আঁধারে আলোর ছায়া

লেখক: জাহিদ মুস্তাফা 

একটি দৃশ্য – দিনের আলোয় এক ধরনের, রাতের বেলায় সেটি অন্যরকম। এ-বিষয়টিকে মাথায় নিয়ে কৌতূহলবশত শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন রাতের আলো-আঁধারীর ছবি এঁকেছেন। এমন অনেকেই আঁকেন। ইংরেজিতে ‘নকটারাল শেড্স’ যার বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় – ‘নিশিরাতে সক্রিয় ছায়া’ এই শিরোনামে শিল্পী ও ভাস্কর হামিদুজ্জামান খানের একটি একক চিত্রপ্রদর্শনী চলছে।

সামিট গ্রম্নপের সহযোগিতায় ঢাকার প্রগতি সরণির এ জে হাইটসের তিনতলায় অবিন্তা গ্যালারি অব ফাইন আর্টসে আয়োজিত এ-প্রদর্শনীতে সাম্প্রতিককালে আঁকা ও গড়া শিল্পীর শতাধিক চিত্রকর্ম ও ভাস্কর্যসহ একশ ত্রিশটি শিল্পকর্ম শোভা পাচ্ছে। আলো-আঁধারীর ভেতরে নিহিত নানা বিষয়বস্ত্তকে অভিনবভাবে তিনি তুলে ধরেছেন – এ যে শেষ হওয়ার নয়, এ-রূপ অনন্তের! রাতের পর রাত আসবে – নিশাচর চড়ে বেড়াবে, পার্থিব-অপার্থিব আলোয় আঁধারের ছায়া ঘনাবে। রাতের অবয়ব ক্রমশ ভারি হতে হতে ঢলে পড়বে প্রাতঃকালের আলোয় – এই তো রাতের পরিণতি!

অবিন্তা গ্যালারিতে গিয়ে দেখি এর বিশাল হলরুমের পশ্চিম দেয়ালের এপার-ওপার জুড়ে রাতের কালোয় কমলা আলোর আলিম্পনযুক্ত অতিশয় বড় একটি পেইন্টিং সংস্থাপন করা হয়েছে! ‘ইনফিনিটি’ বা ‘অনন্ত’ শিরোনামে পাঁচটি খ– এই চিত্রকর্ম সম্পাদন করে একসঙ্গে যুক্ত করেছেন শিল্পী হামিদুজ্জামান। পশ্চিম দেয়ালে ৪১৬ + ৪৮৮ + ৪৮৮ গুণিতক ১৮৮ সেন্টিমিটারের তিনখ–র সঙ্গে, ১২২ গুণিতক ১৮৮ আকৃতির আরো দুটি খ- উত্তর ও দক্ষিণের দেয়ালে সংযুক্ত হওয়ায় – চার দেয়ালের ভেতরে অন্ধকারের অনন্ত রূপকে উপলব্ধির জন্য শিল্পী একটি পরিবেশ তৈরি করেছেন। বর্ণের বাহুল্য এড়িয়ে রাতের আলোছায়ার রূপকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরতে সমর্থ এমন দুটি রং প্রয়োগ করায় রাত যেন নেমে এসেছে গ্যালারিতে!

এই অনন্ত রাতের চিত্রণ শিল্পীমনের উত্তর-আধুনিকতার বোধ তুলে ধরেছে শিল্পের দর্শক-বোদ্ধার কাছে। শুধু এটি কেন – গোটা প্রদর্শনীহলে শিল্পকর্মের বিন্যাস এমনভাবে করা হয়েছে, যা আমাদের দেশে প্রচলিত গ্যালারি-ডিসপেস্ন থেকে ভিন্ন এবং অনেকটাই পাশ্চাত্য দেশগুলোর মতো আধুনিক ও যুগোপযোগী।

অবিন্তা গ্যালারির উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত চার সারিতে চলিস্নশটি করে মোট আশিটি চিত্রকর্ম সংস্থাপন করা হয়েছে। এগুলো ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক এবং কাগজে জলরং ও অ্যাক্রিলিক রঙে এঁকেছেন শিল্পী হামিদুজ্জামান খান। এসব গুচ্ছ চিত্রকর্মের বিষয় – সেই রাত ও রাতের শরীরে আলোর ছায়া-প্রচ্ছায়া। সবই সাম্প্রতিক সময়ের কাজ।

এই চিত্রকর্মগুলোয় শিল্পী আঁধারের রূপ-চরিত্রকে বিচিত্র পন্থায় তুলে ধরেছেন। এখানে আঁধার কখনো গভীর, কখনো অগভীর, কখনো ঘনায়মান। আবার আলো জ্বালায় আমাদের নিকটবর্তী কিংবা দূরের আঁধারের রূপ বদলায়। বদলে যায় অন্ধকারের রং রস। এসব বদলে যাওয়া তৎক্ষণাৎকে চিত্রপটে সযতনে তুলে এনেছেন শিল্পী হামিদুজ্জামান খান।

‘নকটারাল শেড্স’ বা ‘নিশিরাতে সক্রিয় ছায়া’ শিরোনামে ৯৩ গুণিতক ৯৩ সেন্টিমিটার আকৃতির ১ ও ২ সংখ্যক চিত্রকর্ম দুটিতে আমরা দেখতে পাই আঁধারকালোয় লালচে আলোর আভা। প্রথম চিত্রটির দিকে তাকালে মনে হতে পারে এ যেন বাইরের অন্ধকার থেকে দেখা একটি ভবনের ভেতরকার সারিবদ্ধ দরজা ও জানালায় মৃদু আলোর আভা। দ্বিতীয় চিত্রটি যেন সূর্য অসত্মাচলে যাওয়ার পর লালচে আভার আকাশ অন্ধকারে ডুব দেওয়ার আগের মুহূর্তটিকে তুলে ধরেছে।

একই শিরোনামের পাঁচসংখ্যক চিত্রটি কাগজে জলরঙে আঁকা। ৩১ গুণিতক ৩১ সেন্টিমিটার একপাশে কালো আর অন্যপাশে লাল আভার মাঝে পূর্ণচাঁদের মতো হলুদাভ বর্ণের গোলাকার ফর্মের ওপর কালো রঙে আঁকা একটি খোলাচোখ। এ যেন চাঁদের বুকের আলো দিয়ে পৃথিবী দর্শনের কল্পিত চিত্রায়ণ। ঠিক এর পরের চিত্রটিতে আমরা দেখতে পাই – রাত আরো গভীর হয়েছে এবং চাঁদ যেন চোখ বুজে ঘুমিয়ে পড়েছে। শৈশবে শোনা চাঁদ নিয়ে গালগল্পের প্রতীকী চিত্র তুলে ধরেছেন শিল্পী।

এ-সিরিজের সাতসংখ্যক চিত্রটিতে তিরতির করে বয়ে চলা রাতের জলধারার ছবি এঁকেছেন হামিদুজ্জামান। পাখির চোখে দেখা পরিপ্রেক্ষিতে টলটলে জলের ভেতর রাতের আলোছায়ার চলাচল এঁকেছেন তিনি। রাতের বেলায় গভীর জলে মাথা তুলে শ্বাস নেওয়া ডলফিন কিংবা অন্য কোনো জলজ প্রাণীর হঠাৎ ভেসে ওঠার মুহূর্তকে তুলে ধরেছেন শিল্পী। জলের বুকে বুদ্বুদ কিংবা জলের ওপর বাতাসের আলোড়নও নজর এড়ায়নি তাঁর। এসব বিষয়কে সযত্নে এঁকে দর্শকের চোখের সামনে মেলে ধরেছেন।

চিত্রপটে শিল্পীর ভাস্কর মনের প্রতিবিম্বও ঘটেছে কতক ক্ষেত্রে। যেমন – মানুষের কানের মতো ফর্ম কিংবা মাথা নুইয়ে বসে থাকা মানবদেহ – এসব ফর্মও দেখা যায় কতক চিত্রকর্মে। ত্রিভঙ্গে দাঁড়ানো একটি মানবাকৃতিকে কেন্দ্র করে একটি ছবি এঁকেছেন শিল্পী। এটিও যেন তাঁর কল্পিত বা পরিকল্পিত কোনো ভাস্কর্যের আদল। ভঙ্গিতে ডিসকাস নিক্ষেপরত ক্রীড়াবিদের ধরন।

এ-প্রদর্শনীহলে কিছু ভাস্কর্যও সন্নিবেশিত হয়েছে। পদচ্ছাপের মতো ফর্মটিকে বড় করে নির্মাণ করায় জাদুবাস্তবতার মায়া তৈরি হয়েছে গ্যালারি-অভ্যন্তরে। স্টিল দিয়ে বানানো পা আকৃতির বড় এক জলাধারে জল রাখায় গ্যালারির ভেতরের আলোছায়ার প্রতিফলনে তাতে নানারকম দৃশ্য ফুটে উঠছে, যেগুলো দেয়ালে ঝোলানো হামিদুজ্জামান খানের আঁকা অনেক চিত্রকর্মের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বলে আমার মনে হয়েছে।

গত শতকের ষাটের দশকে অর্থাৎ ১৯৬২ সালে মাধ্যমিক স্কুল পাশ করে তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমা থেকে হামিদুজ্জামান খান ঢাকার চারুকলা মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। শিক্ষক হিসেবে পেয়েছেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, আনোয়ারুল হক, আবদুর রাজ্জাক, মুসত্মাফা মনোয়ার প্রমুখ বরেণ্য শিল্পীকে। ছবি আঁকায় তুমুল অনুরাগ নিয়ে স্নাতক করেছেন অঙ্কন ও চিত্রায়ণ বিভাগ থেকে। চারুকলায় ভাস্কর্য বিভাগে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়ে – ফর্ম নির্মাণের একান্ত আগ্রহ থেকে ভারতের বরোদায় মহারাজ সোয়াজি রাও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাস্কর্যে উচ্চতর শিক্ষাগ্রহণ করেন। বাংলাদেশে আধুনিক ভাস্কর্য নির্মাণে তাঁর অবদান অসামান্য। মুক্তিযুদ্ধের অবিস্মরণীয় স্মৃতিকে বিস্মৃতির অন্ধকার থেকে সবার সামনে তুলে এনেছিলেন আশির দশকে চারুকলার জয়নুল গ্যালারিতে আয়োজিত তাঁর একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী দিয়ে। এর শিরোনাম ছিল – ‘স্মৃতি ’৭১’।

অবিন্তা গ্যালারিতে আয়োজিত হামিদুজ্জামান খানের ‘ইনফিনিটি’ শীর্ষক এ-প্রদর্শনী চলবে আগামী ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

Leave a Reply

%d bloggers like this: