আমাদের টৌন জল্পেশগুড়ি ও তার লোকজন

লেখক:

দেবেশ রায়

উপক্রম
স্মৃতি কি জীবনের ঘটনাগুলির পুনর্লেখক? সে-পুনর্লেখন কি চরম? মানে চরম হতেও পারে? কখনো কখনো? নাকি স্মৃতিরও বয়স আছে? স্মৃতিও বদলায়? বদলায় কী? কোনো স্মৃতির সঙ্গে যে-গন্ধ লেগে থাকে, সে-গন্ধ বদলায়? সেই গন্ধই কি স্মৃতির আধার? নাকি স্মৃতিই সেই গন্ধটির আধার? কোনো স্মৃতির সঙ্গে যদি কোনো রূপ লেগে থাকে, সেই রূপ কি বদলায়? বদলায় সেই স্মৃতিও? দেখা গিয়েছিল যে-শঙ্খ, মানবীর নিরাবরণ অবয়বে, সেই শঙ্খ কি ভেঙে যায়? ভেঙে গেলে কি সেই আকার লুপ্ত হয়ে যায়?
সুযোগ মিললে একবার পুনর্পর্যটন ঘটতে পারে? সময়ের দূরত্ব, পরিসরের দূরত্ব, ঘটনার দূরত্ব ঘটিয়ে দিতে পারে সেই পুনর্পর্যটন? তেমন পুনর্পর্যটনে ঘটনার কোনো বদল হয় না? ঘটনার ওপর কোনো নতুন দখলদারিত্ব ঘটে না? সম্ভব নয় বলে দখলদারিও হয় না? বরং যেন নিরপেক্ষ ও স্বাধীন এক দৃশ্যমালা দেখে যাওয়া যায়? দৃশ্যমালা নিরপেক্ষ ও স্বাধীনই থাকে? কিন্তু সেই দৃশ্যনাট্য নিজেরই নির্মাণ? এ এক অদ্ভুত দৃশ্যমালা, গল্পমালা, চিহ্নমালা। প্রণেতা আমিই অথচ যে-প্রণয়নে আমার কোনো ভূমিকা নেই।
কথাটা খুব সাদাসিধে। ঘটনাটা তো সময় দিয়ে বাঁধা। যত লম্বাই হোক, বাঁধা তো বটেই। কিন্তু স্মৃতি তো বাঁধা নয়। যত ছোটই হোক, বাঁধা তো নয়ই।
স্মৃতির এই ফিরে-ফিরে ফিরে-আসার একটি লাগসই উপমা এখনকার ডিজিটাল ক্যামেরায় স্লাইড করে রাখা ফ্রেমগুলির ফিরে-দেখা। ফ্রেমগুলির বিন্যাস কতভাবেই না পালটানো যায়! কতভাবেই – না! ক ত ভা বে।
বর্তমান নয়, বিদ্যমান নয়, চলমান নয়। বর্তমানের দিকে ধেয়ে আসা এক চলমান অতীত? নাকি অতীতের দিকে বয়ে যাওয়া এক বর্তমান?

এক
টৌন জল্পেশগুড়ি হওয়ার আগে টৌন জল্পেশগুড়ি কোথাও ছিল না। যেমন, তমলুক ছিল তাম্রলিপ্তিতে, হুগলি ছিল হোগলা, পাটনা ছিল পাটলিতে। আমাদের এখানে একটু পুরনো মেশানো না থাকলে কদর হয় না। পুরনোটা অবিশ্যি বদলাতে পারে – যখনকার যেমন হাওয়া – দার্জিলিং হওয়ার আগে দুর্জয়লিঙ্গে ছিল, শুনতাম। এখন শুনি না। ছিল দোরজি-লাং নামের কোনো তিব্বতি শব্দে। সে যা-ই হোক পুরনো তো একটা কিছু ছিল।
হালে পড়াশুনো খুব বেড়েছে। তারা হোঁচট খেয়ে হঠাৎ বুঝতে পারছে টৌন জল্পেশগুড়ি হওয়ার আগে কোথাও জল্পেশগুড়ি ছিল না। তাই তারা পুরনো ল্যান্ড-রেকর্ডসের ম্যাপট্যাপ দেখে বের করেছে – এই আমাদের টৌন জল্পেশগুড়ি নাকি আগে ফকিরগঞ্জ ছিল। এসব বের করতে তাদের রংপুর গিয়ে অফিসের কাগজপত্র খুঁজতে হয়েছিল। তারপরও তারা যেসব কাগজপত্র পেয়েছে, সেগুলি পরীক্ষা করে দেখতেও কেউ ঘাড় ফেরায় নি। টৌন জল্পেশগুড়ি যদি পুরনো ফকিরগঞ্জে থেকে থাকে বা থেকে না-থাকে, কিছুতেই কারো কিছু আসে যায় না। আর, দোরজি-লাং থেকে না হয় দার্জিলিং হলো, ফকিরগঞ্জ থেকে জল্পেশগুড়ি হবে কী করে? একটা অক্ষরেও তো মিল নেই।
এই উদাসীনতায় ওদের সুবিধেই হয়। যারা ‘ফকিরগঞ্জ’ বের করেছিল, ওরা বেশ নির্ঝঞ্ঝাটে, ‘ফকিরগঞ্জ : এ বুশগ্রোভ ফর এ টাউনশিপ’ নাম দিয়ে নিজেরা-নিজেরা সেমিনার-টেমিনার করতে লাগল। বুশগ্রোভ কথাটিও নতুন, ওরাই তৈরি করে নিয়েছে, ‘বুশ’ মানে চা-গাছের বুশ, ঝোপ। সেই বুশ তৈরির দরকারেই নাকি ফকিরগঞ্জকে গোর দিয়ে জল্পেশগুড়ি হয়েছে। তা হয়েছে তো জল্পেশগুড়িই হয়েছে, অন্য কিছু তো আর হয় নি, বেশ হয়েছে! ফকিরগঞ্জ থেকে যদি জল্পেশগুড়ি না হতো, তাহলে অন্য কোথাও থেকে হতে হতো। আর তেমন হলে টৌন জল্পেশগুড়ি তো আর টৌন জল্পেশগুড়িই থাকত না। যে-ফকিরগঞ্জ থেকে টৌন জল্পেশগুড়ি হয় না, সে-ফকিরগঞ্জ দিয়ে আমরা করবটা কী? যদি তেমন কারো দরকার পড়ে, সে তা মাপসহ কাটছাঁট করে নিক না – ফকিরগঞ্জ বা নবাবগঞ্জ।
ওই, টৌন জল্পেশগুড়ি আগে কোথাও ছিল না বলে টাউনটা বেশ সাজিয়ে-গুছিয়ে করা গেছে; বুড়ি শেত্লার মন্দির, বেগমের কুয়ো বা জোড়াদিঘি বাঁচিয়ে টাউনটাকে তৈরি হতে হয়।
এই-যে, টাউনটা ইচ্ছেমতো সাজিয়ে-গুছিয়ে করা, সেটা কার ইচ্ছে, কার ইচ্ছেমতো ও কার সাজানো-গোছানো এসব প্রশ্ন গায়েব হয়ে আছে।
‘সেবার মল্লিকদের বড় শরিকের গিন্নির ভাদ্রমাসের রোদে গলে যাওয়ার জোগাড়, বড় শরিক হুকুম দিলেন, তাঁর জানালা বরাবর দুটো দিঘি কাটতে। শুনে গিন্নি মুখ ঝামটা দিয়ে বলে উঠলেন, ‘গলছি এখন! আর উনি হুকুম চালালেন সামনের বছরের হাওয়া যেন ভাদ্রমাসে দিঘি বেয়ে আসে! সামনের ভাদ্রেও কি আমি এইখানে আসব?’ এই রকম সব গল্পকথা জল্পেশগুড়ির কোথাও শিকড়ও চারায় নি, ডালপালাও মেলে নি।
আর কী বাঁচোয়া! জল্পেশগুড়িকে কোনো গল্প বইতে হয় নি, জল্পেশগুড়িকে শুধু নিজের গল্প ঘটিয়ে যেতে হয়েছে। আর সে-গল্পের কি শেষ আছে? এক মোটরগাড়িরই কত গল্প – রায় বাহাদুরের গাড়ি, রমাগতি রায়ের গাড়ি, চিত্তরঞ্জন দাশগুপ্তের গাড়ি, নারু সান্যালের গাড়ি, তিস্তার চর পেরোবার গাড়ি।
একেবারে গাড়িটাড়ি, জজকোর্ট, জেলখানা নিয়ে যে টাউনের জন্ম, সেটার তো থানাও চাই, পোস্ট অফিসও চাই, ব্যাংকও চাই। এসব তো আর নিজের নিজের ইচ্ছেমতো সাজানো-গোছানো যায় না। এক প্রমাণ সাইজের লালরঙের মুখ-হাঁ বাক্স বসালেই তো আর পোস্টাপিস হয় না। কোমরে বকলস লাগালেই তো আর থানার জমাদার হয় না, মানে হতো না – অন্তত তখন। আজকাল হয়। প্রাইভেট সিকিউরিটি এজেন্সির চৌকিদারদের দেখতে তো থানার সেপাইদের মতোই লাগে। তার ওপর ব্যাংক আছে, হাসপাতাল আছে। এগুলি সরকার ছাড়া কেউ করতে পারে? না-হয় মল্লিকদের বড় শরিক গিন্নি ছিল না জল্পেশগুড়িতে আর ভাদ্রমাসও ছিল না। সেই কারণে না হোক দিঘির গল্প নেই। তবে হাসপাতাল-ব্যাংকের তো গল্প না হোক – নোটিশ থাকা দরকার।
হ্যাঁ। সেটুকু মানতে হবে যে আমাদের টাউন – জল্পেশগুড়ি সরকারি গেজেটের টাউন। এ টাউন হিউ-এন-সাঙের ঝোলা থেকে বেরোয় নি।
মানতে হলে, মানতে হবে কিন্তু মন মানতে চায় না। ওই সরকারি গেজেটে এতো টাউন তৈরি হচ্ছে – নেলি সেন টাউনশিপ, চোমং লামা টাউনশিপ, আনন্দময়ী ইস্ট অ্যাভেন্যু, হাজি এস্টেট। জল্পেশগুড়িকে এমন গেজেটেড ভাবতে ইচ্ছে করে না।
হ্যাঁ, এটা একটু আহ্লাদে কথা হলো! এদিকে জাহাঙ্গিরের সনদের জমিদারিও নয় যে শরিকে-শরিকে মামলায়-মামলায় সতীর ৫১টি দেহাংশের প্রতিটির আবার একান্নশো করে টুকরো হয়ে নল রাজার ঢিবি বানাবে। আর ওদিকে একেবারে হালের ওইসব এস্টেটও নয় যে, একটুকরো কাউন্টার পার্ট রসিদ দেখালেই যাদের হাতে ফ্ল্যাটের চাবি, তারা ফ্ল্যাট খুলে দেয়।

দুই
হ্যাঁ, আমাদের আহ্লাদেপনা নিয়ে আমরা জল্পেশগুড়িতে একটু একটেরে  হয়ে থাকতেই পছন্দ করতাম – ওই টিভি সিরিয়ালের ধারণামতো পুরনো একান্নবর্তী পরিবারের ভেতর একমাত্র দোজবর কাকার প্রি-ওয়ার্ল্ড ওয়ার ভিনটেজের দ্বিতীয় পক্ষের বউয়ের ধরনে।
যেমন, একজন ছিলেন, খুব নামডাকওয়ালা উকিল। সারাদিন কোর্টে যমখাটুনি খাটতেন। বড়লোক তো বটেই। কয়েকটি চা কোম্পানির বোর্ডেও আছেন। যদিও হিন্দু কিন্তু ব্রাহ্মসমাজের ভাদ্র মাসের পুজোয় যেতেন। দার্জিলিং মেল কলকাতার দিকে চলে যেত গোধূলিলগনে। তিনি – সেই উকিল, ডিরেক্টর, বদ্যি, হিন্দু ও ব্রাহ্মভাবাপন্ন মানুষটি কোর্ট থেকে ফিরে কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর, ধুতি-পাঞ্জাবি-উড়নিতে সেজে, ওই ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের মোড়ে ঠাকুরের দোকান থেকে এক ঠোঙা সন্দেশ কিনে দার্জিলিং মেলের পৌঁছুনোর সময়ের দিকে হেঁটে যেতেন – সেই গোধূলিলগনের দিকে।
জল্পেশগুড়ি টাউনে দার্জিলিং মেল সাতসকালে কলকাতা থেকে উজানে আসা, আর গোধূলিবেলায় ভাটিতে কলকাতা যাওয়া, যেন ছিল রোজ হরিহরছত্রের মেলা বসা আর ওঠা।
সেই ভদ্রলোক – হিন্দু,  বৈদ্য, ব্রাহ্মভাবাপন্ন, উকিল ও ডিরেক্টর – সেই মেলায় ঢুকতেন, হাতে কাগজের ঠোঙায় সন্দেশ। জল্পেশগুড়িতে সন্দেশকে বলা হতো ‘বাদামবরফি’। এখানকার একমাত্র মিষ্টির দোকান ‘শ্রী সুরেন্দ্রনাথ, কুঁড়ি’র লম্বা সাইনবোর্ডে লেখা থাকত, ‘বাদামবরফি আবিষ্কর্তা’। এক ঠোঙা বাদামবরফি হাতে, সেই তিনি, সেই গোধূলিবেলায়, দার্জিলিং মেলের সারারাতের ভাটিযাত্রায় গিয়ে দাঁড়াতেন আর ট্রেনের লেজ থেকে মাথা, মাথা থেকে লেজ, তাঁর অতিচেনা কোনো পরমাত্মীয়কে খুঁজতেন। পেলে, তিনি তার হাতে সন্দেশের ঠোঙাটি দিয়ে নমস্কার করে স্টেশন থেকে বেরিয়ে আবার তার সেরেস্তার দিকে হাঁটতেন। কোনোদিন না পেলে কোনো পরমাত্মীয়কে – রোজ কি আর পাওয়া সম্ভব – তিনি একেবারে অচেনা – মানে, পরমাত্মীয়ের উলটো কোনো পরম-অনাত্মীয় যাত্রীর হাতে সেই সন্দেশের,  জল্পেশগুড়ির বাদামবরফির, ঠোঙাটা তুলে দিয়ে নমস্কার সেরে বেরিয়ে আসতেন।
এরকমও রটনা ছিল, তিনি নাকি কোথাও বলেছিলেন, ‘তোমার বাড়িতে একটা লোক এলে তাকে প্রথমে ঠাঁই আর জল দিতে হয় না? একটা দার্জিলিং মেলে কত লোকের পায়ের ধুলো পড়ছে, জল্পেশগুড়ি স্টেশনে। তাদের একটু ঠাঁই-মিষ্টি না দিলে তাদের অভিমান হবে না? আমাদের জল্পেশগুড়ির বদনাম হবে না?’
একদিন নাকি স্টেশনে পৌঁছুতে তার এক মিনিট ১২ সেকেন্ড  দেরি হয়েছিল। স্টেশনের বেল বাজিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও দার্জিলিং মেলের  নীলচোখো অ্যাংলো ইন্ডিয়ান গার্ড ট্রেন ছাড়েন নি, যতক্ষণ না বাদামবরফি আসে – ওই এক মিনিট ১২ সেকেন্ডই লেগেছিল তার পৌঁছতে। গার্ড নাকি তার রিপোর্টের খাতায় লিখে দিয়েছিলেন – ‘যথাসময়ে বাদামবরফি না পৌঁছুনোতে…।’
স্থানীয় সব প্রধান আচারের প্রতি এমন বিবেচনাপূর্ণ ও অনুকরণীয় সম্মান প্রদর্শন করায় – ‘সাচ কনসিডারেট অ্যান্ড রেসপেক্টফুল জেসচার্স টু দি লোকাল কাস্টমস’ – রেলওয়ে বোর্ড নাকি সেই নীলচোখো গার্ডকে প্রমোশন দিয়েছিল – সেই ‘সিন্স দি ডায়ামন্ড-নাট ডিড নট রিচ ইন টাইম’ – গার্ডকে।
আমাদের টৌন জল্পেশগুড়িতে একটা সিভিল কোর্ট থাকা সত্ত্বেও জমিজমা নিয়ে শরিকি মামলা প্রায় হয়ই না বলা যায়। হবে কোত্থেকে, টাউন বসতে-বসতেই তো ৫০-৬০ বছর। তার পর ৪৭ সাল থেকে তো টাউন বাড়া শুরু। বছর পঞ্চাশ-ষাটে কটা বাড়ির আর শরিক জোটে? চোদ্দ পুরুষের জোতজমি তো কেউ ভোগ করছে না। বাবা যখন নতুন এই টাউনে এসে বসেছেন, তখন তো আর তার বাবাকে সঙ্গে আনেন নি। অন্য ভাইরা আরো নানাদিকে ছড়িয়ে গেছে। শরিক থাকলে তো শরিকি মামলা হবে? যারা প্রায় সব   ভাই-ই শেষ পর্যন্ত এসে পড়েছিল, তাদের ছেলেপুলেরা বড় হয়ে যাওয়ায় আদিবাড়িতেই যে যার মতো ঘর তুলে নিয়েছে। যেমন বাবুপাড়ার সেনদের বাড়ি, আনন্দপাড়ার চক্রবর্তী বাড়ি, উকিলপাড়ার ঘটকবাড়ি, রায়কতপাড়ার মুখুটিবাড়ি আর ঊমাগতিবাড়ি, শিয়ালপাড়ার মৌলিকবাড়ি। কিন্তু এই ভাইরা, হয় সবাই বিয়ে করেন নি, না-হয় কোনো ভাই বাইরে কোথাও চলে গেছেন, তা ছাড়া ছেলেমেয়ের সংখ্যাও তো কমে আসতে থাকে। শরিকের বদলে জল্পেশগুড়ির অনেক বাড়িই বিশাল জমিতে ট্যাংট্যাং করছে – বাইরে কাছারিবাড়ি, ভেতরে ভিটেপিছু ঘরের বাসিন্দে নেই।

তিন
ঠাকুরদা নেই, ঠাকুরদার বাবাও নেই, অথচ জল্পেশগুড়ির সব বাড়িই পূর্বপুরুষদের নানা সাইজের ছবিতে ঠাসা। সকালে, ৮টা নাগাদ টাউনের একমাত্র আর্টিস্ট মণি বিশ্বাস বেরোতেন, কাঁধে একটা ঝোলা নিয়ে। তখন কাঁধঝোলা বলে কিছু ছিল না। মণিদারই এক ছিল। সেই ঝোলার ভেতর নানা নম্বরের পেনসিল, পেনসিল কাটার ব্লেড, নানা দোয়াতে নানা রকম রং, গোল পাকানো কাগজ, নানা নম্বরের তুলি, একটা ছোট, বাঁশের ছুরি – রং চাঁছতে, এই সব জিনিসপত্র থাকত। সেই ঝোলা নিয়ে মণিদা কাজে বেরোতেন।
কাজ মানে – ছবি আঁকা। না, ছবি আঁকা শেখানো নয়, নিজেই ছবি আঁকা, পোর্ট্রেট। এসব নিয়ে কখনো কোনো কথা ওঠে নি। মণিদাকে দিয়ে বাপ-ঠাকুরদার ছবি আঁকানো হতো বলেই কি তিনি পোর্ট্রেট আর্টিস্ট ছিলেন? নাকি পোর্ট্রেট আর্টিস্টই ছিলেন বলে মানুষের মুখ আঁকতেন। মণিদা খুব ঠান্ডা, চুপচাপ মানুষ ছিলেন, খুব একটা কথা বলতেন না। কিন্তু তার আড্ডা ছিল, আড্ডা দিতে ভালোবাসতেন।
কোনো কোনো মানুষ থাকে, যাদের ভেতর একটা হাজিরা থাকে।
টৌন জল্পেশগুড়িতে তো বংশ নিয়ে কেউ আসে নি, বসতও গাড়ে নি। মণিদা তাদের সেই বংশের কথা, ঠাকুরদাদাদের কথা, ঠাকুরমাদের কথা, সেই ছোটবেলায় হারানো কোনো দিদির কথা, কোনো কুলগুরুর কথা, কোনো মামা বা পিসির কথা…।
মণিদা যে এসব কথা জানতেন, তা তো হতে পারে না। তার বন্ধুবান্ধবদের কারো কারো কাছে একটু-আধটু শুনেছেন। তারপর নিজের মনে তার চেহারাটা কল্পনা করে নিয়ে তার পোর্ট্রেট এঁকে দিতেন হয়তো। আর, আশ্চর্য, সে-পোর্ট্রেট নাকি স্মৃতির চাইতেও জ্যান্ত হতো।
এটাই মণিদার পেশা হয়ে উঠল।
যাদের কথা তোমার জ্বলজ্যান্ত মনে আছে অথচ যার কোনো ছবি তোমার কাছে নেই, মণিদা, তাকে তোমার স্মৃতির চাইতে জ্যান্ত করে এঁকে দেবেন। জল্পেশগুড়ির সব বাড়িঘর অনুপস্থিত পুরুষ ও নারীদের ছবিতে ভরে গিয়েছিল। পূর্বপুরুষ তো আর কমে না, বাড়তেই থাকে।
তবে, মণিদার ওই একটাই শর্ত – তার গল্প শোনাতে হবে। এমনও দু-চারটে ঘটনা ঘটেছে যে বেশ কয়েকদিন শোনার পরও মণিদা ছবিটা আঁকলেন না। জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, ‘কী যেন, দেখতে পেলাম না যে!’
এখন তো এটা একটা বিজ্ঞান। খুব বড় খুনি বা ডাকাতের ইনপুট থেকে কম্পিউটার তার ছবি এঁকে দিতে পারে। তেমনি, একটু ঠিকঠাক, একটু সময় দিয়ে পূর্বপুরুষদের গল্প শোনাতে পারলে, মণিদা, ঠিক তার ছবিটা জ্বলজ্বলিয়ে এঁকে দিতেন, ছোট কিংবা বড়, যে সাইজেই হোক।
ওই একটা জায়গাতে মণিদার ছিল অনড় জেদ। তোমার দেয়ালের মাপে ছবি বড় কিংবা ছোট হচ্ছে, আর্টিস্টের কাজ বা মালের তাতে কিছু যায় আসে না। একদর।
জল্পেশগুড়িতে তাই ছবিতে পূর্বপুরুষদের খুব ভিড় ছিল অথচ সংসারে ঠাকুরদা পর্যন্তই ছিল না। কেউ কেউ তাদের কুলগুরুর লাইনেও গেছেন, দু-একজন গেছেন শ্বশুরবাড়ির লাইনে। সুন্দরীমোহন বাগচীর বাড়িতে রুদ্রাক্ষের মালাসহ কর্তাদের মামা শ্যামানন্দ লাহিড়ীর একটা চিত্র এঁকেছিলেন মণিদা। তিনি তখনকার দিনের খুব নামডাকওয়ালা মানুষ ছিলেন, তাঁকে নাকি  বাঘসিংহও ভয় পেত। কেউ কেউ বলেন, বাঘ-সিংহ মানে সাহেবসুবো। তিনি একটা ইংরেজি কাগজ করতেন রাজশাহী থেকে। তাঁর লেখাকে সাহেবরা ভয় পেতেন; কিন্তু টৌন জল্পেশগুড়ির সঙ্গে তার কোনোকালে কোনো সম্পর্কই ছিল না। কেউ কেউ বলেন, বাঘ-সিংহ মানে সাহেব-মেম নয়। সত্যিকারের বাঘ ও সত্যিকারের সিংহ। বাঙালির কাপুরুষ অপবাদের বিরুদ্ধে তিনি নাকি বাঙালি সার্কাস (নারীবর্জিত) খুলেছিলেন। তাঁর সেই দলের বাঘ-সিংহরাও বাঙালি ছিল, তারাও তাকে ভয় করত।
তবে তার এই পরাক্রমের আসল কারণ নাকি গলার ওই রুদ্রাক্ষের মালা – কামাখ্যা মন্দিরের চাতালে শুয়ে ছিলেন রাতে, সকালে উঠে দেখেন তাঁর গলায় এই মালা। তিনি জীবনে একমুহূর্তের জন্যও ওই মালা তার গলা থেকে খোলেন নি – সেই তিনি ইংরেজি কাগজের সম্পাদকতাই করুন আর বাঘ-সিংহের খেলাই দেখান, সেই মালাটি ছিল চিতাশয্যায় তাঁর একমাত্র আবরণ। মুখাগ্নির পর, কাঠ জ্বলে ওঠার আগে, শ্মশানের বড় ডোম আগুনের ভেতর হাত গলিয়ে গলা থেকে মালাটা ছিঁড়ে এনে, পরে গোপনে, শ্যামানন্দ লাহিড়ীর ছোট ভগ্নিপতিকে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে দিয়ে দেয়। ১৯২৪ সালের ৫০ হাজার টাকা। ছোট ভগ্নিপতি তখন বার্মিজ সেগুনের ব্যবসা করতেন। ব্যবসা তাঁর এতটাই ভালো ছিল যে, তিনি আরো ভালো চাইছিলেন। ৫০ হাজার টাকার রুদ্রাক্ষে সেই আরো ভালো নিশ্চিতও হয়েছিল।
কিন্তু বছর দুয়েকও কাটল না, তিনি মরে গেলেন দুটো কথার জন্ম দিয়ে। মা কামাখ্যার নিজের হাতে পরানো রুদ্রাক্ষমালা কিনা ডোমকে দিয়ে ছোঁয়ালি? আর, বড় ডোম মালা টেনে এনেছিল, বেটাছেলেকে তো উপুড় করে পোড়াতে হয় তাই মালাটা ঝুলে দুলছিলও যেন, কিন্তু আগুনের তাপে বা বড় ডোমের টানে একটা রুদ্রাক্ষ খুলে পড়ে গিয়েছিল। মালা তাই বর থেকে শাপ হয়ে গেল।
সে যাই হোক, শ্যামানন্দ লাহিড়ীর ভাগ্নে বাগচীরা জল্পেশগুড়িতে মণিদাকে দিয়ে যে অয়েল পেইন্টিং আঁকিয়ে টাঙিয়ে রেখেছিলেন, তাতে রুদ্রাক্ষগুলি দেখায় যেন নরমুণ্ড বা অন্তত শিশুমুণ্ড। বাগচী-ভাগ্নেরা সাবধানী মানুষ – তারা ইংরেজি কাগজ, বাঘ-সিংহ বা বার্মাটিকের লাইনেই গেলেন না। শুধু ছবির রুদ্রাক্ষর সাইজটা বাড়িয়ে দিলেন, তাতে যেটুকু সৌভাগ্য ঝরে, তাদের তাতেই চলবে। আর চলছেও তো!
প্রথম দেখলে একটু ভুল হয় মামা শ্যামানন্দকে মা-কালী মনে হয়।

চার
এক সন্ধ্যার এক আড্ডায় মণিদার বন্ধু নসুদা মণিদাকে চেপে ধরলেন। সঙ্গে আরো দু-একজন ছিল, বন্ধুবান্ধব। নসুদা সবসময় নেশা করে থাকতেন, স-ব সময় আর ফিনফিনে ধুতি পাঞ্জাবি পরে থাকতেন। চা বাগান ছিল, চায়ের ব্যবসাও ছিল। তার অফিসঘর ছিল মারোয়ারি ব্যবসায়ীদের গদির মতো। সে অন্য গল্প। যখন হওয়ার হবে। মণিদা মদ খেতেন না কিন্তু ওই আড্ডায় যেতেন – নসুদার টানে আর তাছাড়া খদ্দের জুটে যেত। সেই আড্ডায় নসুদা একদিন খেপে উঠলেন, ‘শা-লা, মণি নিশ্চয়ই তুক জানে। নইলে যার মামিমা তার মনে নেই মামিমা কেমন ছিল। আর মণি শালা তার ছবি এঁকে দিলে ওরা বলে, এই প্রথম মামিমাকে দেখলাম। শালা মণি, বল শালা তোর তুক্। বলে দে – দে – পাল-চৌধুরীদের শেয়ারগুলি কিনব কী কিনব না। শালা, আজ তোকে বলতেই হবে।’
নসুদা মণিদার একেবারে ছেলেবেলার বন্ধু। নসুদা বড়লোকের ছেলে ও নিজেও বড়লোক হলেও টৌন জল্পেশগুড়ির দস্তুর অনুযায়ী গরিব-বড়লোক ভেদ ছিল না। মণিদাকে একটু খাতিরও করতেন নসুদা, খাবার-দাবার এলে বারবার বলতেন, ‘- এ-ই মণিকে দে, মণিকে দে, ও আর্টিস্ট’, ‘এই, মণিকে দে ভালো করে, শালা মরা মানুষ ফিরিয়ে আনে রে, মণিকে দে’, ‘মণিকে আর চারটে রসগোল্লা দে। এই শালা টাউনের হালুইকররা রসগোল্লা বানাতে গিয়ে  লাড্ডু বানায়।’
নসুদা যে মণিদাকে এমন চেপে ধরবেন – তার জন্য মণিদা একেবারেই তৈরি ছিলেন না, অবিশ্যি নসুদার এমন খেয়ালখুশি তার বন্ধুদের অজানা বা অনভ্যস্ত ছিল না। নসুদার সেই ষণ্ডামার্কা কালো পেটানো শরীর। মণিদা মাটিতে পড়ে যেতে-যেতে বললেন, ‘এই নসু, ছেড়ে দে, আরে লাগছে, লা-গছে’ –
‘শালা, তোর  তুক্ বল্ আগে, তুই যাকে জন্মে দেখিসনি, তাকে দেখতে পাস কী করে। তাহলে তুই শেয়ারের দাম কী হবে তা বলতে পারবি না কেন? বল, শালা, পাল চৌধুরীদের শেয়ারের দর কত উঠবে,’ ততক্ষণে মণিদাকে নসুদা তার গদির ওপর একেবারে পেড়ে ফেলেছেন।
মণিদা নসুদার হাতের কব্জার ভেতরে মুরগির বাচ্চার মতো কিচকিচ করে ডেকে ওঠেন, ‘আরে মামি-মামা তো পাস্ট, ওসব দেখা যায়। তোর তো ফিউচার রে, ওকি দেখা যায় নাকি? ছেড়ে দে নসু, লাগছে রে -’
যেমন আচমকা চেপে ধরেছিলেন, তেমনি আচমকা ছেড়ে দিয়ে নসুদা হো-হো হাসতেই থাকেন, মণিদা ধুতিজামা গুছিয়ে দাঁড়াতে-দাঁড়াতে বলেন, ‘কী যে তোর মাথায় চাপে কখন? আরে, শেয়ারের ফাটকাদর বলতে পারলে কি বাড়ি-বাড়ি পেনসিল ঘষে বেড়াই?’
মণিদা এমনিতেই নিরীহ শান্ত মানুষ, গলা তুলে কথাই বলতে পারেন না। তার এই মিনমিন করে বলা কথায় দুঃখ যেন গড়িয়ে পড়ল। নসুদার অট্টহাসি অপ্রস্তুত থেমে যায়, ‘দেখ মণি, আমাদের মধ্যে তুই-ই একমাত্র আর্টিস্ট! পেনসিল ঘষা কী রে? পেনসিল তো দোকানে গেলেই কিনতে পাওয়া যায়। যার ইচ্ছে সেই তো ঘষতে পারে। তাহলে মণি বিশ্বাস ছাড়া কেউ ঘষতে পারে না কেন?’
‘তুই তাই বলে আমাকে ব্যথা দিবি?’
‘আরে, তার আমি কী করব? আমার হাতের দোষ! শালা, হাত না, যেন সাঁড়াশি! জানিস তো আমার লেখাপড়া নেই। আমি কী করে বুঝব রে তুই শুধু পাস্ট  মুখ আঁকিস! আরে, সত্যি তো! আমি যদি তোকে আমার  নাতির বউমা আঁকতে বলি, তুই আঁকবি কী করে? আমারই তো বিয়ে হয় নি। চিরকাল গাণ্ডুই থেকে গেলাম।’
‘নসু – তোর এই অভ্যাসটা ছাড় – বয়স তো হচ্ছে নাকি?’
‘কী অভ্যাস?’
‘এই যে, তোর যা চাই তা এখনই চাই -’
‘আরে মণি, নেশা তো আর করলি না কোনোদিন, যখন নেশা উঠেছে তখন মাল না পেলে চলে?’
‘এখন একটু ঠান্ডা হ নসু। আমরা সব ছেলেমেয়ে নিয়ে হাঁপিয়ে যাচ্ছি, আর তোর বিয়ের নাম নেই।’
‘ওই তো রে, তোদের ছেলেমেয়ে করার নেশা। একটা ছেলে হলেই দেখবি পরপর হতেই থাকবে। একটা মেয়ে এনে দিতে পারলি না, আর পরামর্শ দিচ্ছিস গুরুঠাকুরের মতো – বিয়ে কর? কারে বিয়ে করব? তোকে?’
‘ নেশাভাং গুণ্ডামি ছাড়। যেখানেই সম্বন্ধ হয় সেটাই তো তোর নাম শুনলে ভেঙে যায়, ওরে বা-বা !’
‘তাহলে লুৎফারের বিয়ে হলো কী করে?’
‘ওদের সমাজে হয়!’
‘তাহলে তোদের গৌরীশঙ্কর চক্কোত্তির বিয়ে হলো কী করে?’
‘উল্লাপাড়ার জমিদার। বামুন!’
‘কবরেজ মশাইয়ের গলিতে শুধু বামনি বেশ্যা থাকে, না?’
‘দেখ্, এটা জল্পেশগুড়ি টাউন। এখানে জমিদারি নেই।’
‘ও আমার চাঁদুরে – শহরভর সাজিয়ে রেখেছে রাজবাড়ি, নবাববাড়ি আর বললেই হলো, জমিদারি নেই?’
‘আরে, নবাব কি এখানকার নবাব? সে তো নোয়াখালির। তুই যেমন এখানে এসছিস, সেও তেমনি এসছে, নবাবি কীসের?’
‘বল, বল, মণি সেই যে জ্যোতি সান্যালের ছড়াটা।’

পাঁচ
আমাদের জল্পেশগুড়িতে দিস্তা-সাইজের সাপ্তাহিক কাগজ বেরোত – জনমত, ত্রিস্রোতা, নিশান। জনমত বেরিয়েছিল কংগ্রেসি স্বদেশীর সময়। ত্রিস্রোতা বেরিয়েছিল কংগ্রেসি স্বদেশীদের ভাগাভাগির সময়। আর নিশান বেরিয়েছিল মুসলিম লিগের সময়। দেশ স্বাধীন হতে না হতেই নিশান উঠে যায়। ত্রিস্রোতার সম্পাদক বহুকাল সম্পাদক ছিলেন। তিনি মারা যাওয়ায় নতুন একজন সম্পাদক হন। তিনি বহুকাল সম্পাদক থাকতে পারেন নি একমাত্র এই কারণে যে, খুব অল্প দিনের মধ্যেই তিনি মারা যান। তারপরে যিনি সম্পাদক হলেন তিনিও দু-এক বছরের মধ্যে মারা যাওয়ায় কেউ আর সম্পাদক হতে রাজি হচ্ছিলেন না, এমনকী ‘কর্তৃক মুদ্রিত ও প্রকাশিত’র সঙ্গে ও ‘সম্পাদিত’টুকু যোগ করতে প্রেসের ম্যানেজারবাবুও রাজি হন না। যদি পরের দুজন সম্পাদক হওয়ার পরপরই মারা  না যেতেন, তাহলে হয়তো কাগজটা উঠে যেত না। আর, যিনি অনেক দিন সম্পাদক ছিলেন, তাঁর উত্তরাধিকারীদের আপাতদ্রুত মৃত্যুর ফলে, ও পরে, তার সম্পাদনার সময়ের দৈর্ঘ্যরে কথা চাপা পড়ে প্রধান হয়ে উঠল তার আয়ুর স্বল্পতা। তারপর ত্রিস্রোতা আবার বেরিয়েছে এমন একজনকে পাওয়ার পর, যিনি সম্পাদনাকে বেঁচে থাকার চাইতে বেশি মূল্য দিতেন।
ওই জনমত পত্রিকার জ্যোতি চন্দ্র সান্যাল বেশ চরমপন্থী স্বদেশী ছিলেন। তিনি উকিলও ছিলেন, হয়তো।
আমাদের জল্পেশগুড়ি টৌনের একেবারে প্রাইভেট নদীর নাম করলা। সেই নদীটার জলের রং ও চওড়া পুব বাংলার খাল বা জোলার মতো হলেও সেটা সত্যিই নদী ছিল! তাতে সারাবছরই জল থাকত ও সে-জলে স্রোত থাকত। করলা নদীর দুপারজুড়ে টৌনটা তৈরি হয়েছিল। পূর্বপারে কোর্ট-কাছারি, কালেকটরি, পুলিশ অফিস, পিডবলুডি অফিস, জিলা জজ, ডেপুটি কমিশনার, কমিশনারদের কোয়ার্টার ও হাসপাতাল, জিলা স্কুল, টাউন ক্লাব। সরকারি বাড়িগুলির রং ছিল লাল। করলা-পশ্চিমপারে ছিল একটা টৌনে আরো যা যা থাকে, সেই সব – লোকজন আর রেলস্টেশন। দুই পারকে জুড়ে ছিল চার-চারটি ব্রিজ, চার রঙের। উত্তর থেকে দক্ষিণে-বাজারের পুল, দোলনা, ব্রিজ, লোহার ব্রিজ আর ফুটব্রিজ। ফুটব্রিজটা ছিল শুধুই সাহেবদের জন্য। পশ্চিমপারে সাহেবদের দরকার পড়ত এসপির কোয়ার্টার, ডিআইজির কোয়ার্টার, ইয়োরোপিয়ান ক্লাব (বারসহ), সিগারেট কারখানা আর রেসকোর্স – যেখানে দরকারের প্লেনও নামত। চা বাগানের।
ফুটব্রিজ দিয়ে কারা যাতায়াত করতে পারবে আর কারা পারবে না – এই বিধি ও নিষেধটা ঠিকঠাক জানা যায় না। জল্পেশগুড়ির মতো একমুঠো টাউনে এসব ঠিকঠাক জানানোর ও জানার দায় কারো ছিল না। যে কোনো বিধি বা নিষেধ রটিয়ে দিলে সেটাই বিধি বা নিষেধ বলে সবাই মেনে নিত। এ নিয়ে গোলমাল হতো না। ফুটব্রিজে ভারতীয়দের যাওয়া-আসা বারণ ছিল, নাকি, সরকারি কাজ ছাড়া এ ব্রিজ দিয়ে যাতায়াত বারণ ছিল – এটা কোনোদিনই পাকাপাকি জানা যায় নি। নিজের চোখে দেখা সাক্ষী দুই দলেই ছিল, যারা দেখেছে লেখা আছে ‘ইন্ডিয়ানস আর প্রহিবিটেড ফ্রম ইউজিং দ্য ফুটব্রিজ।’ – ‘ফর ইউজ অন গবমেন্ট ডিউটি অনলি।’ এ নিয়ে তর্কাতর্কি হয়েছে, এছাড়া ঝগড়াঝাঁটি হয়েছে, বাপ-ছেলের মতপার্থক্য হয়েছে, আসলে এটা দুটো মতই রয়ে গেছে – অমীমাংসিত দ্বিমত। কেউই এর নিষ্পত্তির জন্য ব্যস্ত ছিল না। মত দুটির মধ্যে প্রধান পার্থক্য কোথায় সেটা বুঝে ওঠা বেশ কঠিন ছিল – বিশেষ করে নতুন কারো পক্ষে। কিন্তু বেশ কিছুদিন এই মতপার্থক্যের ভেতর থাকতে থাকতে একজন টেরই পেত না – কখন থেকে সে এই দুই মতের পার্থক্য একেবারে ঠিকঠাক ধরতে পারছে। অন্তত ধরতে পারার আভাস পাচ্ছে। একটা হচ্ছে নিষেধ – ‘প্রহিবিটেড’, জোরও দেখানো হয়েছে। আরেকটা হচ্ছে বিধি – ‘শুধু ও কেবল সরকারি কাছে ব্যবহার্য।’ নিষেধ মানলে সাহেবরা সেই নিষেধ থেকে বাদ। বিধি মানলে প্রাইভেটরা সেই বিধির সুবিধা থেকে বাদ। হ্যাঁ – দুটোতেই কেউ না কেউ বাদ পড়ছেই। বা, উলটো করে দেখা যায় – দুটোতেই কেউ না কেউ যেতে পারছেই। চরমপন্থী বা উগ্রপন্থী বা সন্ত্রাসবাদী বা অ্যানার্কিস্ট হতে হলে পড়তে হবে বা জানতে হবে, কারা যেতে পারছে তা নয়, কারা যেতে পারছে না শুধু সেইটুকু। গান্ধীবাদী, সত্যাগ্রহী, অসহযোগী হতে হলে পড়তে হবে বা জানতে হবে, কারা যেতে পারছে তাদের জাত নয়, কী কাজে যেতে পারছে – সেই কাজটুকু। পুলিশ সাহেবের বাড়ি বা অফিসে তাকে দিয়ে ফাইল সই করাতে ওই ব্রিজ দিয়ে যায় না হরিমোহন?
ততদিনে আরো কিছু আনুষঙ্গিক কথা উঠে পড়েছে।  যে-সেপাইদের ওই ব্রিজে পাহারার ডিউটি দেওয়া হয়, তারা কি ‘অন গবমেন্ট ডিউটি’ নাকি ‘অনিন্ডিয়ান’। আরো একটা এমন প্রাসঙ্গিক আনুষঙ্গিক হচ্ছে – চা বাগানের যে সাহেবরা ক্লাব থেকে অফিস-কাছারি করতে এই ব্রিজে দিয়েই যাতায়াত করেন, তারা কি ‘অন গবমেন্ট ডিউটি অনলি’? হতেও পারে, নাও পারে। সাহেবরা যা-ই করুন না কেন তারা তো আমাদের শাসন করতেই এসেছেন? তাহলে, তাদের যে কোনো কাজই সরকারি কাজ আর সে-কাজ যে করবে, যে-ই করবে, সে-ই অন ডিউটি – সে-চিনিবাসই হোক আর সে-জমিদুদ্দিনই হোক।
জল্পেশগুড়ির লোকজন এ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসে নি অথচ মতবিরোধটাকে বাঁচিয়ে রেখেছে ধেনোজলের ছোট কইয়ের মতো।
জিইয়ে রাখার যে দরকার ছিল তা বোঝা যায় তিরিশ সাল নাগাদ, গান্ধীজির দ্বিতীয় আইন অমান্যের সময় – যখন লবণ-আইন ভাঙা হতো। জল্পেশগুড়ির কাছাকাছি কোনো সমুদ্র ছিল না – যদি-না জল্পেশগুড়িকে ঘিরে রাখা হিমালয়, ভুটান, খাসি পাহাড়কে ভৌগোলিক কারণে সমুদ্র ধরা হয়। একসময় নাকি এসব সমুদ্রই ছিল। সেই কোটি-কোটি বছর আগের ঘটনাটাকে না-হয় এখনকার ঘটনা বলেই মেনে নেওয়া যেত যদি পাহাড়ি লবণ বলে কিছু থাকত ও তা নিয়ে কোনো আইন থাকত। এটা তো লজ্জারও ব্যাপার। জল্পেশগুড়িতে একটা এমন কোনো আইন পর্যন্ত নেই যা অমান্য করে গান্ধীজির আন্দোলনে অন্তত সইটুকু করে রাখা যায়। নইলে দেশের সামনে মাথা হেঁট হয়ে যাবে জল্পেশগুড়ির।
জ্যোতিচন্দ্র সান্যাল আর সইতে পারছিলেন না। এমন কোনো আইন যদি না থাকে, যা ভাঙা যায়, তাহলে এমন কোনো আইন বানানো হোক, যা ভাঙা যাবে।
অবশেষে একদিন বার লাইব্রেরির পেছনের ঘরে রাখা জলের জালা থেকে জল নিয়ে কাঁসার গ্লাসে খেতে-খেতে অনিবার্যত পশ্চিমের জানালা দিয়ে আরো পশ্চিমে চোখ চলে গেলে ওই ফুটব্রিজটাই তার চোখে পড়ল।
এর মধ্যে কোনো আবিষ্কারও ছিল না, বিস্ময়ও ছিল না। জল্পেশগুড়ি বার লাইব্রেরির জল রাখার তিনটি আলাদা জায়গা ছিল।  বামুন-কায়েত-বদ্যিদের জন্য পেছনের ঘরের পশ্চিমি জানালার নিচে, কাঁসার গ্লাসসহ। এটা তাদেরই জন্য যারা প্রথমত বামুন-কায়েত-বৈদ্য, দ্বিতীয়ত নিজের হাতে জল খান। আর একটি জালা ছিল – উত্তরের ঘরের উত্তরের জানালার নিচে। এখানেও একটা গ্লাস ছিল – দস্তার। এটা সেই সব হিন্দুর জন্য, যাদের হাতের জল-বামুন কায়েতরা খেতেন না। কাদের হাতের জল চলে, কাদের হাতের জল চলে না – এ নিয়ে তো সর্বমান্য কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। তেমন কোনো সিদ্ধান্ত সম্ভব নয় বলেও বটে আর জল্পেশগুড়ি, জল্পেশগুড়ি বলেও বটে। যারা ঢাকা-ফরিদপুর থেকে এসেছে তাদের জানা ছিল না – মাহিষ্য বলতে কী বোঝায়, বর্ধমান-মেদিনীপুর থেকে যারা এসেছে তাদের জানা ছিল না – কৈবর্ত কত রকমের হয়। সরকার, হালদার, মজুমদার – এসব পদবি নিয়ে ধারণা খুব পরিষ্কার হতো না – যদি অন্তত তিন-চার পুরুষ আগের পরিচয় জানা না থাকে। তিন-চার পুরুষ আগে তো জল্পেশগুড়িই ছিল না।
সেই কারণে এই দ্বিতীয় ঘরের জল কেউই নিজের হাতে খেত না। কে জানে, কে খেলে, কে আপত্তি করবে। বার লাইব্রেরির একজন বেয়ারা ছিল – যদিও বেয়ারা তাকে বলা হতো না, কখনো। খুব গরিব বামুন। বামুন বলেই চাকরিটা পেয়েছিলেন – বামুনের হাতে জল খেতে তো কেউ আপত্তি করবে না।
আর একটা জালা ছিল দক্ষিণের প্রথম ঘরটায়। এটাতে ছিল বেশ ভারী অ্যানামেলের একটি গ্লাস। এই জল খেতেন মুসলমানরা ও ভোলা কোল-মুন্ডা নামের এক উকিল। জল দিতেন ওই বামুন – যাকে বেয়ারা বলা হতো না। তিনি চাকরি নেওয়ার সময় টৌন জল্পেশগুড়ির একমাত্র পণ্ডিতের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছিলেন – ‘বামুন কার কার জল খাবে না তার লিস্টি আছে কিন্তু জল দিতে কোনো বারণের লিস্টি নাই। নানুল্লেখেন বিধি। যে-নিষেধ উল্লিখিত নয়, সে-নিষেধ নয়। কিন্তু যে-বিধি উল্লিখিত নয়, তাকে বিধি বলেই গণ্য করতে হবে।’
এখন বামুনদের জালা থেকে কাঁসার গ্লাসে জল নিয়ে গ্লাস ঠোঁটে ঠেকালেই পশ্চিমের জানালায় চোখ যাবে ও জানালার ওপারে লোহার ফুটব্রিজটাকে দেখা যাবে। জল্পেশগুড়ির প্রত্যেক বামুন-উকিলের পক্ষেই এটা সত্যি। প্রত্যেক বামুন-উকিলেরই পক্ষে।
কিন্তু জ্যেতি সান্যাল সেদিন পশ্চিমের ওই জানালা দিয়ে যেটুকু মাত্র দেখা যায়, সেটুকুই মাত্র দেখলেন না। তিনি এতোটাই আওয়াজ করলেন কাঁসার গ্লাসটাকে জায়গামতো রাখতে যে অনেককেই ঘুরে তাকাতে হলো। কিন্তু কাজের দিন বিকেলে বার লাইব্রেরিতে এমন কত আওয়াজই তো ওঠে – তখনই তো সব অর্ডার বেরোনোর সময়। কাঁসার গ্লাসে তো আওয়াজ হয়ই, বামুনরা রাখলে একটু বেশি হয়। জ্যোতি সান্যালের মতো উকিল, সম্পাদক, জননেতা ও বামুন হলে সবচেয়ে বেশি হয়।
জ্যোতি সান্যাল, ডাকলেন – ‘জয়চন্দ্র।’ ওঁর ভাইও জুনিয়র। ‘হরেন’ – ওর মুহুরি। জয়চন্দ্র ও হরেন তার পেছনে গিয়ে দাঁড়াতেই তিনি বললেন, ‘আমি আইন অমান্য করতে যাচ্ছি। তোমরা পুলিশ অফিসে খবর দাও যাতে আমাকে গ্রেপ্তার করে। আমি বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে পারব না।’
জয়চন্দ্র শুধু বলতে পারলেন, ‘আইন?’
‘পেয়েছি। আমি সেই আইনের অকুস্থলেই যাচ্ছি। ইচ্ছে করলে তোমরা আমাকে অনুসরণ করতে পার’, বলে জ্যোতি মিষ্টির দোকানগুলির দিকে অগ্রসর হলেন। তিনি সদ্য জজকোর্ট থেকে বেরিয়েছেন – গায়ে ছিল গাউন। তিনি যখন মিষ্টির দোকানগুলির দিকে এগোচ্ছিলেন তখন গাউনের ধারগুলি উড়ছিল। ফলে থিয়েটার থিয়েটার লাগছিল।
এই সময়টা কোর্টে কেউ কারো দিকে নজর দিতে পারে না। কিন্তু কোর্টে তো ব্যস্ত লোকের চাইতেও অব্যাপারী মানুষজনের ভিড় থাকেই। জ্যোতি বলতে বলতে এগোচ্ছিলেন, ‘এটা লজ্জার কথা, কলঙ্কের কথা, ধিক্কারের কথা, চৈতন্যাভাবের কথা, লোকলজ্জার কথা, কর্মহীনতার কথা -’
তখন তার পেছনে বেমক্কেল উকিল মোক্তার, বেমোক্তার আসামি জামিনের অপেক্ষারত, মুহুরির কাছে ডেট জেনে নেওয়ার জিজ্ঞাসু – এই সবার ভিড়! আওয়াজ পেয়ে বার লাইব্রেরির ভেতর থেকে অনেক ছোকড়া ছুটে এসেছে। জ্যোতি এখন হাত নাড়িয়ে-নাড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন লোহার ফুটব্রিজের দিকে। জ্যোতি তখন বলে যাচ্ছেন, ‘আলস্যবিলাসের কথা, দেশাভিযানের অভাবের কথা, কর্তব্যবোধের অভাবের কথা…’
পেছন থেকে কেউ চাপা মন্তব্য করে, ‘এই রে, বিপিন পালের লাইনে গেছে, কতগুলি হলো?’
বিপিন পালমশাই খুব নামকরা নেতা ও বাগ্মী ছিলেন। আমাদের জল্পেশগুড়িতে তিনি কখনো আসেননি। কিন্তু জল্পেশগুড়ির পুরনো উকিলরা যখন কলকাতার ল’কলেজের ছাত্র ছিলেন, তখন তারা দু-একজন শুনে পরে কাজে লাগিয়েছেন।
খবর দেওয়া-নেওয়ায় মুহুরিদের দক্ষতা ও দ্রুততা সর্বত্রই কল্পনাতীত। জল্পেশগুড়ির মুহুরিরাও তার ব্যতিক্রম ছিল না।
ওই ফুটব্রিজে উঠতে ‘স’-এর বাঁকের মতো কয়েকটা সিঁড়ি ভাঙতে হতো। জ্যোতি সেই সিঁড়িগুলির গোটা চার-পাঁচ ভেঙেছেন, নিচে রেলিঙে হাত দিয়ে তার  ভাই জয়চন্দ্র দাঁড়িয়ে। তিনি আইন অমান্য করতে চান না আর জানেন না এই ব্রিজে ওঠার বিধি বা নিষেধ কোথা থেকে শুরু – সিঁড়ির গোড়া থেকে নাকি মাথা থেকে। তিনি কোনো গোলমালে পড়তে চান না বলে সিঁড়ির গোড়াতেই দাঁড়িয়ে পড়েছেন। ঠিক এই সময় জ্যোতি বাবুদের হরেন মুহুরি ভিড় ঠেলে ঘামতে-ঘামতে ছোট বাবুর কানে ফিসফিসিয়ে বলে, ‘পুলিশ অফিসে গিয়ে বললাম – বড়বাবু আইন ভাঙতে লোহার ব্রিজে উঠেছেন, অ্যারেস্ট করবেন চলুন। বড়বাবু ভেতরে গিয়ে সাহেবকে বললে সাহেব বলে দিয়েছেন – লোহার ব্রিজে কোনো আইন নেই, ভাঙবেটা কী, অন্য জায়গায় যেতে বলো।’
জয়চন্দ্র চিৎকার করে ডেকে ওঠেন, ‘দাদা, দাদা।’
জ্যোতি ততক্ষণে ‘স’-এর বাঁকের মাথায়। তিনি ঘাড় না ঘুরিয়ে শুধু ডান হাত মাথার ওপর তুলে নাড়তে নাড়তে বলে ওঠেন, ‘এখন আর কোনো পেছু ডাকা নয়। মহাত্মাজি সবাইকে আহ্বান করেছেন আর আমরা এই জল্পেশগুড়িতে একটি আইনও অমান্য না করে দেশমাতৃকার মুখ কলঙ্কিত করছি। এই ব্রিজে ভারতীয়দের ওঠা নিষিদ্ধ। আমি সেই আইন অমান্য করছি।’
‘এই হরেন, কিছু করো, হ-রেন’, জয়চন্দ্র কাতরে ওঠেন। যোগ্য মুহুরিরর তৎপরতা বাঘের মতো। তারা হাকিমের মুখ থেকে ফাঁসির আসামিকে নিঃশব্দে কেড়ে নিয়ে উধাও হয়ে যেতে পারে। হরেন-মুহুরি বাঁহাতে ধুতির ভাঁজিকোঁচাটা তুলে তিন লাফে ‘স’-এর বাঁকের মাথায় চড়ে, বড়বাবুকে কী বলে, দুই লাফে নেমে আসে। মুহুরির কথা কানে নেবে না – এমন উকিল-ব্যারিস্টার এখনো মায়ের পেট থেকে বেরোয়নি। জ্যোতি একটু থেমে চিৎকার করে উঠলেন, ‘আমি তাহলে পাঁচ আইন ভেঙে পাবলিক নুইস্যান্স ক্রিয়েট করব। আমি এই ব্রিজের ওপর প্রস্রাব করব। হরেন, জল।’
একটু সময় লাগল। প্রথমে ওই গাউন, কোট, জামা, গেঞ্জির ভেতর থেকে পৈতেটা বের করে কানে জড়াতে হলো। তারপর আবার প্যান্টের বোতাম খুলে যেটা দিয়ে প্রস্রাব করবেন, সেটা বের করতে হলো। তারপর আইন অমান্যের জলরাশি মূত্রাস্থলী থেকে ব্রিজের ওপর ফেলতে হলো। আশ্চর্য ক্ষিপ্রতা হরেন মুহুরির, জলের ভেতরে শুশুকের মতো। আইন সম্পূর্ণ অমান্য হয়েছে কী হয় নি, হরেন-মুহুরি একটা মাটির ভাঁড়ে জল নিয়ে পেছন থেকে বলে, ‘বড়বাবু, জল।’
এই জ্যোতি সান্যাল সম্পাদক হিসেবে জল্পেশগুড়ির নবাবসাহেবকে নিয়ে একটা ছড়া লিখেছিলেন তার কাগজে। সেই ছড়াটাই নসুদা শুনতে চাইল মণিদার কাছে। জল্পেশগুড়ির লোক হলেই, নিজের মুখস্থ থাকলেও, এই ছড়াটা আর একজনের মুখে শুনতে চায়।
নোয়াখালি করি খালি আসি জলপাই
বিবির আঁচলতলে চিয়া পানি খাই।

ছয়
আমাদের টৌন জল্পেশগুড়ি বহুদিন ধরেই একটা স্যাম্পল টাউন – ওই যেমন আজকাল ১২-১৩ তলা শ-শ ফ্ল্যাট বেচার বিজ্ঞাপনে ছাপা হয় – মডেল ফ্ল্যাট রেডি। কিন্তু জল্পেশগুড়ি তো আর এমন একটা ছোট ব্যাপার নয়। সত্যি-সত্যি টৌন। জেলার সদর, বিভাগের সদর, জজকোর্টের সদর, নর্থ রেঞ্জের ডিআইজির সদর। সে তো একটা মডেল ফ্ল্যাট নয়, তার ব্যালকনিতে ম্যানিকুইন শিশুসহ দ¤পতি থাকলেও নয়। কিন্তু বদলাচ্ছে তো বটেই। আরো পরিবর্তন হবে। কিন্তু জল্পেশগুড়ির মতো বানানো টৌনগুলি নিয়ে এই এক সমস্যা – কিছুতেই সবটা বদলায় না। সেই কারণেই আদি মৌজা ম্যাপ তৈরি থাকা দরকার।
আমাদের রেলস্টেশন একটা, তাতে একটাই প্লাটফর্ম, কোনো ওভারব্রিজ নেই, কোনো আমিষ-নিরামিষ ভোজনালয় নেই। সাবেককালে একটা সোরাবজির দোকান ছিল। সাহেবরা এই স্টেশনে চা খেত। যুদ্ধের সময় মদ খেয়ে হুল্লোড়ও করত।
‘জল্পেশগুড়ি’ নামের সঙ্গে ‘নিউ’ আর ‘জংশন’ শব্দদুটি লাগিয়ে মাইল আট-দশ উত্তরে ও মাইল তিরিশেক পশ্চিমে দু-দুটি স্টেশন হয়েছে। কিন্তু সেই সব স্টেশনে সাহেবরা চা খেতে পারে না।  সেগুলিতে তো সূর্যোদয় ঘটে না – সূর্যোদয়ের সঙ্গে স্টেশনের কোণ মেলে না। সূর্য না উঠলে তো ব্রেকফাস্ট হয় না।
টৌন জল্পেশগুড়িতে রাস্তা আছে, রাস্তা যেমন হয়। কিন্তু     রাস্তাগুলি কোথাও থেকে কোথাও যায় না। যুদ্ধের সময় তৈরি ও যুদ্ধের দরবার চুকে গেলে ছেড়ে যাওয়া এয়ারপোর্ট যেমন দেখতে হয়, তেমনি। বড়-বড় রাস্তার মতো চওড়া রানওয়ে সব। কতটা চওড়া আর কতটা লম্বা ঠাহরে আসে না। রানওয়ে দিয়ে মাটি কাঁপিয়ে ছুটে সেইসব বোমারু বিমানের তো যাওয়ার কোনো জায়গা ছিল না। তারা আকাশে উড়ে যেত। কিছু-কিছু লেখা আছে ইংরেজিতে, কতকগুলি চিহ্ন দিয়ে। সেসব চিহ্ন দিয়ে তো কিছু  হদিস পাওয়া যায় না। তেমনি, আমাদের টৌন জল্পেশগুড়ির রাস্তাগুলি দিয়ে কোথাও যাওয়া যেত না। অনেক নতুন লোক সেটা না বুঝে রাস্তাগুলি দিয়ে কোথাও যেতে-যেতে সেই রাস্তা দিয়েই ফিরে আসত। অথচ এমনটা হতে পারে যে গোল রাস্তায়, রাস্তাগুলির আকার তেমন গোল ছিল না। জল্পেশগুড়ি টৌনে কাউকে কোথাও যেতে হলে শর্টকাট করতে হতো। এক রাস্তা লাফিয়ে শর্টকাটে ঢুকে পড়তে হতো। শর্টকাট শেষ হলে আবার এক রাস্তা লাফিয়ে পেরিয়ে আরেক শর্টকাটে ঢুকে পড়তে হতো।
যেমন, রেলস্টেশন থেকে কাউকে যদি কদমতলার মোড়ে পৌঁছুতে হয়, তাহলে দুই  নম্বর গুমটির উলটোদিকের শর্টকাট দিয়ে হোসেন ভিলার পেছনে দিয়ে একটা রাস্তা লাফিয়ে আমাদের গলিতে ঢুকে আবার শর্টকাট করলেই কদমতলার মোড়।
যেমন বেগুনটাড়ির মোড়ে বিশ্বাসবাড়ির পাশ দিয়ে পাগলা-গলি দিয়ে বাজারে পৌঁছুতে হয়। এমন রটনা ছিল যে, সেই গলির দুটো-তিনটে বাড়িতে তিন-চার রকম পাগল থাকত, মানে পাগলের স্যাম্পল। কিন্তু সবচেয়ে বড় স্যাম্পল ছিল গলির সরু লন, পামগাছ, লিলিপুল দিয়ে সাজানো বড় বাংলোটায়। তার নাম ছিল টি-পি। কাজের লোকদের মশা কামড়ায় বলে সে নাকি কোঁড়া মার্কিন দিয়ে এক বিশাল মশারি বানিয়ে দিয়েছিল। তাতে মশা ঠেকেছিল কিনা তা জানা যায় নি।
কিন্তু ভিতরে যারা শুয়েছিল তাদের শ্বাসকষ্ট হয়েছিল। শুনে টি-পি মার্কিন থানের ভেতরে হাওয়া বওয়ানোর জন্য মুখোমুখি  অনেকগুলি জানালা বসিয়ে দিয়েছিল। মশারির নেটের জানালা। মার্কিন থানের মশারি আর মশারিতে নেটের জানালা।
যেমন অলিগলিময় কামারপাড়া ছিল নবাববাড়ির পেছন। বা এমনও বলা হতো – কামারপাড়ার মুখ ছিল, নবাববাড়ির পেছন। এটা রঙ্গরসিকতার বিষয় নয়। কাউকে যদি বলতে হতো, নবাববাড়ির ভেতর দিয়ে ব্রাহ্মসমাজে যাবে কী করে, তাহলে তাকে নবাববাড়ির পাছদেয়ালের একটা ফোকর দেখিয়ে দিয়ে বলা হতো, ‘এই পাছা দিয়ে ঢুকে হাঁটতে-হাঁটতে সোজা গলা দিয়ে বেরিয়ে যা।’ যেখানে শরীরবিদ্যার এই উলটো শর্টকাট ছিল না – সেখানে সবাই প্রাইভেট শর্টকাট বানিয়ে নিত কোনো একটি-দুটি বাড়ির ভেতর দিয়ে। হয়তো এটাই একটা কারণ যে, সব বড় বাড়িতেই সদর থাকত আর খিড়কি থাকত। আমাদের পাড়ায় চক্রবর্তীদের বাড়ি বিঘে তিন জমির ওপর। সেই বাড়ির উঠোনটার  নানা সাইড দিয়ে সবাই গিয়ে উঠত মাদ্রাসার মাঠে। উঠোনের কোনো দিকেই কোনো বেড়া ছিল না। পাটবোঝাই গরুর গাড়িও চক্রবর্তীবাড়ির উঠোন দিয়ে বড় রাস্তায় যেত। মানুষ না যাতায়াত করতে পারলে তার এমন বিঘে বিঘে উঠোন কেন? কামারপাড়ার ভেতর ছিল অসংখ্য গলি। এ-গলি ও-গলি করে সোজা ওঠা যেত কদমতলার মোড়ে পাটগোলা হয়ে। শিয়ালপাড়া থেকে লিচুপট্টি দিয়ে তো চিলাহাটির রাস্তায় ওঠা যেতই, আবার রাস্তা টপকে চলে যাওয়া যেত রেললাইন পর্যন্ত। সুইসাইডের জন্য এই রাস্তাটা খুব ব্যস্ত থাকত। পুরনো মসজিদ ও রাজার হাট ছিল টৌনের বাইরে, চার নম্বর গুমটি পেরিয়ে। সে-গুমটিতে গেট ছিল না।
রাস্তার কথা এতো করে আসছে, মূল কথাটার প্রমাণ হিসেবে। আমাদের টৌন জল্পেশগুড়িতে সবই ছিল স্যাম্পল। টৌনজুড়ে গোটা চার-পাঁচ রাস্তা অথচ রাস্তাগুলির মধ্যে কোনো সংযোগ নেই। ওগুলি রাস্তা নয়, রাস্তার স্যাম্পল। যদি কেউ রাস্তা দিয়েই কোথাও পৌঁছুতে চায়, সে কোনো দিনই কোথাও পৌঁছুতে পারবে না।
রাস্তার পর ঘাট। সারা টৌন পুকুর ছিল। দুটি  রাজবাড়ির দিঘি, স্টেশনের পুকুর (সম্ভবত রেললাইন পাতার সময় কাটা) আমবাগান ও ডিআইজির কোয়ার্টারের মাঝখানের পুকুরের কোনো নাম দরকার হয় নি কারণ কারোই কোনো কাজে লাগত না। কিন্তু পদ্মপাতা আর শাপলায় ছেয়ে থাকত। বিষ্টু মোক্তারের পুকুর। বেগুনটাড়িতে শিববাড়ির পুকুর। মরণঘোষের পুকুর – কিন্তু সেটা তো টৌনের বাইরে।
আমবাগান, জামবাগান, রেসকোর্স – এগুলি ছিল শুধুই নামের স্যাম্পল। আমবাগানের বা জামবাগানের কেউ আম বা জাম গাছ দেখে নি। রেসকোর্সেও কেউ রেস দেখে নি। কিন্তু এগুলি নিয়ে স্মৃতিকথা ছিল। সিনেমা হল ছিল দুটি কিন্তু মালিক একই লোক – নিউ চিত্রালী আর নিউ সিনেমা। দুটো হলের মালিক ছিলেন আসলে দুটো থিয়েটারের দল – আর্য নাট্য সমাজ আর বান্ধব নাট্য সমাজ। নগেন গাঙ্গুলি নামে একজন বিএ ছিলেন এই দুটোরই লিজি। তার একটা দোতলা কাঠের বাড়ি দুই নম্বর গুমটির উলটোদিকে – খুব বাহারের, নজরে পড়বেই। এরই একটা রেস্তোরাঁ ছিল, স্টেশনের মুখোমুখি, নাম ছিল ‘ওয়েসিস’। শহরের একমাত্র সম্ভ্রান্ত রেস্তোরাঁ।
প্রথম থেকেই রাত্রিবাসের ব্যবস্থা ছিল?
‘ওয়েসিসে’ ঢোকার সাহস আমাদের ছিল না। তবে কারো ছিল। কিন্তু থাকার লোক ছিল না। যারা কাজেকর্মে কোর্টকাছারিতে আসত, তারা গরুর গাড়ির মাথা নামিয়ে উকিলবাবুর বাড়ির মাঠে কিংবা কোর্টের মাঠে ক্যাম্প বসাত। ভদ্রলোক হলে সেরেস্তাঘরে শুতো। হোটেলে ঢোকা খুব খারাপ কাজ ছিল। যুদ্ধের সময় মিলিটারিরা ওয়েসিসে ঢুকত।
যুদ্ধ ছাড়াও ঢুকত চা-বাগানের সাহেবরা। আর মাত্র একটা রেস্তোরাঁ ছিল জল্পেশগুড়ির চা-কোম্পানির শেয়ারবাজারের লোকজন যার নাম দিয়েছিল ক্লাইভ স্ট্রিট, সেই রাস্তায়। সেখানে ব্যাংকও ছিল কিছু। কুমিল্লা ব্যাংকিং করপোরেশন, নোয়াখালি ইউনিয়ন ব্যাংক, ভারতীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক, জোতদার্স ব্যাংকিং অ্যান্ড ট্রেডিং করপোরেশন। এই ব্যাংকগুলি প্রায়ই ‘ফেল’ হতো। ব্যাংক ফেল হওয়া কাকে বলে সেটা জানা ছিল না আমাদের। কিন্তু ব্যাংক ফেল দেখা ছিল। সেই দেখা অবিশ্যি পুরনো বাংলা সিনেমা ও উপন্যাসের সঙ্গে মিলত না।
ব্যাংকের দরজায় মাথা খোড়া কোনো ভিড়ও হতো না, কান্নাকাটিও না। কিছুদিন পর সেই জায়গাতেই অন্য একটা ব্যাংক বসত। আবার ফেল হতো।
ওই ক্লাইভ স্ট্রিটেই ছিল শহরের একমাত্র পেট্রোল পাম্প, বার্মা শেল। উলটোদিকে সদর থানা,  লালটিনের। আমাদের স্কুলে যাওয়ার শর্টকাট ছিল বার্মা শেলের মোড় থেকে থানার ভেতর দিয়ে সেপাইদের খুপড়ি-খুপড়ি রান্নাঘরের পাশ দিয়ে করলা নদীর পাড়ের রাস্তায় ওঠা।
এই শর্টকাটে সেপাইদের রান্নাঘরের সারি দেখা ছিল বলেই আমার শেষ উপন্যাস, ‘বরিশালের যোগেন মণ্ডল’, লিখতে-লিখতে বাংলার আইনসভায় তফসিলিদের জন্য চাকরি সংরক্ষিত রাখার তর্কের বিষয়টি বুঝতে’ বেশি বইপত্র ঘাঁটতে হয় নি ও বেশি বুড়ো মানুষ খুঁজতে হয় নি। বুঝে গিয়েছি – একই চাকরি করছে বলে বামুন শুদ্দুর কি এক হয়ে যেতে পারে? না কী? মামলা গিয়েছিল – সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের কাছে। অধ্যক্ষ তখন সুরেন দাশগুপ্ত। তিনি রায় দিলেন পাশাপাশি রান্নায় জাত তো যায়ই না, বরং দেয়ালে একটা ফুটো ফুটুলে পুণ্য হয়।
আমাদের টৌন জল্পেশগুড়িতে কলেজ ছিল একটা। ছেলেদের হাইস্কুল ছিল তিনটি – জিলা স্কুল, ফণীন্দ্রদেব ইনস্টিটিউশন আর সোনাউল্লা স্কুল। প্রথমটি ছিল সরকারি। দ্বিতীয়টি জল্পেশগুড়ির রাজাসাহেবের দান, তৃতীয়টি এক মুসলমান বিদ্যোৎসাহীর জমিতে ও টাকায় তৈরি, প্রধানত মুসলমান ছাত্রদের জন্য।

সাত
আমাদের টৌনে এমবি ডাক্তার একজন ও একজনই মাত্র। ডক্টর অবনীধর গুহ নিয়োগী। ডাক্তারবাবু স্বদেশি ছিলেন, লালুপ্রসাদ যাদবের চেহারার সঙ্গে অদ্ভুত মিল।
কংগ্রেসি ছিলেন, রেডক্রস ছিলেন। সারা জিলার একমাত্র ডাক্তারবাবু। কথা বলতেন খুব কম। আশু মুখুজ্যের মতো গোঁফ – যা বলতেন, তাও বোঝা যেত না। এতো বড় নেতা অথচ কোনোদিন কোনো ভোটে দাঁড়ান নি। জল্পেশগুড়ির স্যাম্পল ডাক্তার।
চারুচন্দ্র সান্যালও ছিলেন। জল্পেশগুড়ির পুরনো বাড়ির ছেলে। মেডিক্যাল কলেজের ফিফথ ইয়ারে কলেজ ছেড়ে গান্ধীজি। তিনিও কংগ্রেসি, পরে হিন্দু মহাসভা, আবার কংগ্রেসি। জল্পেশগুড়ির প্রথম বা একমাত্র রবীন্দ্রপুরস্কার প্রাপক হওয়ায় তিনি ‘ডাক্তারবাবু’ ছিলেন না, ছিলেন চারুমামা, চারুকাকা বা চারুদা বা চারু সান্যাল।
আরো একজন এমবি ছিলেন – শৈলেশ বাবু বলে। কিন্তু তিনি ছিলেন মিলিটারির মতো ডাক্তার।  হাফপ্যান্ট পরে, ছবিতে দেখা ডাক্তারি-ব্যাগ নিয়ে সাইকেলে রোগী দেখতে বেরোতেন। হেমনারায়ণ  রায় গরদের পাঞ্জাবি ও ধুতিতে সেজেগুজে ছাতামাথায় তার ডিসপেনসারিতে যেতেন ও দু-ঘণ্টা পরে বাড়ি ফিরে আসতেন।
আরো একজন এমবি ডাক্তার ছিলেন – কিন্তু তার নিজেরও সেটা মনে থাকত না। জল্পেশগুড়ির শহরে কে কত পুরনো তা চেনা যেত, বাবুপাড়ায় ঢুকতে ডানহাতি যে-বাড়িটা, টিনের ও ডাবওয়ালের, তাকে কী নামে ডাকেন, সেই ডাকে। যদি বলেন, ‘নগেন সেনের ডিসপেন্সারি’ তাহলে বুঝতে হবে, পুরনো লোক। এমন গল্প আছে নগেন সেন ডাক্তারি পাশ করে শহরে এলে তার বাবা মহাআয়োজন করেন, ডিসপেন্সারি, চেম্বার সাজিয়ে ডাক্তারকে বসালেন। নগেন সেনের প্রথম তিনটি রোগী খুব কম রোগকষ্ট পেয়ে  মারা যাওয়ায় নগেন সেন এতো কাঁদেন ও কাঁদতেই থাকেন যে, তার বাবা তাকে বলেন, ‘তোকে আর মড়াকান্না কাঁদা ডাক্তারি করতে হবে না। বাড়িতে বসে কাজকর্ম দেখ।’ ব্যস, ডিসপেন্সারি বন্ধ। ওরা বড়লোক ছিলেন, নানা রকম সম্পত্তি ছিল। নগেনজ্যাঠার মাথায় একরাশ শাদা চুল। ধুতি আর গেঞ্জি পরে রিকশায় সারা টৌন টহল মারতেন।
কিন্তু এমবি ডাক্তার না থাকলেও এলএমএফ ডাক্তারে জল্পেশগুড়ি ছিল ঠাসা, অলিগলিতেও ডাক্তার। তার কারণ জেনকিনস মেডিক্যাল স্কুল, সেখানে তিন বছরে ডাক্তার হওয়া যেত, ততদিন, যদ্দিন বিধান রায় ওই ডিগ্রি ও কোর্সটাই তুলে না দেন। মেডিক্যাল স্কুলের ছেলেরা মাঝেমাঝেই মারামারি করতে বেরোত, লম্বা-লম্বা হাড় নিয়ে। এত ঘন-ঘন মারামারি কেন লাগত, তা তখনো জানা ছিল না, এখনো জানা নেই। মেডিক্যাল স্কুলে বিপ্লবী দলের ও কমিউনিস্টদের খুব শক্ত ঘাঁটি ছিল। ওই স্কুল থেকে পাশ অনেক ডাক্তারই কালক্রমে কোনো না কোনো কমিউনিস্ট পার্টির বড় নেতা হয়েছেন। শচীন দাশগুপ্ত ছিলেন তাঁদের একজন – উত্তরবঙ্গের, তখনকার উত্তরবঙ্গের কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা।
সরকারি হুকুমে সরকারি স্কুল-কলেজে সরস্বতী পূজা করা নিষিদ্ধ ছিল। সেই কারণে, জিলা স্কুলের সরস্বতী পুজো হতো যোগমায়া কালীবাড়িতে আর মেডিক্যাল স্কুলের পুজো হতো শহরের মাঝখান কেটে বয়ে যাওয়া করলা নদীতে। মেডিক্যাল স্কুলের সবচেয়ে লম্বা ছাত্র ছিলেন আমার এক কাকা – পানুকাকা। তিনি যতদিন ধরে লম্বা ছিলেন, ততদিন ধরেই ছাত্র ছিলেন। সাঁতার জানতেন না। তিনি ওই করলা নদীর যতটা ভেতর পর্যন্ত না ডুবে হেঁটে যেতে পারতেন, সেই ভেতরে একটা ভাসমান বাঁশের মাচায় মেডিক্যাল স্কুলের সরস্বতী পূজা হতো।
মেডিক্যাল স্কুল তুলে দেওয়া হবে – বিধান রায়ের এই নীতিঘোষণার পর আর ছাত্র ভর্তি করা হতো না। কিন্তু তখনো যারা ছাত্র তাদের পাশ না হওয়া পর্যন্ত তো স্কুল ছিল। শেষে নাকি অনেক বছর পর ধরা পড়ল যে, একমাত্র পানুকাকার জন্য বছরের পর বছর স্কুল চালাতে হচ্ছে। সাধারণ হিসেবে পানুকাকার ৩৯ সালে ডাক্তার হয়ে যাওয়ার কথা। আমার বাবাকে পানুকাকারা বড়দা ডাকতেন ও ভয়ও পেতেন। সেই বড়দা খুব কম কথা বলতেন। কিন্তু তাঁর একটা স্থায়ী বেদনা সেই বড়দা প্রায়ই জানাতেন, আমিও যেন শুনেছি মনে হয়, ‘একটা ওয়ার্ল্ড ওয়ার হয়ে গেল, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য শেষ হয়ে গেল, পুরো দেশটা ভাগ হয়ে গেল, আমাদের দেশগুলি বিদেশ হয়ে গেল, ওয়েস্ট বেঙ্গল নামে একটি নতুন প্রভিন্স হলো, তার প্রাইম মিনিস্টার  বদলে গেল, বিধান রায় প্রাইম মিনিস্টার হলেন কিন্তু পানুর আর ডাক্তারি পাশ করা হলো না।’
কথিত আছে যে, বিধান রায়ের হুকুমে নাকি পানুকাকাকে একই বছরে ডবল প্রমোশন দিয়ে থার্ড ইয়ারে তুলে ফাইনাল পরীক্ষায় পাশ করানো হয়। তারপর মেডিক্যাল স্কুল উঠিয়ে দেওয়া গেল বটে কিন্তু জল্পেশগুড়ি টৌনের ইতিহাসে এটাও একটা স্যাম্পল রেকর্ড হয়ে থাকল যে, পানুকাকা ডবল প্রমোশনপ্রাপ্ত একমাত্র ডাক্তার।
রটনা আছে – মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন বা কাউন্সিল থেকে খুব নামজাদা ডাক্তারদের এক প্রতিনিধিদল বিধান রায়ের কাছে অভিযোগ করেন যে, এর ফলে চিকিৎসাবিদ্যাচর্চায় খুব খারাপ দৃষ্টান্ত তৈরি হবে। শুনে বিধান রায় নাকি ধমকে ওঠেন, ‘থামো তো! ১৩ বছরে একটা ছেলেকে এলএমএফ পাশ করাতে পারো না, তোমাদের আবার চিকিৎসা বিদ্যাচর্চা। আমরা কী করে ডাক্তারি পাশ করেছ?’ প্রতিনিধিদের মধ্যে নাকি বিখ্যাত এমআরসিপি ও এফআরসিএস ছিলেন অনেকে। তাদের কেউ একজন যথেষ্ট বিনয়ের সঙ্গেই বলেন, ‘দেশে এমন হতে পারে কিন্তু বিদেশে তো আর এভাবে ডাক্তারি পাশ করা যায় না।’ ‘ওই মেম্বারশিপ আর ফেলোশিপ? সেটা তো পরীক্ষাই না। মৌখিক পরীক্ষা। তাও তো আবার অনেক এক্সপার্ট করুণা করে ইন্ডিয়ান ছাত্রদের কিছুই জিজ্ঞাসা করে না।’ শেষ চেষ্টায় একজন প্রবীণ ডাক্তার কাতর হয়ে বলেন, ‘অন্তত স্যার, ডবল প্রমোশনটা না দিয়ে ডাক্তারির সতীত্ব রক্ষা করুন।’ আর বিধান রায়ও তাঁর সিদ্ধান্তের কারণ জানিয়ে আলোচনা বন্ধ করে দেন, ‘ডবল প্রমোশন না দিলে তো আরো এক বছর ওই একটি ছেলের জন্য পুরো স্কুল চালু রাখতে হয়। তাতে আমার টেকনিক্যাল এডুকেশন বাজেট ধসে যাবে। তোমাদের ডাক্তারির সতীত্ব-কস্টিং এতো বাড়ালে তোমরাই বিপদে পড়বে।’
যেসব উদ্ভট সব ঘটনার মধ্যে মানুষ মিল দেখে ফেলে অথচ কারণ খুঁজে পায় না তারই নাম, যারা জানেন তারা বলেন, নেমেসিস। যারা শব্দটা জানেন না তারা বলেন ডেসটিনি।
যারা আরো একটু কম জানেন তারা বলেন ফেট। যারা আরো একটু কম জানেন তারা বলেন ডিভাইন ডিজাইন।
আমার  বাবা পানুকাকার বড়দা ১৯৬৫ সালের সকালে হঠাৎই রক্তবমি করলেন। রংটা কালো কফির মতো। টকটকে নয়। তখনো জল্পেশগুড়িতে রক্ত পরীক্ষা-টরীক্ষা সাপের ওঝার মন্ত্রবলে বিষঝাড়ার মতো লোকশ্র“তি। জল্পেশগুড়ি টৌনের স্যাম্পল স্টাইলে একজনই ছিলেন কেমিস্ট বা প্যাথলজিস্ট। ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড ল্যাবরেটরিতে বসতেন। যা হোক, জল্পেশগুড়িতে যেদিন সকাল ছটা নাগাদ গলা দিয়ে রক্ত পড়ল, সেদিনই বেলা এগারোটার মধ্যে রক্তপরীক্ষায় জানা যে, বাবার রক্তে নাইট্রোজেন জমে গেছে, তার আর বাঁচার কোনো রকম উপায় নেই, যদ্দিন বাঁচবেন তদ্দিন বাঁচা ছাড়া। জল্পেশগুড়িতে তখন ঢাকার বিধান রায়, ডাক্তার মন্মথ নদী এসে প্র্যাকটিস শুরু করেছেন। তিনি একে এমবি, তায় ঢাকার, তায় বিলেত-টিলেত ঘোরা। সুতরাং জল্পেশগুড়ির মেডিক্যাল স্কুলের ছাত্র হিসেবে যারা ডাক্তারি করছিলেন তাদের ওপর চাপ পড়ল। একজিমা, হাঁপানি, আমবাত, পাইলস, ভগন্দর, শ্বেতস্রাব, অগ্নিমান্দ্য, ম্যাক্সিমাম গ্যাস, অম্বল – এই সব স্থায়ী পুরনো অসুখগুলিই তো ডাক্তারদের লক্ষ্মী। ডাক্তার নন্দী তাদের ধরে-ধরে সারাতে লাগালেন। এলএমএফরা ফিসফিসিয়ে রটাতে লাগলেন, ‘এখন ওষুধ খেয়ে ভালো ঠেকছে। খাও-খাও। ওষুধ তো বানায় কোম্পানি। আমরা কি আর নাম জানি না? ঢাকায় কি আলাদা করে ওষুধের নাম শেখানো হয়। পাচ্ছো যখন খাও। দুদিন পর শ্বাসকষ্ট হলে আমাকে ডাকাডাকি করো না। এগুলি সব বিষ। বিষের নেশা ধরে গেলে বিষ ছাড়া চলে না। স্টেরয়েড। স্টেরয়েড। বিষ। বিষ ঢুকিয়ে বংশগত একজিমা সারাচ্ছে। একজিমা সারছে বটে কিন্তু বিষ তো তাতে অমৃত হয়ে যাচ্ছে না। বিষ বিষের মতোই বাড়ছে রক্তে, তারপর দেখা যাবে একদিন – তোমার রক্তের ভেতর রক্তের চাইতে বিষই বেশি। তো বিষ তখন বিষের কাজ করবে না? শেষ শ্বাস টানতে-টানতে তখন পুরনো একজিমার জন্য শোক উথলে উঠবে। এতোদিন ওই একজিমাই তো তোমার মরণ ঠেকিয়ে রেখেছে। তোমার তিন পুরুষ ধরে।’
এসব কথা ডাক্তার নন্দীর কানে উঠল। টৌন জল্পেশগুড়িতে কানাকানি জীবনযাপনের আধুনিক মেথড হিসেবে স্বীকৃত ছিল। এতোগুলি দেশি চা-কোম্পানির হেড-অফিস। যখন শেয়ার হাতড়ে কোম্পানি লুট চালু হলো, তখন থেকে কানাকানিও দরকার হলো – কার শেয়ার কে কিনছে। সুতরাং ডাক্তার নন্দীর কাছে স্টেরয়েড সংক্রান্ত খবর পৌঁছুবে না – এটা হতেই পারে না।
কিন্তু ডাক্তার নন্দী মানুষটি কানাকানির মানুষ ছিলেন না। ছিলেন সমাজচেতন ডাক্তার। তার দুই ছেলের এক ছেলে মেঘ বিয়ে করে বিদেশে। আর এক ছেলেরও মেমবউ। কিন্তু সে ছেলে থাকেন আন্ডারগ্রাউন্ডে। আন্ডারগ্রাউন্ড মানে তিনি কোথায় থাকেন, বা ঘোরেন, তা কেউ জানে না। তাঁর স্ত্রী থাকেন ওভার গ্রাউন্ডে, ডাক্তার নন্দীরই বাড়িতে। ডাক্তার নন্দীর মতে – স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা-চেতনা বাড়াতে পারলে আমাদের জনমৃত্যুর হার কমে যাবে। সুতরাং তিনি ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের জিলা প্রেসিডেন্টকে ধরে বসলেন, ‘আইএমএ একটা সেমিনার ডাকুক। দি স্টেরয়েড অ্যাজ এ রিমেডি। আমি বলব।’
আইএমএর জিলা প্রেসিডেন্ট তখন ছিলেন দোমোহনি, যখন জংশন স্টেশন ছিল তখনকার রেলের ডাক্তার। জংশন উঠে গেলেও তিনি বদলি নেন নি। জল্পেশগুড়িতে তখনো সেমিনার শব্দটি বাংলা হয়ে ওঠে নি। প্রেসিডেন্ট একটু বোঝার চেষ্টা করেছিলেন, ডাক্তার নন্দী কী করতে চাইছেন। তারপর ডাক্তার নন্দীর কথাবার্তা থেকে বুঝে নিলেন, সেমিনার মানে কথা বলা, ডাক্তার নন্দীও কথাই বলবেন শুধু। ওই যেমন সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ারের আগে ম্যালেরিয়ার জন্য মিটিং হতো।
সেই জল্পেশগুড়ির প্রথম আধুনিক এমবি ডাক্তার, যিনি ডাক্তারি চিকিৎসা ও জনচেতনা নিয়ে কথা বলতে ও শুনতে ভালোবাসতেন, তিনি আমাকে সেই ১৯৬৫ সালের ৫ ডিসেম্বর সকাল ১২টার আগেই বাবার ব্লাড রিপোর্টটা হাতে নিয়ে প্রথমে সামান্য হাসি  ফুটিয়ে, ‘তাহলে টৌনের তো উন্নতি নাই বলা চলে না। নাকি শিলিগুড়ি থিক্যা প্যাথলজিস্ট আনলেন?’
হ্যাঁ, তখন ব্লাড রিপোর্ট, অক্সিজেন, এক্স-রের জন্য শিলিগুড়ি যেতে হতো। জল্পেশগুড়ি হাসপাতালেও ছিল না। ডাক্তার নন্দীর কথায় আমি ‘হ্যাঁ’ ‘না’ কী বলেছিলাম, মনে নেই। কিন্তু তার ভুরু কোঁচকানো হাসি মোছা ও ঠোঁটের ওপর একটা আঙুল বোলানোটা মনে আছে। রক্তে নাইট্রোজেন নিয়েও তিনি কিছু বলে থাকবেন। সেগুলিও আমার মনে নেই। ডাক্তারবাবুর একটি কথাই আমার  মনে-মাথায় গেঁথে গিয়েছিল আর শুধু মনে হচ্ছিল, বাবা কিছুতেই বাঁচবেন না, আমাকে এখনই জল্পেশগুড়ির একমাত্র দিনবাজারে (স্যাম্পল) যেতে হবে, আমার মা তো আর আমিষ খেতে পারবেন না। ডাক্তার বাবু বলেছিলেন, ‘নাইট্রোজেন রিটেনশন মানে এ ওয়াকিং ম্যান অন দি স্ট্রিট বটে এ ডায়িং ম্যান ক্লিনিক্যালি।’ সব জেনে-বুঝে বাবার মৃত্যুব্যাধির কিছু সান্ত্বনা ওষুধ কিনে বাড়িতে দিয়ে, সাইকেলে বাজারে ছুটলাম মায়ের শেষ মৎস্যাহারের জন্য মাছ কিনতে। ডাক্তার নন্দী কিন্তু একবারও বলেন নি – বাবা সেদিনই মারা যাবেন। তিনিও জানতেন বলেন নি, আমিও জানতাম বলেন নি। তবে আমাদের দুজন এও জানতাম না – তখন নেমেসিস, ওরফে ডেসটিনি, ওরফে ফেট, ওরফে ডিভাইন ডিজাইন, ওরফে কপালের খেলা শুরু হয়ে গেছে। এগুলি আগে জানা যায় না। রাজধানী এক্সপ্রেস যে কলকাতার করপোরেশনের ভোটের মুখে লাইন বদলে আরেক ধাবমান ট্রেনের মধ্যে ঢুকে পড়বে, বা সাঁইথিয়া স্টেশনে যে উত্তর থেকে নেশাগ্রস্ত এক্সপ্রেস ট্রেন উড়ন্ত গতিতে সিগন্যাল দেখে বা না দেখে আরেক ট্রেনের ভেতরে সেঁধিয়ে যাবে শ-তিনের বেশি মৃত্যু তৎক্ষণাৎ ঘটিয়ে আর ড্রাইভাররা সশরীরে মরে গিয়ে যে একদিকে সাক্ষ্যলোপ ঘটিয়ে আরেকদিকে নিজেদের ডেডবডির পেট মহাত্মা গান্ধীর পেটের চাইতেও মাদকশূন্য রেখে নতুন সাক্ষ্য তৈরি করবে, তা কি জানা ছিল? জানা গেছে – এখনো? জানা যাবে – কখনো? তখন তো নেমেসিস ওরফে কপাল, ওরফে শতাব্দে একবার করালগ্রাসে সূর্যের হীরের আংটি কাটা চলছে ও বাবার মৃত্যুর নির্দিষ্ট তারিখ না জেনেও বাবার ছেলে, মায়ের শেষ মাছ-খাওয়ার বাজার সারতে সাইকেলে ওরফে ডিভাইন ডিজাইনের প্যাডল ঠেলছে জল্পেশগুড়ির সেই রাস্তাগুলি দিয়ে যেসব রাস্তা মাত্রই রাস্তার স্যাম্পল ও কোথাওই পৌঁছে দেয় না, পৌঁছুতে হলে শর্টকাট চাই-ই – চক্কত্তিবাড়ির উঠোন দিয়েই হোক আর হোসেন ভিলার পেছন দিয়েই হোক।
সন্ধে লেগে গেলে বাবার টান উঠল। ঘেমে যাচ্ছেন। শ্বাস নিতে পারছেন না। সমস্তটা শরীর দিয়ে শ্বাস টানার চেষ্টা করছেন। কোনো ডাক্তারকে পাওয়া যাচ্ছে না। পানুকাকা কষ্টের খবর পেয়েই তার রিকশায় ছুটে এসেছেন – জল্পেশগুড়ির ডাক্তাররা সকালে প্যান্ট ও বিকেলে ধুতি পরেন। পানুকাকারও সেই পোশাক। এসে বাবাকে দেখেই ডাক্তারদের খোঁজ করতে লাগলেন। কাউকে পেলেন না। শেষে বাধ্য হয়ে নিজের ব্যাগ খুলে একটা ছোট ইনজেকশন বের করে তার মাথা ভাঙলেন। সিরিঞ্জে ওষুধটা ভরে বাবার বাঁপায়ের গোড়ালির ওপরের রগটায় ঢুকিয়ে দিলেন। আমি বাবার মাথার কাছে ছিলাম। স্পষ্ট দেখলাম, পানুকাকার হাত কাঁপছে। ডাক্তারদের এরকম শেষ ইনজেকশন কিছু থাকে।
আমার দুই হাতের মধ্যে বাবার শরীর নিথর হয়ে এলো। শ্বাসের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেল। বারান্দায় একটা চেয়ার ছিল। সেখানে বসে পানুকাকা, সেই লম্বা মানুষটা যার মাপে নদীর জলে সরস্বতী পুজোর মাচান বাঁধা হতো, জল্পেশগুড়ির একমাত্র ডবল প্রমোশন পাওয়া ডাক্তার মধ্যরাত্রির একা কুকুরের মতো কেঁদে যাচ্ছেন, তার কান্নাতেও যেন শ্বাসকষ্ট। ‘নিজের হাতে নিজের দাদাকে মেরে ফেললাম।’ তার হাতে এখনো সিরিঞ্জটা ধরা।
মা বাবার হাতদুটো বুকের ওপর তুলে দিয়ে খাট থেকে নেমে বারান্দায় পানুকাকার কাছে এসে তার হাত থেকে সিরিঞ্জটা নিয়ে বারান্দার শেষে নিরাপদ জায়গায় ফেলে দিলেন। মাকে দেখে পানুকাকা আবার ডুকরে উঠলেন, সেই শ্বাসকষ্ট শোনা গেল। মা তাঁর মাথায় হাত দিয়ে বললেন, ‘তুই তো ডাক্তারের কাজ করলি, কাঁদছিস কেন পানু, ওঁর এটাই ইচ্ছে ছিল, কত বলতেন ইংরেজরা দেশ ছেড়ে চলে গেল তবু পানুর ডাক্তার হওয়া হলো না।’
পানুকাকা মায়ের দুই হাতের মধ্যে আরো জোরে ডুকরে উঠলেন। সে আর থামে না। বাবার তখন অপ্রয়োজনীয় শরীরটার মাথাটা দুইহাতে ধরে থাকতে-থাকতে মৃতের শরীরের শীতলতার স্পর্শ পাচ্ছিলাম।
তাহলে, নেমেসিসই হোক, কপালই হোক, দেবতাদের     কিস্তিমাৎই হোক – কাকে নিয়ে ঘটল এসব? বাবাকে নিয়ে পানুর ডাক্তার না হওয়া দুঃখ তিনি জানিয়েছিলেন বলে? পানুকাকাকে নিয়ে – ঘটনাক্রমে বাবার শেষ ডাক্তার হতে হলো বলে? আমাকে নিয়ে – বাবার মৃত্যুর চাইতে মায়ের শেষ মাছ খাওয়ার কথা বেশি ভেবেছি বলে? নাকি মাকে নিয়ে – খেতে খেতে শীতের দিনের বেলা গেছে, এখনো মাছের ঢেকুর উঠছে বলে?
এ সব জানা যায় না।
বিশেষ করে আমাদের টৌন জল্পেশগুড়িতে।
এখানে সবকিছুই স্যাম্পল। নট ফর সেল।
এখানকার রাস্তাগুলি কোথাও যাওয়ার জন্য নয়। কোথাও যেতে হলে বাড়ির উঠোন দিয়ে শর্টকাট।

আট
আমাদের টৌন জল্পেশগুড়ির বদুদার নাকি তিন-তিনবার হাতেখড়ি হয়েছিল। কিন্তু কেউ কখনো দেখেনি, বদুদা কলম ধরেছে বা পেনসিল ধরেছে বা কাগজ ছুঁয়েছে – এমন কাগজ যাতে কেউ কিছু লিখে রেখেছে। ছাপা কাগজ নিয়ে বদুদার অতটা ছোঁয়াছুঁয়ি না থাকলেও, পারতপক্ষে ছুঁতে চাইত না। অথচ বদুদার যা সম্পত্তি তাতে মধ্যপ্রদেশে থাকলে বদুদা একটা রাজা হয়ে যেত। সেই সব রাজার মতো বদুদারও সভাগায়ক, রাজপণ্ডিত, রাজপুরোহিত, সেরেস্তাদার, উকিল, মোক্তার, গুরুদেব, কালীবাড়ি, শিববাড়ি, রাধাকৃষ্ণের কুঞ্জ, নৌকাবিহারের পুকুর, ঝুলনযাত্রার দোলনাবাড়ি, ছিল। কী কোথায় আছে, তা বদুদাও খুব জানত না। তাকে কেউ জিগ্গেসও করত না। এরা প্রত্যেকেই – এই সভাগায়ক থেকে দোলনাবাড়ির সেবায়েত – এরা প্রত্যেকেই নিজেরাই নিজেদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়ে নিজেদের পোস্ট ঠিক করে রেখেছে। বরং বলা চলে এরাই বদুদাকেও অ্যাপায়েন্টমেন্ট দিয়ে রাজা করে রেখেছে। তাদের মালিক না থাকলে তাদেরও তো থাকা চলে না। বদুদা তার নিঃসন্তান পিসিমার একমাত্র ওয়ারিশ। তার পিসেমশাই সারাজীবন ধরে এই যে রাজত্ব তৈরি করে রেখেছেন, তেমন রাজত্ব সাধারণত ঠাকুরদার বাবার কাছ থেকে পুরুষানুক্রমে কেউ পেয়ে থাকে। সেকালের ঠাকুরদার বাবারা আবার প্রায়ই আটকুড়ে হতো। তাই দত্তকপুত্র নিত। সুতরাং দত্তকসূত্রেও এমন রাজত্ব কারো কারো বরাতে জুটত।
রাজত্ব বদুদার ভাগ্যে ছুটেছে – পৈতৃক সূত্রে না, দত্তক সূত্রে না, পিসিমার সূত্রে। একমাত্র কারণ বদুদা ছাড়া পিসেমশাই বা পিসিমার আর কেউ ছিলই না। সাধারণত এসব কেসে বিশ-একুশ বছরে বাপমরা যুধিষ্ঠিরদের মতো কেউ, চার ভাই আর বিধবা মাকে সঙ্গে নিয়ে এসে বলে – সম্পত্তির ভাগ দাও। বদুদা এই রাজত্ব পাওয়ার পর গোপনে-গোপনে অপেক্ষা করেছে, তেমন কেউ এলে বদুদা কেটে পড়তে পারত। এমন কী জাল-প্রতাপচাঁদ সেজেও যে কেউ এলো না – সেটা এক টৌন জল্পেশগুড়িতেই ঘটতে পারে।
বদুদাকে তো তার রাজত্বের অন্তর্গত মানুষজন নিজেদের দরকারেই ওয়ারিশ রাজা বানিয়ে দিয়েছে। দুর্যোধন যদি যুধিষ্ঠিরের মতো জুয়ারি ধর্মপুত্র হতো আর যুধিষ্ঠির যদি দুর্যোধনের মতো বদরাগী মাস্তান হতো তাহলে সেই উলটো মহাভারতে কুরুক্ষেত্রযুদ্ধ কী করে ঘটত।
বদুদা কখনো কারো সঙ্গে মন খুলে হো-হো হেসে কথা বলত না। কিন্তু তার ঠোঁটদুটো সব সময়ই কথা বলার মতো চলত, জিভটাও একটু-আধটু দেখা যেত। তখন মনে হতো, বদুদা সব সময় নিজের সঙ্গে কথা বলছে। এখন বদুদার সেই ঠোঁটনড়ার ছবি ভাবলে মনে হয় – বদুদা যেন ঘুমের ঘোরেও মোবাইল ফোনে কথা বলছে। ফোনটা পকেটে আছে, কানে দুটো প্লাগ গোঁজা আর টেপের মধ্যে কোথাও এক-চিপ মাউথপিস।
বদুদার এই সম্পত্তিটাকে ‘রাজ্য’ বলাটা বোধহয় ঠিক না। রাজ্য তো থাকে রাজধানীর বাইরে। রাজা রাজ্যে থাকেন না। রাজা যেখানে থাকেন সেটা রাজধানী। বদুদার এই রাজধানীই ছিল তার রাজ্য – টৌন জল্পেশগুড়ির প্রথমদিককার মিউনিসিপ্যালিটির এলাকার সিকিভাগ নিয়ে।
সেই সিকিভাগ-টৌনের ভিতর দিয়ে যত রাস্তা রেলওয়ে স্টেশন থেকে টৌনের আরো বারো আনায় গেছে – সব বদুদার। সেই সব বড় রাস্তাকে আড়াআড়ি কেটেছে যে সরু রাস্তাগুলি – সব বদুদার। সেই আড়াআড়ি রাস্তাগুলিকে শর্টকাট করেছে যে পায়েচলা হাঁটা পথ – সব বদুদার। সেই হাঁটাপথগুলিকে আরো শর্ট করেছে যেসব উঠোনপথ – সব বদুদার। আর, এই এতরকম পথের দুপাশে, তিনপাশে যত বাড়ি – সব বদুদার।
আমাদের টৌন জল্পেশগুড়িতে বাড়ির তুলনায় জমি বেশি। সেই সব জমি – বদুদার।
বাড়িগুলির চেহারা ছিল নানা রকমের। এই রাজত্বের আদিপুরুষ বদুদার পিসেমশাই টৌন জল্পেশগুড়ির মধ্যে ‘নরেনভিলা’ নামে আলাদা টৌনের পত্তন করেছিলেন। সেগুলি খোলা ইটের ব্যারাকবাড়ি, ঢালাই ছাদ, পাশাপাশি বাড়িগুলির মধ্যে কমন দেয়ালের বেড়া। লন্ডনে-শিকাগোতে এই বাড়ি আজো তৈরি হয় – বলে টৌন হাউস। বাড়িগুলির হাইট তো বেশি না। আর তখন বোধহয় সিমেন্ট দিয়ে গাঁথনি হতো না। বালি আর চুনের গাঁথনি। ইটগুলি ছিল আধলা সাইজের। তাতে বাড়িগুলিকে প্রাচীনকালের মনে হতো।
আর এক রকম বাড়ি ছিল। মোটা বাঁশের বাতার দুদিকে চুন-বালির প্লাস্টার। আস্ত-আস্ত শাল খুঁটিয়ে গায়ে। সেই শালখুঁটির মাথা জোড়া লাগিয়ে শালকাঠের বাতার ফ্রেম। তার ওপর টিনের চাল। কেউ বলত – ডাব-ওয়াল আর কেউ বলত – আসাম কটেজ। টৌন জল্পেশগুড়িতে যারা থাকত তাদের অনেকেই জানত যে, তারা আসামে থাকে। টৌন জল্পেশগুড়ির জন্ম যখন কারো মাথাতেও নেই তখন রংপুরের শিয়রেই ছিল তিব্বত। একটা ধারণা তৈরি হয়ে গেলে সেই ধারণা নিঃশেষে মুছে যায় না কখনো, একটু না একটু থেকে যায়। টৌন জল্পেশগুড়ির বাসিন্দাদের কেউ-কেউ জানত তারা তিব্বতে থাকে।
কিন্তু বদুদার তো শুধু আসাম বা তিব্বতই ছিল না – প্যালেসও ছিল।
দুটো ফুটবল মাঠের মতো বারান্দাওয়ালা বাড়ি। কলকাতার পুরনো টাঁকশাল বা টাউন হলের মতো থামওয়ালা বারান্দা। শুধু থাম। কোনো কিছু মাথায় নিয়ে থাকার জন্য থাম নয়। খাড়া থাকার জন্যই খাড়া থাকা।
চওড়ায় দু-তিনটে টাউনহলের মাপের সেই ঘর-বারান্দার ভিতরদুয়ারে পুকুর, মাঠ, ছোট একটা ফরেস্ট গিয়ে মিলেছে চারটি পাটগোলায়। একেবারে ধনুকের মতো বাঁকানো টিনের চাল, টিনের দেয়াল, মেড-ইন ব্রিস্টল লোহার পাত দিয়ে মোড়া। সেই সব পাটগোলা থেকে সত্যিকারের রেললাইন গেছে স্টেশনের মালগুদামের শেডে। সব বদুদার। পাটগোলা থেকে পাটভর্তি ওয়াগন গিয়ে মালগাড়ির সঙ্গে জুড়ে যেত। এই সব, সবই বদুদার।
বদুদার মতো একটা রাজা না বানালে এই রাজধানী চলত কী করে?
চলত একমাত্র নিজের গতিতে। বদুদাও সেই গতির বেগেই গা-ভাসাত। কখনো গতিটাকে টেকাতে বা বদলাতে যেত না। এই যারা বদুদার রাজত্বের স্বনিযুক্ত সভাগায়ক থেকে দোলনাবাড়ির সেবায়েত, এরা কেউ কখনো বদুদার কাছ থেকে মাইনেগোছের কিছু নিত না, বরং, বছরে দু-চারবার বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে বদুদাকে থালায় করে সাজিয়ে সিধে দিয়ে যেত। রাস্তা দিয়ে নাচতে-নাচতে গাইতে-গাইতে আসত, বা, কাঁসার সিংহাসনে ফুলপাতার মধ্যে কোনো মূর্তি বা পাথরকে চাপাচুপো দিয়ে ‘ভো’ ‘ভো’ করতে করতে আসত, বা খেরো খাতার মলাট ঝুলিয়ে কানে পাখির পালক গুঁজে চোখের চশমা নাকে ঝুলিয়ে একা একা আসত, বা কালো শামলা ওড়াতে ওড়াতে আসত। গুছিয়ে-গাছিয়ে সাজিয়ে-সুজিয়ে, একই দিনে আনতে পারলে – ঘণ্টাখানেকের একটা রিয়্যালটি শো হয়ে যেতে পারত। এমন কিছু জটিল ব্যাপার ছিল না এসব। এখনকার ভাষায় বলা যায়, এটা ছিল বদুদার রাজত্বে এদের সাবেকি বন্দোবস্তের পরোয়ানা। নরেনভিলা এস্টেটের সংগীত-বিদ্যালয়, আদি জ্যোতিষ ভবন, নরেনভিলা লাইব্রেরি, কুলপুরোহিত, এস্টেটের বাঁধা উকিল বা মোক্তার, এস্টেটের সহস্রকর্ম সাপ্লায়ার – এই সব কাজ যারা ঠিক করেছে ও নিজেরাই নিজেদের সেই কাজে বহাল করেছে, তাদের একটা কর্তৃপক্ষের দরকার হতো। এই বার্ষিক সিধে ছিল সেই কর্তৃপক্ষ জোটানো।
ঝুলনপূর্ণিমার দিন মেয়েরা সামনে আঁচল ঝুলিয়ে এসে বদুদাকে আবিরে রঙিন করে মালা পরিয়ে নাচতে-নাচতে চলে যেত।
যারাই আসত, তারাই কিন্তু বদুদাকে সিধে দিত। কেউ কেউ তার পাঞ্জাবির পকেটে পুরে দিত, কেউ আবার তার পায়ের সামনে থালায় কাঁচা টাকায় সাজিয়ে দিত। বদুদা কোনো টাকাই ছুঁতো না। কিন্তু বদুদার সিধের টাকা কেউ চুরি-চামারিও করত না। যে-গেরস্ত টাকা ছোঁয় না, সে-গেরস্তের টাকা চোরও চুরি করে না। চুরিতে তো সুখ আছে। সুখ-ছাড়া চুরি করে কোনো আহাম্মক। বদুদা বাড়িতে গিয়ে রঙিন পাঞ্জাবি বদলাত – তার বউ তখন সিধের টাকা গুছিয়ে রাখত। আর থালায় দেওয়া টাকাগুলিও কেউ না কেউ বদুদার বাড়িতে পৌঁছে দিত। বদুদার টাকা মেরে দেওয়া মহাপাপ।

নয়
আমাদের টৌন জল্পেশগুড়ি চিরকেলে দোআঁশলা টৌন। প্রাচীন রাজত্বভাঙা বন্দরও নয়, হালের বানানো বন্দরও নয়। তাম্রলিপ্তও নয়, হলদিয়াও নয়। উত্তর কলকাতাও নয়, সল্ট লেকও নয়। সল্ট লেকও নয়, বেঙ্গল-আম্বুজাও নয়। অথচ রীতিমতো পাকাপোক্ত একটা ডিস্ট্রিক্ট হেডকোয়ার্টার। ডিভিশনাল কমিশনার, ডিস্ট্রিক্ট জজ, ডিআইজিসহ একটা টৌন। ইয়োরোপিয়্যান ক্লাবও ছিল, ইমপিরিয়্যাল ব্যাংকও ছিল। মানে, পুরো দস্তুর টৌন – নথি ছাড়া প্রমাণ নেই, দলিল ছাড়া দখল নেই, কলম ছাড়া অর্ডার নেই, অর্ডার ছাড়া কাজ নেই। আমাদের টৌন জল্পেশগুড়িতে টাকার ঝনঝন ফরফর শোনা যেত। চা-কোম্পনিগুলির টাকা, ফরেস্টের গাছ বিক্রির টাকা, পাটগুদামের টাকা – টাকার টৌন।
আবার বদুদাও ছিল। সে টাকা কখনো ছুঁতো না।
কেউ যদি বদুদার পাওনা দিতে আসত, বদুদা তাকে পোস্ট অফিসে পাঠিয়ে দিত। মাস্টারমশাই বদুদার অ্যাকাউন্টে টাকা জমা করে নিতেন। কেউ যদি বদুদার কাছে পাওনা নিতে আসত – বদুদা তাকেও পোস্ট অফিসে পাঠিয়ে দিত। মাস্টারমশাইয়ের কাছে উইথড্রয়্যাল স্লিপ থাকত বদুদার টিপসই দেওয়া। পাওনাদারের সঙ্গে দরকষাকষি করতেন মাস্টারমশাই, তারপর তার বারো টাকা তেরো আনা শোধ করে দিতেন।
বদুদা কখনো ‘আনা’ ছাড়া ‘পয়সা’ বলেননি। মাস্টারমশাই কখনো-বা বলতেন, ‘বদুবাবু, দু-পাঁচশো টাকা নিজের কাছে রাখুন। কখন কী দরকার হয়। রাত-বিরাতে তো পোস্ট অফিস খোলাও থাকে না।’ শুনেই বদুদা দু-হাতে কান চেপে দু-হাত নাড়িয়ে বলে উঠত, ‘ছি ছি ছি, কী বলছেন মাস্টারমশাই, সরকারের ছাপা টাকা লাটসাহেবের আর রানী ভিক্টোরিয়ার ছবি দিয়ে, সই দিয়ে। আমি সব তুলে নেব? আমাকে তো তা হলে গরাদে পুরবে গো।’
টাকায় যখন মহাত্মা গান্ধী আর অশোক চক্রের ছবি ছাপা শুরু হতো তখনো বদুদা বলত – লাটসাহেব আর রানীর ছবি। এমন আধপাগলা লুকোনো মানুষকে ভালোবেসেই খোঁচানোর লোকও তো থাকে। তারা বলত, ‘বদু, তোমাকে পুলিশে ধরবে। তুমি সম্রাট ষষ্ঠ জর্জকে বলছ লাটসাহেব?’ বদুদা ভয় পেয়েই আঁতকে উঠত,  ‘কেন গো, ওরা কি থানার দারোগা, ওই জর্জরা?’
বদুদার এই জিগ্গাসায় কোনো বাহাদুরি থাকত না, বরং ভয় থাকত যেন ভয়টা চাপা দেওয়াও থাকত। হ্যাঁ, বদুদা সবসময় তরাসে থাকত, সে কোনো ঘেরে পড়ে গেছে, বুঝি সে ধরা পড়ে গেছে, বুঝি কথা জানাজানি হয়ে গেছে, বুঝি তাকে ফাঁসানো হচ্ছে, বুঝি তাকে ডুবিয়ে দিচ্ছে।

দশ
বদুদা এমনকি নাম সই পর্যন্ত করত না, বেশির ভাগ সময়ই তার পকেটে একটাও পয়সা থাকত না, একটু বেশি তাড়াতাড়ি কথা বলত, কথা শেষ করতে পারত না, অথচ মনে হতো নিজেকে বলছে, আড্ডায় বসে যেত ও তাকে দেখেও আড্ডা বসে যেত, অথচ একটু বেশি কথা, তর্কাতর্কি হলে উঠে যেত, মদে একেবারে চুর হয়ে দুর্গাবাড়ির পেছনে দেড়-দুদিন টানা ঘুমাত – দুহাত দূরে নিজের বাড়িতে বউ-ছেলের কাছে যেত না – এসবের কারণ বলে তার জীবনী থেকে টুকরো সব ঘটনা এমন দেখা যায় যা বছর ত্রিশ-বত্রিশ আগেও আধুনিক ও যুক্তিসঙ্গত লাগত, এখন মনে হয় রাবিশ, বাকোয়াস, গাঁড়ল। আরো ত্রিশ-বত্রিশ বছর নিমেষে পেছিয়ে যেতে যখন, যুদ্ধটুদ্ধ শেষ হয় নি, দাঙ্গা-দুর্ভিক্ষ শেষ হয় নি, ভগবান-রূপকথা এসবে বিশ্বাস ছিল, প্লেন ট্রেন অ্যাকসিডেন্টের চাইতে নৌকোডুবি, কলেরা, ম্যালেরিয়ায় লোক মারা যেত আর বেঁচে থাকা অনেকটাই ছিল বেঁচে যাওয়া ও না-যাওয়াটাই ছিল বেঁচে থাকার পক্ষে যথেষ্ট কারণ।
সেই সময়ের লোক না হলে কারো তিন-তিনবার হাতখড়ি হয়? আর তৎসত্ত্বেও বদুদা সই না করে টিপসই দেয়?  টৌন জল্পেশগুড়ি না হলে বদুদার পিসেমশাই সেই হাওড়া জিলা থেকে এসে এমন একলপ্তে রিয়্যাল এস্টেট পেত? এখানে তো তার বংশপরিচয় দরকার ছিল না। বাপ-ঠাকুরদার নামে নাম না দিয়ে, নিজের নামেই বানিয়ে ফেলে ‘নরেনভিলা’।
আমাদের টৌন জল্পেশগুড়িতে হাওড়া-বর্ধমান থেকে ঘটিরা, বিক্রমপুর-ফরিদপুর থেকে বাঙালরা আর পাবনা-রাজশাহী থেকে বারেন্দ্ররা বংশপরিচয়-টরিচয় তুলে দিয়ে এসে বসে গিয়েছিল। সাহেবরা সাহেবদের জানা প্ল্যানে টাউনহাউস, রেস্টহাউস, ডাকবাংলো বানিয়েছিল বলেই-না এরকমই সব বাড়িঘর তৈরি হলো।
নিজের বংশ তুলে দিয়ে নরেন যেমন নরেনভিলা বানিয়েছিল, নরেনভিলাও তেমনি নরেনের বংশ লোপ করে দিল। কোনো ছেলেপিলেই হলো না। নরেনের বউ তখন তার মেজদার ছেলে বদুকে নিয়ে এলো – বদুর বয়স তখন বারো-তেরো। তারা থাকত ছোট চন্দনপুরে। নরেন তার  এতোসব বাড়িঘরে ভাড়াটে বসিয়েছে। কিন্তু ঘটি ছাড়া কাউকে ভাড়া দেয়নি। দোকানঘরও দেয়নি। ভিলার এই পুরো টাউনজুড়ে ঘটিভাষার ঘটিদেশের কথাবার্তা, হাসি-মশকরা, ঝগড়াঝাঁটি, ব্রতপার্বণ একেবারে রমরম করত। জল্পেশগুড়ি আমাদের এরকমই ছিল – একদিকে বংশপরিচয় তুলে দেওয়া, অন্যদিকে নিজের নিজের দেশ বসানো। হুগলির ছোট-চন্দনাপুর থেকে নরেনভিলায় চলে এসেও বদুর মনে হলো না দেশান্তরে এসেছে। সব তো একই আছে।
পিসি তার পৈতে দিলো। ঠাকুরমশাইকে বলল, ‘পৈতের সঙ্গে ওর হাতেখড়িটাও সেরে দিন ঠাকুরমশাই।’ ঠাকুরমশাই তো অবাক, ‘ও তো ইশকুলে পড়ছে।’ ‘সে পড়–ক গে। বামুনের ছেলে। হাতেখড়ি না হলে তো বিদ্যে হয় না। ওকে জিজ্ঞেস করলে বলতে পারে না হাতেখড়ি হয়েছে কিনা। দিয়েই দিন। ওই কানে মন্ত্র দেওয়ার পর হাতে একটু লিখিয়ে দিন – অ আ ক খ।’
আমাদের টৌন জল্পেশগুড়িতে বদুদার ক্লাসফ্রেন্ডে ঠাসা। রেলস্টেশনের পাশে সোডাকলের শীতল সাউ, সব দাঁত পড়ে গেছে, চোখে দেখতে পায় না – বদুদার ক্লাসফ্রেন্ড। টাউনের সবচেয়ে নামকরা জানালাতোড় চোর বিমল সরখেল – বদুদার ক্লাসফ্রেন্ড। পরে জল্পেশগুড়িতে কলেজ  হলো তাও ওই এক পিস, যাদের বাবার নামে তাদের পুরোহিতের ছোটভাই প্রফেসর হয়ে এলো – বদুদার ক্লাসফ্রেন্ড। চা-বাগানের মালিকরা বেশিরভাগই বদুদার ক্লাসফ্রেন্ড। জল্পেশগুড়িতে অনেক বিহারি ঘুঁটেওয়ালি থাকত – এ রকম অন্তত একজন ঘুঁটেওয়ালি আর তার ভাই রঞ্জন বদুদার ক্লাসফ্রেন্ড। বদুদা তো কখনো কো-এডুকেশনে পড়ে নি – তাহলে তার মেয়ে ক্লাসফ্রেন্ড কী করে হবে? পিসি নাকি বদুদাকে ওই যে একপিস মেয়েস্কুল সেখানেও মেয়ে সাজিয়ে ভর্তি করে দিয়েছিল। গল্পটা বানানোই হওয়া উচিত। এখনকার ধারণায় তো নিশ্চয়ই বানানো। তবে সেকালে, এসব ঘটনা ঘটতও হয়তো, কজনই বা পড়ত – তার আবার ছেলে আর মেয়ে। বিশেষ করে, আমাদের টৌন  জল্পেশগুড়ি যেহেতু একেবারে নতুন টাউন, তায় আবার জিলা-টাউন আর সেখানে বর্ধমান-হাওড়া, ঢাকা-বিক্রমপুর, পাবনা-রাজশাহীর লোকজন বংশলোপ করে এসে নিজের নিজের দেশ বসিয়েছিল, সেখানে আরো সব অসম্ভব ঘটত। সেসব ঘটনার কাছে বদুদার ঘুঁটেওয়ালি ক্লাসফ্রেন্ড থাকাটা তো স্বাভাবিক সহজ ব্যাপার।
এরা যে বদুদার ক্লাসফ্রেন্ড তাতে বদুদার কিছুই আসত-যেত না। এমন সাক্ষী একজনও পাওয়া যাবে না ক্লাসফ্রেন্ড বলে বদুদা কারো কাছে গেছে বা এমনকি কারো পরিচয় কোনোদিন দিয়েছে।
আবার এর উলটোটাও একইরকম সত্যি। বদুদার এমন একজনও ক্লাসফ্রেন্ড পাওয়া যাবে না, যে বদুদার সঙ্গে পড়েছে এই পরিচয় দিতে বুক ফোলাত না।
আমাদের জল্পেশগুড়ি টাউনে একটা পিলখানা ছিল – তাতে সব সময়ই হাতি থাকত, সরকারি হাতি, অফিসারদের ট্যুরের জন্য, ফরেস্টের কাটা গাছ ঠেলতে বা তিস্তা পার হতে। সেই হাতিদের জন্য এক ডাক্তার ছিল – সরকারি। তার বিরাট কম্পাউন্ডওয়ালা কোয়ার্টার, মেহেদির বেড়া দিয়ে ঘেরা। টাউনে তাকে হাতির-ডাক্তার বলেই ডাকা হতো। সরকারি অফিসার বলে তারা বদলিও হতো। তবে, সব জিলা টাউনে হয়তো হাতি নেই –
সেটা বদুদার দ্বিতীয় হাতেখড়ি – ওই ১৪-১৫ বছর বয়সে। সেই দ্বিতীয় হাতেখড়ির পর বদুদা কোনোদিন আর কোনো ক্লাসে পাশ করতে পারে নি। আগেই-বা ক ক্লাস পর্যন্ত  পাশ করেছে তাও    ধীরে-ধীরে অজানা হয়ে অজানা থেকে গেছে। বদুদাকে ভর্তি করা হয়েছিল নরেনভিলার গায়ে-গা-লাগানো মাইনর স্কুলটিতে। সেটাকে নরেনভিলা স্কুলও বলত। পিসির খুব ইচ্ছে ছিল, বদু ছাত্রবৃত্তি পাক। এখনকার হিসেবে তখনকার সিক্স ক্লাসে একটি বৃত্তিপরীক্ষা হতো। বদুদা     ১২-১৩ বছর বয়সেও ক্লাস ফাইভে পড়ত। ফাইভ ক্লাস থেকে সিক্স ক্লাস – এই একবারই বদুদা পাশ করেছিল। তারপর তো পৈতে আর দ্বিতীয় হাতেখড়ি।
এরপর কোনদিন বা কতদিন পর, কোন স্কুলের কোন ক্লাস থেকে, বদুদার স্কুলে যাওয়া উঠে গেল, সেটা খুব ঠিকঠাক কেউই জানে না, বদুদাও না। এটা জানাজানির কোনো বিষয়ই নয় – বর্ষার বৃষ্টি কবে শুরু হলো, কবে শেষ হলো, সেটা এখন হয়তো জানাজানির বিষয়, কিন্তু কোনো কালে কি তেমন ছিল? স্কুলের লেখাপড়ার তখন অমন বাঁধাধরা আরম্ভ-শেষ ছিল না।
তবে, বদুদার বেলায় স্কুলটা যে তার সঙ্গে এমন সেঁটে গিয়েছিল, তার কারণ, আমাদের টৌন জল্পেশগুড়ি বদুদার ক্লাসফ্রেন্ডে একেবারে গিজগিজ করত। বিশাল টি প্লান্টার কুঞ্জ গুহ তার বিলেতফেরত ছেলের বিয়েতে নেমন্তন্ন করতে এসে বদুদাকে বলে – ‘বদু, তোর পজিশনই আলাদা, বরের বাপের ক্লাসফ্রেন্ড।’ আবার কুঞ্জ গুহের যে বিলেতফেরত ছেলের বিয়ে সেও নেমন্তন্ন করতে এসে বলে, ‘বদুদা, তোমার পজিশনই আলাদা – বরের ওল্ডেস্ট ক্লাসফ্রেন্ড।’
দশ বছরের একটা পুরো স্কুললাইফেও কারো এমন হাজারে হাজারে ক্লাসফ্রেন্ড হওয়া সম্ভব নয়। কোনো ক্লাসে একবারও ফেল না করলে বড়জোর ৩০-৩৫ জন ক্লাসফ্রেন্ড একজনের হতে পারে। একটা ফেল করলে সেটা ডবল হতে পারে – ৬০-৭০। তিনবার ফেল করলে বড়জোর ১০০ হতে  পারে। কেউ যদি নিু-প্রাইমারি, সিক্স ক্লাস বৃত্তি, দশ ক্লাস হাইয়ে পড়ে থাকে ও একবারও ফেল না করে, তাহলে তার ক্লাসফ্রেন্ড ষাটের বেশি হতে পারে না। নিু-প্রাইমারি ও বৃত্তিক্লাসের প্রতিটি ফেলের জন্য যদি ২৫ জন নতুন ক্লাসফ্রেন্ড হতে পারে বলে ধরা যায়, তাহলেও ছয় ক্লাসে না হয়  আরো শ-দেড়েক।
সে-সব উটকো গড় দিয়ে বদুদার ক্লাসফ্রেন্ডের সংখ্যা ঠিক করা যায়? তার ক্লাসফ্রেন্ডরাই তো আমাদের  জল্পেশগুড়ির আরেকটা নাম তৈরি করেছে ‘বদু-কা টৌন’।
সেই মাইনর স্কুলের হেডমাস্টারমশাই এক সন্ধ্যায় নরেন গাঙ্গুলির কাছে এসে বলেছিলেন – ‘এটা কেমন হচ্ছে? বদু তো কোনো বছরই পাশ করতে পারছে না। আর ওর সঙ্গে ক্লাসের অন্য ছাত্রদের বয়সের তফাৎ তো প্রতি বছরই বেড়ে যাচ্ছে। বদু যেবার সিক্স ক্লাসে উঠল, তখন যারা ওয়ান ক্লাসে পড়ত, তারা এখন বদুর সঙ্গে পড়ছে। বদুর বয়স তো প্রায় ১৮-১৯ আর অন্য ছেলেদের বয়স, ওই ক্লাসে, ১১-১২। ওকে অন্য কোনো স্কুলে দিন।’
তখনকার দিনে বয়স নিয়ে এতো চিন্তাভাবনা ছিল না।     নাইন-টেনে এমন ছাত্র থাকত দু-একজন, যাদের বিয়ে হয়ে গেছে। নরেন গাঙ্গুলির সম্বন্ধীর ছেলে বলেই হেডমাস্টারমশাই বাড়ি বয়ে বলতে এসেছেন। নরেন গাঙ্গুলি নাকি হেডমাস্টারমশাইকে বলেছিল – ‘বয়স তো আর একজায়গায় থাকার জিনিসও নয়, কমার জিনিসও নয়। বাড়ার জিনিস, বাড়ছে। তাতে তো আর বদুর দোষ নেই। তোমরা পাশ করালে পাশ করত। তোমরা যে ক্লাসে রাখছ, ও সেই ক্লাসে থাকছে। তার ও-ই বা কী করবে, আমিই বা কী করব।’
যা হোক, বদুদাকে ওই স্কুল থেকে পাশ সার্টিফিকেট দিয়ে দেওয়া হলো আর বদুদা সুতরাং জল্পেশগুড়ির একমাত্র টেন-ক্লাস স্কুলে ক্লাস সেভেনে ভর্তি হয়ে গেল।
বয়স-বাড়া নিয়ে নরেন গাঙ্গুলির তত্ত্ব অনুযায়ী তার বয়সও বাড়তে লাগল ও শেষ পর্যন্ত তার বয়স-টয়স থেমে গেল। বদুদার সেই ক্লাস সেভেন থেমেই থাকল, নাকি তার পিসেমশাই ওই স্কুলের সঙ্গেও কোনো বন্দোবস্ত করে দু-এক ক্লাস তুলতে পেরেছিল, সেসব কে জানে, কেনই-বা জানে।
বদুদার ক্লাসফ্রেন্ডরা বদুদাকে আমাদের জল্পেশগুড়ি টাউনময় জীবিত অমর করে রেখেছিল।
কদমতলার মোড়ে বিরুমুচি বসত, সবসময় ঘাড় হেঁট করে জুতো সেলাই করেই যাচ্ছে। বদুদা হয়তো রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে। সে ডেকে বসে, ‘এ-ই বদু।’ বদুদা তার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। সে তার কাঠের বাক্সোটার ঢাকনা হাত দিয়ে পরিষ্কার করে বলে, ‘বোস। জুতা খোল্।’ বদুদা বসল ও জুতো খুলে দিলো। বিরু সে জুতোজোড়া খুব যতেœ পালিশ করে দিয়ে বলল, ‘যা।’ বদু উঠে চলে গেল।
শুধু তার ক্লাসফ্রেন্ডরাই নয়, জল্পেশগুড়ি টাউনের সকলেই বদুদাকে ভালোবাসতে চাইত। ভালোবাসা বদুদার কাছে ছিল বাড়িতে তৈরি আবিরের মতন। নিজে থেকেই ঝরে যেত। আবার কেউ মাখিয়ে দিত। বদুদাকে মাখিয়ে দিলে সে আবিরে কারো আঙুলের ছাপ থাকে না – এই কি কারণ যে সবাই-ই বদুদাকে আবির মাখাতে চাইত?
অথবা, এমন ভালোবাসার কোনো কারণ থাকে না?
অথবা, আমাদের জল্পেশগুড়ি টাউনটাই ছিল এরকম যেখানে এমন ভালোবাসা বাসতে হতো? টাউনটা তো ছিলই না – বানানো হয়েছে। আবার, বানানো টাউনশিপ বললে যেমন বোঝায়, একেবারেই তেমন নয়। আবার,  ঘটি-বাঙাল-বারেন্দ্ররা তাদের নিজের নিজের বংশগৌরব লোপ করে এখানে এসেছিল, বংশগৌরব দিয়ে যদি দেশেই চলত, তাহলে আর এখানে আসবে কেন। এখানে এসে নিজেদের দেশ তৈরি করে নিজেদের নতুন করে ও একা করে নিতে চেয়েছিল হয়তো। আমাদের টৌন জল্পেশগুড়িতে কোনোবাড়ির ঠাকুরদার বাবা ছিল না, বড়জোর ঠাকুরদা ছিল।

এগার
তাই সরকারি অফিসাররাও ১০-১৫ বছরের  আগে কেউ বদলি হতো না। তেমনি এক হাতির ডাক্তার বদলি হয়ে জল্পেশগুড়ি এসে, সবচেয়ে বড় হাতিটাতে চড়ে সে-ই পিলখানা থেকে নরেনভিলায় বদুদার বাড়ির দরজায় এসে হাঁকাহাঁকি শুরু করলে – ‘এই বদু, বদু, কাঁহা রে, এই ব-দু, হাম তো বদুকা টৌন পর ট্রান্সফার লে লিয়া। আভি সে বদুমহারাজ কী কেরায়া পর ই রাজমঙ্গল হাতি ঠার রহেগা। বদু মহারাজ আজ সে হাতি চড়কে টৌন মে ট্যুর করে গা।’
সেই হাতির ডাক্তার বদুদার ক্লাসফ্রেন্ড। সোনেপট সিং। ওর বাবা ছিলেন এখানে সেকেন্ড মুন্সেফ। পুরোপুরি বাঙালি। তবু বদুর সঙ্গে ঠাট্টা করতে হিন্দিতে ঘোষণা করে দিলো, এখন থেকে এ হাতিবাঁধা থাকবে বদুদার দরজায় – সাইকেল বা রিকশা চড়ে  মানুষজন যে যাতায়াত করে, বদুদা তেমনি ওই হাতি চড়ে ঘুরবে।
সোনেপট বেশি জেদাজেদি করলে বদুদা হয়তো শেষ পর্যন্ত হাতিতে চড়েই বসত। বদুদা কাউকে কখনো ‘না’ বলতে পারে না। রাস্তা দিয়ে হাতি গেল – এই জল্পেশগুড়িতে যখন-তখন দেখা যেত। বাচ্চারা একসঙ্গে চেঁচায় ‘হাতি তোর পায়ের তলায় কুলের বিচি।’ বদুদার দরজার ওই ঘটনার পর বাচ্চারা ওর সঙ্গে আর একটা লাইন জুড়তে শুরু করেছিল, ‘হাতি তোর পিঠের ওপর বদু ব্যানার্জি।’ আমাদের টৌন জল্পেশগুড়িতে কোনো ঘটনা কারো একার থাকত না। হাতিতে চরে হাতির ডাক্তার নরেনভিলায় তখন ক্লাসফ্রেন্ডের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে, দরজায় হাতির ওপর বসে – এ বদু এ বদু – ডাকছে আর হাতি শুঁড় বাড়িয়ে দেয়ালের ওপর মাথা তোলা পেঁপে গাছের মুণ্ডু পাকিয়ে নিজের মুণ্ডুর মুখে ঢোকাবে – এমন ঘটনা বদুদার একার থাকে না, টাউনের হয়ে যায়।
এ তো একটা হাতির মতো ঘটনা।
আমাদের টৌন জল্পেশগুড়িতে কারো মনে মনে ভাবনাও মনে একবার এলে মনে আটকে রাখা যেত না, ঠি-ক বেরিয়ে যাবে। কথাও ছিল একটা  – ‘মনে মনে ভেব না সকলে জানবে, মুখে মুখে বলে দাও সকলে ভুলবে।’ যেমন রাধানাথের ঘুড্ডি। বেলদারপাড়ায় রাধানাথের দাদা, প্রায় ৭০ বছরই বয়স, ঘুড়িই বানান চিরকাল। রাধানাথের বন্ধুরা ৫০-৬০ বছর আগে বলত, রাধানাথের ঘুড়ি। এখনো যারাই ঘুড়ি কিনতে যায়, তারাই বলে রাধানাথের ঘুড়ি। ইতিমধ্যে রাধানাথ হয়ে গেছেন সঙ্গীতাচার্য পণ্ডিত। গানের রাধানাথ কথায় আসেনি, ঘুড়ি থেকেও রাধানাথের নাম ঘোচেনি।
তাই তো ভালোবাসাবাসি এমন বংশের বাইরে ছড়িয়ে পড়তে পেরেছিল আমাদের টৌন জল্পেশগুড়িতে।
টৌন জল্পেশগুড়ির মতো টাউন হলে আর বদুদার মতো মানুষ সেখানে থাকলে – ভালোবাসাবাসিও থাকবে। এমন কিছু দুর্লভ জিনিস তো নয় কোনোটাই। টাউন তৈরি হওয়া সারা দুনিয়াতেই তো হু-হু বেড়ে যাচ্ছে। কলকাতায় তো মনে হয় সপ্তাহে একটা করে টাউন বসছে। তার ভেতর দু-একটা জল্পেশগুড়ির মতো না থাকার কী আছে? জল্পেশগুড়ির মতো ঠাকুরদার বাবাহীন, বংশহীন, দেশময়?
তবে আজকাল কারণ-টারণের দিকে মানুষজনের টান বেশি। কেন, কী, এসব জেনে নিতে চায় সবাই। ভালোবাসাবাসিতেও। বিশ্বাস তাই বর্ষার ঝোপঝাড়ের মতো রাতারাতি ঝাঁকিয়ে ওঠে না। বংশ নেই, দেশ আছে, এসব কথায় আজকাল অপ্রস্তুত লাগে। তবে সেসবের মধ্যেই তো মনে আসে – না-থাকারই-বা কি আছে ভালোবাসাবাসি, টৌন জল্পেশগুড়ি ও বদুদা?
এমন ‘না’ দিয়ে প্রশ্ন করে যে-আশ্বাস জোটে, সে-আশ্বাসের গুঁড়ি আর কত শক্ত আর মোটা হবে?
না হোক। বদুদা তো এমন ক্ষণজম্মা পুরুষ নন যে, নদীয়া বা দক্ষিণেশ্বরে একবারই মাত্র আবির্ভূত হবেন?
টৌন জল্পেশগুড়ি ও বদুদা নিশ্চয়ই এখনো থাকতে পারে।    অন্তত তর্কের খাতিরে।
অবিশ্যি এর উলটো দিকও আছে। তর্ক তো কল্পনানির্ভর নয়। তর্কে মানা গেলেও কল্পনায় কি মানা যাবে সল্টলেক, সাউথ সিটি, ¯িপ্রংফিল্ড, ক্লাবটাউন, উৎসব, বেদিক ভিলেজ – এই সব টাউনের রাস্তা ধরে বদুদা লুকিয়ে-চুরিয়ে হাঁটছে আর বটগাছের তলা থেকে বিরু মুচি তাকে ডাকছে – ‘এই বদু?’
বটগাছ বটগাছ হতে সময় লাগে তো?
তর্কে যদি খানিকটা মানা যায় আর কল্পনায় যদি খানিকটা না মানা যায় – তাহলে ফাঁকটা যুক্তি দিয়ে ভরাট করতে হবে। যুক্তির জোর, পৌঁছ ও হিসেবের সামনে, সপ্তাহে একটা করে টাউন-বসানোর হিড়িকে, ‘জল্পেশগুড়ির মতো টাউন আর বদুদার মতো মানুষ পাওয়া যায় না’ – এ কথাটা অপ্রাসঙ্গিক, অযৌক্তিক ও অবৈজ্ঞানিক শোনায়। ‘সবকিছুই হাতের মুঠোয়’ – এই কথাটি একটু বেশি প্রাসঙ্গিক, যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক ঠেকে।
ঠেকে তো? তা হলেই হলো।
যুক্তির কিছু কিছু আনুষঙ্গিক (কোলাটার‌্যাল) খামতি হয়তো থাকতে পারে, তবে সেসব আবার গুছিয়েও নেওয়া যায় (রিস্ট্রাকচার) আরেক রকমে।
যেমন, এখন কারো তিনবার হাতেখড়ি হতে পারে না। বদুদার তৃতীয় ও শেষ হাতেখড়ি দিয়েছিলেন তার পিসিমা, বদুদার বিয়ের সময়। নরেন গাঙ্গুলি মারা যাওয়ার এক বছর কাটল কালাশৌচে। কাটতে-না-কাটতেই পিসিমা বদুদার বিয়ের কথা ঘোষণা করে দিলেন। মেয়ে তাঁর পছন্দ করা ছিল – নরেনভিলার উলটোদিকে পশু  হাসপাতালের ডাক্তারের মেয়েটি। সে তখন সবে নীলপাড়-শাদাশাড়ি পরে টৌন জল্পেশগুড়ির সবেধন মেয়েদের স্কুলে যায়, মানে ক্লাশ এইটে পড়ে, তাই শাড়ি। পিসিমা মেয়েটিকে দেখেছিলেন – যেন মেয়েটির বয়স হয়েছে ২০-২১। ‘দেখবি তোরা কী চেহারা হয়! ঘাড়ের ভাঁজ দেকিছিস? ঝুমকো জবার মতো নতিয়ে-নুইয়ে আচে। চিবুকে ভাঁজ। দুই গাল যকন ভরে উঠবে তখন দেকবি ঐ ভাঁজের কী মায়া। ওই টুকুনি তো মেয়ে একন – পানপাতার মতো ভারী চোক।’
বদুদা তখনো ক্লাস সেভেনে নাকি এইটে সেসব আর তখনই বা কার মনে ছিল? বয়স ২২-২৩ তো হবেই।
পশু ডাক্তারবাবুর আপত্তি হবে কেন? বদুদার চেহারা কী? খাটো একটু পাঁচ ফুটের দুই-এক ইঞ্চি বেশি। গায়ের রং যেন কাঁচাহলুদ বাটা। মাথাভর্তি কোঁকড়া চুল – কেষ্টঠাকুরের চুড়োর মতো ওপরদিকে বাড়ে। কেউ কোনোদিন উঁচু গলা শোনেনি। ঠোঁটদুটিও কমলালেবুর কোয়ার মতো। দুদিন অন্তর পিসিমা সেনগুপ্তের ধুতি, ফিনলের আদ্দির পাঞ্জাবি আর নেটের স্যান্ডো গেঞ্জি বের করে দিতেন। দু-দিন অন্তর। সেই সব পরে বদুদা ক্লাস সেভেনের পেছনের বেঞ্চের আগের লাইনের ডান দিকে জানালার পাশে বসত – দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, নিয়মিত। বিদ্রƒপক্ষমতা শানিত করার এমন একটি উপাদান বছরের পর বছর হাতের নাগালে থাকা সত্ত্বেও, সত্যিই অবাক কাণ্ড, মাস্টারমশাইরা কোনোদিন তাকে ঠাট্টা করেননি, তাকে কোনো নাম দেননি, বা তাকে অপ্রস্তুত করেননি। বদুদার অত সুন্দর চেহারা ও পোশাক-আশাকের মধ্যে একটা নিষেধ ছিল – অসহায় নিষেধ। বদুদার উপস্থিতির মধ্যে তখন থেকেই সচেতনতা – তার যে এখানে  থাকার কথা নয়, এটা সে-ই সবচেয়ে ভালো ও বেশি জানে। এতটা নিষ্পাপ ও নিরপরাধকে কোনো আক্রমণ করা যায় না।
মেয়ের পাত্র হিসেবে অপছন্দও করা যায় না। তার ওপর,    পশু-ডাক্তার তো চোখের সামনেই দেখছেন, কী বিশাল সম্পত্তির একমাত্র মালিক তার জামাই।
পিসিমা তো আর বরযাত্রী যেতে পারেন না – ছেলের বিয়ে মাকে দেখতে নেই। তিনি ঠাকুরমশাইকে বারবার বলে দিলেন – কন্যাদানের আগে হাতেখড়িটা দিয়ে দেবেন, যদি বউয়ের কপালের জোরে ক্লাসে ওঠে। ঠাকুরমশাই একটু অবাক হয়েছিলেন – ‘বদু কি বিয়ের  পরও স্কুলে যাবে?’ পিসিমা সে-প্রশ্নের জবাবে ঠাকুরমশাইকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘সে-কথা উঠছে কেন?’
এটা তো আনুষঙ্গিক (কোলাটার‌্যাল) খামতি। এই খামতিটা তো পূরণ সম্ভব নয়। এটা গুছিয়ে নিতে (রিস্ট্রাকচার) হবে।
যেমন, আরেকটি আনুষঙ্গিক খামতি একটু প্যাঁচের। বদুদাকে কালক্রমে টৌন জল্পেশগুড়ির সবচেয়ে বড় মাতাল বলে সকলে মেনে নিয়েছিল। বদুদা যে সেটা চেয়েছিল, তা নয়। বা মদ খাওয়াটা যে তার তেমন কোনো সামাজিক দায় ছিল, তাও নয়। বদুদা ২৪ ঘণ্টাই মাতাল থাকত। ২৪ ঘণ্টাই, এমনকি ঘুমের মধ্যেও, তার অতো সুন্দর চেহারা ও পোশাক-আশাকের মধ্যে একটা অসহায় নিষেধ থাকত। রাস্তা দিয়ে যখন বদুদা হেঁটে যেত তখন তার পিছু পিছু সচেতনতা ছড়িয়ে যেত : তার যে এমন হেঁটে যাওয়া ও ঘরসংসার করার কথা নয়, এটা সে-ই জানে সবচেয়ে ভালো ও বেশি।
এতোটা নিষ্পাপ ও নিরপরাধ মাতাল পাওয়া হয়তো এখনো খুব কঠিন নয়। একটু দেখানে-দীনতা মাতালদের এখনো প্রচলিত মুদ্রা। হয়তো, বদুদার মতো আত্মলোপ পাওয়া যাবে না – সে ঠিক আছে। প্যাঁচটা  হচ্ছে এইখানে যে, বদুদার ওই সবসময় লুকিয়ে-চুরিয়ে থাকা, যেন তার নামে পরোয়ানা জারি আছে, যখন টৌন জল্পেশগুড়ির লোকজন দেখত, তখন তারা সঙ্গে-সঙ্গে আরো কিছু দেখত। দেখত –
নরেনভিলার মতো ভূসম্পত্তির একমাত্র মালিক। নরেন গাঙ্গুলি ঘটি বেছে বেছে যে-ভাড়াটেদের বসিয়েছিলেন, তাদের ভাড়া ছিল পাঁচ-দশ টাকা। তাও তারা দিত না এই যুক্তিতে – টাকা দিলে তো বদুর বোতলে ঢুকবে। তেমন ভাড়াটেদের সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়ার কোনো  সম্ভাবনা থাকলে বদুদা লুকিয়ে পড়ত। আবার বড়-বড় এমন ভাড়াটেও ছিলেন দু-একজন, যারা প্রতিমাসের ১ তারিখে ভাড়ার টাকা দিয়ে বদুদাকে ধরে রসিদে টিপছাপ নিয়ে নিতেন। ওয়্যারহাউসগুলির ভাড়াটে ছিল র‌্যালি কোম্পানি পাটের দালাল। এদিকের পাটের নাম ছিল। কিন্তু তারা তো ব্যবসা তুলে দিলো। বদুদা আর পাটগোলার দিকে ভুলেও যায় না, পাছে তাকে ভাড়াটে জোগাড় করতে হয়। শেষে, স্টেশনের কাছাকাছি বলে রেল কোম্পানি তিনটি গুদাম ভাড়া নিল। রেলের উকিলবাবুই বদুদাকে খুঁজে বের করে সইসাবুদ সারলেন।
এমন একটা রটনা আছে – তারপর থেকে ওই ভাড়ার টাকার একটা অংশ উকিলবাবুর প্রধান আয়। এসব রটনার সত্যি ও মিথ্যে যাচাই করা যায় না। এ ঘটনাও তো সবাই চোখের সামনে বছরের পর বছর দেখে যে সারাবছরের ভাড়ার টাকা রেল-কোম্পানির চেকে ওই উকিলবাবুই বদুদাকে দিয়ে, তৈরি রসিদের রেভিনিউ স্ট্যাম্পের ওপর বদুদার টিপছাপ নিয়ে, যান। বদুদা সেই চেক রসিদ থেকে মাথাটা উলটোদিকে ঘুরিয়ে, ‘পোস্টঅফিসে পোস্টাঅফিসে’ বলে উকিলবাবুকে তাড়ায়। উকিলবাবুই গিয়ে পোস্টঅফিসে জমা দিয়ে আসেন।
বদুদা নিজেকে লুকিয়ে ফেলত অথচ তার কোনো লুকনো-চুরনো ছিল না, নেই, সবাই সব জানে, সবাই বদুদার চাইতে বেশিই জানে – এটাই মারাত্মক প্যাঁচ। মাতালের দীনতা-হীনতাও না হয় এখনো পাওয়া যাবে, কিন্তু এত বড় সম্পত্তিবানের বা এমনকি মাঝারি সাইজেরও কারোও বা এমনকি কেরানি-টেরানিরও, টাকা-পয়সা সম্পত্তি লেনদেন কি ফাঁসানো না-হলে কেউ জানতে পারে না কি এখন? বদুদার মাতলামি থেকেই খাতা এমন থাকে – এ কথা বললে তো হবে না। খোলা বদুদার বাড়িঘর-সংসার তো মলিন নয়, দুঃখীও নয়। তা হলে? এটা এমন একটা আনুষঙ্গিক খামতি (কোলাটার‌্যাল), যা গুছিয়ে তোলা বা একটু অন্যরকম সাজানো (রিস্ট্রাকচার) সম্ভবই নয়। এমন বামাক্ষ্যাপা বা পরমহংস চলে না। আর, বদুদা তো তা ছিলেনও না। এটাকে হয়তো একেবারে শেকড়সুদ্ধ উপড়ে ফেলতে হবে (ডিমোলিশন)। যতটা বাঁচানো যায়, খুব সাবধানে সেটুকু (হেরিটেজ) বাঁচিয়ে। ধরা যাক – মাতলামিটা থাকল, একটু-আধটু কাছাখোলাও থাকল; কিন্তু সম্পত্তির দিকে ফিরেও দেখছে না এটা স ম পূ র্ণ বাদ যাবে। তাতে যুক্তিরত্ত যদি কিছু বাদ যায় যাক গে। এখন কেউ ‘বাড়ি’ বলে না, বলে ‘স্বপ্ন’। সেই স্বপ্ন সাতভূতে খাচ্ছে – এটাকে কী বলা যায়?

বারো
আরো একটা স্যাম্পল নেওয়া যায় এমন আনুষঙ্গিক খামতির। বদুদা ছিল টৌন জল্পেশগুড়ির প্রধানতম ও অদ্বিতীয় শ্মাশানবন্ধু। গভীর রাতে, ঝড়বৃষ্টিতে, ঠা-ঠা দুপুরে, সন্ধ্যায়, কি সকালে, কি ঘুটঘুটে অন্ধকারে, কি কোজাগরি জ্যোৎøায়, মড়া পোড়াতে যাওয়ার ডাক বদুদাকে দু’বার কখনো ডাকতে হয় না। একবার। মাত্র একবার। তাও পুরো ডাকতে হয় না – স্বরের ভারী বুদ্বুদ ফেটে যাওয়ার আগেই বদুদা তার চিরপরিহিত পোশাকে বেরিয়ে আসে – সেনগুপ্ত ধুতি, নেটের গেঞ্জি, ফিনলের আদ্দি। বেশির মধ্যে, কাঁধে একটা গামছা।
টৌন জল্পেশগুড়িতে দুটো উলটো প্রবাদ চালু ছিল।
বদু না পোড়ালে মড়া পুড়তে রাজি হয় না।
আর, কার অসুখ কেমন আছে এর উত্তরে – বদুকে ডাকতে গেছে।
বাঁশ জোগাড় করা, সেটাকে সাড়ে তিন হাত টুকরো করা, গিঁট বাদ দিয়ে নইলে কাঁধে বেঁধে, বাঁশের দোফালি বাতা সেই দুই টুকরোর ওপর এক বিঘৎ তিন আঙুল তফাতে বাঁধা, কাঁধের জন্য চারদিকে প্রমাণ সাইজের একহাত ও সেই হাতেরই এক পাঞ্জা বাঁশ রাখা – এর বেশি হলে মড়া দুলবে, কাঁধ থেকে পিছলে যাবে, হাঁড়ি-পাটকাঠি চাল – মড়া পোড়াতে যাওয়ার এইসব জিনিস বদুদা মরাবাড়িতে গিয়ে দাঁড়ানোমাত্র ভূতে জোগাত। একটু খাটো বলে বদুদা অনেক সময় কাঁধ দিতে পারত না – অন্য শববাহকদের সঙ্গে কাঁধ মিলবে না। যে-মড়ায় দিতে পারত কাঁধ বদুদা, সে-মড়ার যেন পাখা গজাত। বদুদা সাঁই-সাঁই করে চলত, একবারও কাঁধ বদলাত না। বদুদার গলা থেকে ধ্বনি বেরোত মেঘডাকার আওয়াজে – ‘বলো হরি।’ বদুদা চিতা সাজাত নিজের হাতে, মাটি থেকে যতটা খাড়া হবে, তার অন্তত তিন ভাগের দুই ভাগ। টৌন জল্পেশগুড়ির শ্মশান ছিল টাউনের বাইরে, করলা নদীর পাড়ে। শ্মশানে কাঠ আর পাটকাঠি ছাড়া কিছু পাওয়া যেত না। চারদিকে জিকে গাছের ডাল পুঁতে, তার ভেতর তলায় গুঁড়ি আর ওপরে গুঁড়ি দিয়ে – মাঝখানে কাঠ সাজাতে হতো। তলায় গর্ত রাখতে হতো সেখান দিয়ে বাতাস ঢুকে চিতার আগুন বাড়িয়ে তুলবে। জিকে গাছের ডাল ঠিকমতো পোঁতা না হলে, নিচের গর্ত মাপমতো না রাখলে আর কাঠ-সাজানোর মধ্যে মোটা-পাতলা ঠিকমত সাজানো না হলে, চিতা ভেঙ যাবে, বা কাঠ পুড়ে যাবে – মড়া পুড়বে না। মড়া যত মোটাই হোক আর যতই কেন তুমুল হোক ঝড়বৃষ্টি, বদুদার সাজানো চিতায় দাহ শেষ হতে কখনই দু-ঘণ্টার বেশি লাগত না। টৌন জল্পেশগুড়ির শ্মশান, মাষকলাইবাড়ি। ডোম সখিয়া বদুদার পায়ের ধুলো নিয়ে বলত – ‘ঠাকুর হরিশচন্দ্র।’
মরাবাড়িতে পৌঁছনো, বাঁশ আনানো, খাট বানানো, দশকর্মের জিনিস আনতে পাঠানো, মড়া কাঁধে রাস্তায় বেরোনো – কখনো এক-দেড়, কখনো দেড়-দুই ঘণ্টা দূরে মাষকলাইবাড়ি পৌঁছনো, চিতা সাজানো, মড়া পোড়ানো, ফিরে আসা – এই কাজটুকুতে বদুদার লুকনো-চুরনো, বদুদার অসহায় নিষেধ, সব যে কোথায় উবে যেত। বরং তার উলটোটাই যেন বান ডেকে আসত – ‘বলো হরি, হরিবোল’, আমি জানি এখানে আমার না থাকলেই নয় – ‘বলো হরি, হরিবোল’ – আমি জানি এখানে আমার না থাকলেই নয় – ‘বলো বদু, বদুবোল’।
শ্মশানে মাথাগণতি  যত লোক আসে,তার চাইতে একজন কম ফেরে। প্রতিটি মরা ছিল বদুদার কাছে সেই অনুপস্থিতির মচ্ছব।
সেদিন বা রাতে বদুদা ফিরে  বাড়িতে যেত না –  দুর্গবাড়ির পেছনের ঘরে পোয়ালের ভেতর পড়ে থাকত। যখন ঘুম ভাঙত, নেশা একটু ছুটত, তখনো বদুদার অস্তিত্ব থেকে মচ্ছব ঘুচত না। দুর্গাবাড়ির পেছনের ঘরটাতে ঠা-ঠা দুপুরেও আবছায়াতে বা রাতে অন্ধকারে বা উষাকালে বদুদার গলায় মরণমচ্ছব জেগে উঠত। যারা চিনত এক তারাই জানত এ গলা বদুদার, ‘মথুরায় না মেলে নন্দলালা।’
বেশিক্ষণ নয়, দু-এক কলম গাইতে না-গাইতেই, বদুদা আত্মসংবরণ করে নিত, যেন গানটা এক স্রোতের মুখে ভেসে এসে ভেসে গেল।
এটা বোধহয় আনুষঙ্গিক খামতি নয়, এমন নয় যে গুছিয়ে নিলে খামতিটা ঢাকা পড়ে যাবে। এটা যুদ্ধের সময় মিলিটারির খাতার সবচেয়ে ছোট শব্দ – ‘লস্ট’।

উপক্রান্তি
ক্রান্তি সর্বদাই উপ, আনুমানিক। স্মরণক্রান্তিও তাই। সব টুকরোই সম্পূর্ণ। অথচ সব টুকরোই এক আধারে সেঁটে থাকে। থাকে। থাকল। স্মৃতি। সম্পূর্ণ তো সম্পূর্ণ। টুকরো তো টুকরো। জল্পেশগুড়ির লিস-ঘিস-মেচি নদীর স্রোতের ভেতর টুকরো-টুকরো পাথরের রঙিন প্রবাহভিতের মতো। পায়ের পাতা না-ডোবা জল যেন খাড়া দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে। আপদদোলায়িত অসংখ্য টুকরো মুক্তো। মালা গাঁথার তো শেষ নেই। শেষ। নেই।

শেয়ার করুন

Leave a Reply