ছোট গল্প
-

নির্জন রাতের সহযাত্রী
শুক্রবারের পূর্বাহ্ণ। জাহিন বসে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের পুকুরপাড়ে। চারদিকের প্রাচীন গাছগুলোর ছায়া নিয়ে পুকুরের জল আরো নিকষ নীলের গভীরে নিজেরাই গোসলে মগ্ন। প্রতি শুক্রবারের মতো হাফপ্যান্ট পরে সাঁতার কাটার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে এলেও কী এক অনুভূতি তাকে অবশ করে রেখেছে। গ্রামের বাড়ির পুকুরটার সঙ্গে অনেক টুকরা টুকরা স্মৃতি নামের ভালোবাসা তাকে হয়তো ওভাবে আনমনা করে…
-

কুয়াশা পাহাড়ের উপাখ্যান
অতীন সরকার বললেন, আপনি দেখতে পাবেন মানুষ কুয়াশা থেকে এসে কুয়াশায় ঢুকে যায় এদেশে, কুয়াশা যখন নামে, সূর্যাসত্ম অবধি থেকে যায়, এমনও হয়। বিপুল এসেছে পিতৃভূমিতে। কলকাতা থেকে নেত্রকোনা, নেত্রকোনা থেকে কংস নদ পেরিয়ে সোমেশ্বরী নদীর ধারে সুসং দুর্গাপুর। সঙ্গে নেত্রকোনার অতীন। তিনি এক ইতিহাস রচনা করছেন অথবা এক পা-ুলিপির ভেতরে আরো কাহিনি যোগ করছেন,…
-

বিবর্ণ আকাশ
রূপার বিবাগি হয়ে যেতে ইচ্ছে করছে। অত নিদারুণ খবরের সঙ্গে সঙ্গে ততোধিক ঘটনাপ্রবাহ হজম করার চেয়ে বনজঙ্গলে নিবাস গড়াও সহজ মনে হচ্ছে তার। তা সে-খবর আর কিছুই নয়, আরিফ সপ্তাহখানেক হলো ছাড়া পেয়েছে। অবশ্য কেবল খবর শুনেই হাত-পা ঠান্ডা করে বসে থাকার মেয়ে রূপা নয়। আরিফ কাল এ-বাড়িতে এসেছিল সে-খবরেও খুব ভেঙে পড়ার মতো কিছু…
-

তেলাকুচার সিন্দুর রং
সমস্যা ভাবলেই সমস্যা, না ভাবলে কিছুই নয়। তবে সমস্যাই হোক আর কিছুই না হোক, বিষয়টির সূচনা হয় এখান থেকেই। এক সন্ধ্যায় সাদেক মিয়া রিপনের মাকে তসলিমার মা বলে ডেকে ফেলে। রিপনের মা বাইরে ছাগল দোহাচ্ছিল মনোযোগ দিয়ে আর ছাগলের বাচ্চাটা তিড়িং-বিড়িং করছিল পাশেই। মাথার ওপরে বরইগাছ থেকে ফুল ঝরছিল ঝুরঝুর আর কলাগাছের লম্বা পাতায় বাতাস…
-

ধৃতরাষ্ট্রের সন্তানসন্ততি
বছরপাঁচেক হলো দর্শনে এমএ করেছি। টিউশনি করে হাতখরচ চালাই। শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এসএসসিতে বসি। একবার কোয়ালিফাই করেও ভাইভাতে বাদ হয়েছি। আসলে বিষয় নির্বাচনে ভুল। দর্শনে ভ্যাকান্সি কম। চাকরির সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তবু সুযোগ এলো। ফুল ডিপার্টমেন্টে। লিখিত পরীক্ষায় বসতে হবে না, কেবল ইন্টারভিউ। বাবা ব্যবস্থা করেছেন। পেছনে অন্য কোনো গল্প আছে কি না…
-

রামবিলাসের একেকটি দিন
সকাল দশটা বা সাড়ে দশটা হবে। ধু-ধু লাল মাটি। ডানদিকে ফসল উঠে যাওয়া মাঠ। বাঁদিকেও তাই। মাঝখানে টানটান রেললাইন। স্টেশন ছাড়িয়ে রেলপথ চলে গেছে চোখের শেষ সীমা পর্যন্ত। এ-পথের দুধারেই খানিক খানিক জুড়ে ছোটমাথা ঝাঁকড়া গাছ। মহুয়া, নিম, বনসৃজনের ইউক্যালিপ্টাস। রেলপথের সে-জায়গাগুলো ছায়া-ছায়া। রোদ আর ছায়ার মাখামাখি। এর বাইরে গাছ ছাড়িয়ে লাইন কোথাও একেবারেই ফাঁকা।…
-

অগস্ত্যযাত্রা
যার যে স্থানে জন্ম, সেই জন্মস্থানের মাটিতে মিশে যাওয়ার অন্তিম বাসনা অনেকেরই হয়। হার্টে প্রথমবার মৃদু ধাক্কা খেয়ে, আবারো বড় অ্যাটাকের আশংকায় আমিও স্বজনদের কাছে শেষ ইচ্ছেটি জানিয়ে রেখেছি। মরে গেলে পৈতৃক ভিটাতেই আমাকে কবর দিও। কার মরণ কোথায়, কখন এবং কীভাবে ঘটবে, কেউ ঠিক জানে না। কিন্তু এটুকু জানি, মরার পর লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সে দীর্ঘ…
-

বাছেত মিয়ার দ্বিতীয় পর্বের জীবনযাপন
বিশেষত কুকুরটা সারাদিন একটা খেকিকুকুরের পেছনে প্রচুর সময় দেয়, সারাদিন ডেটিং করে
-

বারান্দা
জানালাটা বন্ধই থাকত। গাড়ি-ঘোড়ার আওয়াজ, ধোঁয়া, ধুলো, হাড়বজ্জাত মাতালের মাতলামি কোনোটিকেই কারণ হিসেবে দায়ী করা যাবে না। তথাকথিত ফ্ল্যাট-বাড়ির জানালাও এটি নয় যে, অন্ধের কি-ই-বা দিন কি-ই-বা রাত! শুধু ছিটকিনি খোলার অপেক্ষা। হুড়মুড়িয়ে রোদ আর বাতাস। আহা কী দিনই না ছিল! শুধু কি জানালা! দরজা খুললেই চওড়া বারান্দা। শীতের সকালে আরামকেদারা আর খবরের কাগজ। পিতৃপুরুষের…
-

অদরকারি
বাস্তব জগতে যখন কিছু ঘটে, তখন তা ঘটতে যা যা লাগে তার সবকিছু নিয়েই সে ঘটে – যেমন আসমান থেকে জমিনে বৃষ্টি পড়তে পানি লাগে, আসমান লাগে আর জমিন লাগে। তিনটে জিনিসের উপস্থিতিতেই কেবল ‘গগনে গরজে মেঘ ঘন বরষা’ হয়। মুশকিল হচ্ছে, যা লাগে না তা-ও থাকে, যেমন সুলতাদের ঘিনঘিনে কানাচে একটি আত্মজ্বালা মানকচু গাছ…
-

তমোহর
অফিসের পোশাক পরে মেয়ের হাত ধরে বেরিয়ে যাওয়ার আগে তমোহরের রুমে উঁকি দিলো সেঁজুতি। বিছানায় পা ছড়িয়ে বসে, নতুন কেনা গিবসনের গিটারটার টিউনিং করছিল সে। ওদের উপস্থিতিতেও সে-কর্মের কোনো ছেদ ঘটে না। সে আপনমনে টিউনিং করতে থাকে। সেঁজুতি জানত, ও এক পলকের জন্যও চোখ মেলে তাকাবে না। তাই বেশ উঁচু কণ্ঠে বলে, ‘আমরা যাচ্ছি।’ তমোহর…
-

বোবা রাজহাঁস
‘ইলিশ নিবেন গো মা – ইলিশ মাছ – পদ্মার ইলিশ – ’ মাছওয়ালা পাড়ায় হেঁকে বেড়াচ্ছে অনেকক্ষণ থেকে। বাড়ির সামনে দিয়ে হেঁকে গেল কয়েকবার। কার্তিকবাবু রাস্তার দিকের ঝুলবারান্দায়। বর্ষার ভিজে বাতাসে ইলিশের আমন্ত্রণ! তৃতীয়বার লোকটা আসতেই – চাকরির প্রবাস থেকে বউ গোলাপবালার কাছে ফেরার মতো অমোঘ আকর্ষণে মাছের ব্যাগ নিয়ে নিঃশব্দে পথে নেমে এসেছেন কার্তিকবাবু।…
