ঝড় সুনন্দা সিকদার

লেখক:

সাদিক মিয়া

সাতচল্লিশ সালে দেশটাকে দুই ভাগ করে দিয়ে সাহেবরা চলে গেল। গেল ঠিকই, কিন্তু আমরা স্বাধীনতার আনন্দ অনুভব করতে পারলাম না। দেশভাগের কিছুদিন পর থেকেই গ্রামের হিন্দু পরিবারগুলো ভারতের পথে পা বাড়াল। তাঁরাও কাঁদতে কাঁদতে যেতেন, আমরাও চোখের জলে তাঁদের বিদায় দিতাম। তাঁদের বহুপুরুষের ভিটাগুলো আস্তে আস্তে ঝোপ-জঙ্গলে ভর্তি হয়ে উঠল। সম্ভবত সকলেরই তাঁদের জন্য কষ্ট হতো, কিন্তু আমার বুকের মধ্যে যেন সর্বক্ষণ হু-হু করত। আমি আর সতু কলেজের পড়া শেষ করে দূরের এক শহরে চাকরি করছিলাম। হঠাৎ করেই সতুকে চাকরি ছেড়ে দিয়ে ভারতে চলে যেতে হলো। তারপর থেকে আমার জীবনের সহজ আনন্দ হারিয়ে গেল। গ্রামে ফিরে এসে জমি-জায়গা চাষ-বাস দেখতে লাগলাম। কোনোরকমে দিন কাটে। সতুদের পরিত্যক্ত বাগানে ঘুরে বেড়াই।

আমাকে সকলে বোঝায়, হিন্দুদের যে পূর্বপুরুষের ভিটা ছাড়তে হলো, তার জন্য তাঁদের যথেষ্ট দায় আছে। মুসলমানকে তাঁরা নিচু নজরে দেখতেন, ঘৃণা করে হাতের জল খেতেন না। সেই ক্ষোভেই কিছু মুসলমান হিন্দুবিদ্বেষী কাজ করেছে। আমাদের গ্রামে কিছু না ঘটা সত্ত্বেও শুধু আতঙ্কেই হিন্দুরা দেশ ছাড়লেন। সত্যি কথা বলতে কি, আমি কিছুতেই মনে করতে পারি না যে, হিন্দুরা আমাদের বাস্তবিকই ঘৃণা করতেন। তাঁরা আমাদের হাতের জল খেতেন না, এই জল না খাওয়ার মধ্যে তাদের বিরাট এক ভ্রম আছে বলে আমি মনে করি। তাঁদের ধর্মাচরণ, সংস্কার, বিশ্বাসে আমাদের সঙ্গে অনেকখানি ব্যবধান। অন্য ধর্মের মানুষের স্পর্শ থেকে দূরে থাকার এই কুপ্রথা তাঁদের মধ্যে কবে থেকে চলে আসছিল, আমার তা জানা নেই। তবু আমি মনে মনে বিশ্বাস করি, হিন্দু প্রতিবেশীরা আমাদের গভীরভাবে ভালোবাসতেন। তাঁরা নতুন জায়গায় গিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রাম চালাচ্ছেন, তারই মাঝে চিঠি দিয়ে ব্যাকুলভাবে আমাদের খবর জানতে চাইছেন। আমি জানি আমার মন যেভাবে তাদের জন্য কাঁদছে, তাঁদেরও আমাদের জন্য তেমনি কষ্ট হচ্ছে। আমি কোনোদিন ভুলতে পারবো না কীভাবে পাশের বাড়ির হরিমোহনকাকা কাঁঠাল গাছতলায় শীতলপাটি বিছিয়ে আমাকে আর তাঁর ছেলে সত্যপ্রসাদকে একসঙ্গে পড়াতে বসাতেন। অ-আ-ক-খ থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষার পড়া পর্যন্ত সবই তাঁর কাছে বসে হয়েছে। সতুর থেকে বিন্দুমাত্র কম মনোযোগ তাঁর আমার প্রতি ছিল না। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে কাকিমার হাতে তৈরি মোয়া নাড়ু খেতাম। তেল মেখে একই সঙ্গে আমি আর সতু ঝাঁপিয়ে পড়তাম পুকুরে। অনেকক্ষণ সাঁতার কাটার পরে একসময় কাকিমার বকুনিতে উঠে পড়তে হতো পুকুর থেকে। চানের পরে প্রায় প্রতিদিনই জুটত কাকিমার হাতে তৈরি একটা করে মিষ্টি। ছোটখাটো মানুষটির চোখ থেকে যেন স্নেহ ঝরে পড়ত। একসময় খুব অভিমান হয়েছিল কাকিমার ওপর। সতুদের গ্রাম ছাড়ার মূলে ছিল কাকিমারই অকারণ আশঙ্কা। নোয়াখালির দাঙ্গার পর তাঁর মনে হয়েছিল, মেয়েদের নিয়ে আর গ্রামে থাকা চলে না। গ্রাম ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে যাওয়ার জন্য তিনি ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। কাকিমার চাপে পড়ে কাকা ধানের জমি বদল করে কুচবিহারে জমি কিনলেন। সাতচল্লিশ সালের দুর্গাপূজার পর কাকা-কাকিমা রাণু, পারুল আর বউঠানকে নিয়ে গ্রাম ছাড়লেন। সতু চাকরির জন্য এখানেই রয়ে গেল। আববা-আম্মার ওপরে রইল তাদের বাড়ি-ঘর গরু-বাছুরের ভার। কথা ছিল আবার পরের পূজায় আসবেন। তখনকার মতো গ্রামের সকলেরই আশা ছিল একেবারে চিরকালের জন্য গ্রাম ছেড়ে যাচ্ছেন না তাঁরা। কাকারও নিশ্চয়ই বিশ্বাস ছিল তিনি আবার ফিরে আসতে পারবেন। কাকিমা চিরকাল ছোঁয়া বাঁচিয়ে চললেও যাওয়ার দিন আম্মার গলা জড়িয়ে ধরে খুব কান্নাকাটি করলেন, আবার ফিরে আসবেন এটা বিশ্চয়ই তাঁদের মিথ্যা কথা ছিল না। তাঁরা নিজের মনকেও সান্ত্বনা দিয়েছিলেন, একদিন ফিরে আসতে পারবেন বলে। কিন্তু আর ফেরা হলো না তাঁদের।

অল্প কিছুদিন পরে চিঠি এলো সতুকে চলে যাওয়ার কথা জানিয়ে। ওর জন্য ওখানে চাকরির ব্যবস্থা হয়েছে। কুচবিহারে নিজের জমিতে বাস করতে তাঁরা যাননি। কলকাতায় ভাড়াবাড়িতে উঠেছেন। সতু চাকরি ছেড়ে গ্রামে এলো সকলের সঙ্গে দেখা করতে। আমিও ছুটি নিয়ে ওর সঙ্গে গ্রামে চলে এলাম। শেষ কয়েকটা দিন সতু আমার আম্মার কাছেই খেল। জাত-পাতের বাধা এই প্রথম ভাঙল সে। আমাদের বাড়ির সকলেই অবাক হয়ে গেল সতুর এই সিদ্ধান্তে। আম্মা তো রান্নার সব ব্যবস্থা করে দিয়ে সতুকে বলেছিল নিজেই একটু ফুটিয়ে নিতে। কিন্তু সে জেদ করে বলল, চাচির হাতেই সে খাবে শেষ কটা দিন। পারিবারিক এই দ্বিধা ভাঙার ব্যাপারে দ্বিধা ছিল আমাদের বাড়িতে, সব থেকে আপত্তি ছিল আমার আম্মার। সে বলতে গিয়েছিল, – ‘সতু, বাপ আমার, তর বাপ-ঠাকুদ্দার ধম্মো -’। ‘ধম্মো রাখো চাচি, ভাত দেও, খিদা পাইছে।’ মায়ের দ্বিধা এভাবেই উড়িয়ে দিলো সে। কদিন পরে সতুকে ট্রেনে তুলে দিয়ে এলাম। আজন্মের সাথি চোখের আড়ালে চলে গেল, ভাঙা মন নিয়ে আর চাকরি করতে শহরে যেতে পারলাম না। পারলাম না বলে কেউ আমায় কোনো রকম জোরাজুরিও করল না। বরং আমাকে সংসারী করে তোলার জন্য আমার বউ মানোয়ারাকে তার বাপের বাড়ি থেকে আনিয়ে নিল আমার আববা। আমাদের বাড়ির প্রথা অনুযায়ী আমার নিকাহ হয়েছিল মাত্র একুশ বছর বয়সে। মানোয়ারা এতদিন তার আববা-আম্মার কাছেই ছিল, নিকাহর সময় সে ছিল এক কিশোরী। অনেক দিন পরে তাকে দেখলাম। সে এখন পূর্ণ যুবতী, আগের থেকেও অনেক সুন্দরী। তাকে পেয়ে আমার বিষণ্ণতার মেঘ কেটে যেতে পারত। কিন্তু এখানেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াল সতু। আমাদের দাম্পত্য জীবনের মাঝখানে সে জড়িয়ে রইল। দুজনে একসময়ে অনেক লুকিয়ে দেখেছি মানোয়ারাকে। তখন ওর সঙ্গে আমার নিকাহর কথা হয়নি। ম্যাট্টিক পরীক্ষার পর আমাদের হাতে অনেক সময়, সাইকেল নিয়ে দূরে দূরে ঘুরতে যাই। একদিন ভরা-দুপুরবেলা দেখলাম হাজি সাহেব তারেক মোল্লার নাতনি বিড়ালকে দুধ খাওয়াচ্ছে। হাজি সাহেবের নাতনির নাম তখনো জানি না, তবে আমাদের দুজনেরই চোখ ওর দিকে আটকে গিয়েছিল, দাঁড়িয়ে গিয়েছিলাম দুজনেই। তারপর থেকে প্রায় প্রতিদিনই আমরা ওইপথে যেতাম। মাঝে মধ্যেই দেখতে পেতাম তাকে। হাজি সাহেবের নাতনিকে দেখার উৎসাহ আমার থেকেও সতুর অনেক বেশি ছিল। ম্যাট্টিকের ফল বেরোনোর পরে শহরের কলেজে পড়তে গিয়ে আমরা মানোয়ারাকে ভুলে গেলাম। অনেক পরে যখন তার সঙ্গে আমার সম্বন্ধ হলো, নিজেকে একটু অপরাধী লেগেছিল সতুর কাছে। যখন এই সম্বন্ধের কথা তাকে জানালাম, সে ভারী নিশ্চিন্ত হয়ে বলেছিল, হাজি সাহেবের নাতনিকে লুকিয়ে দেখার থেকে তোর বউকে দেখা অনেক সহজ হবে। বন্ধুকে ডেকে বউ দেখানো সহজ ছিল না তখনকার দিনে আমাদের মতো মুসলমান পরিবারে। আমার বউ হওয়ার পরে সতু মানোয়ারাকে কোনোদিন দেখতে পায়নি। নিকাহর পরে বড় শহরে সতুর সঙ্গে চাকরি করতে গিয়ে নিকাহ কিংবা মানোয়ারার স্মৃতি অনেক অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। শহরে গিয়ে প্রথম অনুভব করলাম হিন্দু-মুসলমান সহকর্মীদের মধ্যে এক অবিশ্বাসের বাতাবরণ। হয় তো এই অবিশবাস ছিল খুবই সাময়িক। সকল হিন্দু-মুসলমানই যে পরস্পরকে অবিশ্বাস করত তাও হয় তো নয়। তবু আমার আর সতুর কাছে এই পরিবেশ দুঃসহ লেগেছিল।

এর পরে বহুদিন পর্যন্ত এক চিন্তা আমাকে তাড়া করে বেরিয়েছে, আমিও কি কোনো অবিশ্বাসের কাজ করেছি রাণুবালার প্রতি? রাণুবালা হরিকাকার বড় মেয়ে, ধর্মত সে আমার বোন। সে যখন শ্বশুরবাড়ি থেকে বিধবার বেশে বাপ-মায়ের ঘরে ফিরে এলো আমার বুকে বড় বেজেছিল। ফিরে আসার পরে কাকা ওকে পূজাপার্বণ, ঠাকুর-দেবতার দিকে মন দিতে বললেন। খুব ভোরে উঠে সে পূজার ফুল তুলত। আমি গোহাল থেকে ওই সময় গরু বার করতে যেতাম। মাঝখানে একটি পুকুরের ব্যবধান। পুকুরের ওপারে রাণুদের ফুলবাগান, এপারে আমাদের গোহাল। রোজ আমার দৃষ্টি তার ওপর আটকে যায়। নিষ্পাপ পবিত্র রাণুবালার দিকে তাকালে বড়ো মায়া লাগে। একদিনই মাত্র তার সঙ্গে আমার চোখাচুখি হলো। তার চোখে কি আমি অবিশ্বাস দেখেছিলাম? আমার খুব লজ্জা হলো, পাপবোধও। আমার এই কষ্টের অনুভূতি  তো সতুকেও বলা চলে না। তারপর থেকে আমি নিজে আর গোহালে যেতাম না। কাজের লোককে দিয়ে গরু বার করাতাম।

এসব অনেককাল আগের কথা। আমার আববাজানের সাধ পূর্ণ হয়েছে। মানোয়ারাকে নিয়ে আমি সংসারী হয়ে উঠেছি। আমাদের হিন্দু প্রতিবেশীদের ছেড়ে যাওয়া ভিটার অনেকগুলো ভরে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা মানুষের নতুন করে গড়ে তোলা ঘরে। হিন্দুদের সঙ্গে সম্পত্তি বদল করে তাঁরা এইসব ভিটার মালিক হয়েছেন। তাঁরা মুসলমান হলেও আমাদের সঙ্গে আচার-ব্যবহারে কিছুটা আলাদা। তবু ফাঁকা ভিটার থেকে মানুষ ভালো। তবে সতুদের ভিটায় অন্য মানুষ এলে আমার খুব কষ্ট হবে। ওই ভিটার প্রতিটি গাছগাছালি, ভাঙা ঘরদুয়ারের গন্ধ আমার বড় চেনা। সতু লিখেছে, ওদের পিতৃপুরুষের ভিটা যেন আমরাই দেখি। অন্য কাউকে দেখাশোনা করতে দিলে কাকার আত্মার শান্তি হবে না। কাকা-কাকিমা দুজনেই এই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন। সতুর ছেলেমেয়েরা বড়ো হয়েছে, তাদের বিয়েতে সতু আমাকে নিমন্ত্রণপত্র পাঠিয়েছিল। চিঠিতে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ আছে। আমাদের গ্রামের অন্য হিন্দু পরিবারগুলো কে কোথায় গেল, কোনো খবর আর সতুরা জানতে পারেনি। এক গ্রামের মানুষ সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রামের খবর সতু আমার চিঠিতে জানতে পারে। পূর্ববাংলার গ্রামগঞ্জের যে কতখানি পরিবর্তন হয়েছে, সতু এসে দেখলে আশ্চর্য হতো। যখন একটাই বাংলা ছিল, তখন গ্রাম-শহরের চরিত্র যা ছিল, দু-ভাগ হওয়ার পরে সে-চরিত্র অনেক পালটে গেছে। এখন আশায় আছি আরেকটা বদল হবে। আমরা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ, শুধুই যেন মুসলমান হয়ে বেঁচে আছি। আমাদের বাঙালিসত্তা অবহেলিত, উপেক্ষিত। এবার বাঙালিয়ানার লড়াই শুরু হয়েছে। এসব কথা সতুকে বলতে ইচ্ছে করে। চিঠিতে সব লেখা যায় না। ইতোমধ্যে সতুর জীবনে একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল, সম্প্রতি ওর স্ত্রী-বিয়োগ হয়েছে। বউঠান সুন্দরী ছিলেন না, তাঁর কালো রং গ্রামে কিছুদিনের জন্য আলোচনার বিষয় হয়েছিল। তবে তিনি খুব গুণী ছিলেন আর সতুর বড় বন্ধু ছিলেন। সতুর জীবনে বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি হলো। এক্ষেত্রে সান্ত্বনার কোনো জায়গা নেই। তবু তাকে একটা চিঠি দিলাম। চিঠিতে নিজের কথাই বেশি লিখলাম। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের খবর সে নিশ্চয়ই জানে। আমার একমাত্র ছেলে যে সেই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে সেই খবর তাকে জানালাম। গত মাসে ছেলে একবার বাড়ি এসেছিল কয়েক ঘণ্টার জন্য। তার মা তাকে আটকানোর অনেক চেষ্টা করেছিল। আটকাতে না পেরে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। আমি তাকে যাওয়ার সময় জোর করে কিছু টাকা হাতে দিয়েছি। আমার সমস্ত সুখ-দুঃখ দুশ্চিন্তার ভাগীদার এখনো সতুকেই করি। দূরে থেকেও সে আমার খুব নিকটজন। আমার পিতৃহৃদয় কাঁদছে। তবু আমার মন বলছে, যুদ্ধে আমাদের জয় হবেই। ফিরে আসবে আমার ছেলে খালেক।

 

খালেকুজ্জামান

আষাঢ় মাসের এক সন্ধ্যায় ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে প্রাণ হাতে নিয়ে যশোর দিয়ে আমরা পাঁচ বন্ধু ইন্ডিয়ায় ঢুকে পড়লাম। আমরা পাঁচজন এক কলেজের ছেলে : আমি, আলতাব, হামিদ, জয় আর কালু। কালুর পিসির বাড়ি দমদমে। জয়ের জ্যাঠা থাকে হাবরা। জয় আলতাব আর হামিদকে নিয়ে তার জ্যাঠার বাড়িতে আশ্রয় নিল। জয়ের জ্যাঠা যে খুশি হননি তা বোঝা গেল। তবে আমাদের আর কারো খুশি-অখুশি নিয়ে ভাবার মতো মনের অবস্থা ছিল না। কালু আমাকে নিয়ে দমদম ক্যান্টনমেন্টে পিসির বাড়ি এলো। এ-বাড়িতে আসতে খুবই দ্বিধা ছিল আমাদের। আমি কালুকে বলেছিলাম, ‘লোকের ঘাড়ে বসে খাবার জন্য ঘর ছাড়ি নাই। পথে পথে মোট বইব, তাও কারো আশ্রয় চাই না’। ‘গোঁয়ার্তুমি করিস না খালেক, জায়গাটা চিনা জানা হোক। মুটের কাজ পাওয়াও কলকাতা শহরে সহজ কথা নয়।’ কালুর           সন্তানহারা পিসি-পিসেমশাইয়ের কথা আগেই শুনেছিলাম। ওর নকশালপন্থী পিসতুতো ভাই পুলিশের গুলিতে মারা গেছে। এই দুর্ঘটনা ঘটেছে অল্পদিন আগে। তাই এ-বাড়িতে ঢুকতে আমার পা উঠছিল না, কালুর ধমকে এগিয়ে গেলাম। কালুর শোকতপ্ত পিসি-পিসেমশাই আমাদের ক্ষুধার্ত মুখ দেখে অত রাতেও খাওয়ার আয়োজন করলেন।

কয়েকদিন ধরে খালি তাঁদের মৃত সন্তানের কথা শুনছি আর বুঝতে পারছি তাঁরা আমাদের মধ্যে তাঁদের মৃত সন্তানকে খুঁজে পেতে চাইছেন। আমরা আসার পরে আবার তাঁদের ছেলের ঘরের জানলা-দরজা খোলা, আবার সে-ঘরের খাটের ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ, বিছানাপত্র এলোমেলো। পরছি তো তারই ব্যবহার করা জামা কাপড়, তার বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করি, দরকারমতো তুলে নিই ড্রয়ার থেকে কলম। ড্রয়ারে একদিন দেখতে পাই চার্মিনারের প্যাকেট, দুই-তিনটি সিগারেট তখনো পড়ে আছে। আমরাও পছন্দ করি চার্মিনার, কিন্তু খাই না, কেন যে খেতে পারলাম না, জানি না। পিসিমা প্রায়ই প্রার্থনা করেন ঈশ্বরের উদ্দেশে, শুনতে পাই আমরা – মায়ের নাড়িছেঁড়া ধন, মায়ের বুক খালি করে এসেছে, তাদের ফিরিয়ে দিয়ো ঠাকুর, মায়ের বুকে। অথচ এমনভাবে অাঁকড়ে আছেন যেন ছাড়া না পাই কোনোকালে। এমন একটা আশ্রয় যে পাবো কাঁটাতারের বেড়া পেরোনোর সময় একবারও ভাবিনি।

আমাকে যেতে হবে পিতৃবন্ধু সতুকাকার খোঁজে। ছেলেবেলা থেকে তাঁর কথা শুনতে শুনতে তিনি আমার অতিপরিচিত এক মানুষ। তাঁর ঠিকানা আমার মুখস্থ। তাঁর লেখা সব পোস্টকার্ডের ওপরেই থাকত তাঁর ঠিকানা। আর আববা যখন চিঠি লিখত, কলকাতাবাসী এই বন্ধুকে আমি ঝুঁকে পড়ে, প্রতিটি অক্ষরকে মনের মধ্যে গেঁথে ফেলার চেষ্টা করতাম। কলকাতাকে ঘিরে কেন জানি না আমার মনের মধ্যে এক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। আমার স্বপ্নের কলকাতায় আমাদের কোনো আপনজন থাকেন, তার জন্য প্রচ্ছন্ন গর্ব ছিল আমার। কলকাতা যে আমার স্বপ্নের সঙ্গে খুব মিলেছে, তা বলতে পারব না, তবে এখানে এসেছি যখন সতুকাকার খোঁজ নিতেই হয়, না হলে বাবাকে গিয়ে কী বলব? দমদম থেকে কলকাতা, এইটুকু রাস্তা যেতে অনেক ভাবনা মনে এলো। যুদ্ধ থেকে পালিয়ে এসে লোকের বাড়িতে আরাম করছি জানলে কী ভাববেন কাকা? কাকা যদি কিছু নাও মনে করেন, তাঁর বাড়ির লোকেরা কী ভাববে? ঠিক করলাম কাকার বাড়িতে খুব কম সময় থাকব। পিসি সকালে জল-খাবার খাইয়ে ছেড়েছেন, বলেছেন ফিরে গিয়ে দুপুরের ভাত খেতে। কালু গেছে অন্য কোনো আত্মীয় বাড়ি। আমি একা চলেছি সতুকাকার বাড়ি, একটু অস্বস্তি হচ্ছে, দুপুরে পিসির কাছেই ফিরে আসব। পিসির ছেলের যে দামি শার্টটা পরেছিলাম, সেটা পালটে আমার নিজের কোঁচকানো শার্টটাই পরে নিলাম, মাঝপথে পালিয়ে আসা মুক্তিযোদ্ধাকে মানাচ্ছিল না ওই জামা।

সতুকাকার বাড়ি গিয়ে কিন্তু আটকে গেলাম, সারাদিন কাটিয়ে আসতে হলো। না খাইয়ে ছাড়লেন না। দেখলাম আমারই আববাজানের মতো এক ভাঙাচোরা মানুষকে। শুধু দেশ ছাড়া কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে বিচ্ছেদই তো নয়; নিজেকে অন্য দেশে এসে প্রতিষ্ঠিত করা, সে কি চাট্টিখানি কথা? পরিচয় দিতেই বয়সের থেকে বেশি বুড়ো ঝুঁকে যাওয়া লম্বা-চওড়া মানুষটি আমায় বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন হাউ-হাউ করে। এই বিদেশে এসে আবার করে আত্মীয়তার ছোঁয়া পেলাম, মনটা ভিজে গেল। সারাদিন ধরে কত যে প্রশ্ন করলেন, – বুঝতে পারলাম অন্যের কাছে যত অকিঞ্চিৎকরই হোক না কেন, ওঁর কাছে এসব কথার উত্তর খুব মূল্যবান। ‘সাদিকের কি খুব চুল পেকে গেছে আমার মতো?’ ‘আগেরই মতো মোটা গোঁফ রাখে সে? তার বাঁ গালের আচিলটা কি আরো বড়ো হয়েছে?’ ‘সে কি আগের মতোই জোরে জোরে সাইকেল চালাতে পারে?’ বন্ধুর খবর ছাড়াও আরো অনেক খবর তাঁর চাই। ‘পুকুরটা কি মজে গেছে?’ ‘পুকুরধারে লাউমাচা শসামাচা কি তেমনি আছে?’ ‘টিয়াঠুটি আমগাছের ফলন কি আগের মতোই ভালো?’ ‘ঘোষেদের তেঁতুল গাছে অগুণতি বাদুড় ছিল, এখনো আছে?’

শ্বশুরের ছেলেমানুষি দেখে তাঁর পুত্রবধূ শীলা মিটিমিটি হাসছিলেন। দুপুরবেলা তিনি আমাকে যত্ন করে খাওয়ালেন। কাকা আমাকে রাতে থাকার জন্য পীড়াপীড়ি করলে তিনিও ভদ্রতা করে থাকার জন্য অনুরোধ করলেন। তবে আমি এটুকু বুঝেছিলাম, এ-বাড়িতে আমার থাকাটা বড় বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। ছোট ছোট দুটি ঘর, সিঁড়ি দিয়ে উঠে ঘেরা বারান্দায় খাওয়া আর বসার জায়গা। এর মধ্যে তাড়া খেয়ে পালানো এক বাঙাল মুক্তিযোদ্ধার উপস্থিতি শীলার খুব ভালোলাগার কথা নয়। তার ওপর তার বাপের-বাড়ির কোনো শিকড় পূর্ববাংলায় ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের জয়-পরাজয় নিয়েও তার বিশেষ মাথাব্যথা নেই। কাকার ছেলে অফিসের কাজে বাইরে গিয়েছিল, তার সঙ্গে দেখা হলো না। কাকা জোর করে আমাকে বাসস্টপে পৌঁছে দিতে এলেন। খুব সংকোচের সঙ্গে এক গোছা টাকা বার করে আমার হাতে গুঁজে দিতে গেলেন। কাকা হঠাৎ হঠাৎ পূর্ববাংলার গ্রামের ভাষায় কথা বলেন। ‘টাকাটা নে খালেক, তুই আমার বন্ধুর পোলা, তরে দিবার অধিকার আমার আছে। আর এডা হইল আমার পেনশনের টাকা। পোলার সংসারে টাকা দিমু ক্যান?’ কাকাকে অনেক কষ্টে বোঝাতে হলো, ‘আমার কোনো অভাব নাই, যেখানে আছি রাজার হালে আছি।’ কাকা বললেন, ‘তর রাজার রাইজ্যডা একবার দেখন লাগব।’ দমদমের পিসির ঠিকানা দিয়ে তবে ছাড়া পেলাম।

 

সত্যপ্রসাদ

আমার বন্ধুপুত্র খালেকুজ্জামান কাল এসেছিল। সে ঠিক তার বাবার মতো দেখতে হয়েছে। তাকে বুকে জড়িয়ে আমি চোখের জল ধরে রাখতে পারলাম না। এক লহমায় আমার আর সাদিকের যৌবনের ছবি বর্তমানকে ছাপিয়ে স্পষ্ট হয়ে দাঁড়াল। পূর্ববাংলার গ্রামে উঠানের চারধারে আম-কাঁঠালের ছায়ায় বড় বড় টিনের চালের ঘর ছিল। বর্ষাকালে এঘর-ওঘর করতে হলে ভিজতে হতো। তাতে কোনোদিন কষ্টবোধ করিনি। সেই খোলামেলা জীবন ছেড়ে উত্তর কলকাতার এই ঘিঞ্চি পরিবেশে দীর্ঘকাল আছি। খুব খারাপ নেই, মোটামুটি মানিয়েই আছি। হঠাৎ করে সরু এই গলির মধ্যে কেমন করে ঢুকে পড়ল আমার শৈশব-যৌবন। গ্রামের মাঠ-ঘাট, গাছপালা, দিঘি। স্ত্রী-বিয়োগের পর সংসারের খুঁটিনাটি ব্যাপারে আমি আমার পুত্রবধূ শীলার ওপরে নির্ভরশীল। ইচ্ছে প্রবল হলেও খালেককে নিজের কাছে রাখতে পারলাম না। শুধু দুপুরে তাকে ভাত খাইয়ে দেওয়ার জন্য শীলাকে অনুরোধ করলাম। খালেক খুব বুদ্ধিমান ছেলে। কাকার অসহায়তা সে বুঝেছে। চা খেয়েই চলে যাওয়ার উদ্যোগ করেছিল। পরে আমার মুখ চেয়ে সম্ভবত সে এ-বাড়িতে খেতে রাজি হলো। বউমা অবশ্য তার সঙ্গে ভদ্রতা করেছে। আহারের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি কিছুই করিনি, শুধু দোকান থেকে নিজে গিয়ে একটু দই-মিষ্টি নিয়ে এসেছি। ছেলে থাকলে অবশ্য আমার বন্ধুপুত্রের আরেকটু আপ্যায়নের ব্যবস্থা সে করত। হয়তো দিন দুয়েকের জন্য তাকে থাকার জন্য জোর করতে পারতাম। আমার ঘরে সুরমার মৃত্যুর পর থেকে আমি একাই শুই। অনায়াসে সে আমার ঘরে থাকতে পারত, একবার-দুবার মৃদুভাবে বললেও জোর করার সাহস হলো না, যদি খালেকের অনাদর হয়। মুক্তিযোদ্ধার সম্মান পাওয়ার কথা খালেকও যেমন ভাবেনি, আমার বউমাও সে ব্যাপারে উদাসীন। সাত পুরুষের ঘটি পুত্রবধূ আমার, মুক্তিযুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার ভাবার কথা নয়। কিন্তু সত্যিই তাই? রাস্তায় বের হলে যে দেখি উদগ্রীব হয়ে রেডিওতে মুক্তিযুদ্ধের খবর শুনছে, এতো মানুষ তার মধ্যে তো সকলেই আমার মতো বাঙাল নয়। পূর্ববাংলার প্রতি পশ্চিমবাংলার টান আমি তো দেশ ছাড়ার পর এই প্রথম অনুভব করছি। আমার বউমাটি কেন এ ব্যাপারে ব্যতিক্রমী হয়ে রইল? আর যা-ই হোক খালেককে দেখে তাচ্ছিল্য করার সাধ্য কারো নেই। সে যথেষ্ট সপ্রতিভ, বুদ্ধিমান। তাকে দেখলে মনেই হবে না যে, সে পূর্ববাংলার প্রত্যন্ত গ্রামের ছেলে। খাওয়া-দাওয়ার পর আমার শোবার ঘরে বসিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাপে কেমন আছে কও।’ ‘ভালো নাই কাকা ভালো নাই।’ ‘ক্যান ভালো নাই খালেক?’ ‘গ্রামের সকলে কয়, এককালে খুব হাসি-খুশি মানুষ আছিল সাদিক, দেশভাগ হইল, ভরা গ্রাম নষ্ট হইল, পুরান মানুষ চইলা গেল। সাদিকের দোস্ত, সত্যুরা কইলকাতা গেল গিয়া, সাদিকের মন ভাইঙ্গা গেল।’ ‘দেখছস তো খালেক, মানুষকে  কি না মাইনা লইতে হয়। তর কাকিমা আমার বলভরসা আছিল, তার অভাবও মাইনা লইছি। তর কাকিমা বাইচ্যা থাকলে তর অন্যরকম আদর হইত এ-বাড়িত।’ ‘কাকা, ক্যান দুঃখ করেন, যথেষ্ট আদরযত্ন পাইলাম। আবার আহুম, অখনে যাই।’ খালেককে বাসে তুলে দিতে গিয়ে একটু টাকা দিতে গিয়েছিলাম। সে কিছুতেই নিল না। ঠিকানাটা নিয়ে রাখলাম। দমদমে কার কাছে কীভাবে আছে একবার দেখতে যাবো। সাদিকের ছেলে বলে কথা! কী অবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে আমার বন্ধু আর বন্ধুপত্নী। একমাত্র ছেলে যুদ্ধে। কোনো খবরও পাঠানো যাচ্ছে না, চিঠিপত্র সব বন্ধ। যোগাযোগের কোনো উপায় নেই। এপারে আমি ছাড়া তার আর কে আছে?

 

খালেকুজ্জামান

আমার আববাজান আর সতুকাকার স্বভাবে অনেক মিল। তবে শহরে থাকার জন্যই হয়তো কাকা অনেক স্মার্ট। কাকার সঙ্গে দেখা করে আসার দিন চারেক পরেই কাকা চলে এলেন দমদমের পিসিমার বাড়ি। পিসেমশাইয়ের সঙ্গে গল্প খুব জমে উঠল। তাঁরা একই জেলার মানুষ হওয়াতে নানা প্রসঙ্গ নিয়ে মেতে উঠছেন। কাকা নিশ্চিন্ত হলেন, আমি এখানে কত ভালো আছি দেখলেন। তবে আসা ওঁর চলতে লাগল, পুরনো কথার মধ্যে ডুবে যেতে লাগলেন ওঁরা। আমি একদিন বললাম, ‘এত যখন দেশের জন্য দুঃখ, যান নাই কেন এতদিনে? পাসপোর্ট করে যাওয়ার তো কোনো বাধা ছিল না।’ অনেক ভেবে সতুকাকা বললেন, ‘দ্যাখ রে খালেক, আমাগো পায়ে যেন শিকল বান্দা রে, এখানে আইসা জীবনযুদ্ধ, কত যে কষ্ট পাইলাম, কি কই। তবে যুদ্ধ একদিন শেষ হইল, আমরা গেলাম না। আসলে যাওন যে যায় সেই কথাটাই মনে আইল না রে।’ পিসেমশাই বললেন, ‘না না সে-সব কিছু না, দেশে যাবো, আমার নিজের দেশ, সেখানে যাবো পাসপোর্ট করে? মন চায় নাই, বড়ো দুঃখ পাই যখন নিজের দেশে ভিসা নিয়ে ঢুকতে হবে একথা ভাবি।’ ‘কিসের দুঃখ? কার ওপরে অভিমান কাকা? আমাদের ওপর? আমার বাপ-দাদা কখনো চায় নাই আপনাদের দেশত্যাগ। একবার আসেন, দ্যাখেন কত ভালোবাসা নিয়ে সকলে অপেক্ষা করছে। এখনো আমার আববা এই কাকার জন্যে চোখের পানি ফেলে। একবার সকল অভিমান ভুলে চলেন ওপারে’ – ওঁরা আমাদের সঙ্গেই যেতে পারেন এরকম একটা চিন্তা সেদিন তাঁদের মনে এলো।

ইতোমধ্যে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু আমাদের মনে কোনো আনন্দ নেই। গ্রাম থেকে চিঠিপত্র নেই, যেটুকু খবর ভেসে আসছে তাতে ভয় হচ্ছে। আত্মীয়-বন্ধু কাউকে কি জীবিত পাবো? যুদ্ধে যারা ঝাঁপ দিয়েছিলাম তারা কেউ বেঁচে আছে বলে মনে হয় না। আমরা পাঁচজন একদিকে পালালাম, অন্যদের কী হলো বুঝতে পারিনি। গ্রামের মানুষও আক্রান্ত হয়েছে শুনতে পাই। আমাদের গ্রাম কি করে বাঁচবে? পিসি-পিসেমশাই আমাদের যাওয়ার আয়োজন করছেন। ওঁরা ওঁদের সবচেয়ে বড় সম্পদ হারিয়েছেন। আর কিছু হারানোর ভয় নেই। কোনো প্রিয়জনের দেখা পাবেন বলে তাঁরা যাচ্ছেন না, যাচ্ছেন সম্ভবত আমাদের দুঃখের ভাগ নিতে। আমি আর কালু নিজেদের মধ্যে আমাদের ভবিষ্যতের সংকট নিয়ে, মা-বাবার কষ্ট নিয়ে কোনো আলোচনা করি না। সব সময় সতর্ক থাকি যেন ভেঙে না পড়ি, আমাদের তো নিজেদের ঘরে পৌঁছতেই হবে। এমনিই তো এক গ্লানি বহন করছি সর্বক্ষণ, নিজেরা যে            খেয়ে-পরে আরামে আছি সে-কথা ভুলে কি করে? কাকা বলছেন, ‘এই আছিল আমার নিয়তি, এতদিন যাই নাই, এখন যাইতে হবো, কে আছে আর কে নাই দেখতে। একটাই সান্ত্বনা রে খালেক, তোরা পোলাপানেরা স্বাধীন দেশে বাঁচবি।’ কাকাকে কাকার ছেলে ছাড়তে চাইছিল না, আমিই তাকে বোঝালাম কাকার জন্য ভয় নেই। তাঁকে সুস্থ শরীরে পৌঁছে দেবার দায়িত্ব আমার।

আমরা দুই মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুই আজ সব থেকে দুর্বল। যেদিন যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম, সেদিনের শক্তির ছিটেফোঁটাও আজ নেই। যুদ্ধে মরিনি, কিন্তু মৃত্যু দেখতে হবে প্রিয়জনের, অথবা মৃত্যুর বর্ণনা শুনতে হবে, এ-চিন্তা আমাদের মনকে বিকল করে দিয়েছে। পিসি-পিসেমশাই হাঁকডাক করে সবাইকে বাসে তুললেন, মালপত্তর গোছগাছ করলেন। কাকা বুঝতে পারছেন আমাদের মনের অবস্থা, মাঝে মধ্যে পিঠে-মাথায় হাত রাখছেন। পিসি-পিসেমশাই রাস্তার দুদিক দেখছেন জানালা দিয়ে, নানা কথা বলছেন তাদের শৈশব-যৌবনের। বাস দাঁড়িয়ে গেলে ওঁরাই উদ্যোগ করছেন চা খাওয়ানোর। সহযাত্রীদের কাছে জানতে চাইছেন এখনকার বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জের অবস্থা। আমার বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। কালুর অবস্থা যেন আমার থেকেও খারাপ, বাসে ওঠার পর থেকে যেন ঝিমোচ্ছে। পিসিমাও ওর মুখ দিয়ে কথা বার করতে পারেনি। শেরপুরের কাছাকাছি এসে পিসিরা নেমে গেলেন। আশ্বাস দিয়ে গেলেন, ‘দেখবি সব ঠিক আছে।’ আমরা টাঙ্গাইলের দিকে যাবো, কালু যাবে আমার গাঁ ছাড়িয়ে আরো দূরে। যদি নিজের গাঁয়ে পৌঁছতে পারি ওকে আজকের রাতটা আটকে রাখব।

গ্রামের ছয়মাইল আগে বাসের রাস্তা শেষ হলো। এবার পায়ে হাঁটা। আমাদের অভ্যাস আছে। কিন্তু কাকার কষ্ট হবে, কলকাতা শহরে বাড়ি, হাঁটার অভ্যাসও নেই, তাছাড়া তাঁর বয়েস হয়েছে। খানিকটা হাঁটার পর খবর পেলাম আববা-আম্মা বেঁচে আছে। আমাদের গ্রামের মানুষ জঙ্গলের গভীরে ঢুকে প্রাণ বাঁচিয়েছে, খাওয়ার কষ্ট পেয়েছে, তবে প্রাণে তত মারা যায়নি। গ্রামের দিকে যত এগোচ্ছি তত অবাক হচ্ছি রাস্তায় এতো মানুষের ভিড় দেখে। আমাদের এসব পথে খুব বেশি মানুষ চলাচল করে না। মলিন পোশাক পরা এতো মানুষ কোথায় যাচ্ছে? আসছেই বা কোথা থেকে? খানিক পর বুঝতে পারলাম, গ্রামের মানুষ যাচ্ছে শহরে কেনাকাটা করতে। অতি প্রয়োজনের কেনাটাকা। গ্রামে কিচ্ছু নেই, বহুদিন হাট বসে নাই। লবণ, কেরোসিন, দিয়াশলাই এইসব নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের খোঁজে মানুষ শহরে যাচ্ছে। বাড়ির মেয়ে-বউরা ঘরের বার হতে পারে না। তাদের পরনের কাপড় নাই। না খেয়েও পথে বার হওয়া যায়, কিন্তু বাড়ির মেয়েদের লজ্জা নিবারণ না করতে পারলে মানুষের সামনে বার হতে পারবে না তারা। গ্রামের বেশিরভাগ ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই। খুব প্রত্যন্ত গ্রামেও রাজাকাররা পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছে পাকিস্তানি সেনাকে। তারা আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে মানুষের ঘরে। আবার ঘর বাঁধার জন্য কাঠ-বাঁশ যদি বা জোগাড় হয়, তার কিংবা গুণা নেই। সেসব কিনতে যেতে হচ্ছে শহরে। সংসারে যেসব জিনিস না হলে নয়, সেসব জোগাড় করতে ঘটি-বাটি বেচতে হচ্ছে কাউকে কাউকে। তবু জোগাড় তো করতেই হবে, বাঁচতে হবে যে।

পথে যারা যাতায়াত করছে তাদের অনেক মুখই চেনা। নানা জনে নানা কথা চিৎকার করে বলছে। ‘বাঁইচ্যা আছস প্রাণে, আমরা ভাবতে আছিলাম সাদিকের পোলাডা আর ফিরল না।’ ‘আরে! তুই নবগ্রামের সাদিক মিয়ার পোলা না? ঘরে যা শিগগির, তর আম্মার পরান জুড়াক।’ ‘আরে খালেক না? যা গিয়া তাত্তারি, তর বাপে-মায়ে কাইন্দা মরল।’ কী করে যাবো তাড়াতাড়ি? কাকা কি পারে টানা ছয় মাইল রাস্তা হাঁটতে। কোথাও বসে চা খাই, জল খাই। কোথাও একটু বিশ্রাম করি। গ্রামের দিকে যেসব চেনা মানুষেরা চলেছে, তারা আমাদের অনেক আগে পৌঁছে যাবে গ্রামে। পাশ কাটিয়ে যাবার সময় তারা অনেকেই বলে গেল, ‘তর আববারে খবর দিমু, তুই আইসা গেছস।’ গ্রামে পৌঁছতে বিকেল গড়িয়ে গেল।

গ্রামের শুরুতে হাটখোলা অনেক বটপাকুড়ের গাছ। সবচেয়ে ঝুপসি বটগাছটার তলায় দাঁড়িয়ে আছে আমার আববা সাদিক মিয়া। আমার দিকে এগিয়ে এসেও হঠাৎ করে জড়িয়ে ধরল সতুকাকাকে। বুঝতে পারলাম বাবা শুধু আমারই আসার খবর পেয়েছে। দুই বন্ধু একে অন্যেকে জড়িয়ে ধরে যেন খুলে দিলো এক গুহার মুখ, যেখানে জমানো ছিল বহু বছরের কান্না। দুজনের শরীর কাঁপছে। তাদের চোখের জলের জোয়ার যেন ভাসিয়ে নিচ্ছে আমাকেও।

হঠাৎ করেই দেখতে পাচ্ছি পিছন দিক থেকে দৌড়ে আসছে আমার আম্মা। তার অাঁচল লুটিয়ে পড়ছে মাটিতে, মাথায় ঘোমটা নেই। সমস্ত চুল খোলা, এলোমেলো। কান্না ভেজা গলায় চিৎকার করছে, ‘আমারে কত কষ্ট দিবি বাপ!’ এ কী হয়েছে আমার আম্মার চেহারা! কত বছর বয়েস বেড়ে গেছে তার! আম্মাকে দেখে চেঁচিয়ে উঠলেন সতুকাকা, ‘চিনা ফালাইচি ভাবি, হাজি সাহেবের নাতনিরে চিনা ফালাইচি।’ আববা বলল, ‘দ্যাখ সতু মানোয়ারা বুড়ি হইয়া গেছে।’ ‘দ্যাখেন তো ভাবি আমারে চিনতে পারেন কি না’ – আবার চেঁচিয়ে উঠল কাকা। বাঁধভাঙা কান্নার মধ্যে আমার পুত্র-বিচ্ছেদ-কাতর আম্মা নিয়ে এলো এক ঝলক হালকা হাসি। কাকা আর আববার কথায় সম্বিৎ ফিরে পেয়ে আম্মা মাথায় ঘোমটা তুলে দিলো। আমি তার শীর্ণ লজ্জিত চেহারার মধ্যে খুঁজতে লাগলাম এক কিশোরীকে যে ছিল শুধুই হাজি সাহেবের নাতনি আর বাপ-মায়ের আদরের মেয়ে। কে জানতো মুক্তিযুদ্ধের অাঁচে একদিন ঝলসে যাবে সেদিনের মানোয়ারা, আবার মুক্তিযুদ্ধই মিলিয়ে দেবে দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর দুই বন্ধুকে!

শেয়ার করুন

Leave a Reply