ধারাবাহিক উপন্যাস
-
একটি মেয়ে
আফসার আমেদ ॥ ২৩ ॥ দূরপাল্লার বাসটা ছাড়তে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। ঘড়িতে তখন ছটা দশ। জুনের মাঝামাঝি, বর্ষাকাল চলছে। আকাশে মেঘ। বাসটা বর্ধমান শহর ছাড়াচ্ছিল ধিমেতালে। গতি এখন হ্রস্ব। বাসের মাঝামাঝি বাঁদিকে টু-সিটে তারা বসেছে। সেঁজুতি আর আলম। আলমের গায়ের পাশেই। আলমের অস্বস্তি হচ্ছিল, তাকে বোঝায় তার কোনো অসুবিধে হচ্ছে না, আলম আরাম করেই বসুক।…
-
নদী কারো নয়
সৈয়দ শামসুল হক ॥ ২০ ॥ খ্যাতিমান ঔপন্যাসিক মকবুল হোসেন – যার এত সাক্ষাৎকার, এত ফটোগ্রাফ পত্রপত্রিকায় বেরোয়, যেন এক খোলা বাগানই সে, যে-কেউ বলে দিতে পারবে কোথায় কোন গাছ, কোন ঝিল, ডালেই বা কোন ও কী কী পাখি, কিন্তু এতেও কি সবটুকু তার উন্মোচিত? – আমরা ধন্দে পড়বো যদি তেমন ভেবে নিই এবং পড়বো…
-
একটি মেয়ে
আফসার আমেদ ॥ ২১ ॥ সন্ধ্যা সাড়ে ১০টা বেজে গিয়েছিল মেমারির শীতলাতলায় পৌঁছতে সেঁজুতিদের। মা হইচই ফেলে দেয়। বউদি শাশ্বতী বেরিয়ে আসে। মা কাঁদে। কিন্তু তার হর্ষ বেশি। কথার ঝড় তোলে। ‘আরো সকাল সকাল বেরোতে হয়। ট্রেন ঠিকঠাক পেয়েছিলি? ভিড় ছিল নাকি গাড়িতে? আসবি যখন নবর মোবাইলে ফোন করে দিলি না কেন? নব কাজ থেকে…
-
নদী কারো নয়
সৈয়দ শামসুল হক \ ১৯ \ আধকোশা নদীকে শাসন করবার কী প্রস্তাব আছে মইনুল হোসেন মোক্তারের, সে-বিষয়ে বার লাইব্রেরিতে উপস্থিত উকিল-মোক্তারদের বিশেষ উৎসাহ লক্ষ করা যায় না। তারা মুহূর্তের জন্যে আড্ডার আমেজ থেকে জেগে ওঠে বটে, অচিরে চোখ ফিরিয়ে নেয়। এর কারণও আছে। প্রথমত, উপস্থিত প্রায় সবারই বাড়ি নদী থেকে অনেক দূরে; নদীভাঙনে ব্যক্তিগতভাবে তারা…
-
একটি মেয়ে
আফসার আমেদ \ ২০ \ বিছানায় বালিশের আড়ালে গুটিসুটি মেরে শুয়ে লুকিয়ে পড়েছে সেঁজুতি, হৃদয় তাকে খুঁজে পাচ্ছে না। হৃদয়ের সঙ্গে সে লুকোচুরি খেলছে তার ফ্ল্যাটে। হৃদয় খুঁজছে তো খুঁজছে, খুঁজে খুঁজে সারা হচ্ছে। সে অথচ হৃদয়কে দেখতে পায়, হৃদয় তাকে দেখতে পায় না। বাথরুমে আরশোলারা ওড়াউড়ি করে। রান্নাঘরে মশলার কৌটোগুলো পড়ে যায়। তার মধ্যে…
-
একটি মেয়ে
আফসার আমেদ \ ১৯ \ সেঁজুতির মোবাইল সেটটা কোথায় খোয়া গেছে। আলমদের বসতিবাড়ি থেকে ফিরে আর পাচ্ছে না। ফেরার পর দুদিন পেরিয়ে গেছে, আজই মনে পড়ল তার। সেই যে ওখানে মোবাইল সেটটা নীরব করে রেখেছিল, তারপরেও এই দুদিনে তার সরবতা বোধ করেনি। নিয়ে এসেছিল তো? জানে না। সুইচ স্টপ আছে, কোথাও গুঁজে রেখেছে, দরকার হয়নি…
-
নদী কারো নয়
সৈয়দ শামসুল হক \ ১৮\ উনিশশো সাতচল্লিশ সালের আগস্ট মাস – হিমালয় দক্ষিণের উপমহাদেশ থেকে – বিশেষ আমাদের এই জলেশ্বরীতে ব্রিটিশ বিদায়ের সেই দিনটি – পাকিস্তানের জন্মলগ্নের চোদ্দই আগস্ট বৃহস্পতিবার, আর হিন্দুস্থান তথা ভারতে পনেরোই আগস্ট শুক্রবার – সেই উন্মত্ত সময়ের বয়ান আমাদের কাছে কে করবে? আমরা কুসমির ঘরে সাইদুর রহমান কন্ট্রাক্টরের মুখে গল্প শুনছিলাম…
-
একটি মেয়ে
আফসার আমেদ \ ১৮ \ সেঁজুতি বস্তির ওই ঘরে ও বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়েছিল। বস্তি ঘর-লাগোয়া রাস্তায় গভীর রাতে একটা গাড়ির আওয়াজ এসে মিশল। গাড়িটা এলো। হর্ন বাজাল। থেমে গেছে আলমদের ঘরের সামনে। হর্ন বাজাল আরো কয়েকবার। আর কেউ যেন গাড়ি থেকে নামল ভারী বুট পায়ে। বস্তির ভেতর বুটের শব্দ বাজল। আলমদের দরজায় কড়া নাড়াবার…
-
নদী কারো নয়
সৈয়দ শামসুল হক \ ১৭ \ মধ্যরাতের গাঢ় ঘুম অথবা সন্ধ্যাকাল থেকে তার ঘোর সুরাচ্ছন্নতা, কোনো একটি, অথবা দুটোই – মকবুল হোসেন অচিরে বিছানায় ঢলে পড়ে, যেন প্রবাহিত হতে থাকে – নদী যেমন, নদীর ঢল নামা স্রোতেই যেনবা সে ভেসে যায়, যেতে থাকে। অচিরকাল মাত্র, সে আবার স্বপ্নের ভেতরে ঢুকে পড়ে। মকবুল হোসেনের শরীরের ওপর…
-
একটি মেয়ে
আফসার আমেদ \ ১৭ \ দরজা খুলে দিলো আলমের মা। আর আলমের ব্যান্ডেজ দেখে হাউমাউ করে উঠল। ‘ক্যা হুয়া রে মেরা জিস্ম কা টুকরা? এ লেড়কি কৌন?’ আলম চাপা স্বরে বলল, ‘জো হামারা জান বাঁচায়া। চিল্লা মত্। পানি দে তো।’ ‘ক্যা হুয়া, কোই লাফড়া?’ ‘লাফড়া-ফাপড়া নেই, স্রিফ অ্যাকসিডেন্ট।’ ‘ক্যায়সে?’ ‘খামোশ, বাদমে শুনো।’ ‘বাদমে?’ ‘হাঁ…
-
নদী কারো নয়
সৈয়দ শামসুল হক \ ১৫ \ অন্ধকারে চ্ছলচ্ছল করে চলেছে আধকোশা। কন্ট্রাক্টর সাইদুর রহমান কী জানবেন, যখন তিনি মকবুল হোসেনের সঙ্গে গল্প করছেন, কী তাঁর – জননন্দিত ঔপন্যাসিক মকবুল হোসেনের মনের মধ্যে তুফান তুলছে। আর ওদিকে ড্রাইভার মেহেরুল্লারই বা কী! মকবুল হোসেন নদীর অন্ধকার বুকে চোখ পেতে আছে। নদীর মতো নারী। শুধু নারী কেন? নর-নারী…
