নিয়োগ পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফলে নিজের রোল নম্বরটা দেখে চোখে জল এসে গিয়েছিল, প্রথম প্রচেষ্টাতেই সফল। খুব মনে পড়ছিল বাবার কথা। তিনি জীবিত থাকলে হয়তো খবরটা শুনে বিশেষ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতেন না। বরং বিচার বিভাগে চাকরিতে জয়েন করে অবশিষ্ট জীবনের কর্তব্য বিষয়ে পাঁচ-ছয়টি নাতিদীর্ঘ গভীর বাক্য বলে দিতেন। চারপাশে দুর্নীতিগ্রস্ত পটভূমিতে নিজেকে কী করে পরিশুদ্ধ রাখা সম্ভব সে-প্রসঙ্গই থাকত তাঁর বক্তব্যের মূল। আর হয়তো কাউকে কিছু না বলে বাইরে গিয়ে ১০-১২ কেজি মিষ্টি কিনে নিয়ে হাজির হতেন, নিজেদের ঘর, আত্মীয় আর প্রতিবেশীর জন্য। আমার বাবা মোটেই গড় মানের কোনো মানুষ ছিলেন না। জীবনের প্রতিটি বিষয়ে তাঁর একটা নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, সত্যি কথা বলতে কী, এমন সূক্ষ্ম বোধসম্পন্ন মানুষ আমি আজো দ্বিতীয়টি পাইনি। বাবা এখন আমার কাছে একটা স্বপ্নের মতো বিমূর্ত চরিত্র হয়ে আছেন। তাঁকে আমি ধরতে-ছুঁতে পারি না; কিন্তু আমার চেতনার গভীর জুড়ে নানা রূপে বিচিত্র কম্পাঙ্কে প্রতিনিয়ত প্রভাবিত করে চলে সেই অবিনাশী সত্তা। আমি যখন ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হই, আমার শৌখিন বাবা কালো রঙের একটা স্কুটি কিনেছিলেন। পৌষের সকালে তাঁকে জাপটে ধরে, নিরাপত্তা আর স্নেহের উত্তাপ মেখে আমি প্রথম স্কুলে যাই, বৃক্ষবেষ্টিত বিশাল সবুজ মাঠের দক্ষিণ পাশে টিনে-ছাওয়া দুটি সেমিপাকা ভবন। তারপর টানা কয়েকটা বছর প্রধানত সেই স্কুটিতে চড়েই স্কুলে
যাওয়া-আসা করতাম। এর বাইরেও বাবা মাঝে মাঝে আমাকে পেছনে বসিয়ে দূর-দূরান্তে চলে যেতেন। বাবা ছাড়া আর কেউ এই স্কুটি চালাত না, অনুমতি পেত না। ফলে মোটরবাইকটাকে প্রায়ই বাবার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা জীবন্ত কিছু বলে মনে হতো। সম্ভবত আমার শৈশবের সবচেয়ে আনন্দপূর্ণ সময়গুলো হলো বাবার স্পর্শ নিয়ে তাঁর পেছনে ওই স্কুটিতে বসে থাকা। মাঝে মাঝে এমনও হতো, আমি শেষ রাতে স্বপ্নে দেখতাম আমাদের স্কুটির বিশাল দুটি নীলচে-ধূসর পাখা গজিয়েছে। আমি আর বাবা বাতাস কেটে কেটে সাদা-নীল বা রক্তরং মেঘের ভেতর দিয়ে উড়ে বেড়াচ্ছি। বিশেষ করে শুক্রবার বেলা সাড়ে বারোটা কি পৌনে একটার দিকে আমরা নতুন নতুন অচেনা গ্রামের দিকে রওনা হতাম। হেমন্তের শেষ থেকে পুরো বসন্ত – এই সময়জুড়ে ছোট ভ্রমণগুলো বেশ উপভোগ করতাম আমরা পিতা-পুত্র। উজ্জ্বল আর মিষ্টি রোদের ভেতর দিয়ে পাঁচ-সাত মিনিটের মধ্যে শহর ছেড়ে গ্রামীণ রাস্তায় ঢুকে পড়তাম। সেদিন বোধহয় ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহের ঝলমলে শুক্রবার। আমার তৃতীয় শ্রেণির ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে। অন্যদিনের চেয়ে একটু আগেভাগে, সাড়ে বারোটার দিকে বাবার স্কুটির পেছনে চড়ে বললাম, ‘বাবা, আমার তো পরীক্ষা শেষ, আজ একটু বেশি দূরের কোনো গ্রামে যেতে চাই।’
বাবার কণ্ঠে চিরন্তন স্নেহ আর প্রশ্রয়। ‘দূরে যাবে? ঠিক আছে, জুমার নামাজ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা চলতে থাকব।’ উজ্জ্বল মেরুন পাঞ্জাবি আর সাদা পাজামা পরিহিত আমার সুদর্শন পিতার মনটাও আজ বিশেষ ফুরফুরে। তার পেছনে বসে রাস্তার দুপাশের চলমান চৈতালি ফসলের ক্ষেত, পথচারী, গাছপালা, দোকান, বসতবাড়ি, ছোট বাজার এসব দেখতে বেশ লাগে আমার। আমরা নিম্নমধ্য মসৃণ গতিতে প্রায় আধাঘণ্টা একটানা চলি। বাসুদেবপুর নামক একটা জায়গায় কিছু দোকানপাট চোখে পড়তে বাবা স্কুটির গতি কমিয়ে বলেন, ‘এখানে গরম শিঙাড়া ভাজছে, চলো আমরা কিছুক্ষণের জন্য নেমে শিঙাড়া-চা খাই আর আশপাশটা ঘুরে দেখি।’ চা-পর্ব শেষ হয় দশ-পনেরো মিনিটের ভেতরেই। তারপর খালের পাশে একটা পুকুরে জল সেচে গ্রামের ছেলেদের খলসে-পুঁটি-ট্যাংরা মাছ ধরার দৃশ্য দেখি কিছুক্ষণ। পনেরো মিনিটের মতো সময় সেখানে কাটিয়ে আবার রওনা হই দক্ষিণ বরাবর পাকা রাস্তা ধরে।
দুই-তিন কিলোমিটার পথ পেরিয়ে একটা মহল্লার কাছে এসে বাবা বলেন, ‘ওই তো ডান দিকে একটা মসজিদ। দেখে মনে হচ্ছে বেশ পরিপাটি। অয়ন আমরা এখানে নেমে পড়ি, কী বলো?’
আমাকে তখন গতির নেশা পেয়ে বসেছে। তাই বলি, ‘বাবা, মাত্র তো ১টা ২৫ বাজে, নামাজ কোথাও ১টা ৪০-এর আগে শুরু হবে না, তুমি আরেকটু যাও না প্লিজ।’
‘ঠিক আছে, সামনে যেতে যেতে যে-মসজিদটি চোখে পড়বে সেখানে আমরা নেমে পড়ব।’ বাবা কী যেন একটা সুগন্ধি মেখে এসেছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা মøান হওয়ার বদলে স্নিগ্ধতা যেন আরো বাড়ছে। আমি বাবাকে জড়িয়ে ধরে সেই স্নিগ্ধ বাতাসে বুক ভরে শ্বাস নিই। আমাদের খুব কাছ দিকে একঝাঁক পাখি বিচিত্র আওয়াজ করে দুরন্ত ডানা মেলে কোথায় যেন হারিয়ে গেল। তখন আমি মনে মনে বলি, বাবা যদি অনন্তকাল এভাবে বাইক চালাত আর আমি তার শিশুপুত্রটি হয়ে দেখে চলতাম বিশ্বচরাচরের বিচিত্র দৃশ্য তাহলে বেশ হতো। অথচ, আমি একদিন যুবক হবো, বাবা একদিন বৃদ্ধ হবেন – এমন কথা ভাবতেই আমার মনটা বিষণ্ন হওয়ার পাঁয়তারা করে। বোধহয় মহাকালের নিয়ন্তার প্রতি একটু অভিমানও হয়। কেন মানুষের বয়স বাড়ে, কেন বাবারা বুড়ো হয়ে যান?
বাবা স্কুটির গিয়ার বদলে গতি বাড়িয়ে নিলেন। এই গ্রামের নাম কী তা কে জানে – তবে নতুন রাস্তাটা বেশ মসৃণ। গ্রামে জনবসতি খুব কম। ষাট কিলোমিটার না সত্তর – নাকি তার চেয়েও বেশি গতি? আমার কানের দুপাশে বাতাস শনশন আওয়াজ করছে। এর আগে তাকে কখনো পঞ্চাশের ওপরে গতি ওঠাতে দেখিনি। আমার সামান্য ভয় করে, তবু আমি বাবাকে জাপটে ধরে রেখে গতিটা উপভোগ করি। নাকে নানা রকম সুগন্ধ আসতে থাকে। দৃষ্টিসীমায় কোনো ফুলবাগান বা গাছ চোখে পড়ে না যদিও। হতে পারে বুনো ফুলের গন্ধ। আমরা চলছি তো চলছিই, রাস্তার ধারে আর কোনো উপাসনালয় আমাদের চোখে পড়ে না। কেবল ধর্মশালা কেন – কোনো বসতি, দোকান এমনকি একজন পথচারী বা পৃহপালিত পশুপাখিকেও আর কোথাও দেখা যাচ্ছে না। রাস্তার দুধারে কেবলই অচেনা গাছপালা আর দু-একটি বন্যপ্রাণীর বিক্ষিপ্ত নির্ভয় চলাফেরা। বাতাসে গাছগুলো দুলছে, শীতের ভাব নেই মোটেই, এখানে ডিসেম্বর নয়, যেন বসন্ত। যতই এগোই পরিবেশটা ততই নির্মল, সবুজ আর পাহাড়ি হয়ে ওঠে। পাহাড়ের মাঝে দু-একটি স্ফটিকজল ঝরনাও চোখে পড়ে। আমাদের এত কাছে এমন একটা নির্জন আর নির্মল পাহাড়ি আরণ্যক পরিবেশ আছে বাবা কিংবা অন্য কেউ তো বলেনি আগে। এইদিকের গাছগুলোতে নানা রঙের পাখি কিচিরমিচির করছে। একটিও ঠিক চেনা জাতের বলে মনে হয় না। তবে বাবা সরাসরি এমন স্থানের প্রসঙ্গ না বললেও তিনি আমাকে যেসব গল্প বা রূপকথা শোনাতেন তাতে এমন কিছু পরিবেশের উল্লেখ থাকত। আমরা কি তবে সেই কল্পলোকের জগতে চলে এসেছি? আমার মনে হলো, এই দৃশ্যরাজি কেবল গতির ভেতর নয়, স্থিরভাবে চোখ মেলে দেখার জন্য, রূপ-রস-গন্ধ নেওয়ার জন্য। তাই আমি বলি, ‘বাবা, জায়গাটা তো দারুণ। একটু দাঁড়াবে?’
বাবা কোনো কথা না বলে স্কুটি থামান। ‘তুমি বলেছিলে না আজ দূরে যেতে চাও – দেখো কত দূরে চলে এসেছি আমরা।’ আমরা বাড়ি থেকে যখন বের হই সেই সময়ের চেয়ে বাবাকে আরো প্রাণবন্ত আর তরুণ দেখাচ্ছে।
আমি একবার মুগ্ধচোখে চারপাশটা তাকিয়ে দেখি। এই গ্রামের বর্ণ-গন্ধ-শব্দ কোনোকিছুই যেন আমার চেনা নয়। আমরা কি তবে চিরবসন্তের দেশে চলে এলাম। নিজের চোখকে বিশ্বাস করা যায় না। এত নির্মল-নয়নাভিরাম মৃত্তিকা, বৃক্ষলতা, আকাশ, পাহাড় আর ঝরনা। মানুষ শহর ছেড়ে এসে এখানে আশ্রয় গড়ে না কেন?
বাবার হাত ধরে রাস্তার পাশের একটা দামি কাঠের চকচকে কালভার্ট পেরিয়ে পাহাড়ি উদ্যানটার দিকে এগিয়ে যাই। মনে হলো জায়গাটা প্রাকৃতিক বাগান হলেও পরিচর্যা করা হয় বলে বেশ পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি। অজস্র বড় বড় অচেনা গাছের মাঝে অনেকটা খোলা জায়গা, সেখানে নানা জাতের ফুলের সমারোহ। হরিণ, কাঠবিড়ালি, খরগোশ, বিচিত্র রঙের প্রজাপতি আর পাখি আনন্দে বিচরণ করছে। আমি বাবার হাত ছেড়ে দিয়ে একটা হলুদ রঙের খরগোশের পেছন পেছন এগোতে থাকি। খরগোশটা যেখানে গিয়ে উপস্থিত হলো সেখানে আরো শত শত হলুদ খরগোশের সমারোহ। আমাকে দেখে ওরা একটুও ভয় পায় না। আমার পায়ের কাছে এসে খেলতে থাকা একটা খরগোশ কোলে তুলে নিয়ে আদর করতে থাকি। তখন কোত্থেকে আমারই সমবয়সী একটা ছেলে ছুটে আসে। যাক তাহলে অন্তত একজন মানবসন্তানের দেখা পাওয়া গেল। আমি প্রথমে ভাবি, ছেলেটা বোধহয় পোষা এই প্রাণীদের মালিকপক্ষ। ওদের বিরক্ত করায় আমাকে খারাপ কিছু বলবে। কিন্তু ছেলেটির হাসিমুখ দেখে আমি আশ্বস্ত হই। ও বলে, ‘এই খরগোশটা না খুব আদুরে। আমি ওর নাম দিয়েছি তুনু। দাও তো আমার কোলে একটু।’
আমি বললাম, ‘এরা কি তোমাদের পোষা?’
‘না, না, এখানে কেউ কারো পোষা নয়। সব পশুপাখিই স্বাধীন। তবে পশুপাখি গাছপালা নদী আকাশ পাহাড় প্রজাপতি ফুল – সবাই সবার বন্ধু, সবাই সবার আত্মীয়। এমনকি একটি খরগোশ মন চাইলে প্রজাপতি, কিংবা একটি গাছ ইচ্ছা করলে সবুজ একটা পাখি হয়ে যেতে পারে, স্থির জীবন থেকে মুক্তি নিয়ে ডানা মেলতে পারে আকাশে।’ ওর কথা শুনে আমার বিস্ময়ের সীমা থাকে না। খরগোশটাকে কোলে নিয়ে ছেলেটি কথা বলতে বলতে পথ ধরে এগিয়ে চলে, আমি প্রায় তার পাশাপাশি হাঁটতে থাকি। ছেলেটি আমার নাম জিজ্ঞেস করলে আমি বলি, ‘অয়ন।’
শুনে সে অবাক হয়ে বলে, ‘বাহ! আমার নামও তো অয়ন। তাহলে আজ থেকে আমরা সত্যিকারের বন্ধু হয়ে গেলাম। তোমার কোনো আপত্তি নেই তো?’
‘কী যে বলো – আপত্তি কীসের!’
‘চলো আমরা ওই লেকের ধারে ফলের বাগানটায় গিয়ে খেলি।’
আমি ছেলেটির কথায় সম্মতি দিই। এবার আমরা আরো একটু দ্রুত হাঁটি। কয়েক মিনিটের ভেতরেই সেই বাগানটায় চলে আসি। তিন-চার হাত উঁচু গাছগুলোতে লাল, গোলাপি, সবুজ, কমলা, বেগুনি, খয়েরি প্রভৃতি রঙের অজস্র ফল
থোকায় থোকায় ঝুলে আছে। পাকা ফলগুলো থেকে বিচিত্র সুগন্ধ আসছে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এর একটি ফলও আমার ঠিক চেনা মনে হয় না।
ছেলেটি তার প্যান্ট আর জামার পকেট থেকে লাল, নীল, বেগুনি, গোলাপি প্রভৃতি রঙের অনেকগুলো পাথর বের করল। এগুলো রুবি, হীরা, পান্না, নীলম এসব কি না তা-ও আমি জানি না। তার অর্ধেক সংখ্যক আমাকে দিয়ে বলল, ‘এগুলো তোমার কাছে রাখো।’ তারপর সে আমাকে কীভাবে খেলতে হবে তা বুঝিয়ে দিলো। মাটিতে পাশাপাশি সাতটি ছোট গর্ত করা হবে। সেই গর্তের যে-কোনো একটিতে প্রতিবার তিনটি করে পাথর লুকিয়ে মাটি চাপা দেবে একজন। সে-সময় অন্যজন দূরে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে ধীরে ধীরে ১ থেকে ২০ পর্যন্ত গুনবে, কিংবা একটি গানের চারটি লাইন গাইবে। ততক্ষণে সাতটি গর্ত একই রকমভাবে সামান্য ঢিবির মতো উঁচু করে মাটিচাপার কাজ সমাপ্ত করা হবে। এরপর যার চোখ বন্ধ ছিল সে অনুমান করে বলবে কোনটিতে পাথর লুকনো আছে। সঠিক গর্ত চিহ্নিত করতে পারলে পাথর তিনটি সে পেয়ে যাবে আর ভুল গর্ত চিহ্নিত করলে প্রতিপক্ষকে তিনটি অনুরূপ পাথর দিতে হবে। একেকজনের কাছে ২৭টি করে পাথর আছে। যখন অন্যজন সবক’টি পাথর নিজের করে নিতে পারবে, তখন খেলা শেষ হবে। ছেলেটির হাত থেকে আমি নানা রং ও আকৃতির পাথরগুলো নিয়ে দেখি। এমন উজ্জ্বল পাথর আমি কখনো দেখিনি, যেন সব একেকটা দামি রত্নপাথর। খেলাটা আমার বেশ লাগে, যদিও প্রতি দফাই আমি ওর কাছে পরাজিত হচ্ছি; মানে ও প্রতিবারই সঠিক ঢিবি চিহ্নিত করেছে, আর আমি প্রতিবারই ভুল। মাঝে মাঝে আমরা দুজন গাছ থেকে ফল পেড়ে খাই। ফলগুলোর চেহারা যেমন অচেনা তেমনি স্বাদও ভারি অদ্ভুত, আমার আগে খাওয়া কোনো ফলের সঙ্গে মেলে না। হঠাৎ আমি খেয়াল করলাম আমাদের চারপাশটায় আলো কমে আসছে। সন্ধ্যা। আরে সূর্য ডুবল কখন? কীভাবে এতটা সময় পেরিয়ে গেল আমি তো কিচ্ছু টের পাইনি। ‘অয়ন, তুমি আমাকে বলোনি কেন – খেলায় খেলায় যে রাত হতে চলল। তুমি যদি আমার সত্যিকার বন্ধু হতে তাহলে আমাকে তোমার স্মরণ করিয়ে দেওয়া উচিত ছিল।’ আশ্চর্য আমার সঙ্গের ছেলেটিও দেখি উধাও। আমার হাতের ঠিক বাঁপাশে এই গাছটি তো একটু আগেও ছিল না। তাহলে কি ও গাছে রূপ নিল? আমার ভয় ভয় লাগে।
এতক্ষণের ঝিরঝিরে বাতাস সামান্য ঝড়ো বাতাসে রূপ নিয়েছে। তবে আকাশ মেঘমুক্ত, ফলে এ কোনো ঝড়বৃষ্টির সংকেত নয়। দেখি কেবল অয়ন নয়, আমাদের পাশে যে খরগোশগুলো বিচরণ করছিল তার একটাও নেই। শুকিয়ে আসা কণ্ঠে আমি পিতাকে স্মরণ করি, ‘বাবা, বাবা – তুমি কোথায়? অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে আমরা বাড়ি যাব।’ নাহ বাবার তো কোনো সাড়াশব্দ নেই। আমার বুকের ভেতরের কাঁপুনি প্রবলতর হচ্ছে। এখন গাছপালার ভেতর উদ্যানের গাছগুলো আরো ঘন হয়ে আসছে। আমি দৌড়ে পালাতে চাই, কিন্তু পা ফেলতে পারি না। আমার শরীরটা সবুজ আর শীতল হয়ে আসছে। আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছি মাটির ওপর। যেন আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার দুই পায়ের নিচে দিয়ে শেকড় গজাবে। তারপর কচিপাতা আর ডালপালা। একটা দিন না পেরোতেই হয়তো আমি আস্ত একটি গাছ হয়ে উঠব। আমাকে কি অনন্তকাল একটা বৃক্ষ হয়ে এখানেই থেকে যেতে হবে। কই আমি তো মানুষ থেকে বৃক্ষ হতে চাইনি। নাকি অবচেতনে আকাক্সক্ষা করে ফেলেছিলাম কে জানে। আমি সর্বশক্তি দিয়ে শেষবারের মতো আর্তনাদ করে উঠি, ‘বাবা, তুমি কোথায় – আমাকে নিয়ে যাও। বাবা, দেখ আমি শেকড় গজিয়ে একটা গাছ হয়ে যাচ্ছি। বাবা আর কিছুক্ষণ পরে এলে তুমি আর চিনতে পারবে না তোমার প্রিয় সন্তানকে। এত লাখ লাখ গাছের ভেতর কোনটি আমি তা কী করে বুঝবে। গাছ হয়ে যেতে আমার খুব একটা আপত্তি নেই, মানুষের চেয়ে গাছ-জীবন মন্দ কী! কিন্তু কেবল তোমাকে আর মাকে যে দেখতে পাব না কোনো দিন! বাবা – বাবা – দ্রুত ছুটে এসো আমার দিকে। আমি অরণ্যে পথ হারিয়ে ফেলেছি।’
বাবা আমার চেতনায় অদ্ভুত একটা রূপ নিয়েছে। স্বপ্নও নয়, বাস্তবও নয় – এমন। কখনোই মনে হয় না যে তিনি নেই। শৈশব থেকে আমি তাঁর মৃত্যুর সময় পর্যন্ত যতভাবে তাকে দেখেছি তাঁর বিচিত্র রূপ নিয়ে তিনি প্রতিনিয়ত আমার সামনে ভেসে ওঠেন। আগামী মাসের ২১ তারিখ রোববার আমাকে চাকরিতে যোগদান করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাবা আমাকে সম্ভাব্য কী কী নির্দেশনা দিতে পারতেন তার একটি তালিকা তৈরি করার জন্য আমি রাতে একটি ডায়েরি হাতে নিই। বিচারকের আসনটি যেমন সম্মানের, তেমনি ঝুঁকির। বাবা কি বলতেন ‘কেবল বিশ্ববিধাতাই বিচার করার অধিকার ও যোগ্যতা রাখেন। মানুষের বিচারে ভুল থাকবেই। কাজেই তোমার মুখের প্রতিটি বাক্য প্রতিটি কলমের আঁচড় দেওয়ার সময় বিবেককে শতভাগ জাগ্রত রাখবে। আর যদি সেটা না পারো তাহলে পদটা অহেতুক আগলে রেখো না।’
১৯ বছর আগের ওই দুপুরে আসলে কী ঘটেছিল তা আমি আজো জানি না। আমি অনেকটা বড় হয়ে বহুবার ওইসব দৃশ্যকল্পের ব্যাখ্যা খুঁজে সম্ভাব্য যে-কারণগুলো খুঁজে পেয়েছি :
এক. বাবা সেদিন বেশি গতিতে স্কুটি চালাচ্ছিলেন। তিনি মার্কবিহীন স্পিডব্রেকার দূর থেকে খেয়াল করতে পারেননি। যখন খেয়াল করলেন ব্রেকে চাপ দিলে স্কুটি ব্যালেন্স হারিয়ে পাঁচ-ছয় হাত উঁচুতে উঠে যায়, তারপর রাস্তার পাশের খাদে ছিটকে পড়ি আমরা। বাবা হয়তো সামলে নিয়েছিলেন, কিন্তু আঘাতে, ব্যথায় কিংবা ভয়ে আমি জ্ঞান হারিয়েছিলাম। আমি যা-কিছুর ব্যাখ্যা পাইনি সেগুলো আসলে ঘটেছে আমার অজ্ঞান অবস্থায়, অচেতনে। অর্থাৎ আসলে কিছুই ঘটেনি। ওই উদ্যান, হলুদ খরগোশ, আমারই নামের এবং একই বয়সের ছেলেটি, আমার বৃক্ষ হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া – সবকিছুই হ্যালুসিনেশন।
দুই. আমার পিতার বাইকটাতে সত্যিই ডানা গজিয়েছিল, আমি টের পাইনি; কিন্তু আমার পিতা সবই জানতেন। আমরা হয়তো সেই উড়ন্ত বাইকে মেঘ ছাড়িয়ে আকাশের ওপারের কোনো আকাশে চলে গিয়েছিলাম। সেখানেই বিচরণ করেছি সেই অলৌকিক উদ্যানে।
তিন. আজ আবার মনে পড়ছে ডিসেম্বরের কোনো এক রাতে আমাকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। আমি হয়তো আদৌ সেই দুপুরে বাবার সঙ্গে বের হতে পারিনি। জ¦রের ঘোরে ওইসব দৃশ্য চোখের সামনে হাজির হয়েছিল নিপুণ চলচ্চিত্রের মতো। অবশ্য হাসপাতালের বেডে চোখ মেলে আমি প্রথম মেরুন পাঞ্জাবি পরা সুদর্শন পিতাকে দেখেছিলাম।
নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফলের উচ্ছ্বাস যে মাত্র
একটা-দুটো দিনের ভেতরেই এতটা মøান হয়ে উঠবে তা আমি এর আগে কল্পনাও করতে পারিনি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংশ্লিষ্ট শাস্ত্রে এমএ ডিগ্রি নিয়ে সূক্ষ্ম বাছাই পরীক্ষায় ২২ হাজার ৯২৭ জনের মধ্যে মাত্র ১১২ জন নির্বাচিতের একজন আমি এই অয়ন ইসলাম। কর্তৃপক্ষ আমাকে সবরকমভাবে বাজিয়ে নিয়ে তবেই নিয়োগপত্র পাঠিয়েছে। তবু আমার সংশয়, আমার দ্বিধা ক্রমেই ঘনীভূত হতে থাকে। মানুষের ভাগ্য নিয়ে খেলার অধিকার কোনো চেয়ারের নেই। রাতে বিছানায় গিয়ে ছটফট করি। ঘুম আসছে না কিছুতেই। আচ্ছা, কাল সকালে মাকে যদি বলি – মা আমি এই চাকরিটাতে জয়েন করছি না। মা কি খুব কষ্ট পাবে? নাকি অবাক হবে? আমি জানি, বাবা বেঁচে থাকলে কষ্ট পেতেন না, অবাকও হতেন না। হয়তো নাস্তার টেবিলে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে এমন নির্বিকারভাবে কথা বলতেন যেন এটা কোনো ব্যাপারই নয়। এতটা গভীর এতখানি স্থিতধী অথচ প্রাণোচ্ছল মানুষ আমি আর দ্বিতীয়টি দেখিনি। বাবা খুব ভালো করে জানতেন, জীবনটা ক্ষুদ্র হলেও পৃথিবীটা বড়, আর মহাবিশ্ব কত বড় সে-ধারণাও ছিল তাঁর। তাঁর চিন্তা ছিল আলোকবর্ষের নির্ভীক অভিযাত্রী।
আমার বাল্যকালে ডিসেম্বরের সেই বিশেষ শুক্রবার মধ্যাহ্ন থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কী ঘটেছিল তার কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা আজো মেলেনি। আমরা প্রার্থনার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হয়ে আদৌ কি প্রার্থনায় শরিক হয়েছিলাম? মনে নেই, আমি কিচ্ছু মনে করতে পারছি না। তবে সেই উদ্যান, হলুদ খরগোশ, আমার নামের আমার বয়সী একটি বালক, নিস্তব্ধ সন্ধ্যায় বাবাকে হারিয়ে আর্তচিৎকার – এই অভিজ্ঞতা প্রচলিত প্রার্থনা মুহূর্তের চেয়ে নেহায়েত কম মূল্যবান নয়, হয়তো এর দাম অজস্রগুণ বেশি।সম্ভবত আমার কথাবার্তাগুলো বেশ দুর্বোধ্য হয়ে যাচ্ছে আপনাদের জন্য। আমি সেদিন সেই অদ্ভুত প্রহরগুলোর যে তিনটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যার কথা বলেছিলাম আপনার কাছে অন্য কোনো ব্যাখ্যা থাকলে সেটুকু যোগ করে নিতে পারেন। তাই এই গল্পটি অসমাপ্তই রাখা হলো। ও হ্যাঁ, একটা দরকারি কথা বাদ রয়ে গেল। সেই ঘটনার পর বাড়ি ফিরে আমার পকেটে তিনটে পাথর পাওয়া গিয়েছিল। পাথর তিনটে আমি যত্ন করে একটা টিনের কৌটার মধ্যে রেখে দিয়েছিলাম। কিন্তু বাসা বদলানোর সময় কৌটাসহ পাথরগুলো হারিয়ে যায়। সেই তিনটে পাথর থাকলে ঘটনার কিছু কূলকিনারা পাওয়ার সম্ভাবনা হয়তো উজ্জ্বল হতো। আমি জানি, আমার হারানো শৈশবের মতো ওই পাথরগুলোও আর কোনোদিন ফিরে পাব না।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.