শিল্প যখন প্রতিবাদের ভাষা

লেখক:

hasan ferdous Mithun 5-10-5

হাসান ফেরদৌস

এ-বছর ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ রায়ের নির্মম হত্যাকান্ড আমাদের চেতনায় প্রবল আঘাত হেনেছে। একুশের বইমেলা প্রাঙ্গণে, নিরাপত্তা প্রহরীদের দৃষ্টিসীমানায়, অসংখ্য মানুষের উপস্থিতি সত্ত্বেও নির্মমভাবে খুন হলেন অভিজিৎ, রক্তাক্ত হলেন তাঁর স্ত্রী। এই ঘটনা থেকে নিশ্চিত হওয়া গেল, তাঁদের লক্ষ্য অর্জনে যে-কারো বিরুদ্ধে আঘাত হানতে প্রস্ত্তত সংঘবদ্ধ মৌলবাদী চক্র।

এই চক্রের উত্থান ঘটেছে, এ-সত্যের সঙ্গে আমরা পরিচিত, কিন্তু আমরা প্রস্ত্তত ছিলাম না এই চক্রের এই উদ্ধত হামলার। অভিজিতের মৃত্যুর প্রতিবাদ এসেছে নানাভাবে। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এ-ব্যাপারে কার্যত কোনো প্রতিবাদী ভূমিকা গ্রহণ করেন। কিন্তু রাস্তায় নেমে আসে ছাত্র, সাংবাদিক, লেখক ও শিল্পীগোষ্ঠী। প্রবাসেও সে-প্রতিবাদ অনুচ্চ থাকেনি। নিউইয়র্কে প্রতিবাদ মিছিল হয়েছে, মোমবাতি হাতে মৌন পথসমাবেশ হয়েছে, বাঁধা হয়েছে নতুন গান, অনেকে লিখেছেন কবিতা, কেউ কেউ এঁকেছেন প্রতিবাদের ভাষ্য হিসেবে তাঁদের চিত্রকর্ম।

এঁদেরই একজন মিথুন আহমেদ। সম্পূর্ণ একক উদ্যোগে তিনি নিউইয়র্কে আয়োজন করেন একটি ইনস্টলেশন আর্ট। ‘আলো হাতে চলিয়াছে অাঁধারের যাত্রী’  এই শিরোনামে তাঁর এই শিল্পনির্মাণের কেন্দ্রে ছিল অভিজিৎ রায়ের হত্যার নির্মম ঘটনাটি, যদিও তাঁর লক্ষ্য ছিল আরো একটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। তা হলো, মৌলবাদ ও ধর্মভিত্তিক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যে-লড়াই তা মানবাধিকার, বাক্-স্বাধীনতা, বুদ্ধির মুক্তি ও নাগরিক সাম্যের লড়াই থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো লড়াই নয়। এই বৃহত্তর লড়াইয়ে শিল্প কীভাবে শুধু প্রতিবাদের হাতিয়ার নয়, স্বতঃস্ফূর্ত নাগরিক অংশগ্রহণের ‘মাধ্যম’ হতে পারে, হয়ে উঠতে পারে বৃহত্তর নাগরিক প্রতিবাদের এক ভাষ্য, তাঁর এই ইনস্টলেশন আর্ট থেকে সে-কথা আবারো স্পষ্ট হলো।

নিউইয়র্কের প্রধান বাঙালিপাড়া জ্যাকসন হাইটসে একটি অপরিসর হলঘরে স্থাপিত এই ইনস্টলেশন আর্টের কেন্দ্রে রয়েছে সাতটি স্তম্ভ। প্রতিটি স্তম্ভের ওপর কাপড় দিয়ে মোড়া সাতটি গ্রন্থ, প্রতিটি গ্রন্থের ওপর জ্বলছে একটি মোমবাতি। প্রতিটি স্তম্ভ ছিল একটি লাল বৃত্তে আবদ্ধ। কাঠের একাধিক ফ্রেম ছড়ানো ছিল সারা প্রদর্শনী জুড়ে, যে-ফ্রেমের ভেতরটা ছিল সম্পূর্ণ শূন্য।  ভেতরে রাখা ছিল রঙের টিউব, যার প্রতিটি দর্শককে মনে করিয়ে দিচ্ছিল, এই শূন্য ফ্রেম নিজের বিশ্বাস ও স্বপ্নের রঙে রাঙিয়ে তোলার দায়িত্ব তোমার। লাল, হলুদ, সবুজ ও নীল – এই চারটি মৌলিক রং দিয়ে করা হয়েছিল কিছু প্রতীকী নকশা, ছবি। বাঁ পাশের এক দেয়াল জুড়ে রাখা হয়েছিল ছোট ছোট কাগজের টুকরো, মুদ্রিত ছবি, পোস্টার আর মাটিতে বিছানো ছিল অসংখ্য পরিচিত ও চিরচেনা স্লোগান-অাঁকা মুদ্রিত ব্যানার।  মাটিতে রাখা ছিল কালি, কলম ও রঙের টিউব। শুধু একটি দরজা দিয়ে দর্শকদের আসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। প্রবেশের সময় তাদের হাতে ধরা ছিল নাগরিক অধিকারের দাবি সংবলিত ছোট ছোট ব্যানার।

একটি পূর্বনির্মিত স্থায়ী মঞ্চ থেকে বাজছিল ঢোলের অনুচ্চ আওয়াজ, একটি গানের দল সেখানে তাদের কণ্ঠে তুলে নিয়েছিল আমাদের পরিচিত কোনো গান। দর্শকরা এক-এক করে সে-মঞ্চে এসে দাঁড়ান ও পড়ে শোনান যার যার হাতে ধরা নাগরিক অধিকারের পক্ষে বক্তব্য। একই বক্তব্য বারবার এসেছে, কিন্তু তাতে কেবল এ-কথাই পুনর্ব্যক্ত হয়েছে, এই কথা কোনো এক ব্যক্তির বা কোনো দলের নয়, এই দাবি সকল বাঙালির। তা যেমন গতকালের, তেমনি সে আজকের, এই সময়েরও।

‘সাত’ – এই নম্বরটি মিথুন আহমেদ বেছে নিয়ে তাকে সম্পূর্ণ প্রতীকী অর্থে ব্যবহার করেছেন।  সাত, কারণ বাঙালির ইতিহাসে সাত এই নম্বরটি বারবার ফিরে এসেছে। যেমন ৫২  (৫ + ২), একাত্তর, সাতই মার্চ, সাত বীরশ্রষ্ঠ ইত্যাদি। সে সাত স্তম্ভের ওপর সযত্নে রাখা কালো কাপড়ে মোড়া গ্রন্থগুলি ছিল বাঙালির মুক্তচিন্তার প্রতীক, কোনোটা রবীন্দ্রনাথের, কোনোটা নজরুলের বা জীবনানন্দ দাশের।  বারবার আঘাত এসেছে এসব গ্রন্থের বিরুদ্ধে, কিন্তু বাঙালি তাদের বারবার অবমুক্ত করেছে।  নাগরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে গ্রন্থগুলোকে অবমুক্ত করা হয় শুধু এ-কথা মনে করিয়ে দিতে, তোমরা মুক্তচিন্তা রুদ্ধ করতে যত চেষ্টা করো, জানবে ততবারই আমরা তা অবমুক্ত করব।

যে-সাতটি স্তম্ভ ছিল এ-প্রদর্শনীর কেন্দ্রে, তার প্রতিটি একে অপরের সঙ্গে যূথবদ্ধ ছিল, এ-কথা বোঝাতে যে, এর প্রতিটি আমাদের অর্জন, এবং এর প্রতিটি এখন আক্রান্ত। মেঝের কেন্দ্রে অাঁকা ছিল লাল রঙের একটি বৃত্ত।  কাউকে বুঝিয়ে বলতে হয়নি, কারো পক্ষে বোঝা কঠিন ছিল না যে, এই লাল রং চাপাতির আঘাতে নিহত অভিজিতের রক্তের চিহ্ন। এই বৃত্ত প্রমাণ করে হত্যার টার্গেট হিসেবে তাঁকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু অভিজিত কোনো একজন মাত্র মানুষ নন, তাঁর মতো আরো অনেকে রয়েছেন, যাঁরা ধর্মান্ধ ও কূপমন্ডূক ব্যক্তিদের ‘টার্গেট লিস্ট’-এ আছেন। সে-কারণে সাত স্তম্ভের কেন্দ্রে বৃত্তাবদ্ধ রক্তচিহ্নের এই প্রতীকী নির্মাণ। সে-রক্তমাখা বৃত্ত আমাদের একাত্তরের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে এ-কথাও বুঝিয়ে বলেছে, একাত্তরের শকুনিরা এখনো তৎপর।  তাদের ঠেকাতে হলে এখনই এক হও, আওয়াজ তোলো, প্রতিরোধ করো।

বেদনা ও আশাভঙ্গের এক কাহিনির পুনর্নির্মাণ এই শিল্পকর্ম, অথচ ঘরজুড়ে বেদনা ও পরাজয়ের বদলে ছিল আশা ও সম্ভাবনার আসন্ন উদযাপনের এক উদ্ধত উচ্চারণ। এই আশার ভাবনাটি সুচারুভাবে প্রকাশের জন্য মিথুন আহমেদ চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছিলেন স্বচ্ছ কাচের ভেতর রাখা মোমবাতি। অভিজিৎ এবং অভিজিতের মতো আরো অসংখ্য নাগরিক বীরের স্মৃতির প্রতি নিবেদিত সে-মোমবাতি, যাঁরা আলো হাতে চলেছিলেন নিজের মুক্তচিন্তাকে চতুর্দিকে ছড়িয়ে দিতে।  স্বচ্ছ কাচের পাত্র ভেদ করে ঠিকরে বেরুচ্ছিল যে-আলো, তা আমাদের বলে দেয় অাঁধার ঘুচে যাচ্ছে। কিন্তু এই আলো মোমবাতির, দমকা হাওয়ায় সে নিভে যেতে পারে। তাকে টিকিয়ে রাখতে চাই অহর্নিশ জাগরণ। আলোর কাছে সর্বদাই ভীত অাঁধার, কিন্তু সেজন্য চাই এই আলোকবর্তিকাটি তুলে নেওয়া।

অনুষ্ঠানটি গঠিত হয়েছিল দর্শকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ মাথায় রেখে। কাউকে কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি, কোনো কোরিওগ্রাফার ছিলেন না, যিনি বলে দেবেন এখন আপনাকে কী করতে হবে। অথচ প্রায় সকল দর্শক নিজ আগ্রহে মাটি থেকে তুলে নেন কলম বা তুলি, দেয়ালের সাদা কাগজে এঁকে তোলেন নিজের পছন্দমতো ছবি, অথবা কেউ লেখেন নিজের প্রতিবাদের কোনো বক্তব্য। অল্পক্ষণের মধ্যে একটি পুরো দেয়াল হয়ে ওঠে নাগরিক প্রতিবাদের এক অবিশ্বাস্য ম্যুরাল। হয়তো সুচারু ছিল না সে-অঙ্কন, সর্বদা নির্ভুল ছিল না প্রতিবাদের সে-অক্ষর নির্মাণ, কিন্তু প্রতিটি রেখায় মূর্ত ছিল নাগরিক প্রত্যয়ের বিভাস।

সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে কালো কাপড়ে মোড়া গ্রন্থগুলো অবমুক্তায়নের সময়। পূর্বনির্ধারিত পাঠক এক-এক করে সে-গ্রন্থ অবমুক্ত করে সেখান থেকে নিজের পছন্দের কয়েক ছত্র পাঠ করে শোনালেন। তারপর, সম্পূর্ণ অপরিকল্পিত ও অপ্রত্যাশিতভাবে সে-অবমুক্তায়নে যুক্ত হলেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রায় প্রতিটি দর্শক।  তারাও যাঁর যাঁর স্থান থেকে বলে গেলেন কোনো প্রিয় কবিতার লাইন, কোনো প্রিয় পঙ্ক্তি, অথবা কোনো গানের কলি। কেউ একজন যখন খোলা গলায় গান ধরলেন ‘মুক্ত কর প্রাণ’, তার সে-উচ্চারণ উপস্থিত প্রতিটি নাগরিকের চৈতন্যে প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে গেল। আমরা এই বোধে সঞ্চারিত হলাম, যে-লড়াই আমাদের সামনে, তাতে বিজয়ী হওয়া ভিন্ন অন্য কোনো বিকল্প আমাদের নেই। বিজয়ী হতে হলে আমাদের হাতে হাত রাখতে হবে, তুলে নিতে হবে ওই নিভু-নিভু আলোকরেখা, যা আমাদের সাহায্য করবে পথ চলতে।

বাঙালি আঘাত পেয়েছে বারবার, কখনো বিদেশির হাতে, কখনো দেশি শত্রুর হাতে। নতুন মোড়কে, নতুন আবরণে সে-শত্রু এখনো তৎপর।  প্রতীকী অথচ মূর্ত এই স্থাপনাশিল্পের ভেতর দিয়ে মিথুন আহমেদ আমাদের তাকে ঠেকানোর জরুরি তাগিদ দিয়ে গেলেন।  এভাবে শিল্প হয়ে উঠল নাগরিক প্রতিবাদ ও শপথের সম্মিলিত উচ্চারণ।

১ মে ২০১৫

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার