কবিতা
-
যন্ত্রঘর
তুষার কবির নৈঃশব্দ্যের ফেলে দেয়া আধুলি কুড়িয়ে ফিরে যাচ্ছে সংগীতের মৌন পুরোহিত; মন্দ্রিত মূর্ছনা আর ভগ্ন উপাখ্যান রচনার শেষ দিনে সে কুড়িয়ে কুড়িয়ে জড়ো করে নিচ্ছে যতো ছায়াচেরা গান আর স্তব্ধতার স্বরলিপি – ধ্বনিময় পৃথিবীর টানে আর শূন্যতার অনিঃসীম গানে সে ফিরে যাচ্ছে তার সুরমগ্ন যন্ত্রঘরে – দ্যাখে বেহালাটা আর আগের জায়গায় নেই;…
-
বালিকাবন্ধু
মাহবুব বারী এক বালিকাবন্ধু আমার, তোমাকে দেবো কল্পনার উড়ন্ত ডানা সমুদ্রের স্বপ্ন দেবো গান দেবো আকাশের প্রেম দেবো নানা রঙের, আর দেবো তারা-ভরা রাতের আলো জোছনার চাঁদ; আমাকে শুধু সঙ্গে নিয়ো আর কিছু তো নাই যে আমার সাধ। দুই স্বপ্ন নেই কোনো তবু স্বপ্ন দেখি বালিকার মুখখানি দেখে, কোথায় গন্তব্য তোমার, কোথায় রেখেছ…
-
বৌদ্ধবিহার
হাফিজ রশিদ খান আমি অক্লান্ত বৌদ্ধবিহার সময়ের সোপানে-সোপানে গেঁথে রেখেছি হাজার বছরের চিহ্ন মুক্তিকামী আমার উড়াল আকাশে-আকাশে নাদব্রহ্মে করি বিচরণ নক্ষত্রখচিত রাতে পর্বতমালার চূড়ায়-চূড়ায় মায়াভরা মাটিতে সবুজ ঘাসের ডগায় প্রব্রজ্যা বাতাস – জগতের প্রাণী, আমাকে তো চেনো সকলেই… বাসনার জটিল জাজিম ঘেরা এই বসুন্ধরা বীরভোগ্যা বলে নিত্য কুরুক্ষেত্র প্রণয়ন করি তাই স্থিতিস্থাপকতার…
-
মুসাফির
রোকসানা আফরীন পরমের হাতছানি পরমের আলো এই তো জীবন সখা, এই পরাজয় কারাগার থেকে কারাগারে ছিন্ন হতচ্ছিন্ন আলো আমাকে বন্দি করে, বন্দি করে রাখে আমার জন্মের ঋণ এইটুকু রেখে যেতে চাই নির্বাণ লাভের ভুলে আমাকেই ডুবে যেতে হবে একা একা কসমিক অন্ধকারে ব্ল্যাকহোল কসমিকে আলোর উদ্দেশে মহাজাগতিক মুসাফির হয়ে…
-
নদী ও কবিতা
রবিউল হুসাইন এদেশের মানুষ উর্বর পলিমাটি তাদের বুকের ওপর দিয়ে আকুল নদীগুলো সাগরের দিকে বয়ে চলেছে কুলকুল উন্মূল কূলে কূলে শস্যাদি ফসল ফলফুল প্রজাপতি দূরে রঙিন পাখা মেলে ওড়ে বাতাসের শূন্য পরিসরে ডানায় ডানায় প্রতিসাম্যের বর্ণালী চিত্রকলাসম্ভার কারা এইসব সৃষ্টির মৌলিক শিল্পী এত যে অপূর্ব অভিন্নতার প্রতিটিই স্বয়ংসম্পূর্ণ অথচ ভিন্ন ভিন্ন অবয়বে অসাম্যের…
-
বেচারা আঙুল
হারিসুল হক এ-পথ আমার নয় যে-পথে হেঁটে গেছো তুমি দুরন্ত বজ্রের শব্দে ফাটে কর্ণপটহ – বিচ্ছিন্ন হতে থাকে বেচারা আঙুল যে-পথে তুমি গেছো সে-পথ আমার নয়… স্টেশনে বিকেল নামে হিম এক নদীর আদলে অরণ্যে জারজ গাছ ছায়া গিলে… পথ কি ঝর্ণা নাকি নাকি পথ সর্ষে কুঁড়ি – শুধু দোলাচল শুধু মিটমিট… …
-
কথামালা
শংকর চক্রবর্তী কতদিন উড়িয়েছি পুরনো দিনের কথামালা নিজেরই একান্তে ছিল সবকিছু গোপন আলোয় সন্ধে নেমে এলে শান্ত হয় যেন গিরিতরঙ্গিনী আকাশে উড়া, ভাবি, এবার আকাশে উড়ি বেশ খোলামেলা কতদূর মনে নেই, দেখি দু-পা এক-পা খেলায় বৃক্ষ-সমারোহে শুধু হাসির ঝিলিক উড়তে উড়তে ডানা গেল ভেঙে রক্ত-লাগা ছেঁড়া পালকের ওড়াওড়ি আমি হালকা হয়ে দ্রুত নেমে আসি…
-
ঝাঁপতাল
সুহিতা সুলতানা এক স্বপ্নের রাতে জল ও জালের খেলা দেখতে গিয়ে ধীবরের জালের ভেতরে দেখেছি আমি তার চাঁদমুখ মায়ার ফাঁদে আসি জলে নেমেছি তাকে ছুঁতেও পারিনি। প্রতিরাতে অপাপবিদ্ধ আলো হয়ে ঘূর্ণায়িত নাভির ভেতরে তৃষ্ণার নদী হয়ে ভাসিয়ে নেয় ঝাঁপতাল। মগ্নতার ওপারে ডুবসাঁতার খেলে নীল ফড়িঙের ডানা। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে ঘনীভূত হতে থাকে বিষাদের…
-
গ্রহ
তাপসকুমার রায় ধরো, এই গ্রহ যদি কোনোদিন রেগে ওঠে রেগে উঠে মাথা ঝাঁকিয়ে যদি বলে আমার এ অতিদূর সময়ের ভার আর রাখবো না – যদি জল নেমে যায়, পাহাড় ভেঙে পড়ে যদি ঘুমের মধ্যে গর্ভের শিশু নড়ে যদি আলো নিভে গিয়ে সূর্য হয়ে পড়ে এক মৃত নক্ষত্র যদি সমস্ত সবুজ মুছে গিয়ে আকাশ ভরে…
-
ছয়-দশকের একটি গল্প
জাহিদ হায়দার আমার বোনকে দেখার দাম দশ টাকা। হারিকেনের হলদে আলোয় জিন্নার টুপি পরা ছবি বোনের হাতে কেঁপে উঠেছিল শ্যামলা মুখের জন্যে পাঁচ, কালো, লম্বা চুলের দাম তিন, আর চার জোড়া চোখের সামনে ভীরু পায়ে হাঁটার মূল্য দুই টাকা; আমি মনে মনে হিসাব করেছিলাম। লক্ষ্মীপেঁচার ডাকে এক বার্তা খুঁজে – ও…
-
অগ্নিসঙ্গিনী
বায়তুল্লাহ্ কাদেরী এক আমাকে জলজ ভেবে কেন তুমি ভিজে উঠেছিলে স্বিন্নতায় নিজের ভিতরে? কেন গোধূলিকে গাভিছায়াময় স্মৃতিভূমি ভেবে বসেছিলে খুব নিচু, থুতুনিতে দেখি গম্ভীর মৌসুমি বায়ুর নিঃসঙ্গ ঘূর্ণি, মুখ ছেয়ে গেছে শৈতিক বিষণ্ণতায়, মনে পড়ে, তুমি ছিলে অগ্নিসঙ্গিনী। জীয়নকাঠি। শূন্যতায় আমার আগুনে এসে এলোমেলো কখনো তোমার মৃতধূপ জঙ্গমপারঙ্গমতা পায়, বিস্মৃতির নগ্ন তাসের তুরুপ তুমি…
-
তুমি গুপ্তধন
মাহমুদ কামাল খুঁজে খুঁজে যা পেলাম তা প্রার্থিত শরীর নয় একটি কংকাল ওই কাঠামো থেকে নিঃশ্বাস বেরিয়ে গিয়ে সৌন্দর্যের নিসর্গ-নিচয় শিকড়ে প্রোথিত। মাটি খুঁড়ে কেউ পায় সোনাদানা তেল কিংবা তিল দু-বুকের চিরচেনা তিল খুঁজতে গিয়ে যে-কংকালটি মাটি স্ফুরে এলো লাবণ্য-লতিকা আর তিলের প্রান্তিকে অন্বেষণে যা পেলাম তার প্রতিস্থাপনায় অন্য এক ছবি। আলোক চিত্রণের বিপরীতে…
