মনে করি এই গল্পটি গার্সিয়া মার্কেজের

লেখক:

পিয়াস মজিদ
মহিমান্বিত আপনাদের আমি একান্ত গাবো।
জ্যোতিঃপ্রভাময় সময়ে আমি লিখতে চেয়েছি তমসলেখা কারণ সূর্যের চেয়ে বেশি মালঞ্চে আমি অস্ত যেতে দেখেছি গোলাপগুচ্ছর। মাকোন্দোর ছলে আমি তো শুধু মাকোন্দোর কথাই বলিনি বরং আমার মাকোন্দো ছড়িয়ে আছে হাভানা থেকে হাতিয়া অবধি। যেখানেই ক্ষুধা, লুটপাট, মাফিয়া, স্বৈরাচার, গুণ্ডাপান্ডা, দুর্নীতি, সেখানেই অনিবার্য মাকোন্দো। ফি-সন মঙ্গা আর বন্যায় ভাসা আপনাদের রাহেলা-জমিলার সঙ্গে আমার এরেন্দিরার তো নিয়মিত দেখা হয়। ঠাকুরমা কিংবা দাদিমারূপী নিয়তিবুড়ি কলম্বিয়া কিংবা গঙ্গাচড়ার মানুষদের যে অচ্ছেদ্য বন্ধনে বেঁধেছে তার গিঁট এবার না কাটলেই নয়। আর এই গিঁট কাটার কৌশল কেবল আমার জাদুকথাতেই নয়; ওই তো দেখুন, আপনাদের ঠাকুরমার ঝুলি বা মৈমনসিংহ গীতিকার নিরালা-নিঝুম পৃষ্ঠায় কত কথাজাদু খেলা
করে। একটা গিঁট ধরে টান দিন প্লিজ। দেখবেন, চুপ থাকা শেষ কথা নয় মোটেও। আপাতত যারা চুপ আছে তারা কেউ চিরস্থায়ী চুপ নয়। ল্যাটিন, আফ্রিকা কি বাংলা; কথা বলুন নিজের ভাষায়, রক্তে; দেখবেন আপনাদের কথামালার বিদ্রোহী কলকল সশস্ত্র স্রোতে অন্যায় স্থিতাবস্থা গুঁড়িয়ে যাবে নিশ্চিত। শতাব্দীব্যাপী মহাদেশীয় নির্জনতার পাষাণ-দরোজা এবার মানুষের অন্তহীন ধাক্কায় খুলবেই। এই কথাটা প্রাণভরে জানুন – পৃথিবীর ইতিহাসে মানুষের নেই অবসান কোনো।

দুই
সংবাদপত্রের রিপোর্টের সঙ্গে সাহিত্যের ফারাক সুবিদিত কিন্তু আমি গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, এল এস্পেকতাদোর পত্রিকার সাবেক পেশাদার সাংবাদিক; মনে করি – হয় হয়, সবই সাহিত্য হয়। মানুষেরই তো কথা বলে সাহিত্য। মানুষের কথাতেই তো সাহিত্যের সমস্ত নির্মাণকলা। আর সংবাদপত্র তো মানুষের কথাতেই থাকে ভরপুর। আপনাদের বাঙালি কবি বিষ্ণু দে সত্যই বলেছেন, ‘সংবাদ মূলত কাব্য’। সংবাদসত্যের তথ্য-ভাগ কালের প্রহারে বর্ণহীন হতে বাধ্য কিন্তু এর শ্বাসমূল তো সাহিত্যেরই সার। আমি তাই বিপন্ন জাহাজের নাবিকের গল্প খুঁজে পাই নিউজপেপার রিপোর্টের বক্স থেকে। পত্রিকার সীমাবদ্ধ স্তম্ভ থেকে অতঃপর সেই সংবাদগল্প যাত্রা শুরু করে অসীমের স্পন্দে। শুধু আমি কেন, খোঁজ নিয়ে দেখি আপনাদের চারণ সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিনও তো সংবাদসত্যকে রূপ দিয়েছেন নিরুপম সাহিত্যকর্মে। তাঁর কানসোনার মুখে, পায়রাবন্দের শেকড়সংবাদে, শাহ আলম আর মজিবরের কাহিনিতেও দেখবেন কত সংবাদজাদু বাসা বেঁধে আছে। কিংবা আপনাদের শহীদুল জহিরের পাতা ওলটান; দেখবেন কোনো এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন নিমফল দাসীর মতো গল্পচরিত্র তিনি খুঁজে পেয়েছেন দৈনিকের অবজ্ঞাত ‘মফস্বল সংবাদ’-এ। তাই বলি, সাহিত্যিকের কলমের পেছনে এক নিজস্ব সংবাদদাতা সবসময় থাকে দণ্ডায়মান। সে আমাকে দিয়ে যেত মানুষের কত শত বোবা-স্বরের সব বিস্ফোরক রিপোর্ট।
অনুরোধ আপনাদের, চোখ খোলা রাখুন সবসময়। খবরের কাগজের সবচেয়ে অবহেলিত রিপোর্টটাতে আপনি হয়তো আমার মতোই খুঁজে পাবেন বিপন্ন জাহাজের অনেকানেক নাবিকের গল্প।

তিন
আর আপনাদের নিশ্চয়ই স্মরণে আছে সমসাময়িক চেক কথাকার মিলান কুন্ডেরার কথা। উপন্যাস প্রকৃতার্থে বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির সংগ্রাম। আমিও বলি, আমার উপন্যাসসমুচ্চয় করণকৌশলের কাঠামো ভেঙে বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির সংগ্রাম তীব্র জারি রাখে। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, ১৯২৮-এর অক্টোবরে আমার স্বদেশে ঘটেছিল নিষ্ঠুর কলাবাগিচা হত্যাকাণ্ড। এক রাতে কয়েক হাজার ধর্মঘটী বাগিচা-শ্রমিককে হত্যা করেছিল সরকারি সেনাবাহিনী। পরের কয়েকদিনে চিরতরে হারিয়ে যায় আরো কয়েক হাজার শ্রমিক। দাদু কর্নেল নিকোলাস রিকোর্দো মার্কেজ মেহিয়ার কাছে শৈশবে শুনেছি সেই যুদ্ধবিভীষিকার গল্পগাছি। আর জানেন কি শৈশবে শোনা আরাকাতাকার কলাবাগিচার হত্যাস্মৃতি আমার লেখকসত্তাøায়ুকে আমৃত্যু চালিত করেছে বিস্মৃতির বিরুদ্ধে মরণপণ লড়াইয়ে। কী ঘটল তার চেয়েও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল মানুষ কী মনে রাখে আর কীভাবে মনে রাখে। আমি বুঝি উঠতে চেয়েছি স্মৃতি-বিস্মৃতির সমীকরণ। আমার কর্নেল বা বিষাদ-গণিকা কাউকে আমি বিস্মৃতিতে হারিয়ে যেতে দিইনি। চিরকাল মনে করেছি জীবনপথে যেতে যেতে বলে যেতে হবে জীবনেরই গল্প। কারণ জীবন, জীবন এবং একমাত্র জীবনের পরাক্রান্ত গল্পই পারে ধ্বংস বা বিলয়কে বিস্মৃত করতে। তাই বলি, আমি যেমন কলাবাগিচা হত্যাকাণ্ড ভুলিনি সারাজীবন, তেমনি আপনারাও ভুলবেন না আপনাদের ১৯৭১। গণহত্যার রাত; সে কলম্বিয়া কিংবা মংলা যেখানে হোক, তা বিস্মৃত হওয়া মহাপাপ। মনে রাখা উচিত আমাদের বেঁচে থাকার প্রতিটি মুহূর্ত-সরণিতে একজন শহিদের স্মৃতি ঝুলে আছে। যেন তাই আসুন, শিল্প সৃষ্টি করুন – সম্ভোগ করুন, শিল্পের অরে বিস্মৃতির বিরুদ্ধে উত্তোলিত রাখুন স্মৃতির বিজয়ী ঝান্ডা।
চার
আমি মনে করি, জীবন এক অনন্ত চিত্রশালা। এর প্রদর্শনীর ছবিগুলো কখনো বর্ণহীন হতে দেওয়া উচিত নয় ব্যক্তিশিল্পীর। এজন্য আমি বলেছি, নিরতিশয় হতাশ মুহূর্তে একটু দিল খুলে হাসুন; হয়তো সে-মুহূর্তেও আপনার হাসির প্রেমে পড়বে কেউ। আর প্রেম ছাড়া কি আছে মানুষের জীবনে! সহজ-গভীরভাবে প্রেমের কথা সুরে আনে বলেই আপনাদের প্রিয় পপতারকা শাকিরাকে এত পছন্দ আমার। প্রেম-হাসি-হল্লায় ভরা একটা জীবনের চেয়ে একজন মানুষের নিজেকে দেওয়ার বড় উপহার আর কিছুই হতে পারে না। এই কথা শুধু আমি তো বলি না; শুনে দেখুন আপনাদের স্বর্গত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও কিন্তু বলেছিলেন – ‘রাখিস না শুকনো সন্ন্যাসী করে, রাখিস মা তুই রসে-বশে’। হ্যাঁ, রসে-বশে একটা জীবন কাটানোর চেয়ে মহার্ঘ্য আর কিছুই হতে পারে না। আর মহাত্মা লরেন্স যেমন বলেছেন, ‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়’; আমি তা দুই হাত তুলে সমর্থন করার সঙ্গে যোগ করি – স্বপ্নশীলতা ছাড়া সম্পন্ন নয় কোনো মানুষ। মানুষ বুড়ো – থুত্থুড়ে হয়ে যায় বলে স্বপ্ন দেখা স্থগিত করে না বরং স্বপ্ন দেখা মুলতবি করে বলেই গুরুত্ব বুড়োত্ব ঘনিয়ে আসে মানবজীবনে।
সুতরাং ঠিক পরের মুহূর্তে মৃত্যু নিশ্চিত জানলেও যাওয়ার আগে আরেক চুমুক পান করেন; স্বপ্নমদের প্লাবনে ভাসিয়ে দিন জীবনের যত বিধিবদ্ধ খাদ্য। হ্যাভ অ্যা নাইস টোস্ট উইথ এন্ডলেস ড্রিম, ড্রিম অ্যান্ড ড্রিম।

পাঁচ
জাদুবাস্তবের কথা তো শোনেন আপনারা আমার নামে। আমার এই জাদু কিন্তু কোনো অলীকের খেলা নয়। আসলে ল্যাটিনের রিয়েলিটিই এই মহাদেশের বাইরে ফ্যান্টাসি বলে প্রতিভাত হয়। আমার একশ বছরের নির্জনতায় টিকিট কেটে অচেনা বরফ দেখার যে-বাস্তবকে জাদু বলে ভ্রম হয় তা তো বাস্তবেরই একটা উলটো তল মাত্র। আমার অঞ্চলের গৃহযুদ্ধ-সামরিক স্বৈরাচার-গুপ্তহত্যা-মাদকমাফিয়া-ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানির বেনিয়াবৃত্তি ইত্যাকার সব চরম বাস্তবকে ল্যাটিনের লোককলার আঙ্গিকে যে ঔপন্যাসিক কাঠামোয় বেঁধেছি, তা-ই কেমন জানি জাদুর মতো ঝকমক করে। এ-প্রসঙ্গে আপনাদের বলে রাখি আপনাদের বাংলা অঞ্চলের ঋদ্ধ লোকজ সংস্কৃতিকে ‘গর্বের ধন’ হিসেবে মৃতবৎ স্থবির প্রদর্শন সামগ্রী করে রাখার একটা সাম্রাজ্য-দৃষ্টিবাদী চেষ্টা আছে। আমি বলি জীবন ও শিল্পের চলমানতায় লোকজতাকে অঙ্গীকৃত করুন। গোষ্ঠীগত অহংকারের ধন থেকে তাকে রূপ দিন দেশ ও দশের চিরকালীন সংহিতারূপে।
চাকমা-মারমা-খাসিয়া-তঞ্চঙ্গ্যা কত আদিবাসীর বসত আপনাদের পাহাড়ের সমতলে! কত কথকতা-দীর্ঘশ্বাস-কান্না আর কত কল্পনা চাকমায় ভারাতুর আপনাদের আদিবাসী এলাকা। আপনাদের মহান কথাকার আখতারুজ্জামান ইলিয়াস যেমন বলেছেন, ‘চাকমা উপন্যাস চাই’; তো সেই চাকমা-মারমা উপন্যাস কই? না, কেবল লোককাহিনির নিরীহ সংকলন দিয়ে কিচ্ছু হবে না। উপন্যাসের ডানায় ভর দিয়েই ল্যাটিনের মতো ‘বুম’ ঘটাতে হবে।
আপনারা জানেন নিশ্চয়ই, আমাদের আরেক বন্ধু কথাশিল্পী মারিয়ো বার্গাস ইয়োসা বলেছেন, ঔপন্যাসিক হচ্ছেন শকুন; ঘুণে ধরা সমাজের আবর্জনা খেয়ে বাঁচে। আমি তার সঙ্গে যোগ করে বলি, ঘুণে ধরা আবর্জনা খেয়ে তাকে নির্মল করার পাশাপাশি একজন ঔপন্যাসিকের বিপ্লবী কাজ হচ্ছে ভালো লেখা। হ্যাঁ ভালো, ভালোতর এবং ভালোতম লেখার মধ্য দিয়ে উপকথার সীমানা ভেঙে ল্যাটিনের মতো আপনাদের বাংলাদেশেও জাদুর মতো বাস্তবকে মেলে ধরুন বিশ্বলোকে। আপনাদের উপন্যাস পড়ে বিশ্বপাঠক যখন দেখবে চোর-বদমাশ-ঘুষখোরের মতো সমাজবিরোধীরা এখানে সমাজপতি, খাবার মানে এখানে ফরমালিন, রাজাকার দেয় স্মৃতিসৌধে স্যালুট, পতিত একনায়ক মাঝে মধ্যেই ছাড়ে গণতন্ত্রের বুলি আর কুকুরপ্রতিম খল-শয়তানেরা বলে নন্দনতত্ত্বের কথা, তখন আপনাদের উপন্যাসের কাছেই পাঠক জাদুর খোঁজে আসবে সুতরাং জাদুবাস্তবের অন্বেষায় তত্ত্বের ধূসর বই না ঘেঁটে নিজের ঘরের পাশে চোখ রাখুন-কান পাতুন; দেখবেন জাদুদৃশ্য-জাদুশব্দের কী ভয়াবহ-বিশাল ভাণ্ডার কেবল আপনারই হাতে ঔপন্যাসিক-সাহিত্যিক বিস্ফোরণের অপেক্ষায় আছে।
আসছে কোনো আগস্টে নিশ্চয়ই আমার দেখা হবে আপনাদের জাদুকথাময় আখ্যানের সঙ্গে।

ছয়
চিত্রনাট্যের কর্মশালা – কেমন করে গল্প হয় নামে তরুণ ঘটক বাংলায় অনুবাদ করেছেন স্ক্রিপ্ট-রাইটিং বিষয়ে আমার একটি বই। প্রশ্ন করতে পারেন, এত কিছু থাকতে চিত্রনাট্য নিয়ে আবার পড়লাম কেন? জীবনের গল্প বলতে এসেছি তো তাই চলচ্চিত্রের পর্দাপ্রতিম জীবননেপথ্যে বহমান চিত্রনাট্যের কথা তো আমাকে বলতেই হবে। চিত্রনাট্যের কাট শটের মতোই জীবনের এক-একটি কোণকে তাদের আলাদা স্বাতন্ত্র্যে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। তাহলেই সামগ্রিকভাবে পুরোজীবনের কথা বলা চলে। খণ্ডিত নয়, আমি সবাইকে বলি জীবনসামগ্র্যের চর্চা করতে। চিত্রনাট্যের কথা বলতে মনে পড়ে গেল মৃণাল সেনের কথা। সেদিন হঠাৎ পড়ছিলাম আপনাদের গ্রেট চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেনের আত্মকথা অলঅয়েস বিং বর্নের কিছু অংশ। উনি দেখি আমার সম্বন্ধে কত কিছু লিখেছেন। আপনারাও একটু শুনুন –
‘…১৯৮৭ সালে কিউবার রাজধানী হাভানার ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন স্কুলে আমি আর গীতা আমন্ত্রিত হলাম পনেরো দিনের জন্য। প্রথমেই সেখানে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের উদ্বোধনী বক্তৃতা হলো। তিনিই স্কুলের সভাপতি।… পনেরো দিন আমাদের বিশ্রাম ছিল না। বিশ্রামের দরকারও পড়েনি। ক্যাম্পাসের ভেতরে শিক্ষক-ছাত্র সবার সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা। কখনো সবাইকে নিয়ে, কখনো আলাদা আলাদা। মার্কেজ যখন আসতেন তখন তাঁর কোনো বিশেষ ব্যবস্থা ছিল না। সবকিছুই খোলামেলা, কখনো কোনো কিছুর বাড়াবাড়ি নেই। ক্লাসে ছাত্রদের সঙ্গে খুব সহজ ভাষায় অনায়াস ভঙ্গিতে কথা বলছিলেন মার্কেজ আমার খণ্ডহর ছবিটা নিয়ে, ছাত্রদেরও বললেন ছবিটা দেখে নেওয়ার কথা। বলতে বলতে হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কীভাবে এ-ছবি করার ভাবনা এসেছিল আমার। তারপর উত্তরের অপেক্ষা না করেই বললেন : ‘ইমেজস কাম টু মি ফার্স্ট’। একদিন আমার টেবিলে পড়ে থাকা তাঁর লেখা দ্য অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়ার্ক হাতে তুলে নিয়ে বললেন, মেক্সিকোয় থাকাকালীন একটা অ্যালবামে ভারতীয় স্থাপত্যের ধ্বংসস্তূপের ছবি দেখতে দেখতে তাঁর মাথায় আসে এ-উপন্যাসের বীজ। মধ্যপ্রদেশে বিশাল প্রাসাদের মতো বাড়িতে এক ভয়ংকর নিরালা খুঁজে পান যেন তিনি, তখনই তাঁর ডিক্টেটর চরিত্রের দ্বৈতরূপ তৈরি হয়। ভারতীয়ত্বের ছোঁয়া আছে বলে আমাকে এ নিয়ে ছবি করার কথাও বললেন, বেশ উত্তেজিতভাবেই। ফলে ওঁকে বোঝাতেই হলো যে, এটি ‘জেম অব অ্যা বুক’ নিঃসন্দেহে। কিন্তু ভারতীয়ত্বের ছোঁয়াটুকুই আছে শুধু, আদতে ল্যাটিন আমেরিকা ছেয়ে আছে বইটির সর্বাঙ্গে, যা একেবারেই আমার এক্তিয়ারের বাইরে।
উপন্যাস থেকে ছবি, চলচ্চিত্র। প্রয়োজনবোধে মূলে আঘাত না ঘটিয়ে উপন্যাসকেও ভাংচুর করা হয়। লেখক হয়তো অখুশি হবেন না। হয়তো বা হবেন। বলবেন : নিজে গল্প লিখে চিত্রনাট্য করে নিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। এই নিয়ে মার্কেজের সঙ্গে একদিন কথা হয়েছিল, বলেছিলাম, আপনার অধিকাংশ উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়ণ বড়ই কঠিন, প্রায় অসম্ভব। শুনে মার্কেজ হেসে ফেললেন, বললেন : কাটাকুটি করে নেওয়া যায় না কি! আমি বলি : বলছেন! পঠন-পাঠন এতই সুখকর যে, কলম ছোঁয়ানো যায় না। কমলকুমার মজুমদার আমাদের দেশের এক মহৎ লেখক। তাঁর সম্পর্কেও আমরা অনেকেই ওই একই কথা বলব। দু-চারজন চেষ্টাচরিত্র করেননি এমন নয়। কিন্তু হয়ে ওঠেনি। সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্রে।’
একদিন প্রতিদিন, আকালের সন্ধানের মতো ফিল্মের ডিরেক্টর মৃণালের চিত্রনাট্য বিষয়ে ভাবনাও দারুণ লাগলো আমার। কিন্তু আমি বলি, উপন্যাস আর চিত্রনাট্য একই জীবনের দুই রকম উৎসারণ। প্রেমেন্দ্র মিত্রের বাংলা গল্প তেলনাপোতা আবিষ্কার নিয়ে মৃণাল নিজেই তো হিন্দিতে বানিয়েছেন খণ্ডহর নামের অসাধারণ ছবি। তাই বলি কবিতা হোক, গল্প হোক, উপন্যাস হোক কী চিত্রনাট্য; জীবনসামগ্র্যের সন্ধান পাওয়াই জরুরি কথা। মাধ্যমের ভিন্নতা বড় কিছু নয় আর হোর্হে লুই বোর্হেসের প্রথাভাঙা কথকতার পর সকল শিল্পমাধ্যমেরই তো ভেদ লুপ্ত হয়ে এসেছে। এখন দরকার অভেদ মানবের মুক্তির গান গাওয়া।

সাত
যাই হোক, আমি অবাক হচ্ছি এই ভেবে যে, অক্ষরের কী অন্তহীন ক্ষমতা যে কিউবা থেকে কলকাতা সবাইকে এক সূত্রে গেঁথে ফেলে। মৃণাল সেন যেমন তাঁর আত্মকথায় টুকে রেখেছেন আমাকে তেমনি আপনাদের মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী পর্যন্ত কত কতজন যে বাংলায় অনুবাদ করেছেন আমাকে; এর আগে গ্রেগরি রাবাসা, এডিথ গ্রসম্যান, রেনডলফ হোগানরা ইংরেজি করেছেন আমাকে। এই ভাষাভেদী উড়ালে ‘লস্ট ইন ট্রান্সলেশন’ বলেও হয়তো কিছু ঘটে কিন্তু এর চেয়ে বেশি তো ভালোবাসার ভাগ। তাই বলি সীমান্তের অন্যায় কাঁটাতার বিলুপ্ত হোক ভালোবাসার ঢলে। এক অভিন্ন আদিম মহান পৃথিবীর ধ্র“পদী উত্তরাধিকার যে মানুষ; তাকে ধর্মের নামে, গোত্রের নামে, বর্ণ ও ভাষার নামে ভাগ করা বন্ধ হোক। মৃত্যু উজিয়ে জয় হোক শাশ্বত সীমান্তহারা ভালোবাসার।

আট
এবং গত শতাব্দীতে আমি আপনাদের শুনিয়েছিলাম পাতাঝড়ের কাহিনি। কিন্তু এখন যখন তরুলতা কিছুই অবশিষ্ট নেই, তখন আমি আপনাদের কী আর শোনাতে পারি! শুধু ধুধু বালুচর ছাড়া? নীল কুকুরই নয়; এমন একটি প্রাণীও পেলাম না যার চোখে কান্না নেই। আর এরা প্রত্যেকে আবার অন্যের কান্নার জন্য প্রবলভাবে দায়ী। সরলা এরেন্দিরা কিংবা নিদয়া ঠাকুরমার ভেতর কোনো ফারাক দেখি না, কারণ অভিধান তার তাৎপর্য হারিয়েছে। যা সরলা তাই নিদয়া, যা নিদয়া তাই সরলা। কেবল সেনাপতিই নয়, সবাই যেন ভীষণ এক গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খাচ্ছি। আর পেয়ারার বদলে মাইনের সুবাস ছড়িয়ে পড়ছে চতুর্দিকে। আমরা আমাদের সমরাস্ত্রিক বাসনা পূর্ণ হতে দেখে দারুণ আহ্লাদিতও বটে। আমাদের ওপর দায় পড়েছিল কিছু পূর্বঘোষিত মৃত্যুর কালপঞ্জি আর নিজেদের অপহরণ সংবাদ রচনা করার কিন্তু আমরা কোটি কোটি পূর্ব ও উত্তর-ঘোষিত মৃত্যুর পটভূমি তৈরি করতে লাগলাম সানন্দে। আমাদের প্রেমের মৌসুমে একে একে ধেয়ে আসছে নানান দানব; কলেরা, সুনামি, ক্যাটরিনা। কর্নেলকে চিঠি লিখে না বলে আক্ষেপ করার কেউ নেই। বরং আমরা আমোদ পাই এই ভেবে যে, আমাদের পূর্বপুরুষেরা ‘চিঠি’ বলে কিছু লিখত। আমাদের সামনে ফেসবুক, গুগল প্লাস আর টুইটার-বাস্তবতা। প্রকাশ্যে, গোপনে, চিলি, গুয়ানতানামো-বে, বাগদাদ, কাবুল, গাজা, জেদ্দা, ত্রিপোলি, করাচি, দিল্লি, ঢাকায় ওঁৎ পেতে আছে শত শত হোয়াইট হাউস। আমরাই এদের স্রষ্টা আবার আমরাই এদের হাতে বধ্য। ডুবন্ত জাহাজের অথবা তার নাবিকের বিপন্নতার আলাদা গল্প এই কালে নেই।
কারণ এখন সবই ডুবন্ত।
ডুবন্ত নীলিমা
ডুবন্ত পাতাল
ডুবন্ত সূর্য
ডুবন্ত চন্দ্র।
সাম্রাজ্যবাদী কলা কোম্পানিগুলোর কাছে আমাদের আত্মা বিলি হয়ে গেছে কিছু ক্ষুদ্র ঋণের বিনিময়ে। সমষ্টিগত কোনো মনুষ্য-অবয়ব যেহেতু আর অবশিষ্ট নেই সেহেতু গোত্রপিতার সঙ্গে পৃথিবী থেকে হেমন্তও অবলুপ্ত। অশুভ সময়ের সরণি ধরে হাঁটতে হাঁটতে দেখি বিশাল এক গোরস্তান। সেখানে বারোজন অভিযাত্রীর কবর (এবং তারা যে-কোনো প্রকার অভিযানের পূর্বেই নিহত)। পথিপার্শ্বে একজন বেশ্যা তার সবচেয়ে দুঃখী খদ্দেরের জন্য বিলাপ করছে।
আর আমি আপনাদের নতুন শতাব্দীর প্রধান প্রধান জাদুঘরগুলোতে একশ বছরের নির্জনতা বলে একটি প্রতœবস্তু খুঁজে বেড়াচ্ছি।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার