2004
-
সাহস
তুমি লিখেছ গোলাপ আর ভালোবাসার আখ্যান মৃত আর অনন্ত-প্রাণতার গল্প তুমি বেছে নিয়েছ ঠিক মধ্যাহ্ন, যেন রূপকথা; অথচ তখনো এ-নগরে ঈষৎ শীত, দেয়ালে প্রজাপতি জলাশয়ের ওপরে জমাট কুয়াশা ঘাসে নিবিড় শিশির তখনো রাতগুলোই সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর, রহস্যময় এবং মধুর আমাকে চমকে দিয়েছে তোমার সাহস যা দুর্লভ আর তারচেয়ে বেশি আতঙ্ক-সঞ্চারক কিন্তু এ তো আমার জানাই ছিল…
-
হাসপাতালে লেখা
একটা ফড়িং উড়তে উড়তে বসল এসে শেষে গোরস্তানের সবুজ ঘাসের ডগায় রুপোর শিশির কাঁপতে কাঁপতে গড়িয়ে পড়ে পাতা থেকে পাতায় ঝরল যখন পচা গলা লাশের চোখের গর্ত ঘেঁষে মাথার ঝড়ের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে একটা স্বপ্ন তখন ঘুরে বেড়াচ্ছিল একা বগলে ক্রাচ দিয়ে হাসপাতালের বেডে বেডে বন্ধ কেবিনে ঘড়ির কাঁটা ঘুরতে ঘুরতে পেরিয়ে গেল শীতের…
-
দরখাস্তের কী হবে বয়ান
লেখো, কবে জন্ম হয়েছিলো, লেখো তুমি কোন্খানে জন্ম নিয়েছিলে; লিঙ্গের উল্লেখ করো, বলো তুমি জন্মসূত্রে সে-কোন্ দেশের; মুক্তির দশকে তুমি কোন্খানে ছিলে – রাস্তায়, জঙ্গলে, নাকি গূঢ় ভূমিতলে, নাকি মুচলেকা দিয়ে ফুর্তি ক’রে বাইরেই ছিলে; সম্ভাব্য মৃত্যুর দিন লেখার অবশ্য কোনো প্রয়োজন নেই আপাতত যদি-বা আদপে তুমি না-ই জানো সত্যি জন্ম নিয়েছিলে কি না…
-
পাড়া
কুকুরেরা হল্লা করে গলিজুড়ে মানুষের মতো। দুইপাশে দুই রিকশ দাঁড়িয়ে রয়েছে মুখোমুখি, কাউকে ছাড়ছে না পথ। মানুষ অপেক্ষা করে আছে পথ চলবে বলে। ধীরে ক্ষোভ জমে উঠছে ক্রমশ। আশা কমছে ধীরে ধীরে। মানুষ হচ্ছে আশাহত। এরই মধ্যে মাঝখানে ঢুকে গিয়ে মোটর গাড়িও আটকে দিচ্ছে রিকশ’র সারিবদ্ধ বিশাল মিছিল; এইভাবে এইপাড়া মাঝেমাঝে স্তব্ধ হয়ে পড়ে। মানুষ…
-
সোনার নূপুর বেজে যায়
এখন তো বৃষ্টিতে ভেজার বয়স আমার নেই, সাহসও তো নেই – আষাঢ় মাসের এসময়ে অঝোর ধারায় শুনি সোনার নূপুর বেজে যায়, বাজে – অনাদি ঘুঙুর; আনন্দে আপ্লুত গাছগাছালির পল্লব-পত্রালি আন্দোলিত হতে দেখি – যেন পুনঃ কালিদাস-কাল সমাগত! – পত্রেপুষ্পে সুশোভিত প্রিয় বৃক্ষরাজি অপার আহ্লাদে ভিজছে – শুনি ফুল্ল আনন্দ-ভৈরবী! বাঙ্গালার নরনারীগণ বুঝি সুখে…
-
গ্রাস
যে-কোনো পথেই চলি সেসবই তোমার গ্রাস, জানি। যে-কোনো মধুর শব্দ তোমার চর্বণধ্বনি শুধু। সমস্ত রক্তের ধারা সব হাহাকার সে তোমার হাঁ-ভূমিতে জাগানো বিকট বিশ্বরূপ। তারই মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ে পাক খেতে খেতে নির্বাক কুণ্ডলী হতে হতে এই পরিক্রমাশেষে আবার পৌঁছতে থাকি নতুন ভ্রƒণের দিকে আরো এক গ্রাস প্রতীক্ষায় কেননা তোমার পিণ্ড থেকে আমার কোনোই ত্রাণ নেই।
-
রক্তগোলাপের মতো প্রস্ফুটিত
কী-যে হলো, কিছুদিন থেকে আমার পড়ার ঘরে আজগুবি সব দৃশ্য জন্ম নেয় চারদেয়ালে এবং বইয়ের শেল্ফে, এলোমেলো, প্রিয় লেখার টেবিলে। কতবার গোছাই টেবিল সযত্নে, অথচ ফের কেন যেন হিজিবিজি অক্ষরের মতো কেমন বেঢপ রূপ হয়ে আমাকে সোৎসাহে ভ্যাঙচায় লেখার সময়। ওরা কি আমার রচনার পরিণাম বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে কলম থামাতে চায় এই অধমের?…
-
কোয়ান্টাম মেকানিক্স
একটি কাল্পনিক পরীক্ষা করা যাক। ধরা যাক, আমি একটি ঘরে বসে আছি এবং এই ঘরের আলো আস্তে আস্তে কমিয়ে আনা হচ্ছে, তাহলে শেষ পর্যন্ত কী হবে? উত্তরটি খুব সহজ, আমাদের চোখ কতটুকু আলো দেখতে পারে তার একটি হিসাব আছে, যখন ঘরের আলো তার থেকে কমে আসবে তখন আমি আর কিছু দেখতে পারব না। মনে হবে,…
-

নিবেদন
বড় মনের মানুষ যিনি তিনি সবসময় সহজ হতে জানেন। আরোপিত সম্মান-শ্রদ্ধা যে আলোর বলয় তৈরি করে তার ভেতর চুপচাপ স্মিতমুখে বসে থাকতে এঁরা কখনো চান না। আমি যখন বাংলাদেশে গিয়ে ঢাকার ঢাকা ক্লাবে ছিলাম তখন খুব কম লোকই আমার লেখা পড়েছেন। বন্ধুরা চলে যাওয়ার পর খাওয়া শেষ করে ঘুমাতে যেতাম রাত দুটোর পর। ঘুম ভাঙত…
-

উত্তর-আধুনিকতার বিচার : ‘মালিতে বা মেয়োতে এর অর্থ কী?’
শিরোনামের উদ্ধৃতাংশটি টেরি ঈগলটনের লিটেরারি থিওরি : এন ইন্ট্রোডাকশন গ্রন্থ থেকে নেওয়া। এই গ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণের (১৯৯৬, ভারতীয় পুনর্মুদ্রণ, ২০০০, নয়াদিল্লি : মায়া ব্ল্যাকওয়েল) ‘পুনশ্চ’ অংশে উত্তর-আধুনিকতা বিষয়ে সংক্ষিপ্ত মূল্যায়নের একপর্যায়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ‘উত্তর-আধুনিকতা কি আমাদের সময়ের যথাযথ দর্শন? অথবা, তা কি একসময়ের পশ্চিমা বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীদের একটি বিবর্ণ হয়ে যাওয়া দলের বিশ্ব-দর্শন, যারা তাদের…
-

হাটুরে মারের এক পদ
গত শতকের পঞ্চাশ-দশকের ঢাকা শহর। তখনো মোহাম্মদপুর আর মিরপুর উপশহর তৈরি হয়নি। নিউ মার্কেট হয়েছিল। ধানমন্ডি উঠছিল। আশেপাশে নতুন নতুন জনপদও। তবু তখনো পুরনো ঢাকায় চলে প্রাদেশিক রাজধানীর বাজার-সদাই আর নানা কায়-কারবার। মানুষ যায় চকবাজার, মৌলভীবাজার, ইসলামপুর, আরমানিটোলা, উর্দু রোড, ইংলিশ রোড, লালবাগ, পাঁচ ভাই ঘাট লেন, মিটফোর্ড হাসপাতাল, নবাবপুর। জগন্নাথ কলেজ। জেলা কোর্ট। অথবা…
-

আক্কাস নিবাড়ন-কন্যা মর্নিং ডিউ লিপজেল মিস বাংলাদেশ
আক্কাস নিবাড়ন। নিবাড়ন অর্থ বাড়ন নেই যার। সোজা বাংলায় আক্কাস বামন। ফরিদপুরের বিল এলাকায় জোলা মুসলমান আর নমঃশূদ্রদের গ্রামে বামনকে নিবাড়নই বলে। আক্কাসরা চারপুরুষ ধরেই নিবাড়ন আর চারপুরুষ ধরেই সুদের ব্যবসা তাদের। আর সেই সুদের ব্যবসার টাকায় আক্কাসরা গত চারপুরুষ ধরে কিনে ফেলছে গ্রামকে গ্রাম জুড়ে যত ধানী-জমি, বিল, পুকুর কি মাঠ… সবই আক্কাসদের গর্ভে…
