সোয়াজিল্যান্ডে ভ্রমণ হাউস অন ফায়ার

লেখক:

House-on-fire_Gateমঈনুস সুলতান

আমার আজ কোনোকিছু করার কোনো তাড়া নেই, তাই অনেকটা সময় নিয়ে ধীরেসুস্থে হাউস অন ফায়ারের দেয়ালটি দেখি। এর কেল্লার মতো করে স্থানীয় স্থপতি ও কলাকারদের হাতে গড়ার কায়দা দেখে ওয়ালটিকে বরং প্রাচীর বলাই সংগত। তার গায়ে নতশির হয়ে কতগুলো মূর্তি গভীর চিন্তায় মগ্ন। অর্ধভগ্ন হয়ে কয়েকটি প্রতিমা খামোকা ছড়িয়ে আছে আঙিনায় স্রেফ ভাস্করের খামখেয়ালে। আর দেয়ালে কিছু বাতায়নে স্থপতি অ্যায়সা কেরেসমাতি দেখিয়েছেন যে, সেখানে শিকের পরিবর্তে শোভা পাচ্ছে মানবিক ইশকের প্রতীক হৃদয়ের নকশা। একটি স্তম্ভের ওপরে দাঁড়ানো পরী। শিঙ্গা দিয়ে বোধকরি ফেরেশতাদের উদ্দেশে দেওয়া হচ্ছে এলান। পাশের আরেকটি ক্ষুদ্র স্থাপত্যকে দেখায় অবিকল মসজিদের মিনারের মতো। পাথর কুন্দে গড়া হজরত আদম (দ.)-এর ফরজন্দদের বেজায় দীর্ঘসব আকৃতি এমনভাবে নতশির হয়ে আছে যে, ঠিক বুঝতে পারি না তারা কি বিষাদগ্রস্ত, নাকি সন্ত্রস্ত শিরোশ্ছেদের সম্ভাবনায়। হয়তো স্রেফ শরম পেয়েছে, গন্দম জাতীয় কিছু চুরির ব্যাপার আছে, তাই মূর্তিগুলো মরমে মরে আছে।

সোয়াজিল্যান্ডের মবুবান শহরে পর্যটন করতে এলে গতরে আগুনের আঁচের মতো এসে লাগে হাউস অন ফায়ারের খোশনাম। যারা এখানে এক দফা ঘুরে গেছেন, তারা অনুপম এ-স্থাপনার আলোকচিত্রে প্রণাম করে ইমোশনে আর্দ্র হতে হতে আচানক এ-ইমারতকে অভিহিত করেন ‘অ্যান অ্যানচ্যানটিং স্পেস’ বা ‘জাদুময় জগৎ’ হিসেবে। আর হিপি তরিকার ব্যাকপ্যাকারদের মাঝে যাদের কবিতার ধাত আছে, তাঁরা এ-অট্টালিকাকে প্রকাশ করেন টুকটাক পদ্যে ‘বেস্ট হাউস ইন দ্য গ্রাউন্ড/ অ্যা রিয়েল বিউটি অলঅ্যারাউন্ড।’ হাউস অন ফায়ারের তারিফকে ঠিক বেফজুল বলা চলে না, এসব মন্তব্যের বুনিয়াদ যে বেশ মজবুত, তার পরিষ্কার নিশানা পাই অশোকস্তম্ভের কায়দায় গড়া একটি কলামের কাছে আসতেই। স্তম্ভটির গোড়ায় গা-ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে বাটকুল গোছের কয়েকটি বদখত মূর্তি। তার পাশেই প্রস্তরফলকের কায়দায় উৎকীর্ণ করা হজরত জালালুদ্দিন রুমির একটি মসনবির ইংরেজি তর্জমা। তাতে লেখা – ‘আই অ্যাম অনলি দ্য হাউস অব ইয়োর বিলাভড/ নট দ্য বিলাভড হারসেল্ফ…।’ অর্থাৎ ‘আমি তোমার প্রেমাস্পদ নই, স্রেফ তার বাসগৃহ…।’

এ লবজের সামনে দেখি, দুখানা ক্র্যাচে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে বোমবাসো ব্যাকপ্যাকার লজে বাস করা এক সাঙ্গাত। তার নাম মি. ভেগার্ভ। আদি নিবাস নরওয়ের একটি ছোট্ট শহর গ্রিমস্ট্যাডে। তার জামাকাপড় অত্যন্ত হেগার্ড, ছেঁড়াখোঁড়া ধূলিমলিন ড্রিল স্যুট, গতর থেকে বেরোচ্ছে অ্যালকোহল, টোব্যাকো ও ঘামের কড়া বদবু। তিনি কপাল কুঁচকে বিড়বিড় করে মৌলানা রুমির মসনবির চরণটি পাঠ করে আতান্তরে পড়ে যান। আমাকে দেখতে পেয়ে বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘তবে কি এরা বলতে চাচ্ছে হাউস অন ফায়ারের ফ্যান্টাসি এনভায়রমেন্ট হচ্ছে প্রেমাস্পদের গৃহ, এখানে কায়দামতো খুঁজতে পারলে তার নাগাল পাওয়া যাবে?’ আমি তার ব্যাখ্যাকে সমর্থন করে বলি, ‘দ্যাটস ইট মি. ভেগার্ড, লেটস মুভ অন, খানিক সামনে গিয়ে যার ইশকে মাতোয়ারা হতে চাই তাঁকে বরং তালাশ করি।’ তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। একাধিক ব্যাকপ্যাক ও একটি আস্ত ডাক্তারি ঝোলা ক্যারি করছেন, তাতে আছে প্লাস্টিকের ছোট্ট একটি কংকাল।  খানিকটা নাজেহাল দেখায় এসব সামলাতে গিয়ে তাকে। অতঃপর দুখানা ক্র্যাচে ভর দিয়ে তিনি খ্যাঁচম্যাঁচ শব্দ করে আগ বাড়েন। একটু সামনে গিয়ে অাঁতকা দাঁড়িয়ে পড়ে ছোট্ট নোটবুক বের করে ঠুকে নেন সুফি-সন্ত রুমির চমৎকার চরণটি। দেহে ভারসাম্যের বেজায় খামতি আছে বলে দাঁড়িয়ে কলম দিয়ে লেখা তার জন্য মুশকিল হয়। তিনি একখানা ক্র্যাচ বগলে চেপে লিখতে গেলে তা পাইপের ডগায় বাড়ি খায়, তাতে চারদিকে ছিটকায় ছাইকনা ও আধপোড়া টোব্যাকোর কুঁচি।

মি. ভেগার্ড মৌলানা রুমির মসনবি মনোযোগ দিয়ে টুকে নিচ্ছেন দেখে আমি তাজ্জব হই। দিনকয়েক হয় তিনি মোজাম্বিকের চিকওয়ালাকুয়ালা শহর থেকে বাঝ-বাসে চেপে সোয়াজিল্যান্ডে এসেছেন। বোমবাসো ব্যাকপ্যাকার্স লজের ডরমিটরিতে আমার পাশে বাংক-বেডে বাস করছেন। ভিন দেশে ভ্রমণের সময় বিচিত্রসব কার্স ওয়ার্ড বা গালাগাল সংগ্রহ করার বাতিক আছে তার। অবসর সময়ে ‘ব্লাডি, বোহেনচ্যুত’ কিংবা বুয়ারদের আফ্রিকান্স জবানে ‘নেইয়ার’ অর্থাৎ ‘সঙ্গম করনেওয়ালার’ মতো বিদ্ঘুটে সব লবজ উচ্চারণ করে তিনি পয়দা করেন রীতিমতো সেনসেশন। মসনবিতে তার কোনো প্যাশন থাকার কথা নয়।

হাউস অন ফায়ারের পরিসর বৃহৎ। অনেকগুলো ঘর, ঝুলবারান্দা, পারফরম্যান্স হল, ডিসপ্লে সেন্টার, ক্যাফে, পানশালা ও হরেক রকমের খোলামেলা আঙিনা নানা মাপের করিডর দিয়ে সংযুক্ত। মি. ভেগার্ড আমাকে নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সমস্ত কিছু দেখেন। করিডরে বসে জিরিয়ে নেওয়ার জন্য আছে কাঠের সিংহাসন, কোনো কোনো বেঞ্চের আকৃতিতে শোভা পাচ্ছে স্বর্গের দেবদূতের আদল। আবার কোথাও কারুশিল্পের কারিগররা টাইলস দিয়ে বানানো মোমদানে করে পর্যটকদের কাছে বিক্রি করছেন পানীয়। হাঁটাহাঁটিতে পেরেশান হয়ে মি. ভেগার্ড আঙিনায় পাতা একটি বেঞ্চে বসেন। আসবাবটির সর্বত্র আসমানের একাধিক রাশিচক্রের নকশা অাঁকা। তাতে নক্ষত্রগুলো যেন মানুষের মুখের আকৃতিতে মৃদু হাসছে। মি. ভেগার্ড ফ্লাস্ক বের করে একঢোঁক ব্র্যান্ডি পান করে বিড়বিড় করে বলেন, ‘মোস্ট ইমাজিনিটিভ, ইকলেকটিক অ্যান্ড পিওর বোহেমিয়ান সেটআপ।’ ‘দ্যাট ইজ ট্রু ফর শিওর’ বলে আমি তার মন্তব্যে সায় দিলে তিনি খানিকটা জনান্তিকে আবার বলেন, ‘মনে হয় রাজ্যের সব বাদাইম্যা ভাস্কর, বদমাশ কারুশিল্পী ও বেয়ারা স্থপতিকে জড়ো করে এ-হাউসের একেকটি অংশ ইজারা দিয়ে ব্যাটাদের বলা হয়েছে, তোমাদের পছন্দ অনুযায়ী তৈরি করো দেয়াল, ডিজাইন করো ফ্লোরের মোজাইক, পানি ঝরাও ফোয়ারায়, কিংবা বানাও প্রতিমা। ব্যবহার করো যার যা খুশি স্টাইল। কুচ পরোয়া নেহি। হাউস অল দ্য ফ্রিডম ইউ নিড। মেক অ্যানি ড্যাম থিংক ইউ ওয়ান্ট।’ তিনি একটু পজ নিয়ে আবার বলেন, ‘লুক, অল দিজ ব্লাডি নেইয়ারস, বিল্ড হোয়াট অ্যা ফাইন হাউস অল টুগেদার।’

স্বগতোক্তি শেষ করে তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘তোমার জ্বর কমেছে?’ আমি ইতিবাচকভাবে মাথা হেলালে তিনি সন্তুষ্ট না হয়ে ডাক্তারি ঝোলা থেকে থার্মোমিটার বের করে আমার তাপমাত্রা মাপেন। মি. ভেগার্ডের আরেকটি বাতিক হচ্ছে, ঝোলায় করে ব্লাডপ্রেসার মেশিন ও ‘যেখানে ডাক্তার নেই’ গোছের কয়েকখানা কেতাব ও প্রচুর ওষুধপথ্য নিয়ে ঘোরা। চলার পথে রোগ-ব্যামোতে কোনো পর্যটক সাফার করছে দেখলে তিনি তাদের স্টেথোস্কোপ দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ওষুধপথ্য দেন। কারো পিঠ কিংবা হাঁটুর গাঁটে ব্যথা হলে তিনি প্লাস্টিকের কংকাল বের করে জানতে চান ‘সোর পয়েন্ট’ বা ব্যথা ঠিক কোথায়? তার দুপা বিকলাঙ্গ হলেও হাতদুটি এখনো ঠিকঠাক আছে। হাইকিং করে কোনো পর্যটকের পায়ের গুছি ফুলেটুলে গেলে তিনি মাসল চেপে ধরে মলম মাখিয়ে মালিশও করে দেন অবলীলায়। আমার গত কয়েকরাত ধরে ঘুসঘুসে জ্বর হচ্ছে। আমাকেও তিনি বিনামূল্যে এলাজ দিয়েছেন।

থার্মোমিটারের পারদ চেক করে মি. ভেগার্ড এবার এক প্যাকেট প্যাপরনি বের করে জানতে চান, ‘আর ইউ হাংরি?’ আমি ক্ষুধার্ত হলেও নিষিদ্ধ মাংসে তৈরি প্যাপরনি খেতে চাই না। তাতে বিরক্ত হয়ে মি. ভেগার্ড বলেন, ‘অ্যা বেগার ক্যান্ট বি অ্যা চুজার।’ এ-ভদ্রলোক সারাক্ষণ চকোলেট, চিপস, ক্রিমক্রেকার, সমুসা ও লাবাসকিরি চিজ ইত্যাদি শুকনা খাবার খেয়ে জীবনধারণ করছেন। তাকে কখনো কমপ্লিট মিল খেতে দেখিনি। তিনি স্ন্যাকসের প্যাকেট খুলে বেশ কয়েকবার আমার সঙ্গে শেয়ার করেছেন ড্রাই অ্যাপ্রিকট, ব্রেড স্টিক বা কুকি বিস্কুট। সুতরাং আমাকে ‘বেগার’ সম্বোধন করাতে আমি অসন্তুষ্ট হই না। বরং তাকে নিরিবিলিতে ব্র্যান্ডি পান করার সুযোগ দেওয়ার জন্য আমি আপাতত বিদায় নিই।

দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। আমারও ক্ষুধা পেয়েছে। তাই অন্য একটি আঙিনায় এসে ক্যাফেতে বসি। কমলার তাজা কোয়ার পুর দেওয়া টি-কেকের সঙ্গে আমি চা পান করি। আদম সন্তানের মুখমন্ডলের মতো দেখতে একটি পোড়ামাটির পেয়ালায় পরিবেশিত হয় রয়বস টি। আমি তা চাকুস-চাকুস শব্দে পান করতে করতে মি. ভেগার্ডের কথা ভাবি। আমার ঘুসঘুসে জ্বরের চিকিৎসা তিনি করছেন। কিন্তু তার ব্যাকগ্রাউন্ড ডাক্তারি বা মেডিসিন কিছু নয়। নরওয়ের গ্রিমস্ট্যাড শহরে তিনি কিছুদিন কৃষি কলেজে পড়াশোনা করেন। ক্রমাগত খারাপ রেজাল্টের জন্য কলেজ তাকে জবাব দেয়। তারও আগে স্কুলজীবনে তিনি ড্রপআউট হন বারকয়েক, আবার ফিরে আসেন শিক্ষাক্ষেত্রে; কিন্তু পরীক্ষায় কেবলই ব্যর্থ হতে থাকেন। সামাজিকভাবেও তিনি ছিলেন নরওয়ের সোসাইটিতে মিসফিট। আইন-কানুনের তেমন একটা ধার ধারতেন না বলে বারকয়েক জরিমানা দেন, জেলও খাটেন।

অতঃপর মি. ভেগার্ড সোয়াজিল্যান্ডে আসেন বছরদশেক আগে। অ্যানিম্যাল ফোডার তৈরির ব্যবসায় নামেন। গরু ও মেষের খামারে সাপ্লাই দিচ্ছিলেন জীব-জানোয়ারের খাবার। তখন তার পোলিও রোগে চিরতরে খোঁড়া হয়ে যায় দুটি পা। প্রৌঢ় বয়সের পোলিও খুবই বিরল রোগ। মবুবান শহরের হাসপাতালে তার চিকিৎসা হয় খুব বাজেভাবে। রোগ নির্ণয়ে মারাত্মক ভুল হয়। অপচিকিৎসার ফলে সম্পূর্ণ সুস্থ তিনি হননি। তবে সোয়াজি ডাক্তারদের ওপর বিলা হয়ে বইপত্র পড়ে কিছু সরলসিধা রোগের চিকিৎসাপদ্ধতি শিখে নেন। আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চল ছেড়ে তিনি আর নরওয়েতে ফিরে যাননি। বর্তমানে মি. ভেগার্ড পাশের দেশ মোজাম্বিকের চিকওয়ালাকুয়ালা শহরের ইরিগেশনের ওপর ছোটখাটো কনসালট্যান্সি করছেন। খুবই সাময়িক পেশা। অবসরে অনেকগুলো ব্যাকপ্যাক পিঠে ফেলে সস্তায় বাসে চড়ে ঘুরে বেড়ান এ-অঞ্চলের সর্বত্র। বছরে একবার করে আসেন সোয়াজিল্যান্ডে। ক্র্যাচ তার চলার গতিকে শ্লথ করে দেয়নি। গতকাল আমার সঙ্গে সম্পূর্ণ খোঁড়া মি. ভেগার্ড সিবেবে রক পাহাড়ের চূড়া অবধি পৌঁছেছিলেন। সিবেবে রকের হাইক ছিল বেশ ডিমান্ডিং। আমরা হাঁটতে হাঁটতে মাঝপথে বারকয়েক থেমে জিরিয়ে নিচ্ছিলাম। তখন টুকটাক কথা বলে তার জীবন সম্পর্কে বেশ খানিকটা জেনেছিলাম।

চলে আসি অন্য আরেকটি আঙিনায়। এখানে পাতা বেঞ্চগুলো আমাকে আকর্ষণ করে তুমুলভাবে। একটি বিচিত্র বেঞ্চে এর বাঁদিকে গোলাপি হরফে লেখা ‘লাভ স্টেশন’ আর ডানদিকে ‘ওয়ান স্টপ অনলি’। এ-বাক্য দুটি আদতে কী বোঝাতে চাচ্ছে তা ভাবতে গিয়ে দেখি অন্য আরেকটি বেঞ্চে বসে অঞ্জু আরনা। তার সামনের টি-টেবিলে চড়ছে গোটাসাতেক শালিকের ছোট ছোট মূর্তি। তার সঙ্গে হাউস অন ফায়ারে ঢোকার মুখে তোরণের কাছে দাঁড়িয়ে সামান্য  কথাবার্তাও হয়েছে। আরো একটু বাতচিত করা অসংগত কিছু হবে না আন্দাজ করে দুপা এগিয়ে যাই। তার হাতে খোলা রূপকথার চিত্রিত শিশুতোষ বইটি। পাশে রাখা আয়নার মতো ট্রান্সপারেন্ট একটি ব্যাকপ্যাক। অঞ্জু তার ভেতরে রাখা টেডি-বেয়ারের দিকে ধুন ধরে তাকিয়ে আছে। আমি কাছাকাছি হতেই সে গ্রীবা ঘুরিয়ে তাকায়। বাগিচায় অলংকার হিসেবে রোপণ করা একটি কলার ঝাড়ের ভেতর দিকে তার চোখেমুখে এসে পড়েছে সূর্যের তেরছা আলো। তার তীব্র কালো গাত্রবরণে তাতে ছড়িয়ে পড়ছে ডিমের কুসুমের আভা। অঞ্জু মৃদু স্বরে ‘হোয়াটস আপ’ বললে আমি নিমেষে নির্ণয় করতে যাই তার নৃতাত্ত্বিক অরিজিন। তাকে ঠিক তামিল নারীদের মতো দেখাচ্ছে না? তবে কি সে গুজরাটি। আমি অাঁতিপাঁতি করে বলি, ‘ওয়ানা হ্যাং আউট উইথ মি অ্যা বিট অঞ্জু?’ জবাবে সে প্রশ্রয়ের হাসি হেসে বলে, ‘আই ডোন্ট নো রিয়েলি।’ আমি ‘ও-কে দেন’ বলে একটু দূরে এসে আরেকটি বেঞ্চে বসলে সে উঠে এসে আমার পাশে বসতে বসতে বলে, ‘দিস ইজ সেকেন্ড টাইম, তুমি আমার সঙ্গে কথা বলার জন্য অ্যাপ্রোচ করেছ।’ আমি জবাব দিই, ‘দ্যাট ইজ রাইট। আমার কৌতূহল হচ্ছে, তোমার নামের প্রথম অংশ ‘অঞ্জু’ শব্দের অর্থ জানতে। তুমি তো অলরেডি বলেছ, ‘আরনা’ শব্দের অর্থ গডেস লাক্সমি। এবার কাইন্ডলি বলবে অঞ্জু শব্দে আদতে কী বোঝায়?’ সে সপ্রতিভভাবে জবাব দেয়, ‘গুজরাটি ভাষায় অঞ্জু শব্দের অর্থ হচ্ছে – ওয়ান হু লিভস ইন দ্য হার্ট। আর ইউ স্যাটিসফাইড নাও?’ আমি একটু দ্বিধার সঙ্গে বলি, ‘ইয়েস, এর বেশি কিছু জানতে চাওয়া বোধকরি সঠিক হবে না।’ আমার মন্তব্য শুনে সে আবার গ্রীবা বাঁকিয়ে তাকায়। তার চোখেমুখে কেমন যেন একটি লতা নীরবে খুঁজছে বৃক্ষশাখায় এ-ধরনের অভিব্যক্তি খেলে যায়। আমি ধৈর্য ধরে নিশ্চুপ থেকে তাকে লিড নেওয়ার সুযোগ করে দিই। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমার নীরবতায় উত্ত্যক্ত হয়ে বলে, ‘সো কাইন্ডলি টেল মি, হোয়াট ইট ইজ দ্যাট ইউ ওয়ান্ট টু নো অ্যাবাউট মি?’ জবাব আমার মনে তৈরিই ছিল, তাই সরাসরি জিজ্ঞেস করি, ‘হু ইজ লিভিং ইন ইয়োর হার্ট রাইট অ্যাট দিস মোমেন্ট? এখন কার কথা ভাবছ তুমি অঞ্জু? তোমার হাতে বাচ্চাদের পড়ার বই, ব্যাকপ্যাকে টেডি-বেয়ার? হোয়াট ইজ ইট অল অ্যাবাউট?’

নৌকা থেকে নামার সময় মানুষ যেরকম চরে এক পা দিয়ে দেখে নেয় নিচের মাটি কতটা শক্ত, সেরকম অঞ্জু আরনা নীরবে আমাকে মাপজোখ করে, বোধকরি ভাবে বলা কতটা সঠিক হবে। আমার আজ কোনো তাড়া নেই, তাই বড়শি ফেলা মানুষের মতো চুপচাপ বসে থাকি। ট্রান্সপারেন্ট ব্যাকপ্যাকের জিপার খুলে টেডি-বেয়ারটি স্পর্শ করে তার তুলতুলে পশমে হাত বোলাতে বোলাতে অঞ্জু বলে, ‘এ খেলনাটি এলসা জোহানসনের। নয় বছর আগে আমি যখন তার বেবিসিটার হিসেবে কাজ করতাম, তখন রূপকথার এ-বইটি তাকে বারবার পড়ে শোনাতাম। এক বছরের বাচ্চা মেয়ে এলসা গল্পের কিছু বুঝত না, কিন্তু পড়লে কান্না বন্ধ করে দিয়ে বড়বড় নীল চোখ মেলে তাকিয়ে থাকত। তার তৃতীয় বার্থডেতে আমি তাকে এ টেডি-বেয়ার উপহার দিই। জোহানসন দম্পতি পশমের ভালুকটিকে নেলী নামে ডাকতেন। সুইডিশ ভাষায় নেলী শব্দের অর্থ হচ্ছে টেডি-বেয়ার। এলসা নেলীকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে পছন্দ করত। তারপর তো অনেককিছু…। আমি কিন্ডারগার্টেনের টিচার হলে এলসা প্রি-স্কুলে ভর্তি হয়। প্রি-স্কুল ছাড়াও তাকে আবার ক্লাসটিচার হিসেবে খুব কাছে পাই সে যখন থার্ড গ্রেডে ওঠে।’

অঞ্জু বেশ কিছুটা সময় নিয়ে কী যেন ভাবে। তারপর পার্স থেকে বের করে আমার হাতে ধরিয়ে দেয় দক্ষিণ আফ্রিকার একটি লোকাল নিউজপেপারের কাটিং। ছোট্ট এক কলামের সংবাদটি আমি পড়ি। আজ থেকে বছরতিনেক আগে তার বাড়ির সামনে থেকে সাত বছরের এলসা জোহানসন কিডন্যাপ হয়। খবরে কারাগার থেকে চার বছর আগে ছাড়া পাওয়া এক সেক্স অফেন্ডারের শিশুকামসুলভ লালসা, ধর্ষণ ও মার্ডারের উল্লেখ আছে। তথ্যটি খুব ট্র্যাজিক, অত্যন্ত দুঃখজনক ও ভয়াবহ। তবে আমি তেমন একটা অবাক হই না। বছরকয়েক হলো আমি আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলে বাস করছি। এ-অঞ্চলে, বিশেষ করে সাউথ আফ্রিকায় এ-ধরনের সেক্স-ক্রাইম এত বেশি যে, পত্রিকায় এ-ধরনের ঘটনার বিবরণ ছাপে আকছার।

অঞ্জুর সঙ্গে আমার মাত্র ঘণ্টাদেড়েকের পরিচয়। তার বেদনা আমি বুঝতে পারি, তবে সহানুভূতি জানালে হয়তো তা কপট শোনাবে; আর বিষয়টি এতই দুঃখজনক যে, ঠিক বুঝতে পারি না – কী বলব। অঞ্জু নিজে থেকে নীরবতা ভেঙে বলে, ‘জোহানসন দম্পতি আদতে সুইডেনের লোক। দক্ষিণ আফ্রিকার গলেলা শহরে তারা একটি খামার কিনেছিলেন। এলসার মৃত্যুর পর তারা ফার্মটি বিক্রি করে দিয়ে চলে গেছেন কেপটাউনের দিকে। স্মৃতি পীড়া দেবে, তাই তারা এলসার ব্যবহৃত সব জিনিসপত্র একটি এতিমখানায় দান করে দেন। গলেলা শহর ছেড়ে যাওয়ার দিন তারা এলসার প্রিয় এ-বইটি ও টেডি-বেয়ার নেলী আমাকে স্মারক হিসেবে দেন।’

অঞ্জুর এ-বক্তব্য থেকে শিশুতোষ বই ও খেলনা ভালুক সম্পর্কে একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। তবে এতে কিন্তু তার এসব জিনিসপত্র নিয়ে হাউস অন ফায়ারে আসার বিষয়টি পরিষ্কার হয় না। একটু নীরবতার পর অঞ্জু নিজেই রহস্য ভেঙে খোলাসা করে বলে, ‘গলেলা শহর সোয়াজিল্যান্ডের সীমান্তে। ড্রাইভ করে আসতে মাত্র ঘণ্টাখানেক সময় লাগে। আমি মাঝে মাঝে কিন্ডারগার্টেনের অন্য বাচ্চাদের নিয়ে ফিল্ডট্রিপে সোয়াজিল্যান্ডে এসেছি। বাচ্চারা হাউস অন ফায়ারে আসা খুবই পছন্দ করত। আমি হাউসে ডিসপ্লে করা অনেক আর্ট অবজেক্টের স্লাইড করেছিলাম। থার্ড গ্রেডের ক্লাসে স্লাইডগুলো দেখালে এলসা এখানে আসতে চায়। সে বারবার আমাকে তাড়া দিয়ে বলত – মিস, কবে তুমি আমাকে হাউস অন ফায়ারে নিয়ে যাবে? আমি ফিল্ড ট্রিপের আয়োজন করি? কিন্তু সেদিন তাদের গাড়ি খারাপ থাকায় এলসা স্কুলে আসতে পারে না। সে টেলিফোন করলে আমি তাকে তার আয়ার সঙ্গে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে বলি। আমি তো অন্যদের নিয়ে ড্রাইভ করে ওদিক দিয়ে যাচ্ছি সোয়াজিল্যান্ডের বর্ডারে। তাকে পথে পিক করে নিতে অসুবিধা কী? তো এলসা তার আয়ার সঙ্গে সড়কে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। হঠাৎ খেয়াল হয় যে, সে তার টেডি-বেয়ার নেলীকে ঘরে ফেলে এসেছে। নেলীকেও সে হাউস অন ফায়ারের রকমারি সব আর্ট অবজেক্ট দেখাতে চায়। আয়া তাকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে নেলীকে আনার জন্য ফিরে যায় বাড়ির ভেতরে। সে নেলীকে খুঁজে পাচ্ছিল না বলে তার একটু দেরি হয়। মিনিটদশেক পরে নেলীকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে আয়া দেখে, সড়কে এলসা নেই। আমি পেট্রোল পাম্পে থেমেছিলাম বলে আমিও সময়মতো পৌঁছতে পারিনি তার বাড়ির সামনে। এ সামান্য মিনিটদশেক সময়ই কাল হলো। এক সেক্স-অফেন্ডার গাড়ি ড্রাইভ করে এসে তাকে কিডন্যাপ করে নিয়ে যায়। এলসার মা-বাবা দুজনেই তখন ফার্মের কাজকর্ম দেখছেন।’

অঞ্জু এবার জানতে চায়, আমি কি জাতিস্মর বা পুনর্জন্মে বিশ্বাস করি? আমি নির্দিষ্ট কোনো জবাব না দিলে সে নিজে থেকেই বলে, ‘আই ডোন্ট রিয়েলি নো, ইফ আই বিলিভ ইট অর নট। তবে আমরা দক্ষিণ আফ্রিকার গুজরাটি হিন্দু, আমাদের পরিবারে পুনর্জন্ম জাতিস্মর এসব নিয়ে সংস্কার আছে। মাঝে মাঝে আমি স্বপ্নে দেখি এলসা বলছে – মিস, নট টু ওয়ারি। আমি তো আবার জন্মাবো, তারপর একটু বড় হলে চলে যাবো হাউস অন ফায়ারের ফ্যানটাসটিক সব জিনিসপত্র দেখতে।’ অঞ্জু একটু পজ নিয়ে আবার বলে, ‘প্রতিবছর তার কিডন্যাপ হওয়ার দিনে আমি হাউস অন ফায়ারে আসি। বইতে পড়েছি যে, জাতিস্মর হওয়া বাচ্চারা তাদের আগের জন্মের জিনিসপত্র দেখলে চিনতে পারে। তাই রূপকথার বইখানা আর খেলনা টেডি-বেয়ার নিয়ে এখানে আসি। বসে থাকি। নতুন করে জন্মালে তার দৈহিক আকার-আকৃতি গাত্রবর্ণ সব বদলে যাবে। কিন্তু তার চোখমুখের দিকে তাকালেই আমি তাকে চিনতে পারব।’

অঞ্জু এবার কী যেন এক আগ্রহ নিয়ে আমার দিকে তাকায়। রেসপন্সে আমি নীরব থাকলে সে উঠে পড়ে বলে, ‘নাইস টকিং টু ইউ।’ আমি বলতে চাই, ‘সি ইউ অ্যাগেইন অঞ্জু’; কিন্তু আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সে তার একহারা দেহ নিয়ে দ্রুত হেঁটে যায় বাগিচায় সৌখিন কলাগাছের ঝাড়ের আড়ালে।

আমিও উঠে হরেক কিসিমের কারুপণ্যে সুসজ্জিত হাউস অন ফায়ারের করিডর ধরে হাঁটি। একটি বিষয় ভেবে খুবই অবাক লাগে যে, একটি মেয়েশিশুর দেহ এবং তার জীবনের ওপর হিংসাত্মক আচরণের কাহিনি শুনেও আমি কিরকম নিরাসক্ত আছে? এ নির্লিপ্ততা কি ক্রাইম নয়? এবার সচেতনভাবে তীব্র গ্লানি বোধ করি। ফ্রিজের বাইরে সারারাত রেখে দেওয়া কাচ্চি-বিরিয়ানির বাজে গন্ধের মতো একধরনের অপরাধবোধে ছড়ায় অস্বস্তি। চকিতে আমি গলেলা শহরের অচেনা সেক্স-অফেন্ডারের কথা ভাবি। এ ধরনের ক্রাইম সে করেছে অনেকবার। তার আপত্তিজনক ভায়োলেন্ট আচরণে হয়তো জন্ম হয়েছে একটি কন্যা-শিশুর। সে-বাচ্চাটিও কি কোথাও শিকার হচ্ছে আমার নিজস্ব প্রজাতি আরেক পুরুষের হিংসাত্মক প্রবণতার?

হাউস অন ফায়ারে আমি গ্লানি ও অস্থিরতা নিয়ে ঘুরপাক খাই বিকেল অবধি। একজন আধকানা শিল্পী শশা, মিষ্টি কুমড়া ও কুডু হরিণের মাটির মূর্তি বিক্রি করার জন্য খুব জোরাজুরি করেন। তাকে পাশ কাটিয়ে আমি চলে আসি ক্লক টাওয়ারের মতো করে গড়া একটি মিনারের পাশে। দেখি বোমবাসো ব্যাকপ্যাকার্স লজের আরেক গেস্ট অ্যানমারি ডানকান তার বাঁধানো গোঁড়ায় বসে মগ্ন হয়ে আছেন বিপাসনা মেডিটেশনে। তার পেছনে পরীর মূর্তির আবডালে টিটি-টিভটিভ করে একমনে ডেকে চলেছে বোধকরি একটি টিট্টিভ পাখি। কাছেই একটি বেঞ্চে বসে আমি অ্যানমারির ধ্যান ভাঙার জন্য অপেক্ষা করি। অ্যানমারি বোমবাসোতে এসে উঠেছেন মাত্র দিনতিনেক আগে। পয়সাওয়ালা পর্যটক তিনি। এসেছেন আমেরিকার মিশিগান থেকে। আমাদের মতো ডরমিটরির বাংক বেডে বাস না করে তিনি ভাড়া নিয়েছেন আস্ত একটি প্রাইভেট রুম। যানবাহন হিসেবে হাঁকিয়ে বেড়াচ্ছেন সাউথ আফ্রিকা থেকে রেন্ট করা ঝকঝকে এসইউভি।

বোমবাসো ব্যাকপ্যাকার্সের লাউঞ্জে তার সঙ্গে আমার কথাবার্তা হয়। আমি একা বসে মাইন্ডফুল মেডিটেশনের ওপর একটি বই নাড়াচাড়া করছিলাম। তার ওপর আমার দীর্ঘ চুলদাড়ি দেখে তার ধারণা হয়েছে, আমি নির্ঘাত কোনো এক সাঁইবাবার সাক্ষাৎ মুরিদ। অ্যানমারি আমার সঙ্গে ভারতীয় ফিলোসফি নিয়ে বাতচিত করতে চাইলে আমি কৃষ্ণ মেননের লেখা একটি গ্রন্থের ওয়েবসাইট থেকে ডাউনলোড করা কয়েকটি পৃষ্ঠার প্রিন্ট আউট ধরিয়ে দিই। মহিলা সম্ভ^বত তা পাঠ করেছেন এবং তার ধারণা হয়েছে যে, আমার বুদ্ধিসুদ্ধি আকল-পছন্দ যথেষ্ট, জ্ঞান-প্রজ্ঞাও প্রচুর। আমিও ভান করেছি, নিজে যে নেহাত গন্ডমূর্খ তা খোলাসা করে ঘোষণা করার কোনো উদ্যোগ নিইনি।

সন্ধ্যাবেলা তিনি আমাকে ডিনারে দাওয়াত করেন ইডল্যাডলোনি নামের একটি সোয়াজি রেস্তোরাঁয়। ইডল্যাডলোনি শহরের প্রান্তিকে মোভোবু ওয়াটার-ফলের কাছে। ওদিকে বাঝ-বাসের কোনো রুট নেই বলে আমার কখনো যাওয়া হয়নি। আর কপালে খাদ্যযোগ আছে দেখে আমি খদ্দরের কোর্তা-পাজামা পরে আতর মেখে তার এসইউভিতে সওয়ার হই। রেস্তোরাঁটির নাম খটমটে হলেও এর লোকেশনটি চমৎকার। নদীর পাড়ে লণ্ঠন ঝুলানো গাছের ডালের নিচে পাতা টেবিলে বসে আমরা সোয়াজিকেতায় রান্না করা ভেজিটেরিয়ান ডিশের স্বাদ চাখি। অ্যানমারি পাইনাপেল জুসের সঙ্গে মিশিয়ে পান করেন প্রচুর পরিমাণে উমকমবতসি নামের স্থানীয়ভাবে চোলাই করা পানীয়। এতে তার কথা বলার ব্যামো বেড়ে যায় বিঘতভাবে। ডিনার শেষে আমরা রেস্তোরাঁ থেকে লণ্ঠন ধার করে নিয়ে হেঁটে যাই মোভোবু জলপ্রপাতের কাছাকাছি। এ সুযোগে মহিলা তার জীবনের অনেক বিষয়ই আলাপ করে ফেলেন। ভবিষ্যতে তার সঙ্গে আলাপের আর কোনো মওকা না এলে আমার আফসোসের কিছু নেই।

যতটা জেনেছি, গত সাত বছরে অ্যানমারি বিবাহিত হয়েছেন মোট চারবার। তার কোনো এক স্বামী ছিলেন সংগীতশাস্ত্রে কলাকার, অন্যজন ছিলেন সম্পূর্ণ উন্মাদ। তার সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ করার কোনো কুদরত ছিল না, কারণ তিনি সর্বদা ক্যারি করতেন পিস্তল; কিন্তু আদতে দুর্বল ছিলেন মানসিকভাবে এ-ভদ্রসন্তান। অবশেষে জগৎসংসার থেকে পরিত্রাণ পান তিনি আত্মহত্যা করে। তার ডিভোর্সের কাহিনিগুলো ফিকশনের চেয়েও মন্ত্রমুগ্ধকর। অ্যানমারি যে অ্যাডিকশনে নিমগ্ন হন, এসব ঝঞ্ঝাটে তাও ছিল খুবই মারাত্মক। বছরদেড়েক তিনি কোকেনের কুয়াশায় ছিলেন দস্ত্তরমতো কুলহারা। কিছুদিন আগে তিনি মিশিগানের এক ডিটক্সিফিকেশন প্রোগ্রাম বা মাদকমুক্ত হওয়ার কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে বেরিয়ে এসেছেন সাফসুতরা হয়ে। ইদানীং তিনি ক্লিনভাবে দিন যাপনের কোশেশ করছেন।

মিশিগানের যে ছোট্ট শহরে তার বসতবাটি, সেখানে তার কয়েকটি সেহেলিও জুটেছিল, যারা সর্বদা চড়তে ভালোবাসে ড্রাগসের দুরন্ত ড্রাগন। তার জীবনযাপনে যন্ত্রণা বাড়লেই তারা কুমন্ত্রণা দিত। তিনি মাসছয়েকের জন্য সেহেলিদের সংশ্রব থেকে দূরে থাকতে চাচ্ছেন। তাই চলে এসেছেন আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলে। প্রথমে এক সপ্তাহ কাটিয়েছেন অ্যানমারি সাউথ আফ্রিকায়। কোকেনের নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষ্যে বিকল্প হিসেবে তিনি সেখানে তার দেহে প্রচুর পরিমাণে অ্যাড্রেনেলিন তৈরির উদ্যোগ নেন। অ্যাড্রেনেলিন হচ্ছে মানবদেহের অত্যন্ত শক্তিশালী একটি হরমোন। মানুষ স্নায়বিকভাবে উত্তেজক বা উদ্বেগপূর্ণ পরিস্থিতিতে পড়লে দেহ থেকে নিসৃত হয় এ-হরমোন।  তিনি সাউথ আফ্রিকার একটি নদী একা ডিঙি বেয়ে অতিক্রম করেন। তার নৌপথের দুধারে ছড়ানো আধভাসা পাথরের ওপর বসে ছিল নয়টি কুমির। অত্যন্ত আতঙ্কজনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যখন তিনি কুমিরগুলোর ছবি তুলতে যান, তখন সচেতনভাবে অনুভব করেন যে, তার করোটিতে উঠছে অ্যাড্রেনেলিনের ঝড়। পরদিন তিনি হেলিকপ্টার থেকে ঝাঁপ দেন। তার স্নায়ুতে এতই অ্যাড্রেনেলিন রাশ হচ্ছিল যে, তিনি প্যারাসুটের বোতাম টিপতে বেমালুম ভুলে যান। ফ্রি-ফলে বেশ খানিকটা নেমে পড়ার পর তার বোতাম টেপার কথা মনে আসে। আর ‘ও মাই গড, হেল নো …, যেশাস’ আওয়াজ তুলে চমকে যাওয়ার মুহূর্তে তিনি পৌঁছে যান অ্যাড্রেনেলিন রাশের তুঙ্গে।

সোয়াজিল্যান্ডে এসে অ্যানমারি অবশ্য কোকেনের তীব্র তাড়নাকে মোকাবেলা করছেন অন্যভাবে। তিনি তার শরীরে  তৈরি করছেন এনডরফিন। প্রচুর পরিমাণে ব্যায়াম করলে অথবা সঙ্গমে সফল হলে শরীর আপনাআপনি প্রস্ত্তত করে এনডরফিন। ভালোবাসার সময় মানুষ অনুভব করে যে অনির্বচনীয় সুখ, তাও সৃষ্টি হয় এনডরফিনের কল্যাণে। হালফিল গবেষকরা জানাচ্ছেন যে, মেডিটেশন করে দেহমনে তৈরি করা যায় এনডরফিন। সোয়াজিল্যান্ডে আসা অবধি অ্যানমারি লিপ্ত হয়েছেন নানাবিধ মেডিটেশনে। গতকাল তিনি সিবেবে রক বলে একটি একটি দৃষ্টিনন্দন পাহাড়ের বিপুল একটি মনোলিথিক পাথরের ছায়ায় বসে অনেকক্ষণ মেডিটেশন করেন। আজ অ্যানমারি তার মেডিটেশনের জন্য লোকেশন হিসেবে বেছে নিয়েছেন হাউস অন ফায়ারের ক্লক টাওয়ারের মতো মিনারের গোঁড়া।

অনেকক্ষণ ধরে অ্যানমারি মেডিটেশনে নিমগ্ন আছেন। তার শরীরে নির্ঘাৎ তৈরি হচ্ছে বিস্তর এনডরফিন। এতে আমার আপত্তির কিছু নেই। খুবই ইতিবাচক উদ্যোগ। তিনি আমাকে দরাজহাতে ভরপেট ভোজন করিয়েছেন। আমি তার কুশল কামনা করি। তবে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি অাঁখি মুদে আছেন বলে বেচইন লাগে। আমার অধৈর্য হওয়ার পেছনে আছে ছোট্ট একটি ব্যক্তিগত স্বার্থ। তার ধ্যানমগ্নতা ভাঙলে আন্দাজ করছি তিনি ফিরে যাবেন বোমবাসো ব্যাকপ্যাকার্স লজে। লিফ্ট নিয়ে তার ইসইউভিতে সওয়ার হতে পারলে আর বিকেলবেলা বেশ খানিকটা হেঁটে গিয়ে বাঝ-বাসের স্টপে দাঁড়ানো ঝামেলা পোহাতে হয় না।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার