বিয়ের পর ঝগড়া না করে দীর্ঘকাল দাম্পত্যজীবন কাটিয়েছেন এমন দম্পতির সংখ্যা একশতে কতজন? একজন সমীক্ষক, যিনি এ-বিষয়ে কাজ করেছেন, জানালেন, একেবারে কোনোদিনই ঝগড়া হয়নি এমন দম্পতি আছেন বলে জানা যায় না। একটু-আধটু মতান্তর সবারই হয়, দুটো মানুষ অবিকল এক নয়, তবে সেটা খুব তাড়াতাড়ি মিটেও গেছে এমন দম্পতির সংখ্যা দশ হাজারে একটি।

দশ হাজার অনেক বড় ব্যাপার, কিন্তু আমি এখন পর্যন্ত একটি দম্পতিকে জানি যাঁরা কোনোদিনই ঝগড়া করেননি, এমনকি মতান্তরও হয়নি। ওঁদের সাথে আমার আলাপ বছর দশেকের, ভদ্রলোকের বয়স নব্বুই, ভদ্রমহিলার আশি। বয়স হলেও দুজনেই এখনও শক্তপোক্ত আছেন। ছেলেমেয়ে নাতি-নাতনি নিয়ে বিশাল সংসার। ভদ্রলোক ব্যবসা করতেন। ভালো রোজগার ছিল। সেটা এখন ছেলেরা দেখছে, ব্যবসা বাড়িয়েছে। তবে প্রতিরাতে সবাই একসঙ্গে খেতে বসে। তখন ছেলেরা বাবাকে ব্যবসার রিপোর্ট দেয়, পরামর্শ নেয়। তখন বাবার চেয়ারের পাশে মা দাঁড়িয়ে থাকেন, ছেলেদের খাওয়া হয়ে গেলে মা বউমাদের সঙ্গে খেতে বসেন।

বৃদ্ধ ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘আপনাদের কেন

ঝগড়া হয়নি?’

উনি আমাকে খুব স্নেহ করেন। বললেন, ‘ওঁর জন্যে। উনি ঝগড়া করতে জানেন না।’

বৃদ্ধাকে আড়ালে একই প্রশ্ন করেছিলাম, উত্তর পেয়েছিলাম, ‘ওমা! ঝগড়া হবে কী করে? উনি তো কোনো ত্রুটি রাখেন না। আমার যা ভালো লাগে তাই করে গেছেন।’

‘আপনি বোধহয় শ্বশুর-শাশুড়ি দেবর-ননদের সঙ্গে থাকেননি!’

‘কী যে বলেন! শাশুড়িই তো হাতে ধরে আমাকে সংসারী হতে শিখিয়েছেন। শ্বশুর ছিলেন দেবতুল্য লোক। অল্পবয়সে উনি একবার দিল্লিতে একটা ভালো চাকরি পেয়েছিলেন। শুনে আমি বললাম, চাকরিটা না নিলে নয়?’

উনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কেন বলছ এ-কথা?’

বললাম, ‘ওঁদের ছেড়ে থাকব কী করে? আবার তোমার সঙ্গেও থাকতে চাই। তুমি যদি চাকরিটা না-নিয়ে এখানেই কিছু করো তাহলে খুব ভালো হয়।’

শুনে উনি চাকরি নিলেন না, ব্যবসা শুরু করলেন। আমার শ্বশুর-শাশুড়ি খুব খুশি হয়েছিলেন। আমিও।’

ওঁদের বিয়ের বয়স পঁয়ষট্টি। প্রতিটি সকালে বৃদ্ধ ঘুম থেকে উঠে নিজের ঘরের হিটারে জল গরম করে চা বানান। বাড়ির সবাই যখন ঘুমে থাকে তখন দুকাপ চা ট্রেতে রেখে স্ত্রীর ঘুম ভাঙান। এই পঁয়ষট্টিবছরে কেউ কাউকে ছেড়ে একটিও রাত থাকেননি। একবার তেমন ঘটনা বিশেষ কারণে ঘটতে যাচ্ছিল কিন্তু বৃদ্ধার যাওয়ার দিনই বৃদ্ধের আচমকা এত জ্বর এসেছিল যে আর যাওয়া হয়নি। বারংবার জিজ্ঞাসা করেছি, রহস্যটা কী? ওঁরা অবাক হয়েছেন। রহস্য থাকবে কেন? এটাই তো স্বাভাবিক।

বৃদ্ধাকে আলাদা প্রশ্ন করেছি, ‘আপনি তো হাউজওয়াইফ, ওঁর কাছে টাকা চেয়েছেন কোনো ব্যক্তিগত প্রয়োজনের জন্যে অথচ পাননি, এমন হয়নি?’

উনি বলেছেন, ‘ব্যক্তিগত প্রয়োজন মানে কী? আমি আর উনি মিলিয়েই তো আমাদের ব্যক্তিগত সবকিছু। আর টাকা-পয়সা? আমাদের ঘরে একটা বাক্স আছে। তাতে উনি যেমন রোজগার করতেন তেমন টাকা থাকত। বাক্সের পাশে থাকে একটা খাতা। যার যখন দরকার তখন বাক্স থেকে টাকা নিয়ে নিতাম, নিয়ে খাতায় লিখে রাখতাম। ওঁর কাছে মুখ ফুটে চাইতে হতো না।’

‘যদি বেশি নিয়ে কম লিখতেন?’

বৃদ্ধা অবাক হয়ে গেলেন, ‘ওমা! মিথ্যে কথা লিখব কেন? তাতে তো চুরি করা হয়। নিজের জিনিস কেন চুরি করতে যাবো?’

শুধু বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধা নয়, শুনলাম এই রেওয়াজ এখনও চালু আছে। ব্যবসা থেকে যে-টাকা প্রতিমাসে আসে তার একটা অংশে প্রয়োজনীয় খরচগুলো মিটিয়ে বাকিটা ওই বাক্সে রাখা হয়। ছেলেরা, ছেলের বউরা এমনকি আঠারো বছরের বেশি নাতির নাম লেখা খাতার পাতা বাক্সের পাশে রয়েছে। যার যখন দরকার বাক্স থেকে টাকা নিয়ে নিজের নাম লেখা পাতায় লিখে রাখে। মাসের শেষে যোগ করে দেখা যায় হিসেবে কোনো গরমিল নেই।

ওই বাড়ির পুত্রবধূদের সঙ্গে আলাদা

কথা বলেছি। দেখেছি শ্বশুর-শাশুড়ি সম্পর্কে প্রগাঢ় শ্রদ্ধা ওঁদের। বড়ছেলে বলেছেন, ‘জ্ঞান হওয়ার পর এই

ষাট-বাষট্টি বছরে কখনোই ঝগড়া করতে দেখিনি ওঁদের।’

‘আপনাদের নিজেদের মধ্যে ঝগড়া হয় না?’

‘হয় না আবার! তবে তা শোওয়ার ঘরের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে। বাবা-মা জানতে পারবেন এমন ঝগড়া আমরা কখনও করি না। খুব রাগ হলেও না।’

স্বীকার করছি, এই দম্পতি ব্যতিক্রমের দৃষ্টান্ত। দশ হাজারে এক। চল্লিশ বছর আগেও অভিভাবকরা বাড়ির বউ হিসেবে নির্বাচন করতেন পনেরো-ষোলো বছরের মেয়েদের, যাঁরা সংসার সম্পর্কে অনভিজ্ঞ থাকতেন। শ্বশুরবাড়িতে এসে তাঁরা একটু একটু করে শিখতেন। অত অল্পবয়সে আসতেন, মা হয়ে যেতেন বলে শ্বশুর বাড়িটাই নিজের বাড়ি হয়ে যেত আর বিয়ের আগের বাড়িটা হতো বাপের বাড়ি। তখন কোনো মেয়ে মায়ের বাড়ি বলত না, বলত বাপের বাড়ি। সম্ভবত বাবা একটু দূরের মানুষ বলে বাপের বাড়ি বললে সঠিক মানে বোঝানো সম্ভব হতো। স্বামীর সঙ্গে বয়সের ব্যবধান থাকত। সে-সময়ের অনেক স্ত্রীকেই আমি স্বামীকে আপনি বলতে শুনেছি। স্বামী হয়ে যেতেন অভিভাবকের মতো। সব কথা তাঁকে বলা যেত না। উলটো শাশুড়ি যদি দজ্জাল না হতেন তবে তাঁকেই বন্ধু ভেবে সেসব কথা বলা যেত। একটু বয়স হলে ঝগড়া হতো, ছেলেমেয়ের লেখাপড়া, সংসারের সমস্যা নিয়ে মান-অভিমান কথা-বন্ধ করা চলত। আবার মিটেও যেত। কেউ কাউকে ছেড়ে থাকার কথা চিন্তাও করত না। তবে গোসসা হলে ওই বাপের বাড়িতে চলে যাওয়ার হুমকি চালু ছিল। মুশকিল হতো, বাপের বাড়িতে বেশিদিন থাকার অধিকারও তাঁদের ছিল না। সেক্ষেত্রে কথা উঠত মা-বাবা-ভাইদের মুখেই। ফলে সুড়সুড় করে বাপের বাড়িতে ফিরে না এসে উপায় থাকত না। মূলত, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না-থাকায় প্রায় সত্তর দশক পর্যন্ত একান্নবর্তী পরিবার থেকে শ্বশুরবাড়িতে যাওয়া মেয়েরা ঝগড়াঝাঁটি করেও শেষ পর্যন্ত দাঁতে দাঁত চেপে আমৃত্যু স্বামীর সঙ্গে থাকত।

ভাঙল একান্নবর্তী পরিবারগুলো অর্থনৈতিক কারণে। পরিবার ছোট হলো। তাতে অনেকেরই স্বাচ্ছন্দ্য এলো। যে-বাবাকে একান্নবর্তী পরিবারের সন্তানেরা প্রায় চোখেই দেখতে পেত না এখন তাঁকে সকালে বিকেলে দেখছে। পরিবার ছোট হওয়ায় ভাই-বোনের সংখ্যাও কমেছে। মেয়ে বাপের আদর পাচ্ছে। তার মা নিজের বাবাকে আপনি বলে ডাকত, সে তুমি বলে। ঘাড়েপিঠে চড়েছে শৈশবে, পড়াশুনা করেছে কলেজ পর্যন্ত। বিয়ের পর তার জোর আছে, সে প্রয়োজনে ফিরে যেতে পারে ‘আমাদের’ বাড়িতে। এখন বাপের বাড়ি শব্দটা ক্ষয়ে গিয়েছে। কুড়ি-একুশে বিয়ে হওয়ায় আজন্ম যাতে অভ্যস্ত হয়েছে তার ব্যতিক্রম শ্বশুরবাড়িতে দেখলে মানাতে অসুবিধে হচ্ছে। শাশুড়ির সঙ্গে সংঘাত হচ্ছে, ননদের মন্তব্য মেনে নেওয়া যাচ্ছে না। স্বামী যদি তাঁদের পক্ষ নেয় তাহলে সম্পর্ক আরো খারাপ হচ্ছে। এই করে-টরেও বাচ্চা এসে যাচ্ছে। যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে সে মাঝে মাঝেই চলে আসছে বাবা-মায়ের কাছে। তার মুখে যা শুনছে তাই বিশ্বাস করছেন মা-বাবা। জামাইকে ডেকে ব্রেনওয়াশ করার চেষ্টা চলছে। শেষ পর্যন্ত উপদেশ, তোমার বউ-সন্তানের ভালোর জন্যে আলাদা হও। কিন্তু সেটা সম্ভব হবে যদি জামাইয়ের আর্থিক অবস্থা ভালো হয় এবং মনের জোর না থাকে। শুধু শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে ঝগড়া করে বাবা-মায়ের কাছে থেকে গেছেন এমন মহিলার সংখ্যা কম নয় যাদের বিয়ে সত্তর দশকের পর হয়েছে।

শুধু শ্বশুর-শাশুড়ি বা ননদকে নিয়ে সমস্যা তৈরি হওয়ার জন্যে যে-ঝগড়া তারও তো দিন শেষ হলো একসময়ে। শুরু হলো ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির সংঘাত। পরশুরামের গল্পে দেখেছি ভাবী বরের সঙ্গে শিক্ষিতা কনের বিয়ের আগে যে-আলোচনা হচ্ছে তাতে পরস্পরের পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বিপুল পার্থক্য স্পষ্ট। মেয়ে চায়ে এক চামচ চিনি খায় তো ছেলের দুচামচ ছাড়া চলে না। রাত্রে দুটো স্যান্ডউইচ আর কফিতেই মেয়ে ডিনার সারে তো ছেলের চাই আড়াইশো গ্রাম ভাত এবং সেটা খাওয়ার জন্যে পাঁচ রকমের পদ। এর হলুদ পছন্দ তো ওর সাদা। অতটা না-হলেও বেশকিছু গরমিল আবিষ্কার করে বিয়ের পর গম্ভীর হতে শুরু করেন আশি দশকের বিবাহিতরা। মেয়ে চিরকাল রবীন্দ্রনাথের গান শুনেছে, গেয়েছে। ‘উদাসী হাওয়া’ শুনলে চোখ বন্ধ হয়ে যায় তার, মাথা দোলে। বিয়ের পর স্বামী বিরক্ত হয়ে বলে, ‘কী প্যানপ্যানানি শুনছ? কিশোরকুমার শোন, টেরিফিক।’ কিশোরকুমারের হিন্দি গান অপছন্দ নয় মেয়ের, তাই বলে সুচিত্রা মিত্র, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় শুনতে পাবে না, তা কী করে সম্ভব! তার চেয়ে মরে যাওয়া ভালো। সত্যজিতের ছবিতে ছেলে আনন্দ পায় না, পায় শক্তি সামন্তের ছবিতে। জোর করে স্ত্রীকে নিয়ে যায়। আর স্ত্রী ভাবে এ-সব কী দেখছি! শেষমেশ একটা অ্যাডজাস্টমেন্টে যেতে চায়। এক সন্ধ্যায় স্ত্রীর পছন্দের গান বাড়িতে বাজবে অন্য সন্ধ্যায় স্বামীর। দেখা গেল স্ত্রীর দিনে স্বামী বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারতে বেরিয়ে যাচ্ছে। তখন স্ত্রী বাজায়, ‘সহে না যাতনা’। একদিন জোর করে স্বামীকে ধরে বলে, ‘এই গানটা শোনো প্লিজ।’ স্বামী দুলাইন শুনেই লাফিয়ে ওঠে, ‘ওই তো রবীন্দ্রসংগীত, কী যে ভালো লাগে তোমার!’ স্ত্রী চমকে দিতে চায়, ‘কিশোরকুমার গেয়েছেন’। স্বামী অবিশ্বাসে আবার একটু শোনে, ‘তবু জমেনি।’

ক্লাব থেকে তাস খেলে স্বামী রাত এগারোটায় বাড়ি ফেরে রোজ। স্ত্রী যে সারাদিন এবং সন্ধেও একা কাটায় সেটা তার মাথায় ঢোকে না। এই নিয়ে অভিমান, ঝগড়া, কত কী! যেহেতু এই সময়ের বেশির ভাগ বিয়ে প্রেম করার পরে, তাই রাগ করে বাপের বাড়িতে ফিরে গিয়ে বেশিদিন থাকা যায় না। শুনে মা বকবে, ‘তখনই পইপই করে বলেছিলাম এই ছেলেকে বিয়ে করিস না, শুনিসনি। এখন বোঝ!’ অর্থাৎ যেমন কর্ম করেছ তেমন ফল ভোগ করো। আমাদের কোনো দায়িত্ব নেই।

এ-ব্যাপারেও একটা অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটে গেছে। সত্তর কী আশি দশক পর্যন্ত যদি কোনো বাবা শুনতেন মেয়ে প্রেমে পড়েছে, তাহলে খড়্গহস্ত হয়ে উঠতেন। বাড়ির বাইরে যাওয়া বন্ধ করতেন, তোড়জোড় করে ছেলে খুঁজে বিয়ে দিয়ে দিতেন মেয়ের ইচ্ছেকে উপেক্ষা করে। এসব করার সময় তাঁদের বিজয়ী সেনাপতির মতো দেখাত। মুশকিল হলো, মেয়ে পনেরো-ষোলো বছরের নয়, তার স্বাধীন মতামত তৈরি হয়েছে। শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে সংঘাত বাধলেই সে সোজা বাবা-মাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বলত, ‘তোমরা আমার জীবনের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছ। নিজেদের ইগো বজায় রাখতে আমাকে হাত-পা বেঁধে জলে ফেলে দিয়েছ।’

মা-বাবার মুখে অন্ধকার নামে। কথা খুঁজে পান না।

নব্বুই দশক থেকে অন্য সংলাপ শোনা গেল। একেবারে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। মেয়ে এম এ পাশ করেছে। মা বলছে বাবাকে, ‘এবার ছেলে দ্যাখো, মেয়ের যে বয়স হচ্ছে বুঝতে পারছ না।’ বাবা কথা হাতড়ায়, ‘ছেলে, ছেলে কোথায় পাবো?’ ‘কেন? সবাইকে বলো, কাগজে বিজ্ঞাপন দাও।’ মা বলে। বাবা মাথা নাড়ে, ‘কিন্তু সেই ছেলে যদি খারাপ হয়? আজকাল বাইরে থেকে কাউকে দেখে কিছু বোঝা যায় না।’ বাবা বলে গলা নামিয়ে, ‘আচ্ছা, এতদিন ধরে এম এ পড়ল, কারও প্রেমে পড়েনি?’

মা বলল, ‘আমার মেয়ে ওরকম না।’

‘ওয়ার্থলেস।’ বাবা বিরক্ত হয়, ‘আরে ও যদি কোনো ছেলেকে ভালোবেসে বিয়ে করতে চাইত তাহলে আমি সব খরচ দিতাম। বিয়ের পরে কিছু হলে আমাকে তো দায়ী করতে পারত না।’

কুড়ি-পঁচিশ বছর আগে মেয়ে প্রেমে পড়লে যাঁরা রাগে অন্ধ হয়ে যেতেন তাঁরা এখন প্রাণপণে চাইছেন খুব একটি ভালো ছেলের প্রেমে পড়ে যাক তাঁদের মেয়ে। কারণ তাঁদের কোনো দায় থাকবে না। এই দায় থাকবে না কথাটা তাঁদের মাথায় ঢুকেছে চারপাশের বিবাহিত দম্পতিদের সম্পর্কহীনতা দেখে।

গত দশ বছরে ছবিটা বদলে গিয়েছে দ্রুত। মেয়েরা এগিয়ে এসেছে সামনে। তারা স্বনির্ভর হচ্ছে। ভালো চাকরি পাচ্ছে ছেলেদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে। একটি কম্পিউটারে-ডিগ্রি পাওয়া মেয়ে তিরিশ-চল্লিশ হাজার মাইনে পাচ্ছে অনায়াসে। ফলে তার নিজস্ব ধ্যান-ধারণা এবং জগৎ তৈরি হয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় বাবা-মা চেষ্টা করেও এইরকম মেয়ের যোগ্য পাত্র খুঁজে পান না। আর পাত্র পেলেও তার সম্পর্কে শেষ সিদ্ধান্ত নেয় মেয়ে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সে পছন্দের ছেলেকে বিয়ে করে। এই বিবাহিত-পরবর্তী অবস্থার চেহারাটা অনেকটা এইরকম। সকালে উঠে ব্রেকফাস্ট, স্নান সেরে দুজনেই বেরিয়ে পড়ে অফিসে। ফিরতে সন্ধে পেরিয়ে যায়। তখন একটু ফ্রেশ হয়ে রেস্টুরেন্টে খেয়ে আসা। ভোরে ওঠার তাগিদ থাকে। সারাদিনের কাজের লোক এরা প্রয়োজন পড়ে না বলে রাখে না। ঠিকে ঝি কাজ করে যায় সকাল সকাল। ছুটির দিনে গ্যাস জ্বেলে একবেলা কিছু করে নেয়, সন্ধে কাটে বিভিন্ন পার্টিতে। এদের বেশির ভাগই চটজলদি সন্তান নিতে চায় না। সন্তানের কারণে তিন মাস ছুটি নিলে পুরুষকর্মীদের থেকে পিছিয়ে পড়ার ভয় খুব বড় হয়ে দেখা দেয়। তারপর সেই বাচ্চার দেখাশোনা যত্নের জন্যে সময় দেওয়াও সমস্যা। চাপে পড়ে যে-মেয়ে রাজি হয় সে আয়া রাখে দুটো। রাত্রে বাচ্চার চিৎকারে ঘুম না এলে পরের দিন অফিসে গিয়ে ঢুলতে হবে। এখন এই ব্যাপারে মায়েদের সাহায্য পাওয়া মুশকিল হয়ে উঠেছে, তাঁরাও জানিয়ে দেন বয়স হওয়ায় আর বাচ্চার ঝামেলা নিতে তাঁরা পারবেন না। শিশুরা এইভাবে আয়ার কাছে বড় হয়। তার একটু বেতাল দেখলে স্ত্রী স্বামীকে ভর্ৎসনা করেন, ‘তোমার জন্যেই হয়েছে। আমি তো নিষেধ করেছিলাম। বাবা হওয়ার সাধ হয়েছিল, এখন বোঝ।’

দ্বিতীয় ছবিটা আরো আলাদা। বিয়ের পর একজন বদলি হয়ে গেল মুম্বাইতে, আরেকজন কলকাতায়। বদলি যদি নাও হয়, আরেকটা ভালো চাকরি পেয়ে স্ত্রী চলে গেল ব্যাঙ্গালোরে। আগে থেকে টিকিট কেটে দুমাস অন্তর স্বামী শুক্রবার রাত্রে ব্যাঙ্গালোরে গিয়ে রবিবার রাত্রে প্লেনে ফিরে আসে। স্ত্রীও একই রুটিন মেনে চলেন। এখন একুশ দিন আগে প্লেনের টিকিট কাটলে দুই-তৃতীয়াংশ ভাড়া কমে যাওয়ায় সুবিধে হয় এদের। বছরে বারো রাতের দাম্পত্যজীবনে ঝগড়া হয়? হয়।

স্বামী বা স্ত্রীর জীবনে তৃতীয় ব্যক্তির আগমন নিয়ে এখন জটিলতা বাড়ছে। স্বামীর মদ্যপান নিয়ে তেমন অশান্তি নেই। এতদিনে বাঙালি মদ খেয়ে নেশাগ্রস্ত না হতে শিখে গিয়েছে।

বলা হচ্ছে বাবা-মায়ের অত্যধিক আদরে বড় হওয়া একা মেয়ে স্বামীর সঙ্গে কিছুতেই মানাতে পারছে না। এটা স্বামীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মায়ের স্নেহের ছায়ায় বড় হওয়ার সময় ছেলে শুধু পড়াশুনা করেছে, ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট করেছে, কিন্তু কারও সঙ্গে ভাগ করে নিতে শেখেনি। সেই শৈশবে তাকে স্কুলে পাঠাবার সময় মা বলেছে, ‘টিফিন কিনে খাবে, কাউকে দেবে না, দিলে খুব বকব।’ এটা সে মনে রেখেছে। ভাই-বোন না থাকায় যা চেয়েছে তাই পেয়েছে। আর এই অভ্যেস তার রক্তে এমনভাবে মিশে গেছে যে, বিয়ের পর সে স্ত্রীর কাছে মায়ের প্রশ্রয় পেতে চেয়েছে। না পেলেই সংঘাত।

সম্প্রতি একটি অভিনব মামলা আদালতে শুরু হয়েছে। আমরা সবাই জানি, ডিভোর্স পাওয়া যায় কয়েকটি নির্দিষ্ট কারণে। দুরারোগ্য অসুখ, যৌনরোগ অথবা মস্তিষ্কবিকৃতি প্রমাণ করলে বিবাহ-বিচ্ছেদ আদালত মনজুর করে। আমি ওর সঙ্গে থাকতে পারছি না, এই অজুহাত আদালত মানবে না। তবে দুজনেই যদি একসঙ্গে বলে, আমরা থাকতে পারছি না, তবে আদালত অনেকবার ভাবার সুযোগ দিয়ে শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদের সপক্ষে রায় দেন।

এই মামলায় স্বামী অভিযোগ করেছেন যে, বিয়ের রাত থেকেই তিনি আবিষ্কার করেছেন যে তাঁর স্ত্রী শীতল। কোনো যৌন আগ্রহ তো নেই, বরং সেটি এড়িয়ে চলেন। জোর করলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। অতএব তাঁদের সন্তান হবে না। তাই বিবাহমুক্তি চান। স্বামীর ওই অভিযোগে চুপ করে থাকেননি স্ত্রী, মেনে নেননি। তিনি পালটা অভিযোগ করেছেন, তাঁর স্বামী যৌনকর্মে অক্ষম। তাঁর যৌনাঙ্গ এত ক্ষুদ্র যে, সেটি অক্ষমতাই বহন করে। তবু তিনি তাঁর স্বামীর সঙ্গে থাকতে চান।

প্রকাশ্যে ব্যক্তিগত শারীরিক সমস্যা আদালতে টেনে আনা হলো এই প্রথম। এর আগে একপক্ষ এমন অভিযোগ করলে অন্যপক্ষ মেনে নিয়েছে। কনটেস্ট করেনি। তাই একতরফা রায় হয়ে গেছে। কিন্তু এবার তা হচ্ছে না। এক্ষেত্রে আদালত চিকিৎসকদের সাহায্য নিতে পারেন। চিকিৎসক যদি বলেন স্ত্রী সত্যি শীতল এবং স্বামীর যৌনাঙ্গ ক্ষুদ্র তাহলে আদালত কী রায় দেবেন? বলবেন, বিবাহ-বিচ্ছেদ হবে না?

যদি সেই রায় আদালত দেন, তাহলে ওই দুই স্বামী-স্ত্রীকে কি জোর করে একসঙ্গে বাস করানোর ক্ষমতা আদালতের আছে? না, নেই।এইসব জটিলতা, যত দিন যাচ্ছে, বাড়ছে। কজন দম্পতি বিবাহিত জীবনে ঝগড়া না করে আছেন? এই প্রশ্ন বেশ কয়েকজনকে করেছি। সবচেয়ে ভালো উত্তর দিয়েছেন একজন, ‘রাত্রে ঘুমাতে যাওয়ার সময় খুব অস্বস্তি হচ্ছিল, পাশে শোওয়া স্বামীকে সে-কথা বললাম। সে বলল, ঘুম না এলে ওষুধ খাও। হঠাৎ মনে পড়ল। আজ সারাদিন আমাদের একবারও ঝগড়া হয়নি। মনে হওয়ামাত্র আমি ওর পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া শুরু করলাম। তারপর, বিশ্বাস করুন, একঘুমে রাত চলে গিয়েছিল।’