পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় : অব্যর্থ বীজভূমির সংজ্ঞা ও নির্মিতি

লেখক:

শহীদ ইকবাল
সব্যসাচী সৈয়দ শামসুল হক মারা গেলেন। বাংলাদেশের সাহিত্যে তিনি সব্যসাচী লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেলেও তাঁর কাব্যনাট্য সংগ্রহ তাঁকে অন্যমাত্রায় প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল – সফল আঙ্গিক নিরীক্ষা এবং ব্যক্তি-বাস্তবতার ইঙ্গিতকে আধুনিক সমুন্নতিতে প্রকাশের গুণে। কাব্যনাট্য আধুনিক সাহিত্য-আঙ্গিকের পর্যায়ভুক্ত; বিশেষত বাংলাদেশের সাহিত্যের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিক্রিয়াশীল পুঁজিবাদী সমাজবাস্তবতায় ব্যক্তির বিনাশ ও ক্ষয় নিরূপিত করণকৌশল এতে প্রযোজ্য। যে জটিল যুগবাস্তবতা ব্যক্তিমানুষকে তৈরি করে, সেখানে তার চাওয়া না-চাওয়া, পাওয়া না-পাওয়া, স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন, আশা-আশাভঙ্গ, নৈরাশ্য-ক্লান্তি-হতাশা, মূল্যবোধহীনতা, বর্তমান-ভবিষ্যতের সমস্যা ও সম্ভাবনা ইত্যাদি অনেকানেক বিষয় প্রতিশ্রুতি ও প্রভাবনার রেখাচিত্রের বিনির্মাণ থাকে। আর তাতেই অনিবার্য এ চৌম্বক-আকর্ষণীয় আঙ্গিকের। এক্ষেত্রে শিল্পীর নির্বাচনে, সাহিত্যের প্রাচীন আঙ্গিক কবিতার যেমন কোনো বিকল্প নেই, তেমনি অপরপক্ষে কবিতার বহুব্যাপ্ত মাত্রিকতায় নাটক বা তার নাটকীয়তাকে সম্পূরক-বোধে উপস্থাপনের প্রয়াস অভিমুখ হতে পারে। পৃথিবীর সমস্ত সাহিত্যে এ-প্রবণতা দুর্নিরীক্ষ্য নয়। ‘Poetry is essentially dramatic and the greatest poetry always moves toward drama, drama is essentially poetic and the greatest drama moves towards poetry.’ মানবজীবনের অনিবার্য সূত্রকে রূপায়ণের প্রচেষ্টা কালে কালে নানা প্রয়াসে সংঘটিত হয়েছে; আর সমাজ বিবর্তনের পটভূমিতে ইতিবাচক ইঙ্গিতগুলো সৃষ্টিনিরীক্ষায় তাৎপর্যময় আবহ রচনা করেছে। কাব্যনাট্য আধুনিক সময়ের সৃষ্টি, একটি আধুনিক ফর্ম; ইউরোপীয় সাহিত্যে টি. এস. এলিয়ট (১৮৮৮-১৯৬৫) এর প্রবক্তা। এ প্রসঙ্গে মার্ডার ইন দ্য ক্যাথিড্রাল (১৯৩৫) লেখার দুবছর পূর্বে ১৯৩২-৩৩ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বক্তৃতায় এলিয়ট বলেছিলেন, ‘The ideal medium for poetry, to my mind, and the most direct means of social usefulness for poetry, is the theatre … For the simplest auditors there is the plot, for the more literary the words and phrasing, for the more musically sensitive the rhythm, and for auditors of greater sensitiveness and understanding a meaning which reveals itself gradually…’ এলিয়টের এ-প্রসঙ্গ ধরে সমালোচকরা কাব্যনাট্য প্রসঙ্গটি বিস্তৃত করতে গিয়ে বলেছেন : : `Poetic drama brings into being in a concrete form a particular way of looking at the world. It is not the illustration of a philosophy, but it will leave its audience with the feeling that they have been in the presence of an ordered world in which certain eternal laws obtain, in which people display certain characteristics and are worked on by certain emotions.’বস্তুত কাব্যনাট্য বিস্তৃত ব্যঞ্জনায় প্রখর ও অনিবার্য সমস্যাকে আবেগের মধ্যে গ্রন্থনের নিরলস প্রয়াস। তবে এ-চেষ্টা শুধু লক্ষ্যাভিসারী শিল্পসিদ্ধির তৎপরতা নয়, এখানে ব্যক্তি মানুষের ঐতিহ্য, অধ্যাত্ম চিন্তা, পূর্বাপর ইতিহাস কিংবা প্রাসঙ্গিক অতীত-বর্তমানের যোগসূত্র, রাষ্ট্র থেকে শুরু করে সংসার-পরিবার সম্পর্কযোগ্য ইত্যাদি বিস্তারিত অনুষঙ্গকে চৈতন্যের ভেতরে প্রবিষ্ট করে। এবং তা উপস্থাপন-প্রয়াসে থাকে ব্যক্তির অন্তর্জগতের সঙ্গে বহির্জগতের জটিল সময় আবর্তন চিন্তা। এক্ষেত্রে লেখকের কৌশলের (technique) বাস্তবায়নই পাঠকের অন্যতম অনুপ্রেরণা। কাব্যনাট্য নাটক ও কবিতার সমান্তরাল প্রয়াস। কাব্য ও নাটক কোনোটারই অধিক প্রাধান্য থাকবে না; দুটোর গ্রন্থনে একটি নতুন অবভাস ফুটে উঠবে এবং তা সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির ভেতরের জগতের সংকট। বৃহত্তর বা সামষ্টিক বিষয় নিয়ে কাহিনি গ্রন্থিত হলেও মূলত তার সংকট অভ্যন্তরের। জটিল মনোপৃষ্ঠে কাব্যনাট্য-সৃষ্ট দ্বন্দ্বে ঘটনাক্রম তৈরি করে। আর আকস্মিকতায় নাট্যক্রিয়ার আবহ রচিত হয়। কাব্যগুণ অবলম্বন করে কাব্যনাটকের প্রারম্ভ, প্রবাহ, উৎকর্ষ, আন্তঃক্রিয়া ও পরিণতির পর্ব নিরূপিত হলেও ধপঃরড়হ-এর শিল্প হিসেবে এখানে নাট্যপ্রয়াসের উগ্র উত্থাপন চোখে পড়ে না। কারণ, ব্যক্তির অন্তর্দ্বন্দ্ব, ব্যক্তির মনঃকষ্ট ও সংকট – তার আঁধার ও আলোর জগৎ, আন্তঃ ও বহিঃক্রিয়ার দ্বন্দ্ব, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধী রূপ – এসব বিষয় নিরন্তর ব্যক্তির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে। চৈতন্যের সক্রিয়তা ব্যক্তির জটিল মনস্তত্ত্ব, তার আশা-আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন-বাস্তবতা, মূল্যবোধ-মূল্যায়ন পরতে পরতে অতিশয় দ্বন্দ্বযুক্ত এক আবহ নিরূপণ করে। সেজন্যে কাব্যনাট্যে নাট্যদ্বন্দ্ব শান্ত, পরিমার্জিত এবং স্থির; কিন্তু তার ভেতরের জগৎ অত্যন্ত গতিশীল, গভীর নৈর্ব্যক্তিকতায় তার দ্বন্দ্ব গোটা আবহকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। কাব্যনাট্য সেজন্যেই স্বতন্ত্র ভাষায় উচ্চারিত। যে আধুনিক যুগ এবং প্রতিক্রিয়াশীল বাস্তবতায় কাব্যনাট্যের ফর্ম রচিত সেটা এখনকার সময়-সমীকরণে যথার্থ, সন্দেহ নেই।
দুই
‘কাব্যনাটক যদিও কাব্য ও নাটকের সমন্বিত রূপ, তবু অনস্বীকার্য যে তার চরিত্র যেমন সবটাই কবিতার নয়, তেমনি নাটকেরও নয়। কবিতার সূক্ষ্ম ব্যঞ্জনা এবং নাটকের দ্বন্দ্বময় বাস্তব একাঙ্গীকৃত হয়ে কাব্যনাটক এক স্বতন্ত্র শিল্প। তবু বলতে হয় যে, একজন কবিই কাব্যনাটকের সার্থক জনয়িতা হতে পারেন। পায়ের আওয়াজ-এ সৈয়দ হকের সাফল্য এই বক্তব্যের সমর্থন করে।’ বাংলাদেশে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় (১৯৭৫) কাব্যনাট্যটির অনেকবার সফল মঞ্চায়ন হয়েছে। কাব্যনাট্যের ভূমিকায় সৈয়দ শামসুল হক বলেছেন, ‘শিল্পক্ষেত্রে আমার আর এক সংসার নাটক’; এই নাটকের মধ্য দিয়ে শিল্পী তাঁর দর্শক-পাঠকদের বৈচিত্র্যের স্বাদ উপহার দেন – সময়ের সামাজিক আয়োজনকে দায়বদ্ধতায় উপস্থাপনের অবকাশ পান, আর এক্ষেত্রে প্রবহমান ঐতিহ্যকে খুঁজে নিয়ে পুনর্গঠনের প্রয়াসে লেখক বেছে নেন স্বতন্ত্র আঙ্গিক। সৈয়দ শামসুল হক বৃহত্তর ও ব্যাপক মানুষকে তুলে আনেন ভিন্নধর্মী এক ভাষার মধ্য দিয়ে; তড়িৎপ্রবাহের মতো এ-ভাষা ভূ-সংলগ্ন মানুষের নৃতত্ত্ব-ইতিহাস-সংস্কার-পুরাণ প্রসঙ্গকে বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনায় প্রতœদর্শনে দর্পিত করে তোলে, কবির বিম্বিত সত্তা তীব্র শ্লেষে কার্যকর প্রণোদনা সৃষ্টি করে। কাব্যনাট্যের এ-ভাষা কবি সৃষ্টি করেন তপ্ত অভিজ্ঞতায়; তাঁর দৃষ্টিকোণ(point of view) সমাজ-সংস্কৃতিকে অবিকল বাস্তবতায় উপস্থাপিত করে। তাঁর এ-উপস্থাপনক্রিয়া শুধু কাহিনিনির্ভর বা স্বয়ম্ভু চরিত্র-নির্মাণ প্রবণতায় নয়, একটা সমগ্র সচল সমাজের সুপ্ত-স্থির শায়িত পৃষ্ঠদেশে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি লেপনে গভীরতাকে চিহ্নিত করে সক্রিয় ও প্রচ্ছন্ন বাস্তবতাকে নিরীক্ষা করে; এবং নিশ্চিত অর্থে সে অন্তর্জগতের (inner world) মূল্যবোধ, স্বপ্ন, আকাক্সক্ষা, হতাশা, স্বপ্নভঙ্গ, অবক্ষয়বৃত্তি ইত্যাদির জটিল
সূত্র-সম্ভাবনাকেও ভাষার বুননিতে তুলে আনে। ‘Technique is the only means he has of discovering, exploring, developing his subject, of conveying its meaning, and, finally, of evaluating it…’ এ কৌশলী প্রক্রিয়ায় কাব্যনাট্য আধুনিক যুগের আধুনিক মানুষের জটিল সময়-সন্ধানের চিত্রার্পণ এবং সেখানে সেই বাস্তবতা-অনুষঙ্গী ভাষার প্রয়োগকে অবশ্যম্ভাবী বলে বিবেচনা করে থাকে। এক্ষেত্রে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় কাব্যনাট্যের উদ্দিষ্ট আকর আমাদের জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গোটা দেশ – বাংলাদেশ আর স্বপ্নালু প্রবহমান মানুষের স্রোত; যেখানে তাঁর স্বপ্ন ও সম্ভাবনা বাস্তবতার তীব্রতায় প্রতিফলিত। ‘আমি লক্ষ্য না করে পারি না যে, আমাদের নাট্যবুদ্ধিতে কাব্য ও সঙ্গীতই হচ্ছে নাটকের স্বাভাবিক আশ্রয়’ – এমন শিল্পচিন্তার ভেতর দিয়ে মুক্তিসংগ্রামে লিপ্ত জঙ্গমী মানুষের স্বপ্নচিন্তা কাব্যনাট্যে প্রতীকায়িত উদ্ভাসন চলতে থাকে। পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় কাব্যনাট্যের বিষয় ও আঙ্গিকের বৈশিষ্ট্যও নিরূপিত হয় এমন শিল্পবীক্ষার বৈচিত্র্যের মাত্রা যাচাইয়ের প্রয়াস থেকেই।

তিন
কাব্যনাট্যের কাহিনিতে গ্রামবাসীর উচ্চারণে নাটকের এক্সপজিশনে সময় ও সমাজের ভয়াবহতাকে নির্ণয়ের প্রবণতা পরিলক্ষিত। পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকে ভয়াবহ রূপের যে-প্রতিবেশ চিত্রিত হয় তা আটষট্টি হাজার গ্রামের সাধারণ মানুষের। মুক্তিসংগ্রামী মুক্তিযুদ্ধের মানুষগুলোর চেয়েও এখানে বড় হয়ে উঠেছে পুঁজিবাদের প্রতিক্রিয়াশীলতার কোপানলে পড়ে পিষ্ট হওয়া কিছু মানুষের অন্তর্ভেদী আর্তচিৎকার – এ-চিৎকার যেন নিরাপত্তাহীনতার, এ-চিৎকার যেন নব্য সাম্রাজ্যবাদী তোষণ-সংশ্লিষ্ট প্রতিভূদের বন্দিদশা থেকে পরিত্রাণের। কাব্যনাট্যে মূল চরিত্র মাতবর হলেও গ্রামবাসী চরিত্রের আবহে বিস্তৃত জীবনযুদ্ধের এক ইমেজ সৃষ্টি হয় লেখকের দৃষ্টিতে। এ গ্রামবাসী আটষট্টি হাজার গ্রামের প্রতীক চিত্র। নানা বয়সী-মাপের গ্রামবাসীর উল্লেখে সৈয়দ শামসুল হক বলেছেন, ‘গ্রামবাসীর সংখ্যা প্রয়োজন অনুসারে নির্ধারিত করা যেতে পারে; তবে নারী-পুরুষ অবশ্যই বিভিন্ন বয়সের হতে হবে। নিম্নপক্ষে গ্রামবাসীর সংখ্যা কুড়ি হলে ভালো হয়। আমি অন্তত একজন বৃদ্ধকে কল্পনা করেছি যার বয়স একশত বৎসরের কাছাকাছি; একজন বৃদ্ধা যে অন্তত নব্বই।’ এমন নানাবয়সী গ্রামবাসী আসে ‘কালীগঞ্জ হাজীগঞ্জ থিকা’, ‘ফুলবাড়ি নাগেশ্বরী থিকা’, ‘যমুনার বানের লাহান’, আসতে থাকে শঙ্কিতচিত্তে, প্রবহমান স্রোতে ছাগল-মানুষ-কুত্তাচাটা থালার সমান একাকার উপমায়; নিঃশেষের ক্রন্দনে, আচ্ছন্ন অনুগ্রহের-নিগ্রহের আশায়। উচ্চারণে কাব্যের ভাষা :
সন্ধ্যার আগেই য্যান ভর সন্ধ্যাবেলা
কই যাই কি করি যে তার ঠিক নাই
একদিক ছাড়া আর কোনোদিক নাই
বাচ্চার খিদার মুখে শুকনা দুধ দিয়া
খাড়া আছি খালি একজোড়া চক্ষু নিয়া
মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে এ-গ্রামবাসী অনুগ্রহের ও আদেশের শিকার। সতেরো গ্রামের মাতবর তাদের দিকনির্দেশনা দেয়, ধর্মের চর্চা ও নিয়তির বিধান নির্ধারণ করে দেয়। মাতবর এখানে গ্রামপ্রধানই শুধু নয়, সর্বশ্রেণির জনমানুষের নির্দেশদাতা, মানুষের নিয়ন্ত্রণ শক্তির আধার ও উৎস মাতবর। লেখক মাতবরকে প্রবিষ্ট করেন সমাজ-সংলগ্ন বাস্তবতায় প্রতিটি মানুষের রক্তে-স্পন্দনে-অস্থিমজ্জায়। সংস্কারে-চিন্তায়-চৈতন্যে, মিথ-নৃতত্ত্বে অনিবার্যরূপে প্রত্যেকটি মানুষের অন্তর্জগতে ক্রিয়া করে মাতবর – মাতবর অসাধারণ হয়ে ওঠে গ্রামের মানুষের নির্ভরতার গুণে। নিশ্চয়তার-নিরাপত্তার কিংবা আহার-আনন্দের পটভূমিতে মাতবর উঠে আসে শক্তিশালীরূপে। দোর্দ-প্রতাপের মধ্যে মাতবর – পাইক ও পির-পরিবেষ্টিত হয়ে দীর্ঘায়ত সময়ে একদিকে সচকিত অন্যদিকে ধীরউদাত্তগুণে নাটকীয় আচ্ছাদনে মঞ্চে আবির্ভাব ঘটে। নাটকে আবির্ভাবের আবহ প্রতিপক্ষ – দুর্বল গ্রামবাসীর মুখে এক ধরনের তীব্রতা সৃষ্টি করে। কাব্যের কথনে নাটকীয় উত্তাপ বিচ্ছুরিত হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি হয় মাতবরের উপস্থিতিতে :
শোনো নাই মানুষের মরণ-চিৎকার?
আওয়াজ কি পাও নাই আগুন লাগার?
দ্যাখো নাই সেই তাপে নীল আসমান
ভোরের আগেই এক ভয়ানক ভোরের লাহান?
গ্রামবাসী একতাবদ্ধ হয়ে ‘জানতে চাই’, ‘বুঝতে চাই’, ‘শুনতে চাই’ – এসব ধ্বনি তোলে। পুনর্বার প্রয়াসে অনুমিত হয় গ্রামবাসীর ঝাপসা চোখে আলোকিত হচ্ছে; ধর্মান্ধতার পুঁজিতে ধর্মান্ধ সত্যকে অসত্য, মিথ্যাকে সত্য রূপান্তর অনন্তকাল করে চললেও আজ আর নয়। গ্রামবাসী সম্মিলিত প্রতাপে উঠে আসে। নাটকীয় অগ্রসরমানতায় গ্রামবাসী পূর্বোক্ত ভুলকে অস্বীকার করে, যুক্তিকে প্রাধান্য দেওয়ার শক্তি অর্জন করে। ঐক্য তাদের ভ্রান্তির অবসান দেয়। মাতবরের বিরুদ্ধে সাহসী করে তোলে। কাব্যনাট্যে যুবকের প্রথমদিকের একক প্রত্যয়ী স্বর এবার সমষ্টিতে পরিণত। ধর্মান্ধ মাতবর নির্বিশেষে ধর্মকে ব্যবহার করেছে জনমানুষের নিত্য কর্মকা-ে, মুক্তিবাহিনীকে ‘দখলদার’ বানিয়েছে, অকাট্য শ্লেষে মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে ভ্রান্ত মন্তব্য ছড়িয়েছে; ‘দেশদ্রোহী’ বানিয়ে মুক্তিসন্তানদের অপরাধী বানিয়েছে গ্রামবাসীর কাছে – প্রভুত্বই তাকে নিরবধি ইচ্ছাধীন করে তুলেছে। প্রথমত, মাতবরের প্রকা- ভাবমূর্তিতে গ্রামবাসী বিশ্বাস করলেও সত্বর তার ইচ্ছাধীন প্রবণতা নিয়ে সংশয় দানা বেঁধে ওঠে। মাতবরের দীর্ঘ সময়ের আস্থা ফুরিয়ে যায় মুক্তিবাহিনীর নিশানার ইঙ্গিতে। পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় মুক্তিবাহিনীর – এমন উচ্চারণ মাতবরের চিন্তাসীমায় প্রবিষ্ট হতে চায় না। নিরন্তর অস্বীকার করে অনিবার্য ইঙ্গিতগুলি। সামনে এগোনোর সময়, সত্যিকার মুক্তির প্রণোদনা, গতির প্রচ্ছন্ন রূপ, সভ্যতার ইঙ্গিত কেউ যেন রোধ করতে পারে না! কিংবা তার বিপরীতে কেউ দাঁড়ালে অনাস্থার মধ্যে পড়তে বাধ্য – সময়ের গতি রুদ্ধ করবে কে? মাতবর একটা পোশাকিরূপে উপস্থিত হয় এক সময় – আওয়াজ শুনতে পায়, পাড় ভাঙার শব্দ শুনতে পায় – কর্ণগোচর হয় প্রবহমান পরিবর্তনের প্রণোদনা। কিন্তু বিরুদ্ধ সবকিছু অস্বীকার করতে চায়। পূর্বাপর শক্তি ও অভিজ্ঞতায় স্বমূর্তিতে উদ্ভাসিত হতে চায়। জয়ী দেখতে চায় নিজেকে। তার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয় মুক্তিবাহিনীর জয়, অস্ত্রহীন মানুষ কী করে সশস্ত্র সৈন্যদের সঙ্গে যুঝতে যায় – প্রাণে আস্থা আসে না :
… সাধ্য নাই মুক্তিবাহিনীর
এতটুকু কানা ভাঙ্গে রূপার কলসীর
… … …
আরো শোনো, উড়া জাহাজের ঝাঁক ১০/২০/২৫ হাজার
চক্ক দিতাছে তারা, যদি বোমা মারে একবার
পিঁপড়ার মতো মারা যাবে মুক্তিবাহিনী তোমার।
মাতবরের এমন অস্বীকৃতি ও অনাস্থা ভেতরে-বাইরে দ্বন্দ্ব তোলে – চেতনার ওপর কাঠামো দুর্দাম মনে হলেও অন্তর-কাঠামোতে প্রচ- গতিশীল – আওয়াজ তোলে, কাঠিন্যের পরতে জটিলতা বাড়তে থাকে। একদিকে সামাজিক অবস্থান, পূর্বাপর প্রতিষ্ঠা, আড়ম্বরপূর্ণ প্রভাব অন্যদিকে সত্যের উদ্ভাসন – বিবেকের পরাকাষ্ঠা – মাতবরের মধ্যে এক ধরনের সামগ্রিকতা তৈরি করে। সামগ্রিক সত্যের অন্তর-বাহির প্রতিরূপে বিশ্বস্ত মানুষের আবাহনের ইঙ্গিত মেলে।
প্রধান চরিত্ররূপে মাতবরের ট্র্যাজিক পরিণতি স্পষ্ট হয় যখন নিজের মেয়ে ওই প্ররোচক-শোষকের শিকারে পরিণত হয়। নিজে যখন মেয়ের প্রশ্নের মুখে পড়ে, নিজে যখন বিবেক-বুদ্ধিতে নিজের সন্তানের ক্রন্দনধ্বনি শুনতে পায় তখন তার ট্র্যাজেডির স্বরূপ উন্মোচিত হয়ে পড়ে। মাতবর আর ফিরে দাঁড়ানোর সুযোগ পায় না, অনেক অনুনয়-বিনয় তাকে দুর্বল ও শিথিল মানুষে পরিণত করে। মাতবরের এ শৈথিল্য ও বিবেকবোধ অনেক আগেই নাটকে একটা রূপ নিতে শুরু করে – কেননা মুক্তিযোদ্ধাদের পায়ের আওয়াজ শুনেছে মাতবর অভ্যন্তর আবহের মধ্যে অনেক আগেই। মাতবরের এ ক্রমশ পরিণতি ক্রমাগত একটা পর্যায়ে গিয়ে ঠেকে শেষাংশে – এবং শিল্পদৃষ্টিতে তা খুব পরিশীলিত এবং সমুন্নতির মাত্রা স্পর্শ করে। প্রসঙ্গত, মূল্যবোধের একটা পর্যায়কে চিহ্নিত করেন নাট্যকার। মাতবরের পরিণতির পর্বের উচ্চারণ :
কেবল হাতের ’পরে মেয়েটার হাত দিয়া
আল্লাতালার নাম তিনবার নিয়া
কইলাম – কি কইছি, মনে নাই, কিছু মনে নাই,
সোনার পুতুল আমি এইভাবে সাগরে ভাসাই।
পরিণতির পর্বে গ্রামবাসীর প্রতিরোধও মাত্রা পায়। মাতবরের ব্যাপারে গ্রামবাসীর সিদ্ধান্ত : ‘চাই তোমার মরণ/ মরণ, মরণ।’ মাতবরের মৃতদেহ দেখতে চায় না কেউ, কেউ তারে আর এ-গ্রামের মাটিতে স্থান দিতে চায় না : ‘কবর দিলেও তারে উঠাবো সে লাশ খুইরা আবার।’ কিন্তু পীর ত্রিকালদর্শী চিন্তনে উল্লেখ করে : ‘উঠায়া নিলেই কি সব উঠান যায়?/ দাগ একটা দাগ রাইখা যায়।’
মাতবরের প্রতি ঘৃণাবর্ষণ আর এমন মিথ্যাচারী প্রবঞ্চক যাতে তৈরি না হয়, সেজন্য শোষকচিহ্নকেও বিলীন করার প্রচেষ্টা চলতে থাকে প্রত্যেক সাধারণ মানুষ তথা গ্রামবাসীর মাধ্যমে। সম্মিলিত সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ শক্তি যেন প্রত্যেকের মাঝে সমানভাবে সঞ্চারিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিত রচিত করে। কাব্যনাট্যে প্রত্যেকে মানুষই সমান শক্তি সঞ্চয় করে মাতবরের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। কার্যত, কাব্যনাট্যের প্রথম দিকে মাতবরের যে বন্ধনহীন শক্তি ও প্রতাপ লক্ষ করা যায় তাই এখন তার বিপরীত শক্তিরূপে গ্রামবাসীর শোণিতে সমান প্রবাহিত। প্রকৃত অর্থে, জনতার উত্থিত শক্তির মাঝেই মুক্তিযুদ্ধ পেয়েছে বিশাল ব্যাপ্তি। সত্যিকারভাবে, ‘১৯৭১-এর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এটি ছিল একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার অমোঘ পরিণতি।’ এ ঘটনাকে আরো যৌক্তিক করে বলা চলে – ‘স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় এক যুগান্তকারী ঘটনা। শুধু যে যুগান্তরী, তাই নয়, নতুন ঐতিহ্যের সৃষ্টিকারীও। প্রাচীন এক ভূখ-ে নতুন মানুষ হিসেবে আমাদের আবির্ভাব।’ যে-মুক্তিবাহিনীকে মাতবরের প্ররোচনায় জনতা বিচ্ছিন্ন করে দেখেছে বা ভিন্ন অর্থে মুক্তিসংগ্রামকে চিহ্নিত করেছে – তা এখন ভ্রান্তির অবসানে অনেক বড় মাত্রায় উদ্ভাসিত। পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় কাব্যনাট্যে সে উদ্ভাসন প্রচ- উল্লম্ফিত এবং বাস্তব সত্যের দ্যুতিময় প্রকাশে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত।
মাতবর আর গ্রামবাসীর কণ্ঠ এক পর্যায়ে একই বিন্দু স্পর্শ করে। একই বাস্তবতায় বোধোদয়ের মধ্য দিয়ে মাতবর নিজের প্রতারণার প্রাচীর থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। তার উচ্চারণ বাড়তি মাত্রা পায়; শিল্পগুণে আনে ব্যঞ্জনা :
… ক্যাপ্টেন সাব
কোনোদিন আপনেদের কথার খেলাপ
করি নাই, প্রতিবাদ করি নাই; স্মরণ করেন যদি
নিশ্চয় স্মরণ হবে, আপনেদের লাভক্ষতি
চিরকাল বিবেচনা করছি নিজের। তাই
উল্লিখিত সত্যতায় গ্রামবাসীরাও – এক সময়ের তাদের ত্রাণকর্তা – প্রভু মাতবরকে উদ্দেশ্য করে একই আবহে নিজেদের প্রকাশ করতে পারে। কারণ, এক সময় গ্রামবাসীরাও মাতবরের নির্দেশ ‘তথাস্তু’ বলে পালন করেছে; সেজন্য তাদের ভয়-শঙ্কা অস্বীকার করে নির্বিরোধী সবকিছু মেনে নিয়েছে এবং তাকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। কিন্তু এর পরিণামে প্রবঞ্চনা ভর্ৎসনা ছাড়া আর কি কিছু মিলেছে! সেজন্য একতাবদ্ধ গ্রামবাসী বলছে : ‘অসম্ভব কথা, মাতবর/ সতেরো গ্রামে নাই তোমার কবর।’ এক সময় সব কিছুই প্রমাণিত হয়। ভোগ, স্বার্থ, ধর্মচর্চা, বিশ্বাস – সবকিছুর মধ্যে প্রশ্নদীর্ণ হয় মেয়ের উক্তি :
যখন আমার বুকে কালসাপ দংশাইয়াছিল
বলেন, জবাব দেন, কোথায় কোথায়?
… … …
সেই এক নাম।
নামের তাজ্জব গুণে ধন্য হয় পাপের মোকাম;
চোরের আস্তানায় হয় বড় কোনো পীরের মাজার।
সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাট্যে স্বদেশের স্বভূমিতে প্রতিষ্ঠিত এমন কারণে : (১) বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক পটভূমি থেকে প্রচুর মুসলিম পৌরাণিক প্রসঙ্গের বস্তুনিষ্ঠ অবতারণায়, (২) প্রতœ-প্রাচুর্যের সূক্ষ প্রয়োগ, (৩) বাঙালি মুক্তিযোদ্ধা ও প্রতিপক্ষের প্রতিরোধকে নির্মোহ সত্যের পটভূমিতে প্রতিষ্ঠা দান, (৪) পিরের মাধ্যমে দ্বন্দ্বের সূত্রকে ইঙ্গিতময় ও শিল্পিত করে তোলার ব্যাপারটায়, (৫) জীবনসত্যের সমগ্রতাকে স্বল্পপ্রয়াসে অথচ সুদূরপ্রসারী ব্যঞ্জনায় প্রকাশ ঘটানোয় – বিশেষ করে মেয়ের মধ্য দিয়ে পুরো আবহকে লক্ষ্যে পৌঁছানোর শিল্পিত প্রয়োগ পরিক্রমায়। লেখক কোনো পৌরাণিক কাহিনির পুনর্নির্মাণ নয়, কিন্তু পুরাণ-প্রসঙ্গকে লোকায়ত আবহে চরিত্রের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে উপস্থাপন করেছেন। ভূমিসংলগ্ন মানুষের বিশ্বাস-সংস্কার-আচার ইত্যাদিকে লোকায়ত সংস্কৃতির পরিম-লে নিরূপণের প্রয়াস থেকে লেখক এসবের প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। বাঙালির হাজার বছরের অবিনাশী জয়গাথাকে স্মৃতি ও শ্রুতির দর্শনে কাব্যনাট্যের ফ্রেমে তুলে এনেছেন। মাতবরের মেয়ের গল্পে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ নেই কিংবা গ্রামবাসীদের সঙ্গে মাতবরের দ্বন্দ্বের ভেতরে দামামামুখর মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ আসেনি, কিন্তু বাস্তবত মুক্তিযুদ্ধই গোটা কাহিনির অস্থিমজ্জা। কাব্যনাট্যের তাত্ত্বিক সংজ্ঞা যে আধুনিক সময়বাস্তবতার অনুগামী তার সঙ্গে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় – এর ঘটনা, কাহিনি উপস্থাপনার অনেকাংশে মিল পরিলক্ষিত হয়। যদিও কোনো তত্ত্বের উপদেশে শিল্প বেড়ে ওঠে না বা সেরকম প্রয়াসেও শিল্পী হয়তো কখনো যান না। কিন্তু শিল্পবিচারে তত্ত্বকে কে অস্বীকার করবে!

চার
‘কাব্যনাট্যই শেষ পর্যন্ত আমার করোটিতে জয়ী হয়; টি. এস. এলিয়টের কাব্যনাট্য ভাবনা আমাকে ক্রয় করে… ধ্রুপদী গ্রীক নাটক আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে; শেক্সপীয়র… আমাকে এক তীব্র আলোকসম্পাতের ভেতর দাঁড় করিয়ে রাখে…’ সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাট্যের আলোচিত বিষয়-আঙ্গিক সন্দেহাতীতভাবে এমন অনুভূতি দ্বারা প্রভাবিত। তাঁর স্বীকারোক্তিতে নাট্যবুদ্ধি ক্রয় হয়েছে এলিয়ট থেকে। পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় কাব্যনাট্যটিও তাঁর এ-প্রস্তাবনার অনুবর্তী। পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়ের ভাষা-নির্মাণে এক দুঃসহ-সুন্দর শিল্পরীতির প্রকাশ ঘটেছে। কারণ, ভাষার মর্মবিন্দুই বাস্তবকে নির্মিতি দেয়। ব্যাপক অর্থে, ভাষা আসলে একটা ডিসকোর্স; এই দৃষ্টিভঙ্গিই আধুনিক যুগবাস্তবতার জটিল মানুষের অন্তর্জগৎকে নির্মাণ করে। যেমনটা বলা চলে, মাতবর রূপক হিসেবে এ-কাব্যনাট্যে সক্রিয় (active)| ‘Allegory representing the criminal ambition of mans nature.’ মাতবর স্বমূর্তিতে এমন প্রস্তাবনায় কাব্যনাট্যের আবহকে জঙ্গমতা দান করেছে। নাটকীয় উত্তেজনায় চরিত্রের কার্যকারণে, প্রকোপ-প্রবাহে লেখকের শিল্পিত সক্রিয়তা তৈরি হয়েছে ‘fascination and their effectiveness’

প্রবণতা থেকে। কিন্তু আঙ্গিকে-নির্মাণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছন্দায়িত পঙ্ক্তিবিন্যাসে। এই পঙ্ক্তিমালার ভেতরে পির কিংবা মেয়ে-চরিত্রটি উত্তাপ ছড়ায় একদিকে মাতবরের ভেতরে অন্যদিকে গ্রামবাসীকেও প্রকাশ্য সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়। প্রসঙ্গত সবকিছুই চলে প্রচ্ছন্ন প্রবাহের ভেতরে। এ ফর্মে ‘কোরাস’ এলিয়টের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়ে কোরাস নেই, স্বগতোক্তির প্রসঙ্গটিও দুর্বল। তবে পির কিংবা পাইকের উচ্চারণ বা গ্রামবাসীর সমস্বরের ব্যাপকায়নে সমষ্টির আকুতি এখানে শানিত মাত্রা পেয়েছে এবং প্রতিবাদী দ্বন্দ্বও অনুভবের প্রাঞ্জলতায় বিস্তৃতি লাভ করেছে। ফলে কাব্যনাট্য কাহিনিস্তরের প্রতিক্রিয়ায় উপমা-রূপকের প্রচ্ছন্ন প্রবাহে বহুমাত্রিকতার ভেতর দিয়েই প্রান্তে পৌঁছেছে।
পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়তে অ্যারিস্টটলীয় নাট্যতত্ত্বের আদলে কাহিনি উৎকর্ষও নির্ণীত। মেয়ের আগমন এবং পরে দুর্বল সমর্পিত মাতবরের পাদদেশে মুক্তিসংগ্রামীদের জয়ের ভেতর দিয়ে আটষট্টি হাজার গ্রামের মানুষের সমন্বিত শক্তিতে উঠে আসা – একটা সফল শিল্পপ্রয়াস, সন্দেহ নেই। ভাষা প্রসঙ্গে যে কার্যকরী ও শক্তিশালী রূপ এলিয়টে প্রত্যক্ষ হয়, যার মধ্য দিয়ে প্রতœ-পুরাণ-নৃতত্ত্ব-ভূমি উঠে আসে, সে-প্রমাণ সৈয়দ শামসুল হক সীমিত পরিসরে হলেও রাখতে পেরেছেন; বিশেষত বাংলাদেশের সাহিত্য-বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে। সৈয়দ শামসুল হকের শিল্পচিন্তায় নাটকের নানামুখী চরিত্র নির্মাণে ও আন্তঃসম্পর্ক সৃষ্টি প্রয়াসের জন্য শব্দ-ইমেজের ব্যবহার বিশেষভাবে আকর্ষণীয়; যেমন মেয়ের উচ্চারণে : ‘সে ক্যান ফালায়া গেলো আমার জীবন/ হঠাৎ খাটাশে খাওয়া হাঁসের মতন?’, কিংবা ‘গ্যাছে সুখ/ য্যান কেউ নিয়া গ্যাছ গাভীনের বাঁটে যতটুকু/ দুধ আছে নিষ্ঠুর দোহান দিয়া’ ইত্যাদি। শব্দার্থের বৃত্ত ভেঙে ব্যঞ্জনা যে-পরিকাঠামোতে আবদ্ধ তা প্রথা-সংস্কারসন্ধানী অতীত ও বর্তমানের সেতুবন্ধ তৈরি করে। লেখকের ভাষায় আঞ্চলিকতার আচ্ছাদন থাকলেও তার বিস্তার ঘটেছে সর্বদৈশিক; কালচিন্তনে তা সর্বকালিক বললেও অত্যুক্তি হয় না। ‘আঞ্চলিক শব্দের নিপুণ ব্যবহারে যুদ্ধকালীন উত্তরবাংলার গ্রামীণ জীবনকে যেন শব্দাবলি করে ধরে রেখেছে। ভাষার গীতময়তা, আঞ্চলিক শব্দের কুশলী প্রয়োগ এবং যুদ্ধকালীন জীবনবাস্তবতার কাব্যিক উচ্চারণে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় বাংলাদেশের নাট্যসাহিত্যে একটি পালাবদলকারী নাটক হিসেবে বিবেচিত।’ শুধু বিষয়বৈচিত্র্য বা উপস্থাপনা নয় কাব্যনাট্যের নিরীক্ষিত শৈলী হিসেবে ততোধিক সাফল্যের মাত্রা স্পর্শের কারণেই পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় বাংলাদেশের সাহিত্যে অনিবার্যতার গুরুত্ব বহন করে চলবে।

অনুসরণীয় গ্রন্থ

T. S. Eliot, Selected Essays, (reprint, London, Faber and Faber, 1963)
D. E. S. Maxwell, The Poetry of T. S. Eliot, (London, Routledge & Kegan Paul, 1960).
Mark Schorer, William J. Handy & Max Westbrook (Etd.), Twentieth century criticism, (New Delhi, Light & Life Publishers, 1974).

শেয়ার করুন

Leave a Reply