বর্ষা-বন্দনা

বর্ষার মোহনী রূপ বাঙালির হৃদয় সজাগ করে, দর্শনেন্দ্রিয় পরিতৃপ্ত করে, কর্ণকুহরও সংবেদী করে সুর ধ্বনি এবং ছন্দব্যঞ্জনায়। বর্ষার জলের আছে সরসতা, প্রাণপ্রাচুর্য, সুরের ধ্বনিমাধুর্য, রঙের রূপলাবণ্য। তাই বাংলা বর্ষায় বিগলিত, বাঙালি বর্ষায় বিমোহিত। সবকিছু মিলিয়ে বর্ষা অনন্য।

সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে এদেশে, প্রাচীন বাঙালির সেই কৌমজীবন থেকে ষড়ঋতুর সঙ্গে আমাদের বসবাস। এই কালপাঁচালি প্রতি রোমকূপে ও রক্তের সঙ্গে মিশে আছে – যেন ‘ফুলের গন্ধ বন্ধুর মতো জড়ায়ে ধরিছে গলে’। ঋতুচক্র ও কালপরিক্রমার সঙ্গে মানুষের মন ও জীবনের সম্পর্ক তো অতলান্তিক। একেবারে অচ্ছেদ্য, অবিচ্ছিন্ন, অকাট্য। বাঙালির জীবনচক্র, অর্থনীতি-সংস্কৃতি, বিকাশ-বিলয় সবই অবিচ্ছেদ্যভাবে ঋতুচক্রের সঙ্গে যুক্ত। তাই তো আমরা প্রকৃতির সন্তান। প্রকৃতির প্রাণজ পরিচর্যায় আমরা বেড়ে উঠি, লালিত-পালিত হই ষড়ঋতুর দোলনায় দুলে।

যে-বর্ষা নিয়ে এই উচ্ছলিত কথা-কাব্য, এর গর্ভাশয়ের গভীরে আছে মেঘ আর মর্মে আছে মেদুরতা। ফুল থেকে যেমন ফলের জন্ম, তেমনই মেঘ থেকে বৃষ্টির। বারি, বারিদ, বরুণ, বৃষ্টি, বাদল, বর্ষা, বর্ষণ, বজ্র, বিদ্যুৎ – ব-আদ্যবর্ণের এই শব্দগুলো ‘বর্ষা’র সহোদরপ্রতিম। বারি দান করে বলে তার নাম বারিদ। জল দান করে বলে নাম জলদ। দুই-ই মাতৃস্বরূপিণী মেঘের নাম। মেঘের সাম্রাজ্য আকাশে। ফুরফুরে মেজাজে আকাশে ঘুরে-বেড়ানো মেঘের বহুবিচিত্র নাম। বাংলা বিশ্বকোষের স্রষ্টা নগেন্দ্রনাথ বসু ভারতীয় বেদ-পুরাণ এবং অমর কোষে

চিরুনি-অভিযান চালিয়ে মেঘের শতাধিক নাম আবিষ্কার করেছেন। এগুলো নিম্নরূপ :

অবৃভ্র, বারিবাহ, স্তনয়িতু, বলাহক, ধারাধর, জলধর, তড়িত্বান, বারিদ, অম্বুভৃৎ, ঘন, জীমূত, মুদির, জলমুচ্, ধুমযোনি, অভ্র, পয়োধর, অম্ভোপর, ব্যোমধূম, স্বনাস্বন, বায়ুদারু, নভশ্চর, কন্ধর, কন্ধ, নারদ, গগনধ্বজ, বারিমুচ্, বার্মুক, বনমুচ্, অব্দ, পর্জ্জন্য, নভোগজ, মদয়িতু, কদ, কন্দ, গবেড়, গদামর, খতমাল, বাতরথ, শ্বেতনীল, নাগ, জলকরঙ্ক, পেচক, ভেক, দতর, অম্বুদ, তোরদ, অম্বুবাহ, পাথোদ, গদাম্বর, গাড়ব, বারিমসি, অদ্রি, গ্রাবা, গোত্র, বল, অশ্ল, পুরুভোজা, বালশান, অশ্মা, পর্ব্বত, গিরি, ব্রজ, চরু, বরাহ, শম্বর, রোহিণ, রৈবত, ফরিগ, উপর, উপল, চমস, অহি, অভ্র, বলাহ, মেঘ, দৃতি, ওদন, বৃবন্ধি, বৃত্র, অসুর ও কোশ। উচ্চারণে এই শব্দপুঞ্জ সংস্কৃত ভাষার। একালের বাংলা ভাষায় এর দু-চারটি কালেভদ্রে ব্যবহৃত হয় মাত্র। বাকি সবই অপ্রচলিত। তবে এককালে এগুলো ছিল ওজস্বী দেবভাষার অলংকার।

মেঘ কাকে বলে? সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে নগেন্দ্রনাথ বসু লিখেছেন :

স্বনামখ্যাত দ্রব পদার্থ, যে সিঞ্চন বা জলবর্ষণ করে তাহাকে মেঘ কহে। মেঘ ও কুয়াশার সৃষ্টি হয় প্রায় একইভাবে। পার্থক্য কেবল কালের এবং বাষ্পীয় জলকণার অবস্থাভেদ। বাংলাদেশে মেঘ জমে সাধারণত

গ্রীষ্ম-বর্ষা-শরতে আর কুয়াশা হেমন্ত ও শীতে। বসন্তঋতুতে মেঘ ও কুয়াশা মিলেমিশে থাকে। সূর্যের উত্তাপে সমুদ্রের জলবিন্দু বাষ্প হয়ে বিচরণ করে আকাশে। গ্রীষ্মবর্ষায় এই জলবিন্দু শীতলতার স্পর্শে ঘনীভূত হয়ে মেঘ ও বৃষ্টির সৃষ্টি করে। হেমন্ত ও শীতে বাষ্পীয় জলকণা ঘনীভূত ও আকাশমুখী হয় না, থাকে মাটির কাছাকাছি।

এ-কারণে মেঘের রং কালো, কুয়াশা ধোঁয়াটে। ঘন মেঘ জলবর্ষণ করে, তরল কুয়াশা বুদ্বুদের মতো শিশিরবিন্দু ছড়ায়।

আষাঢ়-শ্রাবণ মাস জুড়ে বর্ষার সরব ও সাড়ম্বরপূর্ণ স্থিতিকাল। আকাশে সঘন মেঘের ঘনঘটা – ক্ষণে ক্ষণে গগন ও মেঘের রং-রূপের রূপান্তর, ঘনঘন কাড়ানাকাড়ার মতো দেয়া-গর্জন! আবহাওয়া-বিজ্ঞান বলে, ভারত মহাসাগর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের ফলে বাংলাদেশে আসে বর্ষা। এই বায়ুপ্রবাহ বঙ্গোপসাগর হয়ে বঙ্গীয়

ব-দ্বীপের ওপর দিয়ে বয়ে যায় উত্তরের হিমালয় পর্যন্ত। এরই ফল বর্ষাঋতু ও এর বিপুল বর্ষণ।

দুই

সেই আদিকালে, বিশ^জগৎ সৃষ্টির অজানা অধ্যায়ে, যখন প্রাণের অস্তিত্ব ছিল না, প্রাকৃতিক নিয়মে সূচনা হয়েছিল ঋতুচক্রের আবর্তন। বহু কোটি বছর ধরে এই জাগতিক ঘূর্ণাবর্ত, ষড়ঋতুর আসা-যাওয়া চলছে বিরামহীনভাবে। চক্রাকারে চলছে গ্রীষ্মের পর বর্ষা, শীতের পর বসন্ত, আসে উত্তরায়নের দিন, আসে মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের কাল। এই ভূভাগে উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে প্রবাহিত হতে থাকে জলজ বাতাস। জলকণা জমতে থাকে গগনের গায়, পর্বতের কায়ায়। প্রকৃতিকে ভালোবাসার চুম্বনে সিক্ত করে মৃত্তিকামাতাকে রজঃস্বলা করতে শুরু মেঘ থেকে বৃষ্টিপাত।

বাঙালির মন যেন পাললিক মৃত্তিকায় গড়া। তার ভাবালুতায় বাউলেপনা, অন্তরে উদাসীনতা, অন্তরে হরিৎ রং। বর্ষার প্রকৃতি যেন তার মনে সজীব সবুজের ছোঁয়া দিয়ে যায়। মনের জমিনে গোপনে অগণন রঙিন ফুল ফোটায়। তাই বর্ষার সঙ্গে বাঙালিমনের সুগভীর সম্পর্ক। মন দেওয়া-নেওয়ার ঋতু বর্ষা, মন কেমন-করা ভাবের ঋতু

বর্ষা – প্রেম-বিরহের ঋতুও বর্ষা। প্রিয়জনের সঙ্গলাভে প্রেমের অঙ্কুরোদয়, নিঃসঙ্গতায় বিরহের উদ্গিরণ। প্রেম শীতলতা, সরসতা ও মধুরতায় টইটম্বুর। বিরহ অপ্রাপ্তির লাভাময় তাপদগ্ধতা ও সঙ্গসুখহীনতার বেদনাবিষাদে ভরা। গগন-ছাপানো মেঘ যখন গুরুগর্জনে আকাশ-কাঁপিয়ে অজস্রধারায় নেমে আসে তখন যুগপৎ প্রেম-বিরহের অনুভবে আবিষ্ট হই আমরা! যেন মেঘের পালকিতে চড়ে আসে আষাঢ়-শ্রাবণ। আকাশভরা কালো মেঘ নিয়ে আসে আষাঢ়, আর বিপুল বর্ষণের সজল ভালোবাসা নিয়ে আসে শ্যামস্নিগ্ধ শ্রাবণ।

সেই কবে কেটে গেছে কালিদাসের কাল, বিলীন হয়নি এই মহাকবি-রচিত মেঘদূতের চিরকালীন আবেদন, নিঃশেষিত হয়নি যক্ষের মর্মবেদনা। বন্ধ হয়নি পূর্বমেঘ-উত্তরমেঘের আগমন-নির্গমন। চিরন্তন প্রেম-বিরহের অনুভব যক্ষ ও যক্ষপ্রিয়ার হৃদয় থেকে যুগ-যুগান্তরে সঞ্চারিত হয়েছে একালের প্রেমিক-প্রেমিকার তৃষিত অন্তরে। কালিদাস বর্ষাকালীন মেঘকে পত্রদূত হিসেবে কল্পনা করেছেন। রামগিরি পর্বতে নির্বাসিত যক্ষ। মেঘ হলো তার দূত। এই দূতের মাধ্যমে অলকাপুরীতে থাকা প্রিয়ার কাছে প্রেমাকাক্সক্ষার অসীম আকুতি প্রেরণ করেছে। এই প্রেমাকাক্সক্ষার গভীরতা ও বিরহের ব্যাপ্তি ব্যাখ্যাতীত এবং অনির্বচনীয়। গদ্যানুবাদে মহাকবি কালিদাসের মেঘদূতের মর্মবাণীতে পাই :

প্রেয়সী আমার! একবারটি চেয়ে দেখ, কাম-পিয়াসীদের পরম প্রিয় বর্ষাকাল এসেছে। ঐ দেখ, আকাশের গায়ে ঘন কালো মেঘরাশি কেমন ঝুলছে! আবার কোথাওবা গর্ভবতী নারীর দুগ্ধের স্ফীত স্তনের মতো প্রভা নিয়ে অবস্থান করছে।…

মেঘমালা দশদিক আবৃত করে রাত্রির অন্ধকার যেন শতগুণ বৃদ্ধি করেছে। বিদ্যুতের ক্ষণিক আলো সম্বল করেও অভিসারিকা কামিনীরা কোনোরকমে পথ হাতড়ে-হাতড়ে প্রেমিক-নির্ধারিত স্থানের দিকে ছুটছে। কামিনীরা আজ খুব জব্দ হয়েছে। অপরাধী পতির সঙ্গে শুয়ে ক্ষোভবশত পাশ ফিরেছিল। অকস্মাৎ মেঘের গর্জনে অনন্যোপায় হয়ে ভীতসন্ত্রস্ত মনে তাড়াতাড়ি পাশ ফিরে অপরাধী পতিকেই জড়িয়ে ধরছে। …

প্রিয়তমে, লক্ষ কর, রূপসীদের আজ কী সুন্দরই না লাগছে। স্তনোন্নত ও মনোলোভা কুচাগ্রে কেমন ফুলমালা শোভাবর্ধন করছে, আর সুপ্রশস্ত নিতম্বদেশে শুভ্র চিক্কণ বসন শোভা পাচ্ছে, আবার জলকণার সংস্পর্শে রোমাবলি ত্রিবলি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে কী অপরূপ শোভামণ্ডিতই না করে তুলেছে! প্রিয়তমে, বর্ষার মন-পাগল-করা বাতাস প্রবাসীদের বিরহ-জ্বালা দূর করতে বদ্ধপরিকর। প্রিয়তমে, ভোগ লালসাপূর্ণ কামিনীদের মনোরঞ্জক বর্ষাকাল তোমার যাবতীয় কামনা-বাসনা সার্থকতায় পরিপূর্ণ করে তুলুক।

– কালিদাস।

বিদ্যাসাগরের পর বাংলা গদ্যের শিল্পিত ও পরিশীলিত লেখক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। শুধু উপন্যাস নয়, তাঁর রসরচনা এবং প্রবন্ধসাহিত্যও শৈল্পবিচারে শিখরস্পর্শী। তিনি ‘মেঘ ও বৃষ্টি’ শীর্ষক দু-পর্বে একটি ছোট্ট প্রবন্ধ লিখেছিলেন। এর রচনারীতি অত্যন্ত চমৎকার। মেঘ ও বৃষ্টির ওপর বঙ্কিমচন্দ্র গুরুত্বারোপ করেছেন। প্রকৃতির এই রূপকে তিনি মানুষরূপে কল্পনা করে ওদের মুখে সংলাপ জুড়ে দিয়েছেন। পুরো লেখাটি মেঘ ও বৃষ্টির জবানিতে স্বগত সংলাপ। প্রথম পর্বে মেঘ বলছে :

দেখ, আমার কি যন্ত্রণা নাই? এই দারুণ বিদ্যুদগ্নি আমি অহরহ হৃদয়ে ধারণ করিতেছি। আমার হৃদয়ে সেই সুহাসিনীর উদয় দেখিয়া তোমাদের চক্ষু আনন্দিত হয়, কিন্তু ইহার স্পর্শ মাত্রে তোমরা দগ্ধ হও। সেই অগ্নি আমি হৃদয়ে ধরি! আমি-ভিন্ন কাহার সাধ্য এ আগুন হৃদয়ে ধরে? …

কালিদাসাদি যেখানে আমার স্তাবক, সেখানে আমি বৃষ্টি করিব না কেন?

দ্বিতীয় পর্বে বৃষ্টি বলছে :

চল নামি – আষাঢ় আসিয়াছে – চল নামি। …

দেখ ভাই, কেহ একা নামিও না – ঐক্যই বল – নহিলে আমরা কেহ নই। চল – আমরা ক্ষুদ্র বৃষ্টিবিন্দু – কিন্তু পৃথিবী রাখিব। শস্যক্ষেত্রে শস্য জন্মাইব – মনুষ্য বাঁচিবে। নদীতে নৌকা চালাইব – মনুষ্যের বাণিজ্য বাঁচিবে। তৃণলতা বৃক্ষাদির পুষ্টি করিব – পশুপক্ষী কীটপতঙ্গ বাঁচিবে। আমরা ক্ষুদ্র বৃষ্টিবিন্দু – আমাদের সমান কে? আমরাই সংসার রাখি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন অনুপম বর্ষাবিলাসী। গান-গদ্য-কাব্যের অগণিত চরণে তাঁর বর্ষা-বন্দনা বিধৃত। বর্ষার রূপরস, মায়ামাধুর্য, প্রেমবিরহ তাঁর কবিহৃদয়ের তন্ত্রীতে বিচিত্র সুরেছন্দে বেজে উঠেছে। আষাঢ়-শ্রাবণ রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ঋতু বলেই তাঁর কবিতায় বৃষ্টির নূপুরনিক্বণ, গানে বর্ষার জলতরঙ্গ, গল্পে শ্রাবণের সারেঙ্গী। কবির প্রবন্ধেও বাদল-বৃত্তান্ত কম নেই। মহাকবি কালিদাসের মেঘদূত তাঁকে আজীবন আবিষ্ট করে রেখেছিল। ‘নববর্ষা’ প্রবন্ধটি এই সত্যের সাক্ষ্য।

কর্মহীন অলস সময়ে বাঙালিরা আড্ডাপ্রিয়। গল্প-গুজবে কাল-গুজরান করতে আমাদের জুড়ি নেই। আর সময়টি যদি হয় ক্লান্তিহীন ঘন বর্ষার, তবে তো পোয়াবারো! বাঙালি লেখকদের মধ্যে আড্ডাবাজিতে অবিসংবাদী মহারাজ সৈয়দ মুজতবা আলী। তিনি বিদেশি বন্ধুদের সঙ্গে তেমন একটি আড্ডায় শেষমেশ মোক্ষম কথাটি বলেছেন :

ওরে মূর্খের দল, জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য বিরহ। আর বিরহ কারে কয়, সেকথা কী করে জানবি মেঘ না জমলে, বৃষ্টি না ঝরলে? আর শেষ তত্ত্বকথা কবিতা কী করে উৎরাবে বিরহবেদনা যদি মানুষকে পাগল না করে তোলে?

আজো ভাবি, আমাদের পদাবলী, জয়দেব, কালিদাস, শূদ্রক যে বিরহবর্ণনা রেখে দিয়েছেন তার সঙ্গে তো অন্য কোনো সাহিত্যের বিরহবর্ণনার তুলনা হয় না।

তিন

প্লটের দিক থেকে বাংলার যে গল্প-উপন্যাস পল্লী-প্রকৃতির মায়াচ্ছন্ন, নদীনির্ভর ও ভাটিঅঞ্চল-কেন্দ্রিক তাতে বর্ষার অনুভূতি এবং বর্ণনা-বিবরণে সয়লাব। লেখকের বর্ষানুভব তাতে ঘটনা ও চরিত্রের পরতে-পরতে প্রাণসঞ্চার করেছে। বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, বিভূতিভূষণ, শরৎচন্দ্র, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, অদ্বৈতমল্ল বর্মণ – এইসব ক্ল্যাসিক কথাকারের রচনায় বাংলার বর্ষার রূপ যেন প্রাচীন অলংকারের মধ্যে মিনা-করা বহুবর্ণিল কারুকাজ। তবে রবীন্দ্রনাথের বর্ষাবর্ণনায়, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে – কবিতা, কথাসাহিত্য, প্রবন্ধ যেখানেই হোক – বন্দনা ছাড়া নিন্দা নেই, নেতিবাচকতা নেই, বর্ষাকালীন অসুখ-বিসুখ, জীবনযন্ত্রণা বা জনদুর্ভোগের কথা নেই! রবীন্দ্রোত্তর কথাসাহিত্যে অবশ্য সেসবের জীবনবাস্তব চালচিত্র মেলে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অধিকাংশ ছোটগল্প বর্তমান বাংলাদেশের নদীমাতৃক গ্রামবাংলার পটভূমিতে রচিত বলেই বর্ষা তার রক্তমাংসমজ্জায়।

বাংলা ভাষার কালজয়ী কথাশিল্পীদের রচনা থেকে বর্ষা-বর্ণনা নিদর্শন উল্লেখ করতে গেলে এ-লেখার আকৃতি হবে বিশাল এবং অনিয়ন্ত্রিত। তাই কয়েকটি গদ্যাংশ উদ্ধৃত করা হলো :

‘বর্ষাকাল ঘনাইয়া আসিল। বর্ষাঋতুটা মোটের উপরে শহুরে মনুষ্যসমাজের পক্ষে তেমন সুখকর নহে – ওটা অরণ্যপ্রকৃতির বিশেষ উপযোগী; শহরের বাড়িগুলা তাহা রুদ্ধ বাতায়ন ও ছাদ লইয়া, পথডক তাহার ছাতা লইয়া, ট্রামগাড়ি তাহার পর্দা লইয়া, বর্ষাকে কেবল নিষেধ করিবার চেষ্টায় ক্লেদাক্ত পঙ্কিল হইয়া উঠিতেছে।

নদী-পর্বত-অরণ্য-প্রান্তর বর্ষাকে সাদর কলরবে বন্ধু বলিয়া আহ্বান করে। সেইখানেই বর্ষার যথার্থ সমারোহ – সেখানে শ্রাবণে দ্যুলোক-ভূলোকের আনন্দসম্মিলনের মাঝখানে কোনো বিরোধ নাই। – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

* ‘সেদিন শ্রাবণের সংক্রান্তি। সকার হইতে ঘন বৃষ্টিপাতের আর বিরাম ছিল না। তিন দিন জ্বর-ভোগের পর বিরাজ ক্ষুধা-তৃষ্ণায় আকুল হইয়া সন্ধ্যার পর বিছানায় উঠিয়া বসিল।… আর কিছুতেই শুইয়া থাকিতে না পারিয়া, সন্ধ্যা জ্বালিয়া দিয়া একটা গামছা মাথায় ফেলিয়া কাঁপিতে কাঁপিতে বাহিরের পথের ধারে আসিয়া দাঁড়াইল। বর্ষার অন্ধকারের মধ্যে যতদূর পারিল চাহিয়া দেখিল, কিন্তু কোথাও কিছু দেখিতে না পাইয়া ফিরিয়া আসিয়া ভিজা কাপড়ে, ভিজা চুলে, চণ্ডীমণ্ডপের পৈঠায় হেলান দিয়া বসিয়া এতক্ষণ পরে ফুকারিয়া কাঁদিয়া উঠিল।’ – শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

* ‘দিন রাত সোঁ-সোঁ শব্দ – নদীর জল বাড়ে – কত ঘরদোর কত জায়গায় যে পড়িয়া গেল। নদী-নালা জলে ভাসিয়া গিয়াছে – গোরু-বাছুর গাছের তলে, বাঁশবনে, বাড়ির ছাঁততলায় অঝোরে দাঁড়াইয়া ভিজিতেছে, পাখ-পাখালির শব্দ নাই কোনোদিকে! চার-পাঁচদিন সমানভাবে কাটিল – কেবল ঝড়ের শব্দ আর অবিশ্রান্ত ধারাবর্ষণ! অপু দাওয়ায় উঠিয়া তাড়াতাড়ি ভিজা মাথা মুছিতে মুছিতে বলিল – আমাদের বাঁশতলায় জল এসেচে দিদি, দেখবি? দুর্গা কাঁথা মুড়ি দিয়া শুইয়াছিল – না উঠিয়াই বলিল – কতখানি জল এসেচে রে? অপু বলে, তোর জ্বর সারলে কাল দেখে আসিস। তেঁতুলতলার পথে হাঁটুজল। – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

* ‘এই বর্ষার সুরে বাঁধা!… সামনে আমার গভীর বন। সেই বনে ময়ূরে পেখম ধরেছে, মাথার ওপর বলাকা উড়ে যাচ্ছে, ফোটা কদম ফুলে কার শিহরণ কাঁটা দিয়ে উঠছে, আর কিসের ঘন-মাতাল-করা সুরভিতে নেশা হয়ে সারা বনের গা টলছে!… এটা শ্রাবণ মাস, না? – আহা, তাই অন্তরে আমার বরিষণের ব্যথাটুকু ঘনিয়ে আসছে!’ 

– কাজী নজরুল ইসলাম

* ‘কুবের উঠানে নামিয়া গেল। বৃষ্টিতে ভিজিয়া ভিজিয়া উঠানটা কাদা ও পিছল হইয়া আছে। গৃহাঙ্গনের এই নোংরা পচা পাঁকের চেয়ে নদীতীরের কাদা অনেক ভাল। সেই কাদায় হাঁটু পর্যন্ত ডুবিয়া গেলেও যেন এরকম অস্বস্তি বোধ হয় না। বাড়ির পাঁকে পায়ে হাজা হয়। পাঁক ঘাঁটিয়া যাহার জীবিকা অর্জন করিতে হয়, সে পাঁকের সংস্পর্শেই তাহারও পা কুটকুট করে। আকস্মিক ক্রোধে কুবের ছেলেমানুষের মত উঠানে একটি লাথি মারিল। পায়ের পাতার একটা পরিষ্কার ক্রোধের ছাপ মাত্র উঠানে পড়িল, আর কিছু হইল না।

আঁতুড় হইতে ক্ষীণস্বরে মালা বলিল, আ গো যাইও না, শুইনা যাও। চালা দিয়া ঘরে জল পড়ছে? ছনগুলা লইয়া যাও, বিছানার তলে ছন দেওন না দেওন সমান।’ – মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

* ‘চৈত্রের খরার বুকের বৈশাখের বাউল বাতাস বহে। সেই বাতাস বৃষ্টি ডাকিয়া আনে। আকাশে কালো মেঘ গর্জায়। লাঙল-চষা মাঠ-ময়দানে যে ঢল হয়, তাতে উপচাইয়া তার জলধারাস্রোতে বহিয়া তিতাসের উপর আসিয়া পড়ে। মাঠের মাটি মিশিয়া সে-জলের রঙ হয় গেরুয়া। সেই জল তিতাসের জলকে দুই এক দিনের মধ্যেই গৈরিক করিয়া দেয়। সেই কাদামাখা ঠাণ্ডা জল দেখিয়া মালোদের কত আনন্দ। মালোদের ছোট ছোট ছেলেদেরও কত আনন্দ। মাছগুলি অন্ধ হইয়া জালে আসিয়া ধরা দেয়। ছেলেরা মায়ের শাসন না মানিয়া কাদাজলে দাপাদাপি করে। এই শাসন না মানা দাপাদাপিতে কত সুখ! খরার পর শীতলের মাঝে গা ডুবাইতে কত আরাম।’ – অদ্বৈত মল্লবর্মণ

বর্ষার ভয়াবহ দানবীয় প্রকাশ ও মায়াময় প্রেমজ প্রকাশ – এই দুই রূপই লক্ষ করা যায় বাংলা কথাসাহিত্যে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্পে এর প্রকাশ আরো ঘনীভূত ও সুসংহত। অধিকাংশ রবীন্দ্রগল্প বাংলাদেশের পদ্মাপারের প্রাণপ্রকৃতি ও জনজীবনের পটভূমিতে রচিত বলে নদী ও বর্ষার রূপায়ণ ঘটেছে সুনিপুণভাবে। তাঁর বর্ষা-সম্মোহিত ও বৃষ্টির আভরণে অলংকৃত গল্পগুলোর কথা স্মরণ করা যেতে পারে : ‘পোস্টমাস্টার’, ‘অতিথি’, ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন, একরাত্রি, ছুটি, ঘাটের কথা, একটা আষাঢ়ে গল্প, মহামায়া, মধ্যবর্তিনী, শাস্তি, আপদ প্রাণরক্ষা, বোষ্টমি, বলাই ইত্যাদি। রবীন্দ্রোত্তর, তিরিশোত্তর, সাতচল্লিশোত্তর এবং মুক্তিযুদ্ধোত্তর ছোটগল্পে বৃষ্টি ও বর্ষার বর্ণনা ঘটনার অনুষঙ্গে কমবেশি চিত্রিত হয়েছে। অগণিত মানুষের চোখের জল ও রক্তেমাখা বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের কথাসাহিত্যেও বর্ষার জল-ঝড়, বজ্র-বিদ্যুৎ-বন্যার ঘনঘটা। তৎক্ষণাৎ মনে পড়ে… ‘রাইফেল রোটি আওরাত’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ’ এবং হুমায়ূন আহমদের ‘জ্যোৎস্না ও জননীর গল্প’-এর কথা। বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধকালে বৃষ্টি-বর্ষা, আষাঢ়ে রাত, শ্রাবণ মেঘের দিন, প্লাবন, জলস্রোত ছিল প্রকৃতি-প্রদত্ত মুক্তিযোদ্ধা। বর্ষা নামক এই প্রাকৃতিক মুক্তিযোদ্ধা একাত্তরে ছিল বাঙালি গেরিলাদের বান্ধব এবং দখলদার পাকসেনাদের প্রাকৃতিক শত্রু। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘রেইনকোট’ গল্পে এর পরিচয় পাওয়া যায় :

তখন তো ঘোরতর বর্ষাকাল, ঢাকায় এবার বৃষ্টিও হয়েছে খুব। রাতদিন এই বৃষ্টি নিয়ে সে কি যেন বলেছিল, তাতে কুলিটা বিড়বিড় করে ওঠে, ‘বর্ষাকালেই তো জুৎ’। কথাটা দুবার বলেছিল। এর মানে কী? স্টাফরুমে কে একজন একদিন না দুদিন ফিসফিস করছিল, বাংলার বর্ষা তো শালারা জানে না। রাশিয়ার ছিল জেনারেল উইনটার, আমাদের জেনারেল মনসুন।

চার

বৈষ্ণব সাহিত্যের কালিক আবহ প্রধানত মেঘবৃষ্টিবর্ষা এবং আষাঢ়-শ্রাবণ ও ভাদ্রকে ঘিরে। প্রেমের পূর্বরাগ, অনুরাগ, মান-অভিমান, অভিসার, লীলা, বিরহমিলন, প্রণয়স্বপন সবই বর্ষাকেন্দ্রিক, আষাঢ়ী আঁধারে, শ্রাবণনিশীথে, বৃষ্টিপিচ্ছিল কালিন্দীর কূলে। তাই মধ্যযুগের আদিকবি বড়ু চণ্ডীদাস থেকে জয়দেব, বিদ্যাপতি, গোবিন্দ দাস, জ্ঞানদাস, দ্বিজ চণ্ডীদাস, দীন চণ্ডীদাস, সকলেই প্রেমগাথায় মেঘাবৃত, বৃষ্টি-বিমোহিত এবং বর্ষাবিগলিত। মধ্যযুগের গীতিকবিতা ও প্রেমগান থেকে মেঘমল্লারের অজস্র উদাহরণ সংগ্রহ করা যায় কিন্তু তা হবে বর্ষার অলস দিনের মতোই ক্লান্তিকর। তাই কয়েকটিমাত্র বিদ্যুৎ-চমকিত ও চুম্বকীয় উদ্ধৃতি :

* সজনি ভাল করি পেখন না ভেল।

মেঘমালা সঞে তড়িৎলতা জনু

হৃদয়ে শেল দেই গেল। – বিদ্যাপতি

* কণ্টকগাড়ি কমলসম পদতল

মঞ্জীর চীরহি ঝাঁপি।

গাগরি বারি ঢারি পরি করি পীছল

চলতহি অঙ্গুলি চাপি।

মাধব তুয়া অভিসারক লাগি।

– গোবিন্দ দাস

* এ ঘোর রজনী     মেঘের ঘটা

কেমনে আইল বাটে

আঙ্গিনার মাঝে     বঁধুয়া ভিজিছে

দেখিয়া পরাণ ফাটে।

– চণ্ডীদাস

* এঘোর রজনী     মেঘ গরজনি

কেমনে অওব পিয়া।

শেজ বিছাইয়া     রহিলুুঁ বসিয়া

পথপানে নিরখিয়া।

– জ্ঞান দাস

* এ সখি, হামারি দুখের নাহি ওর।

এ ভরা বাদর মাহ ভাদর শূন্য মন্দির মোর।

ঝম্পি ঘন গরজন্তি সন্ততি ভুবন ভরি বরিখন্তিয়া।

কান্ত পহুন কাম দারুণ সঘনে খরশর হন্তিয়া॥

কুলিশ কত শত পাত মোদিত মৌর নাচত মাতিয়া।

মত্ত দাদুরি ডাকে ডাহুকী ফাটি যাওত ছাতিয়া॥

– বিদ্যাপতি

* আষাঢ় মাসে নবমেঘ গরজএ।

মদন কদনে মোর নয়ন ঝুরএ॥

পাখি জাতী নহোঁ ছড়ায়ি উড়ী জাওঁ তথা।

মোর প্রাণনাথ কাহ্নাঞি বসে যথা।

কেমনে বঞ্চিবোঁ বরিষা চারি মাস।

এ ভরা যৌবন কাহ্ন করিলে নিরাশ॥

শ্রাবণ মাসে ঘন ঘন বরিষে।

সেজাত সুতিয়াঁ একসরী নিন্দ না আইসে॥

– বড়ু চণ্ডীদাস

ঋতুর সঙ্গে মানবমনের সম্পর্ক গভীর – বর্ষার সঙ্গে গভীরতর। বর্ষা কাক্সিক্ষত প্রেমের ঋতু, অভিসারের ঋতু, বর্ষা বিরহেরও। অবিরাম বারিধারা যেন প্রকৃতির সরব ক্রন্দন। তাই বর্ষণনিমগ্ন দিনে প্রেমাস্পদ কৃষ্ণমিলনের আকাক্সক্ষায় রাধিকার মৌনপ্রতীক্ষা ব্যর্থতায় বিলীন। প্রেমাসক্ত হৃদয়ের এই প্রার্থনা ও অপ্রাপ্তি থেকে বিরহের জন্ম। প্রেম ও বিরহ একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। চিরকালের মানবাত্মার এই আর্তি রাধার মাধ্যমে বৈষ্ণব পদকর্তারা সুগভীর অনুভবের সঙ্গে ব্যক্ত করেছে ন। ঋতুচক্রের বিভিন্ন  মাস ধরে তারা মনের  প্রেমাকাক্সক্ষা ও বিষণ্নতার স্বরূপ বর্ণনায় করেছেন। লেখাই বাহুল্য, তাতে বর্ষাকালের বর্ণনার প্রভাব ও প্রাধান্য বেশি। তাই রাধা শুধু বর্ষাসিক্ত নয়; বর্ষাক্রান্ত, বৃষ্টিপীড়িত ও বর্ষাহত।

পাঁচ

সেই কবে কেটে গেছে কালিদাসের কাল, কিন্তু নিঃশেষিত হয়নি মানবহৃদয়ের আর্তি, বিলীন হয়নি

প্রেমিক-প্রেমিকার মিলনাকাক্সক্ষা, মৃত্যু ঘটেনি যক্ষ ও যক্ষপ্রিয়ার মনোযাতনা! বিলয় হয়নি পূর্বমেঘ-উত্তরমেঘের আগমন-নির্গমন। এই মেঘের ভাসমান পালকিতে চড়ে বাংলায় আসে আষাঢ়-শ্রাবণ। আকাশভরা কাজলকালো মেঘ নিয়ে আসে আষাঢ়, আর বিপুল বর্ষণের সজল ভালোবাসা নিয়ে আসে শ্যামস্নিগ্ধ শ্রাবণ। ধীরলয় থেকে দ্রুতলয়ে ক্রমাগত বাজতে থাকে বৃষ্টির নূপুর। কখনো বৃষ্টি নামে রিমঝিমিয়ে আদরের কোমল পরশ বুলিয়ে, কখনো বাত্যাবিক্ষুব্ধ ঝড়ের দামামা বাজিয়ে। যেন ‘মেঘের অম্বরে বাজিছে ডম্বরু’ কিংবা ‘গুরুগুরু মেঘ গুমরিগুমরি গরজে গগনে গগনে’। বাঙালির জীবনে বর্ষার প্রসঙ্গ এলেই যেমন মনে পড়ে যায় মহাকবি কালিদাস এবং তাঁর কালজয়ী মেঘদূতের কথা, তেমনই বর্ষাবন্দনার অনুষঙ্গ এলে অনিবার্যভাবে আসন পাতেন রবীন্দ্রনাথ। মেঘ-বৃষ্টি-বর্ষার প্রসঙ্গে, কী কথায়, কী কবিতায়, কী গানে, কোথায় নেই রবীন্দ্রনাথ? বাংলার গ্রীষ্ম প্রসব করেছে রবীন্দ্রনাথকে, বর্ষা ঘটিয়েছে দেহের বিলয়। কিন্তু অমরত্ব দিয়েছে বাংলার ভাষা ও বাণী এবং কালি ও কলমের অবিনশ^র সৃষ্টি। ঋতুবিষয়ক সৃষ্টিশীলতায় বর্ষার রূপায়ণে রবীন্দ্রনাথ অনন্য। তাঁর সৃষ্টির বহুলাংশে বর্ষার বিস্তার, বর্ণনায় বৃষ্টির আধিপত্য।

সৃষ্টি ও ভাবের বৈচিত্র্যের কথা বিবেচনা করে বুদ্ধদেব বসু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বলেছেন, ‘হাজার দুয়ারি’।

রবীন্দ্র-সাহিত্যের সহস্র দরোজার মধ্যে সিংহ-দ্বার তাঁর বর্ষাভাবনা। কবিতা, কথাসাহিত্য, গান, নাটক, ভ্রমণকাহিনি, প্রবন্ধ, জীবনস্মৃতি – সর্বত্রই কমবেশি মেঘবৃষ্টি ঝড়বাদল ও বর্ষার অনুষঙ্গ। মহাকবি কালিদাসের মেঘদূতের প্রকৃতি ও প্রেমবিরহ তাঁর ভাবনায় আমৃত্যু উজ্জ্বল ছিল। মেঘের মায়াচ্ছন্নতা, বৃষ্টির বিলোল ছন্দ ও বর্ষার বিবাগী চেতনা রবীন্দ্রনাথকে সৃষ্টিমুখর করেছে।

ঋতুভিত্তিক কবিতা ও গানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রয়েছে বিপুল সম্ভার। সংখ্যাতাত্ত্বিক বিচারে তো বটেই, বর্ষণসিক্ত হৃদয়ের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভাবপ্রকাশে এবং শিখরচূড় শিল্পোৎকর্ষেও তাঁর মেঘাক্রান্ত ও বর্ষণস্নিগ্ধ রচনা অতুলনীয়। রবীন্দ্র-কাব্যপরিক্রমায় লক্ষ করা যায়, মেঘবৃষ্টি-বর্ষাকে তিনি নানা প্রতিশব্দে ও বানানে প্রকাশ করেছেন। সেসব পেলব-কোমল শব্দগুলো হলো : বিষ্টি, বিষ্টি, বাদল, বর্ষণ, বরিষণ, ঘন, বরষা, আষাঢ়, শ্রাবণ, শাওন, শাঙন, জলধারা, বারিধারা, বারিপাত, বারিঝরা, দেয়া, ভরাভাদর ইত্যাদি।

সংখ্যাতাত্ত্বিক বিচারে লক্ষ করা যায়, রবীন্দ্রনাথের গীতবিতানের প্রকৃতি-পর্যায়ে ঋতুভিত্তিক গানে সবচেয়ে বেশি বর্ষার গান – একশ তেরোটি। কবির বর্ষার কবিতা থেকে কয়েকটি হীরকজ্যোতি চরণ :

* শ্রাবণে গভীর নিশি    দিগ্বিদিক আছে মিশি

মেঘেতে মেঘেতে ঘন বাঁধা,

কোথা শশী কোথা তারা     মেঘারণ্যে পথহারা

আঁধারে আঁধারে সব আঁধা।

* এমন দিনে তারে বলা যায়,

এমন ঘনঘোর বরিষায়।

এমন মেঘস্বরে    বাদল ঝরঝরে

তপনহীন ঘন তমসায়।

* রাত্রি থেকে অঝোর ধারায় বৃষ্টি;

ভোরবেলায় আকাশের রঙ

যেন পাগলের চোখের তারা।

বর্ষার নিসর্গ, নাগরিক রূপ, পল্লীপ্রকৃতি, মনোবীণার বিচিত্র ঝঙ্কার, বর্ষার রুদ্ররূপ, ভীমরূপ,

প্রেম-বিরহ-অভিসার-মিলন, সুখের আশা, বেদনার বিলাপ, সৌন্দর্য-দর্শন – ইত্যাকার রবীন্দ্র-অনুভব সবকিছু তুলে ধরা হয়নি; তা সম্ভবও নয়। বর্ষার গানে রবীন্দ্রনাথের অনুভবতন্ত্রী আরো বেশি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম। মোহন সুর ও মধুময় বাণীর অপূর্ব মণিকাঞ্চনযোগে তিনি মানবমনকে বিগলিত এবং রসসিক্ত করেন। তাঁর বর্ষার গানে যেমন প্রকৃতির শ্যামল স্নিগ্ধ রূপ, মায়াচ্ছন্ন সুরের লাবণ্য, ছন্দের সুললিত শ্রাবণিক মাধুরি, তেমনই বর্ষার রুদ্র ও ভীমরূপের বিলয়-গর্জন! তাঁর বর্ষার কয়েকটি গানের মুখ-চরণ :

* আমার দিন ফুরালো ব্যাকুল বাদলসাঁঝে

গহন মেঘের নিবিড় ধারার মাঝে॥

* আষাঢ়সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল, গেল রে দিন বয়ে॥

বাঁধন-হারা বৃষ্টিধারা ঝরছে রয়ে রয়ে॥

* এই শ্রাবণ-বেলা বাদল-ঝরা যূথীবনের গন্ধেভরা॥

* এসো নীপবনে ছায়াবীথিতলে, এসো করো স্নান নবধারাজলে॥

* ওগো আমার শ্রাবণমেঘের খেয়াতরীর মাঝি,

অশ্রুভরা পুরব হাওয়ায় পাল তুলে দাও আজি॥

* পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে

পাগল আমার মন জেগে ওঠে॥

* বজ্রমানিক দিয়ে গাঁথা আষাঢ় তোমার মালা।

তোমার শ্যামল শোভার বুকে বিদ্যুতেরই জ্বালা॥

* মন মোর মেঘের সঙ্গী

উড়ে চলে দিগ্ দিগন্তের পানে…

* হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে ময়ূরের মতো নাচে রে।

গানের কথায় থাকে বিধিবদ্ধ আকার-আকৃতি – মুখ, অন্তরা, আভোগ ইত্যাদি। বাণীর এই স্তরে-স্তরে থাকে গীতিকারের বিচিত্র ভাবনাবেদন। বাণীর দেহে সুরের প্রলেপনে প্রাণ প্রতিষ্ঠা পায়। সুরকারের ঝংকৃত আভরণ গানের বাণীকে মানুষের মনে সম্ভোগের উপযোগী করে তোলে। রবীন্দ্রনাথের গান সুর ও বাণীর অনবদ্য সম্মিলনে বাঙালির মনের ক্ষুধার অমৃত হয়ে উঠেছে। তাঁর বর্ষার গান কেবল পঞ্চেন্দ্রিয়ের নান্দনিক অনুভবের সম্পদ নয়; এর অন্তরে আছে সুগভীর দার্শনিকতা। কালের গতিতত্ত্ব, প্রকৃতি জীবনচক্র ও সৃষ্টির রহস্য রবীন্দ্রনাথের অন্যান্য পর্বের গানের মতো বর্ষার গানেও প্রাণিদেহের অদৃশ্য রক্তপ্রবাহের মতো বহমান। এখানেই রবীন্দ্রনাথের দার্শনিকতা এবং কবির ষষ্ঠেন্দ্রিয়জাত দর্শনতত্ত্ব। মেঘসঞ্চারের ক্ষণ, বর্ষার প্রতিটি মুহূর্ত, বর্ষণের প্রতিটি পলক, ভাসমান মেঘের সদাপরিবর্তমান বঙ্কিম শরীর, মেঘের বিচিত্র দেহভঙ্গিমা, আঁকাবাঁকা মেঘ-মানচিত্র, শীতল বৃষ্টির সুধাময় বিন্দু রবীন্দ্রনাথ মনোবীণায় ধারণ করে সংগীতপ্রেমিক বাঙালির চিরকালের মানস-সম্পদ করে রেখেছেন।

ছয়

কবিতা ও সংগীতে কাজী নজরুল ইসলামের বর্ষাবন্দনা যথেষ্ট উজ্জ্বল। বাণীর কারিশমা বরং সুরের সংবেদনে তিনি বাংলা গানে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। মাত্র বাইশ বছর তাঁর সাহিত্য-সাধনার কাল! এই স্বল্পসময়ে নজরুলের বিপুল ও বহুমুখী সৃষ্টিসম্ভারের মধ্যে তাঁর গানের সংখ্যাই তিন সহস্রাধিক! ঋতুভিত্তিক গানের মধ্যে বর্ষার গান সংখ্যাগুরু। ‘ঝাঁকড়া চুলের বাবড়ি-দোলানো’ এই কবি বৃষ্টিবন্ধু বাতাসের মত্ত ঝাপটার মতো ঝড়ের গতিতে ছুটে আসেন। বর্ষা আগমনের সাইরেন বাজায় কালবৈশাখি, দাদামা বাজায় জ্যৈষ্ঠের ঝড়। বাংলার প্রকৃতির এই দুই বাউণ্ডুলের সম্মিলিত প্রবল শক্তিসাহস বুকে ধারণ করে নজরুলের আগমন। তাঁর কবিতা থেকে কথাশিল্প, পত্রালাপ থেকে পত্রোপন্যাস, গল্প থেকে গান – সর্বত্রই কমবেশি বর্ষা ও বৃষ্টিবাদলের প্রসঙ্গ বিদ্যমান। তবে সঙ্গীতে সঘন বর্ষার বিষয়আশয় বিপুল। নজরুল-সাহিত্যে বর্ষার প্রসঙ্গ বেদনাবিধুরতায় আচ্ছন্ন। বর্ষণসিক্ত কবিতা-গানে তিনি কারুণ্যনির্ঝরতায় বিগলিত। বিরহের কাজলমাখা চোখে এই প্রেমপাগল বর্ষার বীণায় ছন্দহিন্দোল তোলেন বাঙালির কর্ণকুহরে। প্রকৃতির ক্রন্দন বৃষ্টি যেন নজরুলের গানে অশ্রু হয়ে ঝরে। তাঁর বৃষ্টির কান্নাভেজা কবিতাগুলো বেদনায় নীল, আষাঢ়-আক্রান্ত গানগুলো বিরহকাতরতায় বিলাপ-বিহ্বল। সেসব থেকে চয়িত হলো কয়েকটি নিদর্শন :

* ব্যাকুল বনরাজি শ^সিছে ক্ষণে ক্ষণে,

সজনি! মন আজি গুমরে মনে মনে।

বিদরে হিয়া মম

বিদেশে প্রিয়তম,

এ তনু পাখিসম

বরিষা জর-জর।

* তুমি কাঁদিয়াছ ‘বউ কথা কও’ সে কাঁদনে তব সাথে

ভাঙিয়া পড়েছে আকাশের মেঘ গহিন শাওন রাতে।

* বর্ষা ঋতু এল এল বিজয়ীর সাজে।

বাজে গুরু গুরু আনন্দ-ডম্বরু অম্বর মাঝে।।

* রুমঝুম বাদল আজি বরষে

আকুল শিখী নাচে ঘন মেঘ দরশর॥

* সখী বাঁধো লো বাঁধো লো  ঝুলনিয়া।

নামিল মেঘলা মোর বাদরিয়া।

* অঝোর ধারায় বর্ষা ঝরে সঘন তিমির রাতে।

নিদ্রা নাহি তোমায় চাহি আমার নয়ন-পাতে।

* শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে

বাহিরে ঝড় বহে, নয়নে বারি ঝরে

* শ্যামা তন্বী আমি মেঘ-বরনা

মোর দৃষ্টিতে বৃষ্টির ঝরে ঝরনা॥

* শাওন আসিল ফিরে, সে ফিরে এল না

বরষা ফুরায়ে গেল, আশা তবু গেল না॥

নজরুল-সংগীতের এমন শতশত বর্ষাস্নিগ্ধ চরণ অনায়াসে উল্লেখ করা যায়। বাংলার বর্ষার রূপবৈচিত্র্যের তো অন্ত নেই! মেঘেরও অনেক রং, অনেক রূপ! সাদা মেঘ, কালো মেঘ, রঙধনুরঙা মেঘ, ছুটে চলা মেঘ, দ্রুত রূপান্তরশীল মেঘ, তিমিরকুন্তলা মেঘ – আরো কতো কী! সূর্য বন্দি থাকে মেঘের কারাগারে। আষাঢ়ের সেই আবছা আলোতে ছায়াচ্ছন্ন থাকে পৃথিবী। শ্রাবণের ঘনঘোর অন্ধকার ঢেকে রাখে প্রকৃতি-সংসার। বৃষ্টিমুখর রাতে সেই আঁধার হয় আরো ঘনীভূত। মাঝেমধ্যে মেঘের জলদগম্ভীর গর্জন – যেন অন্তরীক্ষে প্রচণ্ড যুদ্ধের দামামা। সেইসঙ্গে

ক্ষণপ্রভা-বিদ্যুতের প্রলয়নাচন – যেন আলোর বাঁকা তলোয়ারের অট্টহাসি। নজরুলের গানের বাণীতে এর সবকিছুই আছে বর্ণনায়, উপমা-উৎপ্রেক্ষায় ও চিত্রকল্পে। মানবমনের চিরন্তন প্রেমাকাঙ্ক্ষা, গোপন অভিসার, মিলনেচ্ছা, বিরহজ্বালা তিনি গভীর আবেগী শব্দবিন্যাসে এবং সংবেদী সুরে প্রকাশ করেছেন। এক্ষেত্রে মেঘদূত ও বৈষ্ণব কবিতা উত্তরসাধক তিনি। তবে অভিনব সুরের স্পর্শেই নজরুলের বর্ষার গান কালোত্তীর্ণ নতুন মাত্রা পেয়েছে।

প্রকৃতির সঙ্গে আবেগী-উদাস বাঙালির মনের সম্পর্ক নিবিড়। ঋতুর সঙ্গে আমাদের হৃদয়ের সংযোগ মমতামাখা মিতালির। বর্ষার সঙ্গে এই বন্ধুত্ব কখনো বেহাগের করুণ সুরে বাঁধা, কখনো মধুর মিলনের সুরে রসঘন। নজরুল বাঙালির এই মনস্তত্ত্ব কবিহৃদয় দিয়ে অনুভব করেছিলেন। তাঁর বর্ষার গানের বাণী ও সুরে এরই বাঙ্ময় প্রকাশ। বর্ষার সঙ্গে মানুষের মিত্রতার কার্যকারণ নির্ণয় মনোবিজ্ঞানী ও মহৎ কবির কাজ। নজরুল ইসলাম তাঁর বর্ষার গানে তা-ই সার্থকভাবে করেছেন।

সাত

সাধারণ মানুষ অন্তর্গত আবেগ-অনুভূতি কবিশিল্পীদের মতো লালিত্যময় ভাষায় প্রকাশ করতে পারেন না। তবে তারা অন্তত এটুকু বোঝেন যে, বর্ষায় মন কেমন করে, মনে পড়ে পুরনো দিনের কথা। আদিগন্ত মেঘাবৃত আকাশ, বর্ষণসিক্ত চারপাশ, সারা দিনরাত ঝরঝর, ঝমঝম, টিপটিপ, রিমঝিম – অবিশ্রান্ত বৃষ্টিপাত, যেন গোমরামুখো আকাশের অবিরাম অশ্রুপাত। বৃষ্টির এই কান্নার শব্দ ফেলে-আসা অতীতের কতো সুখস্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। বর্ষায় বাংলার নদনদী, হাওর-বাঁওড়, খালবিল, মাঠঘাট জলমগ্ন হয়ে যায়। অবাধে বাণিজ্যের মাল ও যাত্রীবাহক নৌকা চলে নদী-তীরবর্তী নগর-বন্দর, গ্রামগঞ্জ, হাটবাজার এবং কূলে-উপকূলে। মাঝিমাল্লার কণ্ঠে তখন ভরাবর্ষার জলের মতোই উপচে ওঠে বাংলার মায়াবী লোকসংগীত –

ভাটিয়ালি-ভাওয়াইয়া, মারফতি-মুরশিদি ও গুরুবাদী দেহতত্ত্বের গান। ‘মাঝি বাইয়া যাও রে’ কিংবা ‘মনমাঝি তোর বৈঠা নে রে, আমি আর বাইতে পারলাম না’ – এমন অজস্র বর্ষার গান আছে বাংলার লোকসংগীতের রত্নভাণ্ডারে।

বাংলায় বর্ষা ও বন্যা সহোদর। একজনের মায়াবী ও মাঙ্গলিক রূপ, অন্যজনের করাল ও রুদ্ররূপ। আমাদের কৃষিপ্রধান অর্থনীতিতে বর্ষার সজলতা বরকত আনে কিন্তু বন্যা আনে বৈষয়িক ক্ষয়ক্ষতি, পানিবন্দি মানুষের অসীম দুঃখকষ্ট ও প্রাণহানি। অতিবর্ষণে শ্রাবণে-প্লাবনে হয় সখ্য। যেবার সেই মিতালি রূপ পায় গলাগলিতে সেবার মানুষ হয় গৃহহারা, বাস্তুচ্যুত, ছিন্নমূল। তারও দুঃখময় বর্ণনা আছে লোকগানে। বর্ষার মায়াচ্ছন্ন রূপ গ্রামবাংলার মানুষকেও স্মৃতিকাতর, উদাসী, আবেগী এবং শিল্পিত। অঝোর বর্ষণের সাময়িক কর্মহীনতায় তারা হয়ে ওঠে শিল্পী – অবৈষয়িক সৃষ্টিমুখর। এর পরিচয় পাওয়া যায় জসীম উদ্দীনের ‘পল্লীবর্ষা’ কবিতায়।

কৃষক-শিল্পীদের বর্ণনায় তিনি লিখেছেন :

গাঁয়ের চাষিরা মিলিয়াছে আজি মোড়লের দলিজায়,

গল্পে গানে কী জাগাইতে চাহে আজিকার দিনটায়।

কেহ বসে বসে বাখারি চাঁছিছে, কেহ পাকাইছে রশি,

কেউবা নতুন দুয়ারির গায়ে চাকা বাঁধে কসি কসি।

কেউ তুলিতেছে বাঁশের লাঠিতে সুন্দর করে ফুল,

কেউবা গড়িছে সারিন্দা এক কাঠ কেটে নির্ভুল।

লোকসাহিত্যের অন্যতম শাখা প্রবাদ-প্রবচন। প্রাণপ্রকৃতি ও সমাজমানস সম্পর্কে আদিকাল থেকে মানুষের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান ছন্দোবদ্ধরূপে এর মাধ্যমে প্রকাশিত। অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠ এই লোকবচনগুলো কেবল মৌখিক ভাষার ওপর ভর করে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে একাল পর্যন্ত চলে এসেছে। প্রসঙ্গত ইতিহাসবিদ নীহাররঞ্জন রায় লিখেছেন : ‘… এই বচনগুলি যে খুব প্রাচীন স্মৃতি বহন করে তাহাতে সন্দেহ নাই। কোন কোন ঋতুতে কী শস্য বুনিতে হইবে, কোন শস্যের জন্য কী প্রকার ভূমি, কী পরিমাণের বারিপাত প্রয়োজন, বারিতাপ ও খরাতাপ নির্দেশ, বিভিন্ন শস্যের নাম ও রূপ, আবহাওয়া-তত্ত্ব, ভূতত্ত্ব, কৃৃষিপ্রধান সমাজের বিচিত্র ছবি, ইত্যাদি নানা খবর এই বচনগুলিতে পাওয়া যায়।’

লোকসাহিত্যের প্রবাদ-প্রবচনে প্রচুর ঋতুভিত্তিক প্রসঙ্গ আছে। এর মধ্যে আবার বর্ষাঋতুর অনুষঙ্গ সমধিক।

মেঘ-বৃষ্টিবাদল-বর্ষা আমাদের কৃৃষিপ্রধান দেশে উৎপাদন ও অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত। আবার বর্ষা ও বন্যা যেন সহোদর – একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বর্ষা বাংলার ফসলের সহায়ক, উৎপাদকের জন্য আশীর্বাদ। কিন্তু বন্যা করে ফসলের বিলয়, আনো জনদুর্ভোগ। এসব প্রেক্ষাপটে প্রচুর খনার বচন পাওয়া যায়। প্রাসঙ্গিক কয়েকটি খনার বচন : * আকাশে গোনা তারা/ তয় দেখবে বর্ষার ধারা। * যদি বর্ষে মুষলধারে/ মধ্যসমুদ্রে বগা চড়ে। * যদি বর্ষে  ছিটেফোঁটা/ পর্বতে হয় মীনের ঘটা। * যদি বর্ষে নিমিঝিমি/ শস্যের ভার না সহে মেদিনী।  * পৌষ গরমি বৈশাখে জারা/ প্রথম আষাঢ়ে ভরবে গাড়া। খনা বলে শোন গো স্বামী/ শ্রাবণ ভাদর নাইকো পানি। * জ্যৈষ্ঠে তারা ফোটে/ তবে জানবে বর্ষা বটে। * চৈতে কুয়াশা, ভাদ্রে বান/ সেই বর্ষে  মড়ক জান। * যদি বর্ষে  মাঘের আগা/ ধানে ধান, কাপাসে মেলে পাখা। * কাতি মাইয়া ভাওরে/ না যাইও পুত হাওরে। * চান্দের শোভার মধ্যে তারা/ বর্ষে পানি মুষলধারা। * জ্যৈষ্ঠে খরে, আষাঢ়ে ঝরে কেটে মেরে গোলা ভরে। * পশ্চিমে ধনু, নিত্য খরা/ পূর্বে ধনু বর্ষে  ঝরা। * ভাদুরে মেঘে পুবে বয়/ সেই দিন বড় বর্ষা হয়। * বেঙ ডাকে ঘনঘন/ বৃষ্টি  হবে শীঘ্র  জান। * বছরের প্রথম ঈষাণে বয়/ সে-বছর বর্ষা হবে খনায় কয়। * বৈশাখের প্রথম জলে/ আশু ধান দ্বিগুণ ফলে।

বাংলার প্রকৃতি ও ঋতুচক্রের সঙ্গে যেমন ফল-ফসল উৎপাদনের সম্বন্ধ তেমনই মেঘ-বর্ষা-বৃষ্টির সঙ্গে সমতুল সম্পর্ক। খনার বচনের সঙ্গে এই সম্বন্ধসূত্রটি সুস্পষ্ট পরিলক্ষিত হয়। এর তাত্ত্বিক দিকটি অভিজ্ঞতালব্ধ; অধীতবিদ্যা বা গবেষণালব্ধ নয়। সুদীর্ঘ কাল প্রকৃতি-পাঠের ফলে সঞ্চিত অভিজ্ঞতার সারাৎসার এই প্রবচনগুচ্ছ। তাই সভ্যতার স্বরূপ বদলে গেলেও এবং আবহাওয়া-বিজ্ঞানের অনেক সত্য আবিষ্কৃত হলেও প্রবচনের সত্যতা অকাট্য-অবিসংবাদী।

আট

কালস্রোত নিত্যবহমান – সেইসঙ্গে সভ্যতা ও সংস্কৃতি। আমাদের ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে মধ্যযুগের বাংলা কবিতায় বর্ষার যে রূপ বিধৃত হয়েছে তা আধুনিকতার কাজলমাখা রূপৈশ্বর্যে এ-যুগের কবিতায়ও বিদ্যমান। হয়তো আগের মতো প্রাচুর্য নিয়ে নয়, প্রকৃতির বর্ণনাত্মক ভঙ্গিতে নয়। তবে মেঘ-বৃষ্টি-বর্ষায় হৃদয়োত্থিত চিরন্তন প্রেমানুভূতি, বিরহবেদনা এবং শূন্যতার কথা একালের কবিরাও প্রকাশ করেছেন। কিন্তু তা ভিন্ন আঙ্গিকে, বিচিত্র অনুভবে নতুন ভাষিক অনুষঙ্গে, চিত্রকল্পে ও বাকপ্রতিমায়। আধুনিক কবিদের বর্ষানুভব ও বৃষ্টিবোধ ও মেঘের মায়াঞ্জন মনের চেয়ে মননের ঐশ্বর্যে ক্রিয়াশীল। বর্ষার রূপ বর্ণনার চেয়ে আত্মবোধের নির্যাস প্রকাশে তারা বেশি উৎসাহী এবং পারঙ্গম। বর্তমান, নিকট, অদূর অতীত কালের কয়েকজন বাঙালি কবির কবিতা থেকে চয়িত হলো :

* হায় চিল, সোনালি ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে

তুমি আর কেঁদো নাকো উড়ে উড়ে ধানসিঁড়ি নদীটির পাশে!

– জীবনানন্দ দাশ

* অন্ধকার মধ্যদিনে বৃষ্টি ঝরে মনের মাটিতে।

– অমিয় চক্রবর্তী

* শ্রান্ত বর্ষা, অবেলার অবসরে,

প্রাঙ্গণে মেলে দিয়েছে শ্যামল ছায়া;

– সুধীন্দ্রনাথ দত্ত

* স্পর্শময় বর্ষা এলো; কী মসৃণ তরুণ কর্দম!

স্ফীতকণ্ঠ, বীতস্কন্ধ – সংগীতের শরীরী সপ্তম।

– বুদ্ধদেব বসু

* শ্রাণের ধারাজলে

মুখর হৃদয় তালীবনদীঘি কল্লোলে অবিরাম।

– বিষ্ণু দে

*এখন দেখছি আমি কবেকার তোমার আঠারো

বছরকে চুমো খাচ্ছে আনন্দে নিভৃত খোলা ছাদে

কাচের গুড়োর মতো বৃষ্টি। বাদল দিনের ফুল

কদমের বুনো ঘ্রাণে শিহরিত তুমি ক্ষণে ক্ষণে।

এমন বর্ষার দিনে তোমার কি সাধ জাগে কেউ

নিরিবিলি টেলিফোনে ‘রাধা’ বলে ডাকুক

তোমাকে?

– শামসুর রাহমান

* বৃষ্টি নামল যখন আমি উঠোন পানে একা

দৌড়ে গিয়ে ভেবেছিলেম তোমার পাবো দেখা

হয়তো মেঘ বৃষ্টিতে বা শিউলি গাছের তলে

আজানুকেশ ভিজিয় দিচ্ছো আকাশছেঁচা জলে

কিন্তু তুমি নেই বাহিরে – অন্তরে মেঘ করে

ভারি ব্যাপক বৃষ্টি আমার বুকের মধ্যে ঝরে

– শক্তি চট্টোপাধ্যায়

* বাইরে বৃষ্টি, বিষম বৃষ্টি, আজ তুমি ঐ রূপালি শরীরে

বৃষ্টি দেখবে প্রান্তরময়, আকাশ মুচড়ে বৃষ্টির ধারা …

– সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

* ঝর ঝর ঝরে বাদলের ধারা

অবিরাম বৃষ্টিতে কাঁপছে সৃষ্টি…

– আল মাহমুদ

* সুগোল তিমির মতো আকাশের পেটে

বিদ্ধ হলো বিদ্যুতের উড়ন্ত বল্লম!

বজ্র-শিলাসহ বৃষ্টি, বৃষ্টি : শ্রুতিকে বধির করে

গর্জে ওঠে

– শহীদ কাদরী

* বৃষ্টির কী দোষ বলো, কর্তব্যকঠিন জল্লাদেরও

চোখে নামে শ্রাবণের ঢল এমন বাদলদিনে।

– রফিক আজাদ

* বৃষ্টি, বৃষ্টি, বৃষ্টি। উলঙ্গ আনন্দ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে আকাশ থেকে। … সঙ্গে আকাশের জামাকাপড়; কিশোরীর ফ্রক, মেয়েদের হলদে সেমিজ আর ডোরাকাটা তোয়ালে।

– সিকদার আমিনুল হক

* এখনো সেই বৃষ্টি ঝরে, এখনো ভেজে বন

দুয়ারে মেঘ শব্দ করে, কাঁদে আমার মন,

এই বর্ষা আমার জন্মঋতু, আমি এসেছি বর্ষায়

এখন ভাবি যাওয়ার কথা, মেঘ বলে যে, আয়।

– মহাদেব সাহা

* কলাপাতায় বিষ্টি বাজে

ঝুমুর নাচে নর্তকী,

বিষ্টি ছাড়া গাছের পাতা

এমন করে নড়তো কি?

– নির্মলেন্দু গ‍ুণ

* উথাল-পাতাল জল কীর্তিনাশা উদ্বেল এমন

গুঁড়ি-গুঁড়ি ইলশেবৃষ্টি সারাদিন চলে সারারাত

– মোহাম্মদ রফিক

* শ্রাবণের সব বৃষ্টি নষ্টদের অধিকারে যাবে।

– হুমায়ুন আজাদ

* এই বৃষ্টি-হাওয়া এই নিভাঁজ মেদুর দিন

বারান্দায় জল কোন কাজল মেঘের থেকে

মনোকণিকার নীল শাড়ি চুইয়ে নেমেছে,

– মাহবুব সাদিক

* চেয়েছি, পেয়েছি বৃষ্টির জলে কলস্বর

চেয়েছি, পেয়েছি বৃষ্টির জলে ডুবোচর।

– মুহম্মদ নূরুল হুদা

* মনে আছে একবার বৃষ্টি নেমেছিল

একবার ডাউন ট্রেনের মতো বৃষ্টি এসে থেমেছিল

আমাদের ইস্টিশনে সারাদিন জল ডাকাতের মতো

উৎপাত শুরু কোরে দিয়েছিল তারা;

– আবুল হাসান

* আকাশ ভেঙে খানখান

পৃথিবী অন্ধকার করে নামে শ্রাণের ঢল

জানালার শিক ধরে বন্দি নারীরা

অবাক বর্ষা দেখে

– শিহাব সরকার

* ছিল না পূর্বলক্ষণ কিছু

যাত্রামঞ্চে দলবেঁধে আসা

রাজকণ্যা আর সখিদের

নাচের ছন্দের মতো ঝমঝম বৃষ্টি এসে গেল

– ফারুক মাহমুদ

* আষাঢ়স্য প্রথম দিবস, কালিদাস এখনো কি লেখে উপখ্যান?

দূরের জানালার কাচে দেখা যায় বৃষ্টিভেজা পথ

যে-পথে এখনো ওড়ে প্রাগৈতিহাসিক রাজহাঁস ঝাঁকে ঝাঁক

প্রবল বর্ষণে তার পাখা থেকে

পড়বে ঝরে অপসৃত পালক – চেনা আঙ্গিনায়

– বিমল গুহ

* নাগরিক পোড়া পিঠে মেখে দাও মমতার সবুজ উদ্ভিদ থেকে রস

বৃষ্টিতে ভিজুক ফের আমাদের বেহিসেবি কিশোর বয়স।

– নাসির আহমদ

* বৃষ্টি হলে মাটি কাঁপে, লাশগুলো আবার দাঁড়াতে চায়

হাতবাঁধা, চোখবাঁধা, বেয়নেটে ছিন্নভিন্ন দেহ –

লাশগুলো আবার দাঁড়াতে চায়।

– রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ

* এই-যে বৃষ্টির দিন আমি ভিজে যাচ্ছি

মাঠের ভেতর

আর সেদিন গিয়েছি ভিজে

তোমার ভেতর!

– গোলাম কিবরিয়া পিনু

* এখন যে বর্ষিত হচ্ছপ মেঘ, তার কোনো

ব্যাকরণ থাকে না

প্রথাবিরুদ্ধ ধারা মুহূর্তে অচল করে দিতে

পারে অদিতি

– ওবায়েদ আকাশ

নানান বিপর্যয়ে বাংলার প্রকৃতিতে আর আগের মতো বর্ষা নেই! প্রকৃতির ওপর মানুষের অনিয়ন্ত্রিত আধিপত্য বিস্তার, লোভের প্রাবল্য ও নির্বিচার অত্যাচার ঋতুচক্রকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। প্রকৃতির সঙ্গে মানবমনের সম্পর্কের সেতুটি এখন সুতোয় পরিণত। তাই বর্ষাও বাংলার বুক থেকে বিলীয়মান। বৈশ্বিক উষ্ণায়নে প্রভাবে বাংলার ষড়ঋতু এখন ম্রিয়মাণ, বিবর্ণ ও বিধ্বস্ত। গ্রীষ্মে অসহনীয় উত্তাপের প্রাখর্য ও ঝড়ের তাণ্ডব। বর্ষা সজলতাহীন।

প্রকৃতি বিপর্যস্ত এবং ঋতুচক্রের আবর্তন জৌলুসহীন বলেই বোধ করি এখন বাংলার একুশ শতকের কবিকুল আর বর্ষাবিমুগ্ধ নন! বরং সন্তাপে ও মনস্তাপে ম্রিয়মাণ তারা। বর্ষার মাঙ্গলিক অনুভবের চাইতে দুর্ভোগ-দুর্যোগের অশনিসংকেত, হতাশার বেদনাবিধুরতা, নস্টালজিক ভাবনায় তারা জর্জরিত। তাই একালের কবিদের বর্ষার কবিতায় মনোবিকলিত চিত্তবিক্ষেপ প্রাধান্য পেয়েছে।

নয়

প্রকৃতিতে যত বিপর্যয়ই আসুক, বর্ষা আমাদের প্রাণদায়ী ঋতু, ফসল উৎপাদনের ঋতু। বর্ষার সঙ্গে বাংলার নদনদী, খালবিল-ঝিল ও হাওর-বাঁওড়ের আত্মার সম্পর্ক। বর্ষা না-এলে নদী মরে যায়। বর্ষা নদীতে প্রাণসঞ্চার করে, যৌবন আনে। নৌকা তখন খেলা করে জলের সঙ্গে, ঢেউয়ের তালে, স্রোতের ছন্দে। বাংলার নদীর সঙ্গে নৌকার নাড়ির সম্পর্ক। বর্ষার ভালোবাসাময় নদীতে তখন ভাসো কত বিচিত্র আকৃতি-প্রকৃতির নৌকা। আকারে-প্রকারে, রঙেরূপে কত সুখদর্শন নৌযান। অঞ্চলভেদে কত সুখশ্রাবী এদের নাম : পানসি নাও, ছিপ নাও, দৌড়ের নাও, মহাজনী নাও, গুদারা নাও, ডিঙি নাও, গয়না নাও, কেরায়া নাও, মহাজনী নাও, সাম্পান, আরো কত কী! যন্ত্রসভ্যতা বিকাশের ফলে এখন এসেছে ইঞ্জিনের নাও। বাংলার সামন্তসমাজ ও বাঙালির লোকজীবনের অমর গাথা মনসামঙ্গল কাব্যে বাণিজ্যিক নৌকার নাম সপ্তডিঙা মধুকর। আর আবহমান বাঙালির স্বপ্নের নৌকার নাম – ময়ুরপঙ্খী!

বর্ষার সঙ্গে কেবল কবিতা নয়; আছে সুরতাললয়ে ছন্দিত গানগীতেরও সম্বন্ধ – যাকে সুভদ্র শব্দে বলে সংগীত। লোকজ সুরের স্বভাব-সাধক বাংলার নদীজীবী-নৌকাজীবী

দাঁড়িমাঝি-মাল্লাদের কণ্ঠে কত-যে ভাটিয়ালি-ভাওয়াইয়া, মারফতি-মুর্শিদি গান তার হিসেব নেই! বর্ষা, নদী,

নৌকা – এই তিন অনুষঙ্গে বাঙালির জীবনে এসেছে খেয়া পারাপারের প্রসঙ্গ। নদীর দুই কূলের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করেছে যে খেয়া ও পারঘাট তা সেসব আধ্যাত্মিক গানের আঁতুরঘর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো গানকে ‘শেষ পারানির কড়ি’ হিসেবে কণ্ঠে তুলে নিয়েছিলেন। তবে তাঁর মনে প্রশ্ন ছিল, ‘পার হব কি না-ই হব তার খবর কে রাখে?’ এসব অন্তরে আছে অতীন্দ্রিয় লোকের চেতনা ও অধ্যাত্ম প্রসঙ্গ। নজরুল ইসলামের কবিতায়ও তা-ই। তাঁর ‘খেয়াপারের তরণী’ কবিতার  ‘পাকা মাঝি-মাল্লা’ আর রবীন্দ্রনাথের গানের ‘তুমি এপারে-ওপারে কর কে গো, ওগো খেয়ার নে’য়ে’ – সবই আধ্যাত্মিকতার আবহে বাঙালি-জীবনের অনুষঙ্গ।

বর্ষার প্রসঙ্গ এলেই মনে পড়ে, শিশুকালে শেখা বন্দে আলী মিয়ার কবিতাংশ : ‘আষাঢ়ে নামিল ঢল খালে আর বিলে/ মনু মিয়া মাছ মারে নিয়ে যায় চিলে।’ মনে পড়ে, মেঘনাচরের শিশু আসমানীর দুঃখময় জীবনের কথা – কবি জসীম উদ্দীন যাকে অমর করে রেখেছেন। ভেন্নাপাতায় ছাওয়া ওদের ঘরে একটু বৃষ্টি হলেই পানি গড়িয়ে পড়ে, একটু হাওয়া দিলেই নড়বড় করে ঘর। সেই আসমানীদের জীবনে ‘আমৃত্যু দুঃখের তপস্যা’ শেষ হয়নি! মনু মিয়াদের ঘাম-ঝরানো শ্রমে ধরা মাছ এখনো চিলে নিয়ে যায়। বর্ষা-প্রসঙ্গে এসব প্রতিকারহীন দুঃখ-কষ্টের কথা আমাদের চলমান জীবনের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে।