বাংলাদেশের লিটলম্যাগ : রচনাদর্শ ও গতিপ্রকৃতি

লেখক:

শহীদ ইকবাল

লিটলম্যাগ সম্পর্কে বুদ্ধদেব বসুর সংজ্ঞার্থসূচক উদ্ধৃতিটি এরকম : ‘কৃতিত্ব যেটুকুই হোক, অন্ততপক্ষে নজর যাদের উঁচুর দিকে, তাদের জন্য নতুন একটি নাম বেরিয়েছে মার্কিন দেশে : চলতি কালের ইংরেজি বুলিতে এদের বলা হয়ে থাকে লিটল ম্যাগাজিন। লিটল কেন? আকারে ছোট বলে? নাকি বেশিদিন বাঁচে না বলে? সব কটাই সত্য, কিন্তু এগুলোই সব কথা নয়; ঐ ছোট বিশেষণটাতে আরো অনেকখানি অর্থ পোরা আছে। প্রথমত, কথাটা একটা প্রতিবাদ, এক জোড়া মলাটের মধ্যে সবকিছু আমদানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। লিটল ম্যাগাজিন বললেই বোঝা গেল যে জনপ্রিয়তার কলঙ্ক একে কখনো ছোঁবে না, নগদ মূল্যে বড়বাজারে বিকোবে না কোনোদিন, কিন্তু হয়তো একদিন এর একটি পুরনো সংখ্যার জন্য গুণীসমাজে উৎসুকতা জেগে উঠবে। সেটা সম্ভব হবে এজন্যই যে, এটি কখনো মন যোগাতে চায়নি, মনকে জাগাতে চেয়েছিল। চেয়েছিল নতুন সুরে নতুন কথা বলতে। কোনো এক সন্ধিক্ষণে যখন গতানুগতিকতা থেকে অব্যাহতির পথ দেখা যাচ্ছে না, তখন সাহিত্যের ক্লান্ত শিরায় তরুণ রক্ত বইয়ে দিয়েছিল – নিন্দা নির্যাতন বা ধনক্ষয়ে প্রতিহত না হয়ে। এই সাহস, নিষ্ঠা, গতির একমুখিতা, সময়ের সেবা না করে সময়কে সৃষ্টি করার চেষ্টা – এটাই লিটল ম্যাগাজিনের কুলধর্ম।’ এখনো এর ওইমতো তাৎপর্য প্রায় সর্বমান্য ও স্বরূপে চিহ্নিত, বলা যায়। এর ভেতরে প্রতিজ্ঞাও আরূঢ়। এ-প্রতিজ্ঞায় ‘সময়’ মূলকেন্দ্র। তা বোধ করি আন্দোলনও একপ্রকার। কীসের আন্দোলন? প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা, করপোরেট আগ্রাসনের বিপরীতে প্রান্তিক ও পরিশুদ্ধ লক্ষ্য-ধারণায় পৌঁছানোর আন্দোলন। এ-আন্দোলনের চর্চা ও অনুশীলন চির-অধ্যয়নপ্রবণও বটে। কমিটমেন্টও। ‘ভাঙবে তবু মচকাবে না’র অভিপ্রায়।
আর্থ-সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত ধরে হিসাবে আনলে আমাদের দেশে এর শুরুটা ধরা যায় বিশ শতকের প্রথমার্ধে। বুদ্ধদেব বসু বা তাঁর সমসাময়িক কালে। তখন রুশ বিপস্নব হয়ে গেছে, ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম প্রায় পূর্ণতা পেয়েছে – বিশ্বযুদ্ধ-আক্রান্ত ‘মানুষ নিয়ত একাকী’। ক্ষমতাসর্বস্বতা, উগ্রতা, ততোধিক ‘ছোট’ করে তুলছে মানুষকে; কিন্তু তাতে বিপরীত ব্যাকুলতাও যে জন্মে না, তা নয় – মানবতা ও মনুষ্যত্বকে ঘিরেই তার আবর্ত রচিত, ক্রমবিবর্ধিত। তাই তো সুবিমল মিশ্র বলেন : ‘রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলাদেশের সাহিত্যে লিটলম্যাগের সবচেয়ে উলেস্নখযোগ্য বিষয় – ব্যবসায়িক লেখালেখির সমান্তরালে আরো একটি স্রোত, একটি আন্দোলন।’ তাই হয়েছিল। সে-রূপেই তার গতিপ্রকৃতি নির্ণীত ছিল। তবে সময় তো পালটায়, সময়ের হাত ধরেই তার অনুগ প্রত্যন্ত-প্রান্ত তৈরি হয়। ফলে লিটলম্যাগের দিগ্বলয় চলিষ্ণু ও ক্রমবর্ধমান। এর ধারণা-বৈশিষ্ট্য কিংবা পন্থা ও পরিণাম অনতিক্রান্ত নয়, ক্রমবিকশিত ও পরিবর্তিত। আর তা নিশ্চয়ই, এ-দেশ মৃত্তিকা ও সংস্কৃতিকে অনুরুদ্ধ করেই পরিচালিত ও বিকিরিত। পরিচর্যার পথটিও সে-লক্ষক্ষ্যই নির্ধারিত।

‘বিকল্প’ পথটি কেন? তারুণ্যই কি এর কারণ! আপসহীনতা, বাণিজ্য-বিমুখতা, বিজ্ঞাপনহীনতা, অ্যান্টি-স্টাবলিশমেন্ট, প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার বিকল্প নিঃশর্ত ‘সিসিফাসপ্রবণ’ শ্রম; বৈষম্যহীনতা-অনাঞ্চলিকতা-নতুনত্ব-পরীক্ষাপ্রবণতাপূর্ণ তারুণ্য নিয়ে ভয়হীন সাহসের সশস্ত্র মেধার চর্চার প্রতিজ্ঞাই কি বিকল্প! এইটি সম্পন্ন হলে কতদূর তা যেতে পারে? গত শতকের ষাট-সত্তরে আর স্বাধীনতার পর আশি-নববইয়ে কিংবা এই শূন্যে তার গতিপথ কতদূর? কীভাবে তার বাঁক পরিবর্তন হয়েছে, কী তার গ্রহণ-বর্জন তৎপরতা, কোথায় তার সীমা-পরিসীমার অভয় অনুষঙ্গ? কিংবা আরো যদি প্রশ্ন করি, এতো কিছু ভারে ও কর্তব্যে তার অবদান কেমন – তাই কি সে বেশিদিন আয়ু পায় না, ঝলসানো পথে জ্বলে ওঠার আগেই ভস্মসাৎ হয় সবটুকুর! তবে কী অর্জনটুকু ওই চেতনার সুকুমার নির্যাস-স্বত্ব – বিশেষ করে এই একমুখী, নব্য-সাম্রাজ্যবাদপ্রসূত, নিও-রিয়ালিস্ট আর্থ-বিশ্বে – যেখানে মানবজীবনের অভিমুখ অধিক চাঞ্চল্যময়, টানাপড়েনে ক্রুদ্ধ, দ্বন্দ্বে অবসাদ এবং ক্ষমতার প্রাকারে ভীত-তপ্ত-ত্রস্ত। বিকল্প পথটি কি তাতেই সৃষ্ট? পেরোনোর পথও তা-ই। প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে লক্ষ্য-নির্দিষ্ট অভিমুখ। সেটির জন্য যাবতীয় কাজ। চলমান সত্তায় তার ভিত্তি। ভবিষ্যতের স্বপ্নে তা বাঁধা। আটকানোও। বুদ্ধদেব বসুর উলিস্নখিত সংজ্ঞার্থের পুনরাবৃত্তিই এসব কথা। কিন্তু পুরনো নয়। লক্ষ্য জ্বলে উঠলে পুরনোও নতুন মাত্রা পায়। অর্জন প্রগাঢ় হয়। প্রতিজ্ঞা উৎকণ্ঠাগ্রস্ত হয়। লিটলম্যাগ সেভাবেই বৃদ্ধিপ্রাপ্ত।

 

দুই

সাতচলিস্নশ-পরবর্তী বাংলাদেশে স্বভাবে ও প্রজ্ঞায় ‘প্রকৃত’ লিটলম্যাগ নির্মাণচিহ্নটি কী? এর চেতনা-সম্ভাবিত রূপটি কেমন? এ-লক্ষক্ষ্য কিছু চেতনাজাত সমত্মাপ নজরে আনা যায় : প্রতিক্রিয়া, নির্মাণ, মুখপত্র, আন্দোলন, মাধ্যম, প্রাণস্রোত, গতি, সম্ভাবনা, চেতনা, নির্দেশনা, শব্দশিল্প, দ্যুতি, দর্শন, অহংকার, গৌরব, কুসুমিত ইস্পাত, যন্ত্রণা, জিজ্ঞাসা, বিস্ময়, ফুল, নিবেদন, প্রত্যাশা, আকাঙক্ষা, স্বপ্ন, পূর্ণতা, এন্টি প্রতিষ্ঠান, স্পর্ধা, কালচার, যুগস্রষ্টা, প্রতিবাদ, উত্তাপ, প্রকল্প, উদ্গীরণ, কমিটমেন্ট, মুক্তমঞ্চ, জাগরণ, দৃষ্টিভঙ্গি, ধমনী, স্ফূলিঙ্গ, আর্তনাদ, দাবি, স্মারক, নিয়ামক, শক্তি, সক্রিয়তা, বীজতলা, স্বাধীনতা, অবমুক্তি, লক্ষণ, আদর্শ, মাত্রা, ধারা, বিরুদ্ধাচরণ, প্রতিরোধ, আক্রমণ, দ্বন্দ্ব, মননশীলতা, মৌলিকতা, আবিষ্কার, রুচিবোধ, দায়, প্রসত্মাবনা, দলিল, নিঃশ্বাস, শিল্প, নিরীক্ষা, অভ্যাস, অভিপ্রায়, অভিযাত্রা, চিৎকার, জ্যামিতি, প্রগতি, সংশপ্তক, স্পন্দন, সংকেত, সূচক, ফলক, রোদ্দুর, বিশ্বাস, নক্ষত্র, কোরাস, আয়োজন, আগন্তুক, অনিকেত মেঘ, অনুরণন, অনুশীলন, অর্কেস্ট্রা, কষ্ট, উলেস্নখ, বৈশিষ্ট্য, সৌধ, পৃথিবী, ধারক, প্রকাশনা, উচ্চারণ, পদধ্বনি, ক্রিয়াভূমি, এন্টি-ক্লক, অস্বীকার, আবশ্যিকতা, প্যারাডাইম, ব্যতিক্রম, যুদ্ধ, শিকড়, তৃতীয় চোখ, কালধারা, আলো, অগ্নিকণ্ঠ, অন্যমাত্রা, চিহ্ন, চমক, ধারক, উদ্যোক্তা, বক্তব্য, সহস্রাব্দ, ভিন্নস্বর, অন্বেষা, প্রতিভা, মুক্তবিচরণ, গন্তব্য, বিশেষণ, পস্নাটফর্ম প্রভৃতি। এ চেতনাবৈশিষ্ট্যে ষাটের বাংলাদেশে অগত্যা, কণ্ঠস্বর, বক্তব্য, স্বাক্ষর, সাম্প্রতিক, স্যাড জেনারেশন, প্রতিধ্বনি, নাগরিকের মতো লিটলম্যাগের কর্মপ্রয়াস শুরু। ফজলে লোহানীর সম্পাদনায় ১৯৪৯ সালে অগত্যার প্রকাশ। হামিদুর রাহমানের প্রচ্ছদে চৌষট্টি পৃষ্ঠার অগত্যা কোনো রাজনৈতিক মুখপত্র ছিল না, বরং
প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতায় তীব্র সোচ্চার। বাংলা ভাষা-সাহিত্যের আনুগত্যেও দুঃসাহসপ্রবণ। অনতি পরে প্রতিষ্ঠা পাওয়া সমকাল, উত্তরণ, পূবালী, পরিক্রম, পূর্বমেঘ পত্রিকার প্রবীণ প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকদের সংস্পর্শ এড়িয়ে কিছু অগ্নিময় তরুণ লেখক নিজেদের বোধচিমত্মা ও সাহিত্যভাবনার মুখপত্র হিসেবে পত্রিকা প্রকাশে উন্মুখ হয়ে ওঠেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে নিজেদের আত্মপ্রকাশের অভিপ্রায়ের প্রথম ধাপ বক্তব্য (১৯৬৩)। সময়ের পরিবর্তনে সমাজবাস্তবতার যে-পালাবদল তাকে মনে রেখেই ষাটের দশকের শুরুতে উলেস্নখনীয় :

দলটা তাদেরই – সেইসব অসন্তুষ্ট, অগতানুগতিক রাগী তরুণদের – অমত্মঃসত্ত্বা রক্তে যাদের নতুন সৃষ্টির আগ্রহ উদগ্রীব। এখানকার সাহিত্যের ও সমাজের ভানসর্বস্ব অযোগ্য মোড়লদের প্রতি তাদের ঘৃণা, ক্ষোভ ও আক্রোশ – যার ফলশ্রুতি হিসেবে সেই ঘেয়ো, অথর্ব, নির্জীবদের বয়স্ক প্রভাব থেকে মুক্তিতে তারা কৃতশপথ – তারা একত্রিত, সমবেত, আয়োজিত। উদ্দেশ্য তাদের নতুন কিছু, মহৎ কিছু, বিস্ময়কর কিছু – প্রয়োজনে উপেক্ষিত বা হাস্যকর কিছু – অসামাজিক অশস্নীল-গর্হিত কিছু, কিন্তু কিছু নতুন, কিছু অভাবনীয়। কালের বুকের ওপর নতুন স্বাক্ষরের বেগবান চিমত্মায় তারা অস্বস্ত, যে স্বাক্ষর স্পষ্ট ও স্থায়ী – সাময়িক ও স্বল্পায়ু হলেও সজীব ও স্বাস্থ্যবান।

এক্ষেত্রে ভাষাবিচার ও বাক্যগঠনকৌশল বিবেচনা করলে ষাটের তরুণদের সাহিত্যচিমত্মার অগ্রসরমান দিকটি অস্পষ্ট থাকে না। দ্বিতীয় সংখ্যার পরেই এর মৃত্যু। এরপর কয়েক বছরে চারটি সংখ্যা বেরোনোর পর স্বাক্ষরও (১৯৬৩) বন্ধ হয়। স্বাক্ষরের প্রতিটি সংখ্যার জন্য গোষ্ঠীর মধ্য থেকেই আলাদা দুজন করে সম্পাদক হতেন। প্রথম সংখ্যার সম্পাদক ছিলেন রফিক আজাদ ও সিকদার আমিনুল হক, দ্বিতীয় সংখ্যার ইমরুল চৌধুরী ও প্রশান্ত ঘোষাল, তৃতীয় সংখ্যার আসাদ চৌধুরী ও প্রশান্ত ঘোষাল এবং সর্বশেষ চতুর্থ সংখ্যার সম্পাদক ছিলেন রফিক আজাদ ও রণজিৎ পালচৌধুরী। এ-সম্পর্কে আবদুলস্নাহ আবু সায়ীদ বলেন : ‘স্বাক্ষরের চরিত্রের সবচেয়ে বড় যা পুঁজি ছিল, তা হচ্ছে এর দুঃসাহস। পত্রিকার প্রচ্ছদ থেকে প্রতিটি শব্দের নির্ভীক তীক্ষন উচ্চারণে এই সাহসিকতা উৎকীর্ণ। লুকোবার, গোপন করবার, পালাবার কোনো উদ্যোগ ছিল না কোথাও, ভয়ে, সম্ভ্রমবোধে বা ‘পবিত্রে’র চোখ-রাঙানিতে কোনো শব্দ, উপমা বা বাকপ্রতিমা বর্জিত হয়নি স্বাক্ষরে।’ বক্তব্য প্রকাশের পর বছরখানেকের মধ্যেই অগ্নি-স্ফুলিঙ্গের মতোই দপ করে জ্বলে ওঠে একটি বিস্ফোরণসম বুলেটিন স্যাড জেনারেশন (১৯৬৪)। ব্রিটেনের ‘অ্যাংরি জেনারেশন’ বিশেষ করে পঞ্চাশের দশকে মার্কিন সাহিত্যে অ্যালেন গ্রিন্সবার্গ-পল রাউলিং-অ্যান স্যাক্সটনদের বিখ্যাত ‘বিট্ জেনারেশনের’ প্রভাবে পশ্চিমবঙ্গে মলয় রায়চৌধুরী-শক্তি চট্টোপাধ্যায়-দেবী সিংহ-সুবিমল বসাক প্রমুখের বেপরোয়া উদ্যোগে ‘হাংরি জেনারেশন’ নামে যে একটি অভিনব সাহিত্য-আন্দোলন গড়ে ওঠে তারই অনুসরণে বাংলাদেশে স্যাড জেনারেশনের উদ্ভব। মূলত স্যাড জেনারেশন বুলেটিনটি বাংলাদেশের লিটল ম্যাগাজিন চেতনার একটি সর্বোচ্চ প্রয়াসের নাম। আপাদমস্তক অবক্ষয়ী চেতনার তৎকালীন প্রবাদপ্রতিম কবিব্যক্তিত্ব রফিক আজাদ (১৯৪৩-২০১৬) ছিলেন স্যাড জেনারেশনের মুখ্য ব্যক্তি এবং উদ্গাতা। মূলত গদ্যবর্তী পত্রিকা হলেও কবিতার অনুবাদ এবং সমালোচনা প্রকাশে সাম্প্রতিক (১৯৬৪) ছিল অকুণ্ঠ। এরপর ১৯৬৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশ পায় কণ্ঠস্বর। তার ঘোষণাপত্রটি এরকম :

যারা সাহিত্যের সনিষ্ঠ প্রেমিক, যারা

শিল্পে উন্মোচিত, সৎ, অকপট, রক্তাক্ত,

শব্দতাড়িত, যন্ত্রণাকাতর; যারা

উন্মাদ, অপচয়ী, বিকারগ্রস্ত,

অসন্তুষ্ট, বিবরবাসী;

যারা তরুণ, প্রতিভাবান,

অপ্রতিষ্ঠিত, শ্রদ্ধাশীল, অনুপ্রাণিত;

যারা পঙ্গু, অহংকারী,

যৌনতাস্পৃষ্ট

কণ্ঠস্বর

তাদেরই পত্রিকা।

প্রবীণ মোড়ল, নবীন অধ্যাপক,

পেশাদার লেখক, মূর্খ সাংবাদিক, ‘পবিত্র’

সাহিত্যিক, এবং

গৃহপালিত সমালোচক এই পত্রিকায়

অনাহূত।

এই ঘোষণাপত্রই লিটলম্যাগের বৈশিষ্ট্য উন্মোচন করে। ১৯৭৬ সালের দ্বিতীয় সংখ্যায় ঘোষণা দিয়ে এটি বন্ধ হয়। এছাড়া ছোটগল্পকেন্দ্রিক লিটলম্যাগও প্রকাশ পায়, ‘ছোটগল্প সমিতির প্রথম সংকলন’ বলে পরিচিত ছোটগল্প (বর্ষ, ১৩৭৪) পত্রিকার মাধ্যমে, সম্পাদক কামাল বিন মাহতাব (১৯৪০-৯৯)। ছোটগল্পের শেষ সংখ্যা বেরোয় ১৯৮৫-তে। ছোটগল্প  ষাটের দশকে গল্প-আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ নিয়ে হায়াৎ মামুদ বলেন : ‘সম্পাদনা করতেন কামাল বিন মাহতাব।… সৌভাগ্য, স্বপ্নযুক্ত আরো দুচারজন বন্ধু জুটেছিল তাঁর : কায়েস আহমেদ, আলমগীর রহমান, শাকের চৌধুরী প্রমুখ। আমরা যারা কমবেশী দূরে ছিলাম; গিনি মোহরের আওয়াজ আমাদেরও কানে পৌঁছেছিল। খুলনা, রাজশাহী থেকে হাসান আজিজুল হক, ঢাকার ভিতরে শওকত আলী, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, আবদুল মান্নান সৈয়দ প্রমুখ।…’

ঢাকার বাইরে বগুড়া শহর থেকে ফারুক সিদ্দিকীর সম্পাদনায় বিপ্রতীক (১৯৬৭), পদধ্বনি (১৯৬৭), স্বরক্ষেপ (১৯৬৭), অবেলা (১৯৬৮) প্রকাশ পায়। আবদুল মান্নান সৈয়দ ‘স্মৃতির নোটবুকে’ লেখেন : ‘নির্ভুল, অদ্ভুত, পরিছন্ন, প্রকৃত লিটল ম্যাগাজিন ছিল ‘বিপ্রতীক’।… বিপ্রতীক আসলে ষাটের দশকের চিরহরিৎ তারুণ্যের এক সবুজ নিশান।… বিপ্রতীক গোষ্ঠীর যে দিকটি আমাকে টেনেছিল ওদের প্রতি – তা হচ্ছে ওদের প্রকৃত প্রগতিশীলতা – অর্থাৎ ঐতিহ্যের প্রতি সমর্থন ও নতুনের প্রতি সম্মোহন। তার মানে মরচে-না-পড়া এক অগ্রসরমানতা।’ সাহিত্য-চিত্রকলা-নাটক-চলচ্চিত্র-সংগীত-ভাস্কর্য-স্থাপত্য-লোকসাহিত্যসহ শিল্পকলার সব বিষয়কে কেন্দ্র করে প্রকাশ পেয়েছিল শিল্পকলা (১৯৭০)। সম্পাদক আবদুল মান্নান সৈয়দ ও সহকর্মী বন্ধু আবদুস সেলিম। সময়ের নিয়মে এবং লিটলম্যাগের স্বল্পায়ুসংক্রান্ত অনিবার্য পরিণতিতে শিল্পকলা ১৯৭৩ সালের এপ্রিলে অষ্টম সংখ্যাটি প্রকাশ করে বন্ধ হয়ে যায়। প্রসঙ্গত উলেস্নখ্য, শিল্পকলা একাডেমির পত্রিকা শিল্পকলা মুখপত্রটি আবদুল মান্নান সৈয়দ-সম্পাদিত শিল্পকলার (১৯৭০-৭৩) প্রকাশাবসানের পর থেকে প্রকাশিত হতে থাকে।

 

তিন

লিটলম্যাগের আয়ু ক্ষীণ। অধিকাংশই জ্বলে ওঠে আবার দপ করে নিভে যায়। তবে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশে প্রচুর লিটলম্যাগ বেরিয়েছে। গ্রামগঞ্জ তথা প্রত্যন্ত এলাকায়ও এর ইতিবাচক বিসত্মার ঘটেছে। অবশ্য বেশিদিন না-বাঁচার কারণে সেগুলোর নাম-ঠিকানা সংরক্ষণ বা স্থির চারিত্র্য নির্ণয় একপ্রকার কঠিন, বলা যায়। তাছাড়া গুণ ও মানের প্রশ্নটিও এখানে প্রশ্নশীল। লিটলম্যাগের পরিধি ছোট, আধফর্মা থেকে বিশ-বাইশ বা ততোধিক হতে পারে; কিন্তু এর সংজ্ঞার্থ চূড়ান্ত না হওয়ায়, পরিধি-গুণমান বা আদর্শ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক আছে। সত্তরের দশকেই বাংলাদেশে লিটলম্যাগের কাজকর্ম শুরু হয়। এ-আন্দোলন নানাদিকে ছড়িয়ে পড়ে। স্বাধীন দেশের স্বপ্ন বাস্তব-অবাস্তবের ঊর্ধ্বে হলেও একপ্রকার আদর্শের উচ্চতায় এর প্রয়োগ ও প্রসার লক্ষণীয় মাত্রার। ১৯৭৬ সালে প্রকাশ পায় বক্তব্যবক্তব্য বেঁচে থাকে ১৯৮৪ পর্যন্ত। ১২টি সংখ্যায় মৃত্যু। সম্পাদক মুহম্মদ জাহাঙ্গীর ও ভূঁইয়া ইকবাল। এটি ছিল প্রবন্ধ-পত্রিকা। মননশীল চিমত্মার মুখপত্র হিসেবে বক্তব্যের রুচিশীল ভূমিকা সে-সময়ে অনেকেরই সপ্রশংস ভূমিকা পরিস্রুত  করে। বক্তব্যের প্রচ্ছদ এঁকেছেন কামরুল হাসান। এছাড়া সাড়া জাগানো লিটলম্যাগ কিছুধ্বনি (১৯৭৯)। সম্পাদক ছিলেন বেবী আন্ওয়ার। প্রথম সংখ্যাটি কবি আহমদ রফিককে নিয়ে। মূলত কবি ও কবিতা-পত্রিকা হিসেবে কিছুধ্বনি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সে-সময়ে। সত্তরের উলেস্নখনীয় এমন লিটলম্যাগ রুচি ও নন্দনে সাহিত্যে ভিন্নমাত্রা ছড়াতে সমর্থ হয়। এদের প্রকৃতি ও পরিচর্যাও প্রশংসনীয়। প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার ভাবনা যেমনই হোক, ছোট্ট পরিসরে হলেও এর উদ্যোগ প্রশংসনীয়। আশির দশকের শুরুতেই নাট্যবিষয়ক মুখপত্র হয়ে মঞ্চ বের হয়। সম্পাদক ছিলেন নাসিরউদ্দিন ইউসুফ। প্রকাশক সেলিম আল দীন। নাটকের পরিধি ও প্রসার নানা নিরীক্ষায় তখন মঞ্চে উঠে আসে। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তীকালে দেশ-জাতি-জাতীয়তার স্বপ্ন, ভাষার প্রতি মমত্ব, বাংলা ভাষার সৃজনশীলতা ইত্যাদি তরুণ প্রজন্মের ভেতরে বিপুল প্রেরণা আসে। ফলশ্রুতিতে সত্তরের স্বপ্নযাত্রা আশিতে সম্প্রসারিত হয়। সেখানে ব্যক্তি-উদ্যোগে বের হওয়া মঞ্চ একটি সংখ্যা হলেও তা গুরুত্বহীন থাকে না। একটি সংখ্যাতেই তার অবলুপ্তি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মোশতাক দাউদী-সম্পাদিত কবিতাপত্র আড্ডা বের হয় ১৯৮০-তে। প্রচ্ছদ করেন কাইয়ুম চৌধুরী। পরের বছরই তারিক-উল ইসলামের সম্পাদনায় শব্দায়ন বের হয়। ‘আসলে আমরা একটা অবিচ্ছিন্ন দুর্ভাগ্যের শিকার। যখনই কাজে হাত দিই পলাতক বৈরী সময়ের হেমলক চুম্বন বাদ সাধছিল বারবার। ‘শব্দায়ন’ সময়মতো বের হয়নি এই কারণে।’ লিটলম্যাগের এই সরল স্বীকারোক্তির শরীর বেয়ে আরো লেখা হয় ‘দারুণ প্যাঁচগোচ লেগে আছে চারদিকে, কোন দিকে যাবে পথ – আসলে এ এক এমন সময়, যে দিকেই তাকাই না কেন মাঠভর্তি মেলে আছে শুধু দুস্তর কাঁটার বন। তবু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘শব্দায়ন’ মনে করে যেতে হবে যদিও বা জানা নেই নির্ভুল বন্দর, যে অনুরাগ ঠিকানা বদলে দেবে বন্দরের শিল্পিত সত্তার। বিশুদ্ধ আনন্দ খুঁজতে ক্ষত-বিক্ষত পায়েই পাড়ি দিয়ে ‘শব্দায়ন’ হতে চায় শিল্পসত্তার গভীর সম্পন্ন এক ভিন্ন মাত্রার।’ আশির দশকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরো বের হয় শ্রাবণ, অহংকার, কথা, বহ্নিশিখা, দ্রোহী, হীরণ্য প্রতিভাস, কৃশানু, উত্তরণ, স্বকণ্ঠ, কালপত্র, ধনুকর প্রভৃতি। এগুলোর কোনোটিই বেশিদিন বাঁচেনি। এক বা একাধিক সংখ্যা প্রকাশের পরই হারিয়ে যায়। তবে লিটলম্যাগের স্বরূপে স্থির থেকে তরুণদের মেধা-বিসত্মারে পালন করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ১৯৮২-তে প্রাবন্ধিক আবুল কাশেম ফজলুল হকের সম্পাদনায় ঢাকা থেকে বের হয় লোকায়ত – যেটি অদ্যাবধি অনিয়মিতভাবে হলেও প্রকাশিত হয়ে চলছে আজো। পত্রিকাটিকে ঘিরে তখন পাঠচক্রও পরিচালিত হয়। মোহাম্মদ শাকেরউলস্নাহ্-সম্পাদিত ঊষালোকে বের হয় আটের দশকের প্রথমদিকেই। এটি ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত বের হয়ে বন্ধ হয়ে যায়। পরে নবপর্যায়ে প্রকাশিত হয় ২০০১ সাল থেকে। একটি বই উপলক্ষ করে বিচিত্র বিষয় নিয়ে এতে প্রবন্ধ সংকলিত হয়। ১৯৮২-তে ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জ থেকে বের হয় অনুরণন। অতঃপর ১৯৮৫-তে নিরন্তর প্রকাশিত হয়। নিরন্তর লিটলম্যাগটি চিহ্নিত ও আদর্শ-অধ্যুষিত একটি পত্রিকা হয়ে ওঠে। নাঈম হাসানের সম্পাদনায় এতে লেখেন যশস্বী অনেক লেখকই। শওকত আলী, যতীন সরকার, আল মাহমুদ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, কাশীনাথ রায় প্রমুখ এতে লিখে সংশিস্নষ্ট হন। ১৯৮৫-তে লিটলম্যাগ চর্চাধারায় খোন্দকার আশরাফ হোসেন উপস্থিত হন একবিংশ নিয়ে। মৌলিকত্ব ও মনন নিয়ে সমৃদ্ধ একবিংশ। এটি কবিতা ও কবিতাবিষয়ক গদ্যের কাগজ। ২০১৩-তে সম্পাদকের অকালমৃত্যুর পরও এটি এখনো প্রকাশিত হচ্ছে। এর আটাশটিরও বেশি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। তবে একবিংশ-সম্পাদকের একটি প্রণিধানযোগ্য বক্তব্য এখানে উদ্ধৃত করি :

‘বাংলাদেশে লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠার আগেই বিস্রস্ত হয়ে যাচ্ছে – এ-ঘটনা দুঃখজনক, কিন্তু সত্য। গত কয়েক বছরে প্রচুর সম্ভাবনাময় সাহিত্যপত্র আত্মপ্রকাশ করেছে; একসময় মনে হয়েছিল, এবার একটি রেনেসাঁস আগতপ্রায়। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সে সম্ভাবনা সুদূরপরাহত। মুষ্টিমেয় কাগজ নিজের অসিত্মত্ব বাঁচাতে প্রবলভাবে লড়াই করছে, অথচ বাজারি রম্য পত্রিকাগুলোর রং-বাহারের আশনাই থেকে চোখ ফেরানো যায় না। অপসংস্কৃতি এখন গণসংস্কৃতি হতে চাইছে, স্বল্পশিক্ষিত আনপড় পাঠকদের আত্মা ক্রয় করার জন্য মাঠে নেমেছে হরেকরকম মুখোশপরা মেফিস্টোফিলিস। সন্দেহ কী, জাতি হিসেবে আমরা এগোচ্ছি, উপজেলা পদ্ধতির মতোই ‘আনন্দহি কেবলম’ সাধনমার্গেরও বিকেন্দ্রীকরণ চলছে। বিজ্ঞাপনদাতারা সাহিত্য-পত্রিকার সম্পাদকদের করুণকণ্ঠে জানিয়ে দেন, ‘সরি ভাই বাজেট নাই’, তখন তাদের টেবিলে রঙচঙে বহু ডিজাইন সিনে পত্রিকাগুলোতে যাবার জন্য অপেক্ষায়।’

১৯৮৬ সালের দিকে প্রকাশিত এ-বক্তব্যে বাংলাদেশে লিটলম্যাগ-আন্দোলন সম্পর্কে একপ্রকার ধারণা মেলে। এটা সর্বৈব একমত পোষণ না করেও বলা যায় যে, যাবতীয় বিরূপতার বিরুদ্ধে ‘উন্মদ’গ্রস্ততা নিয়েই লিটলম্যাগ বেঁচে আছে এবং সম্মুখে অগ্রসরমান হয়েছে। যা হোক, আটের দশকে ঢাকার বাইরে রাজশাহী থেকে বের হয় সদরুদ্দিন আহমদ-সম্পাদিত গুরুত্বপূর্ণ কাগজ বিশ্বসাহিত্য। নিউজপ্রিন্ট কাগজে লেটারপ্রিন্টে ছেপে এ-কাগজটি বাংলা সাহিত্য ও বিশ্বসাহিত্যের একপ্রকার তুলনামূলক পাঠের রুচি গড়ে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক এ-কাগজটি ছিল সম্পাদককেন্দ্রিক কিছু পরিচিত ও চেনামহলের। এটিও যথারীতি কয়েকটি সংখ্যার পর বন্ধ হয়ে যায়। তবে লিটলম্যাগ অঙ্গনে সবচেয়ে বড় ঘটনা নিসর্গ বের হওয়া। বগুড়া থেকে এটি সম্পাদনা করেন সরকার আশরাফ (বর্তমানে ঢাকায়)। এটি দীর্ঘায়ু ছোট কাগজগুলোর মধ্যে অন্যতম। যে-কোনো প্রাতিষ্ঠানিকতার ঊর্ধ্বে এ-কাগজটির সম্পাদক – নিসর্গ প্রকাশের ভেতর দিয়ে গড়ে দেন লিটলম্যাগ-আন্দোলনের চেতনা, যা এ-আন্দোলনকে দিয়েছে অধিকতর গতি ও অনুরণন। লিটলম্যাগের প্রকৃতি ও স্বরূপেও তিনি যুক্ত করেন নতুন সৃষ্টিশীলতা। একইসঙ্গে লেখা-লেখক ও সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা যুক্ত করেন লিটলম্যাগকে ঘিরে। এজন্য প্রতিশ্রুতবান তিনি বিবর্তমান সমাজ-অনুগত ক্রিয়াকর্মে। প্রচ্ছদে, পরিশিষ্টে লিটলম্যাগের আনুকূল্যে সম্পাদক গড়ে তুলেছেন প্রতিষ্ঠানের বিপরীত প্রতিষ্ঠান-জগৎ। লিটলম্যাগের পূর্ণ কমিটমেন্ট না থাকলেও নিসর্গ অদ্যাবধি লিটলম্যাগ চেতনাকে বহন করেই সম্মুখে এগিয়ে যাচ্ছে। পত্রিকাটির কয়েক দশকের প্রকাশনায় বেশ কিছু উলেস্নখযোগ্য সংখ্যাও বেরিয়েছে। একই চেতনা নিয়ে ১৯৮৬-তে বের হয় নন্দন। কাগজটি আলফ্রেড খোকনের সম্পাদনায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ করেছে। প্রান্তিক পর্যায়ের অনেক লেখকই এতে লেখার সুযোগ পেয়েছেন। ১৯৮৭ সালে তপন বড়ুয়া-সম্পাদিত গা-ীব বের হয় – বেশ স্বকীয়তা নিয়ে। তপন বড়ুয়ার গা-ীবের প্রথম সংখ্যায় ছিল শোয়েব শাদাব, সাজ্জাদ শরীফ, শান্তনু চৌধুরী, মোহাম্মদ কামালের গুচ্ছকবিতা, আধুনিক বাংলা কবিতার প্রতিচেতনা পর্যায় পরম্পরাবিষয়ক প্রবন্ধ, লোরকা ও এজরা পাউন্ডের অনুবাদ, সেলিম মোরশেদের অসমাপ্ত চিত্রনাট্য প্রভৃতি। উলিস্নখিত লেখকরা ছাড়াও বিষ্ণু বিশ্বাস, সৈয়দ রিয়াজুল রশীদ, তারেক শাহরিয়ার, মাসুমুল আলম ছিলেন গা-ীবের নিয়মিত লেখক। গা-ীব এখনো চলমান। এর ক্রমবৃদ্ধি এবং প্রসার আলোচ্য লেখকদের বলয়েই। যদিও এ-লেখকদের অনেকেই এখন করপোরেট পুঁজির উঞ্ছবৃত্তির ভেতরে আটকে গেছেন। সাজ্জাদ আরেফিনের সম্পাদনায় নান্দীপাঠ ১৯৮৮-তে বের হয়। এখনো এটি বের হয়, লিটলম্যাগের স্বভাব-চরিত্র বদলিয়ে, সাহিত্য-পত্রিকা হিসেবে। একই বছর লিয়াকত আলীর সম্পাদনায় ঢাকা থেকে বের হয় ছোট কাগজ প্রেক্ষিত। সাহিত্যের চেয়ে সমাজ-সংস্কৃতির প্রণোদনাই এ-পত্রিকার সূচিতে বেশি লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। সাইফুলস্নাহ মাহমুদ দুলালের সম্পাদনায় সূচীপত্র প্রকাশিত হয় ১৯৮৮-তে। প্রবন্ধ-গল্প-কবিতা নিয়ে ক্ষণস্থায়ী এ-পত্রিকাটি লিটলম্যাগ হিসেবে পাঠকমহলে বেশ সমাদৃত। প্রায় একই সময়ে সাহিত্যপত্র বর্তমান বেরিয়েছিল। প্রসঙ্গত বলতে হয়, এসব কাগজে লোরকা-সিঙ্গারের অনুবাদ, সিমোন দ্য বোভেয়ার ও গুন্টার গ্রাসের অনুবাদ, সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী প্রবন্ধ, বিভিন্ন প্রগতিশীল তরুণ কবির কবিতা-গল্প-সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। এ পর্যায়ে লক্ষণীয় যে, ছোটকাগজের এই লেখকরা পরবর্তীকালে বেশ সক্রিয় থাকেন এবং প্রতিষ্ঠাও পান। বর্তমানের সম্পাদক হারুন রশীদ রোদ্দুরের সঙ্গেও ছিলেন। রোদ্দুর বের হয় নববইয়ের গোড়ায়, লতিফ সিদ্দিকীর সম্পাদনায়। হাসান আজিজুল হক, শহিদুল ইসলাম, আনিসুল হক, লতিফ সিদ্দিকী, শিবব্রত বর্মণ প্রমুখ রোদ্দুরের লেখক। গল্প-কবিতা-উপন্যাস-অনুবাদ – বিশেষ করে নগ্গুয়ি উয়া থিয়োংগের অনুবাদ এতেই ছাপা হয়। আশি-নববইয়ে এসব কাগজে
প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা ও প্রগতিশীলতার চর্চা নানান আঙ্গিকে পরিলক্ষিত হয়। এর তীব্রতা ও প্রাচুর্যও আকর্ষণীয়। শুদ্ধ-স্নিগ্ধ সাহিত্যচর্চার আনুকূল্য দিয়েছিল এসব লিটলম্যাগ। বোধ করি, লিটলম্যাগেই তা সম্ভব ছিল। রোদ্দুরে কালো আফ্রিকার সংস্কৃতি, উপনিবেশ-বিরোধিতা ও অ্যান্টি-স্টাবলিশমেন্ট আদর্শ পাঠকমহলে ভিন্ন রুচি ও চিমত্মার সমগ্রতা তৈরি করে। মানবিকতার অভিপ্রায়েও নতুন দ্বার উন্মোচন করে। রাষ্ট্রীয় স্বৈরতন্ত্র বা আধা-স্বৈরতন্ত্রের প্রতিকূলতার বিপরীতেই এমন চেতনাদর্শ শানিত হয়; কাগজের প্রচ্ছদে-প্রণোদনায় উজ্জ্বল সাহসী সন্দর্ভ কার্যত একটি প্রগতিশীল প্রজন্মকেই গড়ে তোলে। যা দেশ ও জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সৃজনশীল করে তোলে। ছোটকাগজের এ-অভিপ্রায় প্রজন্মান্তরে পুনর্গঠিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির ‘নতুন’ অকুস্থল বললে অত্যুক্তি হয় না। এমন ধারাবাহিকতায় ১৯৯০-এ সাময়িকপত্র প্রসূন বের হয়। এ-পত্রিকাটিরও লেখার তালিকা পূর্বোক্ত চেতনাজাত। এতে অসীমকুমার দাস লেখেন ‘ঝঞ্ঝা ও পুনরুত্থান’ কবিতা, কুমার রায়ের রচনা রবীন্দ্র-নাটক নিয়ে, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের অনুবাদ ‘প’ড়ো জমি’ আর চিত্রকলাবিষয়ক কিছু মৌলিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। ১৯৯৪-এর দিকে স্বাতন্ত্র্য বের হয়। এখনকার পরিচিত লেখক জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত,  মুজিব ইরম, চঞ্চল আশরাফ, মিহির মুসাকি, সুশান্ত মজুমদার, আলম খোরশেদ প্রমুখ লেখেন। স্মর্তব্য, পত্রিকার নামগুলোও ছিল দুর্মররূপে দৃষ্টি-আকর্ষক। মেধাবী লেখক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সম্পাদনায় বের হয় লেখক শিবিরের মুখপত্র তৃণমূল। গল্প-প্রবন্ধ-গ্রন্থালোচনা ও বক্তৃতা নিয়ে তৃণমূল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ কাগজ। তবে এ-কাগজটি প্রধানত প্রতিষ্ঠিত লেখকদের লেখাই মুদ্রণ করেছে। ১৯৯৮-তে প্রকাশিত হয় সহজিয়া। ১৯৯৯-এ শ্রাবণের আড্ডা। একই বছর ওবায়েদ
আকাশ-সম্পাদিত শালুক বের হয় লিটলম্যাগের চরিত্র নিয়ে। এর বিশতম সংখ্যাও প্রকাশিত হয়েছে। কবিতা বিষয়েই এর আগ্রহ বেশি; কিন্তু কথাসাহিত্য নিয়েও শালুকের বিষয়ভিত্তিক সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৯৯-তেই অনিকেত শামীম লোক বের করেন। এর আঠারোটি সংখ্যা বেরিয়েছে। অদ্যাবাধি লোক প্রচুর নবীন লেখককে স্থান করে দিয়েছে তার পাতায়। কবিতা-গল্প-পুস্তক সমালোচনা-অনুবাদ কিংবা বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে পত্রিকাটি পাঠকমহলে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে। এছাড়া ধাবমান, শব্দগুচ্ছ প্রভৃতি কাগজও ঢাকা থেকে বের হয়। এসব কাগজ মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, সদ্য পাশ করা যুবক কিংবা স্বউদ্যোগে গড়া কোনো সংগঠনের ব্যানারে প্রকাশিত হয়। ঢাকাকে কেন্দ্র করেই মূলত এর উৎসাহ ও প্রতিশ্রুতি দানা বাঁধে।

অন্য দশকের মতো নববইয়ে বা শূন্য দশকেও ঢাকার বাইরে কাগজ হয়েছে। ১৯৯২-এ কামরুল হুদা পথিকের সম্পাদনায় বের হয় তাৎপর্যপূর্ণ কাগজ দ্রষ্টব্য। এর সেস্নাগানটি আকর্ষণীয় : ‘ঘেন্না –  মৌলবাদ, সুবিধাবাদ, গোয়েবল্সবাদ আর শাদা মুখোশপরা ভ-দের প্রতি’। দ্রষ্টব্যের বর্তমান ঠিকানা সেন্ট্রাল রোড, ধানম–, ঢাকা। এর অষ্টম সংখ্যায় লেখা আছে : ‘আজকের দিনেও আছে তেভাগা আন্দোলনের দাবানল বুকে লালন করা কানসাট কি ফুলবাড়িয়ার বীর কৃষকদের হার না মানা লড়াকু অভ্যুত্থান… আজকের দিনেও আছে গার্মেন্টস শ্রমিকদের জানবাজি রাখা লাগাতার যুদ্ধ… আজকের দিনেও আছে জলপাইরঙা রাষ্ট্রযন্ত্রের উদ্যত ফণা মটকে দেওয়া ছাত্র-শিক্ষকদের নির্ভীক লড়াই… আজকের দিনেও আছে জঙ্গিবাদ – মৌলবাদ রুখে দেয়ার এক নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম… আজকের দিনেও আছে দ্রষ্টব্য অনিন্দ্য চালচিত্র শিরদাঁড়া প্রতিশিল্প দুয়েন্দে কফিন টেক্সট এবং টানটান প্রস্ত্ততিরত আরো অনেক অনাগত যোদ্ধা ও যুদ্ধের আলামত…’। এরূপ উক্তিতেই এর স্বভাব-চরিত্র বোঝা যায়। একই সঙ্গে তাদের সহযাত্রী অন্য পত্রিকার আন্দোলনের খবরও এখানে মিলেছে। বস্ত্তত, এ-ঘরানায় চর্চিত লিটলম্যাগের লেখকরাও সিলেকটিভ। ১৯৯৭-তে হৃদি বের হয় নারায়ণগঞ্জ থেকে।  পরের বছর হাবিবুর রহমান এনার সম্পাদনায় বের হয় খোয়াব। এছাড়া ধাবমান, ধ্রম্নবতারা, পা-ব, চিহ্ন প্রভৃতি বের হয়। এর মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০০ সালে প্রকাশিত লিটলম্যাগ চিহ্ন এ পর্যন্ত ৩১টি সংখ্যা প্রকাশ করেছে। গল্প-কবিতা-অনুবাদ-প্রবন্ধের মতো নিয়মিত রচনা ছাড়াও বিষয়ভিত্তিক শিরোনাম অবলম্বন করে এ পত্রিকাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে নবীন লেখকদের নিয়মিত পাঠচক্র এবং সৃজনশীল চিমত্মাচর্চার কেন্দ্র। এটি এখন পর্যন্ত নিয়মিত বেরোচ্ছে। আমিনুর রহমান সুলতান-সম্পাদিত অমিত্রাক্ষর বের হয় জুন, ২০০২ সাল থেকে। এখন পর্যন্ত এটির মোট ১৭টি সংখ্যা বেরিয়েছে। কবি আসাদ চৌধুরীকে শিরোনাম করে বর্তমানে এর ১৮তম সংখ্যার কাজ চলছে। সাধারণত এটি কবিতার কাগজ। অমিত্রাক্ষর বিশেষত তরুণ কবি ও লেখকদের প্রণোদনার কাগজ।

এছাড়া এখনো দেশব্যাপী প্রচুর লিটলম্যাগ বেরোচ্ছে। এর মধ্যে অতঃপর শব্দায়ন, অনুপ্রাণন, আটকুঠুরি, এবং মানুষ, কবি, চৌকাঠ, দ্যুতি, নন্দন, বেগবতী, মধ্যাহ্ন, সপ্তর্ষী, হাইফেন, জ্যোতি, বাঙালি, আলোক বার্তা, আত্মকথা, নবোদয়, শিক্ষাসাগর, প্রতিশ্রুতি, নদী, মৃদঙ্গ, গল্পপত্র, শাশ্বতিকী, টোঙ, প্রান্তর, খেয়া, ধারা, মাটি, আবহ, মাকড়সা, আদিত্য, চৌকাঠ, সপ্তর্ষি, মেন্টাল, স্বপ্ন, শীতলপাটি, ছলাৎ, আগামীর পথে, উমেদ, লোকশব্দ, নতুন কণ্ঠস্বর, অলক্ত, কমলাঙ্ক, যাত্রী, ইদানীন্তন, বর্ণিতা, কাগজের ডানা, আপন, ছড়া, অরণিকা, বনলতা, মেঠোপথ, সুরঞ্জনা, মাদল, স্পর্ধা সবসময়ে, পিয়াস, প্রতিস্বর, আনন্দ ভৈরবী, ঝরাপাতা, সম্প্রীতি, ইস্টিশন, অর্কেস্ট্রা, দোআঁশ, সুতরাং, দ্বিবাচ্য, কালাক্ষর, পুনশ্চ, শব্দ, শিল্পগ্রাম, বেগবতী, মরাল, ভাস্কর, চালচিত্র, অরণি, ধমনী, প্রভৃতি লিটলম্যাগ প্রতিষ্ঠানবিরোধী ও প্রগতিশীলতার অকুণ্ঠ চর্চার চেষ্টা করে চলছে। প্রতিটি নামই কার্যত এক একটি ‘চেতনা’। এই চেতনার আদলটির উৎপত্তি ও উৎসারণ মূলত স্বাধীন বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতিসত্তার মূলে প্রোথিত।

 

চার

বাংলাদেশের লিটলম্যাগ অনেকাংশে আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করেছে। নতুন সাহিত্য সৃষ্টির উৎসমুখ রচনা করেছে। নবতর লেখক ও প্রজন্মকে দিয়েছে যথোচিত দিকনির্দেশনা। লিটলম্যাগ বেশিরভাগই হয়তো দীর্ঘস্থায়ী নয়, কিন্তু কমিটমেন্টে ও ভয়হীন সাহসে যে ব্যক্তিত্বের জন্ম দেয় – শুদ্ধতার মধ্য দিয়ে যে চেতনবীজ রোপণ করে – তা দূরপ্রসারী। আমাদের জাতিসত্তার পরিচয় কী কিংবা ভাষার আন্তরশক্তির বীজ কোথায় লুক্কায়িত – এমন অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দিয়েছে লিটলম্যাগ। প্রান্তিক-কৃষ্টির চর্চা, দ্বান্দ্বিক জীবনধারার সত্যানুসন্ধান প্রকৃত লিটলম্যাগের কাজ। লিটলম্যাগের সংজ্ঞা, মত ও উদ্দেশ্য নিয়ে নানারকম তর্ক-বিতর্ক আছে, কার্যত এর সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞাও হয়তো তৈরি করা কঠিন; কিন্তু যে-ভাবনা এর মুকুরে বিরাজমান থাকে সেটি অতীতে এবং আগামীতে লেখক প্রজন্ম সৃজনে গড়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কারণ লিটলম্যাগের অদম্য প্রত্যয়ের ভেতর জনসংস্কৃতি এবং সর্বমানবের শুভপ্রদ চিমত্মাই লুকিয়ে থাকে। অবশ্য এ নিয়ে নানা মুনির নানা মত আছে – কিন্তু সাহিত্যের শক্তির সত্যসন্ধ প্রয়াসে দ্বিধাহীনরূপে সে নির্বিকল্প। আর এক্ষেত্রে এটিও বলা যায়, চলমান বিশ্বে তথা বাংলাদেশে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের যে বিচিত্র অভিমুখ এবং তার চিত্রিত শক্তির মূলে লিটলম্যাগের যে-ভাবাদর্শ তা কিছুতেই ছোট করে দেখার নয়। যত লিটলম্যাগের চর্চা হবে, মুদ্রণ-সম্প্রসারণ ঘটবে ততই আমাদের সাহিত্য ঋদ্ধ হবে। এমন চর্চায় যেহেতু প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ অনুপস্থিত – সেখানে ব্যক্তি-স্বাধীনতা বা দৃঢ় ব্যক্তিচেতনাই এর আত্যন্তিক শক্তি – যা আমাদের বর্তমান সাহিত্যেরও উদ্যত অভিমুখ, বলা যায়। এ লক্ষক্ষ্য আমাদের সাহিত্যচর্চায় লিটলম্যাগের চিমত্মাচেতনার প্রবলতা বৃদ্ধি ও উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি আমরা প্রত্যাশা করতে পারি।

 

[পুনশ্চ : এ-প্রবন্ধের আলোচনায় কোনো কোনো লিটলম্যাগের নাম অনুলেস্নখ রয়ে যেতে পারে। তবে সেটি উলেস্নখ করলেও এখানকার বক্তব্যের বিশেষ তারতম্য হবে বলে মনে হয় না। তবু অনুলেস্নখকৃত লিটলম্যাগের সম্পাদক ও কর্মীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি।] r

শেয়ার করুন

Leave a Reply