এই পাতাকে সবাই বলত গাঁদালাপাতা। খুব নাকি উপকারী। পেট ভালো রাখতে। এর মধ্যে একটা বদ গন্ধ থাকত। অনেকটা অ্যামোনিয়া গ্যাসের মতো। দুর্গন্ধ। এটা কবিরাজি শাস্ত্রসম্মত। তাই সবাই ব্যবহার করেন। সব জায়গায় পাওয়াও যায় না। বনে-বাদাড়ে আপনা-আপনি জন্মায়। কেউ চাষ করে না।

ঝামটিয়ায় এরকম ঝোপঝাড় ছিল খুব কম। বেনো জায়গা তো। সবকিছু মরে যেত বানের জলে। বছরে কমপক্ষে দু-তিনবার বান আসত। নিচু জায়গা। লোকে বলে হাজা অঞ্চল। হাজা মানে ফ্লাড-প্লেন, যা প্রতিবছর বানের জলে ডুবে যায়। ভূগোলবিদরা একে বলেন ফ্লাড-প্লেন – মানে যে-অঞ্চল বানে ডুবে যায়। প্রায় পুরো বাংলা এই

ফ্লাড-প্লেনের আওতায়। উত্তর বাংলা থেকে শুরু করে মধ্য-বাংলা দিয়ে বান ক্রমশ নিম্নবাংলা ছাপিয়ে সমুদ্রে পড়ে। বঙ্গোপসাগরের খাঁড়ি বা অংশ। তিন দিক ঘেরা বলে উপসাগর।

বাংলার জন্মটা একটা রূপকথার গল্পের মতো। টেথিস সাগর ফুঁড়ে উঠল হিমালয় পর্বত – প্রায় ছয় কোটি বছর আগে। এই মানবমাথা বা এভারেস্ট ছড়িয়ে চলল কাদামাটি ও পাথর। জন্ম হলো বাংলা বেসিনের। এমন উর্বর জায়গা পৃথিবীতে আর মাত্র দু-একটি জায়গায় আছে।

তাই এখানে বিশাল জনগোষ্ঠী নিয়ে বাঙালির বসবাস। সারা পৃথিবীতে বাংলাভাষী জনগোষ্ঠী প্রায় ৩২-৩৩ কোটি। সম্ভবত একটি অঞ্চলজুড়ে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ জনগোষ্ঠী।

তো গাঁদালপাতা।

নানি লোকজন লাগিয়ে দিলেন চারদিকে। অনেকটা ঢ্যাঁড়া পেটানোর মতো। তাঁর নাতি গাঁদালপাতা দিয়ে প্রায় দেড় মাস অসুখে ভোগার পর প্রথম অন্নগ্রহণ করবে। ভাগ্য ভালো গাঁদালপাতা ঠিক সময়ে পাওয়া গেল জয়পুর থেকে। জয়পুর ঝামটিয়ার উত্তরে আট-দশ কিলোমিটার হবে। বেশ নামকরা ব্যবসা-অঞ্চল। দোতলা পাকাবাড়ি দেখা যেত স্কুলের ভিটে থেকে।

জয়পুর ছাড়িয়ে গেলে কলকাতা যেতে পড়ে এর চেয়ে নামি জায়গা আমতা। তারপর সোজা হাওড়া স্টেশন। এটা উত্তর দিক দিয়ে কলকাতা গেলে। দক্ষিণে চোখে পড়ে খালনা ছাড়িয়ে বাগনান। এই স্টেশন থেকে উলুবেড়িয়া হয়ে হাওড়া। এটায় সময় দূরত্ব সাশ্রয় হয়।

এবার আমার পুনর্বাসন পালা।