মাহমুদুল হোসেন
-

আধুনিকতার দিকে স্বদেশের যাত্রায় – চলচ্চিত্রজন হায়দার রিজভী ও জাহিদুর রহিম অঞ্জন
শুরুর কথা হায়দার রিজভী ও জাহিদুর রহিম অঞ্জন চলচ্চিত্রজন। কিন্তু এই পরিচয়টি যেন যথেষ্ট নয় – যেন একই সঙ্গে আরেকটি কথা তাঁদের সম্পর্কে লিখে ফেলতে হয় যে, তাঁরা আধুনিক মানুষ। লিখে ফেলার পর একরকমের কৈফিয়ত তলবের ব্যাপার তৈরি হয় নিজের মধ্যেই যে – কী এই পরিচিতির সূত্র, কীভাবে এর নির্মাণ? বিশেষ করে, এইসব দেশে, যারা উপনিবেশোত্তর, তাদের জন্য আধুনিকতার প্রসঙ্গটি বড় গোলমেলে। তাদের বিকাশ, অর্থনীতি, রাজনীতি বা সংস্কৃতি কীসে হয় আধুনিক? কোথায় তারা আলাদা উন্নত পৃথিবীর বা উপনিবেশকদের আধুনিকতা থেকে? অথবা আরো এগিয়ে, আধুনিকতা কি আদৌ প্রাসঙ্গিক এই তৃতীয় দুনিয়ার মানুষ আর তাদের সমাজে, রাষ্ট্রে? – এসব তর্ক আমাদের মধ্যে বেড়ে ওঠে। তারা ভ্রান্তি, বিভ্রান্তি এবং নানারকম প্যারাডক্সের জন্ম দেয়। কিন্তু আধুনিকতাকে ঘিরে চর্চাটি থামে না, সেটা জারি থাকে। আমাদের জন্য এরকম একটি বিবেচনাই যথেষ্ট যে, আধুনিকতা কিছু বিশেষ ঐতিহাসিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, প্রযুক্তিগত অবস্থাকে নির্দেশ করতে পারে। ঐতিহাসিকভাবে ঐতিহ্য এবং সনাতন পন্থাকে প্রত্যাখ্যান করে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, স্বাধীনতা, যৌক্তিকতায় বিশ্বাস স্থাপন, সামন্ততন্ত্র থেকে পুঁজিবাদের দিকে যাত্রা, শিল্পায়ন, ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ গঠন, নগরায়ণ, জাতি-রাষ্ট্রের সৃষ্টি – এসব কিছুকে আধুনিকতার চিহ্ন হিসেবে গ্রহণ করা যায়। এই আধুনিকতার যাত্রা শুরু ষোড়শ শতাব্দী থেকে – ইউরোপে। তারপর তাদের উপনিবেশ স্থাপনের প্রক্রিয়ায় আধুনিকতার প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশ ও বিস্তার উপনিবেশসমূহে। তবে বলে রাখা ভালো, পশ্চিমের দেশ নয় এবং উপনিবেশায়ন ঘটেনি এমন দেশেও আধুনিকতা বিস্তৃত হয়েছে। যেমন জাপান ও রাশিয়া। উপনিবেশসমূহ নানাভাবে আধুনিকতার ধারণাটিকে আত্মস্থ ও মোকাবিলা করেছে। বি-উপনিবেশায়নের প্রক্রিয়ায় সেখানে আধুনিকতার নতুন নতুন সংস্করণের আবির্ভাব ঘটেছে। রাষ্ট্রগঠনের নায়কেরা নানা কার্যক্রম গ্রহণ করেছেন, সমাজ সংস্কারক এবং সংস্কৃতির কারিগরেরা নিজস্ব ঐতিহ্য এবং পাশ্চাত্যের আধুনিকতার সমন্বয়ে আধুনিকতার এক স্থানীয় এবং সমকালীন রূপ নির্মাণ করেছেন। কোথাও কোথাও তারা পরিচিতি পেয়েছে প্রাসঙ্গিক আধুনিকতা বা কনটেক্সচুয়াল মডার্নিটি নামে। আমাদের আলোচ্য দুজন মানুষ – হায়দার রিজভী ও জাহিদুর রহিম অঞ্জন এমনি এক উপনিবেশোত্তর সময়ের এবং রাষ্ট্রের নাগরিক। এই ভৌগোলিক অঞ্চলে গত শতকের চল্লিশের দশকের শেষে উপনিবেশের হাতবদলের প্রক্রিয়ায় একটি নতুন যাত্রা শুরু হয় রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের সকল ক্ষেত্রে। এই সময়কালের সামগ্রিক প্রবাহ তাঁদের হয়ে ওঠাকে এবং তাঁদের কর্মতৎপরতাকে প্রভাবিত করেছে; করে তাঁদের আধুনিকতার কারিগরে পরিণত করেছে – এই আমাদের প্রস্তাব। এদেশে আধুনিকতার যাত্রা পাকিস্তান সৃষ্টি পূর্ববঙ্গে বি-উপনিবেশায়ন ঘটায়নি; রাষ্ট্রযন্ত্রও আধুনিক হয়ে ওঠেনি। কিন্তু পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার পরিধিরেখায় অবস্থিত রাষ্ট্র হিসেবে তার এক ধরনের অর্থনৈতিক আধুনিকায়ন শুরু হয়েছিল; পণ্যপ্রধান অর্থনীতির স্বাদ এই জনপদের মানুষ পেতে শুরু করেছিল। এই আধুনিকায়ন পশ্চিমের প্রযুক্তি এবং তজ্জনিত পণ্যের ব্যবহারকারীতে পরিণত করেছিল এখানকার মানুষকে, তার ভেতর শিক্ষাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। আর ভাষা-আন্দোলন এখানকার সাংস্কৃতিক আধুনিকতার সূত্রপাত ঘটিয়েছিল সেই ১৯৪৮-এ। ১৯৫২-তে তার পরিণতি। তবে ইতিহাসের যথার্থতা প্রতিষ্ঠিত রাখার লক্ষ্যে লিখে রাখা ভালো যে, বিশ শতকের বিশ এবং ত্রিশের দশকেই বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন গড়ে উঠেছিল ঢাকাতে। ভাষা-আন্দোলনকে তারই যৌক্তিক প্রসারণ হিসেবে ভাবা যেতে পারে। ভাষা-আন্দোলনের সূত্র ধরে মানুষ সচেতন হয়েছিল স্থানীয় কৃষ্টির বিষয়ে। আর নব্য লভিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা,…
