ছোট গল্প

  • মেঘের বিদ্যুৎ মেঘে যেমন

    মেঘের বিদ্যুৎ মেঘে যেমন

    অনেকটা দূরত্ব পেরিয়ে ক্লান্ত তিতলি, ছয়তলার নিচে ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে যিশু। বিষণ্ন! যিশুকে দেখলে তিতলির বুকের ভেতর ব্যথা হয়, টনটন করে কোথাও। একবার মনে হয় ফিরে গেলেই হয়, কী হবে কাছে গিয়ে; এরচেয়ে এ-ই ভালো – থাকুক কেউ তার অপেক্ষায়! হয় না আর। যিশুর সুতোর টান অনিবার্য। তিতলি সিঁড়িতে এগোয়, হাত বাড়িয়ে কাঁধের ব্যাগটা নেয়…

  • রাজবিলাস

    রাজবিলাস

    গুড়ুম! গুড়ুম! গুড়ুম! বন্দুকের গুলির শব্দে অপরাহ্ণের রাজবিলাস জেগে ওঠে। হরেক রকম গাছের ঝোপ থেকে ঝাঁক-ঝাঁক পাখি সরবে উড়ে যায়। সেই উড়ালে গাছের ডালপালা ঝাঁকুনি খায়। পাকা আম থুপ্থাপ্ ঝরে পড়ে। সারি-সারি কড়ই গাছের ডালে কেহ্চকুমারী পোকার প্রিয় কচি পাতার কোনো কোনো ঝোপও কেঁপে ওঠে। এমন ঝলমলে দিনে বন্দুকের শব্দ বাজ পড়ার মতো চারদিক কাঁপিয়ে…

  • ভানুমতীর ঐরাবত যাত্রা

    ভানুমতীর ঐরাবত যাত্রা

    শুক্লপক্ষের ত্রয়োদশী তিথি। বৃক্ষায়ুর্বেদবিদ্যা পাঠ শেষে ভানুমতী পিতার জন্য ঘৃতান্নসমেত নালিতা শাকের বন্দোবস্ত করতে বসে গেল। প্রভাতের আগেই তিনি বিহার রওনা হবেন। ভানুমতীর বড় ইচ্ছা সেও একবার বিহারযাত্রা করবে পিতার সঙ্গে। কিন্তু সে এক দীর্ঘ ক্লান্তিকর পথ। কত দূর-দূরান্ত থেকে শাস্ত্রজ্ঞান নিতে আসছে মানুষ! গল্প শোনে আর মুগ্ধ হয়ে তারা মায়ের নামে সংকল্প ব্যক্ত করে,…

  • দিনটা যখন যায়, যার যায়

    দিনটা যখন যায়, যার যায়

    আমার ব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট – নামটা নাই বা বললাম, খবিশ লোকেরা তো জেনেরিক, আলাদা নামের মহিমা তাদের জন্য না – আমাকে যে সহ্য করে না, তার প্রমাণ দিলো ঢাকা থেকে হঠাৎ আমাকে বরগুনা বদলি করে, তার আস্তিনের নিচে লুকিয়ে রাখা বিশেষ ক্ষমতা আইনে, যদিও তার ক্ষমতাটা যে বউ-বাহিত এবং চুরি-চামারিঘটিত তা আমি জানি। তবে…

  • আগুন

    আগুন

    সত্যি বলতে একরকম রাতারাতিই গৌরীসেনের ভাণ্ডার লুটে এনেছিল তারা। কি দিনই না গিয়েছে সব। আর্থকাটিং, জাঙ্গলক্লিয়ারিং, হাটিং, ব্রিকসলোডিং, আর আনলোডিং, – এক একটা কন্টাক্ট-এর সঙ্গে রানিং পেমেন্ট। আরাং নেই এক পয়সার অথচ টাকা এসেছে যেন স্রোতের মতো – উপড়ে পড়েছে গিয়ে ব্যাঙ্কে ব্যাঙ্কে। আর সে কি কর্মচঞ্চল জীবন। রয়েল ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের এস, ডি, ও, থেকে…

  • মেহের জানের মা

    মেহের জানের মা

    ফাঁকা একটা প্রথম শ্রেণীর কামরার ভিতর দিয়া আসিয়া জমিলা রকীবাকে ছোট্ট একটা কুঠুরীর ভিতর প্রায় ধাক্কা দিয়া ঢুকাইয়া দরজা বন্ধ করিয়া দিল। রকীবার পেটে পিঠে শাড়ীর নীচে চটের থলিতে সুপারী বাঁধা। হাতে মবিলের টিন। দেওয়াল ধরিয়া দাঁড়াইয়া সে ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলিতে লাগিল। নিজের পেটের দিকে নজর পড়িতে মনে হইল যেন আট-নয় মাস। মেরা-জান যখন…

  • একরাত

    একরাত

    বায়েজিদ বোস্তামীর পাশের পাহাড়গুলো ঢেউ দিতে দিতে মিশে গেছে আকাশে। এদিকে মিলিটারি ক্যান্টনমেন্ট। চারদিকে তারের বেড়া। গেটে সেন্ট্রি। তাঁবুর পর তাঁবু সাজান – যেন অসংখ্য ব্যাঙের ছাতা ফুটে আছে পাহাড়ের থলিতে। জিপ, লরি, ওয়াগন আসছে যাচ্ছে। সোলজাররা মার্চ করে একদল ঢুকছে, একদল বেরিয়ে যাচ্ছে। গেটের কিছুদূরে ঝাপ মেরে দলা হয়ে বসে আছে লিকলিকে আধা লেংটা…

  • আশ্চর্য দুপুর

    আশ্চর্য দুপুর

    এক কাপ চা গিলতে তিন ঘণ্টা সময় লাগার কথা নয়। তবে শুধু এক কাপ চা নয়। কাঁটা চামচ বিঁধিয়ে আস্ত ছ’ আনার একটা চপ্ সাবাড় কোরছিলাম। ঘটনাটা অবশ্য নিছকই আকস্মিক। পকেটে যার সাড়ে তের আনা পয়সা মূলধন, তার কাছে ত বটেই। তাঁতীবাজার থেকে হেঁটে আসছিলাম। সেপটেম্বরের ক্লাসিক্যাল রোদ। বিত্তবানদের চকচকে গাড়ীর ঢাকা চরকার মত ধাবমান…

  • প্রাণের চেয়ে প্রিয়

    প্রাণের চেয়ে প্রিয়

    ওরা এসেছে। হ্যাঁ নিশ্চয় ওরা। আনন্দে তোলপাড় করল বুক। কত দিন ওদের দেখিনি, আজ তিন তিনটে বছর ওরা আমার চোখের অন্তরাল। অনেক অনেকদিন পরে দেখা হবে ওদের সঙ্গে। আব্বা, আম্মা, বাচ্চু, মুন্নি – আমার ছোট ছোট ভাই বোনেরা। তাই আপিস থেকে যখন সাক্ষাৎকারের ‘শ্লিপ’ এলো, তখনই অধীর আগ্রহে উন্মুখ হয়ে উঠেছে মনটা। হবারই কথা। যে…

  • আদিম

    আদিম

    নদী আর গ্রাম পাশাপাশি। ইলশা আর সোনাকান্দি। সোনাকান্দি বর্ধিষ্ণু গ্রাম। হাট, বাজার, মন্দির, মসজিদ, হিন্দু, মুসলমান, চাষাভুষা, জোতদার, জমিদার মিলে একাকার। কিন্তু পাশ দিয়ে প্রবাহিত খরস্রোতা নদী আর নদী নেই। ক্রমশঃ উটের পিঠের মত কাঁচা মাটির স্তর জমাট হয়ে চর পরিধি বাড়াচ্ছে। সবুজ ঘাসের আস্তরণের নীচে নতুন মাটির জীবন আবাদ হচ্ছে। নদী মজে যাচ্ছে। কেবল…

  • গুহা

    গুহা

    হারামজাদীকে পেলে হয় …। অন্ধকার ঠাণ্ডা-ক্যান্টিনের এক কোণে রাখা পাতলা কাঠের টেবিলটা যেন আর্তনাদ করে উঠল। চায়ের জন্যে বাড়তি চিনি রাখার সবুজ প্ল্যাস্টিকের বাটিটা উল্টে পড়ল মেঝের উপর … হারামজাদীকে একবার পেলে হয় … আমি ভাঙ্গা ফ্যাঁস-ফেঁসে কর্কশ গলায় প্রায় হুঙ্কার ছেড়ে চেয়ারে বসলাম। সারাটা ক্যান্টিন থৈ থৈ করছে ভীড়ে, কিন্তু একটি বেয়ারা চোখের পলকে…

  • ষাটের শেষ : সত্তরের শুরু ‘বাঙলাদেশ’-এর ছোটগল্প

    ষাটের শেষ : সত্তরের শুরু ‘বাঙলাদেশ’-এর ছোটগল্প

    ষাট-দশকের শুরুতে যে তরুণ স্কুলের শেষ ক্লাসের ছাত্র, দশকের শেষে সেই তরুণটিই একজন উৎসাহী গল্প-লেখক। এমন ঘটনা আজকের বাঙলাদেশে বিরল নয়। পঞ্চাশের দশকে যারা বাঙলাদেশে সবচেয়ে প্রতিভাবান গল্পকার ছিলেন – পরের দশকে তাঁদের অনেকেই গল্প আর লিখলেন না, কিংবা এমন গল্প লিখলেন যা নতুন পাঠকের কাছে সাড়া তুলতে অক্ষম হলো। প্রতি দশকেই নতুন একদল গল্পকার…