শ্রদ্ধান্জলি
-
প্যারীচাঁদ মিত্র : ফিরে দেখা
বিশ্বজিৎ ঘোষ উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক প্যারীচাঁদ মিত্র (১৮১৪-৮৩)। প্যারীচাঁদকে আমি স্রষ্টা এবং কর্মযোগী মানুষ হিসেবেই দেখতে ভালোবাসি। জন্মের পর দুশো বছর অতিক্রান্ত, মৃত্যুর পরও আমরা পেরিয়ে এসেছি একশ বত্রিশ বছর – তবু বাংলাভাষী মানুষের কাছে এখনো তিনি এক স্মরণীয় নাম। ভাষাবিদ্রোহী, সমাজনিষ্ঠ, কথাকার, মানব-উন্নয়ন সংগঠক, সাংবাদিক, অধ্যাত্মচিন্তক – কতভাবেই তো তাঁকে…
-
নীলাভ রেখার ঘূর্ণি : সুচিত্রা ভট্টাচার্যের সাহিত্যকৃতি
পিয়াস মজিদ জানুয়ারি ২০০১-এ প্রকাশিত হয় সুচিত্রা ভট্টাচার্যের (১৯৫০-২০১৫) উপন্যাস নীল ঘূর্ণি। মহাবিশ্বের সৃষ্টিরহস্য উদ্ঘাটনের গবেষণায় মগ্ন প্রৌঢ় বোধিসত্ত্ব মজুমদার তার বৈজ্ঞানিক যুক্তি-সূত্রকে দয়িতা নামে এক তরুণীর দুরন্ত-দুর্বার ঘূর্ণিতে সমর্পণ করে চেয়েছিলেন শমশান্তি। দয়িতাও চেয়েছিল তাই। কিন্তু ঘূর্ণি তো আর মাপজোখ মানে না। তাই ভাসিয়ে নিয়ে যায় বোধিসত্ত্ব-দয়িতা এবং তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত আর সবাইকে। সবচেয়ে…
-
তপনদা ও হাসিদিকে যেমন দেখেছি
নূরজাহান বোস তপন রায়চৌধুরীর কথা শুনেছি বরিশালবাসীর কাছে। বিখ্যাত কীর্তিপাশা জমিদারবাড়ির সন্তান হিসেবে। আমাদের কাছে আরো বড় ছিল ওই পরিবারের অনেকের স্বাধীনতা-সংগ্রামে অংশ নিয়ে জেল খাটার খবর। তপনদাও জেলখেটেছেন। ওঁরা ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময়ে সপরিবারে ভারতে চলে যান। তপন রায়চৌধুরী উচ্চশিক্ষিত হয়ে নানা জায়গায় কর্মজীবন কাটিয়ে অক্সফোর্ডে ইতিহাসের অধ্যাপক হিসেবে থিতু হয়ে বসেছেন – ভারতীয়…
-
দ্য স্পিগ্যালকে গুন্টার গ্রাস ভাষা ক্রমাগত নবায়ন হবে
অনুবাদ : আতাউর রহমান রাইহান ১৯২৭ সালে পোল্যান্ডের গ্যাডন্সক শহরে জন্ম নেওয়া গুন্টার গ্রাস সেনাবাহিনীর চাকরি ও যুদ্ধবন্দি থাকার পর খামার এবং খনি-শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। গ্যাডন্সক তখন ডানজিগ নামে পরিচিত ছিল। লেখাপড়া করেন জার্মানির ডুসেলডর্ফ ও বার্লিনে। লেখালেখির পাশাপাশি তিনি চারুশিল্পী হিসেবেও পরিচিত। নিজের বইয়ের সব কাভার করেছেন নিজ হাতেই। ১৯৫৯ সালে তিনি লেখেন…
-
শতবর্ষের শ্রেষ্ঠ ড্রামবাদক গুন্টার গ্রাস
ভূমিকা ও অনুবাদ : আন্দালিব রাশদী ‘শিল্পে কোনো সমঝোতা নেই, কিন্তু জীবনটাই সমঝোতায় ভরা।’ ‘মানুষের মাথা পৃথিবীর চেয়ে বড়।… মানুষের মাথা দানবীয়।’ ‘বিশ্বাস করা মানে আমাদের নিজেদের মিথ্যাকে বিশ্বাস করা। আমি বলতে পারি, আমি কৃতজ্ঞ যে, এই শিক্ষাটা আমি খুব বয়সেই পেয়েছি।’ – গুন্টার গ্রাস গুন্টার গ্রাস (১৬ অক্টোবর ১৯২৭-১৩ এপ্রিল ২০১৫) দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর স্বপ্নহীন…
-
অরুণাভ সরকারের কবিতা
রেজাউদ্দিন স্টালিন যে-আপনজন বেঁচে নেই; তাঁকে নিয়ে লেখা দুরূহ। কারণ তিনি আলোচক কিংবা কবিতার ব্যাখ্যা শুনতে অপারগ। বেঁচে থাকলে আরেক রকম ব্যাখ্যা হতো। এ পর্যন্ত কবিতা ও কবিবিষয়ক মহৎ সব আলোচনার সিংহভাগ সাধিত হয়েছে কবির অবর্তমানতায়। কিন্তু সব আলোচনা যদি হয় কবির মৃত্যুর পরে, তাহলে চলবে কীভাবে? কবি জীবদ্দশাতেই জানতে চান – তাঁর কাব্য-ভাবনা কতটা…
-
কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর ও তাঁর লেখার বিষয়-অনুষঙ্গ
আহমেদ মাওলা জীবন ফুরিয়ে যায়, কথা শেষ হয় না। সরব জীবনকে মৃত্যুই নীরব করে দেয়। কী দুঃসহ সময়ে ডুবে আছি আমরা! এরই মধ্যে না ফেরার দেশে চলে গেলেন কথা পত্রিকার সম্পাদক কথাসাহিত্যিক কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর (১৯৬৩-২০১৫)। মৃত্যু হঠাৎ যেন ছিনিয়ে নিয়ে গেল তাঁকে। শহীদুল জহিরের মতোই যেন ফুলের কলি না ফোটার আগেই ঝরে পড়লেন। এরকম অকালপ্রয়াত…
-
বেগম আখতার ফিরায়ে দিয়ো না মোরে শূন্য হাতে
আবুল আহসান চৌধুরী চলচ্চিত্র ও সংগীতে উত্তরকালে খ্যাতির শীর্ষ স্পর্শ করেছেন – যেমন পৃথ্বিরাজ কাপুর, কুন্দনলাল সায়গল, আখতারি বাই, রাজকাপুর, তালাত মাহমুদ কিংবা অমিতাভ বচ্চন – কলকাতা ছিল বাংলা মুলুকের বাইরে থেকে আসা এইসব শিল্পীর প্রেরণার মরমি ধাত্রী। এঁদের পাশাপাশি ভারতীয় মার্গসংগীতের কিছু প্রসিদ্ধ কলাবতের নামও স্মরণ করতে হয়। কেউ এসেছিলেন জীবিকার সন্ধানে, কেউ…
-
দৃশ্যকলার বাঁশিওয়ালা
অশোক কর্মকার ইয়েলো অকার যাঁর প্রিয় রং। সোনালি আভায় উদ্ভাসিত যাঁর ক্যানভাস আর প্রচ্ছদপট। বাংলাদেশের চিত্রকলা আর ব্যবহারিক শিল্পে যাঁর তুলির আঁচড়ে আমাদের রুচির নির্মাণ। তাঁর আঁকা একটি পোস্টার প্রথম দেখি ১৯৭২ সালে। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন-প্রকাশিত ‘লাখো শহিদের আত্মদানে মুক্ত স্বদেশ এসো দেশ গড়ি’, অসাধারণ এক পোস্টার – যা আজো আমার চোখে লেগে আছে। তখন…
-
আমার বাবার মুখ
মইনুল ইসলাম জাবের ‘অনন্ত অসীম প্রেমময় তুমি’ প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৭টার মধ্যে বাড়ি থেকে বেরুতে হতো আমার আর আমার বাবার। স্কুলে পৌঁছুতে হবে পৌনে ৮টার মধ্যে – কারণ তখন পিটি করে ক্লাস ধরতে হতো সকাল ৮টায়। বাবা ঘুম থেকে উঠতেন সকাল সাড়ে ৬টায় আর তার পরপরই মা আর আমি ৭টায়। বাবার প্রথম কাজ স্যান্ডউইচ তৈরি…
-
তুমি যে গিয়াছ বকুল-বিছানো পথে
রাতুল দেব বর্মণ ঢাকায় গেলে কাইয়ুমভাইয়ের সঙ্গে দেখা হবেই। তাঁর সঙ্গে দেখা না হলে, কথা না হলে ঢাকা সফর বা বাংলাদেশ বেড়ানোর কোর্স পুরো হয়নি। দাওয়াত থাকত প্রতিবারেই। কখনো তাঁর বাড়িতে, কখনো ঢাকা ক্লাব কিংবা অন্য কোনো বন্ধু-গুণিজনের বৈঠকখানায়। দেখা-সাক্ষাৎ, আড্ডায় ডুবে যেতাম দীর্ঘসময়। এমন প্রাণোচ্ছল, প্রকৃতি ও মৃত্তিকালগ্ন মানুষ আমি কজন দেখেছি জানি না।…
-
এত দূরে চলে গেলেন কী করে?
রফি হক শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী প্রসঙ্গে লিখতে বসে আমার আর্ট কলেজে ভর্তি পরীক্ষার দিনটির কথা মনে পড়ে গেল। সেই বিরাশি সালে কুষ্টিয়া থেকে অনেকটা বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে আর্ট কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিলাম। আমার ধারণা ছিল এমন যে, ঢাকার আর্ট কলেজটিতে গেলেই আমাকে ভর্তি করে নেবে। কিন্তু পরীক্ষা দিতে হলো নানারকমের। সেখানেই প্রথম দেখি কাইয়ুম…
