নদী কারো নয়

লেখক:

সৈয়দ শামসুল হক

॥ ২৪ ॥

চা আনতে কন্ট্রাক্টর সাইদুর রহমানের সমুখ থেকে উঠে যায় কুসমি। – আপনে বইসেন খানিক, চা নিয়া আসি। বিস্কুট কি দেমো? তিনি হাত নেড়ে অস্পষ্ট একটা ভঙ্গি করেন, যার অর্থ দিতেও পারো, নাও পারো। সাইদুর রহমানকে আজ গল্পে পেয়েছে। কুসমি তাঁর দিকে খানিক নজর ফেলে দেখে নেয়। মনে হয় অনেকক্ষণ আজ তিনি বসবেন। আজ এত রাত পর্যন্ত তার ঘরে বসে থাকা আর গল্প করার মতলবটাও কুসমি ভালো করে ঠাহর করতে পারে না। আজো কি তার সেই প্রস্তাব যে, কুসমি রে, আর দোনোমনা না করিস, তুই মোছলমান
হয়া যা! নাকি, আবার সেই নিকার প্রস্তাব? কুসমি কন্ট্রাক্টরের দিকে তাকিয়েই থাকে। কন্ট্রাক্টর সাইদুর রহমানও ফ্যালফেলে চোখ ফেলে নারীটিকে দেখতে থাকে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে। দীর্ঘশ্বাসটি উভয় তরফেই, গভীর স্তব্ধতার ভেতরে শ্বাস ফেলার শব্দটা ঘোর হয়ে উত্থিত হয়। কুসমি অপ্রস্তুত হয়। উঠে যায়। সে কন্ট্রাক্টরের নজর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে যায়।
গভীর রাতের একটা শব্দ আছে। খুব ঠাহর করলে শোনা যায়। মনে হয় যেন দূরে অতিদূরে কোনো এক গাছি করাত দিয়ে কেটে চলেছে একটা গাছ। তারই শিরমির আওয়াজে চিরে যেতে থাকে রাতের ঘোর স্তব্ধতা। কানেও বুঝি এ করাত চেরার বিরামহীন শব্দ পশবার নয়, বুকের ভেতরেই তা শ্রোতব্য। শ্রোতব্য কি বুকটাই চিরে যায়। কুসমির বুক চিরে যেতে থাকে। কতদিন কত রাতে কন্ট্রাক্টর এসেছে তার ঘরে, আনতাআবড়ি কত গল্প করে গেছে। আজ যেন ভিন্ন মতলব তাঁর। মুখে গল্পেরও শেষ নাই, অচিরে বিদায় নেবারও বিন্দুমাত্র তাড়া নাই। কুসমি রান্নাঘরে যাবার জন্যে উঠেছিল, কিন্তু অলক্ষেই তার পা ঘরের ভেতরে যায়। ঘরের ভেতরে হরিচরণের সাড়া নাই। অনেকক্ষণ তার সাড়া পায় নাই কুসমি। কিছু আগেও অশ্রাব্য গালাগাল করে উঠেছিল হরিচরণ। – মাঙের কুটকুটানি তোর হামার জানা আছে! মুই মরি গেইলে যা করার করিস, মুই বাঁচি থাইকতে নয়! ঘেন্না ধরে যায় কুসমির। আবার মায়াটিও একেবারে বিলীন হয়ে যায় না। তার মায়ের বাবা হরিচরণ, সাক্ষাৎ নাতনিই তো সে। বুড়ামানুষটা একেবারে অচল হয়া গেইছে সেই কতকাল! হাতে ধরি খাবার না দিলে খাইবার শক্তি নাই!
কুসমি ঘরের ভেতরে এসে দাঁড়ায়। হরিচরণ নিঃসাড় পড়ে আছে বিছানায়। ভয় হয়। এত নিঝুম হয়ে পড়ে আছে, প্রাণ আছে তো? কুসমি ঝুঁকে পড়ে বুড়ার মুখখানা অন্ধকারে ঠাহর করবার চেষ্টা করে। মুখ ভালো করে দেখা যায় না। অন্ধকার কী কুটিল ও নিরন্ধ্র। কুসমি দাদুর মুখের ওপর হাত পেতে অনুমান করার চেষ্টা করে শ্বাস বইছে কিনা। না! শ্বাস তো বইছে। হাতটা তখন সরিয়ে নেবে কি নিয়েইছে, খপ করে তার হাত ধরে ফেলে হরিচরণ। চমকে ওঠে কুসমি। হঠাৎ মনে হয়, দাদু নয়, ভূতের হাত, আচমকা খামচে ধরেছে। কুসমি হাতটা ছাড়িয়ে নেয় দ্রুত, কিন্তু দাদু আবার খামচে ধরে। খসখসে গলায় চাপাস্বরে বলে ওঠে, ছিরিচরণ! আসিছিস, সোনা! কুসমির বুক থেকে নিশ্বাস পড়ে। বুক তার ঝড়ের মুখে গাছের ডালের মতো আছাড়ি-বিছাড়ি করে ওঠে। তার ছেলে শ্রীচরণের নাম ধরে ডেকে উঠেছে বুড়া। বুকের মধ্যে শ্বাস চেপে কুসমি বলে, কুনঠে তোমার ছিরিচরণ! তাই মামার কাছে। ইন্ডিয়ায়! আসিবে কোথা হতে? – তবে যে মুই আওয়াজ পাইলোম! – কী শুনিতে কী! – বারান্দায় তবে ও কাঁই কথা কয়? – কাঁইও নয়। জল দেমো? জল খাও। খায়া নিন্দো যাও। কুসমি জল গড়িয়ে দাদুর মুখে ধরে। না, দাদু আর জেগে নাই। ঘুমিয়ে পড়েছে। তখন শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখখানা মুছে দেয় কুসমি। চোখের সমুখে একের পর এক পুত্রের মৃত্যু দেখেছে হরিচরণ, অমলের মৃত্যু দেখেছে, একটা দেশ ভাগ হতে দেখেছে, জ্ঞাতিগুষ্টি ইন্ডিয়া পালাতে দেখেছে। আর কত শোকতাপ সহ্য করতে পারে একটা শরীর। অমল! অমলের কথা, স্বামীর কথা মনে হতেই কুসমির বুক হা হা করে ওঠে। দ্রুত মাথা নাড়ে সে। না! সে ভাঙবে না। কাঁদবে না! চোখের জল ঝরার সময় তার নাই। সে রান্নাঘরে যায়।
যখন চা নিয়ে আসে, দেখে কন্ট্রাক্টর সাইদুর রহমান খলখলে গলায় বলেন, আইসো, বড়ো দেরি করিলে চা বানাইতে। কুসমি বলে, চা খান। রাইত অধিক হয়া গেইছে। – অধিক! সাইদুর রহমান হেসে ওঠেন। বলেন, সেই কথা তো শ্যাষ হয় নাই। – কোন কথা? – ক্যান, সেই পাগলা সময়ের কথা। সেই যে পাটিশান হইলো, পাকিস্তান-হিন্দুস্থান হইলো, তার কথা তো ভোলো নাই। তবে শোনো, মঙ্গলবার হাটের দিন, এলাও মোর মনে আছে। নগদ বিয়া করিছো মুই তখন। পরিবারের প্যাটে বাচ্চাও আসিছে। ভরা মাস। দুই-এক সপ্তার ভিত্রেই বাচ্চা হইবে।
হাটে গিয়েছিলেন নবীন যুবক সাইদুর রহমান, উদ্দেশ্য গাভিন একটা ছাগি কিনবেন। সেকালে শিশুর জন্যে মায়ের দুধ ছাড়া আর কিছু নাই। এখনকার মতো বিলাতি দুধের টিন বাজারে অঢেল নাই কি একেবারেই নাই। মায়ের বুকের দুধ আর সময়ে শটির গুঁড়ো পানিতে গুলিয়ে খাওয়ানো। সাইদুর রহমানের ইচ্ছা নয় গরিব মানুষের মতো শটি খাওয়ানো। তার প্রথম বাচ্চা হতে যাচ্ছে, তারই জন্যে গাভিন ছাগির খোঁজ। মায়ের বুকের দুধ তো আছেই, ছাগির দুধ অবসরে অবসরে দেওয়া যাবে। সেই ছাগির খোঁজে হাটে যান সাইদুর রহমান। ছাগলের হাট বসে হাটের একপ্রান্তে, বাবা কুতুবুদ্দিনের মাজারের সিঁড়ির পাশে। ছাগির খোঁজ করবেন কী, হঠাৎ এক আজান পড়ে মসজিদে। এশা নামাজের সময় তখনো হয় নাই, এর মধ্যে আজান! কিসের আজান? হাটের মানুষ চঞ্চল হয়ে পড়ে। ঝড়ের সময় আজান দেওয়া হয়, অসময়ের আজান – আল্লা হে, ঝড় থামান! তারই কারণে আকুল আজান। কিন্তু কোনো ঝড় তো নাই। জ্যৈষ্ঠের মাঝামাঝি। ঝড়ের সময়। কিন্তু গত কয়েকদিন থেকে আকাশে মেঘের চিহ্নমাত্র নাই। তবে অসময়ে আজান কেন? তবে কি ভ‚মিকম্প? পায়ের নিচে মাটি দুলে উঠলে এমন আজান দেওয়া হয় বটে, কিন্তু পায়ের নিচে মাটি তো মাটির মতোই নিষ্কম্প নির্বিকার। তবে?
বাবা কুতুবুদ্দিন মাজারের খাদেম সাহেবকে দেখা যায় সিঁড়ির মাথায় এসে দাঁড়াতে। দেখা যায় কি, তাঁর বুলন্দ গলার আওয়াজ পেয়েই হাটের মানুষ ফিরে তাকায়। দেখে, সিঁড়ির মাথায় খাদেমসাহেব দাঁড়িয়ে দুহাত গোল করে মুখের কাছে ধরে উচ্চস্বরে বলছেন, পাকিস্তান! পাকিস্তান! মুহূর্তের মধ্যে হাটের কলরব স্তব্ধ হয়ে যায়। খাদেম সাহেব বলতে থাকেন, এই মাত্তর খবর হয়, ইংরাজ ঘোষণা দিছে, পাকিস্তান হইবে! হামার নজির মিঞাকে ডাকি হাকিম সাহেব জানাইছে, পাকিস্তান মানি নিছে ইংরাজ! আল্লার দরবারে শুকরানা নমাজ হইবে বাদ এশা। শুকরানা নমাজ! বাদ এশা! পাকিস্তান! পাকিস্তান!
কুসমিকে কন্ট্রাক্টর সাইদুর রহমান বলে চলেন, গেইলো হামার ছাগি কেনা! হাটের মানুষ চঞ্চল হয়া পড়িলো। পাকিস্তানের দাবি ইংরাজ মানি নিছে, ইয়ার পরে ফুর্তি আর দ্যাখে কাঁই। যুবকেরা টিনের চোঙা ধরি ফুকাইতে লাগিল। হিন্দুর সমাজে চিন্তা বাধি গেইল। যাওবা আশা ছিল, জিন্নার কথা ইংরাজ না মানিবে, তামাম মুলুকে হিন্দুস্থান হইবে – ভাসি গেইল! মুঁইও খুশির খবরটা বাপজানকে দিবার জইন্যে ছুটি আসিলোম বাড়িতে। আসিয়াই তো মাথায় হাত! পরিবারের গব্ভোপাত হয়া গেইছে। সেই যে বাচ্চার জইন্যে আগাম ছাগি খরিদ করিতে যাই – শ্যাষ! প্যাটের বাচ্চা পড়ি গেইছে। ব্যাটা হবার কথা ছিল। চিন্নও ছিল ব্যাটার। নাশ হয়া গেইল। তাকে নিয়াই বাড়ির মানুষ শোরগোল করিতে লাগিল। বাপজানকে আর পাকিস্তানের সম্বাদ দেওয়া হইল না। তার বাদে পাকিস্তানও সময়কালে দুই মাসের মাথায় হয়া গেইল। কাছারির মাঠে হাকিম সাহেব পাকিস্তানের নিশান উঠাইল। হিন্দুঘরের আশা ছিল জলেশ্বরী পড়িবে হিন্দুস্থানের ভাগে, পড়িল পাকিস্তানে। পড়িলো তো পড়িলো, আধখাবলা হয়া পড়িলো। জলেশ্বরী পাকিস্তানে, আর জলেশ্বরীর নদী আধকোশা পড়িল হিন্দুস্থানে ইন্ডিয়ায়। বোঝেন তবে? বোঝেন! টাউন পাকিস্তানে, টাউনের নদীখান গেইল হিন্দুস্থানে! আর সেই নদীর পাড়ে স্তব্ধ মারি খাড়া হয়া রইলেন মইনুল হোসেন মোক্তার। তার চোখের না পলক পড়ে! এই নদী তবে আর হামার নয়! হিন্দুস্থানের!
মইনুল হোসেন মোক্তারকে দেখা যায় জলেশ্বরীর পথেঘাটে। দিনের পর দিন। উদ্ভ্রান্তের মতো মইনুল হোসেন বাজারে হাটে দোকানে কাছারিতে ঘোরে। কোনো উদ্দেশ্য নাই, দিক নাই, দিশা নাই, কেবল একটি জিজ্ঞাসা তার মুখে। নদী তবে আমার নয়? আধকোশা আমার নয়? নদী তবে কার? কার এই নদী শহরের পাশ দিয়ে বহে যায়? – কুসমি রে, মোক্তারের সেই বুকভাঙা সওয়ালখান আইজো মুই কানে শুনিবার পাঁও। আইজো সেই সওয়াল হামার কানে আসি ধাক্কা মারে – নদী তবে হামার নয়? নদী তবে কার? উন্মাদে বা হয়া যায় মোক্তার। জনে জনে ধরি সে পুছ করে, তবে কার জইন্যে এত খাটিলাম? কোন নদীতে বাঁধ দিবার জইন্যে ইংরাজের দরবারে দরখাস্ত করিলাম? কোন নদীকে শাসন করিতে হামার দিন-রাইতের ঘুম মুই হারাম করিছিলোম হে! দেবদত্ত মোক্তার তাকে ধরি নিয়া মাথায় পানি ঢালে। নজির মিঞা তাকে চোখ গরোম করি কয়, নদী না পাইছেন তো কী হইছে? মাটি তো পাইছেন? মইনুল হোসেন পালটা চোখ রঙা করি তাকে কয়, মাটি? মাটিই বা কী পাইছেন? এক খাবলা এদিক পাইছেন তো বড় খাবলা ওইদিক গেইছে। হামার দ্যাশ কুত্তায় ছিড়ি খাইছে! তখন নজির মিঞা হাসপাতালের ডাক্তারকে ডাকি কয়, পাগলের পায়ে ছিকোল দিয়া বান্ধি রাখেন!
কন্ট্রাক্টর সাইদুর রহমান দুঃখের কথাটা বলেন বটে, কিন্তু তার মুখ থেকে হাসির দমকাটি ধরেই তিনি বলে চলেন কুসমির কাছে। – হাসি ক্যানে? কুসমি, হাসির কথা তবে আরো শোনো। পাগলা সময় কইছিলোম না? পাগলা সময়ের শুরু ক্যাবল। পাকিস্তান তো হইলো। পাকিস্তানের নিশানও উড়িলো। দুইদিন পরে ঈদের জমাতে বাবা কুতুবুদ্দিনের মাজারের খাদেম ঈদের নমাজে ইমামতি করিলো। লম্বা একখান মোনাজাত হইলো। মোনাজাতের শ্যাষে ওই ঈদের মাঠেই টাউনের গরিব মানুষের জইন্যে খিচুড়ির পাত পড়িলো। কলাপাতা সানকি খোরা ধরিয়া কত মানুষ খায়া আল্লার কাছে দোয়া মাঙ্গিলো। মুসলিম লীগের নজির মিঞা টাউনের রাস্তায় রাস্তায় বাজনা নামাইলো ঈদের দিন। পাকিস্তানের পয়লা ঈদ! আর হিন্দুর নেতা রাজেনবাবু কইলে, আচ্ছা, পাকিস্তান হইছে তো কী হইছে, কোন কলারঝাড় নাশ হইছে! নাশ হইছে কী হয় নাই, বছর না ঘুরিতেই দেখা গেলো। টাউনের হিন্দুরা একে একে কুচবিহার যাত্রা করিলো। বডারের ওপারে দীনহাটা। দীনহাটায় গেইলো তারা। কাঁইও বা কলিকাত্তা গেইলো। এদিকে জলেশ্বরীতে আসিতে লাগিলো কাটিহার বিহার থেকে বিহারিরা। তারা হিন্দুর ছাড়া বাড়িতে সংসার পাতি বসিলো। তবে সে সকল আরো পরের কথা। তার আগে বয়ান শোনেক কুসমি! এ বড় পাগলা কথা। পাকিস্তানের নিশান উড়িবার এগারো দিন পরে, আধকোশা নদীর পাড়ে মইনুল হোসেন মোক্তারের স্তব্ধ মারি খাড়া হয়া থাকার এগারো দিন পরে, ওয়াহেদ ডাক্তারের জলেশ্বরী ছাড়ি হরিষাল রওনা হওয়ার এগারো দিন পরে, ঠিক এগারো দিনের মাথায় মহকুমার হাকিম নেয়ামতউল্লাহর কাছে সম্বাদ আসিলো, এক আচানক সম্বাদ! হামার জইন্যে খুশির সম্বাদ! কী? না, ভুল হইছে! ভাগাভাগিতে ভুল হইছে ইংরাজের। আধকোশা যে হিন্দুস্থানে দেওয়া হইছে, ভুল! আধকোশা থাকিবে পাকিস্তানে! পাকিস্তান পাইবে আধকোশা! আধকোশাই ক্যাবল নয়, হস্তিবাড়ি মান্দারবাড়ি ইস্তক হরিষাল পরযন্ত পাকিস্তান! ব্যাপারখানা কি বুঝিলু রে কুসমি!
আমরা মইনুল হোসেন মোক্তারকে দেখে উঠি। ওই সে বাজারে বাজারে দোকানে দোকানে কাছারির জামতলায় কি মোক্তার লাইব্রেরি, উকিল লাইব্রেরিতে জনে জনে উন্মাদের মতো জিগ্যেস করছে, নদী তবে কার? নদী তবে কার? হাহাকার করে বলছে, আধকোশা আমার নয়! আধকোশা আর আমার নয়! চিৎকার করে উঠছে, আধকোশা তবে কার? মনের মধ্যে কিছুতেই তার মীমাংসা নাই নদী কী করে পর হয়ে যায়, কী করে এক মুহূর্তের মধ্যে, ইংরেজের একটা ঘোষণা হওয়া মাত্র, নিজের একটা জিনিস পর হয়ে যায় – মুখে তার গ্যাঁজলা উঠে যায়, টাউনের লোকেরা তাকে পাগল বলে সাব্যস্ত করে ওঠে, সখেদে তারা বলে ওঠে – আহা, এমন মানুষটা উন্মাদ হয়া গেইলো হে! কিন্তু তারাও কি মনে মনে লোকটার জন্যে সহানুভ‚তি ধরে ওঠে না? তারা কি দ্যাখে না যে, লোকটা তাদেরই মনের কথাটা অবিরাম উচ্চারণ করে চলেছে! তাই তারা আহা-উহু করে না। বাজারের লোক তাকে ডেকে এনে চা-দোকানে বসায়। – বইসেন তোমরা, এক কাপ চা খায়া শান্ত হন। না, শান্তি নাই মইনুল হোসেন মোক্তারের। চা সে খায়, কলাটা-বিস্কুটটাও সে খায়, আবার উঠে দাঁড়ায়। আবার অবিশ্রান্ত সে হাঁটতে থাকে। আবার সে আধকোশার পাড়ে যায়। আবার নদীর দিকে খর চোখ পেতে সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে থাকে। বয়স্ক মানুষের সহানুভ‚তি যতই থাক, বালকেরা তো বালক! তাদের হাত নিশপিশ করে। তাদের হাতে ঢিল ওঠে। তারা ঢিল ছোড়ে। মইনুল হোসেনের গায়ে ঢিল পড়ে। আঘাতকে সে আর আঘাত বলে গণনা করার মতো সুস্থতায় নাই। আমাদের চোখে পানি চলে আসে।
আমরা খবরটা পেয়ে খুশিতে লাফ দিয়ে উঠি। ইংরেজের ভুলের কারণেই তবে ঘোষণা হয়েছিল যে, আধকোশা নদী পাবে হিন্দুস্থান। এখন তবে আধকোশা আর হিন্দুস্থানের নয় – পাকিস্তানের। পাকিস্তান হবার এগারো দিনের মাথায় এই ভুল সংশোধন হবার খবরে জলেশ্বরীতে আনন্দের উল্লাস বহে যায়। নজির মিঞার টাকায় মুসলমান যুবকদের দল আধকোশার বুকে নৌকার বহর নিয়ে নামে। বর্ষার ঢলে নদীর বুকে তখন ঢল। সেই ঢলের ওপর রঙিন পাল তোলা নৌকার বহর ছোটে। ছিপনাওয়ের বাইচ শুরু হয়। রাতে বাতির বগর নামে। কলাপাতার ডোঙায় মাটির প্রদীপ জ্বেলে নদীর বুকে ভাসিয়ে দেয়, আলোর মিছিল বয়ে যায়। আকাশ নিনাদিত হয়ে ওঠে পাকিস্তান জিন্দাবাদ ধ্বনিতে।
অন্য এক হাহাকার ধ্বনিত হতে থাকে মইনুল হোসেন মোক্তারের মনে। হাহাকার? আমরা থমকে যাই। হাহাকার কেন? মইনুল হোসেন মোক্তার কি খুশি নয় আধকোশা নদীর পাকিস্তানে ফেরত আসার ঘোষণা শুনে? এই তো সেই নদী, বর্ষায় সেই উত্তাল নদী, পাহাড়ি ঢলে বাঁধ না মানা নদী, টাউনের বাড়িঘর গরাসে গরাসে গিলে খাওয়া নদী, জমি মাটি ভিটা খেতে খেতে ব্রহ্মপুত্রের দিকে ধাবমান নদী; এই নদীকে বাঁধ দিয়ে শহর রক্ষার জন্যে একাই সংগ্রামে নামা মানুষ যে মইনুল হোসেন, যে মইনুল হোসেন পরিবারের কথা ভুলে গিয়ে, নদীর মুখে বিলীন হওয়া ভিটার বদলে নতুন ভিটা স্থাপন করার কথা মোটেও মনে না এনে শহরবাসীকে এক কাতারে আনার জন্যে একাই উদ্যোগ নিয়েছিল, যে মইনুল হোসেন পুলিশ ঠেলে বাংলার ছোটলাট লর্ড কেসির সমুখে দাঁড়িয়েছিল আর শহরবাসীর দরখাস্ত তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিল; আর, যে মইনুল হোসেন আধকোশা হিন্দুস্থানে চলে যাওয়া দেখে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল, তার তো খুশি হয়ে ওঠার কথা আধকোশা আবার পাকিস্তানে চলে আসার কথা শুনে। তবে তার বুকে হাহাকার কেন?
সাইদুর রহমান কন্ট্রাক্টর চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে কুসমিকে বলেন, পান নাই ঘরে? – পান? পানের অভ্যাস তো নাই। কাঁচা গুয়া আছে, দেমো? – দ্যাও! বলে হাত বাড়ায় সাইদুর রহমান, যেন গুয়া হাতে করেই বসে আছে কুসমি। হাতটা তার কুসমির হাতে ছোঁয়াছুঁয়ি হয়ে যায়। মুহূর্তের জন্যে বিবশ হয়ে যায় তাঁর ভেতরটা। যুবতী নারীর স্পর্শ। কুসমি সুপারি আনতে ভেতরে যায়। তার চলে যাওয়া শূন্যস্থানটির দিকে তবু চোখ পড়ে থাকে কন্ট্রাক্টরের, যেন যুবতী এখনো সেখানেই বসে আছে। শরীরের ভেতরে পাক দিয়ে ওঠে তার। কিন্তু আজ এখন এসব তিনি প্রশ্রয় দিতে চান না। আজ এখানে আসা তাঁর আরো গভীর একটা উদ্দেশ্যে। যতক্ষণ তিনি কথাটা না ভাঙছেন, আমরা অপেক্ষা করব।
কুসমি ভেতরে গিয়ে ছিকার ওপরে রাখা মাটির ভাণ্ড থেকে দু-টুকরো কাঁচা গুয়া হাতে নেয়। হরিচরণের বিছানার কাছে আরেকবার গিয়ে দেখে ঘুমোচ্ছে কিনা। হ্যাঁ, ঘুমোচ্ছে। ঘড়ঘড় করে শব্দ হচ্ছে গলার কফের। কুসমি বারান্দায় ফিরে আসে। কন্ট্রাক্টরের হাতে কাঁচা গুয়া তুলে দেয়। তিনি অচিরে তা মুখে দেন না, হাতেই ধরে রাখেন। গ্যালগেলে গলায় বলেন, সুন্দরীর হাতে কাঁচা গুয়া খাওয়ার ভাইগ্য কয়জনার হয়! – ওগুলা কী কথা কন! – না, কই আর কি! – মোর ভালো না লাগে। হাউস লাগে তো ঘরের পরিবারের হাতে গুয়া মাঙি খান! – তার বয়স গেইছে! বলে দীর্ঘ একটা নিশ্বাস ফেলেন সাইদুর রহমান। অচিরে যোগ করেন, পরিবারের হাতে গুয়া আর তোমার হাতের গুয়া কি এক হয়! তোমার সোয়াদে আলাদা! তখন কুসমি বলে, যে-কথা কবার ধইরছেন, কন। নয়তো হামার নিন্দ ভাঙি আসে। ঘরে যাঁও। কন্ট্রাক্টর সাইদুর রহমান তখন হাঁ-হাঁ করে ওঠেন। – গপ্পো তো শ্যাষ হয় নাই। পাগলা সময়ের কথা আরো খানিক আছে। কহিলে বিস্তর! শোনো তবে, আধকোশা পাকিস্তানে ফিরত আসিলো এগারো দিন পরে, আবার যায়া নদীর পাড়ে খাড়া হইলো মইনুল হোসেন মোক্তার। নউতন এক পাগলামি তার উপরে ভর করিলো তখন। নতুন পাগলামি? এ কথা শুনে কুসমির মতো আমরাও কৌত‚হলী হয়ে উঠি।
আধকোশার পাড়ে মইনুল হোসেন মোক্তার। আধকোশা! আবার তবে আমার! মইনুল হোসেন পলকহীন চোখে তাকিয়ে আছে নদীর দিকে। বর্ষার নদী। পাহাড়ি ঢলও নেমেছে দিনকয়েক আগে। নদীর পানি পাটল রং। কী ক্রুদ্ধ রং! নদীর বুকে ঘূর্ণি। গোগাড়ির চাকার মতো ঘুরছে। ঘূর্ণির কেন্দ্রে গর্ত হয়ে যাচ্ছে। ডাক উঠছে নদীর। মাথার ওপরে তেজি সূর্য। দুপুরের সূর্য। পাটল পানির বুকে রোদের তীব্র বিচ্ছুরণ। তাকানো না যায়। তাকালেই চোখ বুঁজে আসে আলোর তীব্রতা সহ্য করতে না পেরে। কিন্তু মইনুল হোসেনের চোখে পলক পড়ে না। এই তবে নদী! আমার ছিলো! পর হয়ে গিয়েছিল। আবার আমার হয়েছে। আবার ফিরে এসেছে আমারই কাছে? কিন্তু – কিন্তু – মইনুল হোসেনের মনে হাহাকার হয়ে প্রশ্ন আছড়ে পড়ে – সেই একই নদী কি? সেই একই নদী ফিরে আসে?
কয়েকদিনের ব্যবধানে সে কি নষ্ট হয়ে যায় নাই? যেমন নারী নষ্ট হয় ধর্ষিতা হলে?
কন্ট্রাক্টর সাইদুর রহমান বলেন, কুসমি, জটিলতাখান একবার মালুম করিয়া দ্যাখ। নদীকে বলা হয় নারী। তাই সে নদী। ব্রহ্মপুত্রকে বলা হয় নদ, পুরুষ ব্যাটা তাঁই। আধকোশা যে নদী, নারী বলিয়াই তাকে যে নদী বলা হয়, সেই নারী তবে হিন্দুর ভোগে গেইছিলো, ফিরি যে আসিলো ফির হামারে ঘরে, কুমারী তো না ফিরিলো! আধকোশা তবে নাপাক হয়া ফিরি আইসছে! তবে কেমন করি তাকে ফির হামারে নদী বলা যায়! কুসমি অস্ফুটস্বরে বলে, আপনার মনে পাপ! – কী কইলে? – পাপ! ওগুলা পুরুষব্যাটার কথা হয়, কন্ট্রাক্টর সাব। পুরুষ বলিয়াই নারীর রূপে নদীকে তোমরা দ্যাখেন। পাপ মোক্তারেরও, তাঁই যে ব্যাটা ছাওয়া। নদী ফিরি আইসছে তোমার পাকিস্তানে, খুশি হন! নদী নষ্ট হয় কি করি? কুসমি আরো খানিক এগিয়ে বলে, তবে তো আমার ঘরেই আপনার না আসিবার কথা! মুইও তো নষ্ট। আপনার কারণে। সাইদুর রহমান দম নিয়ে মাথা নেড়ে বলেন, আমার কারণে? – হয়, হয়। আপনে যদি মোর সম্পত্তি মোর ব্যাটা ছিরিচরণের সম্পত্তি এই বাড়িঘর জাগাজমি না কাড়িতেন না ভোগদখল করিতেন, তবে তো মোর নষ্ট হবার কথা ছিলো না! এ-কথা শুনে অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকেন সাইদুর রহমান। স্তব্ধ, কিন্তু মুখে তার মিটিমিটি হাসি। সে হাসির বিপরীতে কুসমিও আবছা হাসি ফুটিয়ে বসে থাকে তাঁর দিকে তাকিয়ে। যেন দুজনের মধ্যে একটা প্রতিযোগিতা চলে, কে কাকে হারাতে পারে ঘটনার গভীরে পরিহাস ওজনের দ্বন্দ্বে।
নীরবতা ভেঙে সাইদুর রহমান বলেন, পালটা একটা প্রশ্নই করে বসেন, আর তুই যে বড় বড় অফিসারের বিছনায় গেইছিস, এলায় ডাক দিলে যে ফির যাইবি, আমার কারণে? না তোর নিজের ইচ্ছায়? কুসমি সময় নেয় না উত্তরটা দিতে। বলে, সেও আপনারে কারণে। যদি বিছনায় যায়া থাকি, গেইছি সম্পত্তি উদ্ধারের কারণে। সরকার যারা চালায়, তাদের বিছনায় শুতিয়াও যদি সম্পত্তি উদ্ধার করিতে পারি, তারে কারণে। আপনে মোর ছিরিচরণের সম্পত্তি যদি দখল না করিতেন, তবে হামার ঠ্যাকা কি থাকিতো নষ্ট হইতে? পালটা সাইদুর রহমান বলেন, যুবতীর শরীলের খিদা মোর জানা আছে। বিছনায় গেইছিস খিদার কারণে, কুটকুট করিয়া শরীল তোর ভাঙে, বিদোবা তুই শরীল জুড়াইতে গেইছিস, শরীলের কারণে, তোর সম্পত্তির কারণে নয়! কুসমি উঠে দাঁড়ায়, বলে, আপনে এলা যান। আপনের মুখে তুই শুনিতে চাঁও না। মুই আপনের কোনো তুই-মুই নও! – আরে! আরে! বলে কুসমির হাত ধরে তাকে মোড়ার ওপরে বসান কন্ট্রাক্টর সাইদুর রহমান। – আউ, আউ, গোশা হইস ক্যানে! বইসেক! কথা মোর ফুরায় নাই। তোর সম্পত্তি তোরে আছে। মোক্তারের কথা থাউক। ওয়াহেদ ডাক্তারের কথা তো এলাও শুনিসই নাই। বইসেক। পারিলে, আরেক কাপ চা বানেয়া আন। – না! আর চা হবার নয়! রাইত অধিক! দাদুও উঠি পড়িবে।
হরিচরণের কথা মনে পড়ে যায় সাইদুর রহমানের। কী গালাগালটাই না তখন করেছিলো হরিচরণ তাঁকে। গায়ে মাখেন নাই তিনি। বড় একটা আমোদ বলেই গ্রহণ করেছিলেন। নদীর পাড়ে হিন্দুর সম্পত্তি। লাখ লাখ টাকা মূল্য তার। আর, হরিচরণ যতদিন জীবিত আছে, সম্পত্তি তো হরিচরণেরই। হরিচরণের ছেলে শ্যামাচরণ সাপের দংশনে মারা গেছে, সম্পত্তির মূল মালিকানা হরিচরণের কাছেই ফিরে এসেছে। শ্যামাচরণের মেয়ে কুসমি, কিন্তু হিন্দুর বিধানে কন্যা নয় সম্পত্তির মালিক। কুসমির স্বামী অমল যে ছিল, সেও মালিক নয় সম্পত্তির। অমল মরে গেছে, তার বেঁচে থাকাতেও সম্পত্তি তার হতো না। আর ছিল শ্যামাচরণের দুই ভাই, হরিচরণের ছেলে – তারাও তো ইন্ডিয়ায় আর বেঁচে নাই বলে শোনা যায়। তবে হ্যাঁ, অমল আর কুসমির ছেলে একটা আছে। শ্রীচরণ! সেই কথাটা নিয়েই কন্ট্রাক্টর সাইদুর রহমান আজ এসেছিলেন কুসমির কাছে। বিষয়টা উত্থাপন করার আগে কুসমির মন গলাবার জন্যে তিনি দেশভাগের গল্পটা শুরু করেছিলেন, এখন সব ভণ্ডুল হয়ে যায় দেখে তিনি হাত ধরে ফেলেন কুসমির, টেনে বসান। বলেন, আসমানে এলাও আদমসুরাত ঢলি পড়ে নাই। রাইতের কী এমন অধিক! পাকিস্তান হবার দিনে কাছারির মাঠে হাকিম উড়াইলে পাকিস্তানের নিশান। আর ওয়াহেদ ডাক্তার গেইলো নদীর পাড়ে। খেওয়ার মাঝিকে ওয়াহেদ কয়, চলেক। মাঝি বলে, সবুর করি যাই, আরো যাত্রী আসিবে! – যাত্রীর গুষ্টি মারো মুঁই। নদীর এপারে আইজ হতে পাকিস্তান, ওপারে হিন্দুস্থান, খবর রাখিস? পার হতে কাঁই আসিবে! – কন কী তোমরা? পাকিস্তান এপারে হিন্দুস্থান ওপারে? – হয়, হয়। পাকিস্তানেরও গুষ্টি মারো মুঁই। জিন্নাহ্র পুটকিতে আছোলা বাঁশ। গান্ধীর পুটকিতেও। আর ইংরাজের ঝাঁই রাজা, তার মায়েকে চোদং মুঁই। চল্্ হামাকে নিয়া আইজ একায় মুঁই প্যাসেঞ্জার। দ্যাখ আজাদি কাকে কয়! আজাদি তো মোর হাতে।
কুসমি বলে, এই কথা তো আগোতে কইছেন কন্ট্রাক্টর সাব। নয়া আর কোন কথা? – নয়া তবে শোনেক। হরিষাল যায়া ঘোষণা দিলে ওয়াহেদ ডাক্তার, মুই হেথায় এলা রাজা। এই রাইজ্য হামার। তার বাদে -। কুসমি বাধা দিয়ে বলে, হেই প্যাচালও মোর শোনা হয়া গেইছে। – শোনেক তবে, বাকি আছে আরো! (চলবে)

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার