মানুষ ও মহাবিশ্ব
শিশিরকুমার ভট্টাচার্য
সময় প্রকাশন
ঢাকা, ২০০৪
দাম : ১৭৫ টাকা
ডক্টর শিশিরকুমার ভট্টাচার্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অঙ্ক শেখান – জ্যোতির্পদার্থবিদ্যার নামী অধ্যাপক। অবশ্য বিশেষজ্ঞমহলে সম্মান পেলেও সাধারণ মানুষের কাছে তেমন পরিচিত নন। তাঁর চর্চার বিষয় তাঁকে দূরে ঠেলে রাখে। আমরা বেশির ভাগ অঙ্কে ভয় পাই। তার ওপর তাঁর বিদ্যানুশীলন যে-স্তরে, সেখানে সিঁড়ি ভেঙে ওঠার সাধ্য আমাদের নেই। নোটেশন আর সিম্বলের অরণ্যে ঢোকার আগেই বুক কাঁপে। অঙ্কের এক-একটি আকার যেন দা-কুড়ুল নিয়ে তেড়ে আসে। আমরা পালাতে পারলেই বাঁচি। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সব রহস্যজাল ছিন্ন করার চেষ্টায়, অথবা ব্যবহারিক-জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য ও স্বাধীনতা বাড়াতে উন্নততর কলাকৌশলের নিয়মনীতি ছেঁকে-তোলায় অন্য কোনো যুক্তিগ্রাহ্য পথ যে আমরা খুঁজে পাই না, এ-কথা আর ভাবতে চাই না। অঙ্কের ভীতিকর চেহারা এড়িয়ে নিরাপদ দূরত্বে কল্পনা ও বাস্তবের মিশেলে ধ্যান-ধারণার কোটর সব বানিয়ে তাদের ভেতরেই মুখ গুঁজে পড়ে থাকি। অনেক ধারণা বানাতেও হয় না। বিশ্বাসের তৈরি ঐতিহ্যে আপনা থেকে পেয়ে যাই। নিশ্চিন্ত-নিরাপদ জাবর কাটায় একভাবে পৌনঃপুনিক জীবন-যাপনে অভ্যস্ত থাকি। কোনো প্রশ্ন করি না। অঙ্কের সমাধানের দিকে, অথবা সমাধানহীন প্রশ্নের দিকে ফিরেও তাকাই না। এমন অবস্থায় শিশির ভট্টাচার্যের পাণ্ডিত্য তাঁর বৃত্তের বাইরে যে তেমন কোনো সাড়া জাগায় না, এতে অবাক হবার কোনো কারণ দেখি না। সব মিলিয়ে এইটিই স্বাভাবিক মনে হয়।
অঙ্কে যাঁদের ভয় নেই, এবং অঙ্ক-কষার দক্ষতা কাজে লাগিয়ে যাঁরা বৈষয়িকভাবেও সফল, তাঁরাও কিন্তু সবাই বিদ্যার বাণী জীবন-ভাবনায় ও জীবন-যাপনে মেলান না। বিদ্যাচর্চা আলাদা খোপে বন্দি থাকে; জীবন বয়ে চলে ভিন্ন খাতে, – সেখানে প্রাগ্রসর জ্ঞানের কোনো প্রভাব পড়ে না। প্রাচীন বিশ্বাস ও সংস্কার জীবনের অন্দরমহলে দাপটের সঙ্গে রাজত্ব করে চলে। অঙ্ক-আশ্রিত বিজ্ঞানের খোলস বাইরে পড়ে থাকে, চৈতন্যে ছাপ পড়ে তার সামান্যই।
এটি যে নেহাত বাজে কথা নয়, তার পরিচয় খুব স্পষ্ট করে পাই শিশির ভট্টাচার্যের মানুষ ও মহাবিশ্ব বইটি ছেপে বেরোবার পর। গত ফেব্রুয়ারিতে বইটির প্রকাশ। বের করেছে ঢাকার সময় প্রকাশন। তারপর সাতমাস পেরিয়ে গেল। আমাদের বিজ্ঞানী-মহল থেকে কোনো উচ্চবাচ্য এখনো শোনা গেল না। অথচ এমন বই বাংলায় হর-হামেশা লেখা হয় না। বিষয়কে এতটুকু তরলিত না করে তার সারমর্ম সাধারণ পাঠকের বোধগম্য ভাষায় সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া, এটি সহজ কাজ নয়। অধ্যাপক ভট্টাচার্য সেইটিই করেছেন অসাধারণ দক্ষতায়। সেই সঙ্গে প্রাসঙ্গিক জ্ঞানের সীমানাকেও যতদূর তাঁর অর্জন, সেই পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেছেন। কোথাও কোনো ছাড় দেননি। পাণ্ডিত্যের দুর্গ আগলেও বসে থাকেননি। সাধারণ বুদ্ধি নিয়ে বাংলা ভাষায় অক্ষরজ্ঞান-সম্পন্ন যে-কোনো মানুষই এ-বই অনায়াসে পড়ে ফেলতে পারে। কোথাও তাকে হোঁচট খেতে হবে না। এবং পড়ার পর, যদি তার বুদ্ধি-বিবেচনাকে সে নিরঙ্কুশ রাখে, তবে অবশ্যই তার দেখার চোখ খুলে যাবে। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সত্যতর পরিচয় তার কাছে উন্মুক্ত হবে। বইটি পড়ে সত্যিই আমি অনুপ্রাণিত বোধ করি। মনে মনে ভাবি, এতদিন বিষয়টি যাদের আয়ত্তের বাইরে ছিল, তারা যদি পড়তে পায়, তবে তাদের চোখের ওপর কালো পর্দা অনেকখানি সরে যাবে। অশেষ উপকার হবে তাদের। মন তাদের প্রসারিত হবে। উপকার হবে গোটা সমাজেরও। বিভ্রান্তির নাগপাশ কিছুটা হলেও শিথিল হবে। এই আশাও জেগেছিল, বইটি হাতে পেয়ে আমাদের বিদ্বৎসমাজে, বিশেষ করে বিজ্ঞানী-সমাজে ধন্যধন্য পড়ে যাবে। সবাইকে ডেকে তাঁরা বইটি পড়ার কথা বলবেন। উৎসুক মানুষের হাতে হাতে বইটি ঘুরবে। কিন্তু কিছুই হয়নি।
অবশ্য কোথাও কোনো আলোড়ন যে একেবারে জাগেনি, তা নয়। জেগেছে উলটোদিকে। বইটির হদিস পেয়েই যাঁরা এতে বিব্রত বোধ করতে পারেন, সন্দেহ হয়, তাঁরা নড়েচড়ে বসেছেন। তাঁদের বিশ্বাস ও সংস্কারেরও যে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে এবং বিজ্ঞানের চরম বিকাশ যে ওই বিশ্বাসকেই প্রতিষ্ঠিত করার পথে এগুচ্ছে, এই কথাটি তারা প্রচারে নেমেছেন। শিশির ভট্টাচার্যের বই নিয়ে এখানে বিশ্ববিদ্যালয়-প্রাঙ্গণে দুচারটি কথা ওঠার পরপরই এই উদ্যোগ দেখে মনে হয়, বিষয়টি কাকতালীয় নয়। এই বয়ান নিয়ে পরে কথা বলার চেষ্টা করব। তার আগে বইটি নিয়ে কিছু বলি।
তবে প্রথমেই জানিয়ে রাখি, অঙ্ক আমি শিখিনি। বিজ্ঞান পড়িনি। এই বই নিয়ে বিশেষজ্ঞের মতামত দেবার যোগ্যতা আমার নেই। কথা বলার অধিকার নিয়েও প্রশ্ন-ওঠা স্বাভাবিক। আমার সবিনয় নিবেদন, বইটি আমাদের জন্যেও লেখা। জটিল অঙ্কের বেড়া ভেঙে এই বই বিষয়-ভাবনাকে সরাসরি আমাদের সামনে তুলে ধরেছে। আমরা তার ভেতরে নাক গলাতে পেরেছি। বিজ্ঞানী না হয়েও বিজ্ঞানচেতনার ও প্রাগ্রসর ধারণার একটি সার্বিক ছবি তৈরি করে নেবার সুযোগ আমরা কিছুটা হলেও এখানে পাচ্ছি।
এ-সবের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের মনের প্রতিক্রিয়ার কথা খুলে বলার ইচ্ছা একটু-আধটু হয়। তা থেকেই এই লেখা। লেখকও হয়তো জানতে পারেন, তাঁর বই আমরা অভাজনরা কীভাবে নিচ্ছি। সামান্য হলেও তারও একটি মূল্য থাকার কথা।
বইটি কী বলতে চায়, এবং কীভাবে বলতে চায়, তা তার সামনের মলাটের ভেতরের ভাঁজে মাত্র কটি বাক্যে গুছিয়ে বলা আছে। আমরা পড়ি, – ‘মহাবিশ্ব কি, বস্তু ও চৈতন্য কি, মানুষ কি করে এল, মহাবিশ্বে মানুষের স্থান কোথায় ইত্যাদি সব প্রশ্ন মানুষের বহুকালের। এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন ধর্মকামীরা, উত্তর খুঁজছেন দার্শনিকরা, উত্তর খুঁজছেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু সেই চূড়ান্ত উত্তর মানুষ খুঁজে পেয়েছে কি, অথবা কোনদিন খুঁজে পাবে কি? এই প্রসঙ্গটিরই অবতারণা করা হয়েছে মানুষ ও মহাবিশ্ব বইখানিতে মূলতঃ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে।’
লেখক ভূমিকাতে আরো জানান, এবং তা যথার্থ – ‘আমরা পৃথিবীর মানুষেরা সবাই অল্পবিস্তর এক একটি কূপমণ্ডুক। যে জীবন আমরা ধারণ করি সে সম্পর্কে বিশেষ কিছুই আমরা জানি না। যে জগতে আমাদের বাস সে সম্পর্কেও আমাদের কোনো ধারণা নেই। এই মহাবিশ্বটা কেমন, কোত্থেকে এল, এর সৃষ্টিই-বা কেন হল ইত্যাদি কিছুই আমাদের জানা নেই। আমরা কতগুলো বিশ্বাসে আবদ্ধ থেকে জীবন যাপন করি। জন্মের পর থেকেই আমাদের উপর কতগুলো বিশ্বাস চাপিয়ে দেওয়া হয়। ফলে এক একটা গণ্ডীর মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ি। সারা জীবন চেষ্টা করেও আমরা অনেকেই এই বিশ্বাসের গণ্ডী থেকে বের হতে পারি না। কেউ যদি কখনো জগৎ ও জীবন সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাসের পরিপন্থী কোনো নতুন ধারণা নিয়ে হাজির হয় তখন আমরা ওই কূপমণ্ডুকের মতোই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠি এবং দূর-দূর করে তাকে তাড়িয়ে দেই। ভাবি, আমার বিশ্বাস কখনো মিথ্যা হতে পারে না।’ বইটি লেখা হয়েছে এইসব সাধারণ মানুষের কথা মাথায় রেখে, – তাদের বিশ্বাসের জগতে বিজ্ঞানের আলো ফেলে নির্মোহ দৃষ্টিতে তা যাচাই করতে এবং একই সঙ্গে যতদূর জানা যায় তার ভিত্তিতে বিশ্বাসের সব সীমানা ভেঙে মানবচৈতন্যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের স্বরূপ ফুটিয়ে তুলতে। খোলামনে বইটি পড়ে তার মর্মগ্রহণ করতে পারলে কূপমণ্ডুক আর থাকা যায় না। আমরা যদি তাকে শ্রেয় বলে মেনে নিই, তবে আর সবাইকে অবশ্যই এই বই-পড়ার অনুরোধ জানাতে পারি। লেখক বলছেন, ‘এ বই কোনো বিশেষজ্ঞের জন্য নয়।’ তাই বলে চিন্তায় কোনো শৈথিল্যও এতে নেই। বিজ্ঞানে নির্মাণকলার ধাপগুলো ঠিক-ঠিক অনুসরণ করে তিনি এগিয়েছেন। কোথাও ফাঁক রাখেননি। পাঠকের মেধার সামর্থ্যকে ছোট করে দেখেননি। যেসব দেশে বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ অনেকদূর এগিয়েছে, সেসব দেশে এমন বই যথেষ্ট সংখ্যায় লেখা হয়। আমাদের কপাল মন্দ, এ-জাতীয় বইয়ের দেখা বাংলাভাষায় কালেভদ্রে মেলে। শিশির ভট্টাচার্য এই অভাবের জায়গাটায় উল্লেখযোগ্য এক অবদান রাখলেন। গুণগত মানেও তা উৎকৃষ্ট।
যে-বিষয়গুলো বইটিতে পরপর আলোচনায় এসেছে, সেগুলো হলো – ১. মানুষ কী করে এল, ২. মানুষ ও প্রকৃতি : ধর্ম ও দর্শন, ৩. বিজ্ঞান কি এবং কেন, ৪. প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের সূচনা ও অন্ধকার যুগ, ৫. বিজ্ঞান রেনেসাঁ ও নিকোলাস কোপার্নিকাস,
৬. কোপার্নিকাস থেকে গ্যালিলিও, ৭. নিউটন ও তাঁর মহাবিশ্ব,
৮. বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় তত্ত্ব, ৯. বিশেষ অপেক্ষবাদ, ১০. সার্বিক অপেক্ষবাদ, ১১. কোয়ান্টাম তত্ত্ব, ১২. বহির্বিশ্বের বর্তমান চিত্র, ১৩. মৌলিক কণা ও মহাবিশ্বের প্রকৃতি, ১৪. মহাবিশ্বের সৃষ্টি,
১৫. মহাবিশ্বে বুদ্ধিমান প্রাণী, ১৬. মহাবিশ্বের পরিণতি,
১৭. বিশ্বাস ও বিজ্ঞানের বিরোধ, এবং সবশেষে ধারাবাহিক আলোচনার পরিসমাপ্তি টেনে, ১৮. উপসংহার।
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে চোখ রেখে অস্তিত্ব-ভাবনায় যে-মূল প্রশ্নগুলো আমাদের তাড়িয়ে বেড়ায়, শিশির ভট্টাচার্য এই বইতে সরাসরি তাদের মুখোমুখি হয়েছেন। উত্তর খুঁজেছেন অগ্রসরমান বিজ্ঞানের অন্বেষণ-সাধনায় ও তার প্রাসঙ্গিক সমাধানসূত্রসমূহের প্রয়োগসিদ্ধিতে। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মবিশ্বাসসমূহ
যে-ধারণাগুলো আমাদের মগজে শুরুতেই প্রশ্নহীন আনুগত্যের দাবি নিয়ে নির্বিচারে সিঁধিয়ে দেয়, আত্যন্তিক নিষ্ঠার সঙ্গে এবং পক্ষপাতহীন শ্রদ্ধার সঙ্গেও, তাদের যথোচিত মূল্যায়নে যত্নবান হয়েছেন।
অধিকাংশ ধর্মশাস্ত্রে এই বিশ্বে মানুষের আবির্ভাবের যে-সব কাহিনী বর্ণিত হয়েছে, বিজ্ঞানের অগ্রাভিযানে তারা সমর্থন হারায়। মানুষ আকাশ থেকে পড়েনি। প্রাণের অভিব্যক্তির পথ ধরে কোটি কোটি বছরের অনুশীলন-প্রক্রিয়ার এক পর্যায়ে পৃথিবীতে মানুষের আজকের পরিচয়ে হয়ে-ওঠা। তিন বিলিয়ন বছর আগে এখানে প্রাণের স্পন্দন অনুভূত হয়েছে বলে আন্দাজ করা যায়। মানবপ্রজাতির স্পষ্ট লক্ষণ ফুটে ওঠে অনেক পরে – আজ থেকে দুই মিলিয়ন বছর আগে। আর বুদ্ধির প্রয়োগে নিজের জীবনযাপন প্রণালির ও পরিবেশের পরিবর্তনে সক্ষম যে-মানুষকে আমরা দেখি, তার অস্তিত্বকাল এখন পর্যন্ত তিরিশ হাজার বছরের বেশি নয়। চার্লস ডারউইনের বিবর্তনবাদকে ভিত্তি করে অগ্রসর হলে প্রাণের এই উদ্বর্তনের যথাসম্ভব পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা মেলে। কোনো অতিপ্রাকৃত ইচ্ছাকে আর কারণ হিসেবে টিকিয়ে রাখার প্রয়োজন করে না। রাখা যায়ও না।
একইভাবে মহাবিশ্বের সৃষ্টি-রহস্যও আজ উন্মোচনের দ্বারপ্রান্তে।
এ-বিষয়ে বিদ্বৎসমাজে প্রায় সবাই একমত যে, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি ১৫-১৮ বিলিয়ন বছর আগে (শিশির ভট্টাচার্য লিখেছেন, ১৫ বিলিয়ন বছর।) এক মহাবিস্ফোরণের পরিণাম। বিজ্ঞান এই মহাবিস্ফোরণের পেছনে বাইরের কোনো হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা উড়িয়ে না দিলেও তার পক্ষে কোনো সংগত যুক্তি বা উপাত্ত খুঁজে পায় না। অন্যদিকে তার বিস্তার বিশ্বপ্রকৃতির স্বয়ংক্রিয় ও স্বনিয়ন্ত্রিত যুক্তিগ্রাহ্য নিয়ম-শৃঙ্খলার অধীন। বিজ্ঞানের আবিষ্কার থেকে তার পাঠ নেওয়া সম্ভব এবং আরো চমকপ্রদ আবিষ্কারের আশাও সংগত। তার বাইরে কল্পনাকে উদ্দাম করা অলস মস্তিষ্কের এক বিপজ্জনক বিলাসিতা।
যেহেতু আমাদের এই পৃথিবীতে বসবাস, এবং দেখা-শোনা-জানা দিয়ে চেতনায় মহাবিশ্বকে আমাদের বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা, তাই শুরুতে এমন ধারণাই প্রবল ছিল যে মহাবিশ্ব ভূ-কেন্দ্রিক, এখানকার প্রাণিজগৎ, বিশেষ করে মানুষকে ঘিরে তার অবস্থান। অতিপ্রাকৃতের আগ্রহ ও পরিকল্পনাও পৃথিবীকে ঘিরে। এই আগ্রহ ও পরিকল্পনার ভাবনা যার চেতনায় যেমন ধরা পড়েছে সে তেমন বুঝেছে, আর সবাইকেও বুঝিয়েছে। সবাই একভাবে বোঝেনি। কারণ প্রত্যক্ষের জগৎ সবার একরকম নয়। ভূ-প্রকৃতি-পরিবেশ ইত্যাদির বিভিন্নতা জীবনযাপনের ও জীবনসংগ্রামের চেহারাতেও বিভিন্নতা আনে। চিরকালের অক্ষয় রূপও সে-সবে ফোটে না। কিন্তু তাদের ওপর দাঁড়িয়েই অতিপ্রাকৃত অভিপ্রায়ের মানে খোঁজার চেষ্টা। এবং তার ওপর চিরকালের ও সর্বব্যাপ্তির সিল মেরে তাকে আর সবার কাছে ফেরি করা, এবং সম্ভব হলে তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। সদিচ্ছায় বিন্দুমাত্র খাদ না থাকলেও এভাবে জ্ঞানের উন্মোচন ঘটে না। হয়তো ইচ্ছার সীমায় কারো কারো মনে শান্তি মেলে; আবেগ চরিতার্থ হয়।
তাহলে কীভাবে এগুবো, এ-প্রসঙ্গে শিশির ভট্টাচার্য লিখছেন, ‘মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমরা যদি সম্যক ধারণা লাভ করতে চাই, অর্থাৎ মহাবিশ্বটা কোত্থেকে এল, এর বর্তমান অবস্থানটা কেমন, এর ভবিষ্যৎ কি ইত্যাদি সব প্রশ্নের উত্তর যদি পেতে চাই তাহলে আমাদের অবশ্যই বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের উপরে নির্ভর করতে হবে।’ তিনি তাই করেছেন; যত্নের সঙ্গে তাত্ত্বিক নির্মাণের নির্ভরযোগ্য বিবরণ তুলে ধরেছেন। তা থেকে দুটি সম্ভাবনা তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়। এক, মহাবিশ্ব স্থিতিশীল; দুই, তা সম্প্রসারণশীল। মহাবিস্ফোরণ ঘটে স্থান-কালের অস্তিত্বের বাইরে। আসলে বস্তুপুঞ্জ-স্থান-কাল সবই ওই বিস্ফোরণের পরিণাম। শক্তির শূন্যাবস্থায়, অর্থাৎ বিভিন্ন মৌলশক্তির পারস্পরিক ভারসাম্যের পূর্ণ স্থিতিতে আকস্মিক বিপর্যয়ে ঘটে মহাবিস্ফোরণ। কেন ওই বিপর্যয়, তার ব্যাখ্যা এখনো আমরা জানি না। কিন্তু নামহীন অবস্থানহীন শক্তি-শোষণের পূর্ণতা ভেঙে পড়লে একই সঙ্গে বস্তু-অবস্তু, দিকসমূহ ও কালের সৃষ্টি হয়। বিপুল বেগে তারা শূন্যে ধাবিত হতে থাকে। সেইসব থেকে, সঙ্গে সঙ্গে নয়, অনেক পরে, তাপগতির প্রক্রিয়ায় ও অভিকর্ষ বলের টানাটানির পরিণামে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে আজ যেভাবে দেখি বা জানি, তা উদ্ভাসিত হয়ে উঠতে থাকে। নীহারিকাপুঞ্জ, ছায়াপথ, অসংখ্য নক্ষত্ররাজি, গ্রহ-উপগ্রহ – এইসব তার অন্তর্জাত অপ্রতিরোধ্য নিয়মে আকার ও স্থিতি পায়। প্রত্যেকে নিজ-নিজ পথ পরিক্রমা করে। কৃষ্ণগহ্বরেরও সৃষ্টি হয়। মৃত তারকাদের তা আকর্ষণ করে। রবীন্দ্রনাথ যে গেয়েছিলেন, ‘প্রথম আদি তব শক্তি – / আদি পরমোজ্জ্বল জ্যোতি তোমারি হে/ গগনে গগনে :’ তাতে মহাবিস্ফোরণের ভাব-কল্পনা অনেকটা ধরা পড়ে। তবে মুশকিল বাধে সর্বনামের ব্যবহারে। উৎসবিন্দু, বা ‘সিঙ্গুলারিটি’কে কোনো সর্বনামে চিহ্নিত করা যায় না। (শিশির ভট্টাচার্য ‘সিঙ্গুলারিটি’র বাংলা প্রতিশব্দ বেছেছেন ‘অনন্য’। শব্দার্থে হয়তো ঠিক আছে, কিন্তু ধারণার যথার্থতায় যেন গরমিল থাকে। ‘অন্যে’র অস্তিত্ব-ভাবনা মাথায় রেখে ‘অনন্য’ শব্দে আসি। কিন্তু ‘সিঙ্গুলারিটি’তে অন্য কোনো সত্তার প্রাক্-কল্পনা অসম্ভব। শব্দহীন কোনো চিহ্ন দিয়ে তাকে বোঝাবার চেষ্টা করার কথা ভাবা যেতে পারে।) তার কোনো কারণ খোঁজা অর্থহীন। মহাবিস্ফোরণকেও তার ঘটনা হিসেবেই দেখি। কর্তা-কর্ম সম্পর্ক ছাড়াই ভেতরের ভারসাম্য আকস্মিক ভেঙে পড়ায় সিঙ্গুরালিটি বিস্ফারিত হয়েছে, এর বেশি আর কিছু আমাদের বলার নেই। কার্য-কারণের পুরনো ধারণা কোয়ান্টাম বিশ্বের নতুন জ্ঞান অনেকটাই অকার্যকর করে ফেলেছে। কোনো আদি কারণের পেছনে ছোটার প্রয়োজন আর গুরুত্ব পায় না। নানাদিক থেকে নানা শক্তির টানাপোড়েনে ঘটনাসমূহ বেরিয়ে আসে। আমাদের বাস্তব জীবনের কর্মকাণ্ডেও তেমনটি ঘটে। বিশেষ করে আর্থনীতিক সম্পর্ক-সম্বন্ধে। পূর্ণ বিস্তৃত উপকরণ-উৎপাদন বিন্যাস সবটাই একটি পরস্পরনির্ভর প্রক্রিয়া। একক কোনো বিন্দুতে মূল কারণ খোঁজার মানে হয় না। তা পাওয়াও যায় না।
এই বই থেকে জানতে পাই, মহাবিস্ফোরণ যে-বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের জন্ম দেয়, অভ্যন্তরীণ প্রবণতার অনিবার্য ও প্রচণ্ড ধারাবাহিক সুবিন্যস্ত তাগিদে তা এক বোধগম্য ও দৃষ্টিনন্দন আকার পায়। আমরা যাকে বলি প্রকৃতি, তারই প্রকাশ ওই তাগিদে। মহাবিশ্বকে কাঁটায় কাঁটায় নিয়ন্ত্রণ করে প্রকৃতির ধর্ম। জ্যোতির্মণ্ডলে কোনোকিছুই স্বেচ্ছাচারী হতে পারে না। প্রকৃতিও তার ধর্মের ব্যত্যয় ঘটাতে পারে না। অতিপ্রাকৃতের হস্তক্ষেপের কল্পনা কার্যকরভাবে খারিজ হয়ে যায়। অবশ্য প্রকৃতি-রহস্য অনেক কিছুই আমাদের অজানা। কী করে তার আড়াল সাধ্যমতো ঘোচানো যায়, সেইটিই হয়ে দাঁড়ায় আমাদের অনুশীলনের বিষয়। বিজ্ঞানের সাধনা এইদিকেই।
মহাবিস্ফোরণ থেকে যে-অতিজাগতিক বর্ণনাতীত বিপুল বিশৃঙ্খলা, গতি ও বেগের সমাহারে তা থেকে বেরিয়ে-আসা মহাবিশ্বের বিস্তার বিজ্ঞানের হিসাবে ধরা পড়ে, – এবং শিশির ভট্টাচার্য সেদিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, – প্রায় এক হাজার কোটি আলোকবর্ষ। আমরা যারা বিজ্ঞানের ছাত্র নই, তাদের জন্যে জানা জরুরি, আলোর গতি সেকেন্ডে এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল। তাকে ৬০ ী ৬০ ী ২৪ ী ৩৬৫ (অর্থাৎ সেকেন্ড থেকে মিনিট, মিনিট থেকে ঘণ্টা, ঘণ্টা থেকে দিন এবং দিন থেকে বছর) দিয়ে গুণ করলে পাই মাইলে এক আলোকবর্ষ-দূরত্বের পরিমাপ। এইরকম এক হাজার কোটি আলোকবর্ষ। তাতে অসংখ্য ছায়াপথে নক্ষত্ররা ছড়ানো। তারা আপন আপন ছায়াপথের চলার সঙ্গে সঙ্গে ওই ছায়াপথকে প্রদক্ষিণ করে চলে। কোনো কোনো নক্ষত্রের চারপাশে নিজ নিজ কক্ষপথে আবর্তন করে গ্রহ, গ্রহেরও থাকতে পারে উপগ্রহ। যেমন – সূর্যের কটি গ্রহের একটি পৃথিবী, পৃথিবীর উপগ্রহ চাঁদ। আমাদের ছায়াপথের সবটা আমাদের অজানা। এইরকম অসংখ্য ছায়াপথ। তাদের কোনো কোনোটিতে মানবজাতীয় প্রাণীর উদ্ভব একই কারণে সম্ভব, যে-কারণে সম্ভব হয়েছে এই মর্ত্যভূমিতে। মহাবিশ্বের এই প্রেক্ষাপটে মানুষের তাই অহংকারী হবার কোনো কারণ নেই। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে সবদিক থেকে একইরকম দেখায়। পৃথিবীর সেখানে বিশেষ কোনো স্থান নেই। তাকেই কেন্দ্র করে মহাশক্তির ছোটাছুটি, এমন ভাবনা নিতান্তই অসার। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বিপুল বিস্ময়ে অসহায় আকুতি নিয়ে মিশে থাকার কথাই শুধু আমরা ভাবতে পারি।
আর, এই মহাবিশ্ব স্থিতিশীল, এ-ধারণা চমকপ্রদ হলেও বিজ্ঞানের যৌক্তিক নির্মাণ তা খণ্ডন করে। প্রথমত, মহাবিস্ফোরণের তত্ত্ব আজ সর্ববাদিসম্মত। গতির প্রশমনে, অথবা সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার নিরসনে তাতে নিরুপদ্রব সমস্থিতি আসবে, এবং বিস্তার হলেও সেইভাবেই তা ঘটবে, বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণে এই বক্তব্যের কোনো সমর্থন মেলে না। বিপরীতে তার অসংগতিই প্রমাণিত হয়। অন্যদিকে মহাবিশ্বে সৃষ্টি-স্থিতি-লয় অব্যাহতভাবে চলছে, আকর্ষণ-বিকর্ষণের প্রকৃতি-নির্ধারিত নিয়মের পরিণামে অতিজাগতিক বস্তুপুঞ্জ নিজ-নিজ পথে ক্রমাগত ছুটে চলেছে, মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে, এই অনুমানগুলোই পুঙ্খানুপুঙ্খ বাস্তব পরীক্ষা-নিরীক্ষার সমর্থন পায়। তবে এই মহাবিশ্ব আমাদের কল্পনাকে পরাস্ত করে যতদূর প্রসারিতই হোক, তার শেষ আছে। কিন্তু শেষ থাকলেও সীমানা নেই। বেগের আবেগ তাকে অপ্রতিহতভাবে সম্প্রসারিত করছে। তার সীমা দূরের হিসাব অতিক্রম করে আরো দূরে সরে যাচ্ছে।
তবে এই সম্প্রসারণের হার ক্রমহ্রাসমান। তা থেকে এই সম্ভাবনার কথা অনেক বিজ্ঞানীর মাথায় আসে, আরো বিলিয়ন-বিলিয়ন বছর পরে একসময়ে তা থেমে যাবে এবং তার পরে প্রাকৃতিক নিয়মেই শুরু হবে সংকোচনের পালা। মহাবিশ্ব নিজেকে গুটিয়ে নিতে থাকবে। স্থান-কাল উলটো পথে নিজেদের গুটিয়ে নেবে। বিপুল বিশ্বব্রহ্মাণ্ড আবার আগের সিঙ্গুলারিটিতে ফিরে যাবে। এইটিই অবশ্য একমাত্র সম্ভাবনা নয়। শিশির ভট্টাচার্য ধৈর্য ও যত্নের সঙ্গে কোথাও বিষয়ভাবনার অবমূল্যায়ন না-ঘটিয়ে চমৎকার গুছিয়ে প্রসঙ্গটি ব্যাখ্যা করেছেন। বিজ্ঞান না জেনেও ভেতরের সারবস্তু আমরা অনেকখানি ধরতে পারি।
চূড়ান্ত মহাসংকোচন তত্ত্বের রূপরেখা অনেক ধর্মবাদীর বিশ্বাসকে এই বলে উসকে দেয় যে, পুনরুত্থান ও শেষবিচারের ভাবনার যেন তা অনুগামী। প্রত্যাবর্তনপথে কাল পুরনো অভিজ্ঞতা অতিক্রম করবে – এ-ভাবনায় রোমাঞ্চ আছে, কিন্তু যুক্তিসিদ্ধি নেই। আসলে দুটি ভাবনার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। একটি দিয়ে অন্যটির প্রমাণ খুঁজতে গেলে যুক্তি-বুদ্ধি সব তালগোল পাকিয়ে যায়। কোনোটিরই প্রতি সুবিচার হয় না। ভাত রাঁধতে তাপের প্রয়োজন হয়। রান্নার পর তাপের উপশম হলে আক্ষরিক অর্থে আমরা চাল ফিরে পাই না। বস্তুর রূপান্তর ঘটলেও অবশ্য মোট বস্তুত্ব অক্ষুণ্ন থাকে। ফিরতিপথে কালের যাত্রার পরিণামকে এইরকম দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা চলে। শেষমেষ সিঙ্গুলারিটিতে সবকিছু বিলীন হবে এই নিদান বাক্যটি শুধু মাথায় রাখি।
মহাবিশ্ব নিয়ে কথা বলতে অধ্যাপক ভট্টাচার্য কেবলমাত্র তাঁর বক্তব্যটুকুই আমাদের শোনাননি। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে মিলিয়ে তার ধারণার ক্রমবিকাশের বিবরণও বিষয়োপযোগী ভাষায় অভ্যন্তরীণ কাঠিন্য বজায় রেখেও চিত্তাকর্ষক ভঙ্গিমায় শুনিয়েছেন। পাঠকের চিন্তাক্ষমতায় সাবালকত্ব যদি তিনি আশা করে থাকেন, তবে তা অন্যায় নয়। সমাজে ভাবনা-বিকাশের উপযুক্ত ক্ষেত্ররচনায় সেইটিই বাঞ্ছনীয়। এখানে আমরা কোপার্নিকাস-গ্যালিলিও-নিউটন হয়ে আইনস্টাইন-নীলব’রের ভাবনাবিশ্বে প্রবেশ করি। তারপরেও অগ্রসর হই। বিভিন্ন দুরূহ তত্ত্বের একটি সম্যক ধারণা গড়ে ওঠে। একটি তত্ত্বের সিঁড়ি ভেঙে নতুন তত্ত্বের জন্ম, এবং এইভাবেই জ্ঞানের পথে অগ্রযাত্রা, এটি অনুধাবন করতে আমাদের অসুবিধা হয় না। বিজ্ঞানচিন্তায় দৃষ্টিভঙ্গিও যে একইসঙ্গে বদলে যেতে থাকে, এটিও আমাদের দৃষ্টি এড়ায় না।
এই দৃষ্টিভঙ্গিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে যখন অণু-পরমাণু নিয়ে বিজ্ঞানভাবনা সাধারণ প্রত্যাশার সীমা ডিঙিয়ে যায়। বইটির প্রাসঙ্গিক অংশে পড়ি, ‘কোয়ান্টাম তত্ত্বের তিনটি বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়, ক্রিয়ার বিচ্ছিন্নতা, কণা-তরঙ্গ দ্বৈততা এবং অনিশ্চয়তাবাদ। এই তিনটি বৈশিষ্ট্যই চিরায়ত বিজ্ঞান-দর্শনের পরিপন্থী। চিরায়ত বিজ্ঞানের মৌলিক দর্শন কার্য-কারণসম্পর্ক এবং নির্ধারণীয়তাবাদ।’ মৌলকণা-বিভাজনের পরিণাম পূর্বনির্ধারিত নয় এবং পরিণাম নিজে থেকে কোনো চরিত্র পায় না। তা প্রত্যক্ষণ-নির্ভর। দেখার বিভিন্নতায় ঘটনার চেহারা ও বৈশিষ্ট্য বদলে যায়। এই মৌলিক বাস্তবতার অনুসরণে আমরা গভীরভাবে অনুভব করি অনিশ্চয়তা ও বহু-বিকল্প সম্ভাবনা প্রকৃতিরই বিধান। একই সূত্রে একযোগে বিপরীতের সমাহারও।
আসলে কোয়ান্টাম তত্ত্বের বিকাশের ফলে বিজ্ঞান কার্য-কারণের একমুখী চিন্তাপদ্ধতিতে আর আটকে থাকছে না। অংশ থেকে সমগ্রের ধারণায় শুধু নয়, সমগ্র থেকে অংশের পরিচয়ে আসা, এবং তার বৈশিষ্ট্যকে সমগ্রের প্রেক্ষাপটে পুঙ্খানুপুঙ্খ জানা, এগুলোও সমান গুরুত্ব দাবি করছে। সব অংশের যোগফলকে অতিক্রম করে সমগ্রে আরো বাড়তি কিছু থাকে এ-ও আজ হিসাবে ধরা পড়ছে। বিজ্ঞানের ক্ষেত্র, ফলে, যেভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে, তাতে প্রথাবদ্ধ ঈশ্বরের এখতিয়ারেও তা হানা দিচ্ছে।
বস্তুর জগৎ থেকে চৈতন্যের জগৎ ভিন্ন এবং সেখানে কারণাতীত মহিমায় ঈশ্বর বিরাজমান – সঠিক পথে এগুলে তাঁর অপরূপত্বের অনুভবও সম্ভব, এমন বিশ্বাস আমাদের মজ্জাগত। চৈতন্যের জগৎ নিয়ে বিজ্ঞানীদের অনুশীলন এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। তবু যে-অনুমানগুলো দানা বাঁধছে, তাতে চৈতন্য যে বিশ্বজগতেরই উদ্ভূত উপাদান এবং বস্তুপুঞ্জের সঙ্গে তার ক্ষেত্রও ইহলোকে ছড়ানো, এই কথাটিই ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আজকাল অনেক বিজ্ঞানী বলছেন, কম্পিউটারে যেমন হার্ডওয়্যার-সফটওয়্যার, মস্তিষ্কেও তেমনি মগজ-কাঠামো ও চিন্তাবলয়। দুটো অঙ্গাঙ্গি জড়িত, তবে ভিন্ন। চেতনালোক অদৃশ্য, যেমন চারপাশের জগতে ইথারও অদৃশ্য। যৌক্তিকভাবে এই চেতনালোক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব। তেমন হলে জীবন্ত মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন কিন্তু মানুষের ওপর ক্রিয়াশীল চৈতন্যের আলাদা এক ক্ষেত্র কল্পনা করা যায়। তা এই মর্ত্য-পৃথিবীরই উপাদান। বাইরের হস্তক্ষেপ সেখানেও অপ্রয়োজনীয়। স্থান ও কালের মতো চৈতন্যও সম্ভবত মহাবিস্ফোরণের বহির্নির্গত পরিণাম। মানুষকে কেন্দ্র করে, এবং মানুষের চারপাশে তার বিকাশের পরিবেশ গড়ে উঠেছে অনেক পরে।
শিশির ভট্টাচার্য অবশ্য এ-সবের অতিরিক্ত চৈতন্যের পরমত্বের কথাও বলেছেন। মহাবিস্ফোরণ ও সম্ভাব্য মহাসংকোচন তার বিকার বা বিলয় ঘটায় না। তিনি লিখছেন, ‘- যদি এমন হয়ে থাকে যে শুরুতে আর কিছুই ছিল না ছিল শুধু এক ‘অহম্’ বোধ। তাহলে তার জন্য স্থান-কালের কোনো প্রয়োজন ছিল না। তারপর সাগরের বুকে যেমন চলতে থাকে ঢেউয়ের ওঠানামা তেমনি চৈতন্যের মহাসাগরের বুকেও চলতে থাকে খণ্ডিত চৈতন্যের উত্থান-পতনের খেলা। মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতিতে যখন এসব কিছু শূন্যতার গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে তখন আবার জেগে উঠবে সেই অহম্ বোধ, পরিপূর্ণ ‘চৈতন্য’। এই নির্গুণ, নিরাকার, নৈর্ব্যক্তিক ‘অহম্’ই বৈজ্ঞানিকের ঈশ্বর যাঁর সৃষ্টি নেই, বিনাশ নেই। আছে শুধু অস্তিত্ব।’
এতে কবিত্ব আছে ঠিকই, কিন্তু এর যথার্থতা আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। আর বইটির পূর্বাপর বক্তব্যকেও এ অনুসরণ করে না। যেখানে ‘সিঙ্গুলারিটি’ সব বস্তু (ম্যাটার-ইলেকট্রন-প্রোটন) ও প্রতিবস্তু (অ্যান্টিম্যাটার) শুষে নেয় এবং যেখানে তা থেকে তারা কোনো কারণ ছাড়াই অভ্যন্তরীণ সন্নিবেশ ও সমস্থিতি ভেঙে বিস্ফোরিত হতে পারে, সেখানে তাকে শুধুই চৈতন্যময় বলে সংজ্ঞায়িত করা আমার কাছে গোলমেলে ঠেকে। বস্তুশোষণে অথবা বস্তু-সৃষ্টির সম্ভাবনায় যে-নিরাকার মহাশক্তির সঞ্চয় তার পরিমাপ আমাদের চূড়ান্ততম বলগাহীন কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায়। মহাবিস্ফোরণের ফলে তা থেকে স্থান-কাল ও বস্তুর সঙ্গে চৈতন্যও নির্গত হয়। এদের কেউ অন্য কারো ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করতে পারে না। একে অন্যের পরিচালক এমন বলাও সংগত মনে হয় না। কোয়ান্টাম বিশ্বের হালচালের দিকে যদি গভীরভাবে নজর দিই, তবে সেখান থেকে এইরকম সম্ভাবনাই বেশি জোরদার হয়ে উঠে আসে।
একটু আগে অধ্যাপক ভট্টাচার্যের মন্তব্য আমরা পড়ি, ‘ঈশ্বর হয়ত প্রাথমিক সীমানা শর্ত এমনভাবে বেছে নিয়েছেন যার জন্যে বিশ্বটা এরকম হয়েছে। -’ আবার, ‘ঈশ্বর কেন মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন সে সম্পর্কে তিনটি মতবাদ আছে। -’ কথায় কথায় ঈশ্বরকে এভাবে ডেকে আনা, হতে পারে, একটা বাক্চাল। আমাদের অভ্যাসে তা লালিত। কিন্তু এখানে তা বিভ্রান্তি ছড়ায়। ‘বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ’ থেকে বিষয়টি তুলে ধরতে চাইলে শব্দপ্রয়োগে ও ভাবনানির্মাণে সতর্ক থাকার প্রয়োজন খুব বেশি।
তবে ঈশ্বরভাবনাকে হেয় করা আমার উদ্দেশ্য নয়। এখানে তা অবান্তর, এইটুকুই শুধু বলবার। বিপুল মহাবিশ্বের সামনে মানুষের অসহায় বিপন্নতা ও অপরিসীম বিস্ময় থেকে তার ঈশ্বরভাবনার উদ্ভব। মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে যেহেতু সবকিছু দেখা, তাই তার ঈশ্বরের প্রয়োজনীয়তাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবিদার। মানুষ তো মিথ্যা নয়। এই প্রেক্ষাপটে, এবং এই প্রেক্ষাপটেই, তার ঈশ্বরনির্ভরতাও বাস্তব। কখনো কখনো তা দুশ্চিন্তায় আকীর্ণ এবং ভয়াবহ রকম বিপর্যয়ের হেতু – যদিও দৈনন্দিন জীবনে আপন সীমায় মানুষ যে-চরম অনিশ্চয়তা ও বিষম দুর্বিপাক থেকে মানসিক শক্তি ও সান্ত্বনা সঞ্চয় করে, এ-ও সত্য। কিন্তু এখানে এই বইতে তার ছায়াপাত বাঞ্ছনীয় মনে হয় না।
অবশ্য এ-কথাও বলি, শেষের দু-তিন পাতায় এমন দলছুট কটি মন্তব্য বাদ দিলে গোটা বই বিজ্ঞানের চিন্তাপদ্ধতি-ব্যবহারের এক আশ্চর্য সফল উদাহরণ। প্রতিটি জায়গায় বক্তব্যের পেছনে যৌক্তিক কাঠামো খুব শক্ত করে বাঁধা। চিন্তাকে তরল করার প্রলোভন কোথাও প্রশ্রয় পায় না। ভাষা সংযত, সাবলীল ও সুশৃঙ্খল। পুরো মাত্রায় বিষয়ানুগ। এ-জাতীয় বই ভবিষ্যতে কেউ বাংলা ভাষায় লিখতে গেলে মানুষ ও মহাবিশ্বকে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে পাবেন।
লেখক বইটিতে আরো মূলধারায় বিজ্ঞান-ভাবনার অগ্রগতির এক দক্ষ বিবরণ তুলে ধরেছেন। টলেমির ভূ-কেন্দ্রিক বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ধারণা থেকে কোপার্নিকাস-গ্যালিলিওর সৌরকেন্দ্রিক বিশ্বভাবনাকে জ্যোতির্মণ্ডলের জ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত করার দুশ্চর সাধনা পেরিয়ে নিউটনের একলাফে সমন্বিত বিশ্বরূপের ধারণায় অনেকদূর এগিয়ে সাম্প্রতিককালে ম্যাক্স প্লাংক, আইনস্টাইন, নীলব’র প্রমুখের হাত ধরে মৌলিক তত্ত্বের তথ্যভিত্তিক ক্রমবিকাশের নির্ভরযোগ্য বিবরণ রচনা করে মহাবিশ্বে বৃহৎ ও ক্ষুদ্রের জগৎকে তিনি আমাদের সামনে বিশদভাবে মেলে ধরেছেন। অজানা বহু বিষয় জানতে পেরেছি। বিজ্ঞানের চমকপ্রদ আবিষ্কারসমূহের রোমাঞ্চ আমাকে স্পর্শ করেছে। আমার বিশ্বাস, যে-কোনো পাঠককেই তা করবে। পৌরাণিক কাহিনীমালাকে অথবা শাস্ত্রবচনের নির্দেশকে সত্যের আকর বলে ভাববার আগে সে অন্তত দুবার চিন্তা করবে।
আরো একটি বিষয় এই সঙ্গে খেয়াল করবার। বিজ্ঞানসাধনায় পরম সত্যের প্রতিষ্ঠা করছি, এমন দাবি কেউ কখনো করেন না। অবৈজ্ঞানিক মন যাঁদের, তাঁরাই কেবল তাঁদের বক্তব্যকে বৈজ্ঞানিক সত্য, এবং সে-কারণে প্রামাণ্য বলে বড়াই করেন। ধর্মতন্ত্রেও চিরকালের সত্য ঈশ্বর একবারে প্রকাশ করেছেন, এমন প্রচার করা হয়। ফলে এইসব ধারণা এক জায়গাতে আটকে থাকে। তা আর বিকশিত হয় না। বাস্তব জীবন কিন্তু স্থির থাকে না। অবস্থার রূপান্তর তাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে। ভিন্নযুগে ছাপ মেরে দেওয়া পরম সত্যকে তার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো অনেক সময়ে দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। তবু বিশ্বাস টিকিয়ে রাখতে গেলে দুদিকের টানাটানিতে জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। কোনো অগ্রগতি ঘটে না। বিজ্ঞানসাধনা এদিক থেকে অনেক বেশি বিনয়ী। বিশেষ বিশেষ শর্তে বিশেষ বিশেষ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা পায়, এইটুকুই তার বক্তব্য। এবং সব বক্তব্যই খণ্ডনযোগ্য। সীমানা-শর্ত এবং/ অথবা পর্যবেক্ষণ-লক্ষ্য বদলে গেলে চিন্তাকাঠামোও বদলে যায় – যাকে বলে ‘প্যারাডাইম্ শিফ্ট্।’ এই বদলে যাবার ফলে নতুন ভাবনার আমদানি হয়। পুরনো তত্ত্ব নতুন তত্ত্বের জন্যে জায়গা ছেড়ে দেয়। চিন্তা এগোয়। যুগের পর যুগ বিজ্ঞানের অগ্রগতি ঘটেছে এইভাবে। এখনো ঘটছে। পুরনো তত্ত্ব খণ্ডন করা গেলে তার অসারতা প্রমাণিত হয় না। আরো বেশি কার্যকর তত্ত্বের আবির্ভাব শুধু ঘোষিত হয় এবং তাও পুরনো তত্ত্বের ওপর এক পা রেখে সামনে এগিয়ে। এইভাবেই নিউটন থেকে আমরা আইনস্টাইনে আসি, এবং আইনস্টাইন থেকে নীলব’রে। তাঁদের অগ্রগতির ইতিহাস মানুষের চিন্তার ক্রমমুক্তিরও ইতিহাস। মানুষ ও মহাবিশ্ব পড়ার পর এই মুক্তির
অনুভব আমাদের চেতনাকে প্রসারিত করে।
শিশির ভট্টাচার্যের বইটি নিয়ে আমার কথার এইখানেই ইতিটানা যেত। কিন্তু এর ভেতরে ছোট্ট একটি ব্যাপার আলোচনাকে আরো একটু টেনে নিয়ে যেতে বাধ্য করছে। ব্যাপারটি সরাসরি এই বই নিয়ে নয়, তবে তার অভিঘাত এতে আছে বলে আমার অনুমান। ঘটনাক্রমের ইঙ্গিতও সেইরকম। লেখার শুরুতে প্রসঙ্গটির অবতারণা করেছি। পরিশিষ্টে বিশদ হবার চেষ্টা করি।
কদিন আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বইটি নিয়ে এক আলোচনা-অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়। সেখানে কুশিক্ষাতাড়িত এই দেশে ছেলেমেয়েদের মানুষ ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে জানার কৌতূহল ও চিন্তাকে সঠিক দিকনির্দেশনায় এগিয়ে নিতে বইটির অসাধারণ উপযোগিতার কথা বারবার ওঠে। তা পড়ে মর্মগ্রহণ করতে পারলে অনেক আজগুবি বিশ্বাস আমাদের কাটে, মনের সংকীর্ণতাও দূর হতে পারে, এমন আশার কথাও আমরা শুনি। লেখককে সবাই শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানায়।
এর দুচারদিন পরেই ঘরে ঢুকে এক বেনামা প্রচারপত্র মেঝেয় পড়ে আছে দেখতে পাই। বুঝতে পারি, দরজার ফাঁক গলিয়ে কেউ ছুড়ে দিয়েছে। নানারকম ভয় দেখিয়ে বা মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে উড়োচিঠি মাঝেসাঝেই পাই। সেটি একরকম গা-সওয়া হয়ে গেছে। এই প্রচারপত্র কিন্তু অভিনব। সবাইকে তাতে জ্ঞান দেবার চেষ্টা; এবং নিচে নির্দেশ, ‘অনুগ্রহপূর্বক অন্তত দুইকপি ফটোকপি করে আপনার বন্ধু-বান্ধবদের দিন’।
দুই পৃষ্ঠাব্যাপী প্রচারপত্রের মোটা অক্ষরে শিরোনাম – ‘ঈশ্বর আছেন : বিজ্ঞানী মহলে নতুন ভাবনা’। তা থেকে কিছু উদ্ধৃতি দিই :
১. পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানীমহল কি ঈশ্বরের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন? সৃষ্টিকর্তার সন্ধানে কি নিয়োজিত করেছেন নিজেদের? প্রশ্নটা উঠেছে এজন্য যে, তাঁদের সাম্প্রতিক কিছু তত্ত্ব বা বক্তব্যের মধ্যে ঈশ্বর প্রসঙ্গ এসেছে। ঈশ্বরের মন, তাঁর বুদ্ধিবৃত্তি এবং মৃতের পুনরুত্থানের মতো কথা উঠেছে, পরলোকের প্রসঙ্গ এসেছে। …একজন বা দুজন বিজ্ঞানীর মধ্যে এই জাতীয় চিন্তার আবির্ভাব হয়নি। হয়েছে একাধিক বিজ্ঞানীর মধ্যে। এঁদের মধ্যে বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীও আছেন। এমনকি নোবেল বিজয়ীও।
২. ১৯৮৪ সালে অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডেলেইড বিশ্ববিদ্যালয়ের গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক পল ডেভিস একটি বই লেখেন : এড়ফ ধহফ ঃযব ঘবি চযুংরপং। বইয়ের নামটাই বিষয়বস্তু বলে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। …স্টিফেন হকিং-এর সময়ের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বের হবার পর পল ডেভিসও ঝট করে একটা নতুন বই নিয়ে হাজির হলেন ১৯৯২ সালে। নাম ঞযব গরহফ ড়ভ এড়ফ। এক বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়ের লিও লেডারম্যান লিখলেন ঞযব এড়ফ চধৎঃরপষব (লেডারম্যান ১৯৮৮ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান।)
৩. ইদানীং বিজ্ঞানীদের কারও কারও বক্তব্য, তত্ত্ব ও ভাবনায় ঘুরে-ফিরে ঈশ্বরের অস্তিত্ব, পরকাল ও মৃতের পুনরুত্থানের মতো বিষয়গুলো যেভাবে আসছে তাতে কিছু কিছু মহল বিশেষ করে নাস্তিকরা প্রমাদ গুনছেন। তাঁদের মনে প্রশ্ন জাগছে, তার মানে কি এই যে, বিজ্ঞানের সঙ্গে ধর্মের দ্বন্দ্বমূলক সম্পর্ক মুছে গিয়ে উভয়ের মধ্যে গভীর প্রণয়ের সৃষ্টি হয়েছে? তাঁরা মনে মনে বলছেন – ধর্মের বিরুদ্ধে যে-বিজ্ঞানকে তারা এতদিন অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে তার ধার কি তাহলে নষ্ট হয়ে গেছে? ভোঁতা হয়ে গেছে কি ওটা? তাঁরা আরো মুষড়ে পড়বেন যদি শোনেন লন্ডনের ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবিতে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানী পল ডেভিসকে সাড়ে ছয় লাখ পাউন্ডের টেম্পলটন প্রাইজে সম্মানিত করা হয়েছে। ঈশ্বর, অধ্যাত্মবাদ ও পারলৌকিকতা সম্পর্কে মানুষের উপলব্ধি ও অভিজ্ঞানকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে যাঁরা অসাধারণ মৌলিকত্বের পরিচয় দিয়ে থাকেন তাঁদের এই পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।
৪. টিপলার দাবি করেছেন সময়ের চূড়ান্ত বিভাজনে আমাদের এমন তথ্য ও কম্পিউটার শক্তি করায়ত্ত হতে পারে যার সাহায্যে মৃত সকল মানুষের পুনরুত্থান ঘটানো সম্ভব। তিনি বলেছেন, ওমেগা পয়েন্টে অর্থাৎ যেখানে স্থান ও কাল শেষ হয়ে যায় সেই মুহূর্ত বা বিন্দুতে পৌঁছলে মৃত সকল মানুষই জেগে উঠবে। কেয়ামতের দিন মানুষের পুনরুত্থানের কথা এবং মানুষের সকল ভালো ও মন্দ কাজের প্রতিফল দেওয়ার কথা আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে।
প্রচারপত্রটি সুলিখিত। অনুমান করি, এর পেছনে যাঁরা আছেন, তাঁরা চলতি হিসাবে উচ্চশিক্ষিত। দেশে-বিদেশে তাঁদের বিজ্ঞানপাঠের ইঙ্গিতও এতে মেলে। তাঁরা অবশ্য বলেছেন, প্রতিবেদনটি দি গার্ডিয়ান পত্রিকা থেকে নেওয়া। কোন গার্ডিয়ান পত্রিকা, তার উল্লেখ নেই। তবে এমন কিছু কথা এতে আছে যা বিলেতের গার্ডিয়ান পত্রিকায় ছাপা হয়ে থাকলে তা খুবই অবাক হবার বিষয়। হয়তো পাঠকের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াবার জন্যে ওই কৌশল। ধর্মবিশ্বাসে সাধারণ মানুষের আস্থা অটুট রাখার লক্ষ্যেই মনে হয় এই প্রচারপত্র বিলি করা। পরের মুখে ঝাল খেতে আমরা অভ্যস্ত। তাই এত নামি-দামি মনীষীর কথিত অভিমতে আমরা অভিভূত
হতেই পারি।
তবে প্রধানত যাঁর দোহাই দিয়ে এত কথা, সেই পল ডেনিসের এড়ফ ধহফ ঃযব ঘবি চযুংরপং বইটি হঠাৎ করে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। সেইসঙ্গে অন্য আরো কিছু এই ধরনের লেখাও। আমার মনে হয়েছে পল ডেভিসের বক্তব্যের সঙ্গে প্রচারপত্রে যা বলা হয়েছে তার ব্যবধান বিস্তর। তিনি প্রকৃতপক্ষে অন্ধবিশ্বাসের দুর্গে বিজ্ঞানের হানা দেবার কথা বলেছেন। এতে বিশ্বাসের ভিত সবল না হয়ে বরং নড়বড়ে হয়ে পড়ে। আর বিশ্বাসের অবলম্বন, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম, তাঁর কোনো শ্রদ্ধা আকর্ষণ করে না। শুরুতেই তিনি সতর্ক করে দেন, যে-ধর্ম তার বিশ্বাসকে ভ্রান্ত প্রত্যয়ের ওপর স্থাপন করে, তা বেশিদিন টিকে থাকার আশা করতে পারে না (পেঙ্গুইন সংস্করণ, ১৯৯০, পৃ ৩)। আরো বলেন, ‘- ধর্ম বহু আগে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়ে যায়, প্রায়শই তা ব্যস্ত থাকে সৎ-অসতের প্রশ্ন নিয়ে নয়, বরং ক্ষমতা ও রাজনীতি নিয়ে। ধর্মীয় উন্মাদনা বড় ঘন ঘন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পথে পরিচালিত হয়, তা মানুষের স্বাভাবিক সহনশীলতাকে বিনষ্ট করে, এবং বর্বর নিষ্ঠুরতার দিকে তাকে ঠেলে দেয়।’ (ঐ, পৃ ৩-৪) ‘খুব কম লোকই এটি অস্বীকার করবে যে, ফাঁপা বড়াই যতই করুক, ধর্ম, যে-সব বিষয় সমাজকে সবচেয়ে বেশি টুকরো টুকরো করে, তার ভেতর একটি।… প্রতিষ্ঠিত প্রধান ধর্মগুলো যে-মানুষের নৈতিকতার কোনো সর্বজনীন মানদণ্ড রচনা করতে পারে, তাদের হানাহানির রক্তাক্ত ইতিহাস তার পক্ষে কোনো সাক্ষ্য দাঁড় করাতে পারে না। এটা বিশ্বাস করারও কোনো কারণ নেই যে এমন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মে যাদের আস্থা নেই, এমনকি যারা চূড়ান্ত নাস্তিক, তাদের ভেতর ভালোবাসা ও সহমর্মিতা জাগতে পারে না’। (ঐ, পৃ ৪)
নতুন প্রকৃতিবিজ্ঞান আজ যেখানে পৌঁছেছে তার আলোয় এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি-স্থিতি-বিস্তার ও পরিণাম-সম্ভাবনার প্রমাণসিদ্ধ বা যুক্তিসম্মত ব্যাখ্যা তিনি খুঁজেছেন, যেমন খুঁজেছেন মানুষ ও মহাবিশ্বে শিশির ভট্টাচার্য। সম্পূর্ণ খোলা মন নিয়ে তিনি অগ্রসর হয়েছেন, কিন্তু ধর্ম-আশ্রিত বিধাতা ঈশ্বরের প্রয়োজনীয়তা বা প্রাসঙ্গিকতা কোথাও তাঁর কাছে ধরা দেয়নি। তথ্য ও তত্ত্বের পরিশুদ্ধ বিচারের শেষে স্রষ্টা ঈশ্বরের অন্বেষণ আমাদের কোথায় নিয়ে যায়, এই প্রশ্নের সদুত্তর তিনি যা পান, তা হলো, ‘সবকিছুর একটা আদি কারণ আছে এ ধারণা প্রবল প্রশ্নসাপেক্ষ, অবশ্য যতক্ষণ কারণ বলতে আমরা তাকে সাধারণ অর্থে বুঝি – তা এই মহাবিশ্ব অনন্তকাল ধরে
থাকুক, অথবা তার এক সুনির্দিষ্ট সূচনাকাল থাকুক, যাই হোক
না কেন’। (ঐ, পৃ ৪২) প্রাণের উদ্ভব কীভাবে হয়েছে, তার ব্যাখ্যাতেও তিনি ঈশ্বরের হস্তক্ষেপ টেনে আনার কোনো প্রয়োজন দেখেন না। (ঐ, পৃ ৭০)
আসলে এ-বই ধর্মতন্ত্রের ঈশ্বরকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় না, বিকাশমান বিজ্ঞানচেতনা নিয়ে তার মুখোমুখি হতে চায়। ঞযব গরহফ ড়ভ এড়ফ বইতেও তাই। কোয়ান্টাম বিশ্বের অনিশ্চয়তার বাস্তবতা সর্বজ্ঞ ঈশ্বরের ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। উড়ো প্রচারপত্রটিতে অবশ্য এই বইটিরও উল্লেখ আছে, এবং এর নামেই যে এর উদ্দেশ্য ধর্ম-নির্দেশিত ঈশ্বরের মাহাত্ম্য-কীর্তন, এমন ইঙ্গিতও তাতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এটি প্রথমেই মনে রাখা দরকার, বিজ্ঞানে ও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মে ‘ঈশ্বর’ শব্দ একই অর্থ বহন করে না। শিশির ভট্টাচার্যও বিজ্ঞানীর ঈশ্বরের ধারণা দিয়েছেন। সেখানে ঈশ্বর কোনো বিধাতা নন, আমাদের জীবনযাত্রায় আপন খেয়ালের প্রকাশও ঘটান না। সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের হওয়া-না-হওয়ার প্রান্তে পুঞ্জীভূত শক্তির অস্তিত্ব বা নাস্তিত্বময়তার তা এক প্রতীকী শব্দ (সব শব্দই অবশ্য প্রতীক)। কার্যত একটি মেটাফর। এই ঈশ্বরের সঙ্গে ধর্মসম্প্রদায়ের ঈশ্বরের ধারণাকে গুলিয়ে ফেললে ভয়াবহ বিভ্রান্তিরই শুধু সৃষ্টি হয়। তেমন বিভ্রান্তি দূর করার জন্যেও শিশির ভট্টাচার্যের বইটি আরো পড়া দরকার। এবং অবাক হই না, প্রচারপত্রটি তাঁর বই নিয়ে আলোচনা শুরু হবার মুহূর্তেই ছাড়া। বোঝা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম সাধারণ মানুষের মনোজগতে নিজের দখল বজায় রাখায়
খুবই তৎপর। তার বৃত্তে
আটকা পড়ে আমাদের দেশে মহাপণ্ডিত বিজ্ঞানীরাও সাড়ম্বরে জীবনপাত করেন।
তবে ঈশ্বরে বিশ্বাস বা অবিশ্বাস এখানে মূল কথা নয়। এই বিশাল মহাবিশ্বে ক্ষুদ্র পৃথিবীতে অতি তুচ্ছাতিতুচ্ছ মানুষের অস্তিত্ব। সেই মানুষ যদি খোলাচোখে তার সামনে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের দিকে তাকিয়ে থাকে, যদি তার অপার বিস্ময় ও সমাহিত সৌন্দর্য, তার চিত্তহরণ করে, তবে তা খুবই স্বাভাবিক। সেখান থেকেই উঠে আসে তার জীবনধারণের ব্যাপকতর মানুষী দায়বদ্ধতা। তা হলো এই বিস্ময় ও সুষমার সঙ্গে একাত্ম হওয়া, মানবজীবনের সীমিত পরিসরেও কোনোভাবে তাকে বিচলিত বিকৃত বা বিনষ্ট না করা। ঈশ্বরে বিশ্বাস রেখে তা সম্ভব; অবিশ্বাস থেকেও। কিন্তু ধর্মতন্ত্রের পাহারাদাররা যদি নিজ নিজ ঈশ্বরের নাম নিয়েই হুংকার ছেড়ে আপন আপন গৌরব-প্রতিষ্ঠায় অন্যের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন, তবে তাতেই ঘটে বিশ্বপ্রকৃতির ওপর কোনো
ঈশ্বর থেকে থাকলে তাঁর প্রকাশমান সত্যের চূড়ান্ত লঙ্ঘন। প্রথাবদ্ধ ঈশ্বরকে না মেনেও কেউ যদি ওই সত্যকে নিজের জীবনে ও পরিপার্শ্বে মিলিয়ে নিয়ে তাতে অনুগত থাকেন, তবে তাতেই ঘটে চেতনায় ও কর্মে প্রকৃত সার্থকতার উন্মোচন। শিশির ভট্টাচার্যের বইটি পড়ে এই বোধ আমাদের জাগে। মহাবিশ্বের নৈর্ব্যক্তিক সুষমায় ও সৌন্দর্যে আমরা আত্মস্থ হই।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.