বাংলাদেশের কবিতা : ভাবরূপের পালাবদল

লেখক:

রফিকউলস্ন­vহ খান
জীবনের বৈচিত্র্য, তার সংঘর্ষ ও গতি, প্রত্যাশা ও অচরিতার্থতা, সংক্ষোভ ও যন্ত্রণা এবং সর্বোপরি সংগ্রাম ও আত্মসন্ধানের সমন্বিত পরিচর্যায় বাংলাদেশের কবিতার চেতনাজগৎ নির্মিত। বিগত প্রায় সাত দশকের বাঙালি-মনের রূপ ও রূপামত্মরের ইতিহাস কবিতার শিল্পশরীরে ধরা পড়েছে। চেতনার বিবর্তনের সঙ্গে-সঙ্গে কবিতার ভাবরূপ, শব্দ, ছন্দ, অলংকার ও চিত্রকল্পের প্রকৃতিও রূপামত্মর লাভ করেছে। বিশ শতকের চলিস্নশের দশকে এ-ভূখ–র কবিমানসে যে-স্বপ্নময় জীবনাকাঙ্ক্ষার প্রাধান্য লক্ষ করা যায়, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের অব্যবহিত পরেই জীবনের বস্ত্তময় সংঘর্ষে সেই স্বপ্নলোক অনিবার্যভাবেই সংরক্ত হয়ে ওঠে। ১৯৪৮ থেকে সমাজমানসে আত্মোপলব্ধির সূচনা, ১৯৫২ সালে তার রক্তাক্ত পরীক্ষা এবং ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যার গণতান্ত্রিক আত্মপ্রকাশ।
১৯৪৭ সালের দেশবিভাগের পর এ-ভূখ–র সমাজমানস এক অমত্মঃশীলা দুঃখদহনে হয়ে পড়ে অবসন্ন, গতিচ্যুত। দীর্ঘদিনের লালিত সুখস্বপ্নের যে-বিকৃত মুখচ্ছবি পাকিসত্মান নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে, স্বাভাবিকভাবেই তা সংবেদনশীলচিত্তে গভীরতর রক্তক্ষরণ ও স্বপ্নভঙ্গের কারণ হয়ে ওঠে। প্রগতি ও গণতন্ত্রবিমুখ পাকিসত্মান রাষ্ট্র বাঙালি জাতিসত্তার ভিত্তিমূল পর্যমত্ম বিনষ্ট করতে সচেষ্ট হয়। ফলে আত্মসন্ধান, সত্তাসন্ধান ও জাতিসত্তাসন্ধানের প্রশ্নটি নতুন পরিস্থিতিতে নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করে। এই পটভূমিতেই সংঘটিত হয়।
ভাষা-আন্দোলন। ভাষা-আন্দোলনের মধ্য দিয়েই
ক্ষুব্ধ, অগ্নিগর্ভ সমাজসত্তার শিল্পিত আত্মপ্রকাশের পথ সুপ্রশসত্ম হয়। আত্মত্যাগ ও রক্তদানের অভিজ্ঞতা থেকে দ্বন্দ্বোত্তরণের শিল্পশক্তি অর্জন করে জীবনলগ্ন ও প্রগতিপরায়ণ কবিমানস। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রম্নয়ারি এ-কারণেই বাঙালি জাতির ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। কেননা, এই ঘটনার মধ্য দিয়েই সূচিত হয় বাংলাদেশের কবিতার নবযাত্রা। তিরিশোত্তর বাংলা কবিতার নেতিবাদী জীবনতন্ত্র থেকে, চলিস্ন­শের দশকের সমাজবাদী কাব্যধারাবিমুখ সামমত্মাদর্শ অনুসারী কবিতার ধারা থেকে এক স্বতন্ত্র ধারার কবিতার জন্ম হলো। দেশবিভাগের পর আবহমান বাংলা কবিতার মূলধারা থেকে বিচ্ছেদের যে-আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছিল, ভাষা-আন্দোলনের পর সেই মূলধারার সঙ্গে পুনরায় যুক্ত হলো এ-ভূখ–র কবিতা। সাংস্কৃতিক নবজাগরণের রাজনৈতিক চরিত্র বাংলা কবিতার ধারায় যে-মাত্রা সংযোজন করল, তা অভূতপূর্ব ও যুগামত্মকারী। ব্যক্তিতন্ত্রের যে-আত্মমুখিতা ঔপনিবেশিক সমাজকাঠামোতে পলায়নবাদী চেতনায় রূপ নেয়, তা থেকেও বহুলাংশে বেরিয়ে এলো বাংলাদেশের কবিতা। ব্যক্তির স্বাধীন বিকাশের শর্ত মেনে নিয়েও বলা যায়, যে-কোনো সমাজের কবিতা যদি সেই সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর চেতনার প্রতিনিধিত্ব না-করে, তাহলে সেই কবিতার আবেদন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। বিশেষ করে যে-মধ্যবিত্ত-মন কবিতার পাললিক ভূখ-, বাংলাদেশে সেই মধ্যবিত্তের বিকাশও স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত নয়। ইংরেজ বণিকের মানদ–র সংস্পর্শে যে-মধ্যবিত্তের যাত্রা সূচিত হয়েছিল, প্রায় দুশো বছরেও বাংলাভাষী ভূখ– সেই মধ্যবিত্তের শ্রেণিচরিত্র কোনো সুস্পষ্ট রূপ পায়নি। বরং সামমত্মাদর্শ, কুসংস্কার, প্রচলিত মূল্যবোধ প্রভৃতির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে এ-দেশের মধ্যবিত্ত চরিত্র বিমিশ্র স্বভাব নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে। বিশেষ করে, বাংলাদেশ ভূখ–র মধ্যবিত্ত শ্রেণিবিকাশের স্বতন্ত্র ও জটিল রূপ তার ব্যক্তিসত্তার বৈশিষ্ট্যকে গোড়া থেকেই ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত করেছে। দেশবিভাগের পর সেই ব্যক্তিসত্তায় যে দ্বন্দ্ব, অনিশ্চয়তাবোধ ও অস্থিরতার জন্ম হয়েছিল, ভাষা-আন্দোলন সেখানে নিয়ে এলো মুক্তচেতনার পথনির্দেশনা। ভাষা-আন্দোলনের নবজাগরণসুলভ চারিত্র্য বাংলাদেশের কবিতায় যে ব্যক্তি ও সমষ্টিচেতনার জন্ম দিলো, সময়ের ক্রমায়ত যাত্রায় তা বহুমুখী স্বভাবধর্ম নিয়ে বিকশিত ও পলস্ন­বিত হয়েছে। গণতন্ত্র, সাম্যবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, প্রগতিশীল জীবনদৃষ্টি, রাজনৈতিক অধিকার অর্জনের প্রশ্নে উচ্চকণ্ঠ আত্মপ্রকাশ প্রভৃতি কবিতার শরীরে ও বক্তব্যে শিল্পিত অভিব্যক্তি পেয়েছে। এর ফলে কবিতার চরিত্র যে রাজনৈতিক হয়ে উঠলো তা বলা যাবে না। বরং
রাজনীতি-সচেতনতা আমাদের অধিকাংশ কবির ব্যক্তিত্ব ও মানসগঠনকে করে তুললো পরিপক্ব ও স্বাবলম্বী। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের কবিতার ইতিহাস থেকে আমরা জানি, একটি জাতির আত্মবিকাশের ক্ষেত্রে প্রকৃত দিকনির্দেশনা দান কবিতার অন্যতম প্রধান ধর্ম। বিশেষ করে উনিশ ও বিশ শতকের পুঁজিবাদী বিশ্ব এবং সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন স্বপ্রতিষ্ঠ হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় জাগ্রত দেশগুলোর কবিতার চরিত্র আলাদা হয়ে গেছে। ইংল্যান্ডের কবি টি.এস এলিয়ট যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলার সামনে দাঁড়িয়ে চরম হতাশায় লন্ডন ব্রিজের পতনদৃশ্যকে কবিতায় রূপ দিচ্ছেন, তখন সাম্রাজ্যবাদকবলিত এ-ভূখ–র কবি কাজী নজরম্নল ইসলাম লিখেছেন, ‘বল বীর, বল উন্নত মম শির’। ভাষা-আন্দোলনের পরে
উপনিবেশ-কবলিত বাংলাদেশের কবিতাও এ-কারণেই তীব্র অহংবোধ ও সমষ্টিচেতনার বহুমুখী অভিব্যক্তিতে এবং ব্যক্তিসত্তার সমাজলগ্ন আকাঙ্ক্ষা রূপায়ণের ঐকামিত্মকতায় নতুন বৈশিষ্ট্য লাভ করলো। পঞ্চাশের দশকে আবির্ভূত যে-সকল কবি সমাজসচেতনতার মধ্য দিয়ে কাব্যরচনা শুরম্ন করেন, দেশবিভাগজনিত সামাজিক-রাজনৈতিক অব্যবস্থা তাঁদের মধ্যেও একধরনের পলায়নমুখী দ্বন্দ্বময় ও বিষণ্ণ মানসিকতার জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু
ভাষা-আন্দোলন সেই বিশি­ষ্ট দ্বন্দ্বদীর্ণ ও হতাশা-আক্রামত্ম কবিদেরকেও স্বাবলম্বী ও আত্মবিশ্বাসী কাব্য প্রেরণায় উদ্দীপ্ত করে তোলে।

দুই
বিগত আটষট্টি বছরের বাংলাদেশের কবিতার যে সম্পন্নতা ও বহুমাত্রিক বিসত্মার, তার মূলে রয়েছে ভাষা-আন্দোলনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রেরণা। দেশবিভাগের পর নতুন কবিতা (১৯৫০) নামে যে-সংকলন প্রকাশিত হয়, সেখানে অমত্মর্ভুক্ত অনেক কবিই পরবর্তীকালে বাংলাদেশের কবিতার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। কিন্তু ওই সংকলনে বিধৃত কবিতা বক্তব্য ও কাব্যভাষার সঙ্গে পরবর্তীকালের কবিতা তুলনা করলেই আমাদের কবিতায়
ভাষা-আন্দোলনের প্রভাবের স্বরূপ সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। পঞ্চাশের দশকে কাব্যরচনায় যাঁরা আত্মনিয়োগ করেন, ভাষা-আন্দোলন তাঁদের কবিতার বিষয় ও প্রকরণে এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। এ-সময়ের নবোদ্ভূত
কবিদের মধ্যে শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আবু জাফর ওবায়দুলস্নাহ, আল মাহমুদ প্রমুখের কবিতায় ভাষা-আন্দোলন বড় ধরনের পালাবদলের সূত্রপাত করেছে। এসব কবি বেরিয়ে এসেছেন নিঃসঙ্গতার অন্ধকার থেকে, ব্যক্তিচেতনার নিভৃত স্বার্থপর জগৎ থেকে। স্থবির সমাজব্যবস্থার অমত্মর্গত যে বিক্ষোভ ও রক্তক্ষরণ, কবিরা তা উপলব্ধি করেছেন গভীরভাবে। ভাষা-আন্দোলনের বাসত্মব অভিঘাত একজন কবির চৈতন্যে কতটা আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারে শামসুর রাহমানের একটি কবিতা থেকে আমরা তা উপলব্ধি করতে পারি :

আমরা যখন ঘড়ির দুটো কাঁটার মতো
মিলি রাতের গভীর যামে,
তখন জানি ইতিহাসের ঘুরছে কাঁটা
পড়েছে বোমা ভিয়েতনামে।
(প্রেমের কবিতা, নিরালোকে দিব্যরথ)
কেবল ভিয়েতনাম কেন, পৃথিবীব্যাপী সাম্রাজ্যবাদী ধ্বংসযজ্ঞের প্রতিবাদে কবিরা সমাজ ও রাজনীতিমনস্কই কেবল হয়ে ওঠেননি, তাঁদের মন-মানস ঋদ্ধ হয়েছে আমত্মর্জাতিকতাবোধে – বিশ্বমানবের সঙ্গে মিলনসাধনায়। কবিতার উপকরণ, ব্যবহৃত শব্দগুচ্ছ, পরিপ্রেক্ষিত, জীবনলোক, ঐতিহ্যসূত্র, পুরাণের জগৎ অপরিবর্তিত থাকলেও কবির আত্মপ্রকাশের প্রকৃতিতে ঘটে গেছে বড় ধরনের রূপামত্মর। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা কবিকে করে তুলেছে আত্মবিশ্বাসী ও ব্যক্তিত্বম–ত। যে শামসুর রাহমানের কবিতাকে আমরা
নগর-মানসের প্রতিবিম্ব হিসেবে চিহ্নিত করি, সেই নাগরিক অসিত্মত্বকেও কবি প্রত্যক্ষ করেন অন্য চোখে : ‘এ-শহর প্রত্যহ লড়াই করে বহুরূপী নেকড়ের সাথে।’ (‘এ-শহর’) হাসান হাফিজুর রহমান, আলাউদ্দিন আল আজাদের কাব্যবস্ত্ত ও কাব্যভাষা বাংলা কবিতার নতুন উৎসমুখ খুলে দেয়। হাসান হাফিজুর রহমান তাঁর সেই বিখ্যাত ‘অমর একুশে’র আনুভূমিক ও ভাষণধর্মী কাব্যপঙ্ক্তিমালায় উচ্চারণ করেন :
এখানে আমরা ফ্যারাউনের আয়ুর শেষ ক’টি বছরের
ঔদ্ধত্যের মুখোমুখী,
এখানে আমরা পৃথিবীর শেষ দ্বৈরথে দাঁড়িয়ে
দেশ আমার, সত্মব্ধ অথবা কলকণ্ঠ এই দ্বন্দ্বের সীমামেত্ম এসে
মায়ের সেণহের পক্ষ থেকে কোটি কণ্ঠ চৌচির করে দিয়েছি :
এবার আমরা তোমার।
(‘অমর একুশে’, বিমুখ প্রামত্মর)

এই স্বদেশ ও জীবনলগ্নতা কেবল বাংলাদেশের নয়, সমগ্র বাংলা কবিতার পটভূমিতেই এক স্বতন্ত্র চেতনায় বিশিষ্ট হয়ে উঠেছে। কবিতায় ভাবালুতার পরিবর্তে প্রাধান্য পেলো মননশীলতা, নিঃসঙ্গ একাকী ভূখ– জেগে উঠলো আত্মবিশ্বাস ও সংগ্রামের রক্তিম চেতনাগুচ্ছ। ব্যক্তিগত প্রেমবোধের সঙ্গে যুক্ত হলো দেশপ্রেম। কয়েকটি দৃষ্টামত্ম-সহযোগে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যেতে পারে –

১. আমার হৃৎপি–র মত
আমার সত্তার মত
আমার অজানা সণায়ুতন্ত্রীর মত
সর্বক্ষণ সত্য আমার দেশ
আমার দেহের আনন্দ কান্নায় তোমাতেই আমি সমর্পিত’
(হাসান হাফিজুর রহমান : অনন্য স্বদেশ, আর্ত শব্দাবলী)

২. সেই দুইজন-বহুজন এল একাকার, অন্ধকার
সমুদ্রের পিঙ্গল শ্যাওলা, সরীসৃপ-বানরের হাড়
এল তা’রা এল পাহাড়ের অরণ্যের প্রামত্মরের একা
বিবাদী মিছিল।
(আলাউদ্দিন আল আজাদ, ‘উত্তরাধিকার’, মানচিত্র)

৩. তাড়িত দুঃখের মত চতুর্দিকে স্মৃতির মিছিল
রক্তাক্ত বন্ধুদের মুখ উত্তেজিত হাতের টঙ্কারে
তীরের ফলার মত
নিক্ষিপ্ত ভাষার চিৎকার :
বাঙলা, বাঙলা –
আমার নিদ্রিতা মায়ের নাম ইতসত্মত উচ্চারিত হলো।
(আল মাহমুদ, ‘নিদ্রিতা মায়ের নাম’, কালের কলস)
৪. এখন কেবল
শব থেকে শবের সিঁড়িতে একটি আকাঙ্ক্ষা হেঁটে যায়
জীবনের নামে। এখন সে জীবনের নাম
স্বপ্ন আর রক্ত আর ঘাম।
(আজীজুল হক, ‘যন্ত্রণা’, ঝিনুক মুহূর্তে সূর্যকে)
৫. শৃঙ্খলিত, বিদেশীর পতাকার নীচে আমরা শীতে জড়সড়
নিঃশব্দে প্রেমিকের দীপ্ত মুখ থেকে জ্যোতি ঝরে গেছে …
(শহীদ কাদরী, ‘উত্তরাধিকার’, উত্তরাধিকার)

এ-ধরনের দৃষ্টামত্ম থেকে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে,
ভাষা-আন্দোলন ও রাজনৈতিক বক্তব্যনির্ভর কবিতাকেই আমরা প্রাধান্য দিচ্ছি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, কবিতার আবহমান বিষয়বস্ত্তর সঙ্গে এই সমষ্টিচেতনানির্ভর কাব্যবস্ত্তর সংযোগ বাংলাদেশের কবিতাকে এক বলশালী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু শেষ উদ্ধৃতির জীবন ও ব্যক্তিমুখিতা কবিতার এক নতুন স্বভাবধর্ম তুলে ধরে। ওই সময়ে রচিত পশ্চিম বাংলার কবিতার সঙ্গে তুলনা করলেই বাংলাদেশের কবিতার স্বতন্ত্র চরিত্র, কাব্যভাষা, প্রতীক ও চিত্রকল্পের নবত্ব এবং জীবনজিজ্ঞাসার অভিনবত্ব আমরা অনুভব করতে পারি। এ-প্রসঙ্গে উলেস্নখ্য যে, ভাষা-আন্দোলন বিভ্রামিত্মর অন্ধকার থেকে জাতীয় চৈতন্যকে মুক্তি দিয়ে প্রবাহিত করেছিলো আত্মসন্ধান ও জাতিসত্তাসন্ধানের ব্যাপক পরিসরে। ব্যক্তির
অসিত্মত্ব-জিজ্ঞাসা স্বার্থপর নিভৃত জগৎ থেকে বহুলাংশে বেরিয়ে আসতে শুরম্ন করে। ব্যক্তির আত্ম-জিজ্ঞাসায়ও ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে থাকে সমষ্টি-অসিত্মত্বের সংরাগ ও সংগ্রাম। ষাটের দশকে উদ্ভূত নতুন কবিদের মধ্যে জীবনের না-অর্থক দিকগুলোই বেশিমাত্রায় অভিব্যক্ত হতে দেখি। এ-সময়ের কবিদের ‘জন্মান্ধ’, ‘জন্মেই কুঁকড়ে’ যাওয়া, ‘স্বপ্নের বাসত্মবে’র মুখোমুখি, আত্মরতিপ্রবণ এবং মধ্যবিত্তের জীবনচক্রে ঘূর্ণায়মান কবিমানসেও জীবনের রূপ ও তাৎপর্য স্বতন্ত্র অবলোকনের বিষয় হয়ে উঠেছে।

তিন
১৯৫২ থেকে ১৯৭০ কালপর্ব বাংলাদেশের কবিতার আত্মসংস্থিত হওয়ার কাল। কেননা, এ-সময়ে কবিরা
সামাজিক-রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও সংক্ষোভকে যেমন কবিতায় রূপায়িত করেছেন, ব্যক্তিসত্তাবিকাশের বহুমুখী সম্ভাবনা নিয়েও তেমনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। সমাজ-অমত্মর্গত ব্যক্তি-অসিত্মত্বের যে হতাশা, পরাভবচেতনা, নৈঃসঙ্গ্যবোধ ষাটের দশকের নবোদ্ভূত কবিদের কবিতায় লক্ষ করি, সেখানেও বৃহত্তর সমাজমানসবিচ্ছিন্ন নগরজীবনের অব্যাহত বিনষ্টি, অবক্ষয়, সম্ভাবনাহীনতার অনুভব কাজ করেছে। এই বোধগুলোকে বিশ শতকের তিরিশের দশকের নেতিবাদী কবিতার অনুকরণ বললে ভুল হবে। কারণ, এ-সময়ের কবিরা যে সমাজপটভূমির মধ্য থেকে আত্মপ্রকাশ করেছেন, তার সংরক্ত অনুভবই এক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা কার্যকর ছিলো বলে মনে হয়। পাশ্চাত্যের শিল্পকলা ও কবিতার অঙ্গীকার এক্ষেত্রে সঞ্চার করেছে বিশ্বজনীন চেতনাপ্রবাহ ও প্রকরণ-সতর্কতা।
১৯৭১ সালের নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশের কবিতার ক্ষেত্রে যুগামত্মকারী পরিবর্তন-সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়ে যায়। সমাজসংস্থার সমামত্মরালে কবিদের আবেগজীবনেও বড় ধরনের রূপামত্মর সাধিত হয়। বিভিন্ন দশকের কবিদের সম্মিলিত পদচারণায় বাংলাদেশের কাব্যস্বভাবে সূচিত হয় এক জটিল জঙ্গম। যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় পূর্বববর্তী বিভিন্ন দশকের কবিরা কাব্যোপকরণের প্রশ্নে প্রায় অভিন্ন বিন্দুতে এসে মিলিত হন। একটা সামাজিক চরিত্রও বাংলাদেশের কবিতা এ-সময়ে অর্জন করে। ভাষা-আন্দোলনের অব্যবহিত পরে অনেকটা এইরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেও ব্যক্তিসত্তার নব্যবিকাশের সম্ভাবনায় অনেক কবিই সামাজিক বক্তব্য প্রকাশের প্রশ্নে
ব্যক্তি – রম্নচিকেই প্রাধান্য দিলেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সংরক্ত চেতনা, গণতন্ত্রায়ন ও শিল্পায়নের অবাধ বিকাশের সম্ভাবনায় নবগঠিত রাষ্ট্রসত্তায় ব্যক্তির আকাশচুম্বী স্বপ্ন একটা সামষ্টিক চরিত্র নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। ফলে ষাটের দশকের শেষার্ধে উদ্ভূত অনেক কবি এবং সমকালীন
সামাজিক-রাজনৈতিক জঙ্গমতার মধ্যে আত্মপ্রকাশকামী তরম্নণ কবিদের মধ্যে কখনো-কখনো চেতনাগত ঐক্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। অভিজ্ঞতা-উৎস অভিন্ন হলেও অভিজ্ঞান ও জীবনবোধ অনেক কবির আত্মপ্রকাশের স্বাতন্ত্র্যকে চিহ্নিত করেছে। যুদ্ধোত্তরকালের নবোদ্ভূত কবিদের রক্তিম জীবনাবেগ, সদ্য স্বাধীন দেশের বাসত্মবতায় সীমাতিরিক্ত প্রত্যাশা ও অবশ্যম্ভাবী ব্যর্থতাবোধ, প্রেম ও নিসর্গভাবনায় প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে আসার প্রবণতা প্রভৃতি একটা সামাজিক রূপ লাভ করে। ষাটের দশকের অনেক কবি স্ব-উদ্ভাবিত পরিণত আঙ্গিকে অভিন্ন কাব্যবস্ত্তকেই যেন প্রকাশ করলেন। পঞ্চাশের দশকের শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী এবং ষাটের দশকের অধিকাংশ কবিই নিজস্ব
কাব্য-অবয়বে সমকালের সংরক্ত চেতনা ধারণ করলেন। ষাটের দশকের শেষদিকে আবির্ভূত বেশ কয়েকজন কবি এ-সময়ে আত্মপ্রকাশের তীব্রতায়, ব্যক্তি ও সমষ্টির নির্বাধ আবেগজীবন উন্মোচনের ঐকামিত্মকতায় এবং দেশপ্রেমের রক্তিম কাব্যকলা সৃষ্টিতে যথেষ্ট আলোড়ন তুলতে সমর্থ হন।
কলকাতাকেন্দ্রিক মধ্যবিত্তের আবেগ-জীবনের যে তীব্র আত্মপ্রকাশ তিরিশের দশকের বাংলা কবিতায় লক্ষ করি, সেখানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সমাজ-চৈতন্য ও ব্যক্তি-অসিত্মত্বের পাশাপাশি কলোনিয়াল মধ্যবিত্তের ব্যর্থতাবোধ গুরম্নত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলো। রূপামত্মরহীন সমাজ-কাঠামোতে ব্যক্তির আত্মপ্রকাশ যে কতটা বেদনাদীর্ণ, নিঃসঙ্গ ও আত্মরতিপ্রবণ হতে পারে, তিরিশের দশকের অনেকের কবিতায় তা সুস্পষ্ট। ঔপনিবেশিক সমাজের মধ্যবিত্তের ব্যর্থতাবোধ, ব্যক্তিক ও সামষ্টিক আত্মমুক্তির আকাঙ্ক্ষা এই সময়ের কবিতায় শতধারায় উৎসারিত হয়েছিল। বিশ শতকের চলিস্নশের দশক থেকে বাংলাদেশ ভূখ–র কবিদের যে নতুন অভিযাত্রা সূচিত হয়, সেখানে ব্যক্তির স্বাবলম্বী আত্মপ্রকাশের তীব্রতার সমামত্মরালে সামাজিক দায়িত্বচেতনা ও অসিত্মত্বের প্রশ্নে
ইতিহাস-ঐতিহ্য মন্থন নতুন মাত্রা পেয়েছে। আহসান হাবীবের কবিতায় প্রাধান্য পেলো সমাজের মাত্রা, আবুল হোসেনের কবিতায় ব্যক্তির মাত্রা, ফররম্নখ আহমদ রোমান্টিক ঐতিহ্যলোকে সন্ধান করলেন সমকালের উজ্জীবনমন্ত্র এবং সৈয়দ আলী আহসানও অনেকটা পুঁথি-সাহিত্যের লোকায়ত অনুভূতিগুলোকে সমকালীন সমাজমানসের অনুকূলে বিন্যসত্ম করলেন। সানাউল হক নিসর্গলোকের উদার পটভূমিতে চেতনা বিসত্মৃত করে যেন দেশপ্রেমের দীক্ষা নিলেন। উনিশশো সাতচলিস্নশের দেশবিভাগ এইসব কবির মনোজগতে স্বাভাবিকভাবেই এক স্বপ্নময় প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছিলো। কিন্তু পাকিসত্মানের নয়া ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ-নিপীড়ন, বাংলাভাষা ও সাহিত্যের প্রতি অশ্রদ্ধা অতি দ্রম্নত মোহভঙ্গের কারণ হয়ে ওঠে। উনিশশো আটচলিস্নশ সাল থেকে সূচিত ভাষা-আন্দোলন ও তার রক্তাক্ত পরিণতি বাংলাদেশের কবিতাকে বাংলা কবিতার প্রচলিত ধারা থেকে স্বতন্ত্র ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করে এবং বাংলাদেশের কবিতার জন্য স্বতন্ত্র, স্বাবলম্বী ও অসিত্মত্বময় পটভূমি প্রস্ত্তত করে দেয়।
ষাটের দশকের কবিদের মধ্যে সিকদার আমিনুল হক, রফিক আজাদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, আসাদ চৌধুরী, মোহাম্মদ রফিক, মাহমুদ আল জামান, মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ, মুহম্মদ নূরম্নল হুদা, আবুল হাসান, হুমায়ুন আজাদ, সাযযাদ কাদির প্রমুখ কবি পঞ্চাশের দশকের কবিতার বিপ্রতীপ এক নতুন ধারার সৃষ্টি করলেন। পঞ্চাশের কবিরা যেখানে সমকালীন জীবনাবেগ রূপায়ণের প্রতি ঐকামিত্মক এবং সমাজ ও সমষ্টি-সংলগ্ন, সেখানে ষাটের দশকে উদ্ভূত কবিরা সমকালের আন্দোলন-সংঘাত-রক্তপাত ও উজ্জীবনের পটভূমিতে বিস্ময়করভাবে বহির্জগৎ-বিমুখ, আত্মমগ্ন এবং পলায়নপর। মনে রাখা প্রয়োজন, ষাটের দশকের কবিদের সামনে স্ব^প্ন অথবা পলায়ন – এ-দুয়ের কোনো বিকল্প ছিল না। মুক্তিযুদ্ধোত্তরকালে যে-সকল নতুন কবি আবির্ভূত হলেন, দ্বিধাহীন আত্মপ্রকাশ-আকাঙ্ক্ষা, সমাজ ও রাষ্ট্রের বস্ত্তগত পটপরিবর্তনের সুখবোধ এবং আনন্দানুভূতি অনেকের স্বপ্নলোককেই করে তুললো বস্ত্তসম্পর্করহিত। প্রেম ও সংগ্রামের দ্বৈরথ অগ্রজদের কারো কারো মতো এঁদেরকে আলোড়িত করেনি। বরং যুদ্ধোত্তর কয়েক বছরের মধ্যে জাতীয় জীবনের বিপর্যয়, মুক্তিযুদ্ধ-অর্জিত চেতনার ক্রমবিলীয়মান রূপ, পাকিসত্মানি আমলের পরাজিত দৃষ্টিভঙ্গির পুনরম্নত্থান, সেনাতন্ত্রের বিকৃত মুখচ্ছবি, গণতন্ত্রের পরিবর্তে স্বৈরতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা, পরাজিত সাম্প্রদায়িকতার পুনরম্নজ্জীবনচেষ্টা এবং সংবিধানের মূলসত্মম্ভগুলোর অপসারণ জাতীয় চৈতন্যকে নিক্ষেপ করে গভীর অন্ধকার ও অনিশ্চয়তাগহবরে। এই পরিস্থিতিতে সংবেদনশীল কবিচৈতন্যের যে প্রতিক্রিয়া, সমাজ ও সময়ের অমত্মঃস্বর অনুধাবনে তার তাৎপর্য অপরিসীম।

চার
সমাজবাসত্মবতা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার সূত্র ধরেই আমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধোত্তর কবিতার স্বরূপ নিরূপণ করতে হবে। এ-সময়ের কবিতায় প্রধানত যে-লক্ষণগুলো সুস্পষ্ট, তাহলো, রক্তাক্ত যুদ্ধের অভিজ্ঞতার সমামত্মরালে ব্যক্তির আত্মপ্রকাশ ও আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা। বৃহৎ ত্যাগের অনুভবে আত্মমুগ্ধ অবসন্ন চৈতন্যের বাসত্মবতা-অতিরেক স্বপ্ন-কল্পনা। ব্যর্থতাবোধের দ্রম্নত সম্প্রসারণ। এ-ব্যর্থতাবোধ ষাটের দশকীয় ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, মূলত সমাজনির্ভর। প্রত্যাশা, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের নতুন চারিত্র্য। সংগ্রামী জীবনাকাঙ্ক্ষার নবতর মাত্রা। শ্রেণিবৈষম্য সম্পর্কে সজাগতা ও শ্রেণিসাম্য প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা। এবং এজন্য নবতর সংগ্রামের প্রস্ত্ততি। যতটা সরলরেখায় লক্ষণগুলো উপস্থাপিত হলো, কবিতায় তার রূপায়ণ অবশ্যই ততটা সরল-বক্ররেখায় চিহ্নিত নয়।
মুক্তিযুদ্ধের পর চলিস্ন­শ, পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকের কবিরা আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব কাব্যবস্ত্তর সন্ধান পেলেন। সৃজন-মননের যৌথ রাগে অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞানকে তাঁরা নিজ-নিজ বোধের মাত্রা অনুযায়ী রূপদান করলেন। কিন্তু এত বড় একটা সামাজিক-রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কাব্যস্বভাবের যতটা রূপামত্মরের সম্ভাবনা জাগিয়েছিলো, অল্পসংখ্যক কবি ছাড়া অধিকাংশই তা অনুধাবনে ব্যর্থ হলেন। উলেস্নখ্য যে, বাঙালির ইতিহাসে ভাষা-আন্দোলন কিংবা মুক্তিযুদ্ধের যে-তাৎপর্য, কেবল কাব্যবিষয়ের মধ্যে তাকে সীমায়িত করে দেখা ঠিক হবে না। জীবনের সামগ্রিক পরিবর্তনে বস্ত্তজগৎ ও চেতনার বৈপস্ন­বিক রূপামত্মরে কবিতার রূপ,
রীতি, শব্দ অর্থাৎ সামগ্রিক প্যাটার্নেরই পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে পড়ে। যেমন দেখেছি ইউরোপীয় রেনেসাঁসের কবিতা, ফরাসি
বিপস্ন­বের সাহিত্য-শিল্প, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কিংবা রম্নশ বিপস্ন­বের কবিতা এবং বিপস্নবমন্থিত ল্যাটিন আমেরিকার কবিতা। আমাদের কবিরা মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধ-পরবর্তী চেতনার রূপামত্মরিত চরিত্র কতোটা ধারণ করতে পেরেছেন কবিতায়, তা বিশেস্ন­ষণ করে দেখা যেতে পারে। এ-সময়ে কবিতাচর্চায় সক্রিয় আহসান হাবীব, আবুল হোসেন, সৈয়দ আলী আহসান এবং সানাউল হকের কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ নতুন বোধের উৎসমুখ হয়ে উঠেছে। যেমন –

১. কোথাও পড়ে না চোখে বধ্যভূমি, অথচ প্রত্যহ
নিহতের সংখ্যা বাড়ে। কোথাও একটিও
লাশ কিংবা কবর পড়ে না চোখে, অথচ প্রত্যহ
শবাধার ব্যসত্ম হয়ে হেঁটে যায় এবাড়ি ওবাড়ি।
(আহসান হাবীব)

২. অনেক শেখানো অনেক পড়ানো
বহু পুরম্নষের মর্চে ধরানো
ভাগ্যটার
ঝুঁটি ধরে নাড়া দেবার সময়
এসেছে এবার…
(আবুল হোসেন)

৩. আমার মনে হয়
সমুদ্রের সামনে যুগযুগামেত্মর সাক্ষ্য বিদ্যমান –
মহাকালকে এখানে অনুধাবন করা যায় একটি
প্রার্থনার কাম্যে।
(সৈয়দ আলী আহসান)
৪. নক্ষত্রের আলো
মুক্তিসেনা চিতার শরীর, বাংলার ন’মাসী উন্মেষ
কখনো কাতর; অকাতর রক্তক্ষরা ধাবমান তরী,
অশোচ আতুর ঘরে সর্ষে ঝাঁঝ, রম্নদ্ধদ্বার ছায়াকালো :
সেখানে আমার জন্ম – কী আনন্দ স্বাধীন বাংলাদেশ। (সানাউল হক )

উলিস্ন­খিত উদ্ধৃতিগুচ্ছ পরিণত অভিজ্ঞতা ও গভীরতর আবেগধর্মের সাক্ষ্যবাহী। কবিরা যুদ্ধ ও যুদ্ধোত্তর ট্র্যাজিক জীবনচৈতন্যের অঙ্গীকার আশ্চর্য কুশলতায় উপস্থাপন করেছেন কবিতায়। পঞ্চাশের দশকে উদ্ভূত কবিদের চেতনা ও সৃষ্টিতে মুক্তিযুদ্ধের আবেদন বহুমাত্রিক। অবশ্য যুদ্ধকালীন সক্রিয়তা বা নিষ্ক্রিয়তাও অনেক ক্ষেত্রে কবিদের আবেগ-মননের চারিত্র্য নির্দেশ করেছে। শামসুর রাহমান, জিলস্নুর রহমান সিদ্দিকী, হাসান হাফিজুর রহমান, আজীজুল হক, আলাউদ্দিন আল আজাদ, সৈয়দ শামসুল হক, আবু জাফর ওবায়দুলস্নাহ, সাইয়িদ আতীকুলস্নাহ, মোহম্মদ মনিরম্নজ্জামান, আল মাহমুদ, আবু হেনা মোসত্মফা কামাল, ফজল শাহাবুদ্দীন, জিয়া হায়দার, আবুবকর সিদ্দিক, শহীদ কাদরী প্রমুখ যুদ্ধ ও যুদ্ধোত্তর জীবনসমগ্রতার অঙ্গীকারকে বিচিত্রভাবে প্রকাশ করেছেন। সংগত কারণেই জীবনচেতনা ও শিল্পাদর্শের প্রশ্নে এঁরা সকলেই স্বনির্মিত কাব্যাদর্শের বৃত্তেই আবর্তিত হয়েছেন। যেমন –

১. এবং পৃথিবীর এক প্রামত্ম থেকে অন্য প্রামেত্ম জ্বলমত্ম
ঘোষণার ধ্বনি প্রতিধ্বনি তুলে
নতুন নিশান উড়িয়ে, দামামা বাজিয়ে দিগ্বিদিক
এই বাংলায়
তোমাকে আসতেই হবে, হে স্বাধীনতা!
(শামসুর রাহমান)

২. বন্দী, তুমি এখনও ভুলতে পারছ না
কী অমত্মহীন এই বন্দী দশা,
বন্দী, সেই থেকে তোমার ঘুম পলাতক
যদিও মুক্তিসেনারা এসেছিল
একদিন
(জিলস্নুর রহমান সিদ্দিকী)

৩. এবার মোছাব মুখ তোমার আপন পতাকায়।
হাজার বছরের বেদনা থেকে জন্ম নিল
রক্তিম সূর্যের অধিকারী যে শ্যামকামত্ম ফুল
নিঃশঙ্ক হাওয়ায় আজ ওড়ে, দুঃখভোলানিয়া গান গায়।
মোছাব তোমার মুখ আজ সেই গাঢ় পতাকায়।
(হাসান হাফিজুর রহমান)

৪. একটি কবিতা একজন কবির হৃৎপি- চিবিয়ে খাচ্ছে
রক্ত
একটি স্বপ্ন একজন প্রেমিকের চোখ উপড়ে নিচ্ছে রক্ত
রক্ত
রক্ত রক্ত রক্ত
উন্মোচিত জরায়ুতে কি এতো রক্ত থাকে?
(আজীজুল হক)

৫. শুভঙ্কর কোথায় জন্মেছিলো?
নিশ্চয় প্রাচ্যভূমি
সেখানে জীবনটা
আয়নার উল্টোপিঠ;
এবং ইতিহাস দস্যুর উপাখ্যান।
(আলাউদ্দিন আল আজাদ)

৬. যখন তিরিশ লক্ষ মানুষের রক্তে পস্ন­বমান আমার স্মৃতি,
এখনো তো আমার স্মৃতি;
যখন তিন কোটি মানুষের গৃহত্যাগে বিলীয়মান আমার সভ্যতা
এখনো তো আমার সভ্যতা;
যখন বলীবর্দের দ্বিখ–ত খুরে কম্পমান আমার স্বপ্ন,
প্রিয় ব্রহ্মপুত্র, এখনো তো আমার স্বপ্ন।
(সৈয়দ শামসুল হক)

উদ্ধৃত কবিতাংশগুলো বাংলা কবিতার ধারায় বিষয় ও প্রকরণে কেবল নতুন মাত্রাই যুক্ত করেনি, বাঙালির বস্ত্ত-অভিজ্ঞতা ও অসিত্মত্বজিজ্ঞাসার ক্ষেত্রে যুগামত্মরের ইঙ্গিত বহন করছে। জীবনাভিজ্ঞতা ও বোধের তীব্রতায় এ-সময়ের কবিতা অপরিমেয় গতি, ব্যাপ্তি ও গভীরতা পেয়েছে। যুদ্ধোত্তর জীবনে সমাজ ও ব্যক্তিমানুষের অনিশ্চয়তা, অবক্ষয় ও নৈরাশ্য কবিমনকে পীড়িত করলেও পলায়নের পরিবর্তে দুঃখ, যন্ত্রণা ও রক্তিম স্মৃতি-আক্রামত্ম বস্ত্তবিশ্বকেই গ্রহণ করলেন কবিরা। ভাষা-আন্দোলনের চেতনায় উজ্জীবিত কবিরা দীর্ঘায়ত সংগ্রামের অভিজ্ঞতাকে শব্দে-শোণিতে-আবেগে-মননে বাঙ্ময় করে তুললেন :
১. কমলকে চেন তুমি;
সুন্দর সুঠাম দেহ
প্রদীপ্ত চোখ
দুপুর রোদের মত
তীব্র প্রখর।
একটা বুলেট
কমলের ডান চোখ
ছিঁড়ে নিয়ে গেছে।
(আবু জাফর ওবায়দুলস্ন­vহ)

২. আমার বুকের রক্তে বাংলার শ্যামল পস্ন­vবিত
যেন কোন সবুজাভা নেই আর, সকল সবুজে
থোকা থোকা লাল রক্ত, আর সেই
সবুজের বক্ষদীর্ণ রক্তের গোলকে
সোনার বাংলার ছবি
মুহূর্তে পতাকা হয়ে দোদুল বাতাসে :
(মোহম্মদ মনিরম্নজ্জামান)
৩. এই তো আমার মুখ ভাইসব, এই তো আমার মুখ!
আমার মুখচ্ছবির মধ্যে এই তো চারজন যুবক প্রবেশ করলো।
কচুরিপানার শিকড়ের মত কালো উজ্জ্বল দাড়ি। দুমড়ানো
পোশাক। যারা সর্বশেষ আহবানে হৃদয়ের ভেতর
অস্ত্র জমা রেখেছে। এখন আমার মুখের ভেতর তাদের
গুপ্ত অধিবেশন। যে অতর্কিতে
শহরগুলোকে দখল করা হবে
আমার মুখ তারি রক্তাক্ত পরিকল্পনা।
(আল মাহমুদ)

৪. বাংলার বৃষ্টির ধারাযন্ত্রে
মন্ত্র ঝরে অদ্ভুত বিদ্রোহ অবিরাম
সংগ্রাম।
… … …
বাংলার যে কোনো ঘাঁটি ভিয়েতনাম,
আজীবন বিদ্রোহী বিপস্নবী
বাংলার গ্রাম।
(আবুবকর সিদ্দিক)

৫. মধ্য-দুপুরে, ধ্বংসসত্মূপের মধ্যে, একটা তন্ময় বালক
কাঁচ, লোহা, টুকরা ইট, বিদীর্ণ কড়ি-কাঠ,
একফালি টিন,
ছেঁড়া চট, জংধরা পেরেক জড়ো করলো এক নিপুণ
ঐন্দ্রজালিকের মতো যতো
এবং অসতর্ক হাতে কারফিউ শুরম্ন হওয়ার আগেই
প্রায় অন্যমনস্কভাবে তৈরী করলো কয়েকটা অক্ষর
‘স্বা-ধী-ন-তা’।
(শহীদ কাদরী)

বোধ ও দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা সত্ত্বেও রক্তে-ঘামে তৈরি স্বদেশ এবং প্রত্নস্মৃতির রক্তিম অভিজ্ঞতাপুঞ্জকে এইসব কবি চেতনার কেন্দ্রে স্থাপন করেছেন। এবং সংগ্রামের অভিজ্ঞতা অভিজ্ঞানে রূপামত্মরিত হয়ে বিশ্বজনীন সংগ্রাম ও মানবতাবোধে উজ্জীবিত হয়েছেন কবিরা। যুদ্ধোত্তর কয়েক দশকে জাতীয় জীবনে যেসব অভাবিত রাজনৈতিক দুর্যোগ সংঘটিত হয়েছে, তা কেবল জাতীয় জীবনকেই বিপন্ন করেনি – মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত সকল গণমুখী মূল্যবোধকে বিপর্যয়ের সম্মুখীন করেছে। এই পরিস্থিতিতে কবিদের চেতনার রূপামত্মরও অনিবার্য হয়ে পড়েছে। রূপামত্মরের রক্তাক্ত পরীক্ষায় কেউ উত্তীর্ণ হয়েছেন, আবার কেউ-বা পরিণত হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তির বশংবদে। সাইয়িদ আতীকুলস্ন­vহর উপলব্ধিতে এই সমাজসত্যেরই ছায়াপাত লক্ষ করা যায় :
ঘৃণিত যারা একাত্তরে তারাই ছলে বলে, কূটকৌশলে
বাজিমাত করার ফিকিরে আছে প্রায় সবখানে
নানা পিশাচের সঙ্গে তারা আজ মিলিয়েছে গলা
দৈর্ঘ্যে প্রস্থে নারকীয় অতি বিকট একটি বাগানে
একাত্তরেও হেসত্মনেসত্ম হয়নি পুরোপরি সবটা।
শামসুর রাহমানের কবিতায় সময় ও সমাজচৈতন্যের এই মর্মন্তুদ ক্রমধারা সুস্পষ্ট ধরা পড়েছে। যুদ্ধোত্তর সর্বগ্রাসী বিপর্যয়ের কালে তিনি প্রথম পর্যায়ে অমত্মর্মুখিতায় নিমজ্জিত হন। জাতিসত্তার প্রতিবাদ ও সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে সিসিফাসের মতো জেগে ওঠে তাঁর কবিমন। তিনি অনুভব করেন, ‘এ কোন খাঁচায় আছি? চাবি দেয়া পুতুলের মতো/ ঘুরি ফিরি, মাথা নাড়ি; ক্লামত্ম হলে শিক গুণে গুণে/ ঘুমের খাঁচায় ঢুকি।’ ‘খাঁচা’ আর আল মাহমুদ ‘আস্থা’ হারান ‘মানবিক নির্মাণের প্রতি’। কিন্তু সময় ও জীবনমুখী চেতনা কবি শামসুর রাহমানকে দাঁড় করিয়ে দেয় রক্ত আর মিছিলের স্রোতে। পঞ্চাশের অনেক কবির মধ্যেই এই রূপামত্মর সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে নববইয়ের গণআন্দোলনকে কেন্দ্র করে। শিল্পীর মানস-রূপামত্মরের শক্তি-উৎস নিঃসন্দেহে মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী চেতনা।

পাঁচ
ষাটের দশকে উদ্ভূত কবিবৃন্দ যুদ্ধোত্তরকালে বাংলাদেশের সম্মিলিত কাব্যধারায় ইতিবাচক গতি সঞ্চারে সমর্থ হন। উলেস্নখ্য যে, এসব কবির অধিকাংশই মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। বাংলা কবিতার পালাবদলে মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী অবদানের রূপ ও স্বরূপ এঁদের কবিতা পাঠে অনুধাবন করা যায়। আবেগের তীব্রতায় বিক্ষোভে-প্রতিবাদে, প্রেমে-সংগ্রামে, আসক্তি ও ঘৃণায় যুদ্ধ ও যুদ্ধোত্তর সমাজসত্তার সমগ্র রূপ ধরা পড়েছে এঁদের কবিতায়। এই সংরক্ত চেতনাবাহী কবিদের মধ্যে রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, মহাদেব সাহা, বেলাল চৌধুরী, আসাদ চৌধুরী, মোহাম্মদ রফিক, আবুল হাসান, হায়াৎ মামুদ, শামসুল ইসলাম, সিকদার আমিনুল হক, আহমদ ছফা, মাহমুদ আল জামান, আবু কায়সার, হুমায়ুন কবির, মুহম্মদ নূরম্নল হুদা, হুমায়ুন আজাদ, মাহবুব সাদিক, অসীম সাহা, অরম্নণাভ সরকার, হাবীবুলস্ন­vহ সিরাজী, কাজী রোজী, জাহিদুল হক, সাযযাদ কাদির, সানাউল হক খান, হেলাল হাফিজ প্রমুখ উলেস্নখযোগ্য। কয়েকটি দৃষ্টামত্ম-সহযোগে
উলিস্ন­খিত কবিদের বোধ ও রূপসৃষ্টির অনন্যতা সন্ধান করা যেতে পারে :
১. কিন্তু শেষ নয় হে মাতৃভূমি
এই ধর্ষিত দেশ থাকবে না অনাসক্ত
আর স্থির আতপ্ত বাতাসে। নেকড়ের মুখ থেকে
একটি হরিণছানাও অতর্কিতে মুক্ত হয়ে যায় শুনেছি
দেশও হবে –
আমার বাংলাদেশ। (সিকদার আমিনুল হক)

২. আমার অনেক কিছুই নেই –
কিন্তু তাতে আমার কিছু এসে যায় না
আমার কোনো অভাবও নেই
কারণ আমার একটি সুন্দর পতাকা আছে,
এখন আমার শুধু একটি আগ্নেয়াস্ত্র চাই,
আর কিছু নয়।
(রফিক আজাদ)

৩. নারকেল সবুজ পাতার বালির ঢাকা চাঁদেও সোনালি কামান
নিঃশব্দ ওঙ্কারে গর্জে উঠে তুমুল জ্যোৎস্না ছুঁড়ে মারে
এই চলে সারা রাত
জ্যোৎস্নায় তমসায় বাদানুবাদ
গৃহযুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধে রূপামত্মরিত হয়ে যায়।
(আবদুল মান্নান সৈয়দ)

৪. পৃথিবীর ইতিহাস থেকে কলঙ্কিত পৃষ্ঠাগুলো রেখে
চ’লে আসি ক্যানাডার বিশাল মিছিলে সেস্ন­vগান শোনাতে।
মানুষের জয় হোক, নিপীড়িত জনগণ জয়ী হোক অমিত্মম
সমরে।
অসত্যের অন্যায়ের পরাজয়ে খুশি হোক বিশ্বের বিবেক,
পলাতক শামিত্ম যেন ফিরে আসে আহত বাংলার ঘরে ঘরে। (আসাদ চৌধুরী)

৫. বাংলার আকাশ জুড়ে মূক ও বধির
মুখ থুবড়ে পড়ে আছে পূর্ণিমার চাঁদ, এতো বেশী –
রক্তপাতে, রক্তহীন
… … …
ঘরে ঘরে লক্ষ কোটি মানুষের উত্তপ্ত নিঃশ্বাস
অগ্নিময় ঝরে পড়ে রক্তফোঁটা, মূক ও বধির
(মোহাম্মদ রফিক)

৬. আঙ্গিনা শূন্য, গ্রাম শূন্য, বাস্ত্তভিটা শূন্য
বাগানে ভাগাড়ে সবই প্রকাশ্য।
ঝ’রে পড়েছে মানুষের থেঁতলানো শরীরে
মৃত্যুর স্পর্শ
একটু একটু করে তুলে ধরো মাটির মধ্যে
নিঃসাড় শরীরে
তোমার তৃষ্ণা।
(মাহমুদ আল জামান)

৭. কোথাও ফোটে না ফুল, কোথাও শুনি না আর
হৃদয়ের ভাষা
কেবল তাকিয়ে দেখি, মার্চ পাস্ট, কুচকাওয়াজ, লেফটরাইট
এই রক্তাক্ত মাটিতে আর ফুল কই, শুধু অস্ত্রের উলস্ন­vস। (মহাদেব সাহা)

৮. শ্রেণীদ্বন্দ্বে খ–ত হয়েছে পৃথ্বি এতোখ- খ- রূপে
এই দ্বন্দ্ব ঘুচে গেলে আবার সম্পূর্ণরূপে, মহামানবের
পূণ্যতীর্থে
জাগিবেন জন্মভূমি, জননী আমার।
(নির্মলেন্দু গুণ)
৯. আমার যে ডান হাতে শামিত্ম ছিলো
সেই ডান হাতটি নেই
উড়ে গেছে বেয়াদব বোমা বিস্ফোরণে
বাম হাতে গৃহযুদ্ধ অন্ধকার
স্বদেশের সাতকোটি মানুষের হতাশার কররেখা নিয়ে আমি
ন্যূব্জ মুখে পড়ে আছি
অসহায় পড়ে আছি
…. …. ….
এদিকে সূর্য এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে
অন্ধকারে অনমত্ম পতাকা
আমাকে আরো বহুদূরে যেতে হবে
আরো বহু দূরে!
(আবুল হাসান)
এরূপ আরো অসংখ্য দৃষ্টামত্ম আহরণ করা যেতে পারে। দেশপ্রেম ও সংগ্রামের তীব্রতায় জ্বলমত্ম এইসব কবির চেতনালোক যুদ্ধ-পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যেই চরম পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। সমাজ ও রাষ্ট্রের বেদনাকরম্নণ ইতিহাস আমাদের জানা। রফিক আজাদ, নির্মলেন্দুগুণ ও আবুল হাসান কবিতায় সমাজমানসের সেই উজ্জীবন, পরাভবচেতনা ও নতুন উজ্জীবনের প্রাণশক্তি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাঙালি জীবনের প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচনে বহুলাংশে সমর্থ হয়েছেন। সমাজজিজ্ঞাসা, আত্মবিশেস্ন­ষণ ও আত্ম-আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে অনেক কবিই জীবনের নতুন সত্য অনুধাবনে সমর্থ হয়েছেন এবং কবিতায় রূপদান করেছেন। স্বাধীনতার পরে সত্তরের দশকে আবির্ভূত কবিদের কবিতায় যুদ্ধোত্তর সমাজে সমষ্টিজীবন ও ব্যক্তিমানসের বিপর্যয় ও অনিশ্চয়তার অস্থিরচিত্র পাওয়া যায়। স্বপ্ন অপেক্ষা স্বপ্নভঙ্গজনিত ব্যর্থতাবোধই তাঁদের কবিতায় তীব্র রূপ ধারণ করেছে। এই ব্যর্থতাবোধও সমাজলগ্ন। ‘জন্মই আমার আজন্ম পাপ’ কিংবা ‘আজও আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই’ জাতীয় উচ্চারণের মধ্যে অবলোকনের ভিন্নতা সত্ত্বেও যন্ত্রণার ঐক্য সুস্পষ্ট। প্রথম পর্বের কবিদের মধ্যে আবেগ ও যন্ত্রণার যে তীব্রতা, সেখানে
নিকট-অতীতের সংগ্রামশীল সংরক্ত চেতনা বিস্ময়করভাবে অনুপস্থিত। মনে হয়, সমাজ ও জীবনের অব্যাহত ভাঙন কবিতার সংহত নিপুণ অবয়বেও এনে দিয়েছে বিস্রসত্ম, এলোমেলো ভাব। জীবনের এক পাড় ভেঙে অন্য পাড় গড়ে উঠবে, সভ্যতা-শিল্পের ইতিহাসে এ-রূপ দেখেই আমরা অভ্যসত্ম। কিন্তু বাংলাদেশের সমাজ-বৈগুণ্য কেবল ভাঙনের অব্যাহত প্রক্রিয়াকেই ত্বরান্বিত করছে। সংগ্রামের ফল ব্যর্থতার কালো রঙে অবগুণ্ঠিত, প্রেম ও নারী সান্নিধ্যে নেই স্বসিত্ম – চিরপরিচিত নিসর্গলোকের শুশ্রূষা থেকে ক্ষুন্নিবৃত্তি মানুষকে টেনে নিচ্ছে উদ্বাস্ত্ত স্বপ্নের মোহে।
সত্তরের দশকের কবিরা জীবনের সদর্থক প্রামত্মগুলোকে সজ্ঞানে পরিহার করতে চাননি, ষাটের দশকের কবিদের যুদ্ধ-পূর্ববর্তী কবিতার মতো। বরং জীবনের নেতিবাচক রূপের অব্যাহত আত্মপ্রকাশ তাঁদের পরাভবচেতনাকে ত্বরান্বিত করেছে। ব্যক্তি, সমষ্টি, মানুষ, দেশ – এসব বোধ তাঁদের ব্যর্থতাবোধের ব্যাকরণে নতুন তাৎপর্য আরোপ করেছে। এই ‘বিপন্নতা’ যে ব্যক্তিগত বিপন্নতা নয়, প্রায় সকল কবির দীর্ঘশ্বাসের মধ্যেও যে রয়ে গেছে অমত্মর্নিহিত ঐক্য, – এই লক্ষণ সত্তরের দশকের কবিতার একটা মৌলিক বৈশিষ্ট্য। এর কারণ কলোনিশাসিত সমাজ এবং স্বাধীন সমাজের পার্থক্য। দশকের মধ্য পর্যায়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাগ্যাকাশে শুরম্ন হয় ষড়যন্ত্র, হিংস্র-মত্ততা ও রক্তপাত। ইতিহাসের পশ্চাদগতি ও রাষ্ট্রাদর্শ থেকে মুক্তিযুদ্ধের চিহ্নসমূহের ক্রম-অপসারণ সমগ্র সমাজজীবনকেই নিক্ষেপ করে সীমাহীন তমসাগহবরে। কবিদের স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা আকাশচুম্বী পরাভবচেতনায় রূপ নেয়। এই পরিস্থিতিতে কবিদের মধ্যে সংরক্ত অনুভূতির পুনরম্নজ্জীবন ঘটে। এই সংরক্ত অনুভূতিকে বিভিন্ন সময়ের কবিরা অগ্রসরমান সমাজচৈতন্যের শব্দরূপে পরিণত করেছেন।
যুদ্ধের অব্যবহিত পরে যাঁদের কবিতা রচনার সূত্রপাত, তাঁদের মধ্যে শহীদুজ্জামান ফিরোজ, আবিদ আনোয়ার, সৈয়দ হায়দার, শামত্মনু কায়সার, দাউদ হায়দার, শিহাব সরকার, সুজাউদ্দিন কায়সার, মুজিবুল হক কবির, আবিদ আজাদ, বিমল গুহ, মুনীর সিরাজ, মাহবুব বারী, শামীম আজাদ, আবু করিম, মাহবুব হাসান, মোসত্মাফা মীর, হাসান হাফিজ, সৈকত আসগর, রবীন্দ্র গোপ, শামীম আজাদ, আসাদ মান্নান, দিলারা হাফিজ, ময়ুখ চৌধুরী, মাসুদুজ্জামান, কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়, জাহাঙ্গীর ফিরোজ প্রমুখ উলেস্ন­খযোগ্য। প্রথম আত্মপ্রকাশ-মুহূর্তে পূর্বতন কাব্যবিশ্বাসে অনাস্থা নিয়েও এঁদের জন্ম হয়নি। তবে অগ্রজ কবিদের অভিজ্ঞতার জগৎ থেকে এসব কবির অভিজ্ঞতার ভুবন স্বতন্ত্র। এই অভিজ্ঞতা কেবল বস্ত্তজাগতিক নয়, মানসিকও বটে। যেমন –

১. গ্রামটা আমার ভেসে গেছে, চৈত্র এলেই পুড়ে যাবে
কাজের জন্য দুয়ার দুয়ার ঘুরেও কোনো ফল হবে না
এখন দেখি শহর আমায় রাখে কিনা

বেঁচে থাকার ইচ্ছে নিয়ে গ্রামটি ছেড়ে চলে এলুম
চলে এলুম তোমায় ছেড়ে চলে এলুম
(দাউদ হায়দার)

২. আমাকে পাবে না। পাবে শুধু অচল দিবাবসান
অনুক্ষণ মরীচিকাপোড়া দিগমেত্মর ডান
বিসর্পিল শুষ্ক জিহবা ঝরে যাবে তোমার পথের
পিপাসার্ত নদী তোমাকে দেখিয়ে দেবে ভুল পথে (আবিদ আজাদ)

৩. সর্বজনীন সূর্য এসে এই বাড়িতে ডোবে
অাঁধার-মুখো চাঁদের নটী উল্টো পায়ে নাচে
দেয়াল ফেটে রক্ত ঝরে জং ধরেছে কাঁচে
ক্লামত্ম চড়ই নিজের পাখা নিজেই ছোঁড়ে ক্ষোভে।
গোরের গানে তৃপ্তি খোঁজে নতুন কোনো র্যাঁবো
এই বাড়িকে জিয়ন-কাঠি ছুঁইয়ে কখন দেবো?
(আবিদ আনোয়ার)

৪. নাচঘরে অস্থির ছুটোছুটি, সারা মঞ্চে আগুন
নিমেষে আমার পান্ডুলিপি কেড়ে নিয়ে
সামনে পেছনে প্রহরা
ক’জন গোয়েন্দা পরে আমার ভাষার ইতিহাসও দাবি করে
তার চেয়ে শিরা কেটে নিলে না কেন?
(শিহাব সরকার)

যুদ্ধোত্তর সমাজ ও ব্যক্তিমানসের বিপর্যয় ও অনিশ্চয়তার অস্থির চিত্র উলিস্ন­খিত কাব্যাংশগুলো থেকে পাওয়া যায়। দশকের মধ্য পর্যায়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাগ্যাকাশে শুরম্ন হয় ষড়যন্ত্র, হিংস্র-মত্ততা ও রক্তপাত। ইতিহাসের পশ্চাদগতি ও রাষ্ট্রাদর্শ থেকে মুক্তিযুদ্ধের চিহ্নসমূহের ক্রম-অপসারণ সমগ্র সমাজজীবনকেই নিক্ষেপ করে সীমাহীন তমসাগহবরে। কবিদের স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা আকাশচুম্বী পরাভবচেতনায় রূপ নেয়। এই পরিস্থিতিতে কবিদের মধ্যে সংরক্ত অনুভূতির পুনরম্নজ্জীবন ঘটে :

১. হাত বাড়ালেই মুঠিতে রক্ত ঝরে
কার সমত্মান কাটা বন্দুকে মরে
হিংস্র-স্বদেশ আমাকে পাঠাও দূরের নির্বাসনে
(কামাল চৌধুরী)
২. অতোটা ফুলের প্রয়োজন নেই
ভাষাহীন মুখ নিরীহ জীবন
প্রয়োজন নেই প্রয়োজন নেই
কিছুটা হিংস্র বিদ্রোহ চাই কিছুটা আঘাত
রক্তে কিছুটা উত্তাপ চাই, উষ্ণতা চাই
চাই কিছু লাল তীব্র আগুন।
(রম্নদ্র মুহম্মদ শহিদুলস্নাহ)
৩. আমার হৃদয় ভর্তি কথাগুলি
অব্যর্থ একটি মেশিনগানের মতোন মুখর হতে চায়। (মাহবুব হাসান)

এই প্রতিবাদী সদর্থক চেতনা এ-সময়ের অনেক কবির মধ্যেই নতুন কাব্যবোধের জন্ম দিয়েছে। তাঁরা নিসর্গবন্দনার পরিবর্তে চেতনা প্রসারিত করেছেন বৃহত্তর জনপদে – প্রেমের ব্যর্থতাবোধকেও একটা তত্ত্বময় অভিজ্ঞানে পৌঁছে দিয়েছেন কোনো কোনো কবি।
সত্তরের দশকের মধ্য পর্যায়ে যে-সকল তরম্নণ কবির আবির্ভাব ঘটে তাঁদের মধ্যে নাসির আহমেদ, হালিম আজাদ, শিশির দত্ত, ইকবাল আজিজ, সোহরাব হাসান, ফারম্নক মাহমুদ, জাহিদ হায়দার, মুহাম্মদ সামাদ, আসলাম সানী, আশরাফ আহমদ, তুষার দাশ, তসলিমা নাসরিন, জাফর ওয়াজেদ, আহমদ আজিজ, নাসিমা সুলতানা, সাইফুলস্নাহ মাহমুদ দুলাল, আবু হাসান শাহরিয়ার, সৈয়দ আল ফারম্নক প্রমুখ উলেস্ন­খযোগ্য। এই প্রজন্মের কবিদের মধ্যে ব্যক্তিসত্তার আত্মপ্রতিষ্ঠার তীব্রতা যেমন আছে, তেমনি রয়েছে সর্বগ্রাসী ব্যর্থতা ও হতাশার মধ্যেও শুশ্রূষার জন্য আকুতি। অবশ্য জাহিদ হায়দার ঘোষণা করেন –

এই জেনারেশন পায়নি কোনো প্রেম
জেগে উঠবার পর থেকে শুনেছে শুধু
ভাঙ্গনের ঘণ্টাধ্বনি
অগ্রজের দীর্ঘশ্বাস
অদ্ভুত রাজনীতির রঙিন ঠোঁটের হাসি
তার বিকৃত শরীর ঘাম তেলে অত্যমত্ম পিচ্ছিল
মানুষের হৃদয়ের লেনদেন তার কাছে বাসি।
প্রজন্মের চারিত্র্যনির্দেশক এই উচ্চারণ সত্ত্বেও জাহিদ হায়দার প্রেমের ব্যর্থতায় নয়, প্রতীক্ষায় আস্থাশীল। প্রেমের দুর্মর আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের তীব্রতায় কবিদের কাব্যোপকরণের ক্ষেত্রও ক্রমাগত বিসত্মৃত হয়েছে। যেমন –

১. আমার ভেতরে আজও ঘুমিয়ে রয়েছে যে বাউল,
সে যেন অমত্মত একবার জেগে ওঠে,
পূর্ণ মানুষের মতো নিজেই নিজের গালে চুমু খেয়ে বলে :

এতকাল ভুল জলে সণান করেছেন মহাশয়
জীবনের ভুল-ভাল কখনো চোখের জলে ধুয়ে নিতে হয়।
(নাসির আহমেদ)

২. একটি নিটোল বিশ্বশামিত্ম যেনো সবাইকে গ্রাস করছে।
হলুদ লোকটি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে
তার এখন ঘুম পাচ্ছে
হলুদ লোকটি ঘুমোতে যাবার আগে আরেক বার
জেগে উঠবে।
(ইকবাল আজিজ)

৩. আমার এখন খিদে পাচ্ছে ঘুম পাচ্ছে
ঘাম রক্তে মুঠোর ভেতর ভিজে যাচ্ছে মানচিত্র
তুই বললি মানচিত্র আমার হবে
কেন বললি?
(নাসিমা সুলতানা)

৪. মা যে আমার তোমার পাশে
কালি-ঝুলি মুখে
তোমার উষ্ণ আবেগ খোঁজে
সমত্মানদের দুখে
(ত্রিদিব দসিত্মদার)

উলিস্ন­খিত উচ্চারণ থেকে এই সময়ের কবিতার একটা সদর্থক রূপ আমরা অনুধাবন করতে পারি।

সবকালের কবিতারই একটা লোকরঞ্জক ধারা থাকে। সময়ের বিবর্তনে ওইসব কবিতার আকর্ষণ বহুলাংশে লোপ পায়। মাইকেল মধুসূদন দত্তের কাল থেকে এই একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্ন পর্যমত্ম এই লোকরঞ্জক কবিতার একটা স্বতঃস্ফূর্ত প্রবাহ বিদ্যমান। জীবনের উপরিতলের অনুষঙ্গবাহী এসব কবিতার সামাজিক তাৎপর্যও কখনো কখনো মুখ্য হয়ে উঠতে পারে। বিশ শতকের প্রথমার্ধের সমকালে জনপ্রিয় অনেক কবির কবিতা সামাজিক-রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে এখনো গবেষণা ও অনুসন্ধানের বিষয় হয়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধোত্তরকালের নবোদ্ভূত কবিদের সুতীব্র জীবনাকাঙ্ক্ষা ও সংরক্ত অনুভূতিপুঞ্জও পূর্বপ্রতিষ্ঠিত প্রাজ্ঞ, পরিণত কবিদের উজ্জ্বলতার কাছে বহুলাংশে মস্ন­vন হয়ে যায়। উদ্ভ্রামত্ম, দর্শনহীন, মীমাংসাশূন্য সমকালীন যন্ত্রণার রূপকল্প হিসেবে স্বীকারযোগ্য ওইসব কবিতার আবেদন পঞ্চাশ-ষাটের দশকের কবিদের অতিক্রম করতে পারেনি। আর অস্থির বর্তমানের চলমানতার পটভূমিতে সমাজগঠনের অস্থিতিশীল চারিত্র্য, বিস্রসত্ম মধ্যবিত্ত জীবন, সদ্যস্বাধীন রাষ্ট্রের দ্রম্নত রূপবদল সাধারণ মানুষের মতো কবিদের জীবন ও জীবিকার পথকেও অনিশ্চয়তা-আক্রামত্ম করেছে। পুঁজিবাদী বিশ্বের শৈল্পিক উত্তরাধিকাররোধে যাঁরা ঋদ্ধ হয়েছেন, তাঁদের পক্ষে
পেটি-বুর্জোয়া স্বভাবের আধা-সামমত্ম মুৎসুদ্দি-পুঁজি নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রযন্ত্রের অধিবাসী হিসেবে সীমাহীন মনোকষ্টে ভোগাই স্বাভাবিক। বাঙালি জাতি স্বাধীন পুঁজির বিকাশের লক্ষ্যে দীর্ঘকাল সংগ্রাম করেছে। আধুনিক বিশ্বে একটি স্বতন্ত্র মানচিত্র, জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীতই যে একটি জাতির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে নির্দেশ করে না, উন্নয়নশীল দেশগুলোর সচেতন অধিবাসীদের কাছে তা সুস্পষ্ট। তবে সামরিক শাসন কিংবা ছদ্মবেশী গণতন্ত্রের দোলাচল সত্ত্বেও সমাজগতির স্বাভাবিক নিয়মে বিশ্বপুঁজির আনুকূল্য ও অনুগ্রহে বাংলাদেশের জনজীবনের সম্মুখযাত্রা অব্যাহত থেকেছে। রাষ্ট্রবিচ্ছিন্ন শিক্ষিত আধুনিক মধ্যবিত্তের চেতনায় আত্মকু-লায়ন ও আত্মরতির সমামত্মরালে বিশ্বের বহুমুখী জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন ও নন্দনতত্ত্বের প্রতি আগ্রহও বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণে। ফলে, প্রচলিত সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি অনাস্থার মতো প্রবল কাব্যবিশ্বাসেও-সময়ের তরম্নণ-মানস আস্থা হারাতে শুরম্ন করে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রভূত উন্নতির ফলে পৃথিবীর অনুন্নত, নিশ্চল ভূখ-গুলোতেও কিছুটা আলোড়ন সৃষ্টি হতে থাকে। পাশ্চাত্য বিশ্বের পুঁজির মুক্তপ্রসার বিশ্বায়নের নামে পরজীবী দেশগুলোর আর্থ-উৎপাদন কাঠামোকে অধিকতর নিগড়বদ্ধ করে। ফলে গণতন্ত্রের দীর্ঘ অনুপস্থিতি অগ্রজের সাধনা ও বিশ্বাসের প্রতি যে অনাস্থার জন্ম দেয়, আশির দশকের নবোদ্ভূত কবিদের অনুভব ও সৃষ্টির ক্ষেত্রে তার প্রকাশ সুস্পষ্ট।

ছয়
আশির দশকের নতুন কবিরা বাহ্যত অনাস্থা প্রকাশ করলেন অগ্রজের কাব্যচারিত্র্য, জীবনানুভব ও নন্দনচিমত্মায়। রক্তিম সমাজজিজ্ঞাসা যে কবিতার মনোলোক ও শরীরকে বিক্ষত করতে পারে, সত্তরের দশকের নিকট-দৃষ্টামত্ম থেকে এ-ধারণা তাঁদের মধ্যে দৃঢ় ভিত্তি পায়। তাঁদের অনুভবে সমাজায়ত চিমত্মা ও উপলব্ধি অপেক্ষা বিশ্বজনীন দর্শন ও বিজ্ঞানের নিত্যনতুন উদ্ভাবনা, মিথ-উৎসের নবমাত্রিক ব্যবহার, পরাবিদ্যার (সবঃধঢ়যুংরপং) অঙ্গীকার; এমনকি, বিশুদ্ধ নন্দনচিমত্মার সমামত্মরালে আধ্যাত্মিক বিশ্বাসেরও স্বীকরণ লক্ষ করা যায়। এই নতুন ধারার কবিদের স্বভাবধর্ম হয়ে দাঁড়ায় – অগ্রজের তিন দশক ব্যাপ্ত অভিন্ন কাব্যস্বভাবে অনাস্থা; অনুষঙ্গের রূপামত্মর; মননতৃষ্ণা, দর্শননির্ভরতা, মিথের সঙ্গে চৈতন্যের মিথস্ক্রিয়া (সামাজিক অনুষঙ্গের নয়); বিজ্ঞানমনস্কতা, দেশজ ঐতিহ্যমগ্নতা এবং চেতনার বিশ্বমুখিতা।
আমরা জানি, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কাল থেকেই কবিতা প্রধানত মেধা, মনন ও বৈদগ্ধ্যের অনুষঙ্গী হয়ে উঠেছে। মার্কস-ফ্রয়েডের যুগামত্মকারী উদ্ভাবনার সঙ্গে সামাজিক এবং মনো-দৈহিক অবস্থার সংগতি খোঁজার চেষ্টা বিশ্বযুদ্ধোত্তর বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান লক্ষণ হয়ে ওঠে। সামাজিক পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের অসিত্মত্বগত ও মনোদৈহিক অবস্থার পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়েই দর্শন ও বিজ্ঞানুষঙ্গের অনুপ্রবেশ ঘটে কবিতায়। মিথের অব্যাহত নবমাত্রিক ব্যবহারের কথা বিচার করলে, বিজ্ঞানের সঙ্গে কবিতার আমত্মঃসম্পর্ক অনেকটা কবিতার সমবয়স্ক। আশির দশকের অধিকাংশ কবিই একটা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অভিজ্ঞতার মধ্যে তাঁদের শৈশব-কৈশোর অতিক্রম করেছেন। কিন্তু রক্তচিহ্ন অবচেতনলোকে স্থায়ী রূপ নেওয়ার যুদ্ধোত্তর এক দশক ধরে অনেকগুলো অনাকাঙ্ক্ষিত রক্তপাতের ঘটনা ঘটে। বয়ঃসন্ধির কৌতূহল ও সংবেদনে যুদ্ধজয়ের আনন্দ, গণতন্ত্রের স্বপ্ন, দেশগড়ার আকাঙ্ক্ষা মস্ন­vন হয়ে যায়। এই সময়ের কবিমানসের পটভূমি হিসেবে জাতিক ও আমত্মর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহের উলেস্ন­খ অনিবার্যভাবেই এসে পড়ে। এই অভিজ্ঞতাপুঞ্জের সমীক্ষা আশির দশকের কবিদের সংগত কারণেই করে তুলেছে নতুন কাব্যবস্ত্ত-অন্বেষী। যেসব কবি পূর্বজ কবিদের প্রতি অনাস্থায়, নববৃষ্টির অহংবোধে, দর্শনচিমত্মায়, বিজ্ঞানমনস্কতা ও পরাবিদ্যাচর্চায় নবধারার কবিতা রচনা করলেন, তাঁদের মধ্যে খোন্দকার আশরাফ হোসেন, মোহাম্মদ সাদিক, গোলাম কিবরিয়া পিনু, আকতার হোসাইন, গাজী রফিক, দারা মাহমুদ, তমিজ উদ্দীন লোদী, শামসেত তাবরেজী, বিশ্বজিৎ চৌধুরী, কাজল শাহনেওয়াজ, হাফিজ রশিদ খান, সালেম সুলেরী, সরকার মাসুদ, ফরিদ কবির, মাসুদ খান, মঈন চৌধুরী, মারম্নফ রায়হান, বদরম্নল হায়দার, সমরেশ দেবনাথ, মহীবুল আজিজ, রেজাউদ্দিন স্টালিন, শোয়েব সাদাব, শামত্মনু চৌধুরী, রিফাত চৌধুরী, কামরম্নল হাসান, খালেদ হোসাইন, সৈয়দ তারিক, তারিক সুজাত, সুহিতা সুলতানা, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, শুচি সৈয়দ, ফেরদৌস নাহার প্রমুখ ছাড়াও রয়েছেন আরো অনেক কবি। এই কবিগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত জনরঞ্জক কবিতার রচয়িতা যে নেই, তা বলা যাবে না। এ-সময়ের কবিদের কাব্যবস্ত্তর ব্যাপকতা ও প্রকরণের সচেতন পরীক্ষা-নিরীক্ষার সূত্র ধরে আমরা এঁদের নতুন নন্দনচিমত্মা ও কাব্যবিশ্বাসের স্বরূপ অনুধাবন করতে পারি। প্রথম পর্যায়ে কবিতায় বিশিষ্টভাবে দার্শনিকতা, অমত্মর্মুখিতা, মিথিক উৎসের ব্যবহার, বিজ্ঞান ও পরাচিমত্মার এক অস্থির জঙ্গম আমরা লক্ষ করি।
আধুনিক কবিতার (এখন উত্তরাধুনিকতা অভিধাও এক্ষেত্রে যুক্ত হয়েছে) ক্রমরূপামত্মর কিংবা উত্তরণের কার্যকর উপাদান হলো মিথ। চিরকালই কবিতায় মিথ ব্যবহৃত হয়েছে। নতুন কবিতা সৃষ্টির জন্য মিথকে ভাঙতে হয় এবং তাকে নতুন অবয়বে রূপদানের মধ্যেই কবিতার পুনর্জন্মের শক্তি-উৎস নিহিত থাকে। আশির দশকের কবিতায় বিশ্বমিথের সঙ্গে দেশজ মিথের অমত্মর্বয়ন লক্ষ করা যায়। ভগ্নক্রম অবচেতনাপ্রবাহ, বর্তমানবিরাগী মনের আনুভূমিক বিশ্ববিহার, ঐতিহ্যের চেতনাসাপেক্ষ প্রয়োগ এবং কাব্য-অনুষঙ্গের বিপর্যাসের মধ্য দিয়ে ওইসব কবির কাব্যবস্ত্ত ও কাব্যভাষায় ভিন্নমাত্রিক আলোড়ন সূচিত হয়। মিথ-উৎসের
ভগ্ন-উলেস্ন­খের সমামত্মরালে এইসব কবি নির্মাণ করেন চেতনার বহুসত্মর। আত্মখনন ও আত্মহননের তীব্রতায় মৃত্তিকার গভীরতাই শেষ পর্যমত্ম আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। প্রকৃতপক্ষে অনুষঙ্গ নির্মাণ বড় কথা নয়, আত্মকৃত সত্যকেই বিভিন্ন অনুষঙ্গের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করা।
প্রথম পর্যায়ের কবিরা রূপ অপেক্ষা ঐতিহ্য, আত্মভূগোল ও দর্শনানুসন্ধানেই বেশি আগ্রহী। বাকিদের অনেকেই নন্দনচিমত্মায় উত্তরাধুনিকতার বহুসত্মর, ব্যক্তিভূগোলের সীমাপ্রসারণ, প্রচল বিশ্বাসের পোস্টমর্টেম, মানবসম্পর্কের অকপট উন্মোচন, পরাবিদ্যার নতুন সংজ্ঞায়ন, এমনকি দু-একজনের মধ্যে বিজ্ঞানের অনুষঙ্গ, সত্য ও তত্ত্বের অভিনব কাব্যরূপ লক্ষ করি।
বিজ্ঞানানুষঙ্গের প্রয়োগ এ-প্রজন্মের কবিতার একটা মৌলিক লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। বিজ্ঞানের বস্ত্তময়তা কিংবা তত্ত্বময়তা নয়, জীবনপ্যাটার্নের রূপামত্মরের সঙ্গে বিজ্ঞানের প্রাসঙ্গিকতাকে অনিবার্য রূপ দিলেন কবিরা। এক্ষেত্রে মাসুদ খানের কবিমন, কাব্যবস্ত্ত ও কাব্যভাষায় বিজ্ঞানেরই সার্বভৌমত্ব। এসব কবির নিসর্গ, নক্ষত্রলোক, গ্রামীণ আবহ, নস্টালজিয়ার ভূমিক্ষেত্র পর্যমত্ম বিজ্ঞানের অনিবার্য প্রবেশে যন্ত্রময়।
শুদ্ধ শিল্পময়তার চর্চা সবকালের কবিতাতেই আমরা কমবেশি লক্ষ করি। কখনো তা মনোদৈহিক সত্য উন্মোচনের প্রয়োজনে, কখনো-বা সামাজিক-রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে পলায়নের লক্ষ্যে, আবার কখনো কখনো পরাবিদ্যা ও রহস্যময়তার শতগ্রন্থিল ভাবলোকে অবগাহনের ঐকামিত্মকতায়। সকল সৎ কবির মধ্যেই শুদ্ধ শিল্প বা নন্দনতত্ত্বের অঙ্গীকার কমবেশি বিদ্যমান। সামাজিক দায়বদ্ধতাকে আধুনিক কবির পক্ষে অতিক্রম করা অসম্ভব। বিশেষ করে, তথ্যপ্রযুক্তির সম্প্রসারণের ফলে জ্ঞান ও শিল্পকলার বিশ্বায়ন সাম্প্রতিক কবিতার শেকড়কে সমামত্মরালভাবে কেন্দ্রানুগ ও কেন্দ্রাতিগ করে তুলেছে। কবিতার মন হয়ে উঠেছে বিশ্বজনীন আর ভাষাশরীর দেশজ। সময়স্বভাবের এই বিচিত্রগতির আবর্তে কবিতার চরিত্রও হয়ে উঠেছে অস্থির।

সাত
বিশ শতকের শেষ দশকে যে-সকল কবি স্বাবলম্বী কাব্যপ্রত্যয় নিয়ে আত্মপ্রকাশ করলেন, এঁদের অধিকাংশেরই হাতেখড়ি আশির দশকের শেষ দিকে। সময়ের শিল্পচারিত্র্যই এইসব কবিকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত করেছে। এসব কবির মধ্যে আমরা লক্ষ করবো, শুরম্নতেই স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা, সৃজনের আত্মমুগ্ধতা এবং কবিসুলভ তীব্র অহংবোধ। পূর্বতন দশক থেকে যার চারিত্র্য কিছুটা ভিন্ন। কাব্যভাষা, শৈলী, প্রতীক ও চিত্রকল্পের প্রচলিত ধরনের (ঢ়ধৎধফরমস) প্রতি অনাস্থা। নতুন কাব্যচারিত্র্য সন্ধানের লক্ষ্যে অনুষঙ্গের রূপবদল। বর্তমান সচেতনতা, দর্শন ও বিজ্ঞানমনস্কতার প্রশ্নে পূর্বানুগামিতা। অতিমাত্রায় আত্মমুখী এবং আত্মকেন্দ্রিক।
সমাজচারিত্র্যের মধ্যে ব্যক্তির জীবন ও মনোগঠনের ব্যাকরণ সৃষ্টি হয়। মুক্তিযুদ্ধোত্তর দুই দশকে বাংলাদেশের সমাজজীবনের বহুমুখী ভাঙাগড়া ও উত্থান-পতনে এর সৃজনশীল মনোজগতে সূচিত হয়েছে অভূতপূর্ব রূপামত্মর। শতাব্দী-সংক্রামিত্মর অস্থিরতায়, বিশ্বপুঁজিবাদ, রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বহির্চাপ এবং দেশি রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির অমত্মর্চাপে এ সময়ের
তরম্নণ-মানস সংগত কারণেই ক্রমাগত অমত্মর্মুখী হয়ে ওঠে। এই অমত্মর্মুখিতার স্বভাবধর্ম পূর্বতন যে-কোনো সময়ের চেয়ে স্বতন্ত্র। প্রচলিত বিশ্বাসে অনীহা, সমাজ-রাজনীতি ও রাষ্ট্রের কূটচরিত্রে অনাস্থা, মূল্যবোধের প্রচলিত সত্মম্ভগুলোর প্রতি অবিশ্বাস এবং অগ্রজের কৃতি ও কীর্তির প্রতি সীমাহীন অশ্রদ্ধায় এই প্রজন্মের মনোলোক বিদীর্ণ ও রক্তাক্ত। মনোজগতের রক্তপাতে অবসন্নতার পরিবর্তে জন্ম নেয় ক্রোধ ও ঘৃণা। এ-ঘৃণা সমাজব্যবস্থার প্রতি, পূর্বপ্রজন্মের বিশ্বাসের প্রতি, এমনকি, সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহের ধ্বসত্ম বিকলাঙ্গ ধরনের প্রতি। ফলে এঁদের আত্মকেন্দ্রিকতা আণুবীক্ষণিক গহনচারিতায় রূপ নেয়। এই প্রজন্মের কবিদের মধ্যে আবু সাঈদ ওবায়দুলস্নাহ, দাউদ আল হাফিজ, তাপস গায়েন, আহমেদ নকীব, ব্রাত্য রাইসু, টোকন ঠাকুর, চঞ্চল আশরাফ, আলফ্রেড খোকন, সরকার আমিন, বায়তুলস্নাহ কাদেরী, জাফর আহমদ রাশেদ, তুষার গায়েন, মাহবুব কবির, মাসুদুল হক, তপন বাগচী, সরকার আমিন, শাহনাজ মুন্নী, অলকানন্দিতা, আয়েশা ঝর্ণা, কবির হুমায়ুন, পাবলো শাহী, খলিল মজিদ, এজাজ ইউসুফী, শামীম কবির, শামীম রেজা, সিদ্ধার্থ হক, শামসুল আরেফিন, শোয়াইব জিবরান, ওবায়েদ আকাশ, মারজুক রাসেল, মোসত্মাক আহমাদ দীন, রওশন ঝুনু, হেনরি স্বপনসহ আরো অনেকে রয়েছেন। জিজ্ঞাসায়-বেদনায়-আর্তনাদে-হতাশা ও
আত্ম-নিমজ্জনের নতুন কাব্যরূপ সন্ধানে এসব কবি এখনো সক্রিয়। নববইয়ের দশকের নবোদ্ভূত কবিদের একটা বড়ো অংশ আত্মনিমজ্জন ও অনুভূমিক মানসপ্রসারণের ক্ষেত্র হিসেবে প্রত্ন-ইতিহাস,
লোক-ঐতিহ্যের আদিভূমি সন্ধানে মাতৃজরায়নের অন্ধকারলোক সন্ধান, মরমিয়া শিল্প-ঐতিহ্যে অবগাহন প্রভৃতিকে কাব্যোপকরণের মূল উৎস হিসেবে গ্রহণ করে।
প্রত্ন-স্মৃতিলোকে বিহার কবিতার ভাষারূপেও অনিবার্য পরিবর্তন সাধন করে। নাগরিক বৈদগ্ধ্য দিয়ে এঁরা আঘাত করে নগরকে, শাহরিক
কৃত্রিম জীবনপ্রণালিকে। গোড়া থেকেই একটা আউটসাইডার চেতনায় বর্তমান সভ্যতা, নগরসংস্কৃতি, অগ্রজের প্রতিষ্ঠিত শিল্পলোক, ভাষাভঙ্গি, চিত্রকল্পের প্রকৃতি, উপমান-উৎস সবকিছুকেই এঁরা অস্বীকার করতে উৎসাহী। সত্তার অণু-পরমাণু সন্ধানের ঐকামিত্মকতায় এই প্রজন্মের কবিদের মধ্যে কবিতার একটা আধ্যাত্মিক চেহারাও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। পৃথিবীব্যাপী ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মান্ধতার বিপজ্জনক টানাপড়েনের মধ্যে সত্তাসন্ধানকামী কবির এই নতুন কাব্যবস্ত্ত সন্ধান নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। তবে বাঙালির আবহমান মরমিয়া ভাবধারার সঙ্গে এই অধ্যাত্মবাদের শিল্পিত সাহচর্যের ফলে কবিতার একটা নতুন ক্ষেত্রও প্রস্ত্তত হয়। আত্মবীক্ষণের তীব্রতায় এঁদের কবিতার উপকরণও যে বহুলাংশে পালটে গেছে, সে-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
সব কালের কবিতারই একটা নিজস্ব ভাষারীতি থাকে। কেননা, আমরা জানি, ভাষার চলমানতা সময়ের মতোই দ্রম্নতগামী। তবু পূর্বজ কবিদের অভিজ্ঞতালোক, শব্দচেতনা ও ভাষারীতি নতুন কালের কবিরা অতিক্রম করতে পারেন না। মানুষকে যেমন শেকড়ের কাছে যেতে হয়, অসিত্মত্বের প্রয়োজনে – কবিতাকেও তেমনি
মিথ-উৎস কিংবা ঐতিহ্যলোকের মতো অগ্রজের অভিজ্ঞতালোকেও কখনো কখনো পরিভ্রমণ করতে হয়। নতুন কালের কবিতার বিসত্মৃত মূল্যায়নের জন্যে, একটা পূর্ণবৃত্ত কাব্যবস্ত্ত, ভাবলোক ও ভাষারূপ সন্ধানের লক্ষ্যে, আমাদের আরো কিছুটা কাল হয়তো অপেক্ষা করতে হবে।
স্বাধীনতা-উত্তর চার দশকের বাংলাদেশের কবিতা কেবল
সামাজিক-রাজনৈতিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করেই বিকাশ লাভ করেনি। ব্যক্তিসত্তা বিকাশের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলোর উন্মোচন, মানব-অসিত্মত্বের বহুমুখী সংকট আবিষ্কার, নব্য-ঔপনিবেশিকতা ও পুঁজিবাদী বিশ্বের ছদ্মবেশী আগ্রাসনের বিরম্নদ্ধে শিল্প-প্রতিরোধ রচনা এবং গণতন্ত্র ও মুক্তচেতনা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আমাদের কবিরা যে-দৃষ্টামত্ম স্থাপন করেছেন, তার তাৎপর্য অপরিসীম।
ব্যক্তির অহং ও আত্মকেন্দ্রিকতার শব্দরূপ নির্মাণে আমাদের কবিরা সব কালেই আত্মনিয়োগ করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের কবিতাকে বারবার ফিরে আসতে হয়েছে সমষ্টিজীবনের আঙিনায়। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বাসত্মবতাই প্রতিনিয়ত অনিবার্য করে তুলেছে আত্মসন্ধান ও সত্তাসন্ধানের প্রাসঙ্গিকতা। বিগত পঞ্চাশ বছরের কবিতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বাংলাদেশের কবিতার যে মূল লক্ষণ সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে, তা হলো, সামূহিক জীবনজিজ্ঞাসা। প্রত্যাশা, ব্যর্থতা কিংবা যন্ত্রণাও এখানে সমষ্টিলগ্ন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বাধীনতা-উত্তর সামাজিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের বহুমুখী ভাঙা-গড়া, উত্থান-পতন। ৎ

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার