ছোট গল্প

  • শ্মশানবন্ধু

    মণীশ রায় সহসা চারপাশের শব্দগুলো থমকে দাঁড়ায়। কতগুলো পরিচিত-অপরিচিত মুখাবয়বের অন্তহীন পুতুলনাচ মুখ থুবড়ে পড়ে; শব্দহীন। কালো ভূতের মতো ঠ্যাং-ওলা ক্যামেরাকটি হঠাৎ স্থির হয়ে যায়; মাথার ওপর চুন-সুড়কির ছাদ ফুঁড়ে যে-রংচটা ফ্যানটা ঘরঘর শব্দে অবিরাম ঘুরছিল একটু আগে, আপাতত সেটিও মুখবন্ধ কয়েদির মতো বাতাসে কিছু নিঃশব্দ আঁকিবুকি ছাড়া আর কিছুই করছে না; চারপাশ জুড়ে এবড়ো-খেবড়ো…

  • এই আমি নই আমি

    আফসানা বেগম আজ তেত্রিশ দিন হলো আমি ফেসবুকে ‘ফারহা সিমি’ নামে একটি অ্যাকাউন্ট খুলেছি। ‘ফারহা’ বা ‘সিমি’, কোনো নামেই আমি কাউকে চিনি না। তবে এটা জানি যে, এই নামগুলো শোনা যায় এর-ওর মুখে। তাই হয়তো কোনো কথোপকথনের স্মৃতি ফুঁড়ে নামদুটো আমার সামনে ভেসে উঠেছিল। দুটো নামকে কেবল সন্ধি করে আমি অ্যাকাউন্টটি খুলে ফেললাম। এরকম একটি…

  • মোনাজাত

    অর্ণব রায় মাতালের কান্ড, পাগলের খেয়াল, বজ্জাত ছেলেপিলের বাঁদরামি – সবরকম ভাবা হয়ে গেলে বোঝা গেল আওয়াজটা আসলে কান্নার। কেউ গলা ফাটিয়ে তারস্বরে সুর করে কাঁদছে। পুরুষের গলা। কতকটা বাঁধপুল বাজারের কাদেরের মতো শুনতে। এশার নামাজের পর থেকেই আওয়াজটা সকলের কানে আসতে থাকে। প্রথম প্রথম, যেমন হয়, কে না কে কাঁদছে মনে করে কেউ সেরকম…

  • এখন তোমার যেমন দরকার

    জিয়া হাশান সকালেই অ্যাডটা চোখে পড়ে। পত্রিকার দুটো পাতা ওলটাতেই সে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়, কিন্তু লুবনা তাতে থিতু হতে পারে না। তার ওপর নজরের একটু ছোঁয়া দিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। মনোযোগের জোয়ারি জলে তারে আর ডোবানো হয় না। তবে একনজরেই বোঝে ­- অ্যাডটার দাবি-দাওয়া ভিন্ন ধাঁচের, চেহারা-সুরত আলাদা ধরনের। ক্লাসিফায়েড গোত্রের, পাত্র-পাত্রী চাই গোছের কিন্তু…

  • বীরেন স্যারের চেহারার শেষ পরিণতি

    ইকবাল আজিজ বীরেন স্যার আমার শৈশবের হিরো, আমার দেখা জীবিত মানুষগুলোর মধ্যে সবচেয়ে রূপবান। বীরেন স্যারের সঙ্গে আমার শৈশবের শিল্পচেতনা ও সৌন্দর্যচেতনার অনেকখানি জড়িয়ে আছে; তাঁর কথা কি আমি ভুলতে পারি? তাঁর চেহারা ছিল অতি বিস্ময়করভাবে নায়ক উত্তমকুমারের মতো। সেই আমলে ষাটের দশকের শুরুতে উত্তমকুমার ছিলেন যে-কোনো বিখ্যাত জননেতার চেয়েও অনেক বেশি জনপ্রিয়। আর নায়িকা…

  • বর্ণপরিচয়ের গোপাল

    শচীন দাশ এই একটা জায়গা, ওদের ভারি পছন্দের। দুদিকে দুটো দেয়াল আছে। দেয়ালের ওপরে টিনের চালা। চালাটা পুরনো। পুরনো ও ভাঙা। ওই ভাঙা চালারই নিচে একফালি জায়গা। ভ্যাপসা ও অন্ধকার। গাদাগাদি করে ওই অন্ধকারেই তখন দুই ভাই। গোপাল ও ভূপাল। গপু ও ভেপু। তাদের মা বড়ো আদর করে ডাকত। একদিন কী যে হলো! মা পালাল…

  • সান ফ্রান্সিসকোতে ফাঁস

    ওয়াহিদা নূর আফজা রুমমেট মেরি লি আর আমার সমস্যাটা এক। অথচ দুজন এর সমাধান চাচ্ছি দুরকম পথে। এটাই স্বাভাবিক। কারণ আমাদের মিলের থেকে অমিল বেশি। প্রথম এবং প্রধান মিলটার কথা আগে উল্লেখ করি। আমরা সমবয়সী। আমার বয়স চবিবশ। মেরি লি আমার থেকে দুবছরের ছোট। অমিল অনেক। সে বেশ সুন্দর। স্কুল-কলেজে পড়ার সময় তাকে একজন প্রথমসারির…

  • দশ জানুয়ারি ১৯৭২

    মনি হায়দার আফসানা খানম কাঁদছেন। সাত মাস ধরে তিনি নিয়মিত কাঁদছেন। না, তার কান্না কেউ শুনতে পাচ্ছে না। মনের ভেতরে গুমরে গুমরে কাঁদছেন। না কেঁদে উপায় কী? তার চারদিকে ভীষণ বিপদ। একমাত্র ছেলে বাড়ি নেই। স্বামী কোথায় আছে, কেমন আছে জানেন না। আদৌ বেঁচে আছে কি-না…। আর ভাবতে চাইছেন না। কিন্তু কোত্থেকে ভাবনা আর মনকান্না…

  • এই কবিতাটা কতোভাবে লিখি

    বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর লিরিক কবিতার অন্তর্ঘাতী চরিত্র নিয়ে আমরা কথা বলতে বলতে মধ্যরাত পার করি, কিংবা কফি খেতে খেতে আমরা জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের নিরাপত্তার অসম্ভব খিদের কথা বলতে বলতে ভোরবেলায় পৌঁছে যাই, কিংবা সুরাইয়া তোমার কি মনে আছে গুন্টার গ্রাসের কথা, কলকাতা থেকে ঢাকায় এসেছিলেন একদিনের সফরে, তাঁকে আমরা ধরে এনেছিলাম আমাদের সেন্টারে, তাঁর মুখে টিন…

  • ছুঁচোর কেত্তন

    নীহারুল ইসলাম স্বাভাবিক নিয়মেই আমার মৃত্যু হয়েছিল। তবে আমার ইচ্ছানুসারে আমাকে দাহ করা হয়নি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতিসাধনে মেডিক্যাল কলেজে আমার দেহটা উৎসর্গ করা হয়েছিল। তারপর কত দিন! কত রাত! কত অন্ধকার পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ছুঁচো জন্ম পেয়েছি। নিজেকে ধন্য মনে করেছি। যদিও নিজেকে ধন্য মনে করার পেছনে আরেকটা কারণ আছে, ছুঁচো জন্ম পেলেও আমার অবস্থান হয়েছে…

  • বইপোকা

    কানাই কুন্ডু অঞ্জনকে সবাই বইপোকা বলে। কিন্তু অঞ্জন বই খায় না, পড়ে। মানুষের নানা অভ্যাস থাকে। কেউ ঘুড়ি ওড়ায়, গান গায়। নাচে, কেউ গপ্পো-কবিতা লেখে, নাটক করে। কেউ অভিনেতা, পরিচালক, আবার কেউ গুছিয়ে ঘর-সংসার করে। অঞ্জন এসব করে না। পড়ে। যত পুরনো, ততো আগ্রহ। এই অভ্যেসে সে বাংলাবাজারের পুরনো বইপাড়ায় ঘোরে। ইউনিভার্সিটির চত্বরে, আড়ংয়ের ফুটপাতে…

  • ক্যালোট্রপিস জায়গানটিয়া

    বুলবন ওসমান কদিন থেকে সকালটা খুব ফাঁকা যাচ্ছে রাশেদের। কাজের ছেলেটা আসবে আটটার দিকে। বিদুষী স্ত্রী গেছে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট করতে যুক্তরাজ্য। এই মাঝবয়সে একা একা নিঃশব্দ ঘরে বেশ অস্বস্তি বোধ করে। মেয়েটাও গেল হোস্টেলে। স্থাপত্যবিদ্যার মডেল করতে দিন-রাত লেগে যায়। ফলে সে গৃহত্যাগী। মা নেই, মেয়ে নেই, কাজের ছেলেটা নেই, আছে শুধু সে একা, সকালের…