শুরুর কথা
হায়দার রিজভী ও জাহিদুর রহিম অঞ্জন চলচ্চিত্রজন। কিন্তু এই পরিচয়টি যেন যথেষ্ট নয় – যেন একই সঙ্গে আরেকটি কথা তাঁদের সম্পর্কে লিখে ফেলতে হয় যে, তাঁরা আধুনিক মানুষ। লিখে ফেলার পর একরকমের কৈফিয়ত তলবের ব্যাপার তৈরি হয় নিজের মধ্যেই যে – কী এই পরিচিতির সূত্র, কীভাবে এর নির্মাণ? বিশেষ করে, এইসব দেশে, যারা উপনিবেশোত্তর, তাদের জন্য আধুনিকতার প্রসঙ্গটি বড় গোলমেলে। তাদের বিকাশ, অর্থনীতি, রাজনীতি বা সংস্কৃতি কীসে হয় আধুনিক? কোথায় তারা আলাদা উন্নত পৃথিবীর বা উপনিবেশকদের আধুনিকতা থেকে? অথবা আরো এগিয়ে, আধুনিকতা কি আদৌ প্রাসঙ্গিক এই তৃতীয় দুনিয়ার মানুষ আর তাদের সমাজে, রাষ্ট্রে? – এসব তর্ক আমাদের মধ্যে বেড়ে ওঠে। তারা ভ্রান্তি, বিভ্রান্তি এবং নানারকম প্যারাডক্সের জন্ম দেয়। কিন্তু আধুনিকতাকে ঘিরে চর্চাটি থামে না, সেটা জারি থাকে।
আমাদের জন্য এরকম একটি বিবেচনাই যথেষ্ট যে, আধুনিকতা কিছু বিশেষ ঐতিহাসিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, প্রযুক্তিগত অবস্থাকে নির্দেশ করতে পারে। ঐতিহাসিকভাবে ঐতিহ্য এবং সনাতন পন্থাকে প্রত্যাখ্যান করে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, স্বাধীনতা, যৌক্তিকতায় বিশ্বাস স্থাপন, সামন্ততন্ত্র থেকে পুঁজিবাদের দিকে যাত্রা, শিল্পায়ন, ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ গঠন, নগরায়ণ, জাতি-রাষ্ট্রের সৃষ্টি – এসব কিছুকে আধুনিকতার চিহ্ন হিসেবে গ্রহণ করা যায়। এই আধুনিকতার যাত্রা শুরু ষোড়শ শতাব্দী থেকে – ইউরোপে। তারপর তাদের উপনিবেশ স্থাপনের প্রক্রিয়ায় আধুনিকতার প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশ ও বিস্তার উপনিবেশসমূহে। তবে বলে রাখা ভালো, পশ্চিমের দেশ নয় এবং উপনিবেশায়ন ঘটেনি এমন দেশেও আধুনিকতা বিস্তৃত হয়েছে। যেমন জাপান ও রাশিয়া।
উপনিবেশসমূহ নানাভাবে আধুনিকতার ধারণাটিকে আত্মস্থ ও মোকাবিলা করেছে। বি-উপনিবেশায়নের প্রক্রিয়ায় সেখানে আধুনিকতার নতুন নতুন সংস্করণের আবির্ভাব ঘটেছে। রাষ্ট্রগঠনের নায়কেরা নানা কার্যক্রম গ্রহণ করেছেন, সমাজ সংস্কারক এবং সংস্কৃতির কারিগরেরা নিজস্ব ঐতিহ্য এবং পাশ্চাত্যের আধুনিকতার সমন্বয়ে আধুনিকতার এক স্থানীয় এবং সমকালীন রূপ নির্মাণ করেছেন। কোথাও কোথাও তারা পরিচিতি পেয়েছে প্রাসঙ্গিক আধুনিকতা বা কনটেক্সচুয়াল মডার্নিটি নামে।
আমাদের আলোচ্য দুজন মানুষ – হায়দার রিজভী ও জাহিদুর রহিম অঞ্জন এমনি এক উপনিবেশোত্তর সময়ের এবং রাষ্ট্রের নাগরিক। এই ভৌগোলিক অঞ্চলে গত শতকের চল্লিশের দশকের শেষে উপনিবেশের হাতবদলের প্রক্রিয়ায় একটি নতুন যাত্রা শুরু হয় রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের সকল ক্ষেত্রে। এই সময়কালের সামগ্রিক প্রবাহ তাঁদের হয়ে ওঠাকে এবং তাঁদের কর্মতৎপরতাকে প্রভাবিত করেছে; করে তাঁদের আধুনিকতার কারিগরে পরিণত করেছে – এই আমাদের প্রস্তাব।
এদেশে আধুনিকতার যাত্রা
পাকিস্তান সৃষ্টি পূর্ববঙ্গে বি-উপনিবেশায়ন ঘটায়নি; রাষ্ট্রযন্ত্রও আধুনিক হয়ে ওঠেনি। কিন্তু পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার পরিধিরেখায় অবস্থিত রাষ্ট্র হিসেবে তার এক ধরনের অর্থনৈতিক আধুনিকায়ন শুরু হয়েছিল; পণ্যপ্রধান অর্থনীতির স্বাদ এই জনপদের মানুষ পেতে শুরু করেছিল। এই আধুনিকায়ন পশ্চিমের প্রযুক্তি এবং তজ্জনিত পণ্যের ব্যবহারকারীতে পরিণত করেছিল এখানকার মানুষকে, তার ভেতর শিক্ষাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। আর ভাষা-আন্দোলন এখানকার সাংস্কৃতিক আধুনিকতার সূত্রপাত ঘটিয়েছিল সেই ১৯৪৮-এ। ১৯৫২-তে তার পরিণতি। তবে ইতিহাসের যথার্থতা প্রতিষ্ঠিত রাখার লক্ষ্যে লিখে রাখা ভালো যে, বিশ শতকের বিশ এবং ত্রিশের দশকেই বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন গড়ে উঠেছিল ঢাকাতে। ভাষা-আন্দোলনকে তারই যৌক্তিক প্রসারণ হিসেবে ভাবা যেতে পারে।
ভাষা-আন্দোলনের সূত্র ধরে মানুষ সচেতন হয়েছিল স্থানীয় কৃষ্টির বিষয়ে। আর নব্য লভিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, ভ্রমণের সুযোগ, একটি পর্যায় পর্যন্ত আদান-প্রদান ইত্যাদি মিলে যে প্রাসঙ্গিক আধুনিকতার কথা লিখেছি আমরা আগে, তার স্পর্শ পেতে শুরু করেছিল এই ভূখণ্ডের মানুষ। অন্তত নাগরিক মানুষ আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের মূলধারাটি খুঁজে পেয়েছিল সংস্কৃতির মাঝেই। আর একই সঙ্গে বিশ্বমানবের সংবেদগুলোর সঙ্গে মিলবার আকাক্সক্ষাও জাগ্রত হয়েছিল তার মনে। তাই দেখি যে, একে একে সব প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি হয়েছিল অথবা কর্মকাণ্ডগুলি ঘটেছিল, যারা এই জনপদের মানুষের স্বদেশ অন্বেষণ এবং আধুনিক মানুষ হয়ে ওঠার সাধনাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। ১৯৫৫ সালে গড়ে উঠেছিল বুলবুল ললিতকলা একাডেমি, ১৯৬১-তে পালিত হয়েছিল রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ, ছায়ানট প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৬৩-তে। নাগরিক বিদগ্ধতার স্বরূপ তুলে ধরেছিল ড্রামা সার্কেলের মতো নাট্যগোষ্ঠী; সেটা সেই ১৯৫৬-এর কথা। তারপর ’৬৮-তে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের যাত্রা শুরু। স্বাধীনতার পর গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের প্রসার। ওদিকে ১৯৬৩ সালেই সৃষ্টি হয়েছিল পাকিস্তান ফিল্ম সোসাইটি; ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনের শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছিল স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই; যা গত শতাব্দীর আশির দশকে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে আধুনিকতার একটি মাত্রাকে স্পর্শ করায় উদ্যোগী হয়েছিল। আর ১৯৬৪ সালে যাত্রা করেছিল পাকিস্তান টেলিভিশনের ঢাকা কেন্দ্র। এই রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত প্রচারমাধ্যমটির শুরুতেই দখল নিয়েছিলেন রুচিশীল, শিল্পমনস্ক বাঙালিরা। সাংস্কৃতিক আধুনিকতার দিকে এই যে যাত্রা তা ক্ষান্তিহীন চলেছিল গত শতকের আটের দশক পর্যন্ত। তারপর এসব প্রতিষ্ঠান হয়তো টিকে রয়েছে; কিন্তু তারা আর সমাজের সাংস্কৃতিক আধুনিকতা নির্মাণের মূল নিয়ামক নয়; তাদের কেউ কেউ হারিয়েছে সেই শক্তি। আবার তর্ক করা যাবে, তখন থেকে আধুনিকতার যাত্রা বিশ্বজুড়েই আর নিরবচ্ছিন্ন, একশৈলিক কোনো প্রক্রিয়া নয়। কিন্তু সেই আলোচনা এখানে আজ নয়।
তাঁদের হয়ে ওঠা
বরং, আমাদের বলার আসল কথাটি এই যে, হায়দার রিজভী এবং জাহিদুর রহিম অঞ্জন আধুনিকতার দিকে এই জনপদের নাগরিক মানুষের যে-যাত্রা তারই সহযাত্রী; এই প্রক্রিয়াতেই সৃজিত তাঁদের সাংস্কৃতিক রুচি এবং তাঁদের কর্মকাণ্ডে এই সংশ্লিষ্টতার ছাপ স্পষ্ট।
হায়দার রিজভীর বাবা তাঁকে বিলেত পাঠিয়েছিলেন বাণিজ্য বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষালাভের জন্য। কিন্তু হায়দার রিজভী মঞ্চনাটকের শিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা লাভ করে দেশে ফিরে এসেছিলেন। এসেই যোগ দিয়েছিলেন টেলিভিশনে। সেখানে এমনসব ব্যক্তির সান্নিধ্যে এসেছিলেন যে, তিনি একজন পারদর্শী টেলিভিশন প্রযোজকেই পরিণত হলেন না; চলচ্চিত্র হয়ে উঠল তাঁর একটি প্রধান ভালোবাসা। আবার দেখি যে, টেলিভিশনেরই আবদুল্লাহ আল মামুনের হাত ধরে ঢুকে পড়েছিলেন গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনে – নাট্যদল থিয়েটারে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের কালে দারুণভাবে জড়িয়ে পড়েন যুদ্ধের সহযোগিতায়। তাঁর জীবন বিপন্ন হয়েছিল সে-কাজে এবং প্রায় অলৌকিকভাবে রক্ষা পেয়েছিলেন তিনি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি ভাষাভিত্তিক, ধর্মনিরপেক্ষ আধুনিক রাষ্ট্র নির্মাণের সংগ্রাম। এরপর হায়দার রিজভী চলচ্চিত্র বিষয়ে অধ্যয়নের জন্য পৃথিবীর সেরা ফিল্ম স্কুলগুলোর ভেতর একটি – পোল্যান্ডের েলাড্জ্ ফিল্ম স্কুলে চলে গিয়েছিলেন। এখানে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক হয়ে শিল্প-চলচ্চিত্রের বৈশ্বিক ভাষার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন তিনি। আর যা ঘটেছিল তাঁর বিভিন্ন সময়ে ইউরোপবাসের সুযোগে তা হলো, তিনি বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সঙ্গে কাজ করার বা তাঁদের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পেয়েছিলেন। তাঁদের কাজের পদ্ধতি এবং তাঁদের চলচ্চিত্র-দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হয়ে একজন আধুনিক চলচ্চিত্রমনস্ক মানুষে পরিণত হয়েছিলেন হায়দার রিজভী।
অন্যদিকে, জাহিদুর রহিম অঞ্জন জন্মগ্রহণ করেছিলেন এমন একটি পরিবারে, যেটি সেই ভাষা-আন্দোলনের সময় থেকেই সাংস্কৃতিক সংগ্রামে যুক্ত ছিল। তাঁর পিতা মীজানুর রহিম একজন ভাষাসৈনিক। রাজনীতিতে বাম ঘরানায় বিশ^াসী এই মানুষটি সমমনা মানুষের সঙ্গে মিলে খুলনায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জোয়ার সৃষ্টি করেছিলেন। পত্রিকা প্রকাশ, গণসংগীতসহ অন্যান্য গানের দল ও স্কুল গঠন, নাটকের আয়োজন, শিশুদের জন্য ছবি আঁকার প্রতিযোগিতা ও অন্যান্য কার্যক্রম তাঁরা গ্রহণ করেছিলেন। আসলে সাংস্কৃতিক আধুনিকতার যে-কথা আমরা লিখেছি আগেই তার একেবারে মধ্যমণি হয়ে ছিলেন তাঁরা। অঞ্জনের শৈশব, কৈশোর এরকম পরিবেশে কেটেছে এবং আমরা জেনেছি যে, তিনি কবিতা আবৃত্তি, ছবি আঁকা এবং সেতার বাজানোর মতো বিষয়গুলো নিজের করে নিয়েছিলেন। পরে, আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি ভারতের পুনা ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে চলে যান এবং চলচ্চিত্র পরিচালনা বিষয়ে শিক্ষণ লাভ করে ফিরে আসেন। এর আগে তিনি ঢাকায় যুক্ত হয়েছিলেন ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনে।
লক্ষ করি যে, রিজভী এবং অঞ্জন দুজনেই সাংস্কৃতিক যুক্ততার একটি পর্যায়ে বিদেশে নামকরা ফিল্ম স্কুলে পাঠগ্রহণ করতে গিয়েছেন। আসলে ব্যাপারটি কাকতালীয় নয়। চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের এক দশকের কাজের ভেতর দিয়ে স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে সে-সময়কার তরুণ চলচ্চিত্রকর্মীরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, শিল্পমাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রকে সম্পূর্ণ আত্মস্থ করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজন আছে। বিশেষ করে চলচ্চিত্রকে আধুনিক মানুষের সংবেদনশীলতা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে পেতে চাইলে তার ভাষার নিবিড় পাঠ, তার ইতিহাস এবং কারিগরি কৌশল যথাযথ পাঠক্রমের ভেতর দিয়ে শেখা প্রয়োজন। এই অনুধাবন থেকেই তরুণেরা চাইছিলেন বিদেশে ভালো ফিল্ম স্কুলে পড়াশোনা করার সুযোগ। এরই ধারাবাহিকতায় সত্তর দশক থেকে চলচ্চিত্রকর্মীরা ভারতের পুনায় এবং পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন ফিল্ম স্কুলে যাওয়া শুরু করেন। রিজভী সত্তর দশকেই আর অঞ্জন আশির দশকে এই যাত্রায় শামিল হন। তাঁরা যাঁর যাঁর বিদ্যালয় থেকে আধুনিক চলচ্চিত্র-রুচি নিয়ে ফিরে আসেন।
এ-পর্যায়ে রিজভী আর অঞ্জনের কাজ নিয়ে লেখার আগে আমরা চলচ্চিত্রের আধুনিকতা বা আরো একটু পিছিয়ে শিল্পের আধুনিকতার ধারণাটিকে পরিষ্কার করে নিতে চাই।
শিল্প – বিশেষত চলচ্চিত্রের আধুনিকতা শিল্পের আধুনিকতাকে চিহ্নিত করতে গিয়ে শিল্প-সমালোচক হার্বার্ট রিডের শরণাপন্ন হই। তিনি লিখেছিলেন আধুনিক শিল্প হচ্ছে, ‘Art that appeals to rational sensibility’ (রিড, ১৯৩১/ ১৯৭২)। রিড শিল্পের বিবেচনায় কার্ল ইউং এবং ফ্রয়েডের মনোবিশ্লেষণের তত্ত্ব দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত ছিলেন এবং শিল্প-প্রকরণকে তিনি দুটি মেরুতে বিবেচনার প্রস্তাব করেছিলেন। এর একদিকে আছে যৌক্তিক এবং বৌদ্ধিক চেতনা থেকে সৃষ্ট শিল্প; অন্যদিকে আছে আবেগায়িত এবং অভিব্যক্তিবাদী শিল্প। তিনি দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন যে, যৌক্তিক সংবেদন শৃঙ্খলা, জ্যামিতি, বিমূর্ততা এবং ধ্রুপদী রুচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। আর এসবই আধুনিকতার ধারণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুণ এবং পদ। অন্য আরেক সমালোচক আরো মূর্ত এবং বিস্তৃত সংজ্ঞায় বলছেন, ‘… The roots of modernism lie in about the middle of the nineteenth century, in Baudelaire’s (Les Fleur Du Mal) art criticism, in Gustave Courbet and Realism. in depiction of ‘modernity’, i.e. the contemporary life, of the fragmentary, in the challenge to established art institutions and canons, in turning against the distinction between ‘high’ and ‘low’ art, in identifying an affinity with contemporary militant politics and in inventing the notion of ‘avant-garde’.’ (গে, ২০০৮ : পৃ ২৬)। অর্থাৎ, যা কিছু সমকালীন যুগযন্ত্রণাকে ধারণ করে, প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পের প্রতিষ্ঠিত নিয়মকে চ্যালেঞ্জ করে, উচ্চ এবং নিম্ন শিল্পের পার্থক্যকে মানে না; যা কিছু আভাঁ গার্দ বা নিরীক্ষামূলক এবং নতুন কিছু উদ্ভাবনে সক্ষম তা-ই আধুনিক শিল্প।
শিল্পের আধুনিকতার এই বিবেচনা থেকে আমরা এখন চলচ্চিত্রের আধুনিকতাকে বুঝতে চাইব। চলচ্চিত্র উপরিতলে প্রথম থেকেই আধুনিক। ফটোগ্রাফি এবং সিনেমা প্রযুক্তিপরায়ন শিল্প এবং যান্ত্রিক পুনরুৎপাদনের যুগের শিল্প যা উৎপাদন, ভোগ এবং সৃজনশীলতার দিক থেকে পূর্বের সকল শিল্প থেকে ভিন্ন। চলচ্ছবি শুরুতেই পেটেন্টবিষয়ক যে-জটিলতায় পড়েছিল তা আধুনিক পুঁজিবাদী সময়কেই নির্দেশ করে। লুমিয়্যর ভাইয়েরা প্রথম
যে-চলচ্চিত্র প্রদর্শন করেছিলেন তা ছিল রেলগাড়ি আর কারখানা বিষয়ে – যাঁরা ইউরোপের আধুনিকায়নের প্রধান নির্দেশক। এরপর বিংশ শতকের প্রতিটি প্রধান ঘটনায় চলচ্চিত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সেসব ঘটনায় অনুঘটক হিসেবে, তাদের প্রামাণ্যকরণে এবং তাদের নিয়ে সৃজনশীল কাহিনিচিত্র নির্মাণে চলচ্চিত্র তার ভূমিকা রেখেছে। আবার নিরীক্ষামূলক চলচ্চিত্রের এক বিশাল ভাণ্ডার তৈরি হতে শুরু করেছে সেই গত শতকের বিশের দশক থেকেই, যারা আধুনিক প্লাস্টিক শিল্প, কবিতা বা নাটকের সমান্তরালে কাজ করেছে মানুষের নতুন সংবেদ নির্মাণে ।
কিন্তু উল্টোদিকে চলচ্চিত্র এক জনসংস্কৃতি। তাকে নিয়ে মুনাফার লোভ কিছু মানুষকে ডেসপারেট করে তুলেছে প্রথম থেকেই। তাঁরা এমন জিনিসকে চলচ্চিত্রায়িত করেছেন যা ঠিক আধুনিকতার ধারণার সঙ্গে খাপ খায় না। পৃথিবীজুড়ে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে এমন অনেক ছবি নির্মিত হয় যারা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পশ্চাদপদ ধ্যান-ধারণা প্রচার করে। তারা আধুনিক মানুষের সংবেদনশীলতাকে ধারণ করতে পারে না। এসব চলচ্চিত্র কখনো অবৈজ্ঞানিক ধারণা বা কুসংস্কার প্রচার করে; কখনো ইতিহাস সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর প্রপাগান্ডা ছড়ায়; কখনো সেসব চলচ্চিত্র মিসোজিনিস্টিক। কাজেই চলচ্চিত্র মাত্রই আধুনিক শিল্প – এই ধারণা সঠিক নয়।
বিষয়বস্তুর পাশাপাশি আর যা গুরুত্বপূর্ণ তাহলো চলচ্চিত্রের ভাষা। চলমান ছবিকে চলচ্চিত্র হয়ে উঠতে গেলে, মানুষের আধুনিকতার যাত্রায় যুক্ত হতে হলে, তাকে চলচ্চিত্রের ভাষায় কথা বলতে হবে। সেই ভাষা গত ১৩০ বছর ধরে নির্মিত হয়েছে এবং হয়ে চলেছে। সেই ভাষা নির্মাণে এডউইন এস পোর্টার থেকে শুরু করে আজকের লাভ ডিয়াস বা আপচাতপং উইরাসেথাকুল পর্যন্ত পৃথিবীর সব মহান নির্মাতা এবং প্রধান চলচ্চিত্র আন্দোলনগুলি তাঁদের অবদান রেখেছেন। বিষয়বস্তু আর তার ট্রিটমেন্টে যে চলচ্চিত্র আধুনিক মানুষের সংবেদনশীলতাকে স্পর্শ করার সক্ষমতা রাখে তাকেই বলা যাবে আধুনিক চলচ্চিত্র। আসলে সেই পুরনো কথাই ফিরে আসে – যে-চলচ্চিত্র মানুষের যৌক্তিক সংবেদনশীলতাকে সন্তুষ্ট করতে পারে, সেই চলচ্চিত্রই আধুনিক। লিখে রাখি যে, সমাজ, অর্থনীতি এবং প্রযুক্তি যেমন আধুনিকতা-উত্তর সময়ে প্রবেশ করেছে, তেমনটি ঘটেছে চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও। ডিজিটাল নানা নিরীক্ষায় উত্তরাধুনিক চলচ্চিত্রের নানা লক্ষণ আমরা দেখতে পাচ্ছি গত দুই দশক ধরে। কিন্তু সে আরেক প্রসঙ্গ। আপাতত আমাদের জন্য যা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো এই কথাটি যে, চলচ্চিত্র তার এক শতকের বেশি সময়ের চর্চায় আধুনিক মানুষের জীবন, সংগ্রাম ও স্বপ্নের সমান হয়ে উঠতে চেয়েছে – নিজে আধুনিক হয়ে উঠেছে।
তাঁদের বিদ্যায়তনগুলো হায়দার রিজভী সত্তরের দশকের মাঝামাঝি এবং তার প্রায় এক দশক পরে অঞ্জন যখন পড়তে যাচ্ছেন বিদেশে ফিল্ম স্কুলে তখন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সংকটকাল। যে-আধুনিক চলচ্চিত্রকে চিহ্নিত করেছি আমরা তা এদেশে নিরুদ্দেশ। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সেই মুখ ও মুখোশের সময় থেকে হঠাৎ কখনো জহির রায়হান, কখনো আলমগীর কবির আবির্ভূত হয়েছেন এমন ছবি নিয়ে যাদের ভাষা এবং বিষয়ে আধুনিক চলচ্চিত্র হয়ে ওঠার চেষ্টা বলে মনে করা যেতে পারে। কিন্ত তার কোনো ধারাবাহিকতা নেই। অন্তত রিজভী যখন যাচ্ছেন পোল্যান্ডে তখন চলচ্চিত্র একেবারেই হয়ে উঠছে না। অঞ্জনের যাত্রাকালে সূর্য দীঘল বাড়ী, ঘুড্ডি বা এমিলের গোয়েন্দা বাহিনীর মতো ছবি আসছে ফিল্ম সোসাইটি অ্যাকটিভিস্টদের হাত ধরে। তাঁরা কেউ আবার পুনা ফিল্ম ইনস্টিটিউটের স্নাতক। কিন্তু চলচ্চিত্রের মূলধারাটি ভাষা ও বক্তব্যে পিছিয়ে অনেকখানি। এমন অবস্থায় হায়দার রিজভী গেলেন পোল্যান্ডের দ্য পোলিশ ন্যাশনাল ফিল্ম, টেলিভিশন অ্যান্ড থিয়েটার স্কুলে। শহরের নাম অনুসারে তাকে সকলে চেনে লোড্জ্ ফিল্ম স্কুল নামে। পোল্যান্ডের তখনকার প্রধানসব চলচ্চিত্র নির্মাতা এই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র। তাঁদের ভেতর আছেন আন্দ্রে ওয়াইদা, ক্রিস্তভ কিসলোভস্কি, ত্রিস্তভ জানুসি, রোমান পোলনস্কি – এঁরা সবাই। এঁদের কেউ কেউ তখন সেখানে শিক্ষকতায় নিয়োজিত। লোড্জ্ সারাবিশ্বেই ফিল্ম শেখার জায়গা হিসেবে বিখ্যাত। আমেরিকার হলিউড রিপোর্টারের এক জরিপে লোড্জ্ ফিল্ম স্কুলকে পৃথিবীর দ্বিতীয় সেরা চলচ্চিত্রের বিদ্যায়তনের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া – সংক্ষেপে পুনা ফিল্ম ইনস্টিটিউট – ততদিনে ভারতীয় চলচ্চিত্রের নব তরঙ্গের সব প্রধান ব্যক্তির শিক্ষণাগার হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে। মনি কাউল, কুমার সাহানি, জন আব্রাহাম, সৈয়দ মির্জা, গিরিশ কাসারাভাল্লি, অরবিন্দন এবং এমনি আরো বহু নির্মাতা পুনা থেকে পাশ করে বেরিয়ে সত্তর ও আশির দশকে ভারতীয় চলচ্চিত্রকে নতুন ধারার চলচ্চিত্র উপহার দিয়ে চলেছেন। ঋত্বিক ঘটক মধ্য ষাটের দশকে সেখানে তাঁদের সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। এই পুনা ফিল্ম ইনস্টিটিউটে পাঠ সমাপ্ত করে ততদিনে দেশে ফিরে এসেছিলেন সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকি, বাদল রহমান, আনোয়ার হোসেন, সাইদুল আনাম টুটুল – এমনি সব তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা ও কুশলী। প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁদের হাতে যেসব ছবি নির্মিত হচ্ছিল – যাদের কয়েকটির নাম আমরা মাত্রই উল্লেখ করেছি – তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করছিল চলচ্চিত্রের আধুনিক ভাষায় তাঁদের যুক্ততার কথা।
আসলে সত্তর ও আশির দশকে সদ্য স্বাধীন দেশের তরুণদের মধ্যে বিশ্ববীক্ষা সৃষ্টি হয়েছিল। তাঁরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে সময়ের সমান হয়ে উঠতে চাইছিলেন – অন্য কথায় আধুনিক মানুষ হয়ে উঠতে চাইছিলেন। এই প্রক্রিয়ারই অংশ হিসেবে চলচ্চিত্রপ্রাণ তরুণরা উপলব্ধি করেছিলেন যে, তাঁদের বিশ্ব-চলচ্চিত্রের সর্বাধুনিক ভাষায় স্বচ্ছন্দ হতে হবে; বিশ্ব-চলচ্চিত্রের ইতিহাসকে জানতে হবে। এই উপলব্ধি থেকেই এইসব নামজাদা স্কুলে তাঁরা পাঠ গ্রহণ করতে গিয়েছিলেন। হায়দার রিজভী ও জাহিদুর রহিম অঞ্জন সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। হায়দার রিজভী দ্য প্রাশিয়ান অফিসার লোড্জ্ স্কুলে হায়দার রিজভীর ডিপ্লোমা ফিল্ম। গল্পটি ইংরেজ লেখক ডি এইচ লরেন্সের লেখা। লরেন্স বিশ শতকের অন্যতম প্রথম এবং প্রধান আধুনিক ফিকশন লেখক হিসেবে সাহিত্যের ইতিহাসে স্থানলাভ করেছেন। তাঁর লেখায় উঠে এসেছে আধুনিক মানুষের বিচ্ছিন্নতা, মনোজাগতিক সমস্যা ও আধুনিকায়নের ফলে সমাজজীবনে যে-পরিবর্তনগুলো এসেছে তার কথা। যৌনতার বীক্ষণ এবং তজ্জনিত মনোবিশ্লেষণও তাঁর লেখার একটি প্রধান বিষয়। দ্য প্রাশিয়ান অফিসার গল্পটিতে এসব কিছুরই আভাস পাওয়া যায়। মূলত প্রাশিয়ান সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন এবং তার আর্দালির সম্পর্ক নিয়ে জটিল একটি কাহিনি এখানে বর্ণনা করেছেন লরেন্স। ক্যাপ্টেনের একাকিত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং এর সূত্র ধরে তরুণ আর্দালির বিষয়ে তার এক ধরনের ব্যাখ্যাতীত অবসেশন ভারী গদ্যে উন্মোচিত হয়েছে। সেই সঙ্গে এসেছে আর্দালির যাপিত জীবনের কিছু উন্মোচন – এক কৃষক বালিকার সঙ্গে তার প্রেম, প্রেমিকার উদ্দেশে লেখা কবিতা। শেষে ক্যাপ্টেন তার হাতে খুন হয় এবং ডেলিরিয়ামের মধ্যে কেটে যায় তার একটি দিন ও রাত; শেষে সেও মারা যায়। রিজভী অবশ্য ছবির শেষটা বদলে দিয়েছেন। ছবিতে আর্দালি মারা যায় সম্ভবত শত্রুর ছোড়া কামানের গোলায়।
চৌত্রিশ পৃষ্ঠার গল্পকে রিজভী পনেরো মিনিটের চলচ্চিত্রে রূপায়িত করেছেন। অথচ ছবিটি দেখার পর গল্পটি পড়তে গিয়ে মনে হলো, চলচ্চিত্রে গল্পের কিছুই হারায়নি। বিশেষ করে চরিত্র দুটির মনোবীক্ষণ ও ক্লস্ট্রোফোবিক যে পরিবেশ গল্পের মূল আকর্ষণ তাকে পুরোপুরি ধরতে পেরেছেন চলচ্চিত্রকার। খুব সংগতভাবেই ক্যাপ্টেনকে খুন করার পর আর্দালি যে ডেলিরামের মধ্যে পার করে দীর্ঘ সময় তাকে চলচ্চিত্রায়িত করার ঝুঁকি নেননি হায়দার রিজভী। একজন মানুষের মানসিকভাবে বিধ্বস্ত অবস্থার যে বিবরণ সাহিত্যের বর্ণনায় দারুণ এক শিল্প হয়ে ওঠে তার সার্থক চলচ্চিত্রায়ন সহজসাধ্য নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, এটি ফিল্ম স্কুলের একজন ছাত্রের তৈরি করা একটি ছবি এবং তাঁকে নিশ্চয়ই নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করতে হয়েছিল। কিন্তু ওই ডেলিরিয়ামের বদলে রিজভী যে-যুদ্ধের দৃশ্য সৃষ্টির চ্যালেঞ্জটা নিয়েছিলেন, সেটাও আমাদের বিস্মিত না করে পারে না। সেখানে যে মুন্সিয়ানার সঙ্গে উতরেছেন তিনি তা লেখাই বাহুল্য।
একরৈখিক বর্ণনার ধারাবাহিকতাকে ভেঙে দিয়েছেন রিজভী শুরুতেই। তাই ছবিটির টাইটেল শুরু হয় মর্গে রাখা দুটি লাশের দৃশ্য দিয়ে। লাশ দুটি কাপ্টেন এবং আর্দালির। সামান্য আউট অফ ফোকাসে দৃশ্যটি ধারণ করা হয়েছে। স্বল্প আলোর কারণে ডেপথ অফ ফিল্ডের যে ঘাটতি রয়েছে দৃশ্যে রিজভী তার সুযোগটি ব্যবহার করেছেন। দেখি যে, লাশগুলো রয়েছে পেছনে কিছুটা ব্লারড অবস্থায় আর ফোরগ্রাউন্ডে টাইটেলগুলো স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। এভাবে যা গল্পের শেষের কথা তা আমরা দেখতে পাই ছবির শুরুতে। আর দৃশ্যটির একধরনের নীলচে, সুররিয়েল এবং আবদ্ধ আবহ আমাদের তৈরি করে পুরো ছবির মেজাজের সঙ্গে সংগত করার জন্য।
পুরো ছবিতে আলো-ছায়ার খেলা আর ক্লোজআপের নিবিড় পর্যবেক্ষণ লরেন্সের মনোজাগতিক বর্ণনার কাজটিকে দৃশ্যগতভাবে উপস্থাপন করে। আর্দালির প্রতি ক্যাপ্টেন যে একধরনের যৌন আকর্ষণ অনুভব করেন তা গল্পের চেয়ে ছবিতে বেশি প্রকাশ্য। আর্দালির তরুণ সুগঠিত দেহের একাধিক ক্লোজআপ রয়েছে ছবিতে, যেখানে ক্যাপ্টেন একধরনের কামনার চোখে তাকে দেখতে থাকেন। ক্যাপ্টেনের নারীসঙ্গের চেষ্টার ব্যর্থতারও খুব ছোট এবং ইঙ্গিতময় দৃশ্যাংশ রয়েছে ছবিতে। পুরো ছবিটি নির্মিত হয়েছে এমন একটি ভঙ্গিতে যেখানে কাহিনির বিকাশ নয়; বরং চরিত্র দুটির সম্পর্কের প্রামাণ্যকরণ আর তাদের মনোবীক্ষণই যেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর ছবিতে ঘটনাক্রম যতটা বিশদ তার চেয়ে বেশি ইঙ্গিতময়। বলা যায়, চলচ্চিত্রটি একটি পর্যায় পর্যন্ত সেরিব্রাল।
জঙ্গলে গাছের পাতার ভেতর দিয়ে আসা সূর্যের আলোকে ডিফিউজড লাইটের মতো ব্যবহার করে আলো আর অন্ধকারের দ্বন্দ্ব তৈরি করার কাজটি অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে করা হয়েছে। এই চেষ্টা যুদ্ধের বা আক্রান্ত হওয়ার দৃশ্যেও অব্যাহত রয়েছে। এই দৃশ্যে দ্রুত চলনশীল ক্যামেরা, শটের ছোট দৈর্ঘ্য এবং শব্দ মিলে যুদ্ধের সার্থক চিত্রায়ন ঘটেছে। ক্যাপ্টেনের ঘোড়াটির ভয় পেয়ে একাকী ছুটে যাওয়ার শটটি পুরো দৃশ্যের ব্যঞ্জনাটিকে মাত্রায়িত করেছে।
ঘোড়াটির চিত্রায়নে রিজভী পুরো ছবিতেই যত্নশীল ছিলেন। ঘোড়ার দলাই-মলাই করার শটে আর্দালি আর ঘোড়াটিকে যেভাবে অতি ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা যায় তাতে মনে করার অবকাশ আছে যে, ক্যাপ্টেনের চোখে তাদের মর্যাদা প্রায় একইরকম। আর্দালি আর তার প্রেমিকার কাছাকাছি আসার ঘটনাটিও ঘটে আর্দালি যখন ঘোড়াটির শরীরের যত্ন নিচ্ছে এমনি সময়ে এবং শটটিকে বলা যায় তাদের তিনজনের এক নিবিড় স্টাডি। পরে আস্তাবলে আর্দালি আর তার প্রেমিকা ঘনিষ্ঠ হয়।
প্রকাশের সংযম, ইঙ্গিতময়তা এবং বিচ্ছিন্ন মানুষের মনোবীক্ষণ – এই তিনটি উপাদান মিলে দ্য প্রাশিয়ান অফিসার একটি সার্থক আধুনিক চলচ্চিত্র হয়ে উঠেছে।
নার্সারি রাইমস ১৯৯০-এর ছবি, হায়দার রিজভী যখন দ্বিতীয় দফায় পোল্যান্ডে, তখন পোলিশ টেলিভিশনের জন্য তৈরি করেছিলেন পঁয়ত্রিশ মিনিটের এই ছবি। ছবিটি আমাদের আধুনিক ছোটগল্পের কিছু অনিবার্য বৈশিষ্ট্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রথমত, মোমেন্ট অফ এপিফেনি – এমন মুহূর্ত যখন এক আকস্মিক এবং ব্যতিক্রমী অনুধাবন আমাদের সংবেদনশীলতাকে ধনী করে তোলে। দ্বিতীয়ত, নাগরিক জীবনের যান্ত্রিক বিচ্ছিন্নতার মাঝে ব্যক্তিমানুষের আত্মানুসন্ধান।
ছবিতে আমরা দেখি যে, কিশোর আর্তুরের মা গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেছেন এবং সে নিজে পঙ্গু হয়ে গেছে। তার বাবা জীবনে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং তার নতুন বান্ধবী হয়েছে। কিন্তু আর্তুর তার মা এবং
বাবা-মাকে নিয়ে তার যে আনন্দময় শৈশব সেখানেই রয়ে গেছে। তার বাবা যখন পাশের ঘরে নতুন বান্ধবী মার্তাকে নিয়ে বিছানায়, আর্তুর তখন কম্পিউটারে তার মায়ের ছবি দেখে, বাবা-মায়ের সঙ্গে তার বেড়াতে যাওয়ার ভিডিও দেখে। সে তার বাবার নতুন সম্পর্ককে মেনে নিতে পারে না এবং বালকসুলভ অভিমানে বাবার ওপর প্রতিশোধ নিতে চায়। আর্তুর প্রযুক্তিপরায়ণ কিশোর। কম্পিউটারে সে ফাইল এডিট করে বাবার প্রেমিকার গলায় ফায়ার ব্রিগেডকে আগুন লাগার মিথ্যা তথ্য দেয়। আবার প্রকৌশলী বাবার বিদ্যুৎকেন্দ্রের কম্পিউটার হ্যাক করে সেখানকার তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। পরে বিকেলে বাবার প্রেমিকা মার্তা বাড়িতে এলে তাদের মধ্যে একধরনের বোঝাপড়া তৈরি হয়। শেষ মুহূর্তে আর্তুর বিদ্যুৎ চলে যাওয়া ঠেকিয়ে দিতে চেষ্টা করে। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। অন্ধকারে ডুবে যায় পুরো শহর। তখন আর্তুর আবিষ্কার করে যে, সেও মার্তার মতোই তার বাবাকে ভালোবাসে। এই মোমেন্ট অফ এপিফেনিতে নার্সারি রাইমস ছবি শেষ হয়।
একটি অ্যাপার্টমেন্ট হাউসের ছোট তিনটি কক্ষের মধ্যে ঘটে যায় এই ছবির ঘটনাগুলো। আসলে শুরুর দিকে আর্তুরের বাবার শোবার ঘরের ছোট দৃশ্যাংশটুকু বাদ দিলে পুরো ছবিটা আর্তুরের ঘর আর খাবার জায়গা এবং কিচেন স্পেস হিসেবে ব্যবহৃত হয় যে জায়গাটুকু সেখানেই ঘটে যায় সব ঘটনা। সে তুলনায় এই ছবি ভিজ্যুয়াল দিক থেকে দারুণ সমৃদ্ধ। মোটামুটি আমরা দু-ধরনের চিত্রায়ন দেখতে পাই। প্রথমত, ক্যানডিড ক্যামেরা পুরো স্পেসের মধ্যে সচল থেকে চরিত্রদের অনুসরণ করে। বিশেষ করে আর্তুরের সঙ্গে তার বাবার দৃশ্যতে এই চালের ক্যামেরার কাজ এই ছোট আপ্যার্টমেন্টের মধ্যেই আর্তুর আর তার বাবার মধ্যকার দূরত্বকে প্রতিষ্ঠিত করে। দ্বিতীয় যে চলচ্চিত্রায়নের টেকনিকটি দেখা যায় সেখানে বড় ক্লোজআপে আর্তুরকে নিবিড়ভাবে স্টাডি করা হয়। আর্তুর যখন কম্পিউটার চালায়, ফোন ধরে, বাবার ড্রয়ার খোলে, নিজের খাবার বানায় তখন এরকম ক্লোজআপ আর্তুরকে দেখায় এবং ক্যামেরার ধীর মুভমেন্ট হুইল চেয়ারে বসা অবস্থায় আর্তুরের কাজগুলোকে স্টাডি করে, চারিদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নাগরিক জীবনের উপাদানগুলোকে দেখি আমরা এবং গৃহবন্দি আর্তুরের জীবনটা আমাদের অভিজ্ঞতার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। এভাবে আমরা, দর্শকেরা, আর্তুরের সঙ্গে একধরনের নৈকট্য অনুভব করি; আমরা সম্ভবত আর্তুরের নিঃসঙ্গতা এবং তার সেন্টিমেন্টকে পাঠ করতে পারি। সেই সঙ্গে প্রযুক্তিপরায়ণ আর্তুরকে আমরা নাগরিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে যথাযথভাবে স্থাপন করতে পারি।
শব্দ ও আলো-ছায়ার কাজ এই ছবির অন্য ঐশ^র্যগুলো নির্মাণ করে। নানা রকম যন্ত্রের শব্দ – টেলিফোনের শব্দ, কম্পিউটারের বিভিন্ন সফটওয়্যারের বিভিন্নরকম শব্দ, রেকর্ডেড ভয়েসের শব্দ – সব মিলে প্রযুক্তির আধুনিকায়নের ছাপ রয়ে যায় ছবির শরীরজুড়ে। আর যা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো আবহসংগীত। পাশ্চাত্য সুরের যন্ত্রসংগীত একধরনের বিষাদক্লিষ্ট সাসপেন্স তৈরি করে। অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে আর্তুরের জীবন আমাদের মধ্যে নাগরিক বিচ্ছিন্নতার যে-চাপ নির্মাণ করে তাকে আরো মাত্রায়িত করে এই সুর। দ্য প্রাশিয়ান অফিসারের মতোই এই ছবিতেও আলো-ছায়ার দ্বন্দ্ব চরিত্রের মনোবীক্ষণের কাজটি করে। আলো খর নয়, অন্ধকারও নিকষ নয়; কিন্তু তাদের যুগপৎ উপস্থিতি দর্শকের মধ্যে আর্তুরের নিঃসঙ্গ, কিছুটা জেদী, অভিমানী প্রোফাইলটি নির্মাণে ভূমিকা রাখে।
অভিমানী এবং স্পর্শকাতর আর্তুরকে আরো প্রতিষ্ঠিত করে কিছু ছোট দৃশ্যাণু। আর্তুর বাবার ডাকে সাড়া দেয় না, দরজা খোলে না। জানালার পর্দা সরিয়ে নিচে মাঠে তার বন্ধুদের ফুটবল খেলা দেখে। কিন্তু বন্ধুরা তাকে দেখামাত্র সে জানালা থেকে সরে যায়। বাবার তৈরি করে রেখে যাওয়া খাবার সে কুকুরকে খেতে দেয়। নিজের খাবার সে নিজে তৈরি করে নেয়। মাউসের বলটি গড়িয়ে দূরে চলে গেলে সে নিজেই সেটিকে কুড়িয়ে নিতে চেষ্টা করে। এভাবে সে হুইল চেয়ার থেকে পড়ে যায়। তখন সে মার্তাকে ডেকে সাহায্য চায়। কিন্তু সেটা তাকে মেঝে থেকে তোলার জন্য যতটা তার চেয়ে বেশি হচ্ছে তাড়াতাড়ি মাউসের বলটি হাতে পাওয়ার জন্য।
এসব নাগরিক নিষ্করুণতা আর তার সঙ্গে আর্তুরের বাবার বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়ার উদ্যোগের মধ্যে আমরা যখন বেদনা এবং উদ্বেগে ভারাক্রান্ত প্রায় তখন আসে সেই মুহূর্ত – মোমেন্ট অফ এপিফেনি। বাবার জন্য আর্তুরের ভালোবাসার কথা জানতে পারি আমরা। সম্ভবত আর্তুরও নতুন করে সেই অনুভবের মুখোমুখি হয় – হয়তো সে আবিষ্কার তার জন্য নিজের ভেতর থেকেই।
দ্য প্রাশিয়ান অফিসার এবং নার্সারি রাইমস ইউরোপের মানুষের গল্প বলে। বলে ইউরোপের আধুনিকতার ভাষায়। সেটা স্বাভাবিকও। কারণ, প্রথমটি একটি ইউরোপিয়ান ফিল্ম স্কুলের ডিপ্লোমা চলচ্চিত্র; অপরটি সেখানকার এক টেলিভিশনের জন্য নির্মিত ছবি। হায়দার রিজভী বাংলাদেশে কোনো ছবি করেননি। সুতরাং, তাঁর ছবিতে ইউরোপের আধুনিকতা স্থানিক মাত্রা পেত কি না, সে-আলোচনা করার সুযোগ নেই। শিক্ষক হায়দার রিজভীর ছাত্রদের কাছে আমরা যা শুনি তাতে বোঝা যায়, তিনি বিশ্ব-চলচ্চিত্রের একজন অত্যন্ত মনোযোগী ছাত্র ছিলেন এবং তাঁর ছাত্রদেরও তিনি সেরকমটি হয়ে উঠতে উৎসাহ দিতেন। বলা যাক, হায়দার রিজভী তাঁর আধুনিক চলচ্চিত্র রুচিকে – যার একধরনের প্রামাণ্যকরণ আছে তাঁর ছোট এই দুটি কাজে – তাঁর ছাত্রদের ভেতর দিয়ে এদেশের চলচ্চিত্র-ভাবনায় সঞ্চারিত করে গেছেন।
জাহিদুর রহিম অঞ্জন
জাহিদুর রহিম অঞ্জন পুনা ফিল্ম ইনস্টিটিউটে যাঁদের শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম মনি কাউল। কাউল ঋত্বিক ঘটকের ছাত্র এবং ফরাসি নবতরঙ্গের নির্মাতাদের গুরু রবার্ত ব্রেসোঁর একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। তাঁর ছবিতে ব্রেসোঁর প্রভাব খুব স্পষ্ট। বিশেষ করে মিড শট অ্যাসথেটিক্স – যাকে ব্রেসো তাঁর সিগনেচার ভিজুয়াল ট্রিটমেন্টে পরিণত করেছিলেন – মনি কাউলের ছবিরও প্রধান দৃশ্যগত ঐশ্বর্য হয়ে উঠেছিল। অঞ্জনের ডিপ্লোমা ফিল্ম মর্নিং বিশেষভাবে এই ধারার ভিজুয়াল ন্যারেটিভ নিয়ে কাজ করে। আন্তন চেকভের বিখ্যাত ছোটগল্প ‘সিøপি’ (‘Spal ne khochetsya’) থেকে একটি মিনিমালিস্ট চিত্রনাট্য তৈরি করেছেন জাহিদুর রহিম অঞ্জন এবং মনোজ নায়ার। ধ্রুপদী সাহিত্য থেকে চিত্রনাট্য নির্মাণ এবং তার অত্যন্ত সংযত, সংক্ষিপ্ত গঠন অঞ্জনের পরের সব কাজেরই বৈশিষ্ট্য হিসেবে রয়ে গেছে। চিত্রনাট্যে প্রকাশিত বর্ণনার চেয়ে উহ্য বিষয় কম নয় এবং তারা দর্শকের চিন্তা ও মননের সক্রিয়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকে। এই দাবি ছবি শেষ হওয়ার পরও ক্রিয়াশীল থাকে।
পুরো ছবিজুড়ে একধরনের বিষাদক্লিষ্টতা কাজ করতে থাকে। কিশোরী গৃহকর্মী মায়াকে ঘিরেই এই ছবির বর্ণনা। কিন্তু যে-বিষাদের কথা বলছি তা যেন কাজ করে আর সব চরিত্রের অতি সংক্ষিপ্ত উন্মোচনের মধ্যেও। রাতে ঘুমাতে না পারা, দুঃস্বপ্ন দেখা, নিজের জীবন সম্পর্কে অনিশ্চিত বোধ করা – এসব নানা নেতিবাচকতার কথা শুনি আমরা তাদের টুকরো সংলাপে। রাতে কান্নার শব্দ শুনতে পায় তারা কেউ কেউ। কিন্তু সেটা যে মায়ার কান্নার শব্দ হতে পারে সে-ভাবনাটুকু তাদের মধ্যে কাজ করে না।
আর ন্যূনতা যেমন ছবির চিত্রনাট্যে তেমনি রয়েছে চরিত্রদের অভিব্যক্তিতে। বেশির ভাগ মধ্যম দূরত্বের শট থেকে নির্বিকার অভিব্যক্তির অভিনয় আমাদের মনে করায় মনি কাউলের উস্কি রোটি বা আরো পিছিয়ে ব্রেসোঁর দ্য ডায়েরি অফ আ কান্ট্রি প্রিস্টের কথা। মাঝে মাঝেই হাত, পা বা কোনো প্রপসের ফ্র্যাগমেন্টেড ডিটেইল এবং তার সঙ্গে কম্পোজিশনের ফ্ল্যাটনেস কাঁচা আবেগের চূড়ান্ত নিরাকরণ করে; কিন্তু একটি বিমূর্তপ্রায় মনোজাগতিক স্তরে দর্শকের মধ্যে কাজ করতে থাকে ছবির প্রবাহ। সেটা এভাবেই যে, ছবির ক্লাইমেক্সের ভয়াবহ ভায়োলেন্স এবং আবারো তার নির্বিকার প্রকাশ আমাদের আপাতদৃষ্টিতে বিচলিত করে না; কিন্তু এক গভীর বিষাদ আমাদের মধ্যে স্থায়ী এক অবস্থান নেয়। ছবি শুরুর সকালের শান্ত নদী, ওপারে গম্ভীর পাহাড়ের আউটলাইন আর বাঁশিতে দিন শুরুর স্তব যখন পরের সকালেও ফিরে আসে সময় আবর্তনের প্রাকৃতিক নির্লিপ্ততায়; আমরা হঠাৎ বোধ করি এর ভেতরেই কী এক কলোসাল পরিবর্তন ঘটে গেছে এই পৃথিবীতে – এই শান্ত গৃহে। আমরা গভীর বিষাদে আচ্ছন্ন হই। বহুদিন পরও যখন এই তেইশ মিনিটের ছবিটির কথা ভাববো আমরা, তখন সেই বিষাদ আমাদের মধ্যে এক অবোধ্য বিষয়নিষ্ঠতায় কাজ করবে।
মর্নিং ১৯৯০ সালের কাজ। তারপর দীর্ঘদিন অঞ্জন কোনো ছবি নির্মাণ করতে পারেননি। ২০১৪ সালে, প্রায় দেড় দশক পর, রাষ্ট্রীয় অনুদানের সুযোগে তিনি নির্মাণ করেন মেঘমল্লার। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্প ‘রেইনকোট’ থেকে এই ছবির চিত্রনাট্য লিখেছেন অঞ্জন নিজেই।
মেঘমল্লার দর্শকের অভিজ্ঞতাকে নির্মাণ করতে চায়। সাধারণভাবে বলা যাবে, সকল চলচ্চিত্রের তা-ই তো লক্ষ্য। কিন্তু মেঘমল্লারে দর্শকের দেখা এক অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া যেন। এই দেখা দৃশ্যমানতা থেকে দৃশ্যকল্পনাকে উৎসারিত করতে চায়। যে-দৃশ্যমানতার মধ্যে আমরা প্রবেশ করি তা আমাদের অন্তর্জাত সংবেদনকে সক্রিয় হতে প্রণোদিত করে। আমরা যেন নির্মাণ করে নেব, অতঃপর, মেঘমল্লারের অভিজ্ঞতার পর, যার যার নিজস্ব মেঘমল্লার।
অথচ মুক্তিযুদ্ধের এই ছবি। আমাদের এই দেশের মানুষের যৌথ স্মৃতিতে এবং ইমেজ-ব্যাংকে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান দৃশ্যরা সঞ্চিত আছে। সেই প্রধান দৃশ্যমালা, সেই ট্র্যাজেডি, সেই মহত্ত্বের দিকে মেঘমল্লার এক ক্যানডিড দৃষ্টিক্ষেপ। ক্যানডিড এবং সামান্য। এই ভঙ্গিটি যে চ্যালেঞ্জটির মুখে অবধারিতভাবেই পড়ে তা হলো এই যে, মুক্তিযুদ্ধের প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ যে দৃশ্যরা, তাদের পাঠ ততখানি সরল হয় না এ-ছবিতে। একধরনের সক্রিয়তা প্রয়োজন হয় দর্শকের পক্ষে। আর মেঘমল্লার তার সামান্যতার মধ্যে এভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠার প্রচুর স্পেস রচনা করে দেয়। স্থির ফ্রেমের দীর্ঘ টেকে প্রায় যেন সময়টিকে যাপন করার অবসর, শব্দহীন অথবা জীবনের স্পন্দনহীন এক জনপদকে ক্রমশ নিজের ভেতরে প্রবিষ্ট করানোর সুযোগ। সংলাপ অথবা তাদের অভাব আর ঘটনাপ্রবাহের ন্যূনতা এক নেগেটিভ স্পেসের জন্ম দেয় আমাদের মনোজগতে; সেখানে আমরা সক্রিয় হই, দর্শকেরা। আমাদের জন্য উজ্জীবক হিসেবে আছে এই থেমে থাকা জীবনের মধ্যে চড়ে ওঠা আবহশব্দ। মধ্যবিত্ত জীবন অথবা তার ক্রুর প্রতিরূপ, যা তখন শিকে ঘেরা, করুণ, ক্ষুদ্র – তার দিকে আমরা তাকাই, আমাদের বোধের ক্রিয়ায়। আর এরই উল্টো দিকে যে মহত্ত্বের জন্ম হচ্ছিল বাংলার সমতল সবুজ আর জলাঞ্চলে, যেখানে যৌবন অতিক্রম করে যাচ্ছিল জীবনের সকল তুচ্ছতা তার ইঙ্গিতগুলো আমাদের ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠার স্টিমুল্যান্ট।
মনুমেন্টালিটি বনাম ক্যানডিড লুক থ্রু – এই চ্যালেঞ্জটি নিয়েছে মেঘমল্লার। একটি দৃশ্যসংবেদ হিসেবে তার সক্ষমতা এবং সীমাবদ্ধতাকে গভীর বোঝাপড়ার মধ্যে নিয়েই সে অগ্রসর হয়েছে। ওয়াইড লেন্সের গভীর শটগুলোতে ফ্রেমের বিভিন্ন তলে নানা সামান্য ঘটনার দিকে সংবেদী দৃষ্টিক্ষেপ; অর্থহীন অথচ মেধাবর্জিত চলচ্চিত্রচর্চায় জরুরি হয়ে ওঠা সকল দৃশ্যময়তা বর্জন; পুনরাবৃত্তির ভেতর দিয়ে মোটিফ অথবা নতুন সংবেদ নির্মাণ – এভাবেই লেখা এই ছবি।
হয়তো বর্ষা তার সহায়। নাকি আরেক চ্যালেঞ্জ। কীভাবে দেখব সেটা যেন স্থির করার অপেক্ষায়। মেঘমল্লার তার নাম; বর্ষার প্রাবল্য, রোমান্টিকতা, নানা মল্লার রাগের সুরধ্বনি ছবির সামান্যতার আঙ্গিককে সংকটের দিকে ঠেলে দিতে চায়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের যে প্রধান চিত্রময়তা ফ্রন্টাল কম্পোজিশনে আঁকা নেই, ছবিতে সেই চিত্রময়তার দিকে সে নিয়ে চলে আমাদের। ইলিয়াসের গল্পে মুক্তিযোদ্ধা শ্যালকের রেইনকোটখানি গায়ে চড়িয়ে নির্বিষ নুরুল হুদা অতিক্রম করে গিয়েছিল সকল তুচ্ছতা, ভয়। মেঘমল্লারে নুরুল হুদার রূপান্তরে রেইনকোটের ভূমিকা তত স্পষ্ট নয়; বরং নুরুল হুদার অতিক্রান্তাবস্থা যেন এক ক্রমাগত প্রক্রিয়ারই বিশেষ মুহূর্ত মাত্র। সেই ক্রমাগত প্রক্রিয়ার নাম বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ। আর সেই বর্ষা যা সেবার হেমন্তেও ছিল প্রবল, বিরাট, অপ্রতিরোধ্য – শত্রুকে যে করে ফেলেছিল বাস্তবে দিশাহারা, মনোজগতে পরাজিত, সে মুক্তিযুদ্ধের এক প্রধান শক্তি। শত্রুর জিঘাংসা আর পোড়ামাটি নীতির বিরুদ্ধে প্রকৃতির প্রতিশোধ। মুক্তিযুদ্ধের দিকে মেঘমল্লার চলচ্চিত্রের প্রক্ষিপ্ত ক্যানডিড দৃষ্টির মধ্যে এভাবে বর্ষার জলদ রূপ ও শব্দাবলি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আমরা নিয়মিতই বোধ করি যে, বর্ষা ক্রমশ নিয়ন্ত্রণ নেয় সে-সময়ের, চলচ্চিত্র মেঘমল্লারের। আর নুরুল হুদা, আসমা, সুধাদের জীবনে যে বিচ্ছেদ এই ছবিতে, সেখানে মল্লার রাগেই তার বিস্তার, প্রকাশ। বলব কি যে সে এক মেধাবী সমাপতন, অথবা খানিক রোমান্টিক জলজতা?
মেঘমল্লার একটি প্রায় একরৈখিক বর্ণনাধর্মিতার মধ্যে বাস্তব-উত্তর আঙ্গিকের সম্ভাবনাগুলি পরখ করে দেখে। একটি শুদ্ধ চলচ্চিত্রিক অভিজ্ঞতা নির্মাণের প্রচেষ্টা হিসেবে একে দেখার প্রস্তাব করা যেতে পারে। এই ছবি দর্শককে তার নিজস্ব ইমেজগুলো নির্মাণ করে নিতে, না বলা সংলাপগুলো রচনা করে নিতে এবং না দেখা আবেগগুলো কল্পনা করে নিতে বলে। সম্ভবত সিনেম্যাটিক অবজেক্ট নির্মাণের এই নিরীক্ষা আমাদের অন্তর্জাত সংবেদকে উজ্জীবিত করতে চায়। আর এই প্রচেষ্টা এক রোমান্টিক মননের সঙ্গে দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয়। মেঘমল্লার সম্পূর্ণতার বোধ জাগায় না। বরং তার শেষ ফ্রেমটি পার হয়ে গেলেও সক্রিয় থাকে আমাদের মধ্যে, কোথাও। সে নতুন হয়, অন্য হয়। তার মধ্যকার ভিজ্যুয়াল এবং তাদের অনুপস্থিতি, তার ঘটনাবলি এবং তাদের বাস্তবাতিক্রান্ত সামান্যতা কাজ করে, আমাদের মধ্যে, কোথাও।
চাঁদের অমাবস্যা সাতচল্লিশ পরবর্তী বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কথাশিল্পী সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর উপন্যাস। ওয়ালিউল্লাহ এই উপন্যাস রচনায় চেতনাপ্রবাহ ধারা বা stream of consciousness-এর আঙ্গিক ব্যবহার করেছেন। গত শতকের প্রথম ও দ্বিতীয় দশকে জেমস জয়েস বা ভার্জিনিয়া উলফের মতো পশ্চিমা সাহিত্যিকরা আধুনিক কথাসাহিত্যের এই ধারা প্রবর্তন করেন। এই আঙ্গিকে ত্রিমাত্রিক বাস্তবতার বদলে প্রাধান্য পায় চরিত্রের মনোজগতের চিন্তার প্রবাহ। বাস্তবের ঘটনাপ্রবাহ কীভাবে কাজ করছে চরিত্রের মননে তার ক্রমাগত বর্ণনাই এই আঙ্গিকের মূল আলেখ্য; ফ্র্যাগমেন্টেড এবং জটিল বাক্যবিন্যাসে চরিত্রের মনোবীক্ষণের কাজটি চলতে থাকে। ওয়ালিউল্লাহর উপন্যাস চাঁদের অমাবস্যার চলচ্চিত্রায়নে সাহিত্যের এই আধুনিক আঙ্গিককে চলচ্চিত্রে রূপান্তরের চ্যালেঞ্জটি নিয়েছেন অঞ্জন। একটি কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা এই যে, দ্য ডায়েরি অফ আ কান্ট্রি প্রিস্ট উপন্যাসটি লেখা হয়েছিল চেতনাপ্রবাহ ধারার আঙ্গিকে। লিখেছি আগেই যে, রবার্ত ব্রেসোঁ এই উপন্যাসের চিত্রায়ন করেছিলেন। ব্রেসোঁ যেভাবে অগ্রসর হয়েছেন এই উপন্যাসটির চলচ্চিত্রায়নে তা বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে অঞ্জনের চাঁদের অমাবস্যাকে। তিনি ন্যূনতার মধ্যে অন্তর্জাত বিনির্মাণের আয়োজন করেছেন। সেখানে দৃশ্যের চেয়ে অদৃশ্যের অধিকার কখনো বেশি। সেই অদশ্য দর্শকের মনোজগতে উৎপাদিত হতে থাকে ক্ষান্তিহীন। এবং সে আবশ্যিকভাবে যুক্ত হয় এই শিল্পাস্বাদনে।
অঞ্জন প্রায় একইভাবে এগিয়েছিলেন আগের ছবি মেঘমল্লারে। কিন্তু এই ছবি বিষয় ভাবনায় কতই না আলাদা মেঘমল্লার থেকে। এখানে মনোজগতের দোলাচাল নিয়ে আন্দোলন; অন্ধকার আর আলোর যে-দ্বন্দ্ব সেটার প্রলয়টুকু চলে আসলে মনের গভীরে। বাইরে, আমাদের সামনে এক প্রান্তিক গ্রাম-জনপদ। সেখানে অভিনীত এক জিঘাংসাময় নাটক, যা লজিং মাস্টারকে এক বিষাদঘন বিপর্যস্ততায় বিপন্ন করে তোলে। তার মধ্যে কী কাজ করে? মৃত যুবতীর প্রতি ভালোবাসা? এই মৃত্যুময়তা বিষয়ে কৌতূহল, ন্যায় প্রতিষ্ঠার সরল আকাক্সক্ষা? এসব হাতড়ে চলি আমরা। আর মেঘ-চাঁদের লুকোচুরি, বাঁশবনের অমোঘ রহস্য, নদীর চরের বিলম্বিত প্রান্তর, যুবতীর ভাসমান লাশ আমাদের ভাবনা বিস্তারের উপাত্তগুলো দিয়ে যেতে থাকে। এই বিস্তার ঘন হয় মাস্টার আর কাদেরের সুররিয়েল আলাপের সূত্র ধরে। এরকম মৌতাত ভেঙে দেয় দৃশ্যান্তগুলোর আকস্মিকতা। এই চলচ্চিত্রের গূঢ় মেজাজের সঙ্গে এ এক বড় অসংগতি যেন। আর বিষাদ জুড়ে থাকে পুরো ছবির শরীরে, গল্পের প্রবাহে।
মাস্টার আর কাদেরের বিনিময়গুলোতে ক্যামেরা আরো মন্তব্যধর্মী হতে পারতো কি? মাস্টারের মনের
উথাল-পাতালের কিছু মেটাফোর আশা করা যেত বোধহয়। এসব ভাবনা নিয়ে আমরা ছবিটি থেকে বিদায় নিই। কিন্তু ন্যূনতায় জাড়িত উপাদানগুলো আমাদের মধ্যে কাজ করতে থাকে। আমরা চাঁদের অমবস্যায় থাকি আরো অনেকটা সময়।
অঞ্জন আধুনিক সাহিত্যকর্ম নিয়ে কাজ করেছেন এবং তাদের যে-চলচ্চিত্রিক রূপ দিয়েছেন সেগুলো চলচ্চিত্রের আধুনিকতায় সংশ্লিষ্ট। তাঁর প্রধান দুটি কাজ মেঘমল্লার এবং চাঁদের অমাবস্যা বাংলাদেশের প্রধান দুজন সাহিত্যিকের কাজের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই তাদের বিষয়বস্তু এদেশের সময় ও সমাজের মধ্যে বিবৃত। অঞ্জনের চলচ্চিত্র-ভাষা ইউরোপমনস্ক। লিখেছি যে, তিনি রবার্ত ব্রেসোঁর চলচ্চিত্র-আঙ্গিক দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। তাঁর কাজে শেষ পর্যন্ত ব্রেসোঁর ছাপ স্পষ্ট। ঋত্বিক ঘটক বা তাঁর ছাত্র মনি কাউল, কুমার সাহানির মতো তিনি কোনো স্থানিক চলচ্চিত্রভাষা নির্মাণে উদ্যোগী হননি। কিন্তু এ-বিষয়টি নির্দ্বিধায় লেখা যায় যে, তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণের বৈশ্বিক আধুনিকতার একটি ধারাকে নিয়ে স্থানীয় বিষয়ে কাজ করেছেন।
হায়দার রিজভীর মতো শিক্ষক হিসেবে অঞ্জনও জনপ্রিয় ছিলেন। যা লক্ষ করেছি তা হলো, অঞ্জন ছাত্রদের মধ্যে চলচ্চিত্র বিষয়ে একটা উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে পারতেন। সিনেমাকে নিয়ে তাঁর গভীর ভালোবাসা ছাত্রদের মধ্যে সঞ্চারিত হতো। আর অঞ্জন ছাত্রদের নিজেদের মতো করে ভাবতে উৎসাহী করতেন। ছবির নির্মাতা হিসেবে নির্মাতার চলচ্চিত্র-রুচিই যে শেষ কথা – এ-কথাটি তিনি তাঁর ছাত্রদের বিশ্বাসের ভেতর স্থাপন করতেন। কিন্তু তার আগে তাঁদেরকে যে বিশ্ব-চলচ্চিত্রের সকল প্রধান নির্মাণের সঙ্গে পরিচিত হতে হবে – এ-কথাটিও তিনি জোর দিয়ে বলতেন। তাঁর আকর্ষণীয় বাকভঙ্গিতে চলচ্চিত্রের যে-বিশ্লেষণ তিনি করতেন তা তাঁর ছাত্রদের ভেতর গেঁথে যেত। এভাবে শিক্ষক হিসেবে চলচ্চিত্রের আধুনিকতার তিনি এক প্রধান প্রচারক।
শেষ কথা
পঞ্চাশের দশকে আমাদের সমাজে আধুনিকতার চর্চার শুরু হয়েছিল – এ-কথা লিখেছি শুরুতেই। সেই চর্চার ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে আমরা একটি রাষ্ট্র অর্জন করেছি। কিন্তু নানাভাবে এই চর্চা পরে ব্যাহত হয়েছে এবং আধুনিকতা আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র জীবনে তার যৌক্তিক পরিণতিতে পৌঁছেনি। প্রযুক্তির হাত ধরে সারা বিশ্বের সঙ্গে আমরাও উত্তরাধুনিক সময়ে প্রবেশ করেছি। কিন্তু উত্তরাধুনিকতা আধুনিকতাকে সম্পূর্ণ নিরাকরণ করে না; বরং, আধুনিকতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে উত্তরাধুনিকতার নানা সম্ভাবনা। এভাবে তারা কখনো সমান্তরাল এবং কখনো পরস্পরছেদী সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক প্রবাহ হিসেবে চলিষ্ণু থাকে। চলচ্চিত্রে আমাদের আধুনিকতার অর্জন খুব বেশি নয়। সেকথাও লিখেছি এরই মধ্যে। পঞ্চাশ ও ষাটের কয়েকটি বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার পর সত্তর দশক থেকে তার একটি ক্ষীণ ধারা অস্তিত্ব বজায় রেখে চলেছে আজ পর্যন্ত। সেই ধারার যাঁরা কারিগর হায়দার রিজভী এবং জাহিদুর রহিম অঞ্জন তাঁদের মধ্যে গণ্য। তাঁরা চলচ্চিত্র নির্মাণে এবং চলচ্চিত্রের শিক্ষকতায় এদেশে আধুনিকতা নির্মাণের যজ্ঞটি চালিত রেখেছিলেন আজন্ম। এই স্বীকৃতি তাঁদের প্রাপ্য।
সূত্র-নির্দেশ
১. গে, পি. (২০০৮), হাউ টু রিড মডার্নিজম : আ ইউজার গাইড, টেমস অ্যান্ড হাডসন।
২. রিড, এইচ (১৯৭২), দ্য মিনিং অফ আর্ট (রিভাইড এডিশন), পেঙ্গুইন বুকস (মূল কাজটি ১৯৩১ সালে প্রকাশিত হয়েছিল)।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.