আমরা তো বেঁঁচে, দেশ আছে কিনা অনুভবে বোঝা ভার;
আমাদের কথা দশ পা গেলেই শোনা যায় না ক’ আর।
আলাপচারিতা যেখানেই চলে আদ্ধেক কথাতেই
ক্রেমলিনে চড়ে-বসা পাহাড়ীর কথা উঠে আসবেই।
কর-অঙ্গুলি ইয়া মোটা মোটা, কৃমি যেন, মেদে ভরা;
যে-কথাই কয় নিখাদ সত্য দাঁড়িতে ওজন-করা।
তেলাচোরা যেন দু’টি শুঁড় তার হাসি-হাসি মুখে চায়,
ঘাড়-তোলা বুট ঝকমক করে সর্বদা চমকায়।
তার চারিপাশ ছেঁকে থাকে সরুগর্দান নেতা মেলা
কেঁচো হয়ে থাকে ওঠ-বস করে – সেই তার প্রিয় খেলা।
কেউ শিস্ দেয়, কেউ ডাকে ম্যাঁও, কাঁদুনি গাইছে ফেউ;
সব থামে তার এক হুঙ্কারে, ঠোঁটটি নাড়ে না কেউ।
ডিক্রির পর ডিক্রি নাজেল – যেন ঘোড়া চাট মারে
কুঁচকিতে কারো, কপালে, ভুরুতে, কারো-বা চোখের ধারে।
ইচ্ছে মাফিক কল্লা কাটছে তার জল্লাদ-রব,
তবু নিজ বুক গরবে ফোলায় ওসেতিয়া-পুঙ্গব।
অন্তিম দু’ পঙ্ক্তির পূর্ব পর্যন্ত কবিতাটির উদ্দিষ্ট কে তা আভাসে-ইঙ্গিতে বোঝা যাচ্ছিল বটে। ক্রেমলিনের পাহাড়ী লোকটির কথা আছে, আরশোলার গোঁফ-জোড়ায় চেহারার ছাঁদ ফুটে বেরোয়। সরুগর্দান নেতা যে মলোতভ্ তাও খুব অস্পষ্ট থাকে না। তবে, অমন সব কথা তো নির্বিশেষভাবেও বলা চলে কোনো বিশেষের দিকে আঙুল তাক্ না-করে। অন্তত আইনের ফাঁক কিছুটা রয়েই যায়। কিন্তু ‘ওসেতিয়া-পুঙ্গব’ বলার পরে রাখঢাক আর কিছুই রইল না। ওসেতিয়া হলো রাশিয়ার ককেশাস অঞ্চলে জর্জিয়ার উত্তরে এক জায়গা। এখানকার অধিবাসীরা মূলত ইরান থেকে আসা, সে-অর্থে ঠিক জর্জীয় নয়। কথিত আছে, স্তালিনের দেহে ওসেতীয় তথা ইরানী শোণিতপ্রবাহ ছিল। কাফ্কাজ্ বা ককেশাস পার্বত্যভূমি, তাই ক্রেমলিনের পাহাড়ী স্পষ্টতই ককেশীয় স্তালিনকে বলতে চাইছে। গোপন রইল না যে, কবিতার লক্ষ্যভূমি ইওসিফ্ ভিস্সারিওনভিচ্ জুগাশ্ভিলি – সোভিয়েত ইউনিয়নের একচ্ছত্র অধিপতি, একনায়ক ‘স্তালিন’। আর তীরন্দাজ এক হতদরিদ্র ও হতমান, লাজুক, বেপথু ও প্রায়-কুশ্রী, কবি। নাম : ওসিপ্ এমিলিয়েভিচ্ মান্দেল্শ্তাম্। সম্ভাব্য পরবর্তী ঘটনাবলি আন্দাজ করা যায়। এবং অনুমানযোগ্য সমস্ত কিছুই ঘটেছিল, ক্রমান্বয়ে, ধাপে-ধাপে, ১৯৩৪-এর ১৩ই মে থেকে ২৭শে ডিসেম্বর ১৯৩৮ পর্যন্ত। শ্বাসরুদ্ধ, মর্মান্তিক, অসহায় ও ক্রন্দ্যমান সে-কাহিনী পৃথিবীকে জানানোর জন্য কবিপত্নী নাদিয়েজ্দা ইয়াকভ্লিয়েভ্না মান্দেল্শ্তাম্কে দু’ খণ্ড বই লিখে বাইরে ছাপাতে হলো : ঐড়ঢ়ব অমধরহংঃ ঐড়ঢ়ব এবং ঐড়ঢ়ব অনধহফড়হবফ, অনুবাদ নয়, মূল ইংরেজিতেই।
কবিতাটির রচনাকাল ছিল ১৯৩৩-এর নভেম্বর। গল্প চালু আছে যে, ওসিপ্ মান্দেল্শ্তাম্ কবিতাটি বরিস্ পাস্তের্নাকের ফ্ল্যাটে এক পার্টিতে পড়ে শোনান। ওসিপের স্ত্রী নাদিয়েজ্দা ওরফে নাদিয়া যদিও অনুপস্থিত ছিলেন সেখানে, এ ঘটনাকে স্রেফ গপ্পো ও প্রচার বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, একাধিক লোক আছে যেখানে তেমন জায়গায় কেউ
স্তালিনের নিন্দা কি সমালোচনার একটি শব্দ উচ্চারণ করার সাহস রাখত না। এই ব্যাখ্যা খুবই গ্রহণযোগ্য, কারণ এটাই তখনকার বাস্তব সত্য। পাস্তের্নাক্ ও মান্দেল্শ্তাম্ সপরিবারে তখন মস্কোয় একই বাড়িতে থাকছেন। সোভিয়েত সরকারের দেওয়া একটি রাষ্ট্রীয় লেখক-আবাসন। দুটো ছোট ছোট ফ্ল্যাট তাঁদেরকে দেওয়া হয়েছিল। রাস্তায় দু’ জনের দেখা, বাড়ির সামনেই। পথের পাশে ফেলে-রাখা বেঞ্চির ওপরে বসে মান্দেল্শ্তাম্ স্মৃতি থেকে কবিতাটি পাস্তের্নাক্কে শোনালেন। পাস্তের্নাক্ আঁৎকে উঠে বলেন, “ওসিপ্, তুমি আমায় কিছু শোনাও নি, আমিও কিছু শুনি নি।” আরো বলেন, “ভীষণ খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি। জান না, দেওয়ালেরও কান আছে? এই বেঞ্চিরও কান থাকতে পারে। কে কোথায় কাকে কী বলবে, কী রটাবে! তুমি আমাকে কিছু শোনাও নি, আমিও কিছুই শুনি নি, ওসিপ্।”
কিন্তু খবর যেখানে পৌঁছুবার ঠিকই পৌঁছে গিয়েছিল। তখন নিজেকেই দোষ দেন পাস্তের্নাক্ – কী কুক্ষণেই না তিনি শুনতে গেলেন! এখন ওসিপ্ যদি ভাবেন যে কর্তাদের কানে তিনিই লাগিয়েছেন। আসলে তাঁরও তো জানার কথা নয়, কবি আর কাকে-কাকে একান্তে ওই কবিতা শুনিয়েছেন – যেমন শুনিয়েছেন তাঁকে। পাছে তাঁকে লোকে বেইমান ও শয়তান ভেবে বসে সেই ভয়ে ও দুশ্চিন্তায় কবি-লেখক-শিল্পী, পরিচিতের চৌহদ্দিতে যেখানে যাকে পেয়েছেন তাকেই পাস্তের্নাক্ বোঝাতে লাগলেন – ভাই, আমি কিন্তু কাউকে কিছু বলি নি। তাঁর সৌভাগ্য যে, নাদিয়া অন্তত তাঁকে দায়ী করেন নি। মান্দেল্শ্তাম্রে স্মৃতিশক্তি ছিল দুর্ধর্ষ। মগজের ভিতরে কবিতা জন্মাত। মগজের মধ্যেই কাটাকুটি চলত, শব্দের ওলটপালট, কাগজের ওপরে কবিতাটি ফুটে উঠত অনেক পরে। কবিতাটি নিশ্চয়ই তিনি ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধবদের কাউকে-কাউকে আলাদা-আলাদাভাবে শুনিয়েছিলেন। কিন্তু কে বা কারা হাইকমান্ডে সংবাদ পৌঁছেছিল সে-খবর কবি-জায়া বহু অনুসন্ধানেও বের করতে পারেন নি। গুপ্তপুলিশ যেদিন মধ্যরাতে কবিকে ধরে নিয়ে গেল তখন সারা ফ্ল্যাট তছনছ করলেও কবিতাটি খুঁজে পায় নি। সে-রাতে তাঁদের বাসায় কবি আন্না আখ্মাতভাও ছিলেন। নাদিয়া ও আন্না উভয়েই তা-ই বলেছেন। আসলে পুলিশ খুঁজছিল ওই কবিতারই অন্য এক পাঠান্তর,
যে-কপিটি তারা পেয়েছিল সেটির মূল। সেখানে কবিতার তৃতীয় ও চতুর্থ পঙ্ক্তি ভিন্ন রকম ছিল, সে আরো ভয়ঙ্কর :
ক্রেমলিনবাসী পাহাড়ীর কথা কান ঝালাপালা শুনে,
আসলে কিন্তু মহাজল্লাদ, চাষীর কশাই, খুনে।
পাস্তের্নাক্ তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “এরকম ক্ষেপে গিয়ে এত রাগী কবিতা লিখেছিলে কেন?” উত্তর পেয়েছিলেন, “যে-কোনো ধরনের ফ্যাশিজ্ম্ আমি ঘেন্না করি।”
ঘেন্না তো করেন, তবু মানুষের জীবন একটাই। ভরোনেজ্ শহরে সাময়িকভাবে নির্বাচিত যখন, তখন সেই তাঁকেই লিখতে হয়েছিল স্তালিন-প্রশস্তি। কিন্তু ক্ষমা মেলে নি। তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়, পরে ফের ধরা হয়। অপরাধ কিন্তু পুরনো, ওই একটিই। এমনটাই তখন রেওয়াজ ছিল। একই অপরাধে, একবারের জন্য হলেও, ধরা হচ্ছে, বন্দি অবস্থায় নির্যাতন চলছে, ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে, আবার ধরা হচ্ছে – ওই পুরনো অপরাধের জন্যই, এবং এভাবে চলতে-চলতে কোনো একটি বার শেষবারের জন্য চালান করে দেওয়া। আখ্মাতভার স্বামী-পুত্রদের ক্ষেত্রে এমন হয়েছে, এবং আরো বহু জনের বেলাতে ঐ কবিতা রচনার বাইরে আর কোন অপরাধে দোষী ছিলেন ওসিপ্? ছিল বৈকি। আরেকটি মাত্র। নবনির্মিত সোভিয়েত দেশে স্তালিন আমলে ঘোষিত শিল্পাদর্শ মান্য না-করা। যাই হোক, চূড়ান্ত শাস্তির রায় ঘোষণা করা হয় শ্রমশিবিরে নির্বাসনের মাধ্যমে। কোন অবস্থায়, কোন জায়গায়, কোন তারিখে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল – কোনো কিছুই কারো জানা নেই। কবির স্ত্রীকে সরকারিভাবে অবশ্য তারিখ জানানো হয়েছিল : ১৯৩৮ সালের ২৭শে ডিসেম্বর। নাদিয়া ঐ ডেথ সার্টিফিকেট পেয়ে হতবাক হয়েছিলেন, কারণ নির্বাসন-দণ্ডপ্রাপ্ত আসামীর মৃত্যুর খবর জানানোর তো রেওয়াজ ছিল না। নাদিয়া বলেছেন, সেকালে বাড়ি থেকে কাউকে তুলে নিয়ে যাওয়া মানে আর তাকে ফেরত না-পাওয়া – বিচার হওয়া না-হওয়া কোনো ব্যাপারই নয়; আদালতে নির্দিষ্ট সময়সীমার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামীর স্ত্রীকে নাকি আভাসে-ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেওয়া হতো যে তিনি ইচ্ছে করলে বিয়ে করতে পারেন। তাই মৃত্যু বা মৃত্যুর তারিখ জেনে নাদিয়ার লাভক্ষতি কিছুই হয় নি। তিনি শুধু এটুকুই নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, তাঁর প্রিয় মানুষটি, সে-যুগের উজ্জ্বলতম কবি, আর নেই। এবং নিশ্চিন্তও হয়েছিলেন, কেননা প্রতি মুহূর্তে হারিয়ে-যাওয়া স্বামীর যন্ত্রণাভোগের দুঃস্বপ্ন তাঁকে আর দেখতে হবে না। তবু স্বস্তি পান না। ওসিপ্ যেদিনই মারা যান-না কেন, কোথায়, কোন অবস্থায় তা খুঁজে বেড়িয়েছেন নাদিয়া বছরের পর বছর। কত জনের কত খবর! তথ্যের অনুপুঙ্খতার সঙ্গতি-অসঙ্গতি মিলিয়ে দেখতে-দেখতে সত্যি কি মিথ্যে বুঝতে হচ্ছে। এরকম একটি খবর হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত জীবিত অবস্থায় শ্রমশিবির থেকে বেরিয়ে-আসা একজন তাঁকে জানাল – ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, মান্দেল্শ্তাম্ নামই বটে, আমরা ‘কবি’ বলে ডাকতাম, সত্তুর বছরের বুড়ো মানুষ।’ মান্দেল্শ্তাম্রে বয়স তখন মাত্র সাতচল্লিশ। নির্যাতনে, অনাহারে, চিকিৎসাবিহীন ব্যাধিতে মানুষ কীভাবে বুড়িয়ে যেতে পারে! নাদিয়ার কষ্টের মাত্রা অনুভব করা আমাদের পক্ষে সহজ নয়।
কেমন মানুষ ছিলেন ওসিপ্ এমিলিয়েভিচ্ মান্দেল্শ্তাম্? যে-মানুষ মাত্রই সাতচল্লিশ বছরের আয়ু নিয়ে জন্মেছে সে কি শুধু কবিতা, গদ্যরচনা ও শিল্পচিন্তার কারণে এতখানি প্রতাপশালী হতে পারে যে রাষ্ট্র ভয় পায়? মান্দেল্শ্তাম্ তো তল্স্তোয় নন! কর্তাদের কাছে ঐ কবিতা পৌঁছানোর খবর শুনতে পেয়ে পাস্তের্নাক্ প্রতিষ্ঠাচ্যুত নিকলাই বুখারিন্কে (পূর্বে পলিটব্যুরোর সদস্য, পরে
স্তালিনের জগদ্বিখ্যাত ‘মস্কো বিচার’ তাঁকে প্রাণদণ্ড দেয়) ধরেছিলেন। বুখারিন্ তখন দৈনিক ইজ্ভেস্তিয়া চালাচ্ছেন, পলিটব্যুরোর সদস্যপদ খারিজ হয়ে গেলেও স্তালিনের সঙ্গে এক ধরনের সম্পর্ক রয়ে গেছে – অন্তত দেনদরবার করার মতো। পরের ঘটনা নানান বইকেতাবে বিশদভাবে লিপিবদ্ধ আছে। ঘটনাটি ওসিপ্কে ধরে নিয়ে যাওয়ার পরে। এক রাত্রে পাস্তের্নাকের টেলিফোন বেজে উঠল। ওদিক থেকে এক কণ্ঠ শোনা গেল – “কমরেড স্তালিন আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান।’ শুনে পাস্তের্নাক্ হতভম্ব।
প্রথম প্রশ্ন এলো, ‘মান্দেল্শ্তাম্কে ধরা নিয়ে তোমাদের কবি-সাহিত্যিক মহল কী বলাবলি করছে, বল তো!”
তোতলাতে-তোতলাতে বরিস্ বললেন, ‘নাহ্, কেউ কিছু বলছে না। কী বলবে? সকলেই ভীষণ ভীত …”
– “ঠিক আছে। কিন্তু মান্দেল্শ্তাম্ সম্পর্কে তোমার নিজের মত কী রকম? কবি হিসেবে সে কেমন?”
পাস্তের্নাক্ বললেন, “ভালো কবি, বড়ো কবি, তবে আমাদের গোত্রের নন। তিনি প্রাচীনপন্থী, ক্ল্যাসিক্যাল ধারার; আর আমরা পুরনো কাব্যকৌশল সব ভাঙতে চাইছি।”
– “তবে, সে কিনা একজন জিনিয়াস, ঠিক কী না?” স্তালিনের প্রশ্ন আসে।
এর উত্তরে কী বলবেন বরিস্? কী বলা সম্ভব! আমতা-আমতা করে বললেন, “এটা তো কোনো বিবেচ্য বিষয় হলো না। কিন্তু আমরা মান্দেল্শ্তাম্কে নিয়ে এত কথা কেন বলছি, বুঝতে পারছি না। আমার অন্য কথা বলার ছিল আপনাকে, অনেক দিন ধরেই বলব ভাবছি।”
– “কী কথা?”
বরিস্ বললেন, “জীবন ও মৃত্যু নিয়ে।”
সঙ্গে সঙ্গে ঘটাং। টেলিফোন রেখে দিলেন স্তালিন। সেই মুহূর্তেই বারংবার চেষ্টা করলেন পাস্তের্নাক্, অপারেটরকে বললেন – “কথা শেষ হয় নি, লাইন কেটে গেছে, জরুরি কথা, কমরেড স্তালিনকে লাইন দিন, এক্ষুনি তো কথা বলছিলাম …” ব্যর্থ চেষ্টা। লাভ হলো না। অপারেটর লাইন দেয় নি।
যে-সংবাদ দ্ব্যর্থহীনভাবে জানার ইচ্ছে ছিল স্তালিনের, তা হয়তো তাঁর বোধগত অনুভবে ধরা পড়েছিল, মুখ ফুটে কেউ বলে নি তখন, কিন্তু ইতিহাস পরে তা বিশ্বকে জানিয়েছে : ওসিপ্ মান্দেল্শ্তাম্ জিনিয়াস ছিলেন বৈকি।
দুই
রুশ সাহিত্য ও সমাজের ইতিহাসের সঙ্গে বাঙালি পাঠক ব্যাপকভাবে পরিচিত নন। তাঁরা সবচেয়ে বেশি চেনেন রাশিয়ার ঊনবিংশ শতক। রুশ সাহিত্যে ‘স্বর্ণযুগ’ বলে কথিত এই সময়। শিথিলভাবে হিসেব করলে পুরো শতাব্দীকেই চিহ্নিত করতে হয়। সর্বদা সমমাত্রার বিকাশ নয় নিশ্চয়ই, সাহিত্যের সকল শাখারও নয়। কখনো কবিতা, কখনো নাটক, কখনো কথাসাহিত্য : একেক সময়ে একেকটির গৌরবপর্ব চলেছে হয়তো। লক্ষ করতেই হয়, রুশ ভূখণ্ডের প্রথম মহত্তম কবি পুশ্কিনের জন্ম ১৭৯৯ সালে আর কথাসাহিত্যের শেষ কালাপাহাড় লিয়েফ্ তল্স্তোয় মারা যান ১৯১০ সালে। এই কালপরিধির মহারথীদের সৃষ্টি সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা আমাদের আছে। পুশ্কিন্, লিয়ের্মন্তফ্, গোগল্, তুর্গিয়েনেফ্, তল্স্তোয়, দস্তইয়েফ্স্কি, চেখফ্ প্রমুখের রচনার সঙ্গে বঙ্গানুবাদের মাধ্যমে কিঞ্চিৎ আলাপ-পরিচয় হয়েছে অনেক দিন হলো। বল্শেভিক্ বিপ্লবের পর যে-সোভিয়েত সাহিত্য তৈরি হয়ে উঠল, সেই জ্যোতিষ্কমণ্ডলেরও অনেককে আমরা চিনি : মায়াকোফ্স্কি, গোর্কি, এরেন্বুর্গ্, ইসিয়েনিন্। এর মাঝখানে একটা ফাঁক আছে, ওই অপসারিত সময় ও তৎকালীন সাহিত্য সম্বন্ধে আমরা তত জ্ঞাত নই। সেই ইতিহাস, হোক-না ন্যূনতম, আভাসেও যদি না জানি তা হলে রুশ জনগণের সৃজনসত্তার গোপন
ও প্রকাশ্য ভাণ্ডার বিষয়ে আমাদের মনে কোনো রূপরেখা তৈরি হয়ে উঠবে না।
ওই বিশেষ কালখণ্ড সাহিত্যের ইতিহাসে সংজ্ঞায়িত হয় ‘রৌপ্যযুগ’ হিসেবে। মোটামুটি চল্লিশ বছরের মতো সময়। স্তালিন ১৯৩২-এ সোভিয়েত ইউনিয়নে যত রকমের কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকদের দল বা গোষ্ঠী ছিল সব রদ করে সোভিয়েত লেখক-সংঘ, ইংরেজির বদৌলতে যা এদেশে রাইটার্স ইউনিয়ন হিসেবেই বেশি চালু, তৈরির ডিক্রি জারি করেছিলেন। এর ভিতরে সোভিয়েত সরকারেরই তৈরি (১৯২৫) রাপ্ (জঅচচ : জঁংংরধহ অংংড়পরধঃরড়হ ড়ভ চৎড়ষবঃধৎরধহ ডৎরঃবৎং) পর্যন্ত নবগঠিত রাইটার্স ইউনিয়নে বিলীন হয়ে যায়। ১৯৩২ সাল পর্যন্ত বিশ শতকের প্রথম বত্রিশ বৎসর এবং তার পূর্ববর্তী শতাব্দীর শেষ আট বৎসর, অর্থাৎ ১৮৯২-১৯৩২ পর্যন্ত চার দশককে ‘রৌপ্যযুগ’ বলা চলে। তার মানে, রুশ বিপ্লবের আগে-পরে ছড়িয়ে আছে ঐ রুপোলি সময়। কত বিচিত্র রুচি ও মেধা ও সৃজনশীলতা একত্র জড়াজড়ি করে বিস্ফোরিত হচ্ছে তখন! সিম্ভলিজ্ম্, আক্মেইজ্ম্, ফুতুরিজ্ম্, ফর্মালিজ্ম্, ইমাজিনিজ্ম্, সেরাপিওনভি ব্রাতিয়া, কন্স্ত্রুক্তিভিজ্ম্ – একের পর এক শিল্পসাহিত্যের তত্ত্ব, সে-সব তত্ত্ব নিয়ে সমমতাদর্শাবলম্বীদের জোট বাঁধা, দল তৈরি করা, মুখপত্র প্রকাশ করা ও আলোচনা-তর্কযুদ্ধে জড়ানো। এককথায় বিস্ময়কর এই উৎসারণ। আমরা বিচ্ছিন্নভাবে জনা কয়েক প্রতিভাকে জানি যাঁরা স্ব-স্ব ক্ষেত্রে বিশ্ববিখ্যাত, কিন্তু যে-সব শিল্পীচক্রের আশ্রয়ে তাঁরা ছিলেন সেগুলো আমাদের অজানা। যেমন ধরা যাক – আলেক্সান্দ্র্ ব্লোক্, আন্দ্রেই বিয়েলি, আন্না আখ্মাতভা, সের্গিয়েই ইসিয়েনিন, ভাদির্মি মায়াকোফ্স্কি, ভির্ক্ত শ্ক্লোফ্স্কি, রমান্ ইয়াকব্সন্, ওসিপ্ মান্দেল্শ্তাম্, বরিস্ পাস্তের্নাক্। নামে চিনি কমবেশি সকলকেই, কিন্তু তাঁদের গোত্র চিনি না; এঁরা বেশিরভাগই ভিন্ন ভিন্ন দলের।
ওসিপ্ এমিলিয়েভিচ্ মান্দেল্শ্তাম্ ছিলেন আক্মেইজ্ম্-গোত্রী। রাশিয়ার সিম্ভলিস্ত্রা ভ্যসি (অর্থাৎ নিক্তি বা দাঁড়িপাল্লা) বলে এক মুখপত্র বের করতেন, ১৯১০-এ তা বন্ধ হয়ে যায়। এ দলে অনেকেই ছিলেন, তাঁদের ভিতরে সবচেয়ে বিখ্যাত ও প্রভাবশালী হলেন ব্লোক্, বিয়েলি, ভাদির্মি সলগুব্, ভিয়াচেস্লাফ্ ইভানভ্ প্রমুখ। সিম্ভলিজ্ম্-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ থেকেই আক্মেইজ্ম্-এর জন্ম। ১৯১১ সালে নিকলাই গুমিলিওফ্ নামে পঁচিশ বছরের এক তরুণ কবি আর সের্গিয়েই মাকোফ্স্কি নামে মধ্যবয়সী (৩৫ বছর) শিল্পাসমালোচক – দু’ জনে মিলে ‘ৎসিয়েখ্ পয়েতফ্’ (অর্থাৎ কবিসংঘ) নামে এক প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়ে তার মুখপত্র প্রকাশ করলেন আপল্লোন্ (অর্থাৎ গ্রিক দেবতা আপোলো)। সেই সূত্রপাত। ক্রমে এখান থেকে জন্ম নেবে আক্মেইজ্ম্ কাব্যান্দোলন। স্বঘোষিত আক্মেইস্ত্ কবি ছিলেন ছ’ জন : আন্দোলনের দুই প্রতিষ্ঠাতা নিক্লাই গুমিলিওফ্ এবং সের্গিয়েই গরদিয়েৎস্কি, আন্দোলনের তাত্ত্বিক আন্না আখ্মাতভা এবং ওসিপ্ মান্দেল্শ্তাম্, আরও ছিলেন দু’ জন – ভাদির্মি নার্বুৎ এবং মিখাইল্ জেন্কেভিচ্। এঁদের মধ্যে সর্বাধিক প্রতিভাদীপ্ত রূপে স্বীকৃত তত্ত্বজ্ঞ দুই কবি। ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন, কিন্তু প্রেমের ব্যাপার ছিল না, আখ্মাতভার সঙ্গে প্রণয় ও বিবাহ হয় গুমিলিওফের, শেষ পর্যন্ত অবশ্য বিয়ে টেকে নি। আক্মেইজ্ম্ কথাটির ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন গুমিলিওফ্। লিখেছিলেন, “আক্মেইজ্ম্ অর্থ – সিদ্ধিলাভের শীর্ষতুঙ্গ, প্রস্ফুটনের কাল।” তখন আক্মেইজ্ম্-এর সমার্থক আরেকটি শব্দও চালু হয়েছিল ‘আদম্ইজ্ম’।
গুমিলিওফের ব্যাখ্যা ছিল এরকম : “আদম্ইজ্ম্ মানে হলো ওজস্বী, সুদৃঢ় ও স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি জীবন সম্পর্কে।” মান্দেল্শ্তাম্ ১৯২২ সালে এক বিখ্যাত রচনা লিখেছিলেন ‘শব্দের প্রকৃতি বিষয়ে’, সেখানে আক্মেইজ্ম্-সম্পর্কে তাঁর ধারণা ব্যক্ত আছে। তাঁরা প্রতীকবাদীদের সংকেতময় কাব্যশৈলীর বিপরীতে অবস্থান নিয়েছিলেন। কবির ব্যক্তিসত্তার অভিজ্ঞতার প্রত্যক্ষানুভূতির ইন্দ্রিয়গম্যতা তাঁদের বিবেচ্য ছিল এবং কবিতায় শব্দের সঠিক প্রয়োগ, ধ্বনি ও ছন্দের
কঠোর অনুশাসন তাঁদের আরাধ্য ছিল। পাস্তের্নাক্ যখন স্তালিনকে বলেছিলেন যে, তিনি ও মান্দেল্শ্তাম্ কাব্যসাধনায় ভিন্নগোত্রীয় তখন এটাই বোঝাতে চেয়েছিলেন। প্রায় একবয়সী দু’ কবির অন্যজন তো ফুতুরিস্ত্। এক বছরের বড়ো পাস্তের্নাক্ তাঁকে ‘প্রাচীনপন্থী, ক্ল্যাসিকাল ধারা’র বলার ওটাই কারণ।
আক্মেইস্ত্দের বড়ো কবি দু’ জনই : আখ্মাতভা (১৮৮৯-১৯৬৬) ও মান্দেল্শ্তাম্ (১৮৯১-১৯৩৮)। যে-রাতে পুলিশ ধরে নিয়ে গেল অন্তত সেদিন পর্যন্ত কাব্যরসিকদের বিচারে এ তিনজনের মধ্যে ওসিপ্ই ছিলেন সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এখন পর্যন্ত প্রিয় রয়ে গেছেন এমন জনা ছয় কবিও যদি বাছাই করা হয় সমগ্র রুশ কাব্যসাহিত্যের ভিতর থেকে, তো তার মধ্যে মান্দেল্শ্তামের উপস্থিতি অনিবার্য। শ্ক্লোফ্স্কি বলতেন, “মান্দেল্শ্তাম্ হলেন ‘মর্মর প্রস্তরের প্রজাপতি’।”
তিন
ওসিপ্ এমিলিয়েভিচ্ মান্দেল্শ্তামের জন্ম পোল্যান্ডের ওর্য়াশতে। বাবা এমিল্ ভেনিয়ামিনভিচ্ মান্দেল্শ্তাম্ ছিলেন চামড়ার ব্যবসায়ী, আর মা ফ্লোরা ওসিপভ্না ভের্ব্লোভ্স্কায়া প্রতিভাময়ী পিয়ানো-শিক্ষিকা। আরও দুই ভাই ছিল ওসিপের। ছোট সংসার গুটিয়ে নিয়ে তখনকার রুশ রাজধানী সাংক্ৎ পিতের্বুর্গে চলে আসেন এমিল্, লক্ষ্য – সাংক্ৎ পিতের্বুর্গের বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী সমাজের পরিমণ্ডলে
সন্তানদের বড়ো করে তোলা। জাতিতে ইহুদি ছিলেন। এটাও একটা কারণ হতে পারে যার জন্যে অকালে ঝরে যেতে হলো।
খুবই নামজাদা স্কুলে ভর্তি করানো হয়েছিল : তেনিশেভ্ বাণিজ্য বিদ্যাপীঠ। পরিচালক ছিলেন কবি ভাদির্মি ভাসিলিয়েভিচ্ গিপ্পিউস্। গিপ্পিউস্ পূর্বকথিত কবিসংঘের এক সদস্য ছিলেন, কবিতা ছাড়াও ভাবসমৃদ্ধ গদ্য রচনায় পটু ছিলেন। এক দশক পরে এই স্কুলে লোলিটা-খ্যাত নাবোকফ্ ভর্তি হয়েছিলেন। পাশ করে বেরুবার পর প্রথমে পারী শহরে (১৯০৭-০৮), পরে দেশে ফিরে এসে পুনর্বার বিদেশ – জার্মানিতে দু’ বছরের (১৯০৯-১০) জন্যে। হাইডেল্বার্গে তিনি প্রাচীন ফরাশি সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনো করলেন। ১৯১১-য় সাংক্ৎ পিতের্বুর্গ্ বিশ্ববিদ্যালয়ে রোমান্স ও জার্মানিক ভাষাগোষ্ঠীর বিষয়াদি অধ্যয়নের জন্য ভর্তি হলেন, কিন্তু শেষ অবধি লেগে থাকেন নি, ডিগ্রি নেওয়া হয়নি। ততদিনে আপল্লোন্ তাঁর কবিতা ছাপতে শুরু করেছে, প্রবন্ধও। ১৯১৩ সালে প্রথম কাব্য প্রকাশ করলেন ‘কামেন্’ (অর্থাৎ প্রস্তর)। সঙ্গে সঙ্গে বিখ্যাত। ছোট কবিতা হয়তো মাত্রই চার পঙ্ক্তির, কিন্তু ছন্দের ভারসাম্য ও সঙ্গতি কানে মায়া ছড়ায়। যেমন এই শিরোনামহীন কবিতা :
ধ্বনিটি বড়োই সাবধানী আর ফাঁপা
ফলটির বটে, গাছ থেকে খসে যেই,
অনন্তমধুর স্বননে স্বননে কাঁপা
মহারণ্যের নীরবতা ভিতরেই …
তিন বছর পরে বর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ বেরুল বইটির। ১৯২২ সালে পরবর্তী কাব্য ‘ত্রিস্তিয়া’ বেরয়। পরের বছর প্রথম কাব্যটি পুনঃপ্রকাশিত হলো শিরোনাম পাল্টে : ‘কবিতাবলির প্রথম বই’ এবং দ্বিতীয় কাব্যও একই সময়ে – ‘কবিতাবলির দ্বিতীয় বই’। ১৯২৮-এতে শেষ বই কবিতাগুচ্ছ। এর পর গ্রন্থাকারে কবিতা প্রকাশের সুযোগ পান নি। ভরোনেজ্ শহরে যখন নির্বাসনদণ্ড ভোগ করছেন তখন একঝাঁক কবিতা বেরিয়ে এসেছিল। ঐ বিপন্ন সময়েও বাºেবী উজ্জ্বল মহিমায় প্রকাশিত হয়েছিলেন ঐ দীন সেবকের কণ্ঠে, সকল সমালোচকই একমত সে-বিষয়ে। সেখানে এ-কবিতাটিও ছিল, শিরোনামহীন এক আত্মশ্লেষ :
– ঐ রাস্তার কী বটে নাম?
– সড়ক মান্দেল্শ্তাম্।
– একি এক নাম হলো নাকি!
ঘুরুন যেদিকেই সব বাঁকই
দেখবেন হতশ্রী বিনি-ছিমছাম।
– হ্যাঁ, লোকটা বরাবরই যেন কেমন!
বোধসোধ ছিল না ক’ মোটে তেমন।
আর তাইতেই বুঝি রাস্তাটা
(আসলে কিন্তু নর্দমাটা)
পেয়েছে শেষ তক্ ঐ নাম :
মান্দেল্শ্তাম্।
বহু বছরের বয়ঃকনিষ্ঠ নিক্লাই চুকোফ্স্কি তাঁর প্রিয় কবিমানুষটির অনবদ্য ছবি এঁকে রেখেছেন। প্রথমেই বলে নিয়েছেন, পাছে তাঁকে ভুল বোঝে পাঠক: “ওসিপ্ এমিলিয়েভিচ্ মান্দেল্শ্তাম্ আমার খুব পছন্দের মানুষ ছিলেন। তাঁকে সতের বছর ধরে চিনতাম, প্রায়ই দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে, কিন্তু আমি তাঁর ঘনিষ্ঠ ছিলাম না – কারণ, অংশত আমাদের বয়সের ফারাক, আর অংশত আমার লেখাপত্রের প্রতি তাঁর বিতৃষ্ণা
যা তিনি কখনোই লুকোন নি। তাঁর সততা ছিল একেবারে তাঁরই
নিজস্ব ধরনের।”
চুকোফ্স্কির আঁকা ওসিপ্ বিস্ময়কররূপে অচেনা। অন্তত আমার চেনা কোনো কবির মুখের আদল সেখানে ভাসে না। লিখেছেন : “তিনি সব সময় হতদরিদ্র অবস্থার ভিতরেই থেকে গেছেন। প্রত্যেক দিনই খাওয়ার সময়ে তাঁকে ভাবতে হয়েছে কোত্থেকে দু-চারটে রুবল যোগাড় করবেন কিছু কিনে খাওয়ার জন্যে। কিন্তু নিজের মূল্য সম্পর্কে তাঁর পুরোপুরি স্পষ্ট ধারণা ছিল এবং তাঁর আত্মসম্মানজ্ঞান ছিল প্রচণ্ড। খুব অভিমানী স্বভাবের মানুষ ছিলেন, সামান্য কিছুতেই অভিমান হতো তাঁর, আর সেটা তিনি গোপনও করতেন না। তখন, ঠিক মোরগ যেন, ঘাড়টা পিছন পানে ঠেলে দিতেন, ছোট্ট মাথাটার ওপরে কয়েকগাছি চুল কাঁপত, ক্ষৌরী-করা সুন্দর মুখের নিচে গলার কণ্ঠার হাড় ঠেলে বেরিয়ে আসত এবং তিনি বর্ষীয়ান আমলার ঢঙে উষ্মা প্রকাশ করতেন।”
ওসিপের জীবনের শেষ দশকের চিত্র এরকম : “তাঁর মেজাজ প্রায়শই খিঁচড়ে থাকত, সামান্যতেই মনে আঘাত পেতেন, তিনি যেন কেমন উৎকণ্ঠায় আর ভয়ে-ভয়ে থাকতেন। দেৎস্কোয় সেলো-তে একবার এক গ্রীষ্মে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়, তখন তাঁর অস্থির ও ছটফটে ভাবভঙ্গি লক্ষ করেছি, যেন মানসিক অবসাদের রোগী। প্রচুর কথা বললেন, এই বসছেন, এই উঠে দাঁড়াচ্ছেন, কখনো টেবিলের ওপরে মাথা ঝুঁকিয়ে বসে থাকছেন, একবার মাথা তুলতেই দেখি দু’ চোখে জল টলটল করছে। সিগারেট খাওয়ার সময় ছাইদান ব্যবহার করতেন না, নিজের বাঁ কাঁধের ওপরে ছাই ফেলতেন, তাঁর কোটের বাঁ দিকের কাঁধ সর্বদা ছাইয়ে ভরা থাকত।”
আমার চোখে কেন যেন, ঠিক কোনো কারণ নেই, এক কবির মুখ তৈরি হয়ে ওঠে বোর্দ্লে ও জীবনানন্দ মিলিয়ে। মঞ্চে কবিতা পড়তে উঠলেই এই ভীরু, এলোমেলো, আত্মপ্রত্যয়হীন মানুষই কেমন নির্ভীক, অকুতোভয়, যেন মুহূর্তের জন্য সম্রাট হয়ে উঠতেন। চোখে ভাসে বেলজিয়ামে বোদ্লের বিশাল সভাকক্ষে ভাষণ দিচ্ছেন কবিতা সম্পর্কে। ভারি সুরেলা কণ্ঠ ছিল মান্দেল্শ্তামের। আর্থিক সংগতি ছিল না, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে অকল্পনীয় শৌখিন। যখন চালচুলো ছিল তখন তাঁর ব্যক্তিগত পাঠাগার ছিল বুক কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো – তাঁর উত্তমরূপে জানা অন্ততপক্ষে চারটি ভাষায় লেখা কত জনের কত বিখ্যাত বই, কি গ্রন্থনির্বাচন আর কি লেখক নির্বাচন! রুচি, মনন ও সংবেদনশীলতার জ্বলন্ত বিগ্রহ।সময়ের চিৎকার নামে এক আত্মজৈবনিক গ্রন্থ রেখে গেছেন পৃথিবীর মানুষের জন্যে। যা লিখতে পারেন নি তা তাঁর বন্দিদশায় শেষ দুর্দশার কাহিনী। সেটুকুর অনেকটাই নানা জনে লিখে রেখেছেন। সব মিলিয়ে পড়লে পৃথিবীতে নির্বাসিত এক দেবদূতের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.