ছোট গল্প
-

মেহেরজান
চোখের আড়াল হতে না হতে পদ্ম এমন বদলে যাবে, পদ্ম ওরফে পার্লির মা মেহেরজান যদি আগে আন্দাজ করতে পারত! পরের ঘটনা আগে জানার উপায় নেই; তবু ভাবে যদি জানত, অন্তত একটা ইশারাও মিলত, তাহলে কি দিনের পর দিন চুলমুঠি টেনে মাটিতে আছড়ে মুগুরছেঁচা দিত! কিল, লাথি-উষ্টা, ডালঘুটনির বাড়ি। লম্বা, ঘন কোঁকড়া চুল – ধরার সুবিধা…
-

বাবার কিছু ঋণ ছিল
৫ অক্টোবর ২০১৭ সকালবেলা স্যার, একজন লোক আসছে। কোত্থেকে? বাইন্নানগর। ইয়ে মানে বানিয়ানগর। পুরান ঢাকার সূত্রাপুর এলাকা। চোখ তুলে জিন্নাহর দিকে তাকালাম। কী নাম? রশিদুল। বানিয়ানগর থেকে এসেছে শুনেই বুঝেছিলাম, রশিদুলই হবে। আমার কিশোরবেলার বন্ধু। বহু বছর তার সঙ্গে দেখা নেই, যোগাযোগ নেই। অথচ একটা সময়ে আমরা দুজন দুজনার জন্য পাগল ছিলাম। দিনের বেশিরভাগ সময়…
-

ভোররাতে শুরু হয় অপারেশন
ভোররাতে শুরু হয় অপারেশন। দুটো বন্দুক আর একটা মাত্র এলএমজি সম্বল করে এতবড় অপারেশন কল্পনাও করা যায় না। অবশ্য তাদের অন্যদের হাতে ছিল গ্রেনেড। এই গ্রেনেডও ঠিকমতো ছুড়তে পারলে খুব শক্তিশালী। সীমান্ত থেকেই তাদের ক্যাপ্টেন বলে দিয়েছিলেন, অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা। কাঁকড়ভরা চালের ভাত খেয়ে এতদিন বেঁচে আছো না? এই খানা খেয়েই যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়েছো না?…
-

একদিন অরিত্র
মে ট্রো অনড়। এসি কোচ, জানালা-দরজা বন্ধ। খুব একটা অসুবিধে হচ্ছে না। তাছাড়া নেমে হাঁটার উপায় তো নেই। সুড়ঙ্গের মাঝখানে স্তব্ধ। যাত্রীরা ক্ষুব্ধ। সময়ে অফিসে পৌঁছোনোর তাড়া। নানা মন্তব্য, এমনকি দরজায় লাথি, চিৎকার হইচই। এমন প্রায়ই ঘটে। কর্তৃপক্ষ পরের দিন পত্রিকা-টিভি মাধ্যমে খবর দেয় : কারো মরণঝাঁপ, অথবা থার্ড রেল বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন, কিংবা কোনো কামরায় ধোঁয়া…
-

বাঁচিয়ে রাখার স্বপ্ন
সেলিনা হোসেন কলেজজীবনে প্রেমের সূচনা হয়েছিল দুজনের। ভালোলাগার প্রচ্ছন্ন ভঙ্গিতে আশ্চর্য দৃষ্টিমোহন রেশ জড়িয়ে হাত ধরল দুজনে। মুগ্ধতার ছটায় বেজে উঠল দিনযাপনের ঘণ্টা। প্রথমে ঊর্মিলা নিজেকে ছড়িয়ে দিলো আকাশের মনোভূমির সবুজ প্রান্তরে। দিগন্তরেখায় দাঁড়িয়ে বলল, তাকাও আকাশ। দেখো আমাকে। আমি তোমাকে ভালোবাসি। হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে আকাশের দৃষ্টি। বলে, আমি তোমার এই কথা শোনার…
-

রানির ফলপাকাড়ি
বুলবন ওসমান কাঁটায় কাঁটায় এগারোটা পনেরোয় নেতাজি সুভাষ বিমানবন্দরে বিমানের অবতরণ। দশ কিলোর একটা ট্রলি নিয়ে ইমিগ্রেশনে দশ মিনিট। ঠিক বারোটা চারে বহির্গমন ধরে ফজলের নির্গমন। দরজার পাশেই অনুজবৎ প–ত দ-ায়মান। নমস্কার দাদা। নমস্কার। তোমার মেয়ের বৈবাহিক অনুষ্ঠানের সব তৈরি? প্রায় সেরে এনেছি। চাকরিটা এবার ছাড়তে হবে তো, তাই কিছুটা অফিসিয়াল ঝামেলা রয়ে গেছে।…
-

তৃণাদপি
এই গল্পটি আগে একবার বলা হয়েছিল। তবুও আরো একবার শোনা যায়। এক পিতামহ যেদিন গৃহত্যাগ করেছিলেন সেদিন বৃষ্টি ছিল। আমার পিতা আমাকে এই কথা বলেছিলেন। প্রচ- বর্ষণে সেদিন ভেসে যাওয়া মাঠ ও শস্যক্ষিত কেবল সমুদ্রের আভাস দিচ্ছিল। অবশ্য গর্জন ও ঢেউ ছিল না। বৃক্ষরাজিও অমনি ভেসেছিল, জনপদের মতোই এবং বড়ঘরের চালায় বসে কদিন কাটানো যায়…
-

তাবিজ-বাঁধা হাত
\ এক \ অধিবেশনে মূল প্রবন্ধ পড়া হয়ে গেলে সভাপতি উপস্থিত অংশগ্রহণকারীদের মন্তব্য করার জন্য আহবান জানালেন। তিনি এর জন্য প্রত্যেক মন্তব্যকারীকে সময় দিলেন দশ মিনিট। একে একে বেশ কয়েকজন এই সময়সীমার মধ্যে তাদের বক্তব্য রেখে গেলেন। সবশেষে এলেন এক মহিলা। তিনি দশ সেকেন্ডে তার মন্তব্য শেষ করে মঞ্চ থেকে নেমে এলেন। কোনো সেমিনারে বা…
-

শব্দযান
ফড়িং-ঘাসফড়িংয়েরা মরে যাওয়ার পর একটু একটু করে শুকোতে শুকোতে, শেষ পর্যন্ত শুকিয়ে চিমসে, শুকনো খড় যেন, এমন চেহারা পেতে পেতে হয়ে যায় বিচালির টুকরো। বাঙালরা – দেশভাগের সময়, আগে-পরে পূর্ববঙ্গ থেকে খ্যাদা খেয়ে এপারে – পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরায় চলে আসা মানুষেরা, যাঁরা – সেইসব পূর্ববঙ্গীয় মানুষদের বেশিরভাগই তো হিন্দু নয়তো বৌদ্ধ – খুব সামান্য হলেও…
-

কতদূর? আর কতদূর?
ঐশী আলমারি খুলল। বিয়ের নীল বেনারসিটার দিকে চোখ গেল। না। বিয়ের কোনো স্মৃতিই সঙ্গে নিয়ে লাভ নেই। ২৩ বছরের খুঁটিনাটি স্মৃতি যদি বইবেই তবে আর মুক্তি কিসে? অবশ্য – ঐশী নিজেই জানে না মুক্তি কাকে বলে। এই ২৩ বছরের মধ্যে আঠারো বছর ধরেই এই দিনটার অপেক্ষায় থেকেছে ঐশী। মুন্নির তখন পাঁচ বছর। তখন থেকেই ঐশী…
-

মমতাজ মহল
মহুয়ার সঙ্গে আমার দাম্পত্য কলহের অন্তত আশি ভাগ জুড়ে রয়েছে মমতাজ মহল। এক বা দুদিনের কলহের আশি ভাগ নয়। একত্রিশ বছর ধরে যত কলহ হয়েছে তার আশি ভাগ। ঝগড়াটা যেভাবেই শুরু হোক, এর উপসংহারে মমতাজ মহল থাকতেই হবে। আমাদের বিয়ের দ্বিতীয় বছরের শুরুতে এক রাতে খাওয়ার সময় হেঁচকি ওঠে। মহুয়া হেঁচকিটাকে খুব সিরিয়াসলি নেয়। আমি…
-

সাঁঝে-সকালের ঝিঙা ফুল
বাইরের উঠোনে সাইকেলের প্যাডেলে পা রেখে হরিহর হাঁক দিলো, ‘এসো!’ ঘরের ভেতর ভ্যানিটি ব্যাগে এটা-ওটা, মায় নিজের মোবাইল ফোনটা গুছিয়ে নিতে নিতে অণিতা উত্তর করল, ‘হ্যাঁ, যাই।’ সকালবেলা। ঝলমলে রোদ উঠেছে। বাঁশঝাড়ে নিম-চল্লার গাছে কাক-কুইরি যেমন ডাকে, ডাকছে। বেগুনঝাড়ের বেড়ায় লতিয়ে-ওঠা কাবাগুড়ি ফল পেকে এখন টকটকে লাল! হরিহর সাইকেলের বেলটায় আলতো চাপ দিয়ে ‘ট্রি-নি-টি’…
