একটি থিয়েটার ইনস্টলেশন আট

লেখক:

মাসউদ ইমরান মান্নু

প্রস্তাবনা

কা থিয়েটারের নিমজ্জনের প্রদর্শনী দেখতে দেখতে আমি দারুণ দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে যাই। কারণ নিমজ্জন দেখার আগে পর্যন্ত আমার অভিজ্ঞতায় ছিল থিয়েটার সর্বৈবভাবেই ‘নির্দেশকে’র। নাট্য-নির্দেশক হিসেবে নাসির উদ্দীন ইউসুফের মূল্যায়ন করতে গিয়ে সেলিম আল দীন একটি সফল মঞ্চায়নে নির্দেশকের ভূমিকার বিষয়টি     পক্ষান্তরে তুলে ধরেন। তা হলো – ‘সমকালীন বাংলা নাট্য-নির্দেশনায় নান্দনিক ক্ষেত্র বিবেচনায় নাসির উদ্দীন ইউসুফ বিশিষ্ট ও স্বতন্ত্র। নির্দেশক-সৃষ্ট মঞ্চ-শিল্পরীতি, নাট্য-দর্শন ও নিজ শিল্পভূমিতে স্ব-সৃষ্টির উদ্ভাসন তাঁর নান্দনিক ক্ষেত্র রচনা করে। বহুবিচিত্র অনুষঙ্গকে একটি শৈল্পিক চলমান রেখায় সাঙ্গীকৃতপূর্বক একজন প্রকৃত নির্দেশক মঞ্চে সার্বভৌম হয়ে ওঠেন। নির্দেশক যখন স্রষ্টা, নাট্যের অনুষঙ্গসমূহ তিনি নাট্যের বহির্ভাগ থেকে আহরণ না করে নাট্যের অন্তর্গত উপাদান কিংবা সম্ভাব্যতার সর্বোচ্চ লক্ষণসমূহ থেকে তা আবিষ্কার করেন। এর ফলে তাঁর রচিত নাট্য-নির্দেশনায় একটা মহৎ অথচ নিরাভরণ সংগীতের সৃজন হয়। নাসির উদ্দীন ইউসুফ সমকালীন বাংলা নাট্যমঞ্চে এ-সুরটি যোজনা করেছেন তাঁর সৃষ্ট নির্দেশনা শিল্পের ক্রমবহমানতায়।’১

নির্দেশকের ভূমিকা বিষয়ক প্রবন্ধে আতাউর রহমান বলেন, ‘এক কথায় তিনি (নির্দেশক) হলেন দর্শকের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য, চলমান, দৃশ্যমান, অভিনীত নাটকটির প্রধান ব্যক্তিত্ব, যিনি নাটকের পান্ডুলিপিটি সম্পূর্ণ হৃদয়ঙ্গম করে, প্রয়োজনবোধে নিজস্ব ব্যাখ্যায় এবং প্রয়োগ কৌশলে দর্শককে একটি নিটোল ও নির্মেদ ফল উপহার দেন। তাই সফল ও রসোত্তীর্ণ নাটকের প্রথম ও প্রধান কৃতিত্বের দাবিদার নির্দেশকই।’২ এইচ কে চিনুইয়ের মতে, নির্দেশক হলেন এমন একক এক সৃজনশীল শক্তি, যিনি তাঁর সামগ্রিক অভিজ্ঞতার নিরিখে উপস্থিত পরিবেশসমূহকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে থিয়েটারকে চূড়ান্ত সত্যনিষ্ঠ আঙ্গিকে উপস্থাপিত করতে সচেষ্ট হন।৩ জন মেস ব্রাউনের মতে, ‘পরিচালক হলেন একজন সক্রিয় সমালোচক’।৪ টায়রন গাথরির মতে, ‘পরিচালক হলেন একজন আংশিক শিল্পী, যিনি একদল শিল্পীর পৌরোহিত্য করেন এবং সেই শিল্পীরা কেউবা ছেলেমানুষ, কেউবা উচ্ছৃঙ্খল আবার কেউবা মুহূর্তের ব্যবধানে উত্তেজিত, উদ্দীপিত বা নির্বাপিত।’৫ এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে – নির্দেশক হলেন একমাত্র পরিকল্পক, যাঁর অনুমোদন ছাড়া মঞ্চে কোনো কিছুই সংগঠিত হয় না। আবার এটাও ঠিক যে, নির্দেশকের চিন্তাকে অতিক্রম করে যায় অভিনেতা যার উদাহরণ রয়েছে অসংখ্য। এ ক্ষেত্রে রাইসুল ইসলাম আসাদ, হুমায়ুন ফরীদি, জহিরউদ্দিন পিয়ার, শিমূল ইউসুফ প্রমুখের কথা উলে�খ করা যেতে পারে।

এবার মঞ্চ-পরিকল্পনার ক্ষেত্রে এরকমই নির্দেশকের চিন্তার অতিক্রান্ত এক কাজ করেছেন ঢালী আল মামুন। তিনি নিমজ্জন নাটকে শিল্প-নির্দেশনা শিরোনামের অধীনে যা করেছেন তা বাংলা থিয়েটারের এক অনবদ্য ঘটনা। মঞ্চসজ্জা, লাইট, সাউন্ড, গোয়ের্নিকার অংশবিশেষ প্রক্ষেপণ ও মঞ্চের সকল স্তরকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন নানাভাবে এবং ইউসুফ মঞ্চসজ্জাকে মাথায় রেখে সিমেট্রিক্যালি অভিনীত স্থানকে বিন্যস্ত করেছেন। ইউসুফের এতদিনের অর্জন, নিরাভরণ মঞ্চের চরিত্রকে, পালটে দিলেন মামুন। তবে তাতে ইউসুফের নিরাভরণ থিয়েটারের বৈশিষ্ট্যকে কোনোভাবে পরিবর্তন না করে শুধু পরিবেশনগত রূপান্তর ঘটিয়েছেন। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আল দীনের নিজ ভাষ্যমতে, ‘ননজেনেরিক’৬ কেন্দ্রীয় গল্পহীন গল্পমালা। এই কেন্দ্রীয় গল্পহীন গল্পগুলোর কথা-ভাষ্যে আল দীন পৃথিবীর তাবৎ গণহত্যার ইতিবৃত্ত রচনা করেছেন। এই নাট্য অথবা কাজে অন্বিষ্ট হয়েছে মানব সভ্যতা ও ইতিহাসের রক্তস্রোতের ইতিবৃত্ত।৭ একে যথার্থই থিয়েটার-ইনস্টলেশন আর্ট হিসেবে ব্যাখ্যা করা বর্তমান লেখার মুখ্য উদ্দেশ্য। ১৯৯০-উত্তর বাংলাদেশের থিয়েটারকে জামিল আহমেদ চিহ্নিত করেছেন নিরীক্ষণ পর্ব হিসেবে।৮ এ-নিরীক্ষণের একটি উচ্চাঙ্গ পরিণতি হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে ইউসুফ-মামুনের ‘নিমজ্জন : থিয়েটার-ইনস্টলেশন আর্ট’।

আভাঁ-গার্দ আন্দোলনের থিয়েটার-ইনস্টলেশন আর্ট বিষয়টিকে ইতিহাস ও ফর্মের ভিত্তিতে আলোচনা জরুরি মনে করায় লেখার প্রথমেই বিষয়টি পরিষ্কার করে নিচ্ছি।

 

আভাঁ-গার্দ আন্দোলন এবং ইনস্টলেশন আর্ট

উনিশ ও বিশ শতকের শিল্প ও সংস্কৃতি আভাঁ-গার্দ ধারণাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। আভাঁ-গার্দ শিল্পকর্মের উৎসভূমি ফ্রান্স ও ইতালি।      ১৯২০-এর উত্তাল সময়ে এই আভাঁ-গার্দ ‘আন্দোলন’ হিসেবে দ্রুত এই অঞ্চল থেকে রাশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। আমেরিকান সংস্কৃতিরও একটি জরুরি অংশ হয়ে ওঠে আভাঁ-গার্দ শিল্পভাবনা, যদিও আমেরিকায় বিস্তৃতভাবে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয় এই আভাঁ-গার্দ আন্দোলন।৯

আভাঁ-গার্দ আর্টের নানা রূপ রয়েছে। এটা বলা মুশকিল যে,  আভাঁ-গার্দ আর্ট অন্য কোনো আর্টের সঙ্গে তুলনীয়। যদিও ফ্রেঞ্চ স্যুররিয়ালিজম, রাশিয়ার কনস্ট্রাকটিভিজম, জার্মান এক্সপ্রেশনিজম বা ভিয়েনিজ সেসিশন (secession) আন্দোলনের সঙ্গে এর কোনোই মিল নেই। বরং আভাঁ-গার্দ আর্টের প্রভাবে এ-আর্ট আন্দোলনগুলো নিজ নিজ মতাদর্শিক অবস্থানকে সংহত করতে পেরেছে। আভাঁ-গার্দ আর্ট-ফর্মকে আবার রেনেসাঁস-উৎপাদিত দীর্ঘ ঐতিহাসিক স্টাইলের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে পারা যায় না। অবশ্য বহু শিল্পকলা-ইতিহাসবিদ এই ‘স্টাইল’কে আলাদা কোনো ধারা হিসেবে চিহ্নিত করতে আগ্রহী নন। আভাঁ-গার্দ আর্ট-আন্দোলনের অন্যতম প্রভাবিত আর্ট-ফর্ম হলো ‘ইনস্টলেশন আর্ট’। ইনস্টলেশন আর্টকে বলা যেতে পারে, ‘… an artistic genre of site-specific, three dimensional works designed to transform a viewer’s perception of a space.’১০ আভাঁ-গার্দ আন্দোলনের সঙ্গে অপরাপর যেসব আর্ট-ফর্ম সম্পৃক্ত তা হলো – Supermatism, Constructivism Dadaism, Surrealism এবং Futurism।

১৯১২ থেকে ১৯১৩ সালের মধ্যে করা পিকাসোর ‘Still Life with Chair Canning’ এবং ‘Sheet of Music and Guitar’ কাজ দুটো নিয়ে সমালোচকগণ দুশ্চিন্তায় পড়ে যান যে, এ-শিল্পকর্মকে তাঁরা চিত্রকলা, ভাস্কর্য বা ছাপচিত্র অর্থাৎ কোন দলভুক্ত করবেন। নিমজ্জন নিয়ে আমার অবস্থাও হয়েছে ঠিক সেরকম। সেলিম আল দীনও নিজের রচনাকে একইভাবে চিহ্নিত করেছেন ‘ননজেনেরিক’।

১৯১৪ সালে দাদাবাদী শিল্পী ডুশোঁর ‘Bottle rack’ কাজের ভেতর এর একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পরিগ্রহ হয়। একে শিল্প-সমালোচকগণ শিল্পের ইতিহাসে প্রথম ‘ইনস্টলেশন আর্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করতে আগ্রহী।

ইউরোপের শিল্পচর্চায় উনিশ শতকের শেষভাগে ইমপ্রেশনিজমের মাধ্যমে প্রথাগত শিল্পকলার অ্যাকাডেমিক ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে
আভাঁ-গার্দ আন্দোলনের সূচনা হয়। ডুশোঁ তাই অবজেক্টকে প্রথাগত শিল্পের ধারণা থেকে বের হয়ে এসে তাঁর শিল্পকে দেখতে বাধ্য করলেন। যেমন – বোতল রাখার জন্য বটলর‌্যাক বা মূত্রত্যাগের জন্য ইউরিনাল। ডুশোঁর কাজ যে সমসাময়িক ও পরবর্তী শিল্পীদের ভেতরে প্রভাব ফেলেছিল, তা ১৯২০ সালের কর্ট শ্বিটার্সের কাজে প্রতিফলিত হয়। দাদাবাদী শিল্পী কর্ট ১৯২০ সালে জার্মানির হ্যানোভার শহরে একটি ঘরের মধ্যে আবর্জনা জড়ো করতে থাকেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে ১৯৪৩ সালে তাঁর এ-শিল্পকর্মটি ধ্বংস হয়ে যায়। ইংল্যান্ডে চলে এসে তিনি ১৯৪৭ সালে একই কাজের নতুন সংস্করণ তৈরি করেন। ১৯৪৮-এ শিল্পী মারা গেলে তাঁর অসমাপ্ত কাজটি হ্যাটন গ্যালারিতে স্থাপন করা হয়। ইনস্টলেশনের আদিরূপ হলো কর্ট শ্বিটার্সের এই ‘মার্জবাউ’ কাজটি, যা ইনস্টলেশনের ইতিহাসে ‘উপাদানের স্বাধীনতা’ বিষয়টিকে সংযুক্ত করেছে।১১

তবে ইনস্টলেশন আর্ট ওল্ডেনবার্গের ‘The Store’ শীর্ষক কাজের মাধ্যমে ১৯৬১ সালে একটি একক শিল্পমাধ্যম হিসেবে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করে, যা আজো একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পকলা হিসেবে পরিচিত।১২ ‘The Store’-এ ওল্ডেনবার্গ, প্রদর্শনীস্থলের মেঝেতে, দেয়ালে, সিলিংসহ সব স্থান থেকেই বস্ত্তসমূহের আয়োজন করেন। ফলে ঘরজুড়ে একটি আবহ তৈরি হয়, যা দর্শকের প্রথাগত শিল্প দেখার দৃষ্টিকে নাড়া দেয়। এ-কাজের বড় দিকটি হলো পরিবেশ তৈরি করা। মামুনের কাজের ভেতরেও আমি এ-প্রবণতা দেখতে পাই। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে : কাপ্তাই নিয়ে ইনস্টলেশন আর্ট বা নিমজ্জন :
থিয়েটার-ইনস্টলেশন আর্ট।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে পর্যন্ত সব আর্ট হয়েছে গ্যালারিকেন্দ্রিক এবং শিল্প ছিল মূলত স্থায়িত্বের উপযোগী। শিল্পের এই বিপণন-যোগ্যতাকে অস্বীকার করে জন্ম নিয়েছে ইনস্টলেশন আর্ট।১৩ কেননা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে ইউরোপে রাজনৈতিক অস্থিরতার কালে প্রথাগত ‘সুন্দর’ বা ‘নান্দনিক’ শিল্পের প্রয়োজনীয়তাকে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। যেখানে যুদ্ধের বীভৎসতা নশ্বর পৃথিবীর ক্ষণিকতাকে রূপায়িত করেছিল, সেখানে শিল্পীদেরও এই অনুধাবন এসেছিল যে, কীসের প্রয়োজনে শিল্পের সৃষ্টি? এই পরিস্থিতি ছিল ইনস্টলেশন আর্টের প্রেক্ষাপট। কারণ ইনস্টলেশন আর্টের যে-চিত্র বিশ শতকের মধ্যভাগে এসে দাঁড়িয়েছিল তাতে বেশকিছু বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পাচ্ছিল, যার মধ্যে ছিল নয়া নয়া  মাধ্যমের প্রয়োগ। ইনস্টলেশন আর্ট মূলত অস্থায়ী বা ক্ষণস্থায়ী এবং ক্ষেত্রবিশেষে নির্দিষ্ট জায়গার প্রেক্ষাপটে তৈরি। আভাঁ-গার্দ আন্দোলনের নানামাত্রিক প্রভাবে Minimalism Environmental Art, Land Art, conceptual Art ও Performance Art-এর প্রভাবে বর্তমান রূপ লাভ করেছে। আভাঁ-গার্দ আন্দোলনের মতো ইনস্টলেশন আর্টও আধুনিকতাবাদের সমস্যাসমূহকে প্রতিরোধ করতে আগ্রহী হয়ে পড়ে।

১৯৬০-৭০ সালের মধ্যে ইনস্টলেশন আর্টের সঙ্গে ক্রিটিক্যাল তত্ত্বসমূহ, যেমন, Feminism, post-colonial theory  ও post-Structuralism যুক্ত হয়ে আধুনিকতাবাদী শিল্পের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। নববইয়ের দশকে শুরু হওয়া বাংলাদেশের ইনস্টলেশন-চর্চায় মামুন অন্যতম নাম। তিনি তাঁর কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার বিপর্যয়কে ইনস্টলেশন আর্টের মাধ্যমে প্রতিবাদী কৌশলে রিপ্রেজেন্ট করেন।

ইউসুফ-মামুনের নিমজ্জনকে উত্তর-কাঠামোবাদী ‘থিয়েটার-ইনস্টলেশন আর্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে, যেখানে প্রথাগত কেন্দ্রীয় গল্প পরিত্যাজ্য কথাভাষ্যকে থিয়েটারের প্রায় সকল প্রথাকৃত কাঠামোকে ভেঙে রিপ্রেজেন্ট করেছে।

 

থিয়েটার-ইনস্টলেশন আর্ট এবং নিমজ্জন

ইনস্টলেশন এমন এক আর্ট ফর্ম, যার নির্দিষ্ট কোনো কাঠামোগত সংজ্ঞায়ন প্রায় অসম্ভব। এ-ফর্মটি ধারণ করেছে এখন পর্যন্ত নানা ধরনের বিষয়কে। তাই মাধ্যম-অনুযায়ী একে বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত করে চিহ্নিত করেন বিভিন্ন সমালোচক। তা হলো – Video, Internet, Projector, Film, Painting, Sculpture, Architecture, Theatre প্রভৃতি।১৪

১৯৬৪ সালে Per Kirkeby-র En jugendfidus – A Jugend Hoax শিল্পকর্মকে থিয়েটার স্পেস ব্যবহার করে প্রথম থিয়েটার ও ইনস্টলেশন আর্টের সমন্বিত শিল্পকর্ম হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এখানে পেইন্টিং এবং টয় থিয়েটারের সমন্বয়ে Happening১৫ এবং পারফরম্যান্সকে ইনস্টল করা হয়, যা সিনিক আর্টের ঠিক বিপরীতধর্মী।

১৯৬৫ সালে ঘটে যায় থিয়েটার-ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। Jorgen Leth-এর নির্দেশনায় এবং Per kirkeby-র শিল্প-নির্দেশনায় প্রদর্শিত হয় হ্যামলেট। এখানে পারফরম্যান্সকে লেথ নানাভাবে পরিবর্তন করে দেন। যেমন প্রধান চরিত্রের বিখ্যাতসব ডায়ালগ অভিনেতাকে ড্রামের সিগন্যালের মাধ্যমে থামিয়ে নির্দেশক নিজেই আবৃত্তি করে দেন। আর মঞ্চসজ্জার ক্ষেত্রে কিরকেবি ফ্লোর, দেয়াল, সিলিং ও দর্শকদের বসার জায়গাসহ সমগ্র থিয়েটারকে ‘নীল’ রং করে দেন। পোশাকের ক্ষেত্রে কিরকেবি পুরুষ অভিনেতাদের বিভিন্ন ফ্যান্সি পোশাক পরান। আর নারী অভিনেত্রীদের লাল, নীল, কালো প্রভৃতি রঙের রিবন দিয়ে সজ্জিত করে দেন। চরিত্র ও দেহের ব্যাখ্যা-অনুযায়ী চিহ্নায়ক বিভিন্ন রং ব্যবহার করেন।

নিমজ্জনের ক্ষেত্রেও কাছাকাছি চিত্র দেখতে পাই।

সমগ্র মঞ্চকে বটগাছ এবং বটগাছের পুরুষ্ট ঝুরি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে, যেন প্রতিটি বড় আকৃতির ঝুরিই এক-একটি পূর্ণাঙ্গ গাছ। এর মাধ্যমে বটগাছের কেন্দ্রিকতাকে ভেঙে দিয়েছেন মামুন। মঞ্চে তৈরি হয়েছে অসংখ্য কেন্দ্র। ঝুরিগুলোর সঙ্গে সঙ্গে ঝুলে আছে মানুষের মস্তক। সমগ্র মঞ্চ সাদা রং ধারণ করেছে।

পেছনের ক্যানভাস বিশাল সাদা। ফেলারও সম্পূর্ণ সাদা। মঞ্চে আসা সব অভিনেতার সজ্জাতেও সাদার আধিক্য। মামুনের এই গাছের ব্যবহার জাপানি কিম মানরির আভাঁ-গার্দ থিয়েটার ফর্মের প্রযোজনার সঙ্গে তুলনীয়। কিম মানরি মালয়েশিয়ার শারীরিক-প্রতিবন্ধী শিল্পীদের দিয়ে তাঁর থিয়েটার উপস্থাপন করেছিলেন।

 

বিশ্বভ্রমণ-শেষে এক আগন্তুক মৃত্যুশয্যায় শায়িত বন্ধুর কাছে আসবে বলে ত্রি-নদীর মোহনায় গড়ে-ওঠা এক শহরে এসে হাজির হয়। মামুন তাঁর শিল্প-নির্দেশনা দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট সংস্কৃতির বা জাতির স্থানকে সিম্বলাইজ না করে স্থানবিহীন এক ‘স্থান’ রচনা করেছেন, যা পৃথিবীর সব নিপীড়িত মানুষের রক্তাক্ত প্রান্তরকে তুলে ধরে হাজারো কেন্দ্রিকতাকে নির্মাণ করে। প্রপস, আলোক-প্রক্ষেপণ, পোশাক ও মঞ্চের তলসমূহ এই কেন্দ্রবিহীন কেন্দ্রিকতাকে সম্পূর্ণ রূপে সহযোগিতা করে এক দারুণ সমন্বয় তৈরি করেছে।

বন্ধুটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক। রাজনৈতিক মতবাদের জন্য সেই শহরের ব����ক ডেথ স্কোয়াড অব কারাভাঁর লোকজন নির্যাতনের পর তার মেরুদন্ডে পেরেক ঠুকে দিয়েছে। আগন্তুক ট্রেন থেকে স্টেশনে নেমে দেখতে পায় এক কুলির ঝুলন্ত লাশ, অদ্ভুতদর্শন এক বৃদ্ধ, স্টিমারের হলোকাস্ট, নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে আসা এক রূপসী নারী – যতবার তাকে কবরে শোয়ানো হয়, ততবার সে মৃত্যু থেকে উঠে বসে। ইউসুফ তার স্পেসকে বিন্যস্ত করেন শূন্য স্পেসকে বিন্যাসের মাধ্যমে অভিনেতাদের প্রপসের মতো করে ব্যবহার করে। সঙ্গে পোশাক এমনভাবে নির্দিষ্ট করা হয়, যেন তা কোনো স্পেসবিহীন পরিচিত স্পেসের মানুষের গল্প যা সর্বক্ষণ ব্যথিত করে। এ ক্ষেত্রে সেলিম আল দীনের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য, ‘পিটার ব্রুকের কোনো কোনো ধারণা স্বীকার না করলেও বলা যায় গ্রোটভস্কির নাট্যচিন্তা, আর্তুদের শিল্প-কৌশলকে আত্মস্থ করে তিনি (ইউসুফ) এমন এক নির্দেশনা নন্দন রচনা করেছেন, যা একালের থিয়েটারের সংকটকে লাঘব করেছে অনেকাংশে। বিশ্বনাটকে নির্দেশনার একটা নতুন ভূমিরও সন্ধান আছে তাতে।’১৬

তবে ইউসুফ নিজেকে বা তাঁর দর্শককে ভুলতে পারেননি বলে অধ্যাপককে দিয়ে রাবীন্দ্রিক আচরণ উত্তরীয়কে চাদরের মতো ব্যবহার করান। অথবা ধর্ষিত নারীর শাড়ির সাজেশন এবং উপস্থাপন করেন। একে সংযুক্তির অসংযুক্তিও বলা যেতে পারে। এটা রাজনৈতিকভাবে গ্রহণীয়, কারণ, থিয়েটারের এই পরীক্ষণ
যে-ভূমিতে হয়েছে, সে-ভূমির সিগনেচার থাকা জরুরি হয়ে পড়ে।

আগন্তুক বরফের চাঙরের ভেতর একান্নটি শিশুর লাশ, আট কি নয় বছরের গায়িকা এক শিশুকে ধর্ষণের পর তার জিভ কেটে নেওয়া, কান্দাহারের মমি, মাদ্রিদের গণহত্যা, চিলির কবি নেরুদার ফিন্দেমুন্দোর শোকগীতি, স্টেডিয়াম গ্যালারিতে প্রায় দেড়-দুই হাজার দর্শক ক্ষুরে কেটে খুন, ত্রিশ হাজার টন উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টিএনটির বিস্ফোরণে ষোলো কিলোমিটার পর্যন্ত বায়ুস্তরে আগুন ধরে যাওয়া শহরটির ক্রমনিমজ্জন দেখা যায়। সমগ্র চিত্রটিকে ইউসুফ তার এতদিনকার অর্জন পাঁচালি ও বর্ণনাত্মক রীতিকে অক্ষুণ্ণ রেখে উপস্থাপন করেন। তবে তিনি মামুনের শিল্প-নির্দেশনাকে অতিক্রম করেননি। মঞ্চের নিম্নতলের দুপাশে ঝুলন্ত দুটো বটের পুরুষ্ট ঝুরির ডানে ও বাঁয়ে স্পেস থাকার পরও ইউসুফ ব�কিংয়ে সে-স্পেসকে অস্বীকার করেছেন।

তাই অভিনেতাদের একটি কেন্দ্রীয় অবস্থান তৈরি হয়। নাটক রচনা এবং শিল্প-নির্দেশনায় যা সম্পূর্ণই অস্বীকার করা হয়েছে। এখানে বলা যায়, ইউসুফ হয়তো উত্তর-কাঠামোবাদী আভাঁ-গার্দ আনেদালন বিষয়ে ব�কিংয়ের ক্ষেত্রে একেবারেই সচেতন ছিলেন না। এ-কারণে লেখার প্রথমেই ইউসুফের নির্দেশনার একক কর্তৃত্বের ওপর আঙুল তুলে মামুনকে নিমজ্জনের সমান ভাগীদার করেছি।

পরিশেষে সূর্য-প্রার্থনার মধ্য দিয়ে রচিত হয় এ-নাট্যের অন্তিম দৃশ্য। সেলিম আল দীনও সম্ভবত ইউসুফের মতো কেন্দ্রিকতাকে ভাঙার ব্যাপারে সর্বক্ষেত্রে সচেতন ছিলেন না। মানবেতিহাসের ক্ষেত্রে তিনি সূর্যকে একটি কেন্দ্রীয় জায়গায় দেবতা হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। এটা বিবর্তনবাদী১৭ গ্র্যান্ড থিউরিতে সাইকিক ইউনিটি অফ ম্যানকাইন্ডের তত্ত্বীয় ভিত্তির ওপরে দাঁড়িয়ে করা হয়। বোয়াস তাঁর হিস্টরিকাল পার্টিকুলারিজমের১৮ থিওরাইজেসনের মাধ্যমে
এ-ধরনের গ্র্যান্ড থিওরিকে অস্বীকার করেছেন। সেলিম আল দীন সম্ভবত ক্রিটিক্যাল থিওরির এ-বিষয় নিয়ে সচেতন ছিলেন না। সম্ভবত তিনি রচনার নন্দনতাত্ত্বিক অবস্থানের পরীক্ষণে নিমগ্ন ছিলেন। ইউসুফের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অসচেতনতা লক্ষণীয়। সম্ভবত ইউসুফ এই নাটক-নির্দেশনার সময়ে থিয়েটারের নান্দনিকতাকে অর্থাৎ তাঁর অতিপ্রিয় ‘মঞ্চ ইমেজ’ ও ‘মঞ্চ কবিতা’ তৈরিতে বেশি সচেতন ছিলেন।  ইউসুফ ও আলোক-পরিকল্পক
এ-বিষয়কে স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছেন, যা মামুনের প্রজেক্টেড গোয়ের্নিকা বা সাউন্ডের ভেতরে ছিল না। মামুন কাঠামোকে ভেঙে ফেলার আভাঁ-গার্দ আন্দোলনের বিষয়ে সচেতন থাকায় মঞ্চ-পরিকল্পনায় এ-ধরনের ত্রুটি খুঁজে পাই না।

সেলিম আল দীন নিজেই তাঁর রচনার একটি চিহ্নায়ন তৈরি করেছেন, ‘ননজেনেরিক শিল্প রচনা১৯ নিমজ্জন নিয়ে পূর্বোক্ত বক্তব্য তাঁর গ্রহণ করা গেলেও ইউসুফ-মামুনের নিমজ্জন বাংলা থিয়েটারের ক্ষেত্রে আভাঁ-গার্দ আন্দোলনের প্রথম নিরীক্ষা হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। তাই একে আমি ‘থিয়েটার-ইনস্টলেশন আর্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করতে আগ্রহী। পশ্চিমা থিয়েটারে এ-নিরীক্ষণের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। এমনকি জাপানি থিয়েটারেও ঘটে গেছে এ-নিরীক্ষণের এক দীর্ঘ পরীক্ষণ। ঢাকা থিয়েটার বাংলা থিয়েটারকে দিলো ‘থিয়েটার-ইনস্টলেশন আর্টে’র নিমজ্জন।

ইউসুফের নির্দেশনারীতির নান্দনিক পরিচয় খুঁজতে গিয়ে সেলিম  আল দীন তাঁর নাট্য-সৃষ্টিকে চারটি পর্বে বিভাজিত করে আলোচনা করেছেন।২০ ইউসুফকে নিয়ে ২০০০ সালে লেখা প্রবন্ধ উত্তরকালে যদি সেলিম আল দীন আজকের নিমজ্জন নিয়ে লিখতেন তাহলে নিশ্চিতভাবে ইউসুফের নির্দেশনার পঞ্চম উত্তরণ হিসেবে চিহ্নিত করতেন নিমজ্জনকে। যাকে আমি বর্তমান লেখায় ইউসুফের ‘থিয়েটার-ইনস্টলেশন আর্টে’র পরীক্ষণ হিসেবে পরিচিত করতে আগ্রহী।

যদিও ইউসুফ তাঁর নির্দেশকের নিবেদনে উলে�খ করেছেন, ‘… বিগত ২০০৪ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়ে দেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি তথা ধর্মীয় জঙ্গিবাদের উত্থান – উদীচী, ছায়ানট, ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের জনসভায় ভয়াবহ বোমা ও গ্রেনেড হামলা এবং টুইন টাওয়ার আক্রমণ, উগান্ডা, রুয়ান্ডা, কসোভো, প্যালেস্টাইন, ইরাক ও আফগানিস্তানে সৃষ্ট রক্তাক্ত অধ্যায়, যা অনেকের মতো আমাকেও সমান বিচলিত করেছে। বিশেষ করে ছায়ানট এবং আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলায় রাস্তায় পড়ে থাকা নিহত নিরীহ মানুষের ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন দেহ ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আমার চোখের ক্যানভাসে এক নতুন গোয়ের্নিকা এঁকে দেয়। এই রক্তাক্ত অভিজ্ঞতায় নিজের ভেতর থেকেই নিমজ্জনের অর্থ সাবটেক্সট এবং দৃশ্যরূপের সন্ধান পাওয়া গেল শেষাবধি।’২১ নির্দেশকের এই উপলব্ধি তাঁর নিজ প্রযোজনায় নাটকের রচয়িতার মতোই নিমজ্জিত হয়ে গেছে। নির্দেশক ইচ্ছা করলেই এসব বিষয় তাঁর প্রযোজনা স্ক্রিপ্টে যুক্ত করতে পারতেন। অথচ ইউসুফ দৃশ্যরূপের সন্ধান পেয়েই সন্তুষ্ট থেকেছেন। পাশাপাশি তিনি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ওপরে প্রবল বাঙালির জেনোসাইডের বিষয়টি থিয়েটার প্রযোজনায় নিজ বক্তব্যেও উপস্থাপন করেননি।২২ যদিও তাঁর সাম্প্রতিক দ্য টেম্পেস্ট প্রযোজনাও এরকম এক জাতিসত্তার শিল্প-কৌশল ব্যবহার করে করা, যা আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত হয়েছে। এরকম ছকবাঁধা পলায়নপরতা আভাঁ-গার্দ আন্দোলনের প্রথাগত চরিত্রকে ভেঙে ফেলার শিল্প-বিপ�বীর চরিত্রের সঙ্গে একেবারেই বেমানান। এ-কারণেই ইউসুফ হয়তো নির্দেশনার ক্ষেত্রে শুধু ‘পোয়েট্রি অন স্টেজ’ বা ‘ন্যারেটিভ ভিজুয়াল নির্মাতা’ হিসেবে নিজেকে আবিষ্কার করতে আগ্রহী, যা রাজনৈতিকভাবে তাঁকে সেফ বা নিরাপদ রাখে। ইউসুফের  এ-ধরনের শিল্প-কৌশলকে দেখে প্রশ্নের উদ্রেক হয় – তবে কি তিনি সেলিম আল দীনের ধাক্কায় কিছুটা উত্তর-উপনিবেশবাদী হওয়ার চেষ্টা করেছেন মাত্র?

এসব বিচারে মামুনের কাজে খুঁজে পাওয়া যায় রাষ্ট্রকে। তিনি নিজেই বাঙালি সাম্রাজ্যবাদী আচরণের প্রতিরোধী হিসেবে ‘কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রে’র রাজনীতিকে নিয়ে সরাসরি ইনস্টলেশন করেছেন। একই সঙ্গে নিমজ্জনে প্রপস ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিজ ল্যান্ডস্কেপের ধারণা ব্যবহার করেছেন। নিমজ্জনে তাঁকে           শিল্প-নির্দেশক হিসেবে উলে�খ করা হয়েছে, যা যথার্থই বলে আমি মনে করি। তিনি ইউসুফের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে বাংলাদেশের এবং বাংলা থিয়েটারের ক্ষেত্রে একটি সফল থিয়েটার-ইনস্টলেশন আর্টের জন্ম দিয়েছেন।

সেলিম আল দীন নিমজ্জনকে ‘ননজেনেরিক’ হিসেবে উলে�খ করেছেন, যাকে কেন্দ্রীয় গল্পহীন অসংখ্য গল্পের অসংখ্য কেন্দ্র নির্মাণে সচেষ্ট হয়েছেন। এখানে চিন্তার বিবর্তনী পদ্ধতিকে বাদ দিয়ে একটি মেটা ন্যারেশন তৈরির চেষ্টা চালানো হয়েছে। কিন্তু লেখকের এ-প্রচেষ্টাকে ইউসুফ নিজের মতো করে বিবর্তনবাদী
চিন্তার অধীনে একটি কেন্দ্র নির্মাণ করে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। এর বড় উদাহরণ হলো, একটি বিবেকবান চরিত্র দিয়ে এখানে তিনি স্পেসকে অস্বীকার করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

ইউসুফের কাজকে যদি অভিনয়শিল্পীরা আরো তত্ত্বীয় ও রাজনৈতিকভাবে সচেতনতার জায়গা থেকে গ্রহণ করতেন, তাহলে বুঝতে পারতেন, তাঁরা বাংলা থিয়েটারের একটি ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন, তা হলো থিয়েটার-ইনস্টলেশন আর্ট। তা হলে, ইউসুফ-মামুনের পরিশ্রমকে আরো গুরুত্বের সঙ্গে নিতেন। বিশেষ করে, ইউসুফ শরীরী ছন্দ ব্যবহারের মাধ্যমে থিয়েটারে লিরিক্যাল বডি ল্যাংগুয়েজ পোয়েট্রি রচনার যে-ডিজাইন করেছেন তা চর্চার কমতি এবং পারফরমারদের শারীরিক অযোগ্যতার কারণে পরিপূর্ণ রূপ পরিগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়েছে। যেমন : কাট হুইলের মতো একটি সহজ কাজকেও সঠিকভাবে প্রদর্শন করতে বেশিরভাগ শিল্পীই ব্যর্থ হয়েছেন। ইউসুফ যদি আরো সচেতনভাবে এ-নাটকের আভাঁ-গার্দ আন্দোলনের পরীক্ষণের অধীনে থিয়েটার-ইনস্টলেশন আর্টের বিষয়ে অবগত করতেন, তাহলে হয়তো অভিনয়শিল্পীদের কাছ থেকে আরো সহযোগিতা পেতেন।

Grotowrsky সিনথেটিক থিয়েটারের ব্যাখ্যানুযায়ী এবং উনিশ শতকের বাহুল্যপূর্ণ রিয়ালিস্টিক ধারণার শিল্প-ভাবনার বিচারে কোনোভাবেই নিমজ্জনকে মেদবহুল রিয়ালিস্টিক থিয়েটারের অধীন করা সম্ভব নয়। আর ‘নিরাভরণ’ শব্দের আভিধানিক অর্থের ওপর দাঁড়িয়ে যদি ইউসুফ-মামুনের নিমজ্জনকে ব্যাখ্যার চেষ্টা করা হয়, তবে অবশ্য ইউসুফের এতদিনের অর্জন যে নিরাভরণ থিয়েটারের চর্চা তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যেতে পারে। নিমজ্জনের
শিল্প-ভাবনায় শুধু হুইল চেয়ার ছাড়া আর কোনো প্রপস বা পোশাককে রিয়ালিস্টিক চিন্তার ওপর দাঁড়িয়ে করা হয়েছে বলে আমার মনে হয়নি। এছাড়া শিল্প-ভাবনাকে দৃশ্যগত করার জন্য যত ধরনের বস্ত্তগত উপাত্ত ব্যবহার করা হয়েছে তা বাজারি-মূল্যের বিচারে খুবই সুলভ। তবে শিল্প-নির্দেশক হিসেবে মামুন যদি বেশ মোটা অঙ্কের লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকেন তাহলে বিষয়টি মেদবহুল থিয়েটারের ধারণাকে প্রতিস্থাপন করবে। ঢাকা থিয়েটারের নিমজ্জনবিষয়ক প্রচারপত্রে এরকম কোনো তথ্য নজরে আসেনি। দ্বিতীয়ত, ঢাকা থিয়েটার কোনো রেপার্টরি থিয়েটার গ্রুপও নয়। অথবা কোনো থিয়েটার কোম্পানিও নয়। এখন পর্যন্ত এই থিয়েটারটি ক্ষয়িষ্ণু গ্রুপ থিয়েটারের ধারণাকে ধারণ করেই প্রযোজনা মঞ্চায়িত করে আসছে।

ইউসুফ ও সেলিম আল দীন যদি উত্তর-কাঠামোবাদী এবং আভাঁ-গার্দ আন্দোলনের মাধ্যমে উৎসারিত কেন্দ্রীয় ক্ষমতাবিহীন বহুত্ববাদী শিল্পচর্চার প্রতি আরো কিছুটা অনুরক্ত হতেন তবে উলি�খিত সমস্যাগুলো এড়ানো যেত। তাঁরা এসব বিষয়ে সচেতন নন, তা উলি�খিত আলোচনা এবং তাঁদের নিজেদের বয়ানসাপেক্ষে বেশ হলফ করে এখানে উলে�খ করলাম। মামুন শিল্প-নির্দেশক হিসেবে এসব দোষ দ্বারা দুষ্ট নন। আর মামুন তাঁর শিল্প-নির্দেশনার অধীন করে নিয়েছেন ইউসুফের বর্ণনাত্মক থিয়েটারের পরিবেশনাকে। ঢাকা থিয়েটারের নিমজ্জনকে তাই ইউসুফ-মামুনের একটি আভাঁ-গার্দ আন্দোলনের পরীক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করে ‘থিয়েটার-ইনস্টলেশন আর্ট’ হিসেবে অভিহিত করাই বর্তমান প্রবন্ধের ইরাদা।

 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার

ঢাকা থিয়েটারের বন্ধু ওয়াসিম আহমেদের বারবার তাগাদা এবং নিমজ্জনের ফটোগ্রাফ ও প্রচারপত্র দিয়ে সহযোগিতা করায় বর্তমান লেখাটি আলোর মুখ দেখতে পেল। এ ছাড়া ইনস্টলেশন আর্ট নিয়ে বন্ধু সঞ্জয় চক্রবর্তী, শিক্ষক, চারুকলা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, তাঁর অপ্রকাশিত অভিসন্দর্ভের অংশবিশেষ পড়ার ও তথ্যসমূহ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ায় তাঁর প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। এছাড়া নাসির উদ্দীন ইউসুফকে নিয়ে লেখা সেলিম আল দীনের গুরুত্বপূর্ণ লেখাটির সন্ধান ও বিভাগীয় সেমিনার লাইব্রেরি থেকে ফটোকপির সুযোগ করে দেওয়ায় নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের সভাপতি খায়রুজ্জাহান মিতুর প্রতি জানাই সালাম।

 

তথ্যসূত্র

১              সেলিম আল দীন (২০০০), বাঙলা নাট্য নির্দেশনা শিল্পরীতি : নাসির উদ্দীন ইউসুফ, থিয়েটার স্টাডিজ, নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা, পৃ ৭।

২              আতাউর রহমান (১৩৪৮ বাং) নাট্য প্রযোজনা ও নির্দেশকের ভূমিকা, শিল্পকলা, ঢাকা : বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী,
পৃ ৬৮।

৩              The Impact of the Director on American Plays, Playwrights and Theatres, 1963.

৪              আতাউর রহমান (১৩৪৮ বাং) নাট্য প্রযোজনা ও নির্দেশকের ভূমিকা, শিল্পকলা, ঢাকা : বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী,
পৃ ৭০।

৫              পূর্বোক্ত।

৬              নিমজ্জন প্রযোজনার প্রচারপত্র, ২০০৭, ঢাকা থিয়েটার।

৭              পূর্বোক্ত।

৮              জামিল আহমেদ (১৯৯৫) বাংলাদেশের নাটক : পঁচিশ বছর, শিল্পকলা, ঢাকা : বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, পৃ ৪১।

৯              http://irmeli.hautamaki.kaapeli.fi

১০            Education and Community Programmes, Irish Museum of Modern Art, IMMA

১১             সঞ্জয় চক্রবর্তী (২০০৯) বাংলাদেশের ইনস্টলেশন আর্ট, এমএফএ, অপ্রকাশিত অভিসন্দর্ভ, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা, ভারত।

১২            পূর্বোক্ত।

১৩            পূর্বোক্ত।

১৪             Education and Community Programmes, Irish Museum of Modern Art, IMMA.

১৫            A happening is a performance, event or situation meant to be considered art, usually as performance art. Happenings take place anywhere, and are often multi-disciplinary, with a nonlinear narrative and the active participation of the audience. Key elements of happenings are planned, but artists sometimes retain room for improvisation. This new media art aspect to happenings eliminates the boundary between the artwork and its viewer. Henceforth, the interactions between the audience and the artwork makes the audience, in a sense, part of the art.

In the later sixties, perhaps due to the depiction in films of hippie culture, the term was used much less specifically to mean any gathering of interest, from a pool hall meetup or a jamming of a few young people to a beer blast or fancy formal party.

১৬            সেলিম আল দীন (২০০০) বাঙলা নাট্য নির্দেশনা শিল্পরীতি : নাসির উদ্দীন ইউসুফ, থিয়েটার স্টাডিজ, নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা, পৃ ৯।

১৭            মাসউদ ইমরান-সম্পাদিত (২০০৯) ক্রিটিকাল তত্ত্বচিন্তা, ঢাকা : মাওলা ব্রাদার্স।

১৮            পূর্বোক্ত।

১৯            নিমজ্জন প্রযোজনার প্রচারপত্র, ২০০৭, ঢাকা থিয়েটার।

২০            সেলিম আল দীন (২০০০) বাঙলা নাট্য নির্দেশনা শিল্পরীতি : নাসির উদ্দীন ইউসুফ, থিয়েটার স্টাডিজ, নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা, পৃ ৮।

২১            নিমজ্জন প্রযোজনা প্রচারপত্র, ২০০৭, ঢাকা থিয়েটার।

২২            পূর্বোক্ত।

শেয়ার করুন

Leave a Reply