বাংলাদেশের নির্দয় জন্মের হৃদয়সংবেদী ভাষ্য

The Cruel Birth

of Bangladesh

Archer K Blood

UPL

Dhaka, 2003

450 Taka

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক তাৎপর্য একান্ত সীমিত হয়ে পড়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সুবাদে বাংলাদেশ একটি শীর্ষ পদ গত চার বছর যাবৎ অধিগত করে রেখেছে। পদ না বলে একে পদাঘাত বলাই বোধকরি সমীচীন। বন্যা, খরা কিংবা ফেরিডুবিতে বিপুল প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির সুবাদে বিশ্বপটে মাঝে-মধ্যে শুশুকের মতো দেখা দিয়েই বাংলাদেশ আবার মিলিয়ে যায়। কেউ কেউ বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবপ্রতিমা হিসেবে প্রফেসর ইউনুস কিংবা বস্ত্রখাত কিংবা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতালাভের কথা উল্লেখ করেন, তবে এইসব ইতিবাচকতা প্রমাণ করতে হয় গলা ফাটিয়ে, নিজের ঢাক নিজেকেই পিটিয়ে। কিন্তু উনিশশো একাত্তরে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন, আপন অস্তিত্ব ও বিকাশের তাগিদে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এককাট্টা হয়ে লড়াই করেছিল বাংলাদেশ, আর সারা পৃথিবী বিস্ময় ও বিমুগ্ধতা নিয়ে দেখেছিল সেই সংগ্রাম, বাড়িয়ে দিয়েছিল সহায়তার হাত। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সর্পিল পথযাত্রা স্বীয় জনগণ এবং সেই আন্তর্জাতিক সম্মান কারো প্রতি সুবিচার করেনি। ফলে হতাশায় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল গোটা বিশ্ব; কিন্তু কিছু কিছু মানুষ ছিলেন যাঁদের জীবন অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের সঙ্গে, ঘটনাক্রমে নয়, আন্তর্তাগিদেও যাঁরা শামিল হয়েছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের কাফেলায় এবং সেই জীবনঘনিষ্ঠতা থেকে তাঁদের তো আর মুক্তি ছিল না। মুক্তি তাঁরা অবশ্য কামনা করেনওনি। তেমনি এক ব্যতিক্রমি ব্যক্তিত্ব আর্চার কে ব্লাড, কর্মচক্রে জড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের সঙ্গে, ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে নিজের ভাগ্যও গাঁথা পড়ল একই সূত্রে এবং একাত্তরের ঘটনাধারা তাঁকে আজীবন অনুসরণ করে চলল, আর তিনিও আজীবন বহন করলেন বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর বন্ধন, যা কখনো কোনোভাবে ছিন্ন হয়নি। এমন এক বিরল মানুষ, একাত্তরে যিনি ছিলেন ঢাকায়, পূর্ব পাকিস্তানে মার্কিন কনসাল জেনারেল হিসেবে, অবস্থান নিলেন নিক্সন-প্রশাসনের পাকিস্তানের প্রতি পক্ষপাতী নীতির বিরুদ্ধে এবং তার মূল্য দিলেন পেশাগত কর্মজীবনে উন্নতির সোপান থেকে পিছলে পড়ে, তিনি যখন জীবনসায়াহ্নে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ঘটনাধারার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ ভাষ্য রচনা করেন, তখন বোধগম্যভাবে তা হয়ে ওঠে এক ঐতিহাসিক গ্রন্থ। কিন্তু আর্চার ব্লাডের ব্যক্তিত্বে ছিল আরো অধিকতর মানবিক মহিমা। সংবেদনশীলতা ও ভালোবাসা নিয়ে তিনি বরণ করেছিলেন জীবনকে, মার্কিন সমাজের শ্রেষ্ঠ আদর্শের পতাকাবাহক ছিলেন তিনি, ফলে তাঁর কর্ম ও জীবনদর্শনে গতানুগতিকের বাইরে ছিল অন্যতর মাত্রা এবং তাঁর প্রণীত গ্রন্থ পেয়েছে সেই বাড়তি মাহাত্ম্য, যা একে হৃদয়গ্রাহী ও অনন্য করে তুলেছে।

‘একজন মার্কিন কূটনীতিকের স্মৃতি’ এই উপশিরোনামের মূল গ্রন্থের নাম রেখেছেন আর্চার ব্লাড দি ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ, ব্রুটাল নয়, ট্রাজিক নয়, নির্দয়া বা ক্রুয়েল এবং এমনি নামকরণের মধ্য দিয়ে যেন বিচ্ছুরিত হয় বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রত্যক্ষদর্শী লেখকের অন্তরের নিবিড় বেদনা। ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, ‘সেসব ছিল সত্যিকারভাবে নির্দয় দিন। এই গ্রন্থ রচনাকালে প্রায়শ আমার দৃষ্টি আচ্ছন্ন হয়েছিল চোখের জলে, যখন আমার মনে হয়েছে বাংলাদেশের সেই বন্ধুদের মুখ, যাঁরা স্বাধীনতা-সংগ্রামে জীবন দিয়েছেন এবং চেষ্টা করেছি বাংলাদেশের সাহসী জনগণের বিপুল যন্ত্রণার পরিমাপ গ্রহণের।’ ভূমিকার এই বক্তব্য যে-ইঙ্গিত দেয়, গ্রন্থপাঠান্তে পাঠক সেটা উপলব্ধি করবেন, এ-নিছক প্রত্যক্ষদর্শী ভাষ্য নয়, এ হচ্ছে হৃদয়-নিঙরানো সংবেদনশীলতা নিয়ে প্রণীত গ্রন্থ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পরিচয়দানের জন্য, বিশেষভাবে বিদেশীদের কাছে, কোনো একক গ্রন্থের অভাব ছিল বহুকাল। কেউ যদি তেমন গ্রন্থের খোঁজ করেন তবে নির্দ্বিধায় তাঁর হাতে এখন তুলে দেওয়া যায় আর্চার ব্লাডের স্মৃতিভাষ্য।

সত্তর-একাত্তর সালে, আর্চার ব্লাড যখন ঢাকায় কনসাল জেনারেল হয়ে কাজ করেছেন সেই পর্ব ইতিহাসের অন্তর্গত হয়ে আছে। কিন্তু এটা তো অজানা থেকে গেছে যে, তিনি প্রথম এসেছিলেন ঢাকায় ১৯৬০ সালের জুনে, দুবছর কাজ করেছেন মার্কিন উপদূতাবাসে পলিটিক্যাল অফিসার হিসেবে। ঢাকা তখন প্রাচ্যের এক নিদ্রিত শহর, বৈদেশিক দপ্তরের তরুণ কর্মকর্তারাই এখানে আসেন এবং কঠিন এলাকায় কর্মসম্পাদন করে পেশাগত উন্নতির পথ তৈরি করেন। ব্লাডের ক্ষেত্রেও এর কোনো ব্যতিক্রম ছিল না, ঢাকাতে থাকাকালে তিনি এফএসও-থ্রি হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন এবং ঢাকার পর তাঁর পোস্টিং হয় পেনসিলভানিয়ায় আর্মি ওয়ার কলেজে। ১৯৬৮ সালে ব্লাড এফএসও-ওয়ান পদে উন্নীত হন এবং তাঁর সামনে অবারিত হয় পেশাগত উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হওয়ার বিপুল সম্ভাবনা।

তবে তরুণ কূটনীতিক আর্চার ব্লাডের জন্য ঢাকার অভিজ্ঞতা প্রীতিকর মনে হয়েছিল। তিনি ষাটের দশকের ঢাকাবাসের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়ে গ্রন্থের সূচনা ঘটিয়েছেন। তখনো বারিধারায় বসতি গড়ে উঠেনি, কূটনীতি-পাড়া বলে ঢাকায় কিছু ছিল না। গুলশান সবে গ্রাম থেকে শহরে রূপান্তরিত হওয়ার পথে পা বাড়িয়েছে, কূটনীতিকদের আবাস মূলত ছিল ধানমন্ডিতে। আর্চার ব্লাডের বাসা ছিল বর্তমান বেইলি রোডে, ব্লাড অবশ্য লিখেছেন রমনায়, তখন গোটা এলাকা রমনা হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিল। অন্য কূটনীতিকদের জন্য স্বস্তিকর না হলেও ব্লাড খুশি ছিলেন যে, তাঁর পড়শিদের মধ্যে বাঙালির সংখ্যাই বেশি এবং এমনি এক পরিবারের সঙ্গে তাঁদের আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠে, ব্লাডের দুই কন্যা শিরিন ও বারবারার বয়স তখন এগারো ও দশ, প্রতিবেশী সেই পরিবারে ছিল তাদের সমবয়েসি এক ছেলে শহুদুল হক, ডাক নাম গুল্লু এবং তারা মিলেমিশে একসাথে বড় হতে থাকে। আর্চার ব্লাড জানিয়েছেন গুল্লুর সঙ্গে তাঁদের অব্যাহত সম্পর্কের কথা, লিখেছেন, ‘বাস্তবে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের এই ঘটনা অবলোকন করা আমার স্ত্রী ও আমার জন্য ছিল এক আগ্রহোদ্দীপক ব্যাপার এবং কীভাবে উভয় পক্ষ এর দ্বারা উপকৃত হয় তা দেখতে পারাটা স্বস্তিকর অভিজ্ঞতা। গুল্লু হয়ে উঠেছিল আমাদের পরিবারের একজন এবং এখনো মেগ ও আমাকে সে খালা ও খালু বলে সম্বোধন করে।’

কর্মের সুবাদে আরেকজন তরুণ বাঙালি অফিসারের সঙ্গে আর্চার ব্লাডের সখ্য গড়ে ওঠে, তিনি হলেন নবীন সিএসপি এ.এম.এ. মুহিত। পূর্ব পাকিস্তান সরকারের প্রটোকল অফিসার হিসেবে মুহিতের সঙ্গে ব্লাডের প্রীতিময় সম্পর্ক বিকশিত হয় এবং একাত্তরে ব্লাড যখন ঢাকার দায়িত্ব ছেড়ে ফিরে গেলেন আমেরিকায়, বাংলাদেশ-সংগ্রামের কঠিন দিনে, সেই সম্পর্ক পায় নতুন মাত্রা।

ষাটের দশকের ঢাকায় কূটনীতিক জীবনের ছোট ছোট বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ করেছেন আর্চার ব্লাড, যার মাধ্যমে বৃহত্তর জীবনবাস্তবতার পরিচয় মেলে। আউট স্টেশনে থাকেন যেসব বিদেশী তাঁদের জীবন সুসহ করতে বিনোদনের রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। আমেরিকান ক্লাবের সদস্যরা সেই তাগিদ থেকে বিভিন্ন সময় নাটক মঞ্চস্থ করে থাকেন। এমনিভাবে একবার তাঁরা মঞ্চস্থ করেছিলেন মার্কিন দরিদ্র কৃষকদের জীবনভিত্তিক নাটক জন স্টাইনবেকের অফ মাইস অ্যান্ড মেন। আরেকবার, সম্ভবত রবীন্দ্রজন্মশতবার্ষিকী দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে মঞ্চায়ন করেন ডাকঘর, যে-নাটকে ঢাকাই শাড়ি পরে কপালে টিপ এঁকে সুধার ভূমিকায় নেমেছিল ব্লাডকন্যা শিরিন। ঢাকা এবং ময়মনসিংহে দুটি প্রদর্শনীর পর পূর্ব পাকিস্তান সরকার নাটকটির পরবর্তী অভিনয় বন্ধ করে দেয়। আর্চার ব্লাড লিখেছেন যে, ‘সরকার কোনো কারণ দেখায়নি, হতে পারে রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ও ভারতীয়, তাই এটা ঘটেছে। তবে এটাও কিছুটা বিস্ময় জোগায় যে, ঢাকায় পলিটিক্যাল অফিসার হওয়া সত্ত্বেও যে ব্লাড খোঁজ রাখেননি পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রজন্মশতবার্ষিকী-উদ্যাপন বাধাগ্রস্ত করার জন্য সরকার কেমন হন্যে হয়ে উঠেছিল এবং বাঙালিরা প্রতিবাদী চেতনা থেকে কীভাবে রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করবার কাজে মেতে উঠেছিল। যেখানে স্বদেশীদের রবীন্দ্রনাটক করতে দিচ্ছে না মূঢ় শাসকেরা, সেখানে মার্কিনিদের রবীন্দ্রপ্রীতি তাদের জন্য চরম অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে বাধ্য।’

মানুষে মানুষে সমাজে সমাজে দূরত্ব যে কতো বিপরীত প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয় তার পরিচয় মেলে ব্লাডের আরেক অভিজ্ঞতায়। মার্কিন এবিসি টেলিভিশনের একটি দল এসেছিল দুর্গত আমেরিকান কূটনীতিকদের জীবনভিত্তিক তথ্যচিত্র-নির্মাণের জন্য। তাঁরা ঢাকার জীবন নিয়ে নানা ছবি তুলেছেন, ব্লাড-দম্পতির সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, কিন্তু এই দম্পতি যে বাঙালি পড়শিদের সঙ্গে মিলেমিশে রয়েছে তাতে খুব প্রীত বোধ করেননি এবং সাক্ষাৎকার থেকে সেই প্রসঙ্গের উল্লেখ ছেঁটে বাদ দিয়েছেন। ঢাকায় কোনো মার্কিন কূটনীতিক-পরিবার স্বচ্ছন্দবোধ করতে পারে এটা মার্কিন টিভি কোম্পানির কাছে বোধগম্য বা গ্রহণযোগ্য হয়নি।

১৯৬২ সালে ঢাকা থেকে বদলি হয়ে আর্মি ওয়ার কলেজে কূটনীতিক শিক্ষাদানের কাজ করেন আর্চার ব্লাড। এরপর বদলি হয়ে আসেন কাবুলে। সেখানে তিন বছর দায়িত্ব পালনশেষে ১৯৬৮ সালে যোগ দেন গ্রিসে মার্কিন দূতাবাসে। ইতোমধ্যে তিনি এফএসও-ওয়ান পর্যায়ে পদোন্নতি পেয়ে তাঁর দক্ষতার স্বীকৃতি অর্জন করেন। ১৯৭০ সালে পুনরায় ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসে চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স হিসেবে যোগদান করেন ব্লাড, মিশনপ্রধান হিসেবে তাঁর প্রথম দায়িত্বপালন। এই পর্ব নিয়েই মূলত ব্লাডের বই, তিনি সবিস্তারে লিখেছেন তাঁর কূটনীতিক কর্মকাণ্ড এবং মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে সৃষ্ট মতপার্থক্য নিয়ে। সত্তরের ঘূর্ণিঝড় ও নির্বাচন এবং একাত্তরের গণহত্যা এ-সবকিছু তিনি দেখেছেন ঘনিষ্ঠভাবে, সেইসঙ্গে সম্প্রতি অবারিত মার্কিন সরকারি নথিপত্র ব্যবহার করে তিনি বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস লিখেছেন আকর্ষণীয় ব্যক্তিগত বয়ানের সূত্রে।

অসংখ্য তথ্য, পর্যালোচনা ও ঘটনা ঠাঁই পেয়েছে এই গ্রন্থে। এসবের বিবরণ তুলে ধরা প্রায় অসাধ্য কাজ, তবে এটুকু বলা যায় যে, পাঠক এখানে নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি-অনুযায়ী অজস্র উপাদান খুঁজে পাবেন ইতিহাস ও উপলব্ধির। জানা ঘটনাকে নতুনভাবে বুঝবার বিভিন্ন সূত্রও মিলবে এখান থেকে। মার্কিন কনসাল হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারের সবিস্তার বর্ণনা রয়েছে। এতে যেমন ব্লাডের ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ ফুটে উঠেছে, তেমনি সরকারিভাবে প্রেরিত সাক্ষাৎকারের রাজনৈতিক রিপোর্টও সন্নিবেশিত হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তাঁর ধানমন্ডির বাসভবনে পাকিস্তানস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত জোসেফ ফারল্যান্ডের দীর্ঘ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এই আলোচনা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ছিল নানা জল্পনা-কল্পনা এবং এবারই প্রথম সেই বৈঠকের এক নির্ভরযোগ্য বয়ান আমরা পেলাম। মাওলানা ভাসানীর সঙ্গে সন্তোষে সাক্ষাৎকার কিংবা ষাটের দশকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দির সঙ্গে ব্লাডের সপরিবার ঘনিষ্ঠতা ইত্যাদির স্বল্পপরিসর-বিবরণেও আগ্রহোদ্দীপক বিভিন্ন দিক উন্মোচিত হয়।

ইতিহাসের অনেক প্রধান কুশীলবকে কাছ থেকে দেখেছিলেন আর্চার ব্লাড, তবে রাজা থেকে গিয়েছিল জালের আড়ালে এবং পরাক্রমশালী এই শক্তির সঙ্গে চিঠিপত্রে টেলিগ্রামে বোঝাপড়া হয়েছিল ব্লাডের। ২৫ মার্চ মধ্যরাত থেকে শুরু হয় বিশ শতকের এক নৃশংসতম গণহত্যা। ২৭ মার্চ স্বল্পসময়ের জন্য কারফিউ শিথিল হলে ডিফেন্স অ্যাটাশে কর্নেল নোলানসহ মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর সঙ্গে দেখা করেন ব্লাড। ২৭ মার্চ রাতে, কূটনীতিক ভাষায় যাকে বলা হয় সিচুয়েশন রিপোর্ট, ওয়াশিংটনে তা প্রেরণ করেন ব্লাড, উল্লেখ করেন ঢাকা জুড়ে পরিচালিত মিলিটারি ক্র্যাকডাউনের এবং এক্ষেত্রে প্রায়শ সংঘটিত রুথলেস ব্রুটালিটির। গণহত্যার একেবারে শুরু থেকে বিভিন্ন সূত্রে খবর সংগ্রহ করে যেসব বার্তা পাঠাচ্ছিলেন আর্চার ব্লাড তাতে পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর সম্যক উপলব্ধির পরিচয় মিলছিল। ২৮ মার্চ প্রেরিত ‘নির্বাচিত গণহত্যা’ শীর্ষক টেলিগ্রামে প্রথম পরিচয় মিলল কূটনীতিক ব্লাডকে ছাপিয়ে জেগে-ওঠা মানবসত্তাসম্পন্ন ব্লাডের। এই বার্তার শুরুতে তিনি জানান, ‘এখানে ঢাকায় পাক মিলিটারি পরিচালিত সন্ত্রাস দেখে আমরা বাকহারা এবং শিহরিত হয়ে পড়েছি।’ এই বার্তা নিক্সনের বিদেশ-দপ্তর সতর্কতার সঙ্গে গ্রহণ করেছিল এবং এই ধরনের টেলিগ্রাম যাঁরা পড়বার সুযোগ পান সেই পরিধি একান্ত সংকুচিত করে দিয়েছিল। যে-স্বল্প কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তা বার্তা পাঠ করেছিলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত কেন কিটিং। তিনি পাকিস্তানিদের আচরণে সংক্ষুব্ধ হয়ে নৃশংসতার নিন্দা জানাতে মার্কিন প্রশাসনকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে টেলিগ্রাম পাঠান এবং লেখেন, ‘এটা হচ্ছে সেই সময় যখন নীতিনিষ্ঠতা দ্বারা নিশ্চিত হয় শ্রেষ্ঠ রাজনীতি।’

ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রশাসন ছিল পাকিস্তানি সামরিক জান্তার পক্ষে অনড় অবস্থানে, আর নীতিনিষ্ঠতা আর্চার ব্লাডকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল অন্য পথে। ৬ এপ্রিল গণহত্যার ব্যাপকতায় শিহরিত ও মর্মাহত ঢাকাস্থ মার্কিন মিশনের বিশজন কর্মকর্তা সরকারি পাকিস্তান-তোষণ-নীতির বিরুদ্ধমত প্রকাশ করে একটি বার্তা প্রস্তুত করে কনসাল জেনারেলকে প্রদান করেন। এহেন পরিস্থিতিতে মিশনপ্রধান কী করবেন সেটা এক বড় প্রশ্ন; কিন্তু আর্চার ব্লাডের ক্ষেত্রে দ্বিধার অবকাশ ছিল কম। নিজের গা বাঁচিয়ে দুকূল-রক্ষার ব্যবস্থা তিনি করতে পারতেন, কিন্তু বিবেকের দায় বড় হয়ে উঠেছিল তাঁর কাছে। তিনি লিখেছেন, ‘ভিন্নমতাবলম্বীদের সঙ্গে কথা বলে আমি তাঁদের নিরস্ত করতে পারতাম, কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে যা ঘটছে তা নিয়ে বিন্দুমাত্র উদ্বেগ প্রকাশে বিদেশ মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা নিয়ে তাঁদের বিস্ময় ও মনঃপীড়ার আমিও তো সাথী।’ তিনি বার্তাটি ওয়াশিংটনে পাঠালেন এবং সেইসঙ্গে জুড়ে দিলেন তাঁর মন্তব্য, মিশনের প্রধান হিসেবে কূটনীতিক রীতি বজায় রেখে বার্তায় নিজ স্বাক্ষর যুক্ত করলেন না বটে, তবে বার্তার বক্তব্যের সঙ্গে তিনি সম্পূর্ণ সহমত ব্যক্ত করলেন।

এই বার্তা পেয়ে ওয়াশিংটনে আগুন জ্বলে উঠেছিল, তবে নিক্সন-প্রশাসনের ভেতর মহল টলে উঠলেও তাদের নীতিতে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। কেন ঘটেনি সেটা টের পেয়েছিলেন ব্লাড আরো পরে জুন মাসে, যখন তিনি ঢাকা থেকে উৎপাটিত হয়ে দপ্তরের গুরুত্বহীন পদে দিন কাটাচ্ছেন। হেনরি কিসিঞ্জার পাকিস্তানের দূতিয়ালিতে গোপনে চীন-সফরের ব্যবস্থায় রত থাকায় ভূ-ভৌগোলিক বিবেচনায় মার্কিন-পাকিস্তান-চীন-অক্ষ লাভ করেছিল অসীম গুরুত্ব এবং বাঙালিদের ওপর পরিচালিত নিধনযজ্ঞের রক্তে সেই আয়োজন নষ্ট হতে দিতে রাজি ছিল না মার্কিন প্রশাসন, তা রক্তের নদী যতোই দুকূলপ্লাবী হয়ে উঠুক না কেন।

প্রতিরোধ-আন্দোলনের তীব্রতা ও রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে শেষাবধি জয় হয় মানবতার, সম্ভব হয়ে ওঠে বাংলাদেশের অভ্যুদয়। বহু মানুষের বহু ধরনের ত্যাগ, শ্রম, নিষ্ঠা ও ভূমিকা পালনের মধ্য দিয়ে সম্ভব হয়েছে এই আলোক-অভ্যুদয়। ইতিহাসের এমনি পরিক্রমণের অংশী ও সাক্ষী হিসেবে আর্চার ব্লাডের স্মৃতিভাষ্য তাই অশেষ তাৎপর্যবহ। কেবল বাংলাদেশের অতীত-ইতিহাসের আলোকে নয়, বর্তমান সংঘাত-পীড়িত বিশ্বে রাজনীতি ও নীতিবোধের দ্বন্দ্বে উত্তাল সময়ে সঠিক পথে চলবার পাথেয় মিলবে এই গ্রন্থ থেকে।

বিশ শতকের রাজনৈতিক ইতিহাসে কলঙ্ক হয়ে আছে বাংলাদেশ-সঙ্কটকালে অনুসৃত মার্কিন নীতি, যে-গণতন্ত্র ও উদারবাদিতার বাহক হিসেবে আমেরিকা নিজেকে মুক্তবিশ্বের নেতারূপে প্রতিষ্ঠিত করতে তৎপর ছিল, মানবতার চরম অপমানেও বিন্দুমাত্র প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে তারা হাত মিলিয়েছিল সামরিক জান্তার সঙ্গে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জাতির শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে হত্যা ও দেশ থেকে বিতাড়নে তাদের আপত্তি তো ছিলই না, বরং পরোক্ষে ছিল জোর সমর্থন। এই নীতির প্রধান হোতা ছিলেন রিচার্ড নিক্সন এবং হেনরি কিসিঞ্জার। নিক্সন অচিরেই ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে লেজে-গোবরে হয়ে বিদায় নিলেন, তবে এক্ষেত্রে এটাও লক্ষণীয়, আমেরিকায় আড়িপাতার অভিযোগে প্রেসিডেন্ট কলঙ্কিত হন বটে কিন্তু গণহত্যার দোসর হওয়াতে কোনো বাংলাদেশ-স্ক্যান্ডাল ঘটে না। অপরদিকে হেনরি কিসিঞ্জার কখনো বাংলাদেশকে ক্ষমা করতে পারেননি, একাত্তরে স্বীয় নীতির অবমাননার পীড়া তিনি কখনো বিস্মৃত হননি। তেমনিভাবে কিসিঞ্জার আর্চার ব্লাডকেও কখনো ক্ষমা করেননি। ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরে কিসিঞ্জার যখন বিদেশমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন, ব্লাড তখন মন্ত্রণালয়ের এককোণে গুরুত্বহীন এক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিসেবে কাজ করছিলেন। তাঁরই বন্ধু, তাঁদের ব্যাচের কনিষ্ঠতম সদস্য, ন্যাট ডেভিসকে বিভাগের পরিচালক করে পাঠালেন কিসিঞ্জার। এক্ষেত্রে একই বিভাগে নিুপদে সতীর্থের অধীনে কাজ করাটা উভয়ের জন্য বিব্রতকর হয়ে উঠেছিল। ব্লাড লিখেছেন, ‘আমি ন্যাটকে বললাম সে বুঝে দেখবে কিনা আমি কি ঢাকার কারণে এখনও কিসিঞ্জারের বাড়ির বাইরের কুকুরঘরের আশ্রিত হয়ে রয়েছি কিনা। ন্যাট সদয়ভাবে সম্মত হলো এবং আমাকে কোনো এক আফ্রিকান দেশে রাষ্ট্রদূত করার প্রস্তাব নিয়ে কিসিঞ্জারের কাছে হাজির হলো। কিসিঞ্জারের প্রতিক্রিয়া ছিল, ন্যাটকে তিনি যা বলেছিলেন, ‘এই ব্যাটাকে ওয়াশিংটন থেকে ভাগাও।’ তার মানে অবশ্য রাষ্ট্রদূত করা নয়।’ অবস্থা বুঝে ব্লাড আবারও ফিরে গেলেন আর্মি কলেজে। পেশাদারি জীবনে তাঁকে বরাবর নির্বাসিতই থাকতে হয়েছিল।

ইতিহাস অবশ্য রায় দিয়েছে ভিন্ন, যাঁকে নির্বাসনে পাঠিয়েছিলেন কিসিঞ্জার তিনি বরং স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, যদিও ইতোমধ্যে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ বিশ্ববাসীর মানস-মানচিত্র থেকে খসে পড়েছে। সে-কারণে আর্চার ব্লাড হয়তো তাঁর হৃত অবস্থান বিদেশ-দপ্তরে আর ফিরে পাননি, তবে তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে ভবিষ্যৎ-ইতিহাসবিদরা। আর অশেষ সাফল্য সত্ত্বেও পাদপ্রদীপের আলোয় উদ্ভাসিত হেনরি কিসিঞ্জারকে নিয়ে একুশ শতকেও রচিত হয় গ্রন্থ, যুদ্ধাপরাধী হিসেবে তাঁর বিচার দাবি করে।আর্চার ব্লাড এবং তাঁর গ্রন্থ ইতিহাসের সেই অমোঘ রায় প্রদানের সাক্ষী হয়ে রইল।