জোসনা ভাসান

লেখক:

লীসা গাজী

 রুহ্ যাওয়ার মুহূর্তটা জোসনা স্পষ্ট টের পায়। এক-ঝটকায় আকাশে উঠে গেল শূন্যে আর শরীরটা পড়ে থাকলো মাটিতে। কী যে উঠে গেল আকাশে ঠাহর পায় না জোসনা। বাতাসের চাইতেও পলকা; দৃষ্টি-অগ্রাহ্য, শ্রবণ-বধির। ছুঁতে চাইলো, কিন্তু ছোঁবে আর কি দিয়ে! শুধু একটা বোধ, একটা জ্ঞান টনটন করে বাজতে থাকে। আম্মা যেমন সবসময় বলতো, ‘জ্ঞান তো টনটনা, কথা কওনের আগেই সব বুইঝা ফালাস – তর এই রহম হয় ক্যান?’

‘কে জানে ক্যান?’

চোদ্দো বছরের এই একরত্তি জীবনের শেষ পঁয়ত্রিশ ঘণ্টা ধোঁয়ায়

আচ্ছন্ন হয়ে আছে ওর। ওপর থেকে নিজের নিস্তেজ শরীরটার দিকে তাকিয়ে জোসনার সবকিছু দুনিয়া-ছাড়া মনে হয়। স্কুলঘরের সামনের খোলা জমিনে কালো বোরখা পরা গোল-গোল মুখ-চোখের মেয়েটা এলোপাতাড়ি পড়ে আছে। বিচার শেষ হওয়ার আগেই সালিশ ভাঙতে হলো। চারিদিকে শোরগোল পড়ে যায়, ‘দাঁত লাগসে… পানি, পানি দেও’, – ভিড়ের মধ্যে কে যেন বলল। হলুদ ওড়না চাদরের মতো করে ওর গায়ের ওপর এলোমেলো বিছিয়ে দিলো কেউ।

তখন শিস দেওয়ার মতো তীব্র শব্দে চারিদিক অন্ধকার করে ভীষণ বাতাস ধেয়ে আসে। সালিশের মধ্যে ছোটাছুটি পড়ে যায়। পানি আনা আর হয় না। কেউ একজন বলে, ‘বাতাসে জুর বেশি, আন্ধার নামবো, ম্যালা মেগ ছুটবো?’ ঝোড়ো হাওয়ায় কখন সেই ওড়না জোসনার শরীরের মায়া ত্যাগ করে কোথায় উড়ে গেল! চোখের পানিতে কাজলের কালি ওর গাল বেয়ে চুঁইয়ে এসে দাঁতে কেটে বসা ঠোঁটের রক্তের সঙ্গে মিশে কালচে লাল-ছোপ ধরে নাক-ঠোঁট-থুঁতনিজুড়ে শক্ত হয়ে জমাট বেঁধে থাকে। আচমকা হেলেপড়ার কারণেই পিঠের দগদগে কাঁচা আঘাত বোরখা আর বোরখার নিচে ধানিরঙা কামিজ চিরে দেখা যায়। রক্তের টকটকা লাল চুপসে গেছে কামিজের ধানিরঙে। নিজের জন্য কেমন মায়া লাগে জোসনার, ইচ্ছা হয় কিছুক্ষণ পাশে পাশে থাকে – কিন্তু ওকে কি দেখা যায়, নিশ্চিত হতে পারছে না। দেখা গেলে বিরাট সমস্যা।

রব ওঠে, ‘মাইয়ার বাপ রে ডাইকা আন – এই ছিনালরে গ্রাম থিকা বাইর কর। গজব নামবো…’ – রব মিশে যায় ধুলায় চিৎকারে, ‘গজবের আলামত দ্যাখা যায়… যেমুন মাইয়া পয়দা করছে, বাপে গলায় দড়ি দিছে লাগে…।’

চালা করা স্কুলঘরের সামনের বড় মাঠ ঘিরে গ্রামের মানুষ জড়ো হয়েছে। শাস্তি কার্যকর হচ্ছে মাঠের জমিনের ঠিক মাঝখানে। দুপুরের খাওয়ার পরে সালিশ বসবে, সালিশের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে বিকেল চারটা। ইমাম এবং চেয়ারম্যান সাহেবের উপস্থিতিতে শাস্তি ধার্য করা হবে। অবশ্য শাস্তি ধার্য করার এখতিয়ার কারো হাতে নেই, সে স্বয়ং রাহমানুর রহিম-ই ধার্য করে রেখেছেন। ইমাম সাহেব, গ্রামের আর দশজন মান্যগণ্য লোকের সঙ্গে সালিশে বসে বিচার করবেন এবং দোষীসাব্যস্ত হলেই মহান আল্লাহ্-তা’য়ালার বিধান অনুযায়ী তা কার্যকর করবেন। ব্যাপার খুব সহজ, জটিলতার নামগন্ধ নেই। কারণ মহান সৃষ্টিকর্তা প্যাঁচ পছন্দ করেন না।

সবাইকে উদ্দেশ করে ইমাম সাহেব বললেন, ‘নবী করিম (সা.) বলেছেন, জেনা হইতেছে এসলামের সবচেয়ে ঘৃণ্য গুনাহ্র একটা। তিনি নারী-পুরুষ উভয়কে বলেছেন’- এইটুকু বলে বাকিটা তিনি ওয়াজের সুরে বললেন, ‘নজর নিচে রাখো, পর্দা করো – জেনা করলে একশ দোররার বিধান; এর কুনো মাপ নাই, নাই অন্য সমাধান।’

জেনার কল্পনায় ইমাম সাহেবকে শিউরে উঠতে দেখা যায়। তিনি বিড়বিড় করে তওবা পড়েন। ‘আল্লাহর অসীম মেহেরবানিতে দুই জেনাকারীর এক জেনাকারীরে আমরা ধরতে পারছি, তবে আফসুসের বিষয় আপনেরা জানেন, আরেক জেনাকারী দিলদাররে কুথাও পাওয়া যাইতেছে না। চেয়ারম্যান সাহেবের দুই লাঠিয়াল হের বাড়ির সামনে খাড়া ছিল, তবু সে পলাইছে, কত বড় শয়তান! চেয়ারম্যানসাব বিষয়টা আপনেদের খোলাসা কইরা বলবেন, – চেয়ারম্যানসাব আসেন, বাকি কথা আপনে বলেন।’

সালিশের একপাশে বাপ-মেয়ে ঘাড় নুইয়ে দাঁড়িয়েছিল। ইমাম সাহেবের কথাগুলো ওদের কানে যাচ্ছিলো ঠিকই কিন্তু এর এক বিন্দুও মাথায় ঢুকছিল না। শেষ বাক্যটা শুধু চাবুকের মতো এসে লাগলো। দিলদারকে পাওয়া যাচ্ছে না – এর অর্থ কী! তাহলে ওরা এখানে কেন? বাপের গা ঘেঁষে প্রায় পড়ে যাচ্ছিলো জোসনা, ঠাহর হতেই শক্ত করে ধরে ফেলে বাপ। ‘আমার মাইয়ায় জেনা করে নাই। কাইল ভোর রাইতে সে পিসাব করতে উঠছিল, তখন দিলদার হেরে টাইনা নিয়া গেছে, হেরে শ্যাষ করছে। ইমাম সাব আল্লাহ্পাকের দোহাই লাগে – আপনে হগলতা জানেন। কাইল দুফর বেলা আমি আপনের কাছে গিয়া…’

‘আল্লাহ্র বিচার সাফা বিচার।’

ইমাম সাহেবে পরিষ্কার গলায় বলেন, তার দরাজ কণ্ঠের উদাত্ত ডাকে সালিশের মধ্যে পিনপতন নিস্তব্ধতা বিরাজ করে। তিনি চারপাশে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বাকি কথা শেষ করেন। ‘তুমার মাইয়া তুমি তো বলবাই কিন্তুক সাক্ষী কই। আল্লাহ্র বিচারে চাইরজন পুরুষ সাক্ষী, যারা তুমার কইন্যার বলাৎকার নিজ চক্ষে প্রত্যক্ষ করেছেন, তাদের বয়ান প্রয়োজন হয়। এইটা কুনু খেলা না, আল্লাহ্পাকের বিচার মনে রাখবা।’

ইমাম সাহেব কিঞ্চিৎ দম নিতেই চেয়ারম্যান সাহেব রহমতকে ইঙ্গিত করলেন; রহমত লাঠিয়ালদের সঙ্গে নিয়ে মেয়ের বাপকে টেনেহিঁচড়ে সালিশের বাইরে নিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ইমাম সাহেব উপস্থিত সবার মনোযোগ নিজের দিকে ফেরানোর জরুরি দরকার উপলব্ধি করলেন। ‘আহা রে হাজার হইলেও বাপের মন…’ তাকে দয়ায় আর্দ্র শোনালো। তিনি যথারীতি ওয়াজের সুর তুললেন, ‘তবে এই বদ মাইয়ার না ছিল পর্দা, না ছিল শরম-লেহাজ। এই মাইয়া আল্লাহ্পাকের পথ ছাইড়া, পেয়ারা নবী (সা.)-এর পথ ছাইড়া কুপথে গেছে, নষ্ট হইছে, আহ্হা রে…’ ইমাম সাহেব সাবধানে উপস্থিত সবার মুখের ভাব পড়তে চেষ্টা করলেন। তিনি ভালোই জানেন, একটা ভাত টিপলে দশটা ভাতের খবর পাওয়া যায়।

‘ঘরে আমাদের সকলেরই স্ত্রী-কন্যা-বোন আছে, কি আছে না? আজকে এর বিহিত না করলে দোজখের আগুন থিকা গেরামের কারও উদ্ধার নাই। আরে আল্লাহ্পাকের বিচার আমি না করার কে! আমি তার এক তুচ্ছ বান্দা, পথের ধুল – ঠিক কি না?’

ইমাম সাহেবের সপক্ষে সম্মিলিত মাতম ওঠে, ক্রোধে ফেটে পড়ে তারা। ‘আস্তাগফিরুল্লাহ!’ এই এক মেয়ের পাপের কারণে গ্রামের মানুষ দোজখে যেতে নারাজ।

 

চেয়ারম্যান সাহেবের আজকে সালিশে মন নেই। সকাল থেকেই তার বাতের ব্যথা, এইসব হাবিজাবি ভালো লাগছে না। এই সালিশ নিয়ে তিনি একটু চিন্তিতও আছেন। আজকাল দেশের অবস্থা ভালো না, শুধু মেয়েটাকে শাস্তি দিলে কী বিপদে পড়েন কে জানে। তাকে খুবই সাবধানে এগোতে হচ্ছে। আগে কখনো কাউকে তিনি তোয়াক্কা করেননি, তিনি যা বলেছেন তাই ছিল যথেষ্ট। এখন গ্রামের ছেলে-ছোকড়াদেরও যা বাড় বেড়েছে দেখলে তাজ্জব লাগে। এক চড় দিলে আরেক চড়ের জায়গা নেই – নিজের মনেই গজগজ করতে থাকেন চেয়ারম্যান সাহেব। আসন্ন গন্ডগোলের সম্ভাবনা মাথায় রেখে তাই আটঘাট বেঁধেই তাকে সব ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। ইমাম সাহেবের কী, ইমাম সাহেবের আছে শুধু তড়পানি, সব সামলানোর দায়িত্ব তো তারই। আবারও দাঁত কিড়-মিড় করেন চেয়ারম্যান সাহেব। অবশ্য গ্রামের সবাই জানে অন্য জেনাকারী দিলদার লাপাত্তা। আজকে সকাল থেকে তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। যদিও চেয়ারম্যান সাহেবের নিজের দুই লোককে দিলদারের বাড়ির সামনে রাতভর পাহারা দিতে সবাই দেখেছে – তারপরও সে হাওয়া। এই পুরো ব্যাপারটায় চেয়ারম্যান সাহেবকে যারপরনাই ক্ষিপ্ত ভাব নিতে হচ্ছে। সকালবেলাতেই যখন খবর এলো দিলদার হাওয়া, তখনই তিনি গ্রামের মুরুবিবদের ডেকে বিস্তারিত জানালেন এবং তার লোকদের গাফিলতির বিষয়ে যে তিনি অত্যন্ত নাখোশ হয়েছেন তা স্পষ্ট করলেন।

‘কত বড় আস্পর্দা! তোরা দিলদারের ঘরের সামনে বটগাছের মতন দাঁড়ায় থাকবি, তা না নাকে তেল দিয়া ঘুম পারছে দুইজন। লাঠিয়াল হইছে নাকি – সবগুলারে লাত্থায়া ঠিক করা উচিত। এদেরই একশ দোররা মারা উচিত – আল্লাহর বিধান নিয়া কোনো রকম ফাইজলামি আমি বরদাশত করব না।’ এই সময় চেয়ারম্যান সাহেবের খেদমতগার রহমত এগিয়ে এসে লাঠিয়াল দুইজনকে ধাইধাই করে দুই-চার ঘা বসিয়ে দিলো। গালি দিতে গিয়ে স্যারের দিকে দৃষ্টি পড়ায় জিভ কাটে রহমত, স্যারকে সন্তুষ্ট দেখায়। তিনি ‘হুম’ সুলভ একটা শব্দ করলেন।

চেয়ারম্যান সাহেবের রোষ দেখে গ্রামের আর দশজন মুরুবিব ঘাবড়ে গেলেন। কেউ কেউ এগিয়ে এসে বললেন, ‘এরা হইতেছে কামলা মানুষ, কিয়ের লাঠিয়াল! চেয়ারম্যানসাব, এইগুলার দায়িত্বজ্ঞান থাকলে তো সারছিলই। জাইনা-বুইঝা অবশ্য পলাইতে দেয় নাই। এই বেলা রেয়াত দেন। খুঁইজা আনা দিয়া হইলো কথা। এই যা ভাগ। যেইখান থিকা পারস দিলদাররে ধইরা আন।’

মুরুবিবদের কথা বিবেচনা করলেন চেয়ারম্যান সাহেব যদিও রাগে তার শরীর কাঁপছিল। ‘যা এইখান থিকা, আমার সামনে সং সাইজা দাঁড়ায় থাকার দরকার নাই। যাত্রাদলের লাঠিয়াল হইছে সবগুলা, হাতে চুড়ি পরায় দেওনের কাম – দুই দিনের মধ্যে দিলদার রে হাজির করবি। এই কথার বরখেলাপ যাতে না হয়। রহমত, এই দুইটারে আমার সামনে থিকা যাইতে ক, ব্লাড প্রেশার বাইড়া আসমানে উঠতেছে।’

চেয়ারম্যান সাহেব ভ্রূ কুঞ্চিত করে সালিশে মন লাগাতে চেষ্টা করলেন। তার সব দিকে সজাগ নজর রাখতে হচ্ছে, খুবই দুরূহ কাজ। তিনি ইমাম সাহেবের কথার জবাবে বললেন, ‘আমাদের মাথা গরম করলে চলবে না। শান্ত থাকতে হবে। তবে ভরসার বিষয় হইতেছে, ইমাম সাহেব আমাদের সবার সামনে আছেন, তিনি কোরআন-হাদিস মাইনা যা সঠিক বলে বিবেচনা করবেন তাই হবে।’

চেয়ারম্যান সাহেবের কথায় ইমাম সাহেব অত্যন্ত প্রীত হলেন। তিনি ফতোয়া জারি করলেন, ‘যেই জেনাকারীর সন্ধান আমরা জানি, আল্লাহ্পাকের বিধান মোতাবেক তার শাস্তি যত দ্রুত সম্পন্ন করা যায় ততই মঙ্গল। কারণ আল্লাহ্পাকের নেকনজর থিকা কেউ কুনোদিন বঞ্চিত হইতে চায় না – আমরাও বঞ্চিত হবো না, ইনশাল্লাহ্।’

কয়েকদিন ধরে সমানে রোকেয়ার মনে কুডাক দিচ্ছিল। বিষয় কী সে জানে না। অস্থির লাগলে যা করে, দিনভর সুবাহান আল্লাহ্  পড়ে – তাই করছিল সে। বলবে না বলবে না করেও স্বামী কুতুব মিয়াকে বলে ফেললো কথাটা। অবশ্য বলেই বুঝলো বিরাট ভুল করেছে কিন্তু ততক্ষণে ধমক যা খাবার খেয়ে ফেলেছে। মানুষটা প্রায় সময়ই গরম তাওয়া হয়ে থাকে; কেন কে জানে, কোনো কিছু মনের মতো না হলেই একদম ছ্যাঁৎ করে ওঠে। তার নিজেরও দোষ কম না – দুপুরে ভাত খাওয়ার আগে এইসব প্যাঁচাল না পাড়লেই চলতো, ভাবে রোকেয়া। কিন্তু কী করবে অস্থিরতা তবু যায় না। কতবার যে সে ঘর-বার করেছে সে-ই জানে।

কুতুব মিয়া দুই ভুরু এক করে কপালের মাঝখানটা কুঁচকে তাকিয়ে রইলো স্ত্রীর দিকে। দুদিন পরপর এ কী যন্ত্রণা! রোকেয়া কী মশকরা করে নাকি তার সঙ্গে। নিজের নাই জানে পানি তার ওপরে এসব ঘ্যানঘ্যানানি কাঁহাতক সহ্য হয়, – ‘গলা পর্যন্ত শুকায় আসে, বুক ধড়ফড় করে হের আমি কী করুম। আমি কি ডাকতর, না কবিরাজ। বুক ধড়ফড় করলে বইসা জিরাও। মুরগির মতো সারাদিন তুরতুরের কাম কি!’

সকাল থেকে জোসনা ঘরে নাই, নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা অবশ্য। একবার মেয়ে পানি আনতে যায় তো একবার রেশমির বাড়ি গপ করতে যায় – এই কিছুক্ষণ আগে দুই ভাই শফি আর রফির সঙ্গে খেলা করে একেবারে ঘেমে-নেয়ে ঘরে ফিরেছে। চোদ্দ বছর বয়স হলো কিন্তু কোনো হুঁশ নেই। এখন আবার গেছে কচুশাক তুলতে। রোকেয়া জানে এসেই আহ্লাদ শুরু করবে কচুশাক দিয়ে শুঁটকির বড়া বানিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু আজকে রোকেয়া পারবে না, সকাল থেকে নামাজের জায়গাটা নতুন মাটি দিয়ে বহু যত্নে লেপেছে। কী সুন্দর মসৃণ হয়েছে আর শীতল। অবশ্য মায়াও লাগে, মা হওয়ার অনেক জ্বালা!

কতবার করে বলল, ‘শফি রে নিয়া যা।’ কে শোনে কার কথা। ‘শফির পানির পিয়াস লাগছে, অয় জিরাক – আমি যামু আর আমু’ বলেই দৌড়। পেছন থেকে ‘এই হারামজাদি, এই হারামজাদি’ বলে চিৎকার করেও মেয়েকে ফিরাতে পারলো না রোকেয়া; কিন্তু ওর হাসির দমক গড়িয়ে তার পায়ের কাছে এসে থামলো। এতো হাসি আসে কোত্থেকে এক খোদাতায়ালা ছাড়া কেউ জানে না!

রোকেয়ার দুই মেয়ে দুই ছেলে। জোসনাই সবার বড়। তার শাশুড়ি জোসনাকে ডাকতেন কেলানির মা আর ছোট মেয়ে রত্নাকে জিরানির মা। কারণ একজন আছেন সারাদিনই সব কয়টা দাঁতের পাটি খুলে বসে থাকেন আর আরেকজন সারাদিন চোখের পাতাই মেলতে পারে না – এমন পেরেশান অবস্থা। বাপের আহ্লাদে ঘরের কুটাটা পর্যন্ত নাড়ে না রত্না, ফাজিলের ফাজিল! জোসনাও লাই দিয়ে বোনকে একদম মাথার তালুতে চড়িয়ে রেখেছে। আর ছেলে দুটা হয়েছে আরও ত্যাঁদোড়। সারাদিন সমস্তটা বাড়ি মাথায় করে রাখাই একমাত্র কাজ। কিছু দরকার পড়লে অবশ্য হয় মা, নয় জোসনার পিছে আঠার মতো লেপ্টে থাকে। মায়ের কাছে ধমকই খায় বেশি, তখন বড় বুজানই ভরসা।

শাশুড়ির কথা মনে পড়ায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে রোকেয়া। এই গেল শীতে উনার মৃত্যু হয়েছে, তবে শান্তির মৃত্যু। ঘুমের মধ্যে আলগোছে জান কবজ করেছেন আজরাইল (আ.)।

কোনো ব্যথা-বেদনা নাই, কাউকে জ্বালানো নাই, টুঁ-শব্দটাও নাই – চুপ করে চলে গেছেন। সকালে দাদিকে না দেখে শফি-রফি বিছানার কাছে গিয়ে চিৎকার করেও উনার সাড়া পায় নাই। ছোট মানুষ, ওরা বুঝতেও পারে নাই কী সে কী হলো। ‘আম্মা দাদি রাও করে না। আম্মা, আম্মা…’

এসব ভাবতে ভাবতেই আবার ডান চোখ লাফ মারে রোকেয়ার। মনে মনে তসবিহ পড়তে শুরু করে আবার। বেলা কত হলো বুঝতে পারে না। রত্না এমন অলস হয়েছে নাহলে বারো বছরের মেয়ে ছোটভাই দুটাকে নিয়ে ভাতটা খেয়ে ফেলতে পারে না! তা পারবে কেন, সেটা পারলে যে মায়ের একটু আজাড় হয়। একেকটা নিমকহারাম পেটে ধরেছেন – রাগে গা জ্বলতে থাকে তার।

‘রত্না, এই রত্না… এই হাঁটকালের গুষ্টি’ – চিৎকার করতে গিয়েও চিৎকারটা গিলে ফেলে রোকেয়া। হঠাৎ খেয়াল হয় ভাত বসাতেই একদম ভুলে গেছিলো। দুড়দাড় করে ছনে-ছাওয়া একরত্তি রান্নাঘরের দিকে সে দৌড় দেয়।

‘আম্মা খিদা লাগছে।’ মাকে রান্নাঘরে যেতে দেখে শফি ছুটে আসে। সে আবার একটু পেটুক গোছের, দুনিয়ার ক্ষুধা জিভে নিয়ে বসে থাকে – পেটের চেয়ে তার জিভ বড়। ‘খিদা লাগলে সিদা হইয়া দাঁড়ায় থাক’ চুলায় ভাত চড়িয়ে ছেলের দিকে ফিরলো রোকেয়া। শফির এই কথাটা খুব মজা লাগে, ফিক করে দুধের দাঁতপড়া মুখে ফোকলা হাসে, রোকেয়াও হাসে। ‘এ্যাতো খিদা কৈত্থিকা আসে বাপ? যা রত্না আর রফিরে আইতে ক। রত্না চুন্নিটারে ক’ এক্ষণ আইসা বাসন বার করতে।’ মায়ের কথা শেষ করতে দেয় না শফি, যেমনি দৌড়ে এসেছিল তেমনি দৌড়ে বেরিয়ে যায়।

তিন ভাইবোনের খাওয়া শেষ কিন্তু জোসনা এখনো আসেনি। কলতলায় তোলা পানিতে বাসন-কোসন ধুতে ধুতে হাঁসফাঁস করে রোকেয়া। ওদের চাপকলে পানি খুব কম আসে; পেসাবের মতো সরু হয়ে পড়ে। জোসনা সেই কোন ভোরবেলা স্কুলের চাপকল থেকে তিন কলস পানি এনে রেখেছে, তাই দিয়েই চলছে। পাজি হলে কী হবে, চট করে মায়ের কাজগুলো আবার ঠিকই করে রাখে। ‘আল্লাহ্পাক তুমি এগোরে হায়াত দরাজ করো’ অস্ফুটে বলে রোকেয়া।

বড় মেয়ের জন্য অপেক্ষা করতে করতে আলতো করে চোখ লেগেছিল শুধু; হঠাৎ মেয়ের স্পর্শে চমক লাগে, ঘুম-ভাব কেটে যায়। কখন জোসনা এসে ঘরের দাওয়ায় হেলান দেওয়া মায়ের কোলে মাথা রেখে চুপ করে শুয়ে পড়েছে ঠাহর হয়নি তার। মেয়েকে জড়িয়ে থাকতে দেখে ধমক দেওয়ার বদলে আদর করে চুলে হাত বুলিয়ে দিলো রোকেয়া। ‘কী রে, খিদা লাগে না? তুই ফিরলে একসাথে খামু বইলা কখন ঘুমায় গেছি দিশা নাই।’  মায়ের কথার কোনো জবাব দেয় না জোসনা, হাতের বাঁধন শুধু আরেকটু শক্ত হয়। ‘উঠ্ উঠ্, পেট জ্বলতেছে। তোর বাপে আজকে ম্যালা সবজি নিয়া হাটে গেছে। দেখিছ নে ফিরতে রাইত হইব। কচি রাতা-মোরগ আনবো বইলা গেছে। কথাবার্তি নাই ক্যান – উঠ্ না! আরে দুর যা, সর – গরম লাগে।’

‘আম্মা, দোয়া পইড়া আমার বুকে একটু থুঃ দেন না।’ জোসনার গলা এতোটুকু শোনায়। উঠতে গিয়েও আবার বসে পড়ে রোকেয়া। ‘ক্যান কী হইছে?’ জোসনার মাথাটা একদম মায়ের বুকের সঙ্গে মিশে আসে আর বুকটা ধক্ করে ওঠে তার।

‘ডর লাগে আম্মা।‘

‘কিয়ের ডর? কিছু দেখছস? কতবার কইছি দুফর বেলা চুল খোলা রাইখা ঘুরিস না। কিন্তু কথা শুনস? – জ্ঞান তো সবের চেয়ে টনটনা…’ জোসনা টুঁ-শব্দ করে না, মায়ের বুকে আরো মিলিয়ে থাকে। রোকেয়ার ভেতরের অস্থিরতা আবার দ্বিগুণ হয়ে ফিরে আসে। মনে মনে দরুদ শরিফ পড়ে মেয়ের মাথায়-বুকে ফুঁ দেয় – একবার, দুইবার, তিনবার। ‘কী হইছে?’ কিছুক্ষণ কোনো উত্তর নেই ওর, তারপর কী যে বলে অস্পষ্ট স্বরে কিছুই বোঝা যায় না। রোকেয়া ঘাড় নুইয়ে মেয়ের কথা বুঝতে চেষ্টা করলো। ‘কী… কী কছ?’

‘দিলদার কাহা খুব ত্যক্ত করে?’ কথাগুলি প্রায় রোকেয়ার বুকে মিলিয়ে যায়। ‘কে কে ত্যক্ত করে?’ রোকেয়া আকুল হয়ে জানতে চাইলো। এই প্রথম জোসনা মায়ের বুক থেকে মাথাটা সম্পূর্ণ তুলে তাকায় তারপর পরিষ্কার গলায় বলে, ‘দিলদার, দিলদার কাহা।’ মেয়ের মুখের ওপর থেকে চুল সরিয়ে মুখটা গভীরভাবে দেখার চেষ্টা করলো রোকেয়া – কান্নার দাগ চোখে পড়লো, ঠোঁট দুটা তখনো অল্প কাঁপছিলো। ‘ক্যামনে করে, কী করে?’ রোকেয়া মরিয়া হয়ে জানতে চাইলো, – ‘আমারে সব ক’, কিচ্ছু লুকাবি না।’

‘দ্যাখলেই কয়, গোয়ালঘরের পিছে আয় তোর জন্য পেয়ারা রাখছি, তেঁতুল রাখছি, লাল চুড়ি রাখছি। আমি কই পিছে যামু ক্যা, দিলে এইখানেই দেন। আরো কয়, – আমি সব দিমু তরে এক্কেরে ভইরা দিমু। আইজকা শাক তুলতাছি কখন আমার পিছে পিছে আইছে, দেখি নাই। আমি খেয়াল যাই নাই আম্মা, আতখা পিছে থিকা আইসা হাত ধইরা টান দিছে। আমি কই ছাড়েন কিন্তুক ছাড়ে না – এক্কেরে ক্ষেতের মইধ্যে আমারে ফালায় দিছিলো। আমি যখন কইছি চিক্কুর দিমু, সবেবরে কইয়া দিমু, তখন চুলে ধইরা কইছে, এই নিয়া একটা রাও যদি আমি করি তাইলে গুষ্টিসুদ্ধা মাটিত পুঁইতা ফেলব। আমি ধাক্কা দিয়া দৌড় মারছি আর আমার উড়না ধইরা এমুন হ্যাঁছকা টান দিছে যে গলায় ফাঁস লাগছিল – কিন্তুক আমার লগে দৌড়ে পারে নাই।’ এইটুকু বলে জোসনা ভীষণ হাঁপাতে থাকে, ওর ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। বারবার জিভ বের করে ঠোঁট চাটলো। রোকেয়া লক্ষ করলো, সূক্ষ্ম কালচে দাগ জোসনার গলা কামড়ে ধরে আছে।

‘আল্লাহ্র কিড়া কাট – কুনুদিন আমি ছাড়া আর তোর বাপে ছাড়া ঘরের বাইরে এক পাও দিবি না’ –  রোকেয়া প্রায় কঁকিয়ে ওঠে। জোসনা মাথা নাড়ে, ওর চোখ দিয়ে অবিরাম পানি পড়ছিল। ‘মাথা হেলবি না চুন্নির বাচ্চা চুন্নি, হারামজাদি – আল্লাহ্র নামে কিড়া কাইটা ক’, মরা দাদির নামে কিড়া কাইটা ক’ বলতে বলতে রোকেয়াও ডুকরে কাঁদতে থাকে। ‘আল্লাহ্ গো এইডা কি আজাবের মইধ্যে ফালাইলা।’

‘আম্মা, আম্মা শুনেন… আম্মা কাইন্দেন না; আল্লাহ্র কসম, নবীজির কসম, আপনের, আববা আর দাদিজানের কসম, আমি কুনুদিন একা কুত্থাও যামু না।’ রোকেয়া মেয়েকে শক্ত করে ধরে একদম কোলের কাছে নিয়ে আসে আর জোরে জোরে দোয়া পড়তে থাকে।

মেয়ের কাছ থেকে সব শোনার পর রোকেয়া জায়গাতেই বহুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসেছিল। না উঠতে হবে, উঠান ঝাড়ু দিয়ে রাতের জন্য অল্প কয়টা ভাত চড়াতে হবে – ভাবে রোকেয়া আর স্বামীকে সব না বলা পর্যন্ত সে শান্তি পাচ্ছে না। ফিরুক আগে, বেশি রাত করে ফিরলে কালকে সকালেই না হয় বলবে। রোকেয়ার দমবন্ধ লাগে; মনে চায় সোজা দিলদারের বাড়ি গিয়ে তার বউকে সব বলে আসে কিন্তু সেটা সম্ভব না!

 

চেয়ারম্যান সাহেব কখনো মুখে বা আকারে-ইঙ্গিতেও দিলদারকে লুকিয়ে রাখতে বলেননি। কিন্তু রহমত এতোদিন ধরে চেয়ারম্যান সাহেবের কাজ করছে যে, এখন আর অনেক কিছুই তাকে মুখ ফুটে বলতে হয় না; ইশারাই কাফি! তিনি রহমতের বিচক্ষণতায় অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়েছেন। গেল নির্বাচনের সময় তার ব্যক্তিগত গোপনীয় কাজগুলো দিলদারই করেছে। রহমত তার খাস-লোক – এটা গ্রামের সবাই জানে, তাই সবকিছু রহমতকে দিয়ে করানো সম্ভব হয়নি। দিলদারকে শাস্তি দিলে তার বিরাট অসুবিধা হবে, এটা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেন তিনি। নিজের স্বার্থেই দিলদারকে এই ঝামেলা থেকে বাঁচাতে হবে, কোনো উপায় নেই। কিন্তু এই ঘটনায় দিলদারের ওপর তিনি যারপরনাই নাখোশ হয়েছেন।

‘শুয়োরের বাচ্চা শুয়োর, লাগাইতে চাস গ্রামের বাইরে যা, গ্রামের ভিতরে এইসব কী। আরে এইগুলার জন্মের কোনো ঠিক আছে নাকি – ছোটজাত!’ থক করে একদলা থুতু ফেললেন।

রহমতের এসব দোষ নেই – বরং বউয়ের সামনে এতো বড় তাগড়া লোক একেবারে ইচা হয়ে থাকে। তবে রহমতের ভয়ংকর রকম টাকার খাই – টাকার জন্য করতে পারে না এমন কাজ এই দুনিয়ার বুকে নেই। আর একবার যদি কারো টাকা সে খায়, তাহলে আজন্ম তার পোষা কুকুর। এই শ্রেণির মানুষ চেয়ারম্যান সাহেবের খুবই পছন্দ। মনিবের জন্য সব কাজ সে নিঃশব্দে করে রাখবে কিন্তু কাকপক্ষীও টের পাবে না। এই যেমন দিলদারকে যে সে কথায় লুকিয়ে রেখেছে এই খবর কিন্তু খোদ চেয়ারম্যান সাহেবও জানেন না। লাঠিয়ালদের দিয়ে সে দিলদারের বাড়ির সামনে রাতভর পাহারা দেয়ালো আবার কখন সেই পাহারাদারদের নাকের ডগার সামনে দিয়ে দিলদারকে পগাড়পার করলো, কেউ বলতেও পারলো না – এই হচ্ছে রহমতের মুনশিয়ানা। এইসব ভাবতে গিয়ে গদগদ হয়ে পড়েন তিনি; রহমতের জন্য অত্যন্ত স্নেহ অনুভব করেন। এই রকম একটা লোককে খাস-লোক হিসেবে পাওয়া অতীব ভাগ্যের ব্যাপার। সব ঝামেলা মিটে গেলে তিনি নিজে রহমতের হাতে দশ হাজার টাকা গুঁজে দেবেন বলে ঠিক করলেন।

দিলদারকে কোথায় রাখা হয়েছে সেই বিষয়ে চেয়ারম্যান সাহেবের অবশ্য বেশ ভালোই ধারণা আছে। থাক এই নিয়ে আপাতত তার না ভাবলেও চলবে, রহমত তো সামাল দিচ্ছেই – এই চিন্তায় আরামবোধ করেন তিনি। বিষয়টা থেকে যত দূরে থাকা সম্ভব ততই শ্রেয়।

তবে মেয়েটার জন্যও তার খারাপ লাগছে, খুবই খারাপ লাগছে তিনি আর যাই হোন পশু তো আর না; তার অন্তরেও দয়ামায়া সবই আছে। কিন্তু কী করবেন, তার হাত-পা এক অর্থে বাঁধা। কথায় আছে নিজে বাঁচলে বাপের নাম। নিজেই যদি বিপদে পড়েন তাহলে গ্রামের মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াবেন কীভাবে। সেই দিক দিয়ে বিবেচনা করলে গ্রামের এতোগুলি মানুষের উপকারের জন্য একজনের জীবন তুচ্ছ করাই যায়। এর একটা চমৎকার ইংরেজি আছে, কোলেটারল ড্যামেজ – আমেরিকা প্রবাসী ছেলের কাছ থেকে শব্দটা শিখেছিলেন তিনি। ঠিক সময় মনে পড়ায় আহ্লাদিত বোধ করলেন। তাছাড়া ফায়দা আরও আছে, এই উছিলায় গ্রামের যুবতী মেয়েদেরও একটা শিক্ষা হবে, বাড় আজকাল সবারই বেড়েছে।

 

ইমাম সাহেব সালিশে উপস্থিত গ্রামের লোকজনের উদ্দেশে দরাজ গলায় বললেন, ‘কোরআন মজিদের চবিবশ নম্বর সুরা             আন-নূরের দুই নম্বর আয়াতে আল্লাহ্পাক স্পষ্ট বয়ান করেছেন, জেনাকারীর শাস্তি একশ দোররা – পুরুষ-মেয়েছেলে ভেদাভেদ নাই। আল্লাহ্র বিচার সমান!’

‘হুজুর বিচার সমান কই? দিলদারে ভাগছে, আইজ বিচার তো একজনেরই করবেন। না কী?’ ভিড়ের মধ্যে থেকে একজন অল্পবয়সী ছেলে বেশ জোরের সঙ্গেই জানতে চায়।

সাঁই করে ইমাম সাহেবের মাথা ছেলেটার দিকে ঘুরে যায়, তিনি স্থির চোখে তাকান, ‘এই ধরনের প্রশ্ন মানেই হইলো ঈমানে জুত নাই। আজকে গেরামছাড়া হইছে কিন্তুক তারে ফিরতে হবে না? আইজ না হোক কাইল না হোক আখেরাতে এই পাপীর বিচার হবে – হবেই হবে।’

‘ফুজুল আলাপে সময় নষ্ট করার দরকার নাই।’ চেয়ারম্যান সাহেব গলা পরিষ্কার করেন। ‘তোর নাম আবুল না – এইবার ইন্টার পরীক্ষা দিছস; বাপে কই, সালিশে দেখি না ক্যান। মন্ত্রী-মিনিস্টার হইছে নাকি? ফালতু কথা কওনের আর জায়গা পায় না! বাপেরে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলবি।’

আবুল কাঁচুমাচু খেয়ে যায়, কোনো উত্তর দেয় না, একসময় সালিশ থেকে সুরুৎ করে বেরিয়ে গেল।

বিচার শুরু হলো। বিচারের সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব ইমাম সাহেব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। তার ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে আজকের বিচারের ওপরই এই গ্রামের সকল মানুষের ইহকাল-পরকাল নির্ভর করছে। এই রকমটাই হোক চেয়েছিলেন চেয়ারম্যান সাহেব, ইমাম সাহেব থাকবেন পুরোভাগে আর তিনি আড়ালে। আবার আড়াল এমন না যে, মানুষ তাকে দেখতেই পেল না। এতে সাপও মরবে আবার লাঠিও ভাঙবে না। তিনি এমনকি বুদ্ধি করে গঞ্জের চৌকি থেকে দুইজন পুলিশকেও আনিয়ে রেখেছেন। কিছুই বলা যায় না কখন দরকার পড়ে। না, চালে এখন পর্যন্ত কোনো ভুল হয়নি – সবদিক বিবেচনা করে তিনি বেশ আত্মতুষ্টি অনুভব করলেন।

জোসনা খুব ভয় পেয়েছিল। মাকে ও সবকিছু খুলে বলতে পারেনি। কোন মুখে বলবে যে দিলদার কাকা পেছন থেকে এসে ওর বুকে হাত দিয়েছে। মনে হলেই ওর গা ঘিনঘিন করতে থাকে, এই ছোট্ট একরত্তি শরীরটা লুকানোর দরকার হয়ে পড়ে। বাড়ি ফিরে এসে মায়ের কোলের কাছে সেঁটে ছিল ও, একদম নড়েনি। রোকেয়া একসময় উঠে গিয়ে সংসারের কাজে গেল তারপর রাতের খাওয়া জোসনার বিছানার কাছে এনে ওকে লোকমা করে খাইয়ে দিলো। মায়ের হাতের মাখাভাত পরম তৃপ্তিতে খেলো মেয়েটা, ‘আহা রে, দুফর বেলা একটা দানাও পেটে পড়ে নাই’ – গভীর মমতা অনুভব করে রোকেয়া। এক গ্লাস পানি ঢকঢক করে খেলো জোসনা, তাও যেন তৃষ্ণা মেটে না। রোকেয়া কাঁসার গ্লাসে আরেক গ্লাস পানি এনে দিলো। দাদির যত্নে তোলা কাঁসার গ্লাসের পানি ওদের চার ভাইবোনেরই খুব প্রিয় – এই গ্লাসে পানি ঢাললেই নাকি মুহূর্তে শীতল হয়ে যায় আর তার স্বাদ বদলে যায়, পানিতে হালকা মিষ্টিভাব চলে আসে। সবই মনের খেয়াল তবু সবেধন নীলমণি এক জোড়া গ্লাস নিয়ে নিত্যই ঝগড়া হয় ওদের ভাইবোনদের মধ্যে। সেই গ্লাসে পানি আনা মাত্র এর শেষ বিন্দুটা পর্যন্ত নিঃশেষে পান করলো জোসনা – বিছানায় শুয়ে পড়লো আবারও। কাউকে চেহারা দেখাতে ইচ্ছা করছে না ওর।

রত্না মিথ্যাই কয়েকবার এসে জিজ্ঞাসা করলো, ‘বুজান ও বুজান – বুজানের কী হইছে আম্মা?’ কিন্তু মা বা বোন কারও কাছ থেকেই সোজা কোনো উত্তর পেল না। শফি-রফি ‘বুজানের জ্বর হইছে, বুজানের জ্বর হইছে’ বলে উঠানজুড়ে চরকি খেতে লাগলো। যেন বুজানের জ্বর হওয়াটা অত্যন্ত আনন্দের বিষয়। শেষ পর্যন্ত মায়ের কাছে প্রচন্ড ধমক খেয়ে দুই ভাই কিঞ্চিৎ দমে গেল।

সন্ধ্যা পার করে রাত গভীর হয়-হয় সময় কুতুব মিয়া বাড়ি ফিরলো। এতো ক্ষুধার্ত আর ক্লান্ত ছিল যে এসেই কোনোমতে  হাত-পা ধুয়ে ভাতের বাটি নিয়ে বসলো। রোকেয়া জোসনা বিষয়ে স্বামীকে সেই মুহূর্তে কিছুই বলবে না বলে মনস্থির করে। আজকে কোনো কিছু শোনার শক্তিও নেই কুতুর মিয়ার। কালকে বরং নাশতা খাওয়ার পরে বলবে তারপরে স্বামীকে রেশমির বাপের কাছে পাঠাবে – কারো না কারো কাছ থেকে তো বুদ্ধি নিতেই হবে। রোকেয়ার হাত-পা ভয়ে পেটের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। তার ক্ষীণ সন্দেহ হচ্ছে মেয়ে তাকে সবকিছু বলেনি। এই মুহূর্তে শাশুড়ির বেঁচে থাকাটা খুব জরুরি ছিল – সবার সঙ্গে তো এই বিষয় নিয়ে শলা-পরামর্শ করা সম্ভব না। স্বামীর পাতে এটা-ওটা দিতে দিতে এইসবই ভাবছিল রোকেয়া কিন্তু ঠোঁট-সেলাই আর কুতুব মিয়াও অতিরিক্ত ক্লান্তির কারণে বিষয়টা লক্ষ করলো না। অন্যদিন হলে হাটবার থেকে আসামাত্র কত প্রশ্ন থাকতো বাচ্চাদের আর তার। আজকে অবশ্য বাড়ি ফিরতে ম্যালা দেরি হয়েছে, এতো দেরি কুতুব মিয়ার সচরাচর হয় না।

‘পুলাপাইন কই, রাও নাই দেহি?’ কুতুব মিয়া বিছানায় শুয়ে ঘুমচোখে স্ত্রীর কাছে জানতে চাইলো; কিন্তু স্ত্রী যে কী উত্তর দিলো তা আর শোনা হলো না; এমন মরা ঘুমে ধরলো তাকে। স্বামীর পায়ের কাছে কিছুক্ষণ বসে থেকে মেয়েদের সঙ্গে শুতে গেল রোকেয়া। জোসনা দাদির পুরনো কাঁথা দিয়ে মাথা পর্যন্ত ঢেকে শুয়ে আছে। রত্না ঘুমিয়ে কাদা কিন্তু জোসনা জেগে আছে বলে মনে  হলো রোকেয়ার – নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকলো মেয়ের দিকে, কোনো কথা বলার চেষ্টা করলো না। দুই মেয়ের মাঝখানে বসে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ একশবার পড়ে মেয়ে দুটার মাথায় ফুঁ দিয়ে দিলো তারপর উঠে গিয়ে স্বামী আর ঘুমন্ত শফি-রফির মাথা, শরীরে ফুঁ দিয়ে এলো। মনটা খুবই দুর্বল হয়ে আছে তার, কিছুতেই শান্তি লাগছে না।

 

খুব বিহানে, যখন রাতা মোরগের ঘুম ভাঙে আর সে রাজকীয় চালে হেলেদুলে হাঁটে এবং তার গগনবিদারী ডাকে পৃথিবীর মানুষকে আলসি ভাঙতে বলে ঠিক তখন রোকেয়ার দুই চোখ বুজে এসেছিল আর তখনই বজ্রপাতের মতো নিজের বুকের ধড়াস শব্দে নিজেই ঠায় উঠে বসলো। রোকেয়ার মনে হলো মাত্র মুহূর্তকালের জন্য তার চোখ লেগেছিল, এর বেশি কিছুতেই না অথচ এরই মধ্যে জোসনা পাশে নেই, কই গেল!

‘রত্না, রতণা… জুসনা কই?’ রত্নাকে হ্যাঁচকা টানে একদম শোয়া থেকে বসিয়ে দেয় সে। মায়ের বুকের ত্রাসের স্পর্শে রত্না জমে যায়। ‘বুজান পিসাব করতে গেছে। আমারে ডাকছিল…’  কথা শেষ করতে পারে না রত্না, রোকেয়ার মনে হলো কেউ যেন একটানে তার শরীর থেকে আত্মাটা বের করে ফেলেছে, সে বাতাসের আগে আগে ছুটলো।

তখনও অাঁধার ঠিক করে কাটে নাই। পিসাবখানার কাছে এসে রোকেয়া দেখলো আধভাঙা টিনের দরজাটা হাঁ করে খোলা। আশেপাশে পাগলের মতো এলোপাতাড়ি খুঁজেও জোসনাকে দেখলো না রোকেয়া। জোরে নাম ধরে ডাকতে ভয় পেল। চাপা গলায় ডাকলো, ‘জোসনা… আম্মা, আম্মা গো।’ কোনো শব্দ নেই। একটু দূরে বাঁশঝাড়ের জঙ্গলায় কিছু কি চোখে পড়ে তার। প্রাণ হাতে নিয়ে ছুটে যায় – জোসনা পড়ে আছে উপুড় হয়ে, যেন ভেসে আছে; অল্প কাতরাচ্ছে – বেঁচে আছে, বেঁচে আছে ও। নিজের মুখে সজোরে হাতচাপা দিয়ে আর্তনাদ গিলে ফেলে রোকেয়া।

তারপর সে আশ্চর্যরকম শান্ত হয়ে যায়। একঝটকায় পরনের শাড়ি খুলে মেয়েটার ওপর বিছিয়ে দেয়। ‘পায়জামা কই?’ চোখে হাতড়ায়, বাঁশঝাড়ে ঝুলছে খুঁজে পায়; আরো একটা জিনিস দেখে ঘৃণায় দুই পা পিছিয়ে যায়, মাথা মুহূর্তের জন্য টলে যায় তার; পায়জামা হাতে নিয়ে ধীরপায়ে মেয়ের কাছে ফিরে আসে সে। হঠাৎ শোনে রত্নার গলা, ‘আম্মা, আম্মা…।’

‘চুপ, এইদিকে আয়।’ তখন কী মনে হয় রোকেয়ার সে চট করে আবার বাঁশঝাড়ের কাছে ফিরে গিয়ে জিনিসটা তুলে নেয়। আবার চাপা গলায় ডাকে, ‘রতন এই যে…’ –

এগিয়ে এসে যে-দৃশ্য দেখলো সেই দৃশ্য দেখার জন্য রত্নার জন্ম হয়নি; তবু টুঁ-শব্দ করলো না। শুধুমাত্র ছায়া-জামা পরা মায়ের দিকে নিজের ওড়নাটা বাড়িয়ে দিলো।

শাড়ি দিয়ে কোনোভাবে পেঁচিয়ে জোসনাকে বাড়ি নিয়ে এলো ওরা। শুকিয়ে যাওয়া এবং তাজা রক্তের ধারা মিলেমিশে যোনিদেশে, ঊরুর ভাঁজে, হাঁটু ছাড়িয়ে পায়ের পাতা অবধি লেপ্টে আছে। রোকেয়া ওকে সোজা কলতলায় নিয়ে গেল। কলতলারই একটা পাশ গোসলের জন্য বেড়া দিয়ে আড়াল করা। সেখানে মেয়েটার শরীর থেকে পেঁচিয়ে পরানো শাড়িটা খুলে সরালো, মেয়েটা ঘাড় গুঁজে নিঃসাড় দাঁড়িয়ে ছিল। রত্নাকে শক্ত করে ধরতে বলে জোসনার কামিজ খুললো সে। এরপর দুই কলসি পানি দিয়ে মেয়েকে গোসল করালো। মাটিতে বসে পড়ে ভেজা শাড়ি দিয়ে ঘষে ঘষে রক্তের দাগ তুললো। গোঁয়াড়ের মতো ঘষছিল রোকেয়া আর তার দাপটে জোসনা ভীষণ টলতে থাকে। রত্না শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়েও ওকে স্থির করে ধরে রাখতে পারে না। ঘষতে ঘষতে গায়ে লেপ্টে থাকা রক্ত তার নিচের চামড়া পর্যন্ত যেন উঠিয়ে ফেলবে সে। ‘আম্মা থামেন, বুজানের দুঃখু লাগতেছে’, – রত্নার গলা আর্তচিৎকারের মতো শোনায়, রোকেয়ার সম্বিৎ হয় না।

জোসনাকে কাপড় পরিয়ে ঘরে নিয়ে আসে মা-মেয়ে; আনার সময় রোকেয়া টের পায় স্বামীর ঘুম ভেঙেছে। বহু যত্নে মাটিতে পাতা বিছানায় জোসনাকে আলগোছে বসালো যেন বহু মূল্যবান ঝাড়বাতি দিয়ে তৈরি! বিছানায় বোনকে বসিয়েই রত্না আচমকা ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে যায়। রোকেয়া ভ্রূক্ষেপ করে না, সে ধীরে জোসনাকে শুইয়ে দিলো – ওর গা গরম মনে হয়। কাঁথা দিয়ে ওকে সম্পূর্ণ ঢেকে দেয় আর তখনই ঘরের বাইরে থেকে ছোট মেয়ের হড়হড় করে বমি করার শব্দ শুনতে পায়। চুপ করে শোনে রোকেয়া; বমির শব্দ থামতেই রত্নাকে ডাকে, ‘রত্না, জোসনার পাশে আইসা বয় – কুলি কইরা আয়।’

রত্না স্বাভাবিক চেহারায় ফিরে আসে। অদূরে ঘুমিয়ে-কাদা হয়ে থাকা দুই ছেলের দিকে একবার তাকায় রোকেয়া তারপর রত্নাকে বলে, – ‘শফি রফি উঠলে, জুসনার কাছে যাইতে দিস না – খাইতে চাইলে খই আর কলা দিস। পাকঘরে ড্যানো দুধের ডিববায় খই আছে’ –  রত্না মায়ের নির্দেশে মাথা নাড়ে। জোসনার কপাল আরেকবার পরখ করে রোকেয়া, – না গায়ের তাপ আগের মতোই আছে; তারচেয়ে বাড়েনি। মাটির দেয়ালের দিকে মুখ করে জোসনা নিথর হয়ে পড়েছিল; শরীরে জীবনের কোনো চিহ্ন নেই।

রোকেয়ার এখন নিজেকে শক্ত রাখতে হবে। স্বামীকে বলতে হবে, সে জানে তার মেয়ের এই দশা কে করেছে;  দিলদারের গেঞ্জি ঝোপ থেকে সে তুলেও এনেছে সুতরাং প্রমাণ আছে। বহুবার দিলদারের পরনে সে এই গেঞ্জি দেখেছে।

রোকেয়া তাদের ঘরের সামনে স্থাণুর মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে নিজেকে গুছিয়ে নিলো; আস্তে করে ঘরে ঢুকে কাঠের দরজায় খিল দিলো। বহু বহুক্ষণ ভেতরে কবরের নিস্তব্ধতা বিরাজ করে; একসময় কুতুব মিয়ার বুকচেরা গোঙানি পলকা দরজার  ফাঁক-ফোকর গলে বাইরে বেরিয়ে আসে, ‘আমার জুসনা আম্মা, আম্মা… আম্মা গো’।

 

সালিশ বসবে স্কুলঘরের সামনে – এই খবর সকালবেলা নিয়ে এলো চেয়ারম্যান সাহেবের খাসলোক রহমত সিকদার। কুতুব মিয়াকে বিকাল চারটার মধ্যে জোসনাকে নিয়ে হাজির থাকতে হবে। মাগরিবের আগেই বিচার শেষ করতে চান ইমাম সাহেব। যাওয়ার সময় হালকা হুমকিও দিয়ে গেল, ‘কুতুব মিয়া উলটাপালটা কইরও না কইলাম। মেয়ে রে নিয়া আপসে আসলে আপসে সব মিটা যাইব। এক ঘণ্টার মাত্র মামলা। এইডা হইতেছে গিয়া ঈমানের পরীক্ষা, হুদা তুমার একলার ঈমান হইলে একটা কথা ছিল; কিন্তু এইডা পুরা গেরামের ঈমানের পরীক্ষা। আরে মিয়া, মাইয়া তুমার আরেকখান আছে, বুইঝো কিন্তু’।

কুতুব মিয়া বিড়বিড় করে কিছু একটা বললো কিন্তু কী যে বললো বোঝা গেল না, খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে রইলো। রহমত বেরিয়ে যাওয়ার পর একদলা থুথু গড়িয়ে পড়লো ঠোঁট বেয়ে তার সঙ্গে দুটা শব্দ, ‘আল্লাহ্ মাবুদ’।

ভোর থেকে রোকেয়া জোসনাকে নিয়ে জায়নামাজে বসে আছে। জোসনা বসেনি উপুড় হয়ে শুয়ে ছিল। যতবার সেদিকে চোখ পড়ছে ধক্ করে উঠছে রোকেয়ার বুক। গতকাল বিহানে ঠিক এইভাবেই পড়ে থাকা মেয়েটাকে খুঁজে পেয়েছিল সে। রোকেয়া একটার পর একটা সুরা পড়ছে আর ওর গায়ে ফুঁ দিয়ে দিচ্ছে। মাথাভর্তি চুল মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে মেয়েটার। রত্না কাঁকই নিয়ে এসে বহু যত্নে আস্তে আস্তে বোনের চুলের জটা ছাড়ালো; কিন্তু ওকে একটুও নড়ালো না, সরালো না – মায়ের শাড়ির ছিঁড়া টুকরা দিয়ে হালকা করে বেণি বেঁধে দিলো। তারপর চুপ করে বসে থাকলো, একটু পরপর শুধু হেঁচকি উঠছে রত্নার – পানিও মুখে দিতে পারছে না। একসময় উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা বোনের পাশে ওড়না দিয়ে চোখ-মুখ ঢেকে নিজেও শুয়ে পড়লো।

রোকেয়া এমনিতে ধোয়া শাড়ি বিছিয়েই নামাজ পড়ে ফেলে; কিন্তু কালকে শাশুড়ির বহু পুরনো জায়নামাজ বের করেছে। জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে গেছিলো, দুই মেয়েকে পাশে বসিয়ে সেলাই করলো তারপর সেটা বিছিয়ে তাতেই বসে রইলো। এখনো সেটাতেই বসা। নামাজ কিন্তু পড়া হলো না ঠিক করে। বারবার দোয়া পড়তে ভুল হচ্ছে।

কখন রত্না এসেছে, পাশে শুয়েছে ঠাহর হয়নি রোকেয়ার। ক্লান্ত চোখে তাকালো ওদের দিকে। ওরা এভাবে শুয়ে আছে কেন কিছুক্ষণ মাথায় এলো না। বোধ-বুদ্ধি সব লোপ পাচ্ছে। একসময় সেও শুয়ে পড়লো দুই মেয়ের পাশে। জায়নামাজ থেকে উঠে আসা পুরনো দিনের গন্ধে বুকের ভেতর বান ডাকে, নিঃশ্বাসের কষ্ট হয় রোকেয়ার। ভেতর থেকে যন্ত্রণার মতো বেরিয়ে আসে, ‘আল্লাহ্, আমার মেয়েটারে বাঁচাও!’

জোসনাকে দেখে বোঝার উপায় নেই ওর জ্ঞান আছে কী নেই। ও একচুলও নড়ে না, শুধু রত্নার হেঁচকি বেড়ে যায়। ছেলে দুটাও কখন মায়ের পায়ের কাছে এসে শুয়ে পড়েছে ওরা কেউ টের পায়নি। মাটির মেঝের ঠান্ডা ওদের নিস্তেজ করে দিলো।

জোহরের নামাজ শেষ করে পায়ে পায়ে ঘরের দরজার কাছে এসে উঁকি দিলো কুতুব মিয়া। কালকে থেকে ছেলে দুটাকে একবারের জন্যেও নজরে পড়েনি। এখন একসঙ্গে সবাইকে দেখে কলিজায় মোচড় পড়ে তার। পাঁচটা লাশ যেন চোখের সামনে শয়ান। মাটির মেঝেতে বিছানো জায়নামাজকে কেন্দ্র করে পড়ে আছে স্ত্রী, দুই কন্যা আর দুই পুত্র। কুতুব মিয়াও নিঃশব্দে তাদের পাশে জায়গা নিলো।

কতক্ষণ শুয়েছিল কুতুব মিয়া জানে না। একসময় সে সটান উঠে বসে, একলাফে কলিজা গলা দিয়ে বেরিয়ে যেতে চায়। হাঁপরের মতো নিঃশ্বাস নিয়ে সে নিজেকে ধাতস্থ করলো। নিষ্প্রাণ শরীরগুলোর দিকে অসহায় তাকিয়েছিল। আলতো করে স্ত্রীকে ডাকলো, ‘রোকেয়া উঠো। সময় হইছে। জোসনার মুখে কিছু দিয়া ওরে তৈয়ার কইরা দেও।’

রোকেয়া যন্ত্রের মতো ঠায় উঠে বসে, ফ্যালফ্যাল করে স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ‘রেশমি খাওন দিয়া গেছে। ভাইরে নিয়া পিছনের বেড়া দিয়া ঢুকছিল। নিজেও কিছু মুখে দেও। কেউ তো কিছু খায় নাই।’

স্বামীর কথা কতটা কানে গেল বা বুঝলো কে জানে, রোকেয়া সোজা উঠে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। খাবারের কথা শুনে ধীরে উঠে বসে শফি-রফি। মুখ শুকিয়ে এইটুকুন হয়ে গেছে দুই ভাইয়ের। ‘ভুখ লাগছেনি বাবা?’ নিঃশব্দে মাথা নাড়ে ওরা।

একটা বড় প্লাস্টিকের বাটিতে ভাত, ডাল আর ঝাল আলু ভাজি দিয়ে গেছে রেশমি। সেই বাটিতেই সব একসঙ্গে মেখে ফেললো রোকেয়া। ছেলে দুটা খেলো, কুতুব মিয়া খেলো, রত্না টপটপ চোখের পানি ফেললো আর মায়ের দেওয়া দুই-তিন লোকমা মুখে নিলো। রোকেয়াও ভাত মুখে দিলো। নিজেকে তার রাক্ষুসী মনে হলো, মনে হলো সে নিজের আত্মজার মান, সম্ভ্রম, চোখের পানি, চুলের ঘ্রাণ চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছে। শুধু জোসনাকে খাওয়ানো গেল না।

মা-বাপের মুখের দিকে তাকিয়ে দুবার চেষ্টা করলো হাঁ করতে। হাঁ করতেই নাড়িভুঁড়িসুদ্ধ উঠে আসছে ওর। মুখের ওপর হাত চাপা দিয়ে ভেতর থেকে উগড়ে আসা তিক্ত চুকা স্বাদ গিলে ফেললো। গা ঘিনঘিন করে ওঠে জোসনার।

‘গরম ভাত ফুটায় রাইখো। সালিশ থিকা ফিরা আইসা খাবেনি।’ কুতুব মিয়া রোকেয়াকে বললো, গলা ভীষণ ধরে আসছে তার, বশে আনা যাচ্ছে না। ‘জুসনারে আম্মার বুরখাটা পরায় দেও।’

থরথর করে কাঁপছিলো জোসনা। রত্না দুই হাতে শক্ত করে বোনকে ধরে ছিল। হঠাৎ একঝটকায় বোনকে ছাড়িয়ে বাপের পা ধরে ফেলে ও, ‘আববা, আমি যাইতাম না।’ এতো ক্ষীণ স্বর যে কান লাগিয়ে রাখলে তবে শোনা যায়। তবু ঘরের প্রতিটা মানুষের কানে বাক্যটা তালা লাগিয়ে দিলো।

কুতুব মিয়ার মনে হলো সে তলিয়ে যাচ্ছে, নিজেকে গভীর গহবর থেকে টেনে তুলে মেয়ের পাশে উবু হয়ে বসে ওর মাথাটা বুকের মধ্যে নিয়ে এলো, ‘ডর নাই গো মা। ইমাম সাহেব সব জানেন; আমি কাইল তারে সব বইলা আসছি। তয় গেরামের মুরুবিবরা দুইটা কড়া কথা কইলে কষ্ট নিস না। হেরা তোরে ছুডো থিকা দেখছে, বকাঝকা দিব। উঠ্ মা, আমার সাথে যাবি।’

রোকেয়া মেয়েকে তৈরি করে দেয়। জোসনার চোখের নিচে জমাট অন্ধকার, আঁচলের প্রান্তে থুথু দিয়ে তা মুছে ফেলতে চেষ্টা করে। কালো বোরখার মধ্যে জোসনা ফুটে থাকে – একপলক তাকিয়ে রোকেয়া মেয়ের কপালে চুমু খায়। ‘আমারে মাপ দিস।’

বাপের হাত ধরে জোসনা ঘর থেকে বের হওয়ার পর থেকেই রত্না দরজার আড়ালে গিয়ে উবু হয়ে বসে থাকল। ওইখান থেকে তাকে আর নড়ানো যায়নি। শফি আর রফি ঠিক বুঝতে পারছে না কী হচ্ছে। গতকাল সকাল থেকেই তাদের দুনিয়া যে আর আগের মতো নেই সেটা শুধু অনুধাবন করেছে। সারাদিন দুই ভাইয়ের কোথাও গিয়ে লুকিয়ে থাকতে মন চাইলো।

মাগরিবের আগেই বাপের হাত ধরে জোসনা ফিরবে। আহা রে, কচুর শাক দিয়ে শুঁটকির বড়া থাকলে সেই গন্ধেই মেয়েটা একথালা ভাত খেয়ে নিতে পারে। রোকেয়া আচানক তাড়া অনুভব করে। বেশি সময় নেই ভাত চুলায় বসিয়ে বড়া বানিয়ে ফেলবে, চার-পাঁচটা বড়া বানাতে কতোক্ষণ আর লাগবে।

 

সালিশের কোনো কিছুর সঙ্গেই জোসনার কোনো সাঁৎ নেই। ও শুধু বাপের পাশে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে। একবার শুধু কানে গেল দিলদার পালিয়েছে, কোথাও তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তখন মুহূর্তের জন্য মনে হলো পা দুটা ওর মোমের মতো গলে যাচ্ছে। তারপর কখন সালিশ থেকে বাপকে টেনেহিঁচড়ে বের করা হলো, কখন তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য সালিশের ঠিক মাঝখানে এনে দাঁড় করানো হলো – এইসব কিছুই ও বলতে পারে না। একটা প্রলয় শুধু ওকে কেন্দ্র করে প্রবল পাকিয়ে উঠলো জলে স্থলে অন্তরীক্ষে আর বেদম ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেল – শরীরের সীমানা ছাড়িয়ে, বোধের আঙিনা পেরিয়ে হুঁশ করে উঠে গেল! ভীষণ ধুলার মাতম তখন পায়ের নিচের মাটি কাঁপিয়ে দাপিয়ে তীব্র ছুটেছে দিগ্বিদিক।

প্রথম আঘাতটা যখন পিঠে পড়লো জোসনার মনে হলো, আঘাতের জায়গাটায় তেরচা করে আগুন ধরে গেছে। পঞ্চম আঘাতে জ্বলুনি পিঠ চিরে কলিজা স্পর্শ করলো, দশম আঘাতে মাথার ভেতরটা ঝনঝন করতে লাগলো। গোল গোল চোখ দুটা কোটর ছেড়ে লাফ দিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইলো, সেটা কী পঞ্চদশ বারের বার! সত্তরতম আঘাতে জোসনা কুন্ডুলি পাকিয়ে মাটিতে হেলে পড়লো – আতখা; কোনো পূর্বাভাস না দিয়েই শরীরটা নিম্নমুখী হলো, যার কারণে একাত্তরতম কঞ্চির বাড়ি ওর পিঠে লাগতে পারেনি এবং সম্মুখবর্তী গতির কারণে বাড়ি প্রদানকারীও তার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি। সেও বেসামাল হয়ে জোসনার পাশে ভীষণ হুমড়ি খেলো।

ঢলে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে এক দমক রক্ত জোসনার ভেতর থেকে উগলে এসে থপ করে মাটিতে পড়তেই মাটি ওর রক্তের শেষ বিন্দুটা পর্যন্ত শুষে নিলো। তারও বহুক্ষণ পরে সময়ের চাইতে ধীরলয়ে এই মাটির পৃথিবী জোসনার চোদ্দো বছরের দুমড়ানো-মুচড়ানো পড়ন্ত শরীর নিজের দিকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে নেয়। তখনই জোসনার রুহ একঝটকায় আকাশে উঠে যায় শূন্যে, আর ওর শরীরটা মুহূর্তক্ষণ কেঁপে স্থির হয়ে যায়।

জোসনার আরামবোধ হয়। আসলে কিছুই বোধ হয় না আর তাতেই কী আশ্চর্য শান্তি লাগে। ওপর থেকে ও স্পষ্ট উপলব্ধি করে চেয়ারম্যান সাহেবের খাসলোক রহমত শিকদার কঞ্চি হাতে উঠে বসার চেষ্টা করছে। গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে সত্তরটা বাড়ি মেরেছে সে। হাতের মুঠি কঞ্চির ভেতরে যেন কেটে বসে গেছে।

ইমাম সাহেব শিরদাঁড়া খাড়া করে বললেন, – ‘বেচেন হওয়ার কিছু নাই – আল্লাহপাকের রহমত দেখবেন আইজ। জেনার মতো কঠিন গুনাহ করার পরও বান্দারে ছাইড়া যান নাই তিনি। তাঁর দয়ার উসিলায় বৃষ্টি হবে, বৃষ্টি আল্লাহর নিয়ামত। এই নিয়ামতের গুণে মাইয়ার অপবিত্র শরীর ধুইয়া-মুইছা যাবে, পাপের বিনাশ হবে।’ ইমাম সাহেব আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে সুরা পাঠ করেন। আল্লাহ্পাকের এই ইশারায় তাকে অত্যন্ত বিগলিত হতে দেখা যায়; তার চোখ বন্ধ হয়ে আসে। ধীরে চোখ খুলে আবারো উপস্থিত সবাইকে আশ্বস্ত করেন, ‘অস্থির হবার কিছু নাই। মাইয়া বেহুঁশ হইছে, জ্ঞান ফিরুক বাকি তিরিশ দোররা পরে দেওয়া যাবে। স্বয়ং আল্লাহপাকের বিচার, আমরা তাঁর হুকুমবন্দ…’ কথা শেষ করতে পারেন না ইমাম সাহেব, আচমকা বাতাসের তোড়ে তার কথা ঢাকা পড়ে যায়।

রহমত একদৃষ্টিতে মাটিতে পড়ে থাকা জোসনার নিথর শরীরটার দিকে তাকিয়ে থাকে, স্পষ্ট দেখতে পায় চোখের পাতি পড়তে না পড়তে জোসনার শরীর একটা তীব্র ঝাঁকুনি দিলো, তারপর আর কিছু না! আসলেই কী কিছু না – কিন্তু সে যে স্পষ্ট দেখলো কী একটা! মনের ভুল হতেই পারে তবু রহমত প্রচন্ড ভয় পেল, এই রকম ভয়ের সঙ্গে তার কখনো পরিচয় নেই। প্রথমে মুখের ভেতরের জিহবা ঠান্ডা মেরে হিম-শীতল হলো তারপর মাড়ি, কণ্ঠনালি, কলিজা। একেবারে বরফ ঠান্ডা যাকে বলে অথচ শরীরের চামড়ার তাপমাত্রা স্বাভাবিক। প্রথমে মনে হলো, সে বোধহয় নড়াচড়া করতে পারবে না, তার সর্বাঙ্গ অবশ হয়ে গেছে। কিন্তু কই না সে দিব্যি হাত-পা-মুখ স্বচ্ছন্দে নাড়াতে পারছে। শুধু শরীরের ভেতরের সব কলকব্জা ঠান্ডায় বিকল হয়ে যাচ্ছে। চেতনার এই অবস্থা সম্পর্কে তার পূর্বজ্ঞান নেই, এর বিন্যাস চেনালোকের বাইরে। রহমত ভয়ে কুঁকড়ে যায়। ‘ইয়া মাবুদ, কী দেখাইলা’ – সেখান থেকে এক অন্ধদৌড় দিতে ইচ্ছা করে তার – মাঠ পার হয়ে, চেয়ারম্যান সাহেবের ধানিজমি ডিঙিয়ে, পাকা মসজিদের উঠান মাড়িয়ে রহমত শুধু বাড়ি যেতে চায়। সে দিশা পায় না উঠে দাঁড়াবে, নাকি জোসনাকে ঠেলা দিয়ে দেখবে। সে টের পায় ঠেলা দিয়ে দেখার কিছু নেই, জান কবজ হতে সে দেখেছে – ‘ফি আমানিল্লাহ’।

সেই মুহূর্তে ইমাম সাহেবের কথায় রহমত বোবা চোখে তাকায়।

‘অস্থির হবার কিছু নাই। মাইয়া বেহুঁশ হইছে, জ্ঞান ফিরুক বাকি তিরিশ দোররা পরে দেওয়া যাবে…’

হাওয়া উঠলো প্রবল। ঝড়ের নিশানা, আশ্বিন মাইস্যা ঝড়। সালিশে যারা উপস্থিত হয়েছিল তারা দ্রুত ঘরে ফেরার জন্য অস্থির হয়ে পড়লো, ঝড় পুরোপুরি নামার আগে বাড়ি পৌঁছানো জরুরি। সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত হতে দেখা গেল ইমাম সাহেবকে। তিনি চেয়ারম্যান সাহেবকে এরই মধ্যে পরামর্শ দিলেন পুলিশ দুটাকে বহাল রাখতে। দরকার হলে তারা স্কুলঘরের ভেতরে অপেক্ষা করুক। পরে ঝড়-বৃষ্টি থামলে মেয়েটাকে নিয়ে কী করা যায় দেখা যাবে।

কিন্তু কে শোনে কার কথা। তুমুল তা বের মধ্যে সব দিগ্বিদিক ছুটছে। চেয়ারম্যান সাহেব বেদিশা হয়ে রহমতকে খোঁজার চেষ্টা করলেন। রহমতের বাঁশের কঞ্চির ডগাটা এক ঝলক দেখেছিলেন বলে মনে হলো, কিন্তু তার আর কোনো চিহ্ন পাওয়া গেল না; তিনি অপেক্ষা করা সমীচীন মনে করলেন না। লাঠিয়ালদের সঙ্গে নিয়ে ঝড়ো বাতাসের মধ্যেই পা চালিয়ে দিলেন, ‘বাড়ি পৌঁছাইতে পারলে শুকুর আলহামদুলিল্লাহ্।’

জমে যাওয়া শরীরের ভেতরটা ঠকঠক করে কাঁপছে রহমতের আর সে প্রাণপণ চেষ্টা করছে থিতু হতে; সেই চেষ্টারই ধারাবাহিকতায় ডানে-বাঁয়ে না তাকিয়ে ঠায় উঠে দাঁড়ালো, কোমরের নিচ থেকে কোনো সার পেলো না যেন জন্মের ঝিঝি ধরেছে। বিঘৎ দূরে জোসনার কিশোরী শরীর নিথর পড়ে থাকে; ঝড়-জল-হাওয়ায় একটুকু নড়ে না শুধু অবাধ্য চুল উড়ে আকুল হয়। দেখবে না দেখবে না করেও নিয়তির অমোঘ নিয়মের মতো রহমতের চোখ সেদিকে ধাবিত হয় আর মেয়েটার নির্ণিমেষ দৃষ্টিতে আমূল আটকা পড়ে যায়। রহমতের সম্পূর্ণ অস্তিত্ব দ্বিতীয়বারের মতো জমাট বাঁধতে শুরু করে। কারো গিয়ে চোখের পাতা বন্ধ করে দিয়ে আসা উচিত; মরা মানুষের চোখ থাকবে বোজা, এইটাই নিয়ম – ভাবলো রহমত কিন্তু মেয়েটার কাছে যেতে সাহসে কুলালো না, দ্রুত সরে পড়ার তীব্র তাড়না শিরায়-স্নায়ুতে-মজ্জায় অনুভব করলো। কেউ একজন তার নাম ধরে ডাকছে। সেই ডাকের তোয়াক্কা করে না সে, প্রবল বাতাস সাঁতরে স্কুল থেকে বেরিয়ে যেতে চায়।

হাঁটছে, দ্রুত হাঁটছে তারপর দৌড় – যেন সময় ডিঙিয়ে যাবে। সমস্ত অস্তিত্বকে ওম দেওয়া প্রয়োজন – এমনটা লাগে রহমতের। কতক্ষণ ধরে যে হাঁটছে বা দৌড়াচ্ছে ঠাহর হয় না তার। দুনিয়া ভেঙে আসছে কিন্তু এরই মধ্যে একটা চেনা ঘ্রাণ মাটির গভীর থেকে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে তার গা বেয়ে লতিয়ে উঠে এসে নাকের কাছে পাক খেতে থাকে। বলক ওঠা ডালে কাঁচামরিচ আর ধনেপাতার কুঁচি ছড়িয়ে দিলে যে সুবাস ছোটে সেই গন্ধ মুহূর্তে তার সমগ্র বোধ-বুদ্ধি দখল করে নেয়। ইহজগতে এই স্বাদ আর পাওয়া হবে না; মৃত্যু হবে তার মৃত্যু হবে – প্রাণের হাহাকার মিশে যায় প্রকৃতির দাপটের সঙ্গে। চলার গতিতে আতকা রাশ টেনে ধরে; হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তে নিজেকে সামলে নিলো রহমত।

‘কাহা, ঠাটা পড়বো! হাঁটু ভাইঙ্গা বইসা পড়েন।’

কাউকে দেখতে পায় না সে কিন্তু স্পষ্ট শোনে। এতক্ষণে তুফান ভেদ করে তাকাতে চেষ্টা করলো রহমত। না, কেউ নেই – চারিদিকে ম-ম করা ধনেপাতার গন্ধে দুনিয়া তোলপাড়।

‘কাহা আল্লার কিড়া লাগে মাটিত শুইয়া পড়েন। না না তেঁতুল গাছের ছেমায় যাইয়েন না। ঠাটা পড়বো কইলাম।’

মেয়েটার গলা বাতাসের তরঙ্গে কেঁপে ভেঙে ছড়িয়ে যায়। এই বিভ্রমের কাছে কোনো প্রশ্ন চলে না। এর উৎস কোথায় সে জানে, সে ঠিকই জানে। সুবোধ শিশুর মতো রহমত বিরান ফসলের জমিতে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে, দুই হাঁটুর মধ্যে মাথাটা ঢুকিয়ে দেয়। এক, দুই, তিন, চার…

প্রচন্ড শব্দে বাজ পড়ে বুকের কাছে কোথাও তারপরই কানে তালা লাগানো প্রকান্ড গর্জন। একসময় ফসলের জমিনে সটান শুয়ে পড়ে রহমত।

‘কাহা, কৎখন চুপ কইরা শুইয়া থাকেন।’

তারপর সুনসান। শুধু কিছুক্ষণ পরপর বজ্রপাতের শব্দ মাটি চিরে যায়, চিলিক দিয়ে ওঠে আসমান তারপর ফালা-ফালা হয়ে এদিক-ওদিক ছিটকে পড়ে।

রোকেয়ার হঠাৎ স্পষ্ট মনে হলো জোসনা সামনে এসে বলছে, ‘আম্মা সবেরে নিয়া ঘরে খিল দেন।’ তখন শুরু হলো তুফান, পাকঘরের ছনের ছাউনি ভেঙে পড়লো আর রোকেয়া তিন সন্তান কলিজার মধ্যে নিয়ে কেয়ামতের অপেক্ষায় প্রহর গুনে চলে।

চেয়ারম্যান সাহেবের দুই লাঠিয়াল আর রহমত সেই কখন কুতুব মিয়াকে টেনেহিঁচড়ে স্কুলঘরের পিছনে নিয়ে এসে কাঁঠাল গাছের সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে রেখে গেছে। রশি দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধার পড়ে কুতুব মিয়াকে তারা প্রচন্ড মারলো, চোর-মারা বিদ্যা যত জানা ছিল সব ঝাড়লো তার ওপর। রহমত মারধরের মধ্যে গেল না; কিন্তু অদূরে দাঁড়িয়ে লাঠিয়ালদের যথারীতি তাতাচ্ছিল – ‘লাঠি কী সাজায় রাখার জন্য তেল মাখস নিহি? হুম্মুন্দির পুতের পুন্দে ঢুকা। মাইরের উপরে অষুদ নাই, কি কছ!’ রহমতের মধ্যে একটা বড়লোকি চাল চলে এসেছে; তাকে উৎফুল্ল দেখালো।

প্রথম দফার আক্রমণ কুতুব মিয়ার ওপর তীব্র আঘাত হেনেছিল কিন্তু কিছুক্ষণ পড়ে তার আর কোনো খবর ছিল না। কতোক্ষণ বেহুঁশ অবস্থায় ছিল কে বলতে পারে কিন্তু একসময় কুতুব মিয়ার মনে হলো কেউ যেন গায়ে ফুঁ দিয়ে দিচ্ছে; আঘাতে কুঁকড়ে যাওয়া শরীরে মলমের মতো আরামবোধ হলো তার। ‘বাজান বাড়িত যান, আম্মা কানতেছে’ – জোসনার কথা স্পষ্ট শুনতে পায় সে। সঙ্গে সঙ্গে তার শরীর টানটান হয়ে যায়। চারিদিকে আতিপাতি দৃষ্টি বুলায়, কোথায় জোসনা! কুতুব মিয়া নিশ্চিত সে ওর আওয়াজ শুনেছে, তাহলে? মাথা পাগল পাগল লাগে।

হাওয়ার তান্ডব সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো কুতুব মিয়ার গায়ে আছাড় খেয়ে পড়ে। চারিদিকে মানুষের ছোটাছুটি, শোরগোল শুনতে পায়। দড়ি টানাটানি করতে গিয়ে সে টের পায় বাঁধন অনেক আলগা হয়ে গেছে। দ্বিগুণ উদ্যমে চেষ্টা চালায় সে। তখনই আবার খুব কাছে থেকে পরিষ্কার শোনে, ‘রশি গইলা বাইর হইয়া আসেন বাজান’ – মুহূর্তে থেমে যায় কুতুব মিয়া, তারপর আলগোছে বাঁধন গলে বেরিয়ে আসে। অস্ফুটে ডাকে, ‘আম্মা, আম্মা…’ তারপর শুধু শুধুই দুই হাত দিয়ে বাতাসের মধ্যে এলোপাতাড়ি খোঁজে।

মানুষ বাড়ি ছুটছে, ভীষণ ঝড় উঠেছে, কারো দিকে কারো তাকানোর ফুরসত নেই। কুতুব মিয়াও এর মধ্যে তার ক্ষত-বিক্ষত শরীরটাকে টেনে নিয়ে স্কুলঘরের দিকে ছুটলো। তার দিকে কেউ ভ্রূক্ষেপও করছে না; সকলে বিপরীতমুখী দৌড়াচ্ছে। প্রবল বাতাসের সঙ্গে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামলো। মাটিতে জোসনা অসাড় হয়ে পড়ে আছে; কেউ নেই আশেপাশে, ঝড় ওকে গ্রাস করেছে। কুতুব মিয়া মেয়ের কাছে এসে হাঁটু ভেঙে পড়ে যায়। চোখের পাতা মেলা যায় না এমন তুফান; সে হাতড়ে হাতড়ে মেয়েকে দেখে, ওর স্পর্শ নেয়।

‘আববা, আল্লাহ্র কসম লাগে ওঠেন’ – কুতুব মিয়া মেয়েকে পাঁজাকোলা করে এলোমেলো পায়ে উঠে দাঁড়ায়। হাওয়া আর জলের বিরুদ্ধে যুঝে নিজের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে আনে তারপর এক পা এক পা করে সামনে এগোয়; রোকেয়া অপেক্ষা করছে, জোসনাকে নিয়ে বাড়ি ফিরবে সে।

মেয়েকে নিয়ে নিজ বাড়ির আঙিনায় ঢুকল কুতুব মিয়া; তুফানে-তান্ডবে প্রেতাত্মার ছায়া ফেলে উঠানের মাঝখানে এসে দাঁড়ায়। ‘রোকেয়া, জোসনারে নিয়া আসছি…’ – কুতুব মিয়ার সর্বগ্রাসী চিৎকারে আল্লাহ্র আরশ কাঁপে না কিন্তু তাঁর সৃষ্ট দুনিয়া দুলে ওঠে।

রোকেয়া, রত্না আর শফি-রফি খিল দেওয়া দরজা খুলে বেরিয়ে এলো। ঘরের দাওয়া থেকে ওরা বৃষ্টির গাঢ় পর্দার ভেতর দিয়ে কুতুব মিয়া এবং তার কোলে নিঃসাড় জোসনাকে দেখতে পায়। কেউ ছুটে আসে না যেন প্রত্যেকের পায়েই দুই-মণী শিকল বাঁধা; ধীরে ওরা কুতুব মিয়া আর জোসনাকে গোল করে ঘিরে দাঁড়ালো।

সারারাত জোসনার লাশ নিয়ে ওরা বসেছিল। লম্বালম্বি হয়ে শুয়ে আছে জোসনা। দাদিজানের কাঁথা দিয়ে ওর শরীর আপাদমস্তক ঢাকা। কাঁথার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে ওর ডান হাত শক্ত করে ধরে থাকে রোকেয়া। কেউ কাউকে বলে না কিন্তু জোসনা প্রত্যেকের মর্মে লাগে। শফি-রফি একসময় ঘুমে ঢলে পড়ে।

তারপর বিহান বেলা – ফজরের আজানের ডাক সবে যখন বাতাসের সঙ্গে মিশে যায়; পুব আকাশে লালের ছোপের আকুলতা বাড়ে; আগের রাতের তান্ডব ভুলে যায় পৃথিবী আর রাতা মোরগ ডেকে ডেকে হয়রান হয় তখন ধীরে রোকেয়া উঠে যায়। রত্না সাবান আর শুকনা গামছা এনে রাখে। কুতুব মিয়া মেয়ের প্রাণহীন পলকা শরীর কোলে করে গোসলের জায়গায় নিয়ে যায় তারপর আলগোছে আদরে মাটির মেঝেতে শুইয়ে দেয় ওকে।

মেয়েকে রোকেয়া এই দুইদিনে দুইবার গোসল দিলো, ‘আর ডর নাই রে মা। দাদির পাশে আরামে শুইয়া থাকবি।’ মায়ের কথায় মরা মেয়েটার খুব পেট-পুড়ে, – ‘কয়টা দিন দাদির সাথে থাক, আমি আসতেছি’।

গভীর মমতায় মেয়েকে অনুভব করে রোকেয়া আর উঠান থেকে স্বামীর চাপা সুরের বিলাপে তার শরীর থেকে থেকে কাঁটা দিয়ে ওঠে।

সকাল থেকে মৃত জোসনার বাড়ির সামনে মানুষের আওয়াজ উঠেছে; ওরা জোসনার জানাজায় শামিল হতে চায়। পোস্টমর্টেম শেষে পুলিশ মেয়েটার লাশ গ্রামে নিয়ে আসার পর থেকে মানুষের ঢল নেমেছে।

সেদিনের পর গ্রামে মেলা ঘটনা ঘটেছিল। সেসব কিচ্ছা-কাহিনি খবরের কাগজ আর টেলিভিশনে ফলাও করে ছাপা হয়, দেখানো হয়। দিলদারের খোঁজ রহমত সিকদার নিজেই ফাঁস করে দেয়। গঞ্জে ফেল্টু চেয়ারম্যানের আড়তে দিলদারকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে – এই খবর রহমত শিকদার জনে জনে গিয়ে বলেছিল। চেয়ারম্যানের ইশারায় সে-ই এই কাজ করেছে, তাও বলেছে। তারপর রহমতের কথা অনুসারে পুলিশ সেই গঞ্জের আড়তে অভিযান চালিয়ে দিলদারকে গ্রেফতার করে। তবে এই ব্যাপারে চেয়ারম্যান সাহেব সকল দায়িত্ব অস্বীকার করেছেন; তিনি কখনোই রহমতকে দিলদার বিষয়ে কোনো নির্দেশ দেননি। রহমত তার মতো সম্মানী মানুষকে বিপদে ফেলার জন্যই এমন গল্প ফেঁদেছে। গ্রামের আর দশজন মুরুবিবকে সাক্ষী রেখে তিনি বলেছেন যে, দিলদারকে ধরার জন্য তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন। তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগই তাই ধোপে টেকেনি। বরং তার জবরদস্ত সাক্ষী দেওয়ার কারণেই পুলিশ তৃতীয় দিনে ইমামসহ আরও কয়েকজন যারা সেদিন সালিশে উপস্থিত ছিল তাদের গ্রেফতার করে। খুব হাঙ্গামা হয়েছিল সেদিন। পুলিশের বড় অফিসার এসে ইমাম সাহেবকে গ্রেফতার করে না নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত শয়ে শয়ে গ্রামের মানুষ তার বাড়ি ঘেরাও করে রেখেছিল।

পুলিশ দুবার পনেরো দিনের রিমান্ডে নিয়েছিল রহমতকে। যদিও রিমান্ডে নেওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না তাকে, একবারে জেলে ঢোকালেই চলতো, কারণ সে কিছুই লুকাবার চেষ্টা করেনি; আগবাড়িয়ে পুলিশকে সে নিজেই সবকিছু খোলাসা করে বলেছে। রহমত যতবার সব বলেছে ততবার তার শরীরের গভীরতম বোধ থেকে নিয়তির ঠান্ডা-কামড় আলগা হতে থাকে। তবে শুধু এইসব কথা বলেই সে ক্ষান্ত হয়নি, সে যে জোসনার রুহ দেখেছে তাও বিশদভাবে বর্ণনা করেছে। তার কঞ্চির আঘাতে জোসনা যখন নিহত হয়, তখন ওর আত্মা শরীর থেকে বের হতে নাকি সে সচক্ষে দেখেছে; রাগী আত্মা না, শান্ত নরম আত্মা। এই প্রসঙ্গ উঠলে গ্রামের মানুষ বলে, ‘রহমইত্যা আওলায় গেছিলো। মাইয়াটারে পিটায়া মারছে – হের বাদেই মাথা নষ্ট।’ কিন্তু রহমত জানে, তার পরিবার জানে, তার মাথা নষ্ট হয়নি, বরং তার মাথা এখন আশ্চর্য রকম সাফা।

মানুষের উত্থান মৃত্যুর মতো অনিবার্য।

সোশ্যাল মিডিয়া

নিউসলেটার