রাজীব সরকার
-

একজন সংস্কৃতিমান শিক্ষকের প্রস্থান
আশি ও নব্বইয়ের দশকে দৈনিক সংবাদের সাহিত্য সাময়িকীটি ছিল উল্লেখযোগ্য। স্কুলে পড়ার সময় ওই সাহিত্য সাময়িকীতে প্রথম সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের লেখা পড়ি। ‘অলস দিনের হাওয়া’ নামে তিনি একটি পাক্ষিক কলাম লিখতেন। বিশ্বসাহিত্য, কখনো কখনো চিত্রকলা সম্পর্কে বিশ্লেষণ করতেন। পরে জেনেছি তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক। কথাসাহিত্য, নন্দনতত্ত্ব, প্রবন্ধ, চিত্রকলা ইত্যাদি তাঁর সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্র। সৈয়দ…
-
কাজী আনোয়ারুল কাদীর : বিস্মৃত চিন্তানায়ক
বিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশে সংঘটিত উল্লেখযোগ্য বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে অন্যতম ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’। মুসলিম সাহিত্য সমাজের সাংগঠনিক নেতৃত্বে এ-আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২৬ সালে। মুসলিম সাহিত্য সমাজের শতবর্ষ পূরণ হতে চলেছে। এ-আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কয়েকজন উদার মানবতাবাদী লেখক ও সংগঠক। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে অগ্রজ ছিলেন কাজী আনোয়ারুল কাদীর। তিনি শুধু সবচেয়ে অগ্রজ ছিলেন না, বুদ্ধির মুক্তি…
-

আমার যতীন স্যার
যতীন স্যারের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের দিনটি এখনো স্পষ্ট মনে আছে। ১৯৯৫ সাল। ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র আমি। দৈনিক পত্রিকায় গুরুগম্ভীর বিষয় নিয়ে চিঠি লিখি, এখানে-ওখানে বিতর্ক করি; ভালো ছাত্র হিসেবেও সুনাম রয়েছে। যতীন সরকার নামে একজন বিখ্যাত ব্যক্তি ময়মনসিংহে আছেন তা আমি জানতাম, বাবার মুখে তাঁর নাম শুনেছি একাধিকবার। কখনো তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের…
-

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর অন্তহীন অন্বেষণ
আধুনিক বাংলা সাহিত্যে সৃজনশীল রচনার যে সম্ভাবনা ও বিকাশ দেখা যায়, মননশীল রচনার ক্ষেত্রে তা কিছুটা অনুপস্থিত। চিন্তাশীল রচনা তথা মননশীল সাহিত্য বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য শাখার তুলনায় অনগ্রসর। ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান বা স্প্যানিশ ভাষার সাহিত্য সৃজনশীলতা ও মননশীলতা উভয়ক্ষেত্রে সমৃদ্ধ। এসব পাশ্চাত্য ভাষায় বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, সমাজতত্ত¡, সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি নিয়ে এমনসব বই ও প্রবন্ধ…
-

ইহজাগতিকতা ও আহমদ শরীফ
শিক্ষক, গবেষক, প্রাবন্ধিক ও সমাজ রূপান্তরকামী বুদ্ধিজীবী-বহুমাত্রিক পরিচয়ে ভূষিত আহমদ শরীফ ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি চিন্তাবিদ। বর্তমান প্রবন্ধের লক্ষ্য তাঁর বহুমাত্রিক পরিচয়ের স্বরূপ উন্মোচন নয়। এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য আহমদ শরীফের জীবনদর্শনের ভরকেন্দ্রটিকে চিহ্নিত করা। এই ভরকেন্দ্রের নাম ইহজাগতিকতা। সেক্যুলারিজম বা ইহজাগতিকতা রেনেসাঁসের মৌল বৈশিষ্ট্য। সামন্ততান্ত্রিক মধ্যযুগ থেকে বাণিজ্যিক ধনতন্ত্রে উত্তরণের আর্থসামাজিক পটভূমিতে যে…
-

জলচিকিৎসা
তিপান্নতে পৌঁছে হাকিম আব্দুল্লাহর মনে হলো, শরীরটা যেন আর তার দখলে নেই, কথায় কথায় বিদ্রোহ করে। কাজের মাঝখানে অবসাদ উঁকি দেয়, অকারণ বিষণ্নতা মন দখলে নেয়। আরো বিপদ, তার শরীরে দেখা দিচ্ছে জইফ হওয়ার কিছু লক্ষণ। যেমন, তার স্মৃতিরা এখন যেন তিলনা বিলের বাইন মাছ, ধরা দিতে দিতে দেয় না, তার পেটে কিছুই যেন হজম…
-

জন্মদ্বিশতবর্ষে মাইকেল : তাঁর বিদ্রোহের স্বরূপ
বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহী কবি হিসেবে কাজী নজরুল ইসলাম অবিস্মরণীয়। তাঁর পরেও কোনো কোনো কবি বিদ্রোহ বা দ্রোহের কবি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে কবিমাত্রই অনিয়ম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্রোহ ঘোষণা করেন। সে-বিচারে অধিকাংশ কবিই বিদ্রোহের কবি। এই বিদ্রোহ মূলত সামাজিক ও রাজনৈতিক। সাহিত্যিক বিদ্রোহ ভিন্ন বিষয়। এক্ষেত্রে বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহের পথিকৃৎ মাইকেল মধুসূদন দত্ত। ব্যক্তিজীবনে ও…
-

লালসালু : আধুনিকতা ও শিল্পের স্পর্ধা
বাংলা কথাসাহিত্যে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ এক অবিস্মরণীয় নাম। র্যাডক্লিফ-অঙ্কিত পূর্ববাংলার সাহিত্যিক মানচিত্রে তাঁর ভূমিকা যুগপ্রবর্তকের। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এই ভূখণ্ডের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী, আধা-সামন্ত বাঁধনে আবদ্ধ গ্রামীণ মুসলমান সমাজের জীবনযাত্রা উপস্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস লিখেছেন আবুল ফজল, আবু জাফর শামসুদ্দীন, শওকত ওসমান, শহীদুল্লা কায়সার, আবু ইসহাকের মতো কৃতী ঔপন্যাসিকগণ। এরপরও কোথায় যেন শূন্যতা ছিল – আধুনিক কথাসাহিত্যের প্রকরণে…
-

আত্মকথার দর্পণে বুদ্ধদেব বসু
রবীন্দ্রোত্তর বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে সব্যসাচী প্রতিভা বুদ্ধদেব বসু। বিভিন্ন গল্পে, উপন্যাসে, কবিতায় ও প্রবন্ধে বিক্ষিপ্তভাবে নিজের জীবনকাহিনি শুনিয়েছেন তিনি। তবে সুনির্দিষ্টভাবে তিনটি রচনায় তাঁর আত্মকথা পাওয়া যায় – ‘আমার ছেলেবেলা’, ‘আমার যৌবন’ ও ‘আমাদের কবিতাভবন’। যদিও শেষোক্ত রচনাটি তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে অসমাপ্ত, এরপরও ধারাবাহিকভাবে এই রচনা তিনটি পাঠে এক অসামান্য আত্মজীবনীমূলক সাহিত্যকর্মের স্বাদ অনুভব করা…
-

রবীন্দ্রকাব্যে রেনেসাঁস চেতনা
ইতালীয় রেনেসাঁসের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মানুষের দৃষ্টিকে অপার্থিব বা দৈব প্রভাব থেকে মুক্ত করে জাগতিক ও মানবিক বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত করা। মধ্যযুগে মানুষের দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল পরলোক, ধর্মসাধনা ও অন্ধবিশ^াসের প্রতি; জাগতিক ও মানবিক চিন্তাধারা তখন উপেক্ষিত হয়েছে, প্রাধান্য পেয়েছে বিষয়বৈরাগ্য ও সন্ন্যাস। রেনেসাঁস এই দৃষ্টিভঙ্গিকে পাল্টে দেয়। জাগতিক ও মানবমুখিনতার প্রতি নবজাগ্রত এই আগ্রহ…
-

রবীন্দ্রনাথ ও বাংলার রেনেসাঁস
চতুর্দশ শতাব্দীতে ইতালিতে রেনেসাঁস বা নবজাগরণের সূত্রপাত ঘটে। পরবর্তী কয়েক শতাব্দী জুড়ে রেনেসাঁসের ঢেউ আছড়ে পড়ে ইউরোপের অন্যান্য দেশেও। রেনেসাঁসের বহুমাত্রিক ইতিবাচকতা থাকলেও যেটি মূল বৈশিষ্ট্য হিসেবে রেনেসাঁসকে চিহ্নিত করে সেটি হলো মানবমুখিনতা বা মানবকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। এর আগে ধর্মীয় সংস্কার, দৈব বা অলৌকিকের ওপর ভিত্তি করে মানুষের চিন্তাজগৎ আবর্তিত হতো। রেনেসাঁসের আলো সেই বদ্ধ দুয়ারে…
-

রবীন্দ্র-ভাবনায় জনস্বাস্থ্য
জীবনের শেষ বছর অর্থাৎ ১৯৪১ সালে শান্তিনিকেতনে বসে রবীন্দ্রনাথ ‘জন্মদিনে’ নামক অসামান্য কবিতাটি রচনা করেন। বিপুলা পৃথিবীর কতটুকুই বা জানেন তিনি, এই আক্ষেপ ব্যক্ত করার পর কবি ঘোষণা করেন, ‘আমি পৃথিবীর কবি, যেথা তার যত উঠে ধ্বনি/ আমার বাঁশির সুরে সাড়া তার জাগিবে তখনি’। সমগ্র জীবনের বিস্ময়কর সাহিত্যসাধনায় রবীন্দ্রনাথ এই ঘোষণার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। জীবদ্দশায় ম্যালেরিয়া,…
