ছোট গল্প

  • শব্দযান

    শব্দযান

    ফড়িং-ঘাসফড়িংয়েরা মরে যাওয়ার পর একটু একটু করে শুকোতে শুকোতে, শেষ পর্যন্ত শুকিয়ে চিমসে, শুকনো খড় যেন, এমন চেহারা পেতে পেতে হয়ে যায় বিচালির টুকরো। বাঙালরা – দেশভাগের সময়, আগে-পরে পূর্ববঙ্গ থেকে খ্যাদা খেয়ে এপারে – পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরায় চলে আসা মানুষেরা, যাঁরা – সেইসব পূর্ববঙ্গীয় মানুষদের বেশিরভাগই তো হিন্দু নয়তো বৌদ্ধ – খুব সামান্য হলেও…

  • কতদূর? আর কতদূর?

    কতদূর? আর কতদূর?

    ঐশী আলমারি খুলল। বিয়ের নীল বেনারসিটার দিকে চোখ গেল। না। বিয়ের কোনো স্মৃতিই সঙ্গে নিয়ে লাভ নেই। ২৩ বছরের খুঁটিনাটি স্মৃতি যদি বইবেই তবে আর মুক্তি কিসে? অবশ্য – ঐশী নিজেই জানে না মুক্তি কাকে বলে। এই ২৩ বছরের মধ্যে আঠারো বছর ধরেই এই দিনটার অপেক্ষায় থেকেছে ঐশী। মুন্নির তখন পাঁচ বছর। তখন থেকেই ঐশী…

  • মমতাজ মহল

    মমতাজ মহল

    মহুয়ার সঙ্গে আমার দাম্পত্য কলহের অন্তত আশি ভাগ জুড়ে রয়েছে মমতাজ মহল। এক বা দুদিনের কলহের আশি ভাগ নয়। একত্রিশ বছর ধরে যত কলহ হয়েছে তার আশি ভাগ। ঝগড়াটা যেভাবেই শুরু হোক, এর উপসংহারে মমতাজ মহল থাকতেই হবে। আমাদের বিয়ের দ্বিতীয় বছরের শুরুতে এক রাতে খাওয়ার সময় হেঁচকি ওঠে। মহুয়া হেঁচকিটাকে খুব সিরিয়াসলি নেয়। আমি…

  • সাঁঝে-সকালের ঝিঙা ফুল

    সাঁঝে-সকালের ঝিঙা ফুল

    বাইরের উঠোনে সাইকেলের প্যাডেলে পা রেখে হরিহর হাঁক দিলো, ‘এসো!’ ঘরের ভেতর ভ্যানিটি ব্যাগে এটা-ওটা, মায় নিজের মোবাইল ফোনটা গুছিয়ে নিতে নিতে অণিতা উত্তর করল, ‘হ্যাঁ, যাই।’   সকালবেলা। ঝলমলে রোদ উঠেছে। বাঁশঝাড়ে নিম-চল্লার গাছে কাক-কুইরি যেমন ডাকে, ডাকছে। বেগুনঝাড়ের বেড়ায় লতিয়ে-ওঠা কাবাগুড়ি ফল পেকে এখন টকটকে লাল! হরিহর সাইকেলের বেলটায় আলতো চাপ দিয়ে ‘ট্রি-নি-টি’…

  • কানাই

    কানাই

    শ্রীকৃষ্ণের নামে নাম রেখেছিলেন ঠাকুরমা – কানাইলাল বিশ্বাস। হাটে-মাঠে মানুষ অবশ্য ওকে শুধু কানাই বলেই চিনত। তবে কেন জানি এলাকায় তেমন একটা সুনাম ছিল না কানাইয়ের। জন্মের পরপরই মা মারা গিয়েছিল কানাইয়ের। আর বয়োপ্রাপ্ত হওয়ার আগেই কলেরায় ভুগে দুদিনের ব্যবধানে মারা যায় বাবা রসিকলাল বিশ্বাস ও দিদি মালতী। সেই থেকে কানাই একা। মানুষ বৃদ্ধ ঠাকুরমার…

  • ছায়াবাজি

    ছায়াবাজি

    বলা নেই কওয়া নেই দুম করে অনন্তপ্রসাদ মরে গেল। ভোরবেলায় একে নিয়ে হাওয়া খেতে বেরোয় শিবু। খোলা হাওয়া পেলে বেশ তাগড়া দেখতে অনন্তপ্রসাদ দুরন্ত ঘোড়ার মতো ছুটে চলতে চায়। পিছু ধাওয়া করতে গিয়ে শিবু ক্লান্ত হয়ে পড়ে। হাঁপ ধরে যায় রীতিমতো; তবু কোনোদিন নিয়মের ব্যত্যয় হয় না ওর। যদিও এর বাহারি নাম অনন্তপ্রসাদ, আদতে এটি…

  • ফাঙ্গাস

    ফাঙ্গাস

    এক ‘ওই মিয়া কীয়ের বালছাল মার্কা গাড়ি চালাও এ্যা? গাড়ির সিটের গায়ে ফাঙ্গাসের ভিটাবাড়ি হইছে … দ্যাখবার পাও না?’ যাত্রীর বিরক্তিভরা কথা শুনে গাড়ি চালাতে চালাতেই মাথা ঘুরিয়ে দেখল ড্রাইভার ইদ্রিস মিয়া। হাইওয়েতে গাড়ি ছুটছে। এখন বেশি উত্তেজিত হলে চলবে না। তাই মাথাটাকে শান্ত রেখেই যাত্রীর কথার জবাব দিলো সে। ‘কী কন মিয়াভাই? কীয়ের ফাঙ্গাস?…

  • এগারশ’ বাহাত্তর নম্বর সীমান্ত পিলার

    এগারশ’ বাহাত্তর নম্বর সীমান্ত পিলার

    আষাঢ়ের টানা বৃষ্টিতে স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেছে গোটা পরিবেশ। গতরাতেও গুমোট ছিল আকাশ। সারাদিন সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। রাতে ভালো ঘুম হয়েছে। ভোরে উঠে আকাশের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যাই। মনে মনে বলি, আকাশ জুড়ে বিসত্মার নেওয়া ঘনকালো মেঘের বিশাল চাঁদোয়াটা এক রাতের মাঝে কে সরিয়ে নিয়েছে! এমন ফুরফুরে ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠেই শিশু-সূর্যটা পুবদিগন্ত থেকে…

  • দুর্ভিক্ষর সাক্ষী

    দুর্ভিক্ষর সাক্ষী

    গোসাবার হজরত আমাকে মৈপীঠের কথা বলল – বলল, আমাদের এদিকে সব চবিবশ পরগনার, কিছু বড়জোর দেশভাগের সময় যশোর-খুলনা থেকে আসা। মেদিনীপুরের লোক পাবেন আপনি পশ্চিমে। পশ্চিম মানে কুলতলি থেকে শুরু করে একেবারে কে-পস্নট, এল-পস্নট হয়ে সেই সাগরদ্বীপ পর্যন্ত। আর মেদিনীপুরেই তো সাংঘাতিক সেই ঝড়। ঝড়, নদী-গাঙের ঢেউ। একেবারে তিরিশ-চলিস্নশ হাত উঁচু। একদিনেই হাজার হাজার লোক।…

  • অগ্রন্থিত গল্প  বসির মিঞা

    অগ্রন্থিত গল্প বসির মিঞা

    সংগ্রহ ও টীকা : মাসুদুজ্জামান বাংলাদেশে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ (১৯২২-৭১) গ্রন্থিত ও অগ্রন্থিত ছোটগল্প সংগ্রহ করে যাঁরা সংকলন করেছেন তাঁদের মধ্যে উলেস্নখযোগ্য হচ্ছেন আবদুল মান্নান সৈয়দ, সৈয়দ আবুল মকসুদ, সৈয়দ আকরম হোসেন ও হায়াৎ মামুদ। তাঁর গল্প উদ্ধার করে সংকলিত করতে আরো যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তাঁরা হলেন লায়লা জামান, সাজ্জাদ আরেফিন ও সাজ্জাদ শরিফ। এছাড়া…

  • কতিপয় দাঁড়কাকের সুইসাইড নোট

    কতিপয় দাঁড়কাকের সুইসাইড নোট

    আমরা ভেবেছিলাম – গল্পটি আমাদের। মধুর ক্যান্টিনের সামনে যে-ভঙ্গিতে শরীফুল হাসান দাঁড়িয়ে থাকত ঘণ্টার পর ঘণ্টা, একটা সস্তা সিগারেটের ধোঁয়ায় নিজের ভাঙাচোরা মুখখানা ঢেকে দিতে দিতে যেভাবে সে মাথা নাড়ত, আর বলত, হইলো না রে দোস্ত, হইলো না! – এ-দৃশ্য দিনের পর দিন দেখে আমাদের সবার মনে এ-ধারণাই জন্মেছিল : গল্পটি বোধহয় আমাদেরই। আমাদের বন্ধু…

  • দ্বিজেনের স্বর্গদর্শন

    দ্বিজেনের স্বর্গদর্শন

    বাদাম বিক্রি করতে বেরিয়ে দ্বিজেন ভুল করে পুরনো বাসস্ট্যান্ডে চলে এসেছে। একেবারে রানী-পুকুরপাড়ের তেমাথার মোড়ে। সাধারণত এই মোড়ে সে আসতে চায় না। ভুল করে কখনো চলে এলে মন খারাপ হয়ে যায়। যেমন এখন এই পড়ন্ত দুপুরে তার মন খারাপ হয়ে গেল। এই মোড়ে কখনো তার একটা সেলুন ছিল! ছিল বলতে সেলুনটা এখনো আছে, ‘টিপটপ সেলুন’।…