বইপত্র

লেখক:

প্রবহমান কালের প্রজ্ঞাময় বিশ্লেষণ
মুহিত হাসান
কালের সাক্ষী
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

বেঙ্গল পাবলিকেশন্স লি.ঢাকা, ২০১৫
৪২৫ টাকা

এ-বছরই প্রকাশিত হয়েছে আমাদের সময়ের একজন অত্যন্ত অগ্রণী প্রাবন্ধিক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর নবতম প্রবন্ধগ্রন্থ কালের সাক্ষী। বইটিতে অন্তর্ভুক্ত দশটি প্রবন্ধের দিকে তাকালে বোঝা যায়, প্রতিটি রচনাজুড়েই রয়েছে প্রবহমান কালের নানাবিধ সাক্ষী ও সাক্ষ্য সম্পর্কে আলোচনা। লেখক শুরু করেছেন রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর নোবেল বিজয়ের প্রসঙ্গটি দিয়ে, শুরু করেছেন নিজের একটি আত্মসাক্ষ্যরূপী স্মৃতিচারণধর্মী গদ্যরচনার মাধ্যমে। লেখকের দৃষ্টিভঙ্গির বৈচিত্র্য ও ব্যাপকতা এ থেকে টের পাওয়া যায়। আর প্রতিটি লেখার মধ্যেই রয়েছে এই উপমহাদেশের ইতিহাসের ও সংস্কৃতির অতীত বা বর্তমান সময়ের রুদ্ধশ্বাস টানাপড়েনের উত্তাপ, এবং সেই উত্তাপের বিশ্লেষণেও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী পান্ডিত্য ও স্বাতন্ত্র্যমন্ডিত ভাবনার যথেষ্ট পরিচয় রেখেছেন।

এবার বইটির প্রবন্ধগুচ্ছের দিকে তাকানো যাক। বইয়ের প্রথম প্রবন্ধ ‘রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কারে’ প্রায় অর্ধশত পৃষ্ঠা জুড়ে আলোচিত হয়েছে গীতাঞ্জলির ইংরেজিতে অনূদিত হওয়ার ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের বিলাত-ভ্রমণের ইতিকথা, নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তি ও সমকালীন রাজনীতি, ইয়েটসের গীতাঞ্জলিযোগসহ তৎসংশ্লিষ্ট বহু প্রসঙ্গ। এখানে লেখকের সাহিত্যবোধ ও রাজনীতি-সচেতনতা যুগপৎ তীক্ষ্ণতায় নতুনভাবে রবীন্দ্রনাথের জীবনের সেই বহুধাজটিল সময়টিকে অনুপুঙ্খরূপে পাঠকদের সামনে হাজির করেছে। তাঁর মতে, রবীন্দ্রনাথকৃত গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদ নিয়ে সমালোচনা রইলেও ‘তিনি তাঁর নিজস্ব সৃষ্টিকে নিয়ে খেলা করার স্বাধীনতা, তাঁর অসামান্য কল্পনাশক্তি, ছন্দস্পন্দনের বোধ এবং শব্দের জ্ঞান ও কানকে (ইংরেজি ভাষার হলেও) ব্যবহার করে গীতাঞ্জলির কবিতাগুলো অতুলনীয় করে তুলেছিলেন, যা পড়ে যাঁরা বাংলা জানেন না তাঁরাও মুগ্ধ হয়েছেন… বাংলায় গীতাঞ্জলির তুলনায় ইংরেজি গীতাঞ্জলি সমমানের না হলেও তার সময়মতো প্রকাশ নানা ধরনের তাৎপর্যের কারণে অত্যন্ত স্মরণীয়, যেমন রবীন্দ্রনাথের নিজের জন্য, তেমনি তাঁর দেশবাসীর জন্য।’

‘ম্যান্ডেলা, গান্ধীবাদ ও জনমুক্তির আকাঙ্ক্ষা’ প্রবন্ধে লেখক প্রয়াত জননেতা নেলসন ম্যান্ডেলার জীবন ও রাজনৈতিক কর্মযজ্ঞের সঙ্গে গান্ধীবাদের সম্পর্কের যে-কথা শোনা যাচ্ছে, তার দিকে নতুনভাবে আলোকপাত করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, ম্যান্ডেলা একান্তই বস্ত্তবাদী ছিলেন, অপরপক্ষে মহাত্মা গান্ধী ছিলেন ভাববাদী। গান্ধী যেখানে নেহাতই বিরতি দিয়ে নরম সুরে সমাজ ও শাসক পরিবর্তনের পথে হেঁটেছেন, সেখানে ম্যান্ডেলা ছিলেন অব্যাহত জনগণের আন্দোলনে বিশ্বাসী। ম্যান্ডেলা গান্ধীর কাছে তাঁর ঋণের কথা স্বীকার করেছেন বটে নানা লেখায়-বক্তৃতায়, কিন্তু তাঁর হাতে গড়া সংগঠনটি ‘গান্ধীবাদী আপসকামিতা ও শাসকশ্রেণির হৃদয় পরিবর্তনের ভদ্রলোকী বলয়’ থেকে নিজেদের বিযুক্ত রাখতে পেরেছিলেন বলেই সফল হয়েছিলেন।

এ-বইয়ের সবচেয়ে জরুরি ও অভিনব প্রবন্ধ যদি বলি ‘তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক জীবন’কে, তাহলে আশা করি অত্যুক্তি হবে না। তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক জীবনের সাফল্য ও অবদান সম্পর্কে আলোচনার পাশাপাশি কেন তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন ও কোন ধরনের রাজনীতিতে তাঁর আগ্রহ ছিল – এই দুটি প্রশ্নকে মাথায় রেখে লেখক এখানে আলোচনার সূত্রপাত করেছেন। তাজউদ্দীনের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি চিহ্নিত করেছেন সময়ের তাগিদকে, কেননা তাঁর মধ্যে ছিল সংবেদনশীলতা ও কর্তব্যজ্ঞান তথা দায়িত্ববোধ। আর তাঁর রাজনীতি ছিল জাতীয়তাবাদের পটভূমিতে দাঁড়ানো ঠিকই, কিন্তু জাতীয়তাবাদের মধ্যে থাকা দক্ষিণপন্থীদের সঙ্গে তাঁর মতের মিল ছিল না, তিনি দাঁড়িয়েছিলেন জাতীয়তাবাদের মধ্যে বামপন্থীদের সীমান্তে। তাই তাঁর রাজনীতি ছিল ব্যক্তিগত মুনাফার নয়, সমাজ পরিবর্তনের রাজনীতি – ইতিহাস ব্যক্তির সীমাকে নির্দিষ্ট করে দিতে চাইলেও কেউ কেউ তার মধ্যে থেকেই ইতিহাসকে বদলানোর চেষ্টা করে যান, ‘তাজউদ্দীনও তেমনটাই করেছেন’।

‘কাজী নূর-উজ্জামানের অসমাপ্ত যুদ্ধ’ মূলত মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত কাজী নূর-উজ্জামানের নির্বাচিত রচনা নিয়ে প্রকাশিত একটি বইয়ের ভূমিকা হিসেবে লিখিত। নির্দিষ্ট কোনো গ্রন্থের জন্য লেখা ভূমিকা হলেও এখান থেকে একজন মুক্তিযোদ্ধার আজীবনের সংগ্রামের ও চিন্তাভাবনার পরিচয় পাওয়া যায় বিস্তারিত আকারে। নূর-উজ্জামানের রচনা কী করে আমাদের মনের মধ্যে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের অতীত থেকে প্রেরণা নিতে ও প্রগতিশীল সমাজের আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে তা লেখকের কলমে উঠে এসেছে সুচারুভাবে। ‘মুক্তিযুদ্ধের আরেক মূল্যায়ন’ শীর্ষক রচনাটিও মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরেই আবর্তিত। ইরতিশাদ আহমদের আমার চোখে একাত্তর বইটির মূল্যায়ন করতে গিয়ে লেখক মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতার কথা মাথায় রেখে বলেন : ‘…একাত্তর ছিল অবিশ্বাস্য। পুরাতন পৃথিবীটাকে সে বদলে দিয়েছিল। পারস্পরিক সংবেদনশীলতা যেমন বেড়েছিল, তেমনি অবিশ্বাসও দেখা দিয়েছিল। কথা ছিল নতুন একটি পৃথিবী গড়ে উঠবে। কাজটা যে জাতীয়তাবাদীরা করবেন, এমনটা আশা করার কারণ ছিল না। দায়িত্ব ছিল বামপন্থীদেরই। কিন্তু একাত্তরে তাঁরা অনেকেই বিভ্রান্ত ছিলেন, তাঁদের বিভাজনও ছিল মর্মান্তিক। একাত্তরের পরেও তাঁরা সমাজ বদলের স্বপ্নটাকে বাস্তবায়িত করতে পারেননি। নতুন নেতৃত্ব গড়ে ওঠেনি। পুরাতন নেতৃত্ব অকার্যকর হয়ে পড়েছে।…’ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর এমন রূঢ় অথচ সত্যবচন প্রমাণ করে, তাঁর দায় সত্যের কাছেই। সমাজতন্ত্রের মধ্যে তিনি সমাজ বদলের সম্ভাবনা দেখলেও, সেই চেতনার তথাকথিত ধারক-বাহকদের ত্রুটি-বিচ্যুতি তিনি চিহ্নিত করতে ভোলেন না।

‘পিয়ারু সরদারকে স্মরণ করি’ লেখাটি বিশ শতকের পঞ্চাশের দশকের ঢাকা শহরের বাইশজন পঞ্চায়েত সরদারের একজন, পিয়ারু সরদারের প্রতি একটি অনুপম শ্রদ্ধার্ঘ্য। বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনের সময় যিনি পেশায় ছিলেন একজন সরকারি ঠিকাদার, তবু পাকিস্তানি শাসকশ্রেণির রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি ভাষাশহীদদের স্মরণে শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য দরকারি সামগ্রী অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছিলেন প্রগতিমনা ছাত্রদের মাঝে। ছাত্রনেতাদের হাতে দিয়েছিলেন তাঁর গুদামের চাবি, নিঃস্বার্থভাবেই। পুলিশের হাতে ধরা পড়ার ভয় ছিল, কিন্তু তিনি দ্বিধা করেননি। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতে, এ-ঘটনা কেবল হৃদয়ের উষ্ণ উদারতা বা করুণা প্রদর্শন নয়, ‘প্রকৃত ঘটনা তার চেয়েও বড়। এ হচ্ছে সীমান্ত লঙ্ঘন। মুসলিম লীগের জনবিরোধী রাজনীতির সীমা পার হয়ে তিনি চলে এসেছেন জনগণের মুক্তির  যে-আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তার সঙ্গে হাত মেলাতে। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির একটা পরিবর্তন ঘটে গেছে।’ অধ্যাপক ও সমাজবিজ্ঞানী নাজমুল করিমের রচনাবলির মূল্যায়ন মিলবে ‘নাজমুল করিমের সমাজদৃষ্টি’ প্রবন্ধে। তিনি দেখিয়েছেন, নাজমুল করিম সমাজবিজ্ঞানের প্রথাবদ্ধ চর্চার বিপদের দিকটা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। সমাজবিজ্ঞান পাঠ যেন কায়েমি স্বার্থের অনুকূলে না চলে যায় সে-বিষয়ে তিনি সচেতন ছিলেন। এক্ষেত্রে পরিসংখ্যানের ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তাঁর মত ছিল ‘পরিসংখ্যান সংখ্যা দেয়, কিন্তু ওজন দেয় না। ওজন করতে হলে দরকার দর্শনের। দর্শন হচ্ছে ওজনের বাটখারা। প্রয়োগবাদ তথ্য দেয়, তত্ত্বকে ঢেকে দিয়ে।’ এরকম চিন্তাশীলতার কারণেই নাজমুল করিমকে তিনি দেখেন সংরক্ষণের নয়, পরিবর্তনের দিকের মানুষ হিসেবে। তিনি চেয়েছিলেন সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের সমন্বয়বাদী একটি সমাজ।

‘ত্বকীর কবিতা-লেখা’ ঘাতকের হাতে নিহত প্রতিভাবান কিশোর ত্বকীর নোটবইতে পাওয়া কবিতার আলোচনা শুধু নয়, এ-লেখাটি আমাদের সমাজ-রাজনীতিতে যে এক কৃষ্ণকায় হননের কাল এখন বিরাজ করছে, তারও এক নির্লিপ্ত-রক্তাক্ত খতিয়ান যেন। লেখক তাঁর কিশোরবেলার কথা বলেন, লেখেন, তাঁর সময়ে রাষ্ট্র অনেক সময় শত্রুতা করেছে, নিপীড়নের চেষ্টা চালিয়েছে, কিন্তু তখনো অবধি তা গুপ্তঘাতকদের লালন-পালন করে চলেনি। এখন যেমনটা করছে, আর সেই গুপ্তঘাতকদের হাতেই প্রাণ দিতে হয় তাই ত্বকীর মতো স্বপ্নবান কিশোর-তরুণদের। সুকান্ত ভট্টাচার্য যেমন তাঁর কিশোর বয়সে লেখা কবিতায় সমাজকে পালটাতে চেয়েছিলেন, তেমনটা ত্বকীও চেয়েছিলেন ভিন্নভাবে নিজের কবিতায়, কিন্তু ঘাতকের হাত সেই পরিবর্তনের অংশী তাঁকে হতে দিলো না। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এ-প্রসঙ্গে স্মরণ করেন আঠারো শতকের ইংল্যান্ডে জন্ম নেওয়া আরেক কিশোর-কবিকে, টমাস চ্যাটারটন। তাঁকে কেউ হত্যা করেনি বটে, কিন্তু প্রচন্ড দুঃখ-হতাশায় আর দারিদ্রে্যর ছোবলে অসহায় হয়ে পড়ায় তিনি আত্মহত্যা করেন আর্সেনিক খেয়ে। এও তো আরেক ধরনের হত্যাকান্ড সমাজের. অদৃশ্য হস্তক্ষেপে।

‘লোকসংস্কৃতির ভদ্র-অভদ্র চর্চা’য় লেখক ভিন্ন আঙ্গিকে স্মরণ করেছেন গণসংগীতের নায়ক হেমাঙ্গ বিশ্বাসকে। তাঁর মতে, লোকসংস্কৃতির প্রথাগত চর্চায় একধরনের ভাবালুতা বা আধ্যাত্মিকতা রয়েছে, যা কিনা শেকড়ে ফেরার নামে প্রকারান্তরে ডেকে আনে পশ্চাদমুখী প্রতিক্রিয়াশীল ভাবনাকেই। কিন্তু হেমাঙ্গ বিশ্বাস লোকসংস্কৃতির অন্যতম মুখ্য উপাদান লোকসংগীতকে ব্যবহার করেন গণসংগীতের মধ্যেও। আধ্যত্মিকতামুখী লোকসংগীতের বাণীকে তিনি দেখান ইহজাগতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে। লেখক তাই জোর দেন হেমাঙ্গ বিশ্বাসের কাজের দিকে, তাঁর জীবনসাধনা প্রমাণ করে, লোকসংস্কৃতির বিলাসী তথা ভদ্র-চর্চার বাইরে গিয়ে লোকসংস্কৃতিতে গণসংস্কৃতির চর্চায় উত্তীর্ণ করা জরুরি। তাতেই জনগণ ও বাঙালির সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হবে। আর স্রেফ আপন গন্ডিতে মাথা গোঁজার বদলে এক সহমর্মী আন্তর্জাতিকতার শরিক হবে সবাই।

গ্রন্থের শেষ প্রবন্ধ ‘ভূতে-পাওয়া একজনকে নিয়ে আরেকজনের কথা’ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে নিয়ে লেখকের আন্তরিক অবলোকনের স্মারকবিশেষ। উদ্যোক্তা ও কর্মী আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের মূল্যায়ন করতে লেখক যেমন ফিরে তাকিয়েছেন তাঁদের দুজনের সমকালের দিকে, তেমনিভাবে নিজেদের কর্মের হিসাবনিকাশ নিয়েও কথাবার্তা রেখেছেন। মত দ্বিমত আছে এ-রচনায়, আছে নিজের ও নিজের সময়ের আত্মসমালোচনাও। স্মৃতিকথার ভঙ্গিতে লেখা হলেও লেখাটি আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের এক জটিল ও বহুবর্ণ সময়ের তীক্ষ্ণ ব্যাখ্যাও ধারণ করে রয়েছে – এমনটা বলাই যায়।

কালের সাক্ষী পাঠান্তে আমরা একটি দীর্ঘ কালপর্বের সময় ও সমাজকে নতুনভাবে দেখার অভিজ্ঞতার অংশী হয়ে উঠি যেনবা। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও মানসের প্রাজ্ঞতা দ্বারা আমাদের অতীতের ছায়ারেখাকে যেমন নতুন করে চিনিয়ে দিয়েছেন, তেমনি স্পষ্টতার সঙ্গে বর্তমানকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথও চিহ্নিত করেছেন। যাঁদের নিয়ে তিনি লিখেছেন, তাঁদের সবারই লক্ষ্য ও কর্ম নির্দিষ্ট, এবং তা জনগণের কল্যাণ-কামনার দিকেই ধাবিত হয়েছিল। এবং, লেখকেরও লক্ষ্য তাই। তার প্রমাণ তো রয়েছেই এ-বইয়ের ছত্রে ছত্রে। r

 

আহমদ রফিকের চোখে দেশবিভাগ
আমিনুর রহমান সুলতান 

দেশবিভাগ : ফিরে দেখা
আহমদ রফিক

অনিন্দ্য প্রকাশ
ঢাকা, ২০১৪
৬০০ টাকা

দেশ-বিভাগ মানে ভারত-বিভাগ। ভারত-বিভাগ হওয়ার পেছনে নানা ঘটনা, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান; প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ এবং ব্রিটিশরাজ যে দায়ী এ-কথা মেনে নিয়েছেন ইতিহাসবিদরা। তার পরও এই যে ত্রিমাত্রিক যোগসূত্র এর বিশ্লেষণের দৃষ্টিভঙ্গির কমবেশি ভিন্নতা ও পার্থক্যও রয়েছে। সত্যের ভেতর আরো সত্য এবং সত্যের বাইরেও আরো সত্য থাকে, তাকে অনেক সময় ধরতে হয় গভীর অধ্যয়ন ও সৃজনশীল ভাবনার মধ্য দিয়ে। আহমদ রফিক এক্ষেত্রে ব্যতিক্রমই বলা যায়।

সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে কবি, ভাষাসংগ্রামী ও রবীন্দ্র-গবেষক আহমদ রফিকের দেশবিভাগ : ফিরে দেখা শিরোনামের গ্রন্থ। গ্রন্থে তিনি দেশ-বিভাগের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত বিশ্লেষণ করেছেন। সে-পরিপ্রেক্ষিত বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি এমন কিছু বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছেন, যা খুবই প্রাসঙ্গিক এবং লেখকের নিজস্ব ভাবনার মূল্যও এতে উপস্থাপিত। গ্রন্থের সূচিপত্র পাঠ করলে এটি সম্পর্কে একটি সাধারণ ধারণা পাওয়া যাবে। এক্ষেত্রে সূচিপত্রের বিষয়গুলো তুলে ধরা হলো – আমজনতারও স্বপ্ন ছিল পাকিস্তান, রাজনীতির সাম্প্রদায়িক বিভাজন, সহাবস্থানের ভিত নষ্ট করে স্থানীয় রাজনীতি ও শাসকনীতি, সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ : লীগ কংগ্রেস প্রজাপার্টি, প্রাদেশিক নির্বাচন ও দলীয় সম্পর্কের জের, রাজনৈতিক টানাপড়েনে বিপর্যস্ত ফজলুল হক, লীগের গায়ে জোয়াড়ি হাওয়া বঙ্গ-পাঞ্জাবের দাক্ষিণ্যে, লীগ-কংগ্রেস দ্বন্দ্বে ব্রিটিশরাজের ভূমিকা, বিশ্বযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে লীগ-কংগ্রেস ও ‘রাজ’, কংগ্রেসে নীতিগত অন্তর্বিরোধ : যথারীতি গান্ধী-প্রাধান্য, কংগ্রেসে ডান-বাম দ্বন্দ্ব ও সুভাষ সমাচার, হক-জিন্নাহ দ্বন্দ্বের নেপথ্যে ক্ষমতার চক্রান্ত, সিকান্দার হায়াতের পাকিস্তান বনাম পাঞ্জাব-ভাবনা, ফ্যাসিস্টশক্তির অগ্রযাত্রায় স্থানিক প্রতিক্রিয়া, বিশ্বযুদ্ধের কল্যাণে প্রধান বিশ্বশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ক্রিপস প্রস্তাব নিয়ে নানা টানাপড়েন, ক্রিপস মিশনের ব্যর্থতা ও ব্রিটিশ চাতুর্য, স্বশাসন প্রস্তাবের চোরাবালিতে স্থানীয় রাজনীতি, বিশ্বযুদ্ধ ও ভারতীয় কমিউনিস্টদের ‘জনযুদ্ধ’, বিয়াল্লিশের ক্রান্তিকালে জাতীয়তাবাদী মুসলমান নেতৃত্ব, ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলন, আগস্ট আন্দোলনের চরিত্রবিচার ও কুশীলবগণ, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও দুঃশাসনের কালোছায়া, হক-সোহরাওয়ার্দী দ্বন্দ্ব : লীগের অগ্রযাত্রা, পাকিস্তান আন্দোলন : সাহিত্যচর্চায় প্রভাব, কংগ্রেস রাজনীতির আপসবাদ, বঙ্গ-ভারতীয় রাজনীতি ও মুসলমান সমাজ, বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন ও সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলি, বঙ্গভঙ্গ রদ থেকে মন্টফোর্ড প্রস্তাব : রাজনীতির নৈরাজ্য, রাজনীতিতে ধর্মীয় চেতনা ও সাম্প্রদায়িক সংঘাত, সাম্প্রদায়িক ঐক্য-অনৈক্য ও রাজকীয় দমননীতি, ‘সারে জাঁহাসে আচ্ছা’র ঐক্যবোধ টেকেনি, লীগ-কংগ্রেস দ্বন্দ্বের রাজনীতি, জিন্না : ‘ভারতীয় মুসলমানদের একমাত্র মুখপাত্র’, জিন্না পাকিস্তান চাননি : প্রশ্নবিদ্ধ মিথ, পাকিস্তান অর্জন কতটা ইতিবাচক রাজনীতির প্রতিফলন, সিমলা বৈঠকের ব্যর্থতার দায় কার?, অগ্নিগর্ভ ভারত : ছাত্র-জনতা-শ্রমিক ও নৌ-সেনা তৎপরতায়, সাধারণ নির্বাচন ও মুসলিম রাজনীতি, কেবিনেট মিশন : সমঝোতার নয়াপ্রচেষ্টা, প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস : কলকাতায় সাম্প্রদায়িক গণহত্যা, অন্তর্বর্তী সরকার নিয়ে বেজায় টানাপড়েন, ব্রিটিশ সিংহের ভারতত্যাগের ঘোষণা : সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিস্তার, কোন ভাঙনের পথে ভারতবর্ষ, ভাঙনের প্রতিক্রিয়ায় বিপন্ন দেশ, ভারতীয় রাজনীতিতে গান্ধী-জিন্নাহ সমাচার, দেশ-ভাগের নিয়তি : নেহরু বনাম আজাদ, নেপথ্যে প্যাটেল, ভারতবিভাগ কি অনিবার্য ছিল, দেশভাগ বাংলাভাগ : জাতীয়তাবাদ থেকে সাম্প্রদায়িকতায়, দেশ-বিভাগের পটভূমিতে বাঙালি জাতিসত্তা, জিন্নাহর পাকিস্তান : পাকিস্তানের জিন্নাহ দেশভাগ ও উদ্বাস্ত্তকথা,  দেশ-বিভাগ বিচার : একুশ শতকে দাঁড়িয়ে-১, দেশ-বিভাগ বিচার : একুশ শতকে দাঁড়িয়ে-২।

আহমদ রফিক এই গ্রন্থের বিশ্লেষণে বেশ কয়েকটি বিবেচনাকে খুবই গুরুত্ব দিয়েছেন। ফলে তা হয়ে উঠেছে ভিন্নমাত্রিক। এ-কারণেই গ্রন্থটিও সমকালীন অন্যান্য ঐতিহাসিক গ্রন্থের চেয়ে খুবই গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে পাঠক-সমালোচকের কাছে। যেমন : দেশ-ভাগের মূল উপকরণ হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা। আর এই সাম্প্রদায়িকতার দায় যে তিনটি প্রতিষ্ঠানের – ‘লীগ, কংগ্রেস ও রাজে’র তা খুবই স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন আহমদ রফিক। এই সাম্প্রদায়িকতার সামাজিক প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে উনিশ শতকী নবজাগরণসূত্রে ‘হিন্দু-সংস্কার ও পুনরুজ্জীবন’ – এ-দিকটিকেও গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনায় এনেছেন। সাম্প্রদায়িক মনোভঙ্গিকে ঔপনিবেশিক শাসক তো প্রশ্রয় দেবে তার হীন স্বার্থেই।

এ-কারণে দেশ-বিভাগে যে তিনটি প্রধান শক্তির ত্রিভুজ মূলশক্তি, সে-ত্রিভুজের শীর্ষে যে শাসকশ্রেণি, তারা তাদের ভেদনীতি প্রয়োগ করেছে। প্রয়োগ করেছে ‘ভাগকর-শাসনকর’ নীতি। দু্ই পাশে ছিল লীগ ও কংগ্রেস। এ প্রক্রিয়ায় ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের জন্ম, যা সাম্প্রদায়িক বিভাজনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।

তাই বলে দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়ে যাওয়া কংগ্রেস ও লীগ ওই সাম্প্রদায়িকতার পথটাকে সঙ্গী করবে কেন? করেছে অনেকটা জেনেশুনেই। লেখক মনে করেছেন, সাম্প্রদায়িকতাকে এড়ানো সম্ভব ছিল কংগ্রেসের। কিন্তু কংগ্রেস তা করতে সমর্থ হয়নি, যে-কারণে তারও ইঙ্গিত তিনি রেখেছেন তাঁর বিবেচনায়। ‘কংগ্রেস তাদের ঘোষিত সেক্যুলার জাতীয়তাবাদের চরিত্র পুরোপুরি ধারণ ও প্রয়োগ করতে পারেনি তাদের ডানপন্থি ও হিন্দু মহাসভা পন্থিদের প্রভাবের কারণে।’ এর জন্য অবশ্য যথার্থ শিক্ষার অভাব সর্বনাশের পথকে সুগম করেছে। সর্বনাশের পথকে প্রশস্ত করেছে মুসলিম লীগের সম্প্রদায়চেতনা ও বিভাজন চিন্তা। যুক্তি ও মানবিকবোধ মোটেই জয়ী হতে পারেনি সাম্প্রদায়িকতার কাছে। তবে সাম্প্রদায়িক প্রেক্ষাপট যাতে সৃষ্টি হতে না পারে সেজন্য অনন্য ভূমিকার অধিকারী কেউ কেউ ছিলেন; কিন্তু তাদের প্রয়াণে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধন অটুট থাকেনি। লেখক এক্ষেত্রে যথার্থই বলেছেন যে, ‘সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রচনার অন্তত দুটো ঘটনা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ – একটি বঙ্গে, অপরটি পাঞ্জাবে। সাম্প্রদায়িক সমন্বয়ের (১৯২৩) প্রবক্তা চিত্তরঞ্জন দাসের অকালমৃত্যুর (১৯৪২) পাঞ্জাব রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নায়ক ইউনিয়নিস্ট পার্টির নেতা সিকান্দার হায়াত খানের। উত্তরসূরি খিজির হায়াত খান অবশ্য ততটা ব্যক্তিত্বসম্পন্ন রাজনীতিক ছিলেন না। দুই মুসলমানপ্রধান প্রদেশে পূর্বোক্ত অঘটনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সর্বভারতীয় রাজনীতিতে।’

অবশ্য সমাজবিজ্ঞানীগণ মনে করেন ‘অতীতে যা প্রয়োজন ছিল তা হচ্ছে সামাজিক-চেতনাসম্পন্ন এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ নতুন রাজনৈতিক এলিট গঠন এবং আর্থ-সামাজিক রূপান্তর সাধনের উদ্দেশ্যে বৈপ্লবিক রাষ্ট্রনীতির উদ্ভাবন।’ তা সম্ভব হলেও সাম্প্রদায়িকতাকে এড়ানো যেত। সেটিও সম্ভব হয়নি।

কিন্তু লাহোর প্রস্তাবভিত্তিক দেশ-বিভাগের যে-পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়, তাতে যে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প প্রতিনিয়ত ছড়িয়ে পড়ছিল ভারতবর্ষে। এসব ধরনের বিবেচনা ও বিশ্লেষণ আহমদ রফিক তাঁর গ্রন্থের প্রথম শিরোনামের লেখায় নির্মোহভাবে তুলে ধরেছেন। এক্ষেত্রে তিনি দেখিয়েছেন লাহোর প্রস্তাবের আগেও পূর্ববঙ্গ বাদে ‘পাঞ্জাব, সিন্ধু, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তান নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ মুসলিম রাষ্ট্র দেখতে চেয়েছিলেন কবি স্যার মোহাম্মদ ইকবাল। ‘স্বশাসিত সে-রাষ্ট্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভেতরে বা বাহিরে যেখানেই হোক।’ কিন্তু জিন্নাহ হিন্দু ও মুসলমান এই দুই জাতি – এই তত্ত্বের ভিত্তিতে লাহোর প্রস্তাব (মার্চ, ১৯৪০) দেশ-বিভাগের তাত্ত্বিক ভিত রচনা করে।’ তবে লাহোর প্রস্তাবে  যে-অস্পষ্টতা ছিল, তা সংবিধান-বিশেষজ্ঞ ড. আম্বেদ করের পাকিস্তান অর পার্টিশন অব ইন্ডিয়া গ্রন্থের সূত্রে তুলে ধরেছেন। শুধু অস্পষ্টতাই নয়, ছিল স্ববিরোধিতাও। লেখক এ-ব্যাপারে প্রাসঙ্গিক মন্তব্য গ্রহণ করেছেন এইচ ভি হডসনের দেশ-বিভাগ বিষয়ক গবেষণাধর্মী গ্রন্থ দ্য গ্রেট ডিভাইড গ্রন্থ থেকেও।

ফলে লাহোর প্রস্তাব সম্পর্কে জিন্নাহ যে-ভূমিকা নিয়েছিলেন তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সমালোচিত তিনি। এই গ্রন্থের লেখকও তাই উচ্চারণ করেন, ‘আমাদের বিস্ময় যে, জিন্নাহ নিজে একজন আইন-বিশেষজ্ঞ হয়েও এ-ধরনের একটি অস্পষ্ট, স্ববিরোধী প্রস্তাব উপহার দিলেন কী মনে করে।’ লেখক বলেন, ‘এ প্রস্তাবের বড় স্ববিরোধিতা হলো যেখানে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র বাসভূমির দাবিতে দেশভাগ করা হচ্ছে সেই স্বতন্ত্ররাষ্ট্রে তথা পাক ভূমিতে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের উপস্থিতি।… এভাবে আরো স্পষ্ট নীতিগত স্ববিরোধিতার পক্ষে মন্তব্য তুলে ধরেছেন লেখক। লেখক অবশ্য শেরে বাংলাকেও এ-দায় থেকে মুক্ত রাখেননি। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ছিলেন লাহোর প্রস্তাবের উপস্থাপনকারী। তাই লেখক বলেছেন, ‘তিনিইবা কীভাবে এমন একটি ধোঁয়াটে প্রস্তাব তুলে ধরলেন এর সবদিক না দেখে, না বুঝে।’

তাই বলা যায়, ভারত ভাগের পেছনে শুধুই সাম্প্রদায়িক কারণ নয়, অর্থনৈতিক কারণও আছে। এক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমান অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। কারণ তাদের আর্থ-সামাজিক পশ্চাৎপদতা – একদিকে যেমন বিশাল কৃষক-শ্রমজীবী শ্রেণি, তেমনি উঠতি শিক্ষিত শ্রেণি, ছাত্রযুবাদের আকাঙ্ক্ষা প্রতিযোগিতাহীন স্বদেশ। লেখক পাকিস্তান অর্জনের স্বপ্নে একজন মুসলিম গ্রামীণ দিনমজুরের আনন্দ-অনুভূতির বাস্তবতার মধ্য দিয়ে দেশভাগের অনিবার্য সত্যকে প্রকাশ করেছেন।

এরপর পেছন ফিরে তাকিয়েছেন উনিশ থেকে বিশ শতকে অগ্রসর হিন্দু শিক্ষিত শ্রেণিরা সমৃদ্ধি নিয়ে – বঙ্গবিভাগবিরোধী আন্দোলনের বাস্তবতা ও অবাস্তবতা চিত্রণে জাতীয়তাবাদে হিন্দুত্ববাদের প্রতিক্রিয়াশীল প্রভাবের বিবরণে।

এ-বিষয়ে লেখক বিস্তারিত আলোচনা করেছেন মার্লি-মিন্টো বা মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার ও ১৯৩৫-এর সম্প্রদায়বাদী  আইন-স্বতন্ত্র নির্বাচন, যা দুই সম্প্রদায়ের পথচলা ভিন্ন করে দেয়।

লেখকের মতে এটা বিভাজনের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক –

জিন্নাহ-প্রভাবিত মুসলিম লীগ মুসলমান স্বার্থ নিয়ে যেসব দাবি-দাওয়া জানাতে শুরু করে, সেক্ষেত্রে কংগ্রেসের ভুলভ্রান্তি লীগকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে – যেমন ১৯৩৭-এর নির্বাচনে বঙ্গে হকের সঙ্গে কোয়ালিশন না করা, যা লীগকে একচেটিয়া ক্ষমতাবিস্তারে সহায়তা করে। হকের উচ্চাভিলাষও এজন্য দায়ী। দ্বিতীয়ত, উত্তর প্রদেশে কোয়ালিশন না করা আরেক ভুল কংগ্রেসের। এবার জিন্নাহ পুরোপুরি বিরোধী হয়ে ওঠেন কংগ্রেসের।

মুসলিম লীগের শক্তিবৃদ্ধিও ভারতভাগে মূলত বাংলা, পাঞ্জাব ও উত্তর প্রদেশের রাজনীতি প্রধান factor – হিন্দু মহাজন-প্রভাবিত কংগ্রেসে অনমনীয়তা প্রথম পর্বে বিভাজনের পথ তৈরি করে। ফলে ১৯৪০ সালে বিভাজক লাহোর প্রস্তাব (পাকিস্তান প্রস্তাব) পাশ হয়। পরে কংগ্রেস কিছুটা নমনীয় হলেও জিন্নাহর অনমনীয়তা দেশভাগের পথ তৈরি করে।

কেবিনেট মিশন প্রস্তাব ঘিরে লীগ, কংগ্রেসের টানাপড়েন। জিন্নাহর অনমনীয় মনোভাব সিমলা কনফারেন্সে – ওয়াভেনের সদিচ্ছা ব্যর্থ হয়। দেশ-বিভাগের কফিনে সর্বশেষ পেরেক পোতা হয় – নেহরুর অদূরদর্শী মন্তব্যে এবং সেই সূত্রে জিন্নাহর ভয়াবহ প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস ঘোষণায়, যা ১৯৪৬ আগস্টে ভয়াবহ কলকাতা দাঙ্গা ঘটায়, যা দেশভাগ নিশ্চিত করে। দেশভাগের ফলে যে উদ্বাস্ত্ত সমস্যা প্রকট হয় এ-সম্পর্কেও বাস্তবনিষ্ঠ তথ্য তুলে ধরেছেন লেখক তাঁর অভিজ্ঞতা ও অন্যান্য বিখ্যাত লেখকের গ্রন্থের আলোকে। লেখক আহমদ রফিকের মন্তব্য এক্ষেত্রে স্মর্তব্য – ‘দেশভাগের পরিণাম সম্প্রদায়গত বিভাজন ঘটিয়েই শেষ হয়নি। উদ্বাস্ত্ত সমস্যা ঘিরে পশ্চিমবঙ্গে আঞ্চলিক বিভেদেরও জন্ম দিয়েছে। ভাগ্যতাড়িত একশ্রেণির মানুষের জন্ম দিয়েছে যাদের নাম ‘রিফিউজি’ তথা বাস্ত্তত্যাগী, শরণার্থী। পাঞ্জাব থেকে বাংলা পর্যন্ত এ-ট্র্যাজেডির বিস্তার। তবে স্বধর্মীয়দের আঞ্চলিক মানবিক বিভাজন একমাত্র তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গে দেখা গেছে। একে বাঙাল, তায় বাস্ত্তত্যাগী। … দেশভাগ বাংলা ভূখন্ড ও বাঙালি জাতিসত্তাকে এবং তার দুই প্রধান ধর্মসম্প্রদায়ের চেতনাকেই শুধু বিভক্ত করেনি, ভূখন্ড-ভিত্তিতে ও চৈতন্যের জগতে সমধর্মী সম্প্রদায় বিশেষকেও দ্বিখন্ডিত করেছে। এ বিভাজন স্বাভাবিক নয়, রাষ্ট্রবিজ্ঞানভিত্তিকও নয়। ইতিহাস যে-কোনো ঘটনাকে তার আপন তাৎপর্যে মেনে নেয়, কিন্তু সমাজবিজ্ঞানের বিচারে তা গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।

প্রসঙ্গত বিপরীত চরিত্রের একটি ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে যেমন তুলেছেন সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে বিশ্লেষণে দীপক পিপলাই। তার প্রশ্ন, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মুসলমানদের নিয়ে, যাদের মধ্যে বাস্ত্তত্যাগীর সংখ্যা পূর্ববঙ্গীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের তুলনায় অনেক কম। তার ভাষায়, ‘বারবার দাঙ্গা ও গণহত্যা সত্ত্বেও হিন্দুপ্রধান দেশে বাঙালি মুসলিমদের বাস করা যদি স্বাভাবিক হয়, তাহলে মুসলিমপ্রধান দেশে বাঙালি মুসলিমদের পক্ষে ‘চৌদ্দপুরুষের ভিটে’তে থেকে যাওয়াই স্বাভাবিক নয় কেন?’ একই কথা বলেন আরেক বাস্ত্তত্যাগী সমাজসেবী প্রাণতোষ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি পূর্বাপর সহাবস্থানে বিশ্বাসী, ধর্ম ও ভূখন্ড নির্বিশেষে। আর সেজন্য স্বধর্মীর অবজ্ঞা থেকে আপন হীনমন্যতার মধ্যেই জন্ম নেয় তাদের প্রতিবাদী চেতনা যা রাজনীতিকেও স্পর্শ করে।’

দেশভাগের মূল ঘটক মাউন্ট ব্যাটেন ও তার চাতুর্য – তাকে পরোক্ষ সাহায্য করেছে নেহরু প্যাটেল – প্রত্যক্ষভাবে জিন্নাহ পাকিস্তান দাবিতে অনড় থেকে। তাই আহমদ রফিকের মন্তব্য খুবই প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছেন, ‘বিপ্লবে নয়, বিদ্রোহে নয়, ভারতে ক্ষমতার হস্তান্তর আপসবাদী পথে। ব্রিটিশরাজের প্রতিনিধি হিসেবে ভাইসরয় মাউন্ট ব্যাটেন তাঁর চতুর হিসাবমাফিক ভারত বিভাগের মাধ্যমে তাদের ভারতত্যাগের সিদ্ধান্ত কার্যকর করেন। ভারত ও পাকিস্তান নামক দুই ডোমিনিয়নের শাসনভার তুলে দেন যথাক্রমে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের হাতে। ক্ষমতার হস্তান্তরও হয় ১৫ আগস্ট মধ্যরাতের আগে ও পরে। কংগ্রেস ও লীগের পক্ষে এ-অনুষ্ঠানের নায়ক যথাক্রমে জওহরলাল নেহরু ও মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ।’

অন্তর্বর্তী সরকার অকার্যকর করার প্রধান ব্যক্তি জিন্নাহ – তার চতুর আইনিবুদ্ধিতে –  মোটকথা, তার জেদ, অহমবোধ মেটাতেই ভারতভাগ।

গ্রন্থের শেষ পর্যায়ের দুটি রচনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ক. দেশবিভাগ বিচার : একুশ শতকে দাঁড়িয়ে-১; খ. দেশবিভাগ বিচার : একুশ শতকে দাঁড়িয়ে-২।

আহমদ রফিক অকপটে রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার নিরিখে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে যারা নিয়ন্ত্রণ করে সেসব খ্যাতিমান রাজনৈতিক ব্যক্তির কথাও ব্যক্ত করেছেন। ‘দেশবিভাগ বিচার’-এর দুটি লেখায়, যাদের ভূমিকা দেশভাগকে অনিবার্য করে তুলেছে। এজন্য আহমদ রফিক মন্তব্য করেছেন এই বলে যে, ‘ভারতীয় রাজনীতির দুর্ভাগ্য যে, সে যুক্তিবাদী ও সেক্যুলার চিন্তার বিচক্ষণতায় ভর দিয়ে বরাবর চলতে পারেনি। বরং স্ববিরোধিতা তার চলার পথ নিয়ন্ত্রণ করেছে।… ১৯০৫ সন থেকে চার দশকের রাজনৈতিক ঘটনাবলী ও নেতাদের আচরণে তেমন আভাস মেলে।’

লেখকের প্রশ্ন – দেশ-বিভাগ কি অনিবার্য ছিল? জবাব – ছিল না। লীগ কংগ্রেসের দ্বন্দ্ব ও ব্রিটিশ চাতুর্য তা অনিবার্য করেছে। ফলে হিন্দু, মুসলিম, শিখ এই তিনের রাজনীতি-প্রভাবিত নর-নারী শিশু হত্যার মধ্য দিয়ে পাকিস্তান অর্থাৎ দেশভাগ-ঘৃণা বিদ্বেষের উত্তরাধিকার নিয়ে যা এখনো দৃশ্যমান। জাতিসত্তার অধিকারসহ সংযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রই ছিল সঠিক পথ।

 

শঙ্খ ঘোষের
চিন্তাজগৎ
মুহম্মদ সাইফুল ইসলাম

নির্বাচিত প্রবন্ধ : নানাপ্রসঙ্গ
নির্বাচিত প্রবন্ধ : রবীন্দ্রনাথ
শঙ্খ ঘোষ

কথাপ্রকাশ
ঢাকা, ২০১৪
৩০০ টাকা

 

ঐকান্তিক ভাবনার পরশে অসাধারণ এই প্রকাশ। মননের শান্ত নিবিড়তায় সৃষ্ট এই প্রকাশের সঙ্গ যেমন আনন্দের, তেমনি মূল্যবান অভিজ্ঞতার। শঙ্খ ঘোষের এই প্রথম কোনো বই বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত হলো। কবিতার নয় এ-বই, প্রবন্ধের; চিন্তাঘন আবেষ্টনী আর সাহিত্যের শুদ্ধ আবেগ এ-বইয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য। বলা যেতে পারে, বাংলাদেশের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পক্ষে এ-প্রকাশনা একটি স্মরণীয় ও অভিনন্দনযোগ্য সংযোজন।

শঙ্খ ঘোষের, দুখন্ডে প্রকাশিত এ-বইয়ের প্রথম খন্ডের বিষয় রবীন্দ্রনাথ, প্রবন্ধসংখ্যা ২০; দ্বিতীয় খন্ডে সংকলিত হয়েছে তাঁর ‘নানা বিষয়ের ভাবনা’, প্রবন্ধসংখ্যা ২৫। বলে নেওয়া ভালো, তাঁর অনুরাগী ও তাঁর গদ্যশৈলীর গুণমুগ্ধ পাঠক আছেন অগণিত, সংকলিত রচনাগুলোর, অধিকাংশের সঙ্গে ইতোমধ্যে যাঁদের পরিচয় আছে বিলক্ষণ। তবু এ-সংকলন যে মূল্যবান, তার কারণ, পূর্বে প্রকাশিত তাঁর নানা গ্রন্থ থেকে নিয়ে সাজানো সুনির্বাচিত বক্তব্যের এইসব রচনার সঙ্গে নতুন করে পরিচয় ঘটল তাঁর সমস্ত বাংলাভাষী ও বাংলাদেশের পাঠকের। অন্য একটি সংবাদও বাংলাদেশের পাঠকের জন্যে পরিবেশন করা বিশেষ আনন্দের। নির্বাচিত প্রবন্ধের দুটি খন্ড শঙ্খ ঘোষ উৎসর্গ করেছেন বাংলাদেশের দুজন মনস্বী ব্যক্তিকে। এঁদের একজন আবুল হাসনাত, অন্যজন মফিদুল হক।

দুই

এ প্রসঙ্গে আমরা মনে রাখতে পারি, কবি হিসেবেই তিনি সুপরিচিত, ভারতে এবং বাংলাদেশে। সেটাই তাঁর প্রধান ও যথার্থ পরিচয়। মানসাকর্ষণে কাব্য-সৃষ্টিই তাঁর স্বধর্ম। সেখানে তিনি ‘শব্দের ভিতরে অন্তঃশীল নৈঃশব্দ্যে’ খুঁজে পান তাঁর পরম সত্য। আমরা তাঁর কবিতা থেকে বুঝে নিতে পারি তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাসের ওঠানামা, তাঁর কণ্ঠস্বরের স্বকীয়তা, তাঁর স্বরভঙ্গির মৌল প্রবণতা। কেননা আত্মোন্মোচনে সেখানেই তাঁর পরিচয় ফুটেছে ভালো। সেখানে বাঁধা পড়ে গেছে তাঁর মনের ইতিহাস – তাঁর মননের ইতিবৃত্ত। কাজেই তাঁর মনের চলাচল, জীবনের নানা গতিবিধির সংবাদ তাঁর কবিতা থেকে পাওয়া সম্ভব। কারণ জীবনের অভিজ্ঞতাকে তিনি কবিতায় ধারণ করেছেন – প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন বুদ্ধি আর আবেগের যোগ্য মিলনে। সন্দেহ কী, কবিতা তেমনি এক শিল্পমাধ্যম, যা ভাবকে ভাষায় বাঁধে। মানুষ এমন করে সমুজ্জ্বল আধারে ভাবকে বাঁধার আর কোনো কৌশল আয়ত্ত করতে পারেনি। তারই সাধনায় ব্যাপৃত হয়েছে শঙ্খ ঘোষের জীবন।

আত্মোন্মোচনের এমন সর্বোৎকৃষ্ট শিল্পের ভাষা আয়ত্ত করার পরও শঙ্খ ঘোষ লিখেছেন, ‘সত্যকে কখনো একপাশ থেকে দেখা যায় না। সেভাবে দেখলে তাঁর আধখানা মুখ মাত্র চোখে পড়ে।’ সেজন্যে কি সমাজ-সভ্যতা আর সাহিত্য বিষয়ে তাঁর বলার কথাও অজস্র? এর থেকে বুঝতে অসুবিধা নেই আর, একমাত্র কাব্যেই তিনি নিজেকে নিঃশেষ করে দেননি।

সত্য যে, গদ্যেও তিনি প্রকাশ করেছেন তাঁর বহুবিধ বক্তব্য। সাহিত্য বাদেও সেখানে আছে দেশনীতি, রাজনীতি, সমাজভাবনার খুঁটিনাটি আর আত্মঘাতী মানুষের বিচিত্রধর্মী মিথ্যাচারের বয়ান। ভাষা আজ মানুষের মিথ্যাচার এবং আত্ম-প্রবঞ্চনার শপিংমল খুলে বসেছে। এই নিয়েও দুপাতা কথার ধিক্কার নিঃশব্দে উচ্চারিত হয়েছে তাঁর রচনায়। এসবই এসেছে একটির টানে আরেকটি। সবই নির্বিশেষ মানুষেরই জন্যে। সবমিলে তৈরি হয়েছে শঙ্খ ঘোষের গদ্যভাষ্য। কীভাবে তৈরি হয়েছে তাঁর এ-ভাষ্য, সে-সম্পর্কে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘গদ্যের দাবিদাররা চাপ দিতে দিতে যখন শেষ সীমায় এনে ফেলেন, ত্রস্ত আর কুণ্ঠিতভাবে তখনই কেবল লিখতে বসি অগত্যা।’ লেখা হয়ে ওঠে তাঁর গদ্য-রচনা। নির্বাচিত প্রবন্ধের দ্বিতীয় খন্ডের ‘সূচনাকথা’য় তিনি এ-সম্পর্কে আরো লিখেছেন, ‘গদ্য লেখায় বরাবরই আমি আলস্য বোধ করেছি, এমনকি অনিচ্ছা। তা সত্ত্বেও, বাইরের নানা চাপের বশীভূত হয়ে, লিখেও ফেলেছি কিছু। এতদিন পরে মনে হয়, তার বহর নিতান্ত কম নয়।’ বলে নেওয়ায় ক্ষতি নেই, আমাদের আলোচ্য বইয়ে তাঁর সংকলিত রচনাগুলির যে ‘বহরে’র কথা ইতোমধ্যে আমরা উল্লেখ করেছি, তারও সমস্তের আলোচনা সম্ভব নয় বর্তমান ক্ষেত্রে। অবশ্য তার প্রয়োজনও নেই। আমরা কেবল তাঁর দু-একটি প্রধান কথার খেই ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবো এখানে। আশা করব, তাতেই তাঁর প্রবন্ধের স্বাদ ও বক্তব্যের চরিত্র টের পাওয়া যাবে।

এই যে শঙ্খ ঘোষ বলেছেন, সত্যের নাগাল পাওয়া যায় না, তাকে কেবল একটা মাত্র দিক থেকে দেখলে – এই কথাটি বড়ো মূল্যবান। কবিতায় কবির সত্য-উপলব্ধির প্রকাশ ঘটে এক রকমভাবে – গদ্যে তার প্রকাশ হয় ভিন্নরকম মাত্রায়। এই নানা বিরোধী মাত্রা থেকে সত্যকে জানতে হয়। কথাটা বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করা যাক শঙ্খ ঘোষের দেওয়া একটা তথ্য থেকে। সত্যি সত্যিই যিনি একজন লেখক – যাঁর বলার মতো কথা আছে – যিনি মনে করেন, তাঁর সময়টাই একমাত্র শেষ সময় নয়, ভবিতব্য বলেও একটা সময় আছে, সেরকম একজন দায়িত্বশীল লেখকের পরিণাম সম্পর্কে বলতে গিয়ে ‘লেখকের নিয়তি’ প্রবন্ধে শঙ্খ ঘোষ স্মরণ করছেন, প্রাণের সাড়া যখন কোথাও মিলছে না, নৈঃশব্দ্যের মতো নির্পতগ মাটিতে যখন কিছুই ফলছে না, তখন ‘করুণা আর পরিহাস একই সঙ্গে জমে ওঠে মনের মধ্যে।’ তখন ‘এই বিরোধী বৃত্তির মধ্য থেকেই আমাদের জানতে হয় সত্য।’ কারণ, তিনি একজন বিবেকী লেখকের অভিজ্ঞতায় দেখেছেন, ‘যে-কোনো কাজে হাত দিতে গেলে ঝুঁকে পড়ে শল্যময় উৎপাত।’ এ-অবস্থায় ‘মোরগের ডাক, নারীর চকিত দৃষ্টি অথবা জলে মাছের ঘাই দেখতে দেখতে আমি যে আমার বাসভূমিকে আরো একটু বাসযোগ্য করে যেতে পারব, অভিজ্ঞতা এমন কথা বলে না।’ ভয়ংকর এই অভিজ্ঞতা! কারণ এখানে ‘রাষ্ট্রনীতির কলরোল মিথ্যে বলে শুধু। দলীয়তার পেষণে ঝরে যায় ব্যক্তি। প্রমোশন বা বিজ্ঞাপনের নষ্টামিতে মানুষের মন চিরদিনের মতো সরে যায় প্রেম থেকে, সৌন্দর্য থেকে।’ এমন অকরুণ সমাজে, এরকম হৃদয়হীন পরিবেশে বাস করেও আমরা যদি আমাদের যাত্রাপথে চাই সুন্দরকে গড়ে তুলতে, চাই যদি ভালোবাসার সেতু মন থেকে মনে, তবে আমাদের ‘কেবলই দাঁড়াতে হবে এই দলীয়তা এই কলরোল এই প্রমোশন-লোলুপতা বা বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে, কাজে এবং কথায়।’ শঙ্খ ঘোষ বলছেন, ‘কাজে, সে হলো আপনার ব্যক্তিগত উত্তরণ। কথায়, সে হলো আপনার বন্ধুজনের পরিচর্যা, আপনার পরিবেশের প্রতিষেধক।’ এমনিভাবে ‘আমার যতটুকু সাধ্য, সবিনয়ে ততখানি কাজ করে যাওয়াই আমার ভবিতব্য – আর বলাও আমার কাজ – তার ফল কতটা হলো সেটা এই মুহূর্তে আমার বিবেচনার বিষয় নয়! লেখকের পক্ষে এই হলো একমাত্র, একমাত্র ভাবনা।’ একজন যথার্থ লেখকের পক্ষে এর চেয়ে খাঁটি কথা আর কিছু হতে পারে না। শঙ্খ ঘোষ এখানে লেখকের স্বধর্মের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। সংবেদনার সঙ্গে বলেছেন, ‘আর-সকলে মিথ্যা বলে বলুক, দু-চারজনের কাছে আমরা সত্য চাই। আর-সকলে ভ্রান্ত করে করুক, দু-চারজনের কাছে আমরা ব্রত চাই।’ – শঙ্খ ঘোষ স্বয়ং এই ‘দু-চারজনের’ ভিতরের একজন সতর্ক সৃজনবুদ্ধির লেখক। সত্য যাচাইয়ের একটা শান্ত এবং দৃঢ়কণ্ঠ তাঁর প্রবন্ধের সর্বপ্রধান বৈশিষ্ট্য। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে লেখা তাঁর রচনাগুলির মধ্যেও এই একই রূপ চোখে পড়ে।

তিন

আজ আর কোনো সন্দেহ নেই যে, রবীন্দ্রচর্চা বাংলা সাহিত্যচর্চারই একটা সুসংগঠিত ধারা। এই ধারা নানা খাতে প্রবাহিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। ভালো-মন্দ মিলিয়ে, আমাদের চোখে পড়ে তার সেই নানা রঙা চেহারা। আজ যেমন আমাদের আধুনিক জীবনে রবীন্দ্র-সাহিত্যের একটা প্রধান স্থান জুড়েছে কেবল প্রতিপত্তি-রচনায়, ব্যবসায়িকতায়, রাজনৈতিক বিতর্কে এবং জীবিকা অর্জনে; তেমনি একটা সময় ছিল, যখন তাঁকে বড়ো করে তোলা হয়েছিল তাঁর সৃষ্টির স্বরূপ না বুঝে। আমাদের কাছে রবীন্দ্রনাথ এখন প্রায় মুনাফাসর্বস্ব বিষয়। অনেকের কাছে রুটিরুজির ব্যাপার, করে-খাওয়ার জায়গা। শঙ্খ ঘোষ বলেছেন, এর মধ্যে কোথাও বিন্দুমাত্র যথার্থ সাহিত্যিক বিবেচনা নেই। যেমন ছিল না রবীন্দ্রচর্চার শুরু থেকে দীর্ঘকাল। বলা বাহুল্য, এখনকার মতলব প্রায় সবক্ষেত্রেই আত্মপ্রতারণা; তখনকার জিগির ছিল আত্মগৌরব প্রচার। বলা হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথ যে এত বড়ো সাহিত্য-স্রষ্টা, তার কারণ তিনি মহাপুরুষ; কেবল তাই নয়, তিনি একটি মহৎ বংশের মহত্তম রত্ন। তাঁর সাহিত্য নিয়ে বিচার ছিল না তখন, ছিল তাঁর আভিজাত্য নিয়ে উচ্ছ্বাস, রোমান্টিকতা; দ্বারকানাথ ঠাকুরের পৌত্র হিসেবে ধনে ও মর্যাদায় তিনি যে ভারতবর্ষের একজন মহাকবি, নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ও নাইট উপাধিপ্রাপ্ত পুরুষসিংহ – এসব অবৈধ ও অবান্তর কথার বর্ষণ অবিরল ধারায় বর্ষিত হয়েছিল তখন। কাব্য-বিবেচনা নয়, কবি রবীন্দ্রনাথের জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল তাঁর জমিদারিত্ব, তাঁর পিতা দেবেন্দ্রনাথের মহর্ষিত্ব, তাঁর ঠাকুরদা দ্বারকানাথের প্রিন্স উপাধির সম্মোহন। একদিকে খামোকা ফেঁপে উঠেছিল রবীন্দ্রনাথের আত্মীয়-বন্ধুর বিস্তৃত তালিকা, অন্যদিকে তাঁরই রচিত অজস্র কথার উদ্ধৃতি-সংকলন। তৈরি হয়ে উঠেছিল রবীন্দ্রনাথের এক অচলায়তনিক মহীরুহ শবমূর্তি – যার সুপরিচিত নাম গুরুদেব। আজো বিপুল অধিকাংশ অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন মানুষের কাছে তিনি বিশ্বকবি। অজিতকুমার চক্রবর্তী, প্রমথনাথ বিশী, ক্ষিতিমোহন  সেন, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ, মোহিতলাল মজুমদার, মৈত্রেয়ী দেবী প্রমুখ রবীন্দ্র-সমালোচকের সরণি বেয়ে নীরদচন্দ্র চৌধুরী, কৃষ্ণকৃপালনি, শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, জগদীশ ভট্টাচার্য, কেতকী কুশারী ডাইসনের নেতৃত্বে এই ‘আব্রহ্মস্তম্ভব্যাপী বিরাট সত্তার যে রসরূপ আবিষ্কারে’র কাজ চলছিল, তার লক্ষ্য ছিল রবীন্দ্রনাথের ‘কাব্য-আত্মা’কে কলঙ্কমলিনতা থেকে তুলে ‘উচ্চতর ভাবলোকে উদ্বর্তিত’ করা। জীবিতকালেই রবীন্দ্রনাথ দেখতে পেয়েছিলেন তাঁর প্রতি এইসব তেল-রঙের ব্যবহার! এ জন্যেই কী তিনি লিখেছিলেন, ‘তুমি মোর পাও নাই পরিচয়’?

শঙ্খ ঘোষ ‘কবির অভিপ্রায়’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথের একটি গুরুদেব মূর্তি আমাদের সামনে তৈরি হয়ে ছিল অনেক দিন। দীর্ঘকাল জুড়ে অনেক প্রতিকৃতি ছাপা হয়েছে তাঁর, কিন্তু নামটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে অনেকেরই চোখের সামনে ভেসে ওঠে শুধু শাদা দাড়ির এক দেবোপম মুখ, পশ্চিমে অনেকেই যার তুলনা দেবার জন্য চলে যান খ্রিস্টমুখ পর্যন্ত।’ আজ আমরা জেনেছি, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে গড়ে তোলা এই ‘দেবোপম’ মূর্তি ভেঙে ফেলার অভিযানে আবু সয়ীদ আইয়ুবের ছিল একটা বড় রকমের পদক্ষেপ। এ বিষয়ে তরুণ বুদ্ধদেব বসুর জিজ্ঞাসাও ছিল থমকে দাঁড়াবার মতো এক স্মরণযোগ্য হস্তক্ষেপ। রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত মহত্ত্ব মেনে, বুদ্ধদেব রবীন্দ্র-সাহিত্যের একটা নৈর্ব্যক্তিক সমালোচনার কথা তুলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সেখানে কেবল রবীন্দ্রনাথের নিজের ভাষ্যের অনুবর্তন থাকবে না, থাকবে তাঁর সীমানা ডিঙোবার অভিপ্রায়ও। এবং তাতেই আসল রবীন্দ্রনাথকে পাওয়া সম্ভব বলে তিনি মনে করতেন। আবু সয়ীদ আইয়ুব কিংবা বুদ্ধদেব বসুর এই ধারণা ও অভিপ্রায়ের একজন অসাধারণ ভাষ্যকার হচ্ছেন শঙ্খ ঘোষ। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আলোচ্য প্রবন্ধগুলোতে তাঁর যে-মেজাজ লক্ষ করা যায়, তা আইয়ুবের চিন্তার পাশে উচ্চারিত হওয়ার যোগ্য। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, একজন কবির ‘সমস্ত কাব্যের ভিতর দিয়া বিশ্ব কোন্ বাণীরূপে আপনাকে প্রকাশ করিতেছে, তাহাই বুঝিবার যোগ্য।’ এই সূত্র ধরে আইয়ুব ‘কবি রবীন্দ্রনাথের সমগ্র বিশ্বনিরীক্ষা ও জীবনবোধ কেমন ক’রে পর্যায়ক্রমে পরিবর্তিত ও পরিণত হয়েছে’ তারই ভাষ্য রচনা করতে চেয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথের ‘লেখার সঙ্গে সম্পর্কহীন সেই ইমেজগত বিজ্ঞাপন’ নয়। শঙ্খ ঘোষ লিখেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ে, রবীন্দ্রনাথের গান শুনে, রবীন্দ্রনাথের নাটক দেখে আমরা কি রবীন্দ্রনাথকেই চাই, তাঁকেই জানতে চাই আরো বেশি বেশি করে? নাকি জানতে চাই সেই কথাটুকু, সেই বেদনাগুলি, যা তিনি বলতে চেয়েছিলেন?’ এ জিজ্ঞাসার উত্তর দিয়েছেন তিনি এভাবে : ‘লেখাকেই আমরা চাই, লেখককে নয়। নিষ্ঠুর শোনালেও কথাটা সত্য যে সোনার ধানটুকুকেই চাই আমরা : নৌকোয় যিনি তুলে দিয়েছিলেন, তাঁকে নয়।’ কেননা ‘তাঁকে’ চাইলে নতুনতর আঙ্গিকে ‘একটা উলটে-ধরা গুরুবাদ’ তৈরি হয়। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তাঁর  এরকম নির্মোহ বক্তব্যের কারণে হয়তো আলোচ্য বইয়ের পরিচিতিতে বলা হয়েছে, ‘রবীন্দ্র-প্রসঙ্গে লেখা শেষ হয় না শঙ্খ ঘোষের। শেষ করতে চান হয়তো, ভাবেন যে লিখবেন না আর, রবিকে নিয়ে। কিন্তু তাঁর লেখায় ঘুরে-ফিরে আসেন তিনি, অনিঃশেষ রবীন্দ্রনাথ। আসেন শুধু তথ্যের জন্যে নয়, তত্ত্ব হয়ে নয়, প্রমাণ হিসেবেও নয়। আসেন সত্য হয়ে – কখনো বাস্তব, কখনো-বা কাব্য-সত্যের আলোয়, জীবনের ধ্রুব নক্ষত্রের মতো যেন। শঙ্খ ঘোষ রবি-বিশারদ নন, ব্যাখ্যাতা, ভাষ্যকার তাঁকে বলা যায় না। অথচ তিনি এ সবই। তিনি কি শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্র-প্রেমিক? রবীন্দ্রনাথ কি তাঁর ‘প্রাণের সখা’? অসম্ভব নয়। রবীন্দ্র-প্রসঙ্গের অনেক লেখা থেকে বাছাই করা বর্তমান রচনাগুলো বলে দেয় শঙ্খ ঘোষের উল্লিখিত আত্মদর্শন। ‘শীলিত বুদ্ধি আর আবেগের শুদ্ধতায় উজ্জ্বল ভাষার শিল্পে রচনাগুলি অনন্য’ – এ মূল্যায়নে অত্যুক্তি নেই। কারণ জীবনের পরিকল্পনায় ও জীবনের আদর্শসৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথের যে সাধনা ছিল, নিজের জীবনের সঙ্গে সেটা মিলিয়ে দেখার ও বিচার করার প্রয়াস ও প্রযত্ন শঙ্খ ঘোষের রবীন্দ্র-ভাষ্যের মৌল তাৎপর্য।

 

অস্তহীন স্মৃতিপূর্ণিমা
পিয়াস মজিদ

আমার জীবন ও অন্যান্য
মুর্তজা বশীর

বেঙ্গল পাবলিকেশন্স লি.
ঢাকা, ২০১৫
৫২৫ টাকা

চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীরের সদ্যপ্রকাশিত মুক্তস্মৃতি ও গদ্যসংকলন আমার জীবন ও অন্যান্য। ‘দেয়াল’, ‘শহিদ-শিরোনাম’, ‘পাখা’, ‘রমণী’ ইত্যাদি বহুখ্যাত সিরিজ চিত্রমালার শিল্পী মানুষটি আমাদের সাহিত্যসংসারেও এক সুজ্ঞাত নাম। তোমাকেই শুধু, ত্রসরেণু, এসো ফিরে অনসূয়া শীর্ষক কবিতাগ্রন্থ, গল্পগ্রন্থ কাচের পাখির গান, উপন্যাস আলট্রামেরিন আর গবেষণাগদ্য মুদ্রা ও শিলালিপির আলোকে বাংলার হাবসী সুলতান ও তৎকালীন সমাজ এবং নানা অগ্রন্থিত লেখাপত্রে তাঁর লেখকসত্তা অনন্য বিশিষ্টতায় ভাস্বর। বর্তমান বিশালায়তন গ্রন্থটি শুরু হয়েছে ‘আমার ছেলেবেলা’ নাম্নী আত্মকথার প্রাথমিক-লেখ দিয়ে আর সমাপ্তি নোঙর বেঁধেছে ‘তৃষিত নদী’ শীর্ষক শখানেক পৃষ্ঠার সম্পূরক স্মৃতিভাষ্যের মধ্য দিয়ে। ‘প্রসঙ্গ-কথা’য় বইয়ের প্রকাশক বেঙ্গল পাবলিকেশন্সের পক্ষে আবুল হাসনাতের আশাবাদ ‘আশা করি পাঠক শিল্পী মুর্তজা বশীরের বৈচিত্র্যময় ও বহুকৌণিক এই রচনাগুচ্ছ থেকে বৃহত্তর এক ভুবনের সাক্ষাৎলাভ করবেন।’ এই আশাবাদ নিয়ে বইটির পাঠ-সমাপনান্তে মোটেও হতাশ হতে হয় না। কারণ প্রায় অর্ধশত পৃথক রচনায় গাঁথা এই স্মৃতি ও গদ্যগুচ্ছ লেখকেরই কথামতো সমুদ্রগামী খন্ড-খন্ড নদীতৃষ্ণারই যেন সংকেত রেখে যায় পাঠকমনে। ভাষা ও বোধে সৃষ্ট অমল জোয়ারের ঘ্রাণে এই বই পাঠককে জাগিয়ে তোলে, জাগিয়ে রাখে, উৎসুক করে ব্যক্তি-লেখকের জীবন এবং সেই সঙ্গে ফেলে আসা সময়ের সরণিতে চক্কর দিতে, যেখানে জীবন ও শিল্প অদ্বৈত অন্বয়ে বাঁধা পড়ে আছে।

এই বইভুক্ত রচনার অধিকাংশই আত্মস্মৃতি আর আছে অমর একুশেকেন্দ্রিক পাঁচটি লেখা, পন্ডিত পিতা ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ সম্পর্কিত তিনটি লেখা, শিল্পী জয়নুল আবেদিন-কামরুল হাসান-এসএম সুলতান-আমিনুল ইসলাম-কাইয়ুম চৌধুরী-সোমনাথ হোর-রশিদ চৌধুরী, কবিবন্ধু শামসুর রাহমান, উর্দু কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজ সম্পর্কে স্মৃতি, রাজনৈতিক জীবন ও জেলখাটা, ’৪৩-এর দুর্ভিক্ষ থেকে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ঢাকার অলিগলি-মহল্লা থেকে চট্টগ্রামের সমুদ্রটিলা নিয়ে নোনা ও মিষ্টি সব স্মৃতি। আছে চিত্রশিল্পের ব্যাকরণ নিয়ে নানা কথা, ভ্যান গঘের নন্দনতত্ত্ব থেকে হাসনাত আবদুল হাইয়ের ভ্রমণসাহিত্য নিয়ে আলোচনা আর অনিবার্যভাবেই আছে শিল্পকলা-সংস্কৃতির নানা নিবিড় নির্যাস।

 

দুই

এই আত্মকথা প্রকৃতার্থে আকাঙ্ক্ষার গল্প; ব্যক্তি যখন ব্যক্তিগত স্থূল আকাঙ্ক্ষার গন্ডি ছাপিয়ে আকাশমুখী হয়ে ওঠে তখন             সাফল্য-ব্যর্থতার বাইরে এক সদাচঞ্চল জীবন সে পায় যা আমাদের জন্য হয় বিপুল কৌতূহল-জাগানিয়া। মুর্তজা বশীর তাঁর জীবনকথার সমান্তরালে যে দর্শনবিভূতির ইঙ্গিত দিয়ে যান তা-ই তাকে সমকালীন হুল্লোড় থেকে নির্জন একক রূপে চেনায় ‘…জীবনটা একবারই আসে। জীবনটা হলো নদীর জোয়ারের পরে যখন ভাটা হয়, তখনকার সেই বালিয়াড়ির মতো নরম। তুমি চেষ্ট করো একটা হাতি হওয়ার, যেন সেখানে একটা গভীর ছাপ তুমি রেখে যেতে পারো। কিন্তু তুমি যদি একটা পিঁপড়া হও, তাহলে ছাপটা এত ক্ষুদ্র হবে যে, দেখাই যাবে না।’ (পৃ ৫৫)

হ্যাঁ, দিনানুদৈনিকের জীবনক্ষুদ্রতার ঊর্ধ্বচারী এক মহাজীবনের সাধনাই যেন ছিল শিল্পী লেখকের আরাধ্য-পরম। এই দিগন্তভিসারী জীবনদৃষ্টি থেকেই তিনি অংশ নেন মাতৃভাষা মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনে, মেহনতি মানুষের মুক্তির মিছিলে আর রেখা ও রঙের শৈল্পিক সংগ্রামে।

 

তিন

অমর একুশে তাঁর জীবনের এক মহত্তম অধ্যায়। একুশেকেন্দ্রিক বেশ কিছু স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে আবুল বরকতের শাহাদাৎ-মুহূর্তের দুর্লভ তথ্য ‘…দেখলাম প্যান্টের মধ্যে শার্ট গোঁজা, লম্বা শেভ করা একজনকে। তার সারা মুখে বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটার মতো ঘামের বিন্দু। আর কল খুলে দিলে যেমন পানি পড়ে তেমনি রক্ত ঝরছে। সে বারবার জিভ বের করছে আর বলছে – পানি পানি। আমার হাতের রুমালটা ঘামে পানিতে ভেজানো ছিল। আমি ইতস্তত করছিলাম রুমালটা নিংরে দিব কি না। সে কাটা মুরগির মতো ছটফট করছিল। অবশেষে আমি নিংড়ে দিলাম। সে ফিসফিস করে বলল, ‘আমার নাম আবুল বরকত, বিষ্ণুপ্রিয়া ভবন, পল্টন লাইন, আমার বাড়িতে খবর দিয়েন’…’ (পৃ ৭৪ )

ভাষা-আন্দোলনের এমন রক্তাপ্লুত ইতিহাস বয়ানের সঙ্গে যখন তিনি ঐতিহাসিক একুশে ফেব্রুয়ারী সংকলনের সঙ্গে তাঁর যুক্ততার কথা উল্লেখ করে নিরাসক্ত নৈর্ব্যক্তিকতায় আত্মসমালোচনা করেন এভাবে – ‘যে জন্য শহীদেরা তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছে, সেই চেতনার সঙ্গে কি নিজেকে জড়িয়ে রাখতে পেরেছি? সেই চেতনাকে কি এগিয়ে নিতে পেরেছি? যখন দেখি পারিনি, মনে হয় আমি কাপুরুষ এবং পলাতক’ (পৃ ৮৭), তখন তাঁর এই আত্মোপলব্ধি হয়ে ওঠে আমাদের সমষ্টিরই প্রাণকথা।

আর একুশের উত্তরপর্বে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচর্যায় চোখ দিলে দেখব ব্যক্তিগত স্মৃতি ও প্রামাণ্য তথ্যসূত্রের ভিত্তিতে তিনি একাত্তরের উত্তাল মার্চে শিল্পী-সাহিত্যিক-সংস্কৃতিসেবীদের সংগ্রামী ভূমিকার কালপঞ্জি প্রণয়ন করেছেন, যা মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক ইতিহাস রচনায় বিশেষ তাৎপর্যবান বলে বিবেচিত হতে পারে। ১৯৫০-এর ৭ জুন তারিখে কমিউনিস্টকর্মী হিসেবে জেলযাত্রাকে যখন তিনি আক্ষরিক কারাবাসের বৃত্তভেদী ‘দ্রোহ ও সৃজনের জেলজীবন’ শিরোনাম দেন তখন পূর্বোক্ত সেই জীবনদৃষ্টির কথাই বলতে হয়, যে-জীবন, জীবনের সীমিত সীমায় দাঁড়িয়ে গায় মহাজীবনের গান – তাই কারাবাসের কষ্টের চেয়ে তাঁর বর্ণনায় সজীব হয়ে ওঠে জেলের ভেতরে বসে রজনীগন্ধার ড্রইং অাঁকা কিংবা নয়াচীনের অভ্যুদয় নিয়ে কবিতা লেখার স্মৃতি।

খ্যাতিমান পিতা ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র সঙ্গে পুত্র মুর্তজা বশীরের সম্পর্কটা নির্দ্বান্দ্বিক ছিল না মোটেও। এ বিষয়ে অকপটে লেখক বেশ কিছু অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন তাঁর লেখায়। এক জিজ্ঞাসার জবাবে শহীদুল্লাহ্ যখন বলেন, ‘আধুনিক চিত্রের মতোই আমার ছেলে দুর্বোধ্য’ তখন উত্তরপ্রজন্মের সঙ্গে দূরত্বের প্রসঙ্গ এবং একই সঙ্গে তাদের স্বীকৃতির বিষয়টিও আড়াল থাকে না। পুত্রের কাছে ভাষা-আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ শুনে কালো পরিধেয় বস্ত্র ছিঁড়ে নিজের বাহুতে তার টুকরো বেঁধে ভাষাশহিদদের স্মরণে ব্যক্তিগত শোক উদ্যাপনের সঙ্গে সঙ্গে যখন শহীদুল্লাহ্র এমন মন্তব্য আমরা পাই – ‘নিজের মাতৃভাষার জন্য যদি তোমার প্রাণ যেতো আমার কোনো দুঃখ থাকতো না’ তখন আমরা লেখকের পিতা শহীদুল্লাহ্কে ছাপিয়ে সেই মাতৃভাষাব্রতী শহীদুল্লাহ্কে প্রত্যক্ষ করে উঠি যিনি সবসময় মা আর মাতৃভাষাকে সমমর্যাদায় স্থান দিয়েছেন।

বর্ণাঢ্য শিল্পীজীবনের উন্মেষ ও বিকাশপর্বের কথা বলতে গিয়ে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের প্রণোদনা এবং শিল্পী আমিনুল ইসলামের ঋণ স্বীকার করেন তিনি এভাবে – ‘আমিনুল ইসলাম আমাকে হাত ধরে নিয়ে গেল শিল্পকলার জগতে।’ তাঁর শিল্পজীবনে ধ্রুবতারার মতো দিকনির্দেশক আমিনুল ইসলাম সম্পর্কিত স্মৃতিত্রয়ীতে ফিরে ফিরে এসেছে তাঁর শিল্পকাজ ও ব্যক্তিসত্তার প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গ। ব্যক্তি বশীরকে আমিনুল ইসলাম যে প্রায়ই বলতেন, ‘Art is the jealous mistress… তুমি যদি একটু অবহেলা করো সে তোমাকে আর ধরা দেবে না।’  মূলত এ-কথার মধ্যেই যেন উত্তরকালের সব শিল্পীমানুষের প্রতি আমিনুল ইসলামের সাধারণ নির্দেশনা নিহিত আছে।

ইতিহাসের বিশিষ্ট চরিত্রকে মুর্তজা বশীর কেবল বহিরাঙ্গিক কৃতি বা চূড়াস্পর্শী খ্যাতির মানদন্ডে বিচার করেন না; খুঁজে বের করেন তাঁর অন্তরালের স্বর্ণবিভা। এই যেমন ১৯৬৯-এ হোটেল শাহবাগে কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে তাঁর মতো বিশিষ্টজনের সাধারণ দেশি প্রসাধনী ব্যবহারের বিষয়টি বিশদ করে তাঁর অন্তর্গত দেশপ্রেমী সত্তাকে তুলে ধরেন। আবার একান্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে নিবিড় অবলোকনের সময় তাঁর সঙ্গে সখ্য ও দূরত্ব – উভয়ই উল্লেখপূর্বক তার মানবীয় মূল্যায়নেও সচেষ্ট তিনি। কবিবন্ধু শামসুর রাহমানের স্মরণালেখ্যে তাঁর অন্তরঙ্গ সান্নিধ্যের পাশাপাশি দু-একটি বিষয়ে মৃদু দূরত্বের উল্লেখের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুর প্রয়াণকে উপলব্ধি করেন স্বীয় সত্তাব্যাপ্ত দারুণ অগ্নিবাণে। বন্ধুর মৃত্যুরূপী অগ্নিভস্ম থেকে ফিনিক্স পাখির মতো অর্জন করেন নিজের প্রত্যাশিত নবজন্ম। আবার নেহায়েত স্মৃতিচারণার মধ্যেও মুর্তজা বশীর প্রচলিত লোকসিদ্ধ ধারণা খন্ডনেও সুব্রতী। ‘কাইয়ুম চৌধুরীর চিত্রকাজে লোকশিল্পের প্রভাব আছে’ – এমন সরলমাত্রিক ধারণায় তিনি আস্থাশীল নন; একটু গভীরে গিয়ে তিনি যামিনী রায়, জয়নুল আবেদিন, রশিদ চৌধুরীর কাজের সঙ্গে প্রতিতুলনা সম্পন্ন করে দেখান ঢালাওভাবে লোকশিল্প নয়, বরং জ্যামিতিক প্রভাবরেখার অন্তর্লীনে কাইয়ুম চৌধুরীর কাজে নিত্যবহমান ছিল জামদানি শাড়ির আবেদন। বাংলার লোকশিল্প বলে কোনো অবভাস তৈরি করতে বশীরের আপত্তি। তিনি স্পষ্ট করে বলতে চান, জামদানি শাড়ির পাখি, পাতা, ফুল ও জ্যামিতিক নকশা কাইয়ুমের কাজের নেপথ্য-প্রভাবক উপাদান। আমরা মনে করি, সদ্যপ্রয়াত শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর চিত্রভুবন বিশ্লেষণে বশীরের এই আবিষ্কার বিশেষ গুরুত্ববহ।

‘সূর্যদগ্ধ পথে এক ঝলক শীতল মেঘ’ লেখায় দূর-দূরান্তরে শিল্পীর ভ্রমণরেখায় অনুভবের যে বিচিত্র বর্ণবিস্তার আস্বাদন করি তা এককথায় অতুলনীয়। রাঙামাটি থেকে লাহোর; মেরুদূরত্বের ভ্রমণেও কাজ করে ভ্রামণিকের এক অভিন্ন সৌন্দর্য-সম্ভোগ পরম্পরা, শিল্পদৃষ্টির বহুভঙ্গিম প্রক্ষেপণ। পার্বত্যভূমির রাঙ্গাছড়ি লুসাইপল্লি গিয়ে সৃষ্টির আদিম-উদোম সৌন্দর্যসায়রে ডুব দিয়ে নিজের ভেতর পল গগাঁকে অনুভব করে ওঠেন; গগাঁ তাহিতি দ্বীপের জীবনযাত্রা দেখে বলেছিলেন, ‘Our civilization is diseased’ আর বশীরও আদিবাসী পাহাড়িপল্লির মানুষের সহজ-সরল জীবন, প্রকৃতির সবুজাভ সরণিকে নিজের তীর্থজ্ঞান করেন।

এ-বইয়ে মূল্যবান অংশ মুর্তজা বশীরের অনন্য কিছু চিত্রকর্ম সৃজনের নেপথ্য ইতিহাস ও রসায়নের বর্ণনা।

দেয়াল সিরিজ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘দেয়াল সিরিজ আমি করেছিলাম ৯২টি। সময়কাল ছিল ১৯৭২-১৯৯৬। সূচনা হয়েছিল ঢাকায়, শেষ করেছিলাম প্যারিসে। মাঝে কিছু এঁকেছি পাকিস্তানের সারগোদা ও করাচিতে। এই দেয়াল সিরিজের ভেতর দিয়ে আমি তুলে ধরতে চেয়েছিলাম এই সমাজব্যবস্থার ফলে আমরা একটি অদৃশ্য প্রাচীরের ভেতর বন্দি। তাতে কেউ কারো সঙ্গে কমিউনিকেশন করতে পারছে না। না বুঝতে পারছে পিতা তার পুত্রকে, স্ত্রী তার স্বামীকে এবং বন্ধু তার বন্ধুকে। কোথায় জানি একটা অদৃশ্য দেয়াল রয়েছে।’  (পৃ ৪২৬)

এপিটাফ সিরিজ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্যভাষ্য, ‘এপিটাফ আমি শুরু করি প্যারিসে। ’৭১-এ। জীবনকে ভালোবাসি বলে দেশ থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম।… প্যারিসে টেলিভিশনের পর্দায় কিংবা পত্রিকার পাতায় দেখলাম আত্মোৎসর্গিত যুবকদের ছবি। আমার কেন জানি মনে হতো দেশের জন্য যারা এভাবে জীবনকে উৎসর্গ করলেন তাঁদের নামে কোনো দিন কোনো স্মৃতিস্তম্ভ হবে না। সবাই চাইবে যার যার রাজনৈতিক কর্মীদের নাম তুলে ধরতে। কিন্তু এঁরা সবাই তো রাজনৈতিক দলের সভ্য ছিলেন না। তাঁরা দেশকে ভালোবাসতেন এবং দেশের জন্য আত্মাহুতি দিয়েছেন। এই যে অজানা নামহীন শহীদবৃন্দ তাঁদের উদ্দেশে আমি পাথরের নানা রকম আকৃতির ভেতর দিয়ে স্মৃতিস্তম্ভ করতে চেয়েছি। আদিম যুগে যখন কোনো বীরযোদ্ধা মৃত্যুবরণ করতেন তখন তাঁর কবরের মাথার কাছে পাথরটি একটি রূপকে আত্মার প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত হতো। আমার এই ক্যানভাসগুলোতে ছিল আলোর ঝলকানি; বিষণ্ণতা বা শোকের ছায়া ছিল না। আমি বলতে চেয়েছিলাম, এই শহীদদের আত্মদান নক্ষত্রের মতো ভাস্বর, সূর্যের মতো জ্বলজ্বলে।’ (পৃ ৪২৭)

চার

আমার জীবন ও অন্যান্য ঋদ্ধ হয়েছে ১৯৫০-এ অঙ্কিত ‘বর্জন’ শীর্ষক পেনসিল-কাজ থেকে ২০০৩-এর ‘হলুদ গোলাপ হাতে রমণী’র মতো তেলরঙের কাজের একটি সুনির্বাচিত সংগ্রহের প্রতিলিপি সংযুক্তিতে। এর মধ্য দিয়ে লেখক মুর্তজা বশীর আর শিল্পী মুর্তজা বশীর যেন ধরা দেন অভিন্ন আলকেমিতে। এই অভেদাত্মার বোধ কেবল চিত্রকাজ ও লেখকতার মধ্যে সীমায়িত থাকে না, বৃহদার্থে জীবন ও শিল্পের অভেদ রূপের সাধক মুর্তজা বশীরকেই খুঁজে পাই, যিনি জীবনের আশি বসন্ত পেরিয়েও যুগপৎ জীবনসংগ্রাম ও শিল্পসৃষ্টিতে মুখর। জীবনযুদ্ধে পর্যুদস্ত হয়ে কখনো জাঁ ককতোর কথা স্মরণ করেন – ‘বুর্জোয়া সমাজব্যবস্থা জিনিয়াসকে স্বীকৃতি দেয় কিন্তু কেড়ে নেয় তার বাঁচার অধিকার’ কিন্তু না, পরক্ষণেই মনে করেছেন তাঁর সমুদ্রসম জীবনতৃষ্ণার কথা তাই জীবনপথে যেতে যেতে চেয়েছেন শিল্পসুন্দরের দেখা; কি প্যারিসে, কি চট্টগ্রামে।

জীবনের কোনো পর্ব বা অভিজ্ঞতাকেই ঊন-জ্ঞান করেননি তিনি – ফলে চট্টগ্রামবাসের স্মৃতিতে মফস্বলে থাকার সমস্যার কথা উঠে এলেও শেষ বিচারে চট্টগ্রামে বসবাসের সময়খন্ডকে নিজের শিল্প-অভিজ্ঞতার পূর্ণতাপ্রাপ্তির পথরেখা হিসেবে বিবেচনা করেন, যেখানে বাঙালির মিশ্র ধর্ম ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্রোতধারায় নিজেকে অভিষিক্ত করার পাঠ পেয়েছেন।

 

পাঁচ

১৯৫৪ সালে মুর্তজা বশীর লিখেছিলেন আত্মজৈবনিক উপন্যাস আলট্রামেরিন। এর ছয় দশক পর লিখলেন আত্মকথাধর্মী বই আমার জীবন ও অন্যান্য। আলট্রামেরিন উপন্যাসে ভ্যান গঘ উঠে এসেছিলেন বশীরের লেখকসত্তায়। গঘ যেমন তীব্র একাকিত্বের ভেতর লালন করতেন সৃষ্টির গুরুতর যন্ত্রণা, বশীরেরও ছিল তাই। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, প্রথম জীবনের আলট্রামেরিন-কালপর্ব এখনো পেরোয়নি প্রিয় শিল্পী ও লেখক মুর্তজা বশীরের। তাই মুর্তজা বশীর ধূসর রঙের দর্পণে নিঃসঙ্গ নিজেকে নিয়ত আবিষ্কার করলেও তাঁর আমার জীবন ও অন্যান্য বইয়ের মধ্যে পাঠক পেয়ে যায় ভবিষ্যৎ শিল্পসৃষ্টির অজর আশামন্ত্র।

 

অনুপম ভঙ্গিমা
অপরূপ আলাপ
নওশাদ জামিল

একদিন সব কিছু গল্প হয়ে যায়
আহমাদ মোস্তফা কামাল

নান্দনিক
ঢাকা, ২০১৫
১৫০ টাকা

কথাসাহিত্যিক আহমাদ মোস্তফা কামাল দিনলিপি লিখেননি, আত্মজীবনীও লিখেননি; লিখলেও তাঁর পাঠকের কাছে তা এখন পর্যন্ত আসেনি, অর্থাৎ দুই মলাটে তা কোথাও ছাপা হয়নি, কিন্তু লিখেছেন নানা বিষয় নিয়ে স্মৃতি-বিস্মৃতির কথামালা। তাঁর স্মৃতিকথা, খন্ডবিখন্ড সুরশব্দঘ্রাণচিত্রমালা, অনুভূতিমালা ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়। কখনো সম্পাদকের আবদারে, অনুরোধে; কখনোবা নিজের সৃজনস্পৃহায় রচনা করেছেন স্মৃতিজাগানিয়া বেশ কিছু অনুপম গদ্য। বস্ত্তত ওই গদ্যগুলোরই একটা অনবদ্য সংগ্রহ একদিন সব কিছু গল্প হয়ে যায় শিরোনামের বই।

সময়ের এক সংবেদী রূপকার এবং শক্তিমান কথাসাহিত্যিক হিসেবে আহমাদ মোস্তফা কামাল এরই মধ্যে অর্জন করেছেন মনস্বী পাঠকের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। কথাসাহিত্যই তাঁর ধ্যান-জ্ঞান, আরাধনা। নববইয়ের গোড়া থেকেই গল্প, উপন্যাস লিখলেও শিল্প-সাহিত্য, দর্শনসহ নানা বিষয়ে লিখেছেন ভিন্নস্বাদের মননশীল প্রবন্ধ। এরই মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর নিরীক্ষাধর্মী চারটি প্রবন্ধগ্রন্থ। কিন্তু এবারই প্রথম প্রকাশিত হলো তাঁর মুক্তগদ্যের বই একদিন সব কিছু গল্প হয়ে যায়। সদ্যসমাপ্ত অমর একুশে গ্রন্থমেলায় বইটি প্রকাশ করেছে নান্দনিক। ১১২ পৃষ্ঠার বইটিতে পত্রস্থ হয়েছে বিভিন্ন সময়ে লেখা ১৬টি মুক্তগদ্য। তাঁর অন্যান্য রচনা থেকে এ-বই অন্যরকম, চলনে-বলনে-গড়নে ভিন্নমাত্রিক। কেননা, এক মলাটে পাওয়া যাবে আহমাদ মোস্তফা কামালের রচনার বহুমাত্রিক স্বাদ। কখনো তা মনে হবে গল্পের রোমাঞ্চকর যাত্রা, কখনো আবার মনে হবে উপন্যাসের মহাকাব্যিক বিস্তার। কিন্তু রচনাগুলো গল্প নয়, উপন্যাসের প্লাটফর্মও নয়; প্রবন্ধের আদলে তা মূলত কলম ছেড়ে দেওয়া জাদুবিস্তারী একরকম উৎকৃষ্ট মুক্তগদ্য।

 

দুই

কথাসাহিত্যিক আহমাদ মোস্তফা কামালের গল্প যাঁদের পরিচিত, তাঁর গদ্য যাঁদের চেনা, তাঁরা জানেন, বিশিষ্ট এ-লেখকের রচনা সম্পূর্ণই আলাদা। তাঁর গল্প যেমন স্বপ্ন-বাস্তবতাময়, অনুভূতিময়; তেমনই তাঁর গদ্য বড় আগ্রাসী, চিত্রগন্ধময়। ফলে পাঠক তা পড়তে-পড়তে পৌঁছে যান এক ঘোরলাগা স্বপ্নের জগতে। তাঁর সৃষ্ট এ-জগৎ সত্যিকার পাঠকের জন্য আনন্দময় ও শিহরণ-জাগানিয়া। বর্তমান বইটিও এর ব্যতিক্রম নয়। বইটির প্রতিটি গদ্য মনকাড়া। প্রকৃতি ও জীবনঘেঁষা এসব গদ্য তিনি লিখেছেন স্মৃতিকথার ভঙ্গিমায়; যদিও তা পড়ে মনে হয়, গল্পই তো পড়লাম! বইটি সম্পর্কে লেখক ছোট্ট, কিন্তু আকর্ষণীয় একটা ভূমিকায় লিখেছেন। তাতে বলেছেন, ‘গল্প নয় এগুলো, যদিও গল্পের ঢঙেই লেখা; উপন্যাসও নয়, যদিও উপন্যাসের অনেক উপকরণ পাওয়া যাবে; প্রবন্ধও নয়, যদিও গঠনশৈলী দেখে সেটি মনে হতে পারে। খানিকটা ব্যক্তিগত আলাপচারিতার ভঙ্গিতে রচিত এই লেখাগুলোকে মুক্তগদ্য নামে ডাকতেই ভালোবাসি আমি। যেহেতু ব্যক্তিগত অনেক প্রসঙ্গ আছে লেখাগুলোর ভেতরে, এগুলোকে হয়তো ব্যক্তিগত রচনাও বলা যেত। কিন্তু তাতে এদের সম্পূর্ণ রূপ ধরা পড়ে না।’

বইটির সম্পূর্ণ আবহ ধরা যায়, অনুভব করা যায় তখনই; যখন ফিকশন এবং নন-ফিকশনের আধুনিক প্রকরণ ভেঙে যায়। শিল্প-প্রকরণের ভেদাভেদ ঘুচিয়ে, গল্প-উপন্যাসের ফর্ম পেরিয়ে, বলা যায়, লেখকের একটা নতুন প্রকরণ নির্মাণ করার প্রয়াস এ-বইয়ের রচনাগুলো। লেখক যখন সংশয় প্রকাশ করে বলেন, ‘ফিকশন এবং নন-ফিকশনের সীমারেখাটি আসলে কোথায়, কিংবা আদৌ আছে কী-না’ তখনই আমরা টের পাই যে, দুটি ভিন্ন প্রকরণের মধ্যে লেখক তৈরি করতে চান একটা সেতুবন্ধ; পাঠক দুই পারের দূরত্ব তাতে বুঝতে পারবেন, আবার একের ভেতর দুইয়ের অস্তিত্বও অনুভব করবেন।

বইটির রচনাগুলো পাঠশেষে মনে হয়, ফিকশন ও নন-ফিকশনের মধ্যবর্তী একটা জায়গায় পৌঁছে, নির্জন এক দ্বীপের মতো পাঠকের মানসপটে ভেসে ওঠে কথাসাহিত্যিক আহমাদ মোস্তফা কামালের প্রজ্বলিত আলোকবর্তিকা। তাতে টর্চ ফেলে, স্মৃতি থেকে, সুদূর অতীত থেকে তিনি স্পষ্ট করেছেন নানা দৃশ্যগাথা। সেসব তাঁর অনুপম কথায়, নিপুণ ও ঝরঝরে ভাষায় প্রস্ফুটিত করেছেন; মেলে ধরেছেন ব্যক্তিগত জীবন, ভ্রমণসহ নানা কিছু। তেমনি তুলে ধরেছেন মা-বাবার স্মৃতি, শৈশব-কৈশোরের নানা আলোড়িত ঘটনা। পাশাপাশি আছে শিল্প-সাহিত্য, তাঁর গল্প-উপন্যাসের উৎসভূমি নিয়ে মজাদার তথ্য ও পটভূমি। বইটির পরিসর ছোট হলেও, রচনাগুলোর আয়তন ক্ষীণ হলেও, পাঠক এতে যেমন ব্যক্তি লেখককে জানতে পারবেন, তেমনই বুঝতে পারবেন তাঁর সাহিত্যবোধ, তাঁর পঠন-পাঠনসহ সাহিত্যের অলিগলির নানা আলো-অন্ধকার। বইটির কিছু কিছু গদ্য সত্যিই প্রকৃতি ও নিসর্গঘেঁষা, সেসব শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি। কখনো শহরে, কখনো গ্রামে তাঁর শৈশব কাটলেও ছোটবেলার অধিকাংশ সময় কেটেছে প্রকৃতির ছায়ায়। পদ্মাপারের নৈসর্গিক দৃশ্য-সুর-ছন্দ যার অনুভূতিকে ঋদ্ধ করেছে, তাঁর রচনা তো নিসর্গময় হবেই। আত্মজৈবনিক ভঙ্গিতে সেসব গদ্যে লেখক তুলে ধরেছেন প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর সখ্য, হৃদ্যতা। চেনা-অচেনা ফুল, ফল, গাছ-গাছালি, পাখ-পাখালি, ঋতুবৈচিত্র্য দিয়ে ঘেরা ছিল তাঁর দিনগুলো। সঙ্গে ছিল পদ্মার ভয়াল ও সর্বনাশী রূপ। এসবই অপূর্ব ভঙ্গিমায় লিখেছেন তিনি। লিখেছেন চড়ুই পাখির জন্য তাঁর বেদনাবোধ, ফড়িঙের জন্য কাতরতা; বাড়িতে পোষা একটা ছাগলের জন্য মমত্ববোধ। হয়তো ওই বোধই তাঁকে দিয়েছে বেদনাকে বোঝার এক গভীর শক্তি। ছোটবেলার কথা শুধু নয়, লিখেছেন যৌবন ও তারুণ্যের দিনগুলোর কথাও। লিখেছেন বিদেশভ্রমণ নিয়ে চমৎকার ভ্রমণকাহিনি। দুর্দান্ত গদ্য লিখেছেন পূর্ণিমা নিয়ে, ঝরঝর বাদলধারা নিয়ে। জাত কথাশিল্পী বলেই, হয়তো, তাঁর মুক্তগদ্যেও চলে এসেছে গল্পের ভাষা, গল্পের চরিত্র। গল্প নয় বলেই বইটির প্রধান চরিত্র লেখক নিজেই। তবু ফর্ম বা প্রকরণগত কোনো নিয়ম না মেনেই আহমাদ মোস্তফা কামাল গল্প করতে-করতে চলে যাচ্ছেন গল্পের নির্যাসে, উপন্যাসের বারান্দায়। কোনো একটি বিষয় নিয়ে লিখতে-লিখতে লেখক চলে যাচ্ছেন ওই বিষয়ের ইতিহাসে, বিষয়ের সঙ্গে তাঁর অতীত স্মৃতিতে। কখনো তথ্য-উপাত্ত দিয়ে, কখনো অন্যান্য লেখকের উদ্ধৃতি দিয়ে, কবিতার পঙ্ক্তি দিয়ে, কিংবা মজাদার তথ্য দিয়ে অতীত থেকে তুলে আনছেন ফেলে আসা জীবনেরই চাপাত্রস্ত্র নানা অনুভূতি।

 

তিন

বইটির রচনাগুলো পড়তে-পড়তে মনে হয়, কথাশিল্পী আহমাদ মোস্তফা কামাল সহজিয়ারই সাধনা করছেন প্রতিনিয়ত। প্রকাশভঙ্গিমায় কুটিলতাকে এড়িয়ে উচ্চারণ যত সহজ হয়, যতই তো হৃদয়গ্রাহী হয়। লেখক রচনাকে হৃদয়গ্রাহী ও আকর্ষণীয় করতে চান, হয়তো এ-জন্যই তিনি পরিহার করেছেন বাক্য গঠনের নানা জটিলতা, ত্যাগ করেছেন দুর্বোধ্য এবং দূরকল্পনীয় চিত্রমালা। অনুপম-সজীব-নির্বিকল্প ভঙ্গিমায় বর্ণনা করেছেন তাঁর অনুভূতি। ‘সেই অপরূপ নির্জনতা’ শীর্ষক রচনায় তাঁর বক্তব্যে এ-কথাই যেন প্রতীয়মান।

নিজের লেখালেখি নিয়ে ভাবছি অনেকদিন ধরে – বছর দুয়েক তো হবেই, যে, আমি আরো সহজ ও সরল করে লিখতে চাই। গভীরতর উপলব্ধির বর্ণনা, সরল উপস্থাপনায়। নিরাভরণ, অলংকারহীন – যেখানে শব্দেরা ঝংকার দিয়ে উঠবে না, বরং মোলায়েমভাবে লেপ্টে থাকবে বাক্যের শরীরে, আর পড়ে মনে হবে অপূর্ব এক নৈঃশব্দ্য নেমে এলো। নীরবতা, নৈঃশব্দ্য ও নির্জনতা। যার ভেতর বসে মানুষ নিজে অন্তরের সাথে কথা বলে। এই কোলাহলপূর্ণ পৃথিবীতে সেই বিরল নির্জনতা আর অপরূপ নৈঃশব্দ্যের সন্ধান করেছিলাম, হয়তো পাঠককেও দেখা করিয়ে দেওয়ার অসম্ভব স্বপ্ন দেখেছিলাম।

প্রাজ্ঞ ও আলাপী আহমাদ মোস্তফা কামাল বাক্যের ভেতর, কাঠামোর ভেতর যে অপরূপ নির্জনতার সন্ধান করেছিলেন, সহজিয়ার যে-স্বপ্ন দেখেছিলেন, মনে হয়, তাঁর ওই মৌনব্রত সাধনার মার্জিতরূপ এই রচনা। বাহুল্য বর্জন করে, সাদামাটাভাবে, আলাপের ভঙ্গিমায় লেখক বলে গেছেন তাঁর কথা। লেখকের ওই আলাপনে ঠিক যতটুকু অলঙ্কার প্রয়োজন, ঠিক ততটুকুই অঙ্গে জড়িয়ে দিয়েছেন। যেখানে উপমা, চিত্রকল্প প্রয়োজন, যেখানে কাব্যিকলয়ে সাজিয়েছেন দৃশ্যপ্রতিমা। সবমিলিয়ে কোথাও অতিরিক্ত মেদ নেই, কোথাও গড়নে কিছুর আধিক্য নেই, কোথাও উৎকট ও অশোভন আধিক্য নেই – তাঁর সৃজনদেবী এমনই অপরূপ। লেখক তাঁর আলাপের মধ্য দিয়ে নিজেকেই যেন             মনে-মনে প্রশ্ন করেছেন, তালাশ করেছেন জবাবের, উত্তর পেয়েছেনও নিশ্চয়। ‘সেই অপরূপ নির্জনতা’ শীর্ষক রচনায় তিনি পারি দিতে চেয়েছেন ওই সহজিয়া পথ এবং সুদূরের সীমানা।

হয়তো চেয়েছিলাম, একটু আগে যেমনটি বলেছি, সহজ ও সরল করে গদ্যেই লিখে যাবো মানুষের নির্জনতার আকাঙ্ক্ষার কথা, না পাওয়ার বেদনার কথা, লুকিয়ে ফেলা দীর্ঘশ্বাসের কথা। চেয়েছিলাম, সেইসব কথা বর্ণিত হোক এক নিরাভরণ-অলংকারহীন ভাষায়। আর কেনইবা চাইবো না? আমি কি দেখিনি, নিরাভরণ রূপ কত অপরূপ হতে পারে? মনে কি হয়নি, নিরাভরণ রূপই সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত, সবচেয়ে নিখুঁত, সবচেয়ে আকর্ষণীয়? দিনের বেলায়ও কি সেই নিরাভরণ রূপের ওপর কোজাগরী পূর্ণিমার চাঁদের আলো ফুটে উঠতে দেখিনি? কেন ওভাবে লিখতে পারি না আমি? আভরণের আড়াল যেখানে নেই, সেখানে যে মনেরও আড়াল নেই। মন যেখানে কথা বলে ওঠে, কেন তেমন করে লিখতে শিখিনি? আমি তো বরাবর বিশ্বাস করে এসেছি, সরলভাবে জটিলতর ভাবনা প্রকাশ করার মতো সক্ষমতা অর্জন করার মাধ্যমেই একজন মানুষ শিল্পী হয়ে ওঠেন। আর এ-কথা তো সর্বজনবিদিত যে, যিনি যত বড়ো শিল্পী তাঁর ভাবনার জগৎটি ততটাই জটিল আর গভীর, কিন্তু প্রকাশটি ততোধিক সরল। সরলতার ভেতর দিয়ে সৌন্দর্যের প্রকাশ ঘটানো বা রহস্যের অনুসন্ধান করা কেবল মহত্তম শিল্পীদের পক্ষেই সম্ভব।

আহমাদ মোস্তফা কামালের রচনা, হোক তা গল্প কিংবা উপন্যাস, তিনি ওই সরলতার পক্ষেই দাঁড়িয়েছেন জোরালোভাবে। কিন্তু সরল হলেও তা তরল নয়। ঘন এবং ঘনীভূত। ফলে পাঠক সহজেই পৌঁছে যেতে পারেন, লেখকের নিজস্ব তপোবনে।

চার

অত্যন্ত ঝরঝরে ভাষায়, ভঙ্গিমায় লেখক একেকটি রচনায় তুলে ধরেছেন তাঁর যাপিত জীবনের নানা অনুষঙ্গ। জীবন থেকে নেওয়া এইসব স্মৃতিরাশি মূলত ব্যক্তিক উচ্চারণ, কিন্তু, লেখক তাঁর মুন্শিয়ানা এবং কারিশমায় করে তুলেছেন সামষ্টিক। নিজের লেখালেখি, তাঁর গল্প-উপন্যাসেও এ-ব্যক্তিক অনুভূতি জড়িয়ে। আত্মজৈবনিক ভঙ্গিতে, জীবনকে তিনি দেখেছেন বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে; অবলোকন করেছেন গভীরতল থেকে; হয়তো এ-জন্যই ব্যক্তিক রচনাগুলোয় উপস্থিত লেখক নিজেই। কে না জানে যে, প্রকৃত ও মহৎ শিল্প রচিত হয় তখনই, যখন শিল্পী কিংবা লেখক মিশে থাকেন তাঁর রচনার পরতে-পরতে। আহমাদ মোস্তফা কামাল এ-বইয়ে তা স্বীকার করেছেন, প্রকাশ করেছেন যে, তাঁর অনেক রচনার সঙ্গে জড়িয়ে তিনি। ফলে বইটি পড়তে গিয়ে পাঠকের সামনে ভেসে ওঠে লেখকসত্তা ও ব্যক্তিসত্তার অপূর্ব ঐকতান। ‘একদিন সব কিছু গল্প হয়ে যায়’ শীর্ষক রচনায় প্রমাণ মেলে তাঁর সরল ও অকপট স্বীকারোক্তি।

আজকে যা কিছু ঘটে চলেছে, আগামীকাল তার সবই গল্প হয়ে যাবে। আমি হয়তো গল্প শিরোনামে স্মৃতিকথাই লিখে চলেছি এতগুলো বছর ধরে। হয়তো ‘আমার সব গল্পই আত্মজৈবনিক’ অথবা কোনোটাই নয়। স্মৃতি এমনই যে কখনো কখনো অপরের গল্পকেও নিজের গল্প বলেই মনে হয়। সেই অর্থে সব গল্পই হয়ে ওঠে আত্মজৈবনিক।

আহমাদ মোস্তফা কামালের স্বীকারোক্তি থেকে এও টের পাওয়া যায়, গল্পের কথা থাক, আপাতত দূরে থাক তাঁর উপন্যাসের কথাও; আলোচ্য বইটি সম্পূর্ণভাবেই আত্মজৈবনিক রচনা। বইটির এসব রচনা যেমন আত্মকথা ধাঁচের, তেমনই তাতে মিশে আছে তাঁর কাব্যিকবোধ। কবিতা তাঁর বিশেষ পছন্দের, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে জীবনানন্দ দাশ, শঙ্খ ঘোষ হয়ে সমসাময়িক অনেক কবির পঙ্ক্তি অবলীলায় ব্যবহার করেছেন; কবিতা তিনি লিখেননি, কবিতা তাঁর মাধ্যমও নয়, কিন্তু অল্পকথায় দীর্ঘশ্বাসের অনুভূতি, না-পাওয়ার বেদনাবোধ লেখক ধার করেছেন কবিতা থেকেই। বইটির অধিকাংশ রচনার শিরোনামও বেশ কাব্যিক, যেমন, ‘দু-চারটে অশ্রুজল’, ‘মনে গেঁথে থাকা হঠাৎ-মুখগুলো’, ‘এই মনোরম ঘর’, ‘মৃদু, মায়াময় হেমন্তের দিনগুলো’, ‘আহা বিমূঢ়তা!’, ‘সেই অপরূপ নির্জনতা’ ইত্যাদি শিরোনামে ধরা পড়ে তাঁর কাব্যবোধ এবং কবিতার প্রতি নিগূঢ় মমত্ববোধ। যখন বাপ-দাদার ভিটেমাটি কেড়ে নেয় ভয়াল পদ্মা, তখন অস্তিত্বহীন বেদনা তাঁকে নিয়ে যায় কবিতার দীর্ঘশ্বাসের দীঘল দ্রাঘিমায়; যখন পদ্মাপারে কিংবা ক্ষীণতোয়া ইছামতির কাশবনে ছুটে যায় তাঁর মন, তখন তো কবিতাময় হয়ে ওঠে তাঁর শৈশবের ছোপ ছোপ রং। প্রকৃতির প্রতি তাঁর মায়াবোধ যেমন তীব্র, তেমনই জোরালো তাঁর ভাষাও। যখন হেমন্তের কথা বলেন, পূর্ণিমার কথা কথা বলেন, যখন বৃষ্টিমুখরতায় মেতে ওঠে তাঁর তৃষিত মন, তখন তো ওই কবিতাই হয়ে ওঠে তাঁর আশ্রয়।

বইটির বিভিন্ন রচনায়, বিশেষ করে বলেছেন গ্রামের কথা, ছেলেবেলার কথা। ঘুরেফিরেই গ্রামের কথা বলে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছেন লেখক। তারপর, স্মৃতিসরণি ধরে জেগে উঠেছে বেদনা রাশি-রাশি। ‘দু-চারটে অশ্রুজল’ শীর্ষক রচনায় ওই বেদনার ছোঁয়া লেগে আছে শব্দের ধ্বনিগুলোয়, অন্ধ অক্ষরগুলোয়। ‘পশ্চিমে ইছামতি আর দক্ষিণে পদ্মা’ – এই দুই নদীর রূপ গায়ে মেখে অপরূপা হয়ে উঠেছিল ওই গ্রাম। লেখকের ওই গ্রাম মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলাধীন; এখন পদ্মার গর্ভে ওই গ্রামের অবস্থান। চেনাপথ হারিয়ে গেলেও, ডুবে গেলেও তাঁর হৃদয়ে রয়ে গেছে ওই গ্রামের রূপগন্ধদৃশ্যমালা। লেখক তা বর্ণনা করতে-করতে মেলে ধরেছেন শেকড়চ্যুতির অবর্ণনীয় বেদনাবোধ। দেশভাগের মর্মন্তুদ দুঃখের কথা যাঁরা পড়েছেন বিভিন্ন লেখকের গল্প-উপন্যাসে, লেখকের ওই বেদনাবোধ শুধু দেশভাগের কষ্টের সঙ্গেই সমীপ্য। ব্যক্তিজীবনের এইরূপ কষ্টের কথা তিনি যেমন বলেছেন, তেমনই বলেছেন ভালোলাগা উচ্ছ্বাসের কথাও। বইটিতে উচ্ছ্বাস যতটা, তারচেয়ে বেশি বেদনা, তারচেয়ে বেশি হারানোর ব্যথা, তারচেয়ে বেশি অতলের অতৃপ্তিবোধ। বইটির একটি মর্মস্পর্শী রচনা ‘মায়ের কথা বলি’, সেখানে যেমন মায়ের কথা উঠে এসেছে, তেমনই উঠে এসেছে আনন্দ-বেদনার কাব্য।

পাঁচ

কথাসাহিত্যিক আহমাদ মোস্তফা কামাল শুধু ফিকশন এবং নন-ফিকশনের প্রভেদ ঘোচাতে চাননি, পাশাপাশি গদ্যের সঙ্গে কবিতার দূরত্বকেও ঘোচানোর একটা নিরীক্ষাধর্মী প্রয়াস চালিয়েছেন বইটির মুক্তগদ্যগুলোয়। সবমিলিয়ে এ-এক ভিন্নরকম পাঠ; এ-এক আত্মমগ্ন জগৎ। লেখক তাঁর জাদুবিস্তারী ভাষায় ওই জগৎকে শুধু বর্ণিলই করেননি; রঙের ভেতর, যাপিত জীবনের ভেতর যে ক্লান্তি রয়েছে, লেখক ওই ক্লান্তিকেও নির্জনতায় ছুঁয়ে-ছেনে উপস্থিত করেছেন। বস্ত্তত, এর মধ্য দিয়েই লেখকের লেখালেখির শৈল্পিক প্রবণতাগুলো যেমন বোঝা যায়, তেমনই বোঝা যায় তাঁর ব্যক্তিসত্তার স্বচ্ছ অবয়বও। হয়তো, এ-কারণেই একদিন সব কিছু গল্প হয়ে যায় তৈরি করে লেখকের আত্মজীবনীর একটা যোগসূত্র, নির্মাণ করে তাঁর মধ্যজীবনের বহুস্তরবিশিষ্ট ঘোরলাগা জীবন ও  বাস্তবতা। সহজ-সরল ভাষায় স্নিগ্ধ ও অনাবিল ভঙ্গিতে লেখা এই বই তাঁর নিজেরই কথা, পাঠকের আরশিতে দেখা নিজের অবয়ব; ফলে লেখককে জানতে, তাঁর রচনাকে বুঝতে বইটি অবশ্যপাঠ্য।

 

গ্রামীণ জীবনের

নিখুঁত নির্ঘণ্ট
মাহমুদ হাফিজ

 

আশ্বিনের শেষ রাত্তিরে
বদরুন নাহার

বেঙ্গল পাবলিকেশন্স লি.
ঢাকা, ২০১৫
২৭৫ টাকা

একদিকে আড়িয়াল খাঁ আর অন্যদিকে ভুবনেশ্বরকে যুক্ত করা একটা ক্ষীণ বাহু চৈতারকোল। কোলের অাঁকাবাঁকা গতিপথ ধরে গ্রামটা ধনুকের মতো বেঁকে গড়ে উঠেছে। গ্রামের পেছনে ফসলি মাঠ, সেই মাঠ পার হয়ে চোখে পড়বে কাঁচারডাঙ্গী। কোলপাড় থেকে কাঁচারডাঙ্গীর তটরেখা যতটা চোখে পড়ে, কোলের ওইপারে ফসলের মাঠ পেরিয়ে পরের গ্রাম অনেক ধূসর।’

বদরুন নাহারের আশ্বিনের শেষ রাত্তিরে উপন্যাসের এ-বর্ণনা পড়েই বুঝে নেওয়া যায় গাঁও-গেরামের  নিষ্কণ্টক  জীবনালেখ্যকে উপজীব্য করেছেন লেখক। পুরো বই শেষ করে এই বুঝ আরো পোক্ত হয় যে, সহজ গ্রামীণজীবনের নিখুঁত-বিস্তৃত বর্ণনা এবং চরিত্রের মনস্তত্ত্বানুগ সংলাপ উপন্যাসের মূল সম্পদ। কৃষিজীবী গ্রাম্য লোকাচারের আনন্দের মধ্যে বেড়ে ওঠা চরিত্রগুলোর মানসিক টানাপড়েনের দিকেও তীক্ষ্ণ নজর দেওয়া হয়েছে উপন্যাসটিতে।

উপন্যাস বা ছোটগল্প শুরু করার ক্ষেত্রে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আকস্মিক শুরুর যে-টেকনিক ব্যবহার করেছেন বদরুন নাহারকে তার প্রতিই বিশ্বস্ত দেখা যায়। ‘ময়নার একটা ভাল সম্বন্ধ এসেছে। বাড়ি ভদ্রাসন, ছেলেটি শিক্ষিত।’ চমৎকারভাবে  শুরু করে লেখক এগিয়েছেন চৈতারকোলের প্রভাবশালী গেরস্থ মিয়াবাড়ির কন্যা ময়নার বিলম্বিত প্রেম-বিয়ে-মানসিক টানাপড়েন ও সংসারী হওয়ার আখ্যানের পরিণতির দিকে। একে উপন্যাসে রূপ দিতে চৈতারকোলপাড়ের মিয়াবাড়ি ও আশপাশের গ্রামের বেশ কিছু চরিত্র তুলে আনা হয়েছে। কালো হওয়ার অপরাধে ময়নার বিয়ে-বিলম্ব, লজিং মাস্টার লিয়াকতের প্রেম-রাজনীতি, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকালে নিস্তরঙ্গ গ্রামীণ জীবনে রাজনীতির হাওয়া, বাম রাজনীতিতে দীক্ষিত বাতেন মাস্টারের রাজনীতিহীন সংসারজীবন, বাউল-মানসিকতার আলা মিয়ার বাউন্ডুলেপনা, ময়নার স্বামী লেবু খাঁর বোকামিময় জীবনকে বশে আনতে হয়েছে। সবকিছু ছাপিয়ে উচ্চকিত হয়ে উঠেছে কৃষিজীবী গ্রামীণ সমাজের আশ্বিনের শেষ রাত্রের বিলীয়মান লোকাচার গাশ্শি সংস্কৃতি। গ্রামীণ জীবনের এই লোকাচার শহুরে সংস্কৃতির আবহে বিলীয়মান এক অজানা উৎসবে পরিণত। চরিত্রগুলোর ওপর ভর করে গ্রামীণ মিথটিকে পুনরুজ্জীবিত করতে সচেষ্ট হয়েছেন লেখক। তাঁকে সাধুবাদ।

উপন্যাসের চমৎকারিত্বের জায়গাটি হচ্ছে চরিত্র ও পটভূমির  বিস্তৃত বর্ণনা ও চরিত্রানুগ সংলাপ। এ-গুণ এর চরিত্রগুলোর পরিণতগত খামতিকে ঢেকে শিল্পবিচারে একে উতরে যাওয়ার পথ করে দিয়েছে। বদরুন নাহার দক্ষ গল্পকারের মতো আশপাশের সবকিছু সূক্ষ্মভাবে দেখেন বলে মিয়াবাড়ির কাছারিঘরের চাতালে মজুদ পেঁয়াজ-রসুনের খোসা, খেজুরপাটির জায়নামাজের মধ্যে বড়মিয়ার সৌদি মখমলের জায়নামাজ কিংবা ধান মাড়াইয়ের মলনে ঘূর্ণমান গরুর নাদা ধরার গোলাকৃতি খড়ের পুঁটলিটিও তার চোখ এড়ায় না।

ঘরের মধ্যে বিশাল আকৃতির ছয় পায়াবিশিষ্ট চৌকিটাকে শহুরে সভাসমিতির মঞ্চের মতো লাগে। আর সেখানটা খেজুরের পাতার পাটিতে ঢাকা, মাঝে একটা মাত্র সৌদি মখমলের জায়নামাজ। বড় মিয়ার আসন। আর বাকি সবাই পাটির ওপরই সিজদা দেয়। মাঝে বড় বড় দুটো কাঠের আলমারি ভরা কোরআন শরিফ, সিপারা থেকে শুরু করে অজিফার বই, মদীনা পত্রিকা আর কত বই।… ঘরের মধ্যে কয়েকটা কাঠের চেয়ার, যার মধ্যে তিনটার একটা করে হাতল ভেঙে কবে থেকে নাই হয়ে গেছে। এসবের মধ্যে একটা কেতাবি গন্ধ ছাড়াও তীব্র একটা গন্ধ জেগে থাকে, তা হলো রসুন পিঁয়াজের গন্ধ। মাথার ওপরের বাঁশের মাচাল ঘরের অর্ধেকজুড়ে বেছন পিঁয়াজ-রসুনের পসরা জমে থাকে। ওপর তাকালে পালকের মতো লাল আর সাদা খোসা ঝুলে থাকতে দেখা যায়।

নিয়ম করে বছরে দুবার কি তিনবার রুনীর দাদাবাড়ি আসা পড়ে। শহর থেকে বাসে বাইশরশি, খাইজুরতলা, তারপর নৌকায় শ্রীরামদির হাট। কখনো কখনো তাদের কৃষ্টপুর দিয়ে আসতে হয়। ভুবনেশ্বর এখন নদী নয়, হয়েছে বালুর মাঠ আর বাদামের ক্ষেত।

এ-পটভূমির মধ্যে চরিত্রগুলোর যথোপযুক্ত সংলাপ ও ভাষাভঙ্গি যেন প্রকৃতির নিস্তরঙ্গ জীবনে খলবলিয়ে ওঠা ভাটিয়ালি সুর। মিয়াবাড়ির যে-কাছারিঘরের চিত্র পাওয়া গেছে সেখানে দুপুরে মিয়াবাড়ির মেজো মিয়া অলস সময় কাটান। এটি নদীপারে বলে নদী দিয়ে কে যায় না যায় সব নজরে আসে। ময়নার বিয়ের সম্ব^ন্ধ ঠিক হওয়ায় মিয়াবাড়ির ছেলে আলতাব যখন শহর থেকে পরিবার নিয়ে নদীর ঘাটে এসে পৌঁছে… কাছারির বেঞ্চে শুয়ে থাকা মেজো মিয়া ‘জানালা দিয়ে মাথা বের করে বলে – ঘাটলায় জলা কিসের?’ সেখান থেকে দু-তিনজনের সমন্বিত উত্তর ভেসে আসে – ছুডু পোলায় আইছে…। সহসা মেজো মিয়া উঠে পড়ে, দৌড়ে বাড়ির উঠানে গিয়ে হাঁক ছাড়ে – ব্যাবগতি গেলি কই, আলতু আইছে…।’ পটভূমির লেখচিত্রের সঙ্গে এই-সংলাপ খুব মানানসই।

নিখুঁত বর্ণনার উদাহরণ রয়েছে এ-উপন্যাসের পরতে পরতে। চাঁদনী রাতে উঠোনে ধান মাড়াই চলে, গল্পগুজবের আসরে মেতে ওঠে গ্রামের মানুষ। এ্রর বর্ণনা নিতান্ত গ্রামীণ, বাস্তবানুগ ও নিটোল। ‘এবাড়ি ওবাড়ি ভিন্ন ঘর ভিন্ন চুলা হলেও পূর্ণিমা রাতে চাঁদের আসরের কোনো বিভাজিত আল নেই।… পাকা ধানের গোল বিছানায় গরুর পেছনে লাঠি হাতে রাখাল জয়েদ আলী, সদ্য কেটে আনা ধান বৃত্তাকারে বিছিয়ে নিয়ে মলন দিতে থাকে। আর তারই পাশেই জমে ওঠে আসর। নাকে তাজা খড়ের গন্ধ নিয়ে খেতে না পেরে গরু দুটোর হাঁটার মধ্যে আলসেমি! জয়েদ হাতের লাঠি গরুর লেজের ফাঁক গেল নরম মাংসে খোঁচা দিয়ে খেঁকিয়ে ওঠে – হৈট, হৈট।’

আসরে সবাই যখন গল্প শোনায় মত্ত। ‘এমন সময় জয়েদ আলী হঠাৎ দৌড়ে খড়ের গাদা থেকে এক মুঠ খড় নিয়ে পাখির বাসার মতো গোল করে ধরে গরুর পেছনে। গরুর লেজ ততক্ষণে বেশ উঁচুতে উঠে গেছে, আর লেজের নিচের নরম মাংস ভেদ করে বেরিয়ে আসা নাদা জয়েদ আলীর মুঠিতে জড়ো হয়।’

যারা গ্রামের এই চালচিত্র খুব কাছ থেকে দেখেছেন তাদের পক্ষেই কেবল গরু নাদার সময় লেজ উঁচিয়ে যাওয়া ও রাখাল কর্তৃক খড় দিয়ে তা মুঠিতে জড়ো করা কিংবা গরুর পাছায় লাঠির খোঁচা দিয়ে হৈট হৈট করার বর্ণনা লেখা সম্ভব। এমনকি এই রাখালকে গাশ্শির দিন দেখা যায় তালের শাঁস কাটতে। ‘জয়েদ আলীকে দেওয়া হয়েছে জমিয়ে রাখা তালের অাঁটি কেটে ভেতরের শাঁস বের করতে, সে কালচে হয়ে যাওয়া তালের অাঁটির সঙ্গে দাওটা কষে বিঁধিয়ে মুগুরের ওপর আছড়ে ফেলছে। মাঝখান থেকে ভাগ হয়ে যাওয়া ঝুলঝাল কালচে অাঁটির সাদা আর হলুদ আভার তালের ফোঁপাগুলো বেরিয়ে আসছে।’

গ্রামীণ জীবনকে ঘনিষ্ঠতা, সবকিছু ডিটেইলে দেখা ও বর্ণনায় লেখকের এসব মুন্শিয়ানায় অবাক হতে হয়। তালের অাঁটির শাঁস বের করতে গ্রামে যে কসরত করা হয়, এখানে জয়েদ আলী তাই করছে।

উপন্যাসের মূল চরিত্র ময়না, কালো হওয়ার অপরাধে যার বিয়ে বিলম্বিত হয়। ময়নাকে ঘিরে পুরো উপন্যাসের পটভূমি, লোকাচার, চরিত্রগুলো আবর্তিত হয়েছে। ময়না, তার  মা রাঙা বউ, বোকা স্বামী লেবু খাঁ, প্রেমিক লজিং মাস্টার লিয়াকত, শাশুড়ি মায়মুনা বেগম, মিয়াবাড়ির বড় মিয়া, মেজো মিয়া, বাড়ির বিবাগী বোহেমিয়ান আলা মিয়া, বোচা মাঝি, রাজনীতিপাগল নওশাদ তালুকদার, রাজনীতিবিমুখ বাতেন মাস্টারের  চরিত্রচিত্রণ ও মনস্তত্ত্বানুগ সংলাপের ক্ষেত্রে লেখকের মুন্শিয়ানা অতুলনীয়। তবে শহরে বসবাসরত মিয়া বাড়ির নাতনি রুনী চরিত্রটি উপন্যাসের প্রথম থেকে প্রায় শেষাবধি টেনে নেওয়া হলেও তা পরিস্ফুটনের ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা রয়েছে। বিয়ের অনেকদিন পরও সন্তান না-হওয়া ময়নাকে এক রাতের অস্পষ্ট মিলনে সন্তানসম্ভবা হওয়া, স্বামী লেবু খাঁর সন্দেহবাতিক ও পরিণতিতে আত্মহত্যার গল্পটি না সাজালেও চলতো বলে মনে হয়েছে। উপন্যাসের ভঙ্গিটিই এমন অভিজ্ঞতাশ্রয়ী ও অভিনতুন, যা গ্রামীণ বা শহুরে পাঠককে আপনা-আপনি টানতে বাধ্য। তাছাড়া চৈতারকোলপাড়ের সরল ও প্রকৃতিময় জীবনযাপনের মধ্যে রাজনৈতিক হালচালকে আরোপিতভাবে টেনে আনা হয়েছে উপন্যাসে। যেমন এক পর্যায়ে মিয়াবাড়ির কর্মহীন অলস সময় কাটানো অশিক্ষিত মেজো মিয়াকে পর্যন্ত রাজনৈতিক চিন্তায় উদ্বিগ্ন করা হয়েছে।

মোদ্দাকথা, কাহিনি ও চরিত্রচিত্রণের অনুল্লেখযোগ্য সামান্য বিচ্যুতি সত্ত্বেও এ-উপন্যাসের ভাষাভঙ্গি, চরিত্রের প্রেক্ষণবিন্দু অনুসারে সংলাপযোজনা, গ্রাম-প্রকৃতির নিটোল বর্ণনা, জীবনযাপনের মনস্তত্ত্ব, প্রাত্যহিক ঘটনাসৃজন ও নির্ভেজাল গ্রাম্য ভাষাভঙ্গি দিয়ে তা সমাপন উপন্যাসকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। সবকিছু ছাপিয়ে উপন্যাসে গ্রামীণ জীবনের এমন একটি উৎসব-গাশ্শিকে পুনরুজ্জীবন করা হয়েছে, যা আজ বাংলাদেশ থেকে বিলীন হতে চলেছে। স্বভাবতই উপন্যাসটি সুখপাঠ্য ও শিল্পসফল।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার