মাটির দীর্ঘশ্বাস

লেখক:

Mobashir

মোবাশ্বির আলম মজুমদার

এই আনন্দ-বেদনার মাঝে সুখ আছে। আকাশ, জল, হাওয়ার মাঝে ঘোরলাগা স্বপ্ন থাকে। মোহাম্মদ টোকন মাতৃভূমির জল, হাওয়া, মাটির ঘ্রাণ প্রতিনিয়ত অনুভব করেন। শিল্পের সারাৎসার নির্মাণ করেন নিজ ভূমির রং দিয়ে। বিশাল ক্যানভাসের রঙের দ্যুতি দেখলে মনে হয়, এ যেন কিছুই নয়। আবার থমকে থেকে দেখা যায় রঙের সঙ্গে রঙের সখ্য। অন্ধকারের সঙ্গে আলোর সম্মিলনে নির্মিত হয়েছে টোকনের সৃষ্টিকর্ম। টোকন শিল্পের মূল উৎসে খোঁজ করেন বাংলার মাটির গন্ধ। বিদেশ-বিভুঁইয়ে মাটি তাঁর কাছে স্মৃতি হয়ে যায়। নগরায়ণ, আধুনিকতা, বিশ্বায়ন – সবটুকু নিজে ধারণ করতে পারেননি। শেষ অবধি। বাঙাল থেকে যাওয়াতে তিনি আনন্দ পান। টোকনের প্রদর্শনীর শিরোনাম ‘লাইট ডার্ক স্পেস’। মোট শিল্পকর্মের সংখ্যা ৩৬। সমকালীন শিল্পকর্মের আলো, অন্ধকার আর স্থানের নিরীক্ষাকে চূড়ান্তভাবে মেনে নিয়ে পশ্চিমা শিল্পীরা শিল্প নির্মাণ করেছেন। প্রাচ্যের শিল্পীরা রং ও আলোছায়ার নিরীক্ষা শুরু করেছেন ষাটের দশকে। পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের সম্মিলনে সৃষ্টিকর্ম আমাদের শিল্পকর্মকে ঋদ্ধ করেছে। টোকন আমেরিকায় বসবাস করেন। আমেরিকান শিল্পী মার্ক রথকো, সাই টম্বলির ‘আর্ট স্টুডেন্টস লিগ অব নিউইয়র্কে’ তিনি অংশগ্রহণ করেছেন।

মাতৃভূমির সবুজ রঙের মাঝেই তিনি সবসময় থেকেছেন। পাশ্চাত্যের শিল্পকর্মের ছায়া তাঁর কাজে দেখা যায় না। আমরা দুভাবে এ-প্রদর্শনীর কাজকে বিশ্লেষণ করতে পারি। প্রথমত, রঙের ব্যবহার। নির্দিষ্ট কিছু রঙের বাইরে গাঢ় রং হিসেবে বান্ট সিয়েনা ভায়োলেটের ব্যবহার দেখা যায়।

যখন কোনো শিল্পীর শিল্পকর্ম তাঁর নিজেকে উপস্থাপন করতে থাকে তাতে উপস্থাপিত হতে থাকে নতুন রঙের স্ফুরণ। সময়, পরিবেশ, অনুভূতি পরিবর্তন হলে রঙের ব্যবহারও পরিবর্তন হতে থাকে। দর্শকদের কাছে টোকনের শিল্পকর্ম এরকম শূন্যতা তৈরি করতে পারে। সে-প্রসঙ্গে বলা যায়, এমনভাবে কিছু না থাকার মাঝে অনেক কিছুর উপস্থিতি। ষড়ঋতুর রঙের বন্দনা। সবুজ ঘাসের শব্দ, আকাশের গায়ে থাকা মেঘের রঙের সঙ্গে মিলে যায় কল্পনাশক্তি। ইম্প্রেশনিস্ট ধারার রং-প্রয়োগের রীতি  অনুসরণ করলেও বিষয় নির্বাচনে সূক্ষ্ম চিন্তা কাজ করে। এককথায় প্রকাশের ক্ষমতা শিল্পীভেদে পার্থক্য আছে। টোকন তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করেন রঙে-প্রলেপে-বুনটে। প্রকৃতির গাঢ় রঙের দ্যুতি তাঁর ক্যানভাসকে আলো দেয়। আলোছায়ার মাথায় ক্যানভাসে দৃষ্টিনন্দন রং উদ্ভাসিত হয়। মূলত প্রাথমিক রং নিয়ে তিনি কাজ করেন। অমৌলিক রঙের সঙ্গে শীতল ও উষ্ণ রঙের হঠাৎ উপস্থিতি ক্যানভাসে দ্যুতি ছড়ায়। ‘লাইট ডার্ক স্পেস’ শিরোনামে নয়টি কাজে আমরা দেখি গাঢ় নীলের মাঝে আলট্রামেরিন ব্লু, গাঢ় ছাই রঙে সবুজ-হলুদ, বেগুনি রঙের নানা স্তর, বিকেলের রঙে রক্তিম আভা, উজ্জ্বল সবুজের সঙ্গে হলুদের সখ্য – এসব মিলিয়ে তিনি প্রকাশ করেছেন, কেমন করে আলো অন্ধকারের বুকে বাসা বাঁধে। বৃষ্টি প্রকৃতির অনিবার্য অংশ। পৃথিবীর দেশে দেশে বৃষ্টির রূপ অনেকটা এক। গাঢ় বেগুনি রঙের সঙ্গে হালকা বেগুনি রঙের প্রলেপ মনে করিয়ে দেয়, এটি বৃষ্টি-শেষের মুহূর্ত। উজ্জ্বল লাল রংকে মনোভূমিতে স্থাপন করে তিনি বলতে থাকেন ‘টেক মাই হ্যান্ড অ্যান্ড ওয়াক দ্য রেড ল্যান্ড’। ক্যানভাসে লালের বিন্যাস খুব সহজ কাজ নয়। লালের দ্যুতির কাছে অন্যসব রং থমকে যায়। ভারসাম্য তৈরির জন্যে লাল রং ব্যবহারে সাবধানী হতে হয়। টোকন লাল রঙের নিরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। দীর্ঘ সময় রঙের নিরীক্ষায় নিয়োজিত হলে সে-সফলতা দেখা যাবেই। প্রকৃতির মাঝে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য রঙের মাঝে নিজের পছন্দের রং নির্বাচনে টোকন মনোযোগী হয়ে কাজ করেন। ‘বিয়ন্ড দ্য ক্লাউডস’ ছবিতে বেগুনি রঙের মাঝে নীল আর হালকা বেগুনি রঙের চলাচলে মেঘের পরে রোদ তারপর আকাশ, প্রত্যেক মুহূর্তের রং স্পষ্ট করে বোঝা যায় এ-ছবিতে। এ-প্রদর্শনীর মাঝে কাগজে করা ছবিগুলোর সঙ্গে ক্যানভাসের কাজের অনেক পার্থক্য বোঝা যায়।

এটি মাধ্যমগত পরিবর্তনের কারণে হতে পারে। এ-প্রদর্শনীর শিরোনাম ‘লাইট ডার্ক স্পেস’। এর সঙ্গে প্রদর্শিত কাজের যোগসূত্র আছে। কিন্তু কোনো কাজে স্পেস বা স্থান দৃশ্যমান নয় বলে মনে হয়েছে। শিল্পকলার প্রধান স্তম্ভ হচ্ছে, কম্পোজিশন বা স্থান বিভাজনের সঙ্গে রং-রেখা, বুনটের ঐক্য গড়ে তোলা। এক্ষেত্রে এসব মেনে চললেও স্থানিক ব্যবস্থাপনায় অমনোযোগী মনে হয়। ফিরে আসি ছবির বিষয়ে। ‘অন অ্যা স্নো ডে, আই অ্যাম স্ট্যান্ডিং ইন দ্য ডার্ক’ ছবিতে অন্ধকারে হয়তো শিল্পীর উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। আবার কাছে গেলে শূন্য স্পেস অনুভূত হয়। একটি বরফে ঢাকা দিনের স্মৃতিকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা সরলতারই প্রকাশ। প্রকৃতির আলো-ছায়া, রং-রেখা, বুনট, মসৃণ আকৃতির নিবিড় বন্ধন তৈরি করে দেখান। মোহাম্মদ টোকন প্রকৃতির অনিবার্য সত্য নিয়ে কাজ করেন। প্রকৃতি আর ব্যক্তির অনুভূতি যখন মিলে যায়, তখনই তৈরি হয় কালোত্তীর্ণ শিল্প। গত ৩১ জানুয়ারি বেঙ্গল আর্ট লাউঞ্জে শুরু হওয়া এ-প্রদর্শনী শেষ হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার