‘স্মারক দুর্ঘটনা’ ও ঢালী আল মামুন

লেখক:

দীপ্তি দত্ত

Road-Accident-Memorial
Road-Accident-Memorial

স্মরণিকা জাদুঘর ‘স্মারক দুর্ঘটনা’ গত বছর ২৯ নভেম্বর উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এখানে শিল্পী ঢালী আল মামুন একটি অবজেক্টকে (সংখ্যায় নয়, ধারণাগত দিক দিয়ে) একজন স্থপতির সহযোগিতায় স্থানিক চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা করেছেন। দ্রোহ-প্রেমের অসংযমী আদি নগর-কারখানা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হল-সংলগ্ন একটি সড়কদ্বীপে তিনি এটি স্থাপন করেছেন। এমন কোনো শ্রেণি নেই যারা নানা সময়ে নানাভাবে এই কারখানায় পরিভ্রমণ করেন না। এটাও এই কারখানারই বৈশিষ্ট্য। এই স্থানিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে শিল্পী মামুন ‘স্মারক দুর্ঘটনা’ ভাবনার কোথায় কীভাবে উপরিপাতন ঘটিয়েছেন আর কোথায় করতে চাননি বা পারেননি, তা-ই বিধৃত হয়েছে এই আলাপনে।

দীপ্তি : সড়কদ্বীপটিতে নানা শ্রেণির মানুষ আসে। ‘স্মারক দুর্ঘটনা’ প্রসঙ্গে একজন তরুণ চিত্রকর বলেছিলেন, ‘র’ ম্যাটারিয়াল খুব বেশি সরাসরি উপস্থাপন করা হয়েছে। তাঁর প্রত্যাশা ছিল, ধারণা এবং দৃষ্টিভঙ্গিগত উপস্থাপনা আরো সমৃদ্ধ হবে। এই কাজটির আগে আরেকটি এক্সিবিশন ‘অপনয়নে’ তিনি সেটা দেখেছিলেন। তাই ‘স্মারক দুর্ঘটনা’ তাঁর প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।

মামুন : সেটা হতেই পারে। এখন আমরা যে-আধুনিকতা সম্পর্কে জানি, সেখানে শিল্পচর্চাই হতো কতগুলো নান্দনিক শৃঙ্খলার পরিপ্রেক্ষিত। ফলে ছেলেটির মতে এই কাজের মধ্যে যে আরো কিছু থাকা প্রয়োজন, তার অর্থ এটি আকর্ষণীয় হওয়া উচিত। তার মানে অক্ষিপট-নির্ভরতার বিষয়টি চলে আসে। আসলে আমি চেয়েছিলাম পুরো গাড়িই মুড়ে ফেলতে, যেন গাড়িটা নিজেই আহত। এতে দুর্ঘটনার পর গাড়িটির মধ্যে যে একটি ভায়োলেন্স প্রতিভাত হচ্ছে বা বিবৃত রয়েছে, সেটিকেই আমি তুলে ধরতে চেয়েছিলাম। ওটা থাকবে ভেতরে। কিন্তু বাইরে সে পৃথক হয়ে যাবে। কিন্তু টেকনিক্যাল আসপেক্টের কারণে সেটা করতে না পেরে আমি চিন্তার আরেকটি ইমপ্রোভাইজ করার চেষ্টা করলাম। ভাবতে শুরু করলাম, চলচ্চিত্রের সঙ্গে কী করে একে সম্পৃক্ত করা যায়। এ চিন্তা থেকেই তারেকের চলচ্চিত্রের যে-ভাষা, যে ফিকশন অ্যান্ড ডকুমেন্টারি সেগুলোরই সমন্বয় ঘটানোর চেষ্টা করেছি গাড়িটিতে। গাড়িটিতে পাঁচটা হাত রয়েছে – দুর্ঘটনায় মারা গেছেন পাঁচজন – একটি রেফারেন্স রয়েছে। আবার হাতগুলো কিন্তু হঠাৎ গাড়ির সঙ্গে লেগে থাকা, এটি গাড়ির বাস্তবতাকে পালটে দেয়। তার মানে ফিকশন আসে। মানুষ ওই হাতগুলো দেখে প্রত্যেকে নিজস্ব একটি গল্প তৈরি করবে। অবশ্য এখানে একধরনের অ্যানিমেশনও আছে।

দীপ্তি : ভেতরে যে-হাতের ফর্মগুলো ব্যবহার করছেন, সেটা দর্শক একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে না দাঁড়ালে দেখতে পান না।

মামুন : ওটা আমি পুরোপুরি উন্মুক্ত করতে চাইনি। একটি বিস্ময় সৃষ্টি করতে চেয়েছি। আরেকটা বিষয় হলো, সাদা রংটি বৈশ্বিকভাবে সম্মত। যে-কোনো দুর্ঘটনাসৌধের রং সাদা হয়ে থাকে। আমিও সেই জায়গা থেকে ব্যতিক্রম কিছু করতে চাইনি। আমি সেটা রাখতে চেয়েছি। তাই সাদা রঙের কারণে গাড়িটির মধ্যে যে-ভায়োলেন্সটা ছিল, তা খানিকটা নিউট্রাল হয়েছে। এটিও একটি কারণ। এছাড়া আমার মনে হয়েছে, সিটগুলোই এক-একটি ভাস্কর্য। যদি দুঁশ্যাম্পের ‘ইউরিনাল’ কাজ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে, তবে এটা সে অর্থে ডকুমেন্টারি। এটা একই সঙ্গে আমার মতে – মেমোরিয়াল, মনুমেন্ট ও মিউজিয়াম। মানে একটা ওপেন উন্মুক্ত জাদুঘর।

দীপ্তি : আপনার কাছে শিল্প কী বা কোনটি?

মামুন : এখন বহু দার্শনিক বলছেন, শিল্পকলার ইতিহাস ও সাধারণ ইতিহাসের মধ্যে সীমারেখা রাখার কোনো যথাযথ কারণ নেই। আসলেও তাই, শিল্পকলা কিন্তু একটি ইতিহাস। কারণ এর মধ্য দিয়েও কিন্তু একটি স্মৃতি, সমাজ নানাভাবে প্রতিফলিত-প্রতিবিম্বিত হয়। সত্যিকার অর্থে আজ আমরা যে-সময়ে বাস করি, তাও মানুষের সামাজিক বা সার্বিক কর্মকান্ডেরই অংশ। মানুষের উন্নয়নের একটি অংশ। সৃজনশীলতাকে আর আলাদা করে দেখার কিছু নেই। সাহিত্যের ক্ষেত্রেও একই বিষয় দৃষ্ট হয়।

আসলে ‘স্মারক দুর্ঘটনা’ নির্মাণের এজেন্ডার মধ্যে ছিল একটি মনুমেন্ট করতে হবে, একটি মেমোরিয়াল করতে হবে। একই সঙ্গে মানুষকে সচেতন করতে হবে। সচেতনতা ও নান্দনিক সৌকর্যে মানুষকে অভ্যস্ত করতে হবে। সে-কারণেই  এ-স্পেসটাকে অনেক গুরুত্ব দিয়েছি। এখানে শুধু এই গাড়ি বা  অবজেক্টগুলো গুরুত্বপূর্ণ নয়, সেখানে নুড়ি-পাথরগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। বসার সিটগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি সেখানকার গাছগুলোকে যেভাবে দেখা হচ্ছে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। এখন সেটা শিল্প হয়েছে কি-না তা নিয়ে আমি খুব একটা ভাবিত নই।

দীপ্তি : এখানে দুটি টেক্সট আছে – ‘মানুষ আমি আমার কেন পাখির মতো মন’ আর হচ্ছে – ‘পাখিটা বন্দি আছে দেহের খাঁচায়’।

মামুন : দুই বন্ধু তারেক ও মিশুকের দুটি প্রিয় গান। এর মধ্যে ‘পাখিটা বন্দি আছে দেহের খাঁচায়’ তারেকের লেখা। আর ‘মানুষ আমি আমার কেন পাখির মতো মন’ মিশুকের খুবই প্রিয় ছিল। মূলত এটা টেক্সটের কম্পোজিশন।

দীপ্তি : বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি উন্মুক্ত শিল্পচর্চা…

মামুন : এটাকে জন-শিল্প বলা যেতে পারে। আসলে যে-কোনো মনুমেন্ট বা সৌধের কিন্তু মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। অর্থাৎ এগুলো বিশেষ একটি মর্যাদার জিনিস। আমি সেই জায়গা থেকে সরে আসার চেষ্টা করেছি।

দীপ্তি : বিভিন্ন সময়ে সাংস্কৃতিক আন্দোলনে বলা হয়েছে, একজন নগর-পরিকল্পনাবিদ কিংবা একজন শিল্পী, একজন স্থপতি ও একজন পরিবেশবিদ সমন্বয়ে গঠিত কোনো কমিটির মধ্যমে যখন নগরে কিছু করা হয়, সেটা করা উচিত। আপনার এ-কাজেও একজন স্থপতিকে যুক্ত করা হয়েছে পরিবেশ পরিকল্পনার জন্য। সেটা মূলত কী উদ্দেশ্যে?

মামুন : সেটা আসলে আমি বলতে চাই না ওইভাবে। তবে একেবারেই ছিল না, সেটাও বলব না। আমাদের একটা Intension ছিল যে, একটা স্পেস আসলে কত গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণে আমি খুবই determined ছিলাম, I have to work incorporate with the architect. এই স্পেসটা আমার বের করা। এর পেছনে নানা রকম কারণ আছে। ছাত্রছাত্রীরা এই স্পেস ব্যবহার করলেও জায়গাটা মৃতপ্রায় এবং রাস্তার পাশে। যে-উদ্দেশ্যে, আমাদের মনুমেন্টের যে-প্রাসঙ্গিকতা তার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ-কারণেই এ-জায়গায় ‘স্মারক দুর্ঘটনা’ তৈরি করা হয়েছে। স্পেস বিল্ডিংয়ের ক্ষেত্রে আমরা অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। এমনকি মানুষের হাঁটাচলার জন্য আমরা র‌্যাম্প ব্যবহার করেছি। যেন একজন প্রতিবন্ধীও এটি উপভোগ করতে পারে। একই সঙ্গে এটার function-টা aesthetically address করা যায়, আবার এটা ফাংশনালও।

দীপ্তি : পাশে শামসুন্নাহার হল এবং শিক্ষার্থীদের সময় কাটানোর স্থান। এখানে নিয়মিত বসে ছেলেমেয়েরা। সেই বিষয়টা কি ভাবনায় ছিল?

মামুন : হ্যাঁ, সেজন্য আমি এটাকে একটু till করেছি। আমি তো ইচ্ছা করলে মাটির সঙ্গে লাগিয়ে রাখতে পারতাম এবং till করার পেছনে একটি কারণ হচ্ছে যে, একটা মনুমেন্টের মর্যাদা দেওয়া।

দীপ্তি : আমাদের যে Open air art practice-টা, সেখানে বেদিটা এখনো রয়ে গেছে।

মামুন : সেটা দুটো কারণে হচ্ছে – একটা হচ্ছে তোমার এই প্রবণতাটাকে রোধ করা, আরেকটি হচ্ছে কিন্তু একটা আলাদা মর্যাদা দেওয়া।

দীপ্তি : মর্যাদার পাশাপাশি cultural behaviour…

মামুন : সেটাকেও কনসিডার করা হয়েছে। দুটোকেই। আমি হয়তো নিচে রাখলে এক ধরনের সংকট তৈরি হতে পারত।            নানা রকম, not only human being, জন্তু-জানোয়ারও। আর এখন দেখতেও কিন্তু জিনিসটা অন্যরকম  লাগছে। আমি একটি পাখিও সেখানে যুক্ত করেছি। সেটি হচ্ছে তারেকের মাটির ময়নার পাখি।

দীপ্তি : পুরো কাজটিকে যদি আমি কম্পোজিশনালি ডিভাইড করি, মাঝখান দিয়ে রেখা টানি তাহলে একটা centralized composition হয়। মাঝখানে একটা বৃহৎ ফর্ম আছে। বাকি যে-element-গুলো আছে, ওই পাশে যে-ফর্মগুলো আছে, সেটাকে আপনি entrance point বললেন –

মামুন : দুদিক থেকেই entrance তৈরি করা যায়। স্পেসিফিক না। আমার যেটা মনে হয়, জানি না, central কি-না। তবে একটা হচ্ছে যে, দুটো বটগাছ আমাদের খুব সাহায্য করেছে। কারণ তারেকের পছন্দের মধ্যে বটগাছ, তারেকের ফিল্মের মধ্যে আছে বটগাছ। এগুলো আমি দেখেছি। মাটির ময়নার মধ্যে বটগাছ একটা ব্যাপার। আমাদের যে লোকায়ত সংস্কৃতিতেও বটগাছের একটা বড় ভূমিকা আছে। আমাদের একসময় মনে হয়েছিল, বটগাছ থাকলেই যথেষ্ট ছিল। পরে দেখলাম যে, it’s not bad. এখন মেহগনি গাছগুলোকে আর মেহগনি গাছ মনে হয় না। এই আলো-ছায়া সব মিলিয়ে একটা অন্য ধরনের স্পেস তৈরি হয়েছে। আর শুধু বটগাছ থাকলে, তাহলে মনে হতো যে, ওহ্ ডেলিবারেটলি এটা করা হয়েছে, আমার মনে হয়। আমরা নেচারের সঙ্গে, সেটা যা-ই ছিল সেটা মানুষ লাগাক কি pre-planned লাগাক, যেভাবেই লাগাক, ওই জায়গাটাতে খুব বেশি হাত দিতে চাইনি। তেমন কোনো হাত দেওয়া হয়নি।

দীপ্তি : আপনার কাজের পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনাটা শুনতে চাই। আর দ্বিতীয় বিষয়, সীমাবদ্ধতা কী?

মামুন : সীমাবদ্ধতাগুলো মেনে নিয়েই কাজটা করতে হয়েছে আমাদের এবং সেগুলোকেও কিন্তু আমরা বিবেচনায় রেখেছি। এখন একটা তো এই ধরনের কাজ – বড় পরিকল্পনা করতে গেলে কতকগুলো practical problem আছে।  যেমন আমার ইচ্ছা ছিল sound installation করব। পরে দেখলাম, এটার কিছু practical problem আছে। sound installation-টা করলে আমাকে প্রতিনিয়ত একটা লোক রাখতে হবে। সেটার পক্ষে যে maintainance করার ক্ষমতা বা পয়সা তা আমাদের নেই। সেক্ষেত্রে একটা সংকটের জায়গা রয়েই গেছে। তার পরও অনেক চেষ্টা করে দারোয়ান ইত্যাদি জিনিস রাখা হয়েছে। কিন্তু সব পরিকল্পনা তো আর সম্পন্ন করা যায় না।

দীপ্তি : চেয়ারের নিচে সবুজ গাছ লাগানোর বিষয়…

মামুন : সেটারও একটা problem আছে। maintainnance again, অনেক পরিকল্পনাই ছিল – থাকে। সব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করাটা খুব difficult  হয়ে যায়। আমি sign language-এ গানটাও লিখতে চেয়েছিলাম। মানে যেহেতু হাত একটা ঘটনা। হাতের প্রতি আমার একটা দুর্বলতা আছে। তা আমি চেয়ারটার নিচে চেয়েছিলাম যে, ওই পাখিটা বন্দি আছে দেহের খাঁচায় – ওরকম sign language দিয়ে লিখতে চেয়েছিলাম। ওরকম লেখার ইচ্ছা ছিল যে, ওই হাতগুলো জাস্ট পাথর থেকে বেরিয়ে যাবে। তারা কিন্তু আসলে sign language একই সঙ্গে। They will make expression but they are actually text. এরকম একটা।

দীপ্তি : টেক্সটা কেন? একজন আর্টিস্ট হিসেবে আপনি মূলত যে-ধরনের ফর্ম নিয়ে কাজ করেন তা কি অভিব্যক্তি প্রকাশের ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়?

মামুন : সেটা ঠিক নয়। আসলে একটা জগৎ নির্মাণ করা – বিভিন্ন ধরনের উপাদান দিয়ে। মানুষের সমস্ত কীর্তিকে সমন্বিত করা। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের কোনো চিন্তাই সম্পন্নও হয় না, অর্থবহও হয় না দৃশ্যরূপ ছাড়া। কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে আবার টেক্সটও তো মানুষেরই অভিব্যক্তির একটি অনুষঙ্গ। কারণ আমি যাদের নিয়ে ওই মনুমেন্টটি করছি, সেখানে যে-টেক্সটগুলো আসছে, আমার ওই দুই বন্ধুকে স্মরণ করা, আমার কাছে মনে হয়েছে, এটি একটি যথার্থ উপায়। ওই লাইনটা পড়লে কাজটা সম্পর্কে মানুষের এই জাগতিক জীবনের দুঃখ-বেদনা ছাড়িয়ে অন্যত্র পৌঁছার একটা রাস্তা তৈরি করে  দেবে। সেটিও কিন্তু একটি ইনটেনশনের মধ্যে ছিল।

দীপ্তি : আমরা শেষ পর্যন্ত জগৎকে অতিক্রম করে যেতে চাই – spiritually,  এই যে যাওয়ার প্রবণতা এবং শেষ পর্যন্ত আপনার কাজেও তা-ই দেখি  – কেন?

মামুন : এটা আমি exactly বলতে পারব না। কিন্তু যেমন ধরো আমাদের এই অঞ্চলে যাঁরাই ছিল, প্রত্যেকেই, যেমন রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, তাঁকে এক পশ্চিমা পন্ডিত বা দার্শনিক প্রশ্ন করেছিলেন – তোমাদের মধ্যে তো কাল-চেতনা নেই। তখন রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, সত্যি তাই। আমরা কাল নিয়ে ভাবি না। আমরা চিরকাল নিয়ে ভাবি।’ এটা রবীন্দ্রনাথই পারেন বলতে। আমাদের নিম্নবর্গের মানুষও এত দুঃখ-কষ্টের মধ্যে থেকে একটা জীবন অতিক্রম করে যায়। এই জীবনকে যাপনও করে, অতিক্রমও করে। আমি মনে করি, সেটা wonderful, এটা কিন্তু পলায়নপরতা নয়। এটা জীবনকে জয় করার আরেকটা কৌশল, আরেকটা পদ্ধতি।

দীপ্তি : কনটেক্সট তৈরি হচ্ছে এইভাবে এবং আমাদের সবাই শিল্পী-সাহিত্যিক ভাবার চেষ্টা করছেন যে, তাঁরা নিজস্ব কনটেক্সটে কাজ করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু মার্শাল দুঁশোর সমাজে ফিলোসফির একটা প্রভাব আছে, তাঁর কাজের পেছনে সমাজবাস্তবতা আছে। আমাদের কী? এই সীমাবদ্ধতার কারণ কী? চর্চা নেই কেন?

মামুন : এটা দীর্ঘ ইতিহাস। ওরকম দর্শন-চর্চার পরম্পরা আমাদের নেই। আজকের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যে দর্শন-চর্চা হয় বা পড়ানো হয়, সেটার দিকে তাকালেই আমরা বুঝতে পারি আমাদের অবস্থা কী। আমাদের প্রধানত যে-কোনো শিল্পকলার ইতিহাসের ক্ষেত্রে বা শিল্পের সমালোচনার ক্ষেত্রে বা নন্দনতত্ত্বের ক্ষেত্রে, যে হচ্ছে দর্শনশাস্ত্রেরই একটি শৃঙ্খলা। কিন্তু আমাদের এখানে এখন পর্যন্ত দর্শনশাস্ত্র থেকে কেউ এসে নন্দনতত্ত্বের চর্চা করেনি। আমরা পাইনি। আমরা এখন পর্যন্ত এই বাংলাদেশে নন্দনতত্ত্ব পড়ানোর লোকই খুঁজে পাই না। যেগুলো পড়ানো হয় আদতে সেগুলো কতটা মানসম্পন্ন সে-ব্যাপারে প্রশ্ন থেকেই যায়। এটার ঘাটতি তো আছে। এছাড়া এটার একটা রাজনৈতিক ইতিহাস আছে, যা সমাজ বিকাশের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অনেক কিছুর সঙ্গে সম্পৃক্ত, এক কথায় বলা সম্ভব নয়।

দীপ্তি : যদি সম্ভব হতো তাহলে হয়তো sound installation করতেন। তাহলে ঢাকা শহরে এটি কতখানি যৌক্তিক? মানে যখন চারপাশে শব্দ?

মামুন : এটি প্রথমে আমার রিসার্চের একটি অংশ ছিল। আমরা চেষ্টা করেছিলাম, ঢাকার একশ বছরের সাউন্ড হিস্ট্রি ইনস্টল করতে। ঢাকা একশ বছরে কী রকম সাউন্ড evaluate করেছে। কীভাবে evolution-টা হয়েছে। কারণ আমি বলেছিলাম মিউজিয়াম মনুমেন্টাল। সেটা ওই অর্থেই সাউন্ডের একটা মিউজিয়াম হিসেবে থাকত যে, ঢাকা সিটির সাউন্ড মিউজিয়াম।

চলচ্চিত্র তো মূলত ইমেজ ও সাউন্ডের ট্যাপিস্ট্রি। সাউন্ড ইজ ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট। যদিও ওখানে আমার অনেক বন্ধুরা বলছে, এখানে এমনিতেই অনেক সাউন্ড। কিন্তু এখন অনেক ডিভাইস পাওয়া যায়, সাউন্ড কিন্তু একটি পার্টিকুলার স্পেসের মধ্যেও পাওয়া যায়। সেটা ভেরি এক্সপেনসিভ ডিভাইস।

 

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার