কাজী নজরুল ইসলাম এবং রণদা প্রসাদ সাহা স্বমহিমায় ভাস্বর দুই খ্যাতিমান বাঙালি। একজন সাহিত্যের বরপুত্র, কাব্যদেবী দু-হাত ভরে তাঁকে আশিস দিয়েছেন আর সেই আশীর্বাদধন্য হয়ে তিনি উপহার দিয়েছেন কালজয়ী অজস্র গান ও কবিতা। অন্যজন সোনা ফলিয়েছেন ব্যবসায়, গড়ে তুলেছেন হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, দুহাত উজাড় করে দান করেছেন, নিরন্নের মুখে তুলে দিয়েছেন অন্ন, তৈরি করেছেন মানবতার উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত। দুজনেই জন্মেছিলেন দরিদ্র পরিবারে। দুজনের জীবনই সংগ্রামমুখর। মানবতাবোধ ও দেশাত্মবোধ দুজনেরই মন ও মননের অমিয় মন্ত্র। এবং আশ্চর্যরকমভাবে দুজনেই ছিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টের গর্বিত সৈনিক এবং এই সৈনিক জীবনের সখ্য, সম্পর্কের আত্মিক বিনিময় দুজনের জীবনকে করেছে সমৃদ্ধ।
বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী কবি ও লেখক হওয়ার কারণে কাজী নজরুলের সৈনিক জীবন যতটা আলোতে এসেছে, তুলনায় রণদা প্রসাদের সৈনিক জীবন এবং কাজী নজরুলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের সমীকরণ অনেকটাই ইতিহাসের আড়ালে লুকানো। মানুষ রণদা প্রসাদকে উপমহাদেশের প্রখ্যাত দানবীর হিসেবে জানেন, মান্যতা দেন কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট, ভারতেশ^রী হোমস, কুমুদিনী হাসপাতাল, কুমুদিনী কলেজ, দেবেন্দ্র কলেজসহ বহুবিধ দাতব্য ও শিক্ষায়তনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে। কিন্তু ইতিহাসের ধুলো জমা পথের বাঁকে বাঁকে কত অজানা অধ্যায় লুকানো থাকে। আর সেসব অধ্যায় উন্মোচিত হতেই তুতেনখামেনের সমাধির মতো আবিষ্কৃত হতে থাকে ঐশ^র্যমথিত গোপন বৈভব।
ব্রিটেন যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল, সময়টা ৪ঠা আগস্ট ১৯১৪। ভারত তখন ব্রিটিশ উপনিবেশের অংশ। ব্রিটিশ সরকার ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে তরুণ প্রজন্মকে সামান্য কিছু ট্রেনিং দেওয়ার পর ভাড়াটে সৈনিক হিসেবে প্রথম বিশ^যুদ্ধে পাঠানো শুরু করেছিল। কিন্তু ভারতের অন্যান্য প্রদেশে রেজিমেন্ট তৈরি করা হলেও বাংলায় রেজিমেন্ট তখনো তৈরি করা হয়নি। এর অন্যতম কারণ, স্বদেশি আন্দোলনের নামে ব্রিটিশদের সবচেয়ে বেশি উত্ত্যক্ত করছিল এই বাঙালি জাতি। ব্রিটিশদের ভয় ছিল যে, বাঙালিদের অস্ত্রশিক্ষা দিলে একদিন সে-শিক্ষা তাঁদেরই বিপক্ষে যাবে। কিন্তু যুদ্ধের তীব্রতা বেড়ে গেলে ১৯১৬ সালে ব্রিটিশ সরকার বেঙ্গল রেজিমেন্ট তৈরি করলো এবং বাংলা থেকে বহু তরুণকে ভাড়াটে সৈনিক হিসেবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য নিযুক্ত করতে লাগলো।
কাজী নজরুল ইসলাম তখন শিয়ারসোল রাজ হাই স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র। দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তবে ভালো ছাত্র হওয়ার সুবাদে স্কুল থেকে তিনি বৃত্তি পেতেন, থাকতেন স্কুলের বোর্ডিংয়ে। তখন তাঁর প্রিয় বন্ধু ছিলেন শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়। নজরুলের মধ্যে তখন থেকেই জাতীয়তাবোধ বা বিপ্লবী মনোভাব তৈরি হয়ে গিয়েছিল। ব্রিটিশ যে ভারতের শত্রু, এই বোধ তখনই তাঁর মধ্যে জাগ্রত হয়েছিল। নজরুলের এই বোধের পেছনে ভূমিকা ছিল তাঁর স্কুলের শিক্ষক নিবারণচন্দ্র ঘটকের, যিনি ‘যুগান্তর’ দলের একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। নজরুল তখন সশস্ত্র বিপ্লবের চেতনায় উদ্বুদ্ধ। তিনি উপলব্ধি করতেন, ব্রিটিশদের তাড়াতে গেলে অস্ত্রশিক্ষা জরুরি। তখন তিনি স্থির করলেন বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগদান করে অস্ত্রশিক্ষা লাভ করবেন এবং সেই শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে নজরুল এবং তাঁর বন্ধু শৈলজানন্দ তখন প্রি-টেস্ট পরীক্ষা না দিয়ে পালিয়ে এলেন কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়ামে পরীক্ষা দিয়ে রেজিমেন্টে যোগদান করার জন্য। রেজিমেন্টে যোগদান করার পর সৈনিকদের পাঞ্জাবের নৌসেরাতে পাঠানো হতো। নৌসেরাতে ট্রেনিংয়ের পরে তাঁদের পাঠানো হতো করাচিতে। সেখান থেকে কোনো রেজিমেন্ট চলে যেত মেসোপটেমিয়ায়, আবার কোনো রেজিমেন্ট যেত বেলুচিস্তানে। কোনো কোনো রেজিমেন্ট করাচিতেই থেকে যেত। এভাবেই বিভিন্ন রেজিমেন্ট ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় পাঠানো হচ্ছিল। কিন্তু যেদিন নজরুল এবং শৈলজানন্দ ফোর্ট উইলিয়ামে এলেন পরীক্ষা দিতে, সেদিন ঘটনাচক্রে শৈলজানন্দের ঠাকুরদাও ওই স্থানে একটি কাজের সূত্রে আসেন এবং দুর্ভাগ্যবশত তাঁদের মুখোমুখি সাক্ষাৎ হয়ে যায়। ফোর্ট উইলিয়ামে শৈলজানন্দকে নজরুলের সঙ্গে দেখতে পেয়ে শৈলজানন্দের ঠাকুরদা আন্দাজ করে ফেললেন, তাঁরা পরীক্ষা দিয়ে যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। নিজের দৌহিত্রকে বাঁচানোর জন্য নিজের পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে ভেতর থেকে তিনি এমন ব্যবস্থা করলেন যে, পরীক্ষার মেডিক্যাল টেস্টে নজরুল উত্তীর্ণ হলেও শৈলজানন্দ অনুত্তীর্ণ হলেন। ফলে, শৈলজানন্দ ফিরে এলেন এবং নজরুল চলে গেলেন করাচিতে। তাঁদের কুচকাওয়াজ, ফায়ারিং ইত্যাদি কিছু প্রাথমিক ট্রেনিং নেওয়ার পর নজরুল দ্রুত উন্নতি করতে থাকেন বাহিনীতে। যোগ দিয়েছিলেন সিপাহি পদে। সেখান থেকে তিনি ল্যান্সনায়েক পদে এবং পরবর্তীকালে খুব গুরুত্বপূর্ণ কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার পদে উন্নীত হন। নজরুলের সৈনিক জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা পরবর্তীকালে শৈলজানন্দকে লেখা তাঁর চিঠিগুলোতে উঠে আসে।
রণদা প্রসাদের যুদ্ধে জড়ানোর ইতিহাস আরো বেশি রোমাঞ্চকর। প্রসব-পরবর্তী ধনুষ্টংকারে আক্রান্ত হয়ে মাতৃদেবী কুমুদিনী যখন মৃত্যুবরণ করেন রণদার বয়স তখন সাত। সৎমা হয়ে গৃহে আসেন কোকোন দাসী। সৎমায়ের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে মাত্র ১৪ বছর বয়সে ঘর ছাড়েন তিনি। এলাসিন পোড়াবাড়ি জাহাজঘাট থেকে কলকাতাগামী জাহাজে চেপে পৌঁছে যান শিয়ালদহ স্টেশনে। কখনো পত্রিকার হকার, কখনো মিষ্টির দোকানের কর্মচারী, কখনো হুগলী বন্দরে কয়লার জাহাজের কয়লা খালাস হওয়ার পর পরিত্যক্ত কয়লা কুড়িয়ে বাসায় বাসায় বিক্রি। এভাবেই চলছিল রণদার সংগ্রামী জীবন। যুধিষ্ঠির চক্রবর্তী নামে এক মেধাবী ছাত্রের সংস্পর্শে এসে সাহেবি কায়দার ইংরেজি বলাটা রপ্ত করেন তিনি। জড়িয়ে পড়েন স্বদেশি আন্দোলনে এবং এক বছর জেলও খাটতে হয় তাঁকে। প্রথম বিশ^যুদ্ধের দামামা যখন বেজে উঠলো তখন রণদা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে চাইলেন, কিন্তু বিপত্তি বাধালো তাঁর স্বদেশি আন্দোলনে অন্তর্ভুক্তি। পরবর্তীকালে প্রখ্যাত চিকিৎসক ও শিক্ষাবিদ ডা. শিশির প্রসাদ সর্বাধিকারীর লিখিত সুপারিশে তিনি স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে বেঙ্গল অ্যাম্বুলেন্স কোরে যোগদান করার সুযোগ পান।
প্রথম বিশ^যুদ্ধ রণদা প্রসাদের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কুতেল আমারায় ব্রিটিশ বাহিনী তখন তুর্কি সেনাপতি হাশিম পাশার হাতে বন্দি। প্রচণ্ড খাদ্যাভাব চলছে। টাটকা সবজির অভাবে সৈনিকদের শরীরে স্কার্ভি, পাইওরিয়া ও অন্যান্য অসুখ দেখা দিয়েছে। সেই সময় রণদা কিছু দুঃসাহসিক কাজ করেন, যা শিশির কুমার সর্বাধিকারীর স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে – ‘এই দুঃসময়ে রণদা একটা কাজ করলে যাতে অনেকের উপকার হলো। সমস্ত বিপদ অগ্রাহ্য করে ট্রেঞ্চের বাইরে যেখানে অনবরত গোলাগুলি চলছে, সেখান থেকে রণদা ঘাস, লতাপাতা শাক যা পেতো নিয়ে আসতো। সৈনিকরা সেসব সেদ্ধ করে খেতাম। এভাবে সৈনিকদের সে প্রাণ বাঁচালো, অনেকে স্কার্ভি থেকে মুক্তি পেলেন। রণদা ভয়ডর কাকে বলে জানতো না। সবসময় হাসিমুখে কাজ করতো।’ রণদা প্রসাদ যুদ্ধে আহত সৈনিকদের মনপ্রাণ উজাড় করে সেবা করতেন। শত্রুপক্ষের অবিরাম আক্রমণ ও গোলাবর্ষণের মধ্যে সবার জন্য খাদ্য সংগ্রহ করতেন। সেনাপতি টাউনসেডের কানে গেল সেই কথা। তিনি রণদাকে ডেকে পাঠালেন।
– তোমার নাম কী?
– আর পি সাহা।
– পুরো নাম।
– রণদা প্রসাদ সাহা।
– বাঙালি?
– আজ্ঞে হ্যাঁ।
– বাঙালির এত সাহস?
– দেশে আমার চেয়েও সাহসী যুবক লাখে লাখে আছে।
টাউনসেড রণদা প্রসাদকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানালেন এবং তাঁর সাহসের ভূয়সী প্রশংসা করলেন।
যাই হোক সেবার কিন্তু ব্রিটিশ বাহিনীকে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছিল। তাঁরা তখন বাগদাদে বন্দি। হঠাৎ একদিন সামরিক হাসপাতালে আগুন লেগে গেল। সকলেই প্রাণ বাঁচাতে ছুটছে, চারিদিকে আগুনের লেলিহান শিখা। ক্যাপ্টেন উইলফ্রেড কিং বিষণ্ন দাঁড়িয়ে আছেন। কোন মায়ের সন্তানকে এই নিশ্চিত মৃত্যুর কোলে ঝাঁপিয়ে পড়তে আদেশ করবেন? এগিয়ে এলেন রণদা প্রসাদ। বললেন – ‘অনুমতি দিন, হাসপাতালের ভেতর থেকে আমি রোগীদের বের করে আনবো।’
ক্যাপ্টেন কিছুতেই রাজি নন। তিনি বললেন – ‘দেখ রণদা, বাড়িতে নিশ্চয়ই তোমার মা আছেন। হয়তো স্ত্রীও আছেন। তোমাকে আমি নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারি না।’
রণদা নাছোড়বান্দা, বললেন – ‘আমি মরে গেলে আমার জন্য কাঁদবার মতো কেউ নেই। আপনার পায়ে ধরি, আমাকে অনুমতি দিন।’
ক্যাপ্টেন বাধ্য হয়ে অনুমতি দিলেন। রণদা প্রসাদ একা ছুটলেন হাসপাতালের দিকে। একটু পর একজন আহত রোগীকে কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে এলেন। সবাই রণদার সাহসিকতায় চমকে গেল। এবার রণদার দেখাদেখি আরো কয়েকজন এগিয়ে এলো এবং সবাই মিলে বারোজন শয্যাশায়ী রোগীকে সেদিন উদ্ধার করতে পেরেছিলেন। চারিদিকে ধন্য ধন্য রব উঠলো। রণদার প্রশংসায় মুখর হলো চারদিক। দেশে ফিরলে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ রণদা প্রসাদকে অভিনন্দন জানালেন। যুদ্ধশেষে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য হ্যাম্পটন কোর্টে রাজা পঞ্চম জর্জ রণদা প্রসাদ সাহাকে ‘সোর্ড অফ অনার’ পদকে সম্মানিত করলেন। আর এসব কিছু আমরা জানতে পারি Captain Wilfred King-এর লেখা The 49th Bangalees নামক চমৎকার একটা বই থেকে।
অ্যাম্বুলেন্স কোরে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর রণদা প্রসাদ বেঙ্গল রেজিমেন্টে অস্থায়ী সুবাদার মেজর পদে যোগদান করেন। আর এখানেই তাঁর সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের দেখা হয় এবং পরবর্তীকালে সখ্য গড়ে ওঠে।
রণদা প্রসাদ নতুন করে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাঙালি পল্টনের সঙ্গে ট্রেনিং নিতে চলে যান নওশেরায়। তিন মাস ট্রেনিং গ্রহণের পর রেজিমেন্ট চলে যায় করাচিতে। করাচিতে বাঙালিদের প্রশিক্ষণে ছিল রাজপুত ব্যাটালিয়ন ও স্থানীয় ব্রিটিশ রেজিমেন্ট। প্রথমে তাঁরা বিউগল ও সিগন্যালিং শিখলেন। তারপর সেকশন, প্লাটুন, কোম্পানি ড্রিল, রাইফেল এক্সারসাইজ, ফিজিক্যাল প্যারেড, বেয়নেট ফাইটিং এবং মাস্কেট্রি ড্রিল শিখলেন।
রণদা প্রসাদ সাহা যখন জমাদার হন, অর্থাৎ ১৯১৮ সালের আগস্ট বা সেপ্টেম্বর মাসে, কাজী নজরুল ইসলাম তখন একই রেজিমেন্টের হাবিলদার। সেনা ছাউনিতে নজরুলের জীবন ছিল একটু ভিন্ন। তিনি সামরিক কাজের বাইরে অসামরিক কাজেই বেশি লিপ্ত থাকতেন। পল্টনে থাকতে নজরুলের ব্যক্তিজীবনের একটি ধারণা তাঁর সেনাজীবনের বন্ধু অরুণ কুমার বসুর বর্ণনা থেকে জানা যায়। কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার নজরুল পেয়েছিলেন রসদভাণ্ডারের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব; কোট-প্যান্ট, বুট মোজা, কম্বলের তিনিই ছিলেন জিম্মাদার ও সরবরাহকারী। এ-ধরনের গার্হস্থ্য দায়িত্ব নজরুলের পড়াশোনা আর লেখালেখির পক্ষে অনুকূল হয়েছিল। তাছাড়া একাধিক বাদ্যযন্ত্র তিনি শিখতেন। ছাউনির কোনো এক পাঞ্জাবি মৌলভির কাছ থেকে আরবি-ফারসির তালিম নিতেন। স্বরলিপি দেখে তিনি রবীন্দ্রসংগীত তুলতেন। বিপ্লবী সব পত্রপত্রিকা তিনি গোপনে পড়তেন। বেশ কয়েকটি বাংলা পত্রপত্রিকা চাঁদার বিনিময়ে গ্রাহক হয়ে আনাতেন এবং তা পড়তেন। তিনি সব সময় উচ্চকণ্ঠ রসিকতায় সবাইকে মাতিয়ে রাখতেন। আবার গোপনে তিনি সংগ্রহ করতেন রাজদ্রোহমূলক কাগজপত্র। আনাতেন নিষিদ্ধ পত্রিকা। খবর রাখতেন যাবতীয় সব আইরিশ বিপ্লব এবং রুশ বিপ্লবের। তাঁর কাগজপত্রের তলায় লুকানো থাকত সিডিশন কমিটির রিপোর্ট। গোপনে সেসব পড়তেন। আর রাত জেগে লিখতেন তপ্তাক্ষরে জ্বালাময়ী লাইনের পর লাইন কবিতা। করুণ আত্মত্যাগের গল্প লিখতেন, যা রোমান্টিসিজমের ভাবধারাকে জাগিয়ে তুলতো সন্তর্পণে। নাটকীয় পত্রোপন্যাসও তিনি লিখতেন। তবে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহকর্মীও নজরুলের এসব গুপ্তকর্মকাণ্ডের খবর জানতেন না। সন্ধান পেতেন না তাঁর এসব নিষিদ্ধ সাধনার। তবে সহকর্মীদের একাধিক সাময়িকীর গ্রাহক করে দিয়েছিলেন তিনি। যে-কোনো সমবেত সভায় তিনিই হতেন মধ্যমণি। অট্টরোল আর হট্টগোলে তিনি সহসা হেঁকে উঠতেন ‘দে গরুর গা ধুইয়ে’, ‘ঘি চপচপ কাবলি মটর’ এমনকি ‘চালাও পানসি বেলঘরিয়া’র মতো বিভিন্ন গানে। সাধারণ সেপাইরা এসব গানে বেশ মজা পেতেন। তাঁরাও নজরুলের গানের সঙ্গে ধুয়া তুলতেন হেঁকে হেঁকে। নজরুল তাঁর বাল্যবন্ধু শৈলজানন্দকে এসব চিঠিতে লিখেছিলেন। সৈনিক সুরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় বলেন, নজরুলকে তাঁরা ‘হৈ হৈ কারী’ বলে ডাকতেন। কেননা প্রাণচঞ্চল নজরুল সব সময়
আনন্দ-উল্লাসে টইটম্বুর হয়ে থাকতেন। গোটা সেনানিবাসকে মাতিয়ে রাখতেন। সেনানিবাসের সর্বত্র তিনি খুব জনপ্রিয় ছিলেন।
রণদা প্রসাদ সাহা, অস্থায়ী সুবাদার মেজর। সবাই তাঁকে যমের মতো ভয় পায়; কিন্তু কাজী নজরুল সামরিক রেওয়াজ উপেক্ষা করে বাবরি চুলের বিজয় পতাকা উড়িয়ে হনহন করে চলে যান। রণদা প্রসাদ নজরুলকে ডেকে পাঠালেন। মনে মনে ভাবলেন ছেলেটাকে বকে দেবেন, যাতে সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলাটা বজায় থাকে।
– কী নাম তোমার?
– কাজী নজরুল ইসলাম।
– কাজী, তুমি কি গান গাও?
– আজ্ঞে, অল্পবিস্তর চিৎকার করি বটে।
– কবিতা লেখো?
– লোকে তেমন দুর্নামও করে।
রণদা আর নজরুলকে তিরস্কার করতে পারেন না। বরং তাঁর মনে হতে থাকে, ছেলেটা অন্যরকম, বাকি দশজন থেকে একদম আলাদা।
পরবর্তী পর্যায়ে মূলত নজরুলের জন্যই রণদা প্রসাদ রেজিমেন্টের সংগীত কোর গঠন করলেন এবং এর দায়িত্ব দিলেন নজরুলকে। পছন্দের কাজটি পেয়ে কবিও মহাখুশি। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি নজরুলের সংগীতচর্চাও অব্যাহত গতিতে চলতে লাগলো। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটা বড় অংশ সরাসরি যুদ্ধে মেসোপটেমিয়া চলে যায়, বাকি অংশ রিজার্ভ হিসেবে করাচিতে থেকে যায়। সেই অংশেই ছিলেন রণদা প্রসাদ সাহা এবং কাজী নজরুল ইসলাম। ফলে সরাসরি যুদ্ধ তাঁরা করেননি। রেজিমেন্টে নজরুলের গান ও কবিতা শুনে রণদা প্রসাদ নজরুলের গুণগ্রাহী ভক্তে পরিণত হন এবং প্রতিনিয়ত নজরুলকে সাহিত্যচর্চা ও বিভিন্ন পত্রিকায় লেখা প্রকাশে অনুপ্রেরণা জোগান। নজরুলকে তিনি ‘কাজী’ বলে ডাকতেন।
রণদা প্রসাদ সাহার সঙ্গে কবির এই সখ্য আমৃত্যু বজায় ছিল। যুদ্ধ শেষে রেলের চাকরি পান রণদা। সেই চাকরি ছেড়ে পরবর্তীকালে কয়লার ব্যবসা শুরু করেন। ধীরে ধীরে জাহাজ ও ডকইয়ার্ডের ব্যবসা করে তিনি হয়ে ওঠেন বিত্তশালী। আর নজরুল হয়ে ওঠেন রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম কবি ও গীতিকার। কবি নজরুল যখন ভীষণ অসুস্থ, তখন রণদা প্রসাদ চেষ্টা করেন তাঁকে এই দেশে এনে চিকিৎসা করানোর। ততদিনে রণদা গড়ে তুলেছেন তাঁর স্বপ্নসৌধ কুমুদিনী হাসপাতাল। কিন্তু নানা ধরনের রাজনৈতিক টানাপড়েনে তা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তবে তিনি নিয়মিত তাঁর প্রিয় কাজীর খোঁজখবর রাখতেন এবং অর্থ সহায়তা দিতেন। বিশিষ্ট নজরুল গবেষক ও শিক্ষাবিদ ড. করুণাময় গোস্বামীর সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, কবির দুই পুত্র এখানে এলে রণদা প্রসাদের সঙ্গে দেখা করতেন। আর্থিক সহায়তা ছাড়াও নানাভাবে তিনি তাঁদের সহায়তাদান করতেন। ক্যাপ্টেন ডা. রহমান (রণদা প্রসাদের ব্যক্তিগত চিকিৎসক) এবং করুণাময় গোস্বামী রণদা প্রসাদ সাহার সঙ্গে নিয়মিত আড্ডা দিতেন। তাঁদের সঙ্গে আলাপচারিতায় রণদা প্রসাদ উন্মোচন করেন তাঁর সৈনিক জীবনের গোপন বৈভব। যেখানে ক্যাপ্টেন কিং ও কাজীর সঙ্গে তাঁর সখ্য আর স্মৃতির রোমন্থনে চিকচিক করে উঠত তাঁর দুই চোখ।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.