জলচিকিৎসা

তিপান্নতে পৌঁছে হাকিম আব্দুল্লাহর মনে হলো, শরীরটা যেন আর তার দখলে নেই, কথায় কথায় বিদ্রোহ করে। কাজের মাঝখানে অবসাদ উঁকি দেয়, অকারণ বিষণ্নতা মন দখলে নেয়। আরো বিপদ, তার শরীরে দেখা দিচ্ছে জইফ হওয়ার কিছু লক্ষণ। যেমন, তার স্মৃতিরা এখন যেন তিলনা বিলের বাইন মাছ, ধরা দিতে দিতে দেয় না, তার পেটে কিছুই যেন হজম হয় না, শুধু কারখানার শক্তিতে বায়ু উৎপাদন করে যায়। তার পায়ে ক্লান্তি, তারপরও তারা তাকে বাজারহাটে নিয়ে যায়, অফিসে পৌঁছে দেয়। অফিস শেষে মা, না মেয়ে, কাকে দেখতে হাসপাতালে যাবেন এবং গেলে কোন হাসপাতালে, তার ধান্ধায় পড়ে শেষ পর্যন্ত বাড়ির পথ ধরেন। বাড়িতে মেয়েকে দেখে শর্মিন্দা হন, আবার স্বস্তিও পান, যাক মেয়ে ডেঙ্গু – নাকি ডেঙ্গি – চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল থেকে ফিরেছে। তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমার দাদি যেন কোন হাসপাতালে, মা?’ মেয়ে বলে, ‘উইকেয়ারে, দুদিন আগে যদিও গুডহেলথে ছিলেন। তবে সুসংবাদ, দাদি কাল রিলিজ পাচ্ছেন, এবং তাকে বাড়ি নিতে হামীম চাচা এসেছেন। তোমার হাসপাতালের ক্ষেপ শেষ।’ হাকিমের ভুলোমনা ভাবটা দিনে দিনে বাড়ছে, তা নিয়ে মেয়ের উদ্বেগ, তবে তার

মাথা-চিকিৎসাটা যে জরুরি, সে-কথা আর বলে না, মায়ের জন্য তুলে রাখে। মা তার ওটিটির সিনেমা-গলায় কথাটা বলে হাকিমের গায়ে ফোস্কা তুলবেন।

হাকিম টের পান তার দুই চোখও এখন আধা-জইফ। মাঝে মাঝেই তিনি সামনাটা ঝাপসা দেখেন। এ বড় অন্যায়, তিনি নিজেকে বলেন। চোখ গেলে মানুষের কী থাকে? তার সন্দেহ হয়, জগৎ যেন তাকে বলছে, হাকিম আব্দুল্লাহকে দেখানোর মতো আর এমন কি আছে যে তার চোখ দুটিকে জ্যোতিষ্মান রাখতে হবে। মুশকিল হলো, হাকিমের চোখ যত ঘোলাটে হচ্ছে, তার স্মৃতিরাও তত অস্পষ্ট হচ্ছে।

দিনের শুরুটা মন্দ হয় না হাকিমের। অফিসে গেলে রিসেপশনিস্ট অধরা তাকে একটা চওড়া হাসি উপহার দিয়ে বলে, ‘স্যার আইসা পড়ছেন!’ বেচারা অধরা। তার প্লাস্টিকের হাসিটা যে সকলের জন্য, এবং এটি যে তার চাকরি ধরে রাখার একটা উপায়, হাকিম তা বোঝেন। তবে হাসি তো হাসিই। তাছাড়া, কোনো কোনো দিন, আকাশটা যখন ছেয়ে থাকে তিলনা বিলের গভীর কালোয়, এই হাসি তাকে আরেক অধরার কাছে নিয়ে যায়, যে কিনা আঠারোতে এসে নাই হয়ে গেল। তিলনা বিল সেই নাই হয়ে যাওয়ার সাক্ষী, নাকি তামিলদার! এখন অধরা শুধু মাঝে মাঝে স্মৃতির গলিতে ধূসর ছায়া ফেলে হাঁটে।

বাবাকে নিশ্চুপ দেখে মেয়ে দয়াশীল হয়, বলে, ‘তোমার হাঁটুর লিগামেন্ট ছিঁড়ল। তুমি এখন পা টেনে হাঁটো। মা তোমাকে মরিচ বাটা দিয়ে কদিন শুঁটকির কী একটা হরিবল আইটেম খাওয়ালো। তোমার আলসার হলো। ক্ষুধামান্দ্য হলো। এখন তোমার চোখের গোলমাল। আমি চাই না তোমার চোখ খুঁড়িয়ে দেখুক। তোমার চোখের ক্ষুধামান্দ্য হোক। তোমাকে ডাক্তার দেখাবো।’

হাকিম হাসলেন। হাসারই কথা। জগৎ তাকে জানান দিয়েছে, মেয়ে সেটা আঁচ করে তার একটা জবাব দিচ্ছে। জগতের কথা আলাদা, কিন্তু এই দেশটায় কী এমন দেখার আছে যে, চোখ দুটাকে শান দিয়ে রাখতে হবে? মেয়েকে বললেন, ‘কত মানুষ তো চোখ ছাড়াই বাঁচে, বাঁচে না?’

মেয়ে, যার নাম অপরাজিতা, আহত চোখে তাকায়। তার চোখে ভাসে স্কুল বেলার এক ছবি। ছুটিতে তারা বাড়ি গেছে, তিলনা বিলের ঘ্রাণ মাখা গোমুন্ডি গ্রামে। বিলে ছায়া ফেলেছে হিজল-বরুণ-করচ গাছ, সেই ছায়ায় ফুটেছে শালুক আর পদ্ম। বাবা তাকে বলছেন, ‘দুচোখ ভরে বিলের শোভা দেখো।’ তাকে কাঁধে ফেলে তিনি শাপলা তুলছেন, তার চুলে শাপলা গেঁথে বলছেন, ‘মেয়ে আমার রাণী বিক্তোরিয়া। এই তার টায়ারা।’

অপরাজিতার ফোন বাজল। ফোনে ভেজা চোখ রাখতেই তা শুকালো। সে আড়ালে গেল।

দুই

মাঝরাতে ঘুম ভাঙলে হাকিমের মনে হলো, এই সময় তিলনা বিলে মাছ উজায়। মশাল জেলে সেই উজানো মাছ মারা হয়। সব মাছ অবশ্য আলো পছন্দ করে না। যারা করে, কেন করে, হাকিম তা ভেবে পান না। তাদের কি তিলনার গভীরের অন্ধকার দেখে দেখে ক্লান্ত? নাকি তারা আলোতে অপার্থিব কিছু দেখে? কেন, অধরার কাছে এই অন্ধকারই তো ছিল আলো!

হাকিমের পাশে শুয়ে স্ত্রী তসলিমা। তার ওটিটি গলা এখন শান্ত। তিনি ঘুমাচ্ছেন। তার সিøপ আপনিয়া। নিয়ন্ত্রণে থাকলে ঠিক, না থাকলে ভয়াবহ। মানুষটার জন্য হাকিমের মায়া। অসুখটা তাকে নানান কষ্ট দিচ্ছে। হাসিখুশি মানুষটার গলায় অকারণ রাগ ঢেলেছে। তার বই পড়ার আনন্দ ওটিটি আর নেটফ্লিক্সে চালান করেছে। ছ-মাস আগে তার আপনিয়া নিরসনে হাকিম একটা মেশিন কিনে এনেছেন। এতে তসলিমা সুফল পাচ্ছেন। তার নাক ডাকা কমেছে, ডাকলেও তা কোমল আর সুরেলা। শুরুটা ধীর লয়ে, তারপর

আরোহণ-পালা। আরোহণ শৃঙ্গে চড়লে তা পা রাখে তার যৌবনে ইতালির ফ্লোরেন্সে শোনা এক ধ্রুপদ সংগীত পরিবেশনার ক্রিসেন্দা মুহূর্তে। হাকিমের মনে পড়ে, তিলনা বিলে রাতের হাওয়াও সুরেলা শব্দ তোলে। অধরা বলেছিল, হাওয়ার শব্দে তিলনা তাকে গল্প শোনায়। কিসের গল্প? না, এ প্রশ্নের উত্তর আর পাওয়া হয়নি। তার আগেই অধরার গল্প শেষ।

তিলনা গভীর বিল। কিন্তু তার শরীর ধার ধার। সেই শরীরে ঢেউ তুলে সে ফিসফাস করে। অধরা বলত, আকাশকে ডাকে। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে – অবাক! – আকাশটাও কোনো কোনো রাতে নিচে নামত।

কে না ক্রিসেন্দো চায়!

তসলিমার ঘুম ভাঙ্গে। তার শরীরে হাকিমের হাত। কেন? ‘হাত সরাও’, তিনি বলেন। তারপর ‘ধুর, ঘুমটা গেল’ বলে ফের নিদ্রাদেবীর তালাশে যান।

হাকিমের অবাক লাগে। তসলিমার অনিয়মিত হওয়া

নাক-ডাকা শীর্ষে পৌঁছালে তারও কেন

ক্রিসেন্দো-ক্রিসেন্দো ভাব হয়? কচ্ছপের মতো গলা বাড়িয়ে তার পৌরুষ একটা কিছু ঘোষণা দেয়। ঘোষণাটা তসলিমার কানে পৌঁছানোর কথা না। তছাড়া, ঘোষণাটা কি, তিনিই তো ঠিক ধরতে পারেন না।

তিন

সকালে মেয়ের সঙ্গে নেত্রক্লিনিকে রওনা হয়ে হাকিম দেখলেন, আকাশটা ঘোলাটে। শহরটা অনেক ঋতু থেকেই চিরস্থায়ী ঘোলাটে। ‘এই শহরের এয়ার কোয়ালিটি যাচ্ছেতাই’, তিনি মেয়েকে বললেন, ‘কোয়ালিটি কথাটাই তো এই কোয়ান্টিটির শহরের জন্য একটা মস্করা।’

মেয়ে হাসল। ‘গোমুন্ডির এয়ার কোয়ালিটি আইসল্যান্ডের মতো। যাবে?’ সে বাবাকে বলে। তার চোখে ভিড় করে তিলনার পদ্ম-শালুকের ছবি। হাকিম কোনো উত্তর দেওয়ার আগে অপরাজিতার ফোন বাজে। ‘হ্যাঁ, জান,’ সে বলে, এবং হাকিম কান সরিয়ে নেন। কান বন্ধ করেও অবশ্য তিনি শোনেন ‘ইয়ামাহা’, ‘মাওয়া’, এবং মেয়ের কথাগুলি ডিকোড করার চেষ্টা করেন। তার মনটা ভারী হয়। ডিকোড করার মতো কোনো কথা তসলিমা কি তাকে অনেকদিন বলেছেন?

অথবা তিনি তসলিমাকে?’

নেত্রক্লিনিকে প্রচুর ভিড়। মেয়ে বলল, ‘শহরের মানুষের চোখ-খারাপটা এক্সপোনেনশিয়ালি বেড়েছে।’ এটা হাকিমেরও কথা। তাকে মিডিয়া বলেছে, এটা এখন বড়সড় এক হেলথ অ্যান্ড ওয়েলবিইং ইস্যু। তার নিজেরও মনে হয়েছে, মানুষের চোখ এখন খসখসে শুকনো, যেন চোষ কাগজ।

নেত্রক্লিনিকের নেত্রবিদ, নার্স, টেকনিশিয়ান, মাছি, টিকটিকি – সবাই ব্যস্ত। পঁয়তাল্লিশ মিনিট বসে থেকে এক ব্যস্ত নেত্রবিদকে দেখা গেলে অপরাজিতা জিজ্ঞেস করল, ‘আর কতক্ষণ, স্যার?’ অপরাজিতা কেন সময়ের হিসাব করছে, নেত্রবিদ তার কি জানেন? তিনি বললেন, ‘সময়ের মালিক আমি না। বসেন।’

রোগীদের মধ্যে আলাপ হয়। নষ্ট শহরে নষ্ট সময় পার করার উত্তম উপায় রাগী আলাপ। হাকিম শোনেন : দেশটা আন্ধা। রাজনীতি আন্ধা। সরকারের চোখ নাই।

আর আপ্নেই শুধু চক্ষুষ্মান!

নাহ্, দেশটা এখন নুলা। সিস্টেম খারাপ। সিস্টেমের ফেকো সার্জারি দরকার।

স্বপ্ন দেখেন, ম্বপ্ন দেখতে চৌখ লাগে না।

আমার ছেলেটা মাওয়া গেল, আর ফিরল না।

নেত্রক্লিনিকের বাতাসটা কিছুক্ষণের জন্য ভারী হয়। হাকিম শুনলেন, আমার চোখটা ফেরত চাই। ছেলেটার ছবিতে চোখ রেখে না ফেরার দেশে চলে যেতে চাই।

আপা, আমরা সবাই না ফেরার দেশে আছি।

ব্যস্ত নার্স ঘোষণা করলেন, ‘যাদের সিরিয়াল পঁচিশের পর, বিকাল চারটায় আসবেন।’

অপরাজিতা উত্তেজিত হলো। হাকিম তাকে শান্ত করলেন, বললেন, ‘ওদের কি দোষ, মা, রোগী যেমন বাড়ছে। কাগজে পড়লাম, আরো বাড়বে। এক নেত্র-মনস্তত্ত্ববিদ লিখেছেন, চোখে যত বাঁকা আলো পড়বে, তত। আমি বরং বাসায় যাই। তুমি যাও মাওয়ায়। তোমার জান নতুন বাইক কিনেছে কিনা।’

মেয়ে হতচকিত হলো। রাগ করতে গিয়েও পারল না। সে দেখল, তার অপেক্ষা না করে বাবা বেরিয়ে গেলেন। তিনি কি পা টেনে হাঁটছেন, নাকি পা তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে?

বোঝা গেল না।

রাস্তায় বেরিয়ে অপরাজিতা দেখল, আকাশটা আরো ঘোলাটে আর কালো। মেঘের ওজনে ভারী। বৃষ্টি নামবে। শিট! মাওয়া-ভ্রমণের তাহলে কী হবে?

চার

সম্ভব-অসম্ভবের ওপার থেকে তিলনা বিল হাকিমকে বলল, আমি এখন তোমার শহরের উপর উপুড় হচ্ছি। তুমি কি আছ?

আছি, হাকিম বললেন।

এই শহরের জলচিকিৎসা দরকার। চিকিৎসাটা শুরু করতে হয়।

জলচিকিৎসা আবার কী? হাকিম জিজ্ঞেস করলেন।

আকাশে মেঘেরা গর্জন করছে। তার ফাঁকে হাকিম শুনলেন, তিলনা বলছে, তোমাদের শহরে চলছে ষড়ঋতুর খরা। এমন খরা, যা বর্ষণে-প্লাবনে কাটে না। কত বর্ষাই তো এলো-গেলো। শহরটা কি ভিজেছে?

না।

তাহলে?

তাহলে আবার কী? সামনের মাসে এই শহরে ক্লাইমেট সামিট হবে, হাকিম জানালেন। পুব-পশ্চিম থেকে ক্লাইমেট-মাথারা আসবে। নিশ্চয় তারা আকাশ থেকে শহর ভেজানোর জল নামাবে। সেই জলে খরা কাটবে।

মেঘের ডাকটা গভীর হলো, যেন ক্লাইমেট-মাথারা একত্র হয়ে বৃষ্টির জন্য বিলাপ করছেন। সেই বিলাপে তিলনার হাসিটা চাপা পড়ে গেল, অন্তত হাকিমের সেরকম মনে হলো।

জলচিকিৎসা কি তাহলে শহরটাকে সত্যিই ভেজাবে? হাকিম জানতে চাইলেন।

তিলনা কোনো উত্তর দিলো না, শুধু ফিসফাস কিছু গল্প শুরু করল। এ এক অবাক গল্প বলা! সারা শহরের মানুষ যে যেখানে ছিল, দাঁড়িয়ে গেল। রাস্তার লম্বালম্বি, আড়াআড়ি যত ট্রাক-বাস-অটো-লেগুনা-রিকশা চলছিল, সব থেমে গেল। থলে হাতে, ছুরি-ডান্ডা হাতে, ফাইল-মোবাইল-লোটা-কম্বল-হাতে মানুষগুলি আকাশে চোখ মেলে সেই গল্প শুনতে থাকলো। হঠাৎ দেখলে মনে হবে, যেন আকাশ ছাপিয়ে কোনো ঘোষণা এসেছে, মানুষকে কিছুক্ষণ নীরব থাকতে হবে। বিরাট কারো মৃত্যুযাপনের জন্য যেমনটা করতে হয়।

মেঘ গলে বৃষ্টি নামল, কিন্তু মানুষ দাঁড়িয়েই থাকল। অপরাজিতাও? তার পাশে একটা ইয়ামাহা। সেটিও আকাশে তাকিয়ে ভিজছে।

হাকিমের মনে হলো, ভুল শহরের ভুল মানুষেরা গল্পগুলি শুনছে, এত আয়োজনের মেঘ-ডাকার পর নামা বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে। তাদের চোখ কি ভিজছে? তিনি জানেন, এই ফিসফাস গল্প সারাদিন সারা সপ্তা মিডিয়ার খাদ্য হবে। নানা মতের হামানদিস্তায় এগুলি পিষা হবে। দলাদলিতে শতভাগ হবে। গলাবাজিতে জবাই হবে। গল্পগুলি নিয়ে মজুদদারি হবে। পাচার-লোপাট। কালোবাজারি। আইন-আদালত। খুনাখুনি।

ঘোড়ার ডিম জলচিকিৎসা, তিনি তিলনাকে বললেন, তুমি বরং গোমুন্ডিতেই ফিরে যাও। আর তুমি যদি চাও, আমিও আসতে পারি।