আনিসুজ্জামান : তাঁর মনীষী-বীক্ষণ

লেখক: আবুল আহসান চৌধুরী

স্মৃতিই হারিয়ে যাওয়া সময় ও মানুষকে ফিরিয়ে আনে। ‘স্মৃতি সততই সুখের’ – প্রবচনতুল্য এই কথাটির দ্যোতনা অস্বীকার না করেও বলা যায়, এই সুখের আড়ালে আবার লুকিয়ে থাকে কত না দুঃখের ইতিহাস, শোক-বেদনা-বিচ্ছেদের দীর্ঘশ্বাস আর হাহাকার – বিস্ময়ের জাগরণ, লুপ্ত রত্নের উদ্ঘাটন।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মনীষী-বীক্ষণ দুই পর্বে বিন্যস্ত : বিদ্যাসাগর ও অন্যেরা (২০১৮) গ্রন্থে আলোকপাত করেছেন তাঁর জন্ম-পূর্বের খ্যাতকীর্তি বাঙালি সাহিত্যসেবী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, দীনবন্ধু মিত্র, ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়, মীর মশাররফ হোসেন, শেখ আবদুর রহিম ও শেখ ফজলল করিম সম্পর্কে। চেনা মানুষের মুখ (২০১৩) – এই বইতে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্মৃতির সরণি বেয়ে এই ভূখণ্ডের তিনজন মুক্তিযুদ্ধে শহিদসহ আটাশজন কৃতী ও স্মরণীয় মানুষের ‘আলেখ্যনির্মাণের প্রয়াস’পেয়েছেন, যাঁরা ছিলেন সাহিত্য-সাংবাদিকতা-শিক্ষা-রাজনীতি-সমাজসেবা-সংস্কৃতিচর্চা – নানা বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত। এঁদের মধ্যে আবার অনেকেই ছিলেন একই সঙ্গে নানা গুণের অধিকারী। অবশ্য খ্যাতি-পরিচিতি-প্রতিষ্ঠা-গুরুত্বে এঁরা যে সমপর্যায়ের ছিলেন তা নয়, মাপে-মানে ফারাক তো ছিলই। কিন্তু লেখক সমান আগ্রহ ও অনুরাগে তাঁদের উপস্থাপিত করেছেন পাঠকের কাছে। বইয়ের পরিচিতি দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, লেখাগুলোতে ‘কোথাও আছে তাঁদের কৃতির আলোচনা, কোথাও তাঁদের সম্পর্কে স্মৃতিচারণ, কোথাও বা কৃতির কথা ও স্মৃতির কথা মিলেমিশে গেছে।’ মোহাম্মদ আকরম খাঁ, আবদুল গফুর সিদ্দিকী, মুহম্মদ হবীবুল্লাহ্ বাহার, শামসুন নাহার মাহমুদ, সৈয়দ নাজমুদ্দীন হাশেম, মাহবুব উল আলম চৌধুরী ও শহীদুল্লা কায়সার সম্পর্কে আলোচনায় কৃতির বিষয়টিই প্রাধান্য পেয়েছে। স্মৃতিচারণের পর্যায়ে আবুল ফজল, কাজী মোহাম্মদ ইদ্‌রিস, মন্মথনাথ নন্দী, আব্দুর রাজ্জাক, মাহমুদ নুরুল হুদা, আখতার ইমাম, এ আর মল্লিক, আহমদুল কবির, আনোয়ারা বাহার চৌধুরী, মুজাফ্‌ফর আহমদ চৌধুরী, রোকনুজ্জামান খান, সন্তোষ গুপ্ত, হাসান হাফিজুর রহমান, গিয়াসউদ্দিন আহমদ, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, নাজমা জেসমিন চৌধুরী, সেলিনা বাহার জামানের নাম বিশেষ করে আসে। আর স্মৃতি ও কৃতি মিলিয়ে চরিত্র-চিত্রণের কথা উঠলে রণেশ দাশগুপ্ত ও খান সারওয়ার মুরশিদের নাম বলতে হয়। তবে এই বিভাজনও চূড়ান্ত নয়, মাঝে-মধ্যেই তা একে অপরের সঙ্গে মিশে যায় স্থানবদল করে। প্রায় পঞ্চাশ বছর পরিসরের এই লেখাগুলো সবই উপলক্ষের ফসল – শোক-স্মরণ-সংবর্ধন কিংবা জন্মদিনের শ্রদ্ধা-শুভেচ্ছা।
মওলানা আকরম খাঁকে দিয়ে এই বইয়ের আলোচনা শুরু, আর শেষ হয়েছে সেলিনা বাহার জামানের স্মৃতিচর্চায়। এঁদের সবার সঙ্গেই যে লেখকের সমান পরিচয় বা অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল তা নয়। কিন্তু সম্পর্কের গভীরতা যতটুকুই থাকুক না কেন, তাতে সেই মানুষটির মূল্যায়নে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। আকরম খাঁর সঙ্গে আনিসুজ্জামানের নিজের ততোটা না থাকলেও পরিবারের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ ছিল। নিজের পঠন ও পর্যবেক্ষণে আকরম খাঁর একটি নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ পরিচয় তিনি তুলে ধরেছেন। ‘প্রাচীনপন্থীদের তুলনায় মওলানা আকরম খাঁর ভূমিকা ছিল প্রগতিশীল; আর আধুনিকদের তুলনায় ছিলেন রক্ষণশীল’ – তাঁর এই মন্তব্যে আকরম খাঁর মন-মানসের পরিচয় সঠিকভাবে ফুটে ওঠে। প্রচলিত ধারণায় আকরম খাঁকে যে ঘোরতর রক্ষণশীল ও প্রগতিবিরোধী বলে চিহ্নিত করা হয় লেখক সেই বক্তব্যকে যৌক্তিক বলে বিবেচনা করেননি। এখানে একটি কথা স্মরণ করা যেতে পারে : আকরম খাঁ সারাজীবন ঢাকার ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজে’র (১৯২৬) কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করে এসেছেন। বিশেষ করে কাজী আবদুল ওদুদ ও আবুল হুসেনের মত ও মন্তব্যের তীব্র নিন্দা ও সমালোচনা করতে তাঁর উৎসাহের অভাব কখনোই হয়নি। এমনকি তাঁর প্রতিক্রিয়ার প্ররোচনায় ‘সাহিত্য সমাজে’র প্রতিপক্ষের হাতে আবুল হুসেনকে নিগৃহীত ও অসম্মানিতও হতে হয়। এই ঘটনা তাঁর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ত্যাগ করে কলকাতায় গিয়ে আইনপেশায় যোগদানের অন্যতম কারণ বলে ধারণা করা হয়। এই আবুল হুসেনের অকালমৃত্যুতে তাঁর মেধা-প্রতিভা-কৃতি স্মরণ করে আকরম খাঁ যে শোকবাণী প্রচার করেন, তাতে তাঁর গুণগ্রাহিতা ও মানসিক উদারতার পরিচয় মেলে।
বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যসাধনা-পুথিসংগ্রহ ও চর্চা, সাংবাদিকতা এবং রাজনীতিকর্মে নিবেদিত ছিলেন আবদুল গফুর সিদ্দিকী। তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নিয়ে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিপিনচন্দ্র পাল প্রমুখ সেকালের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসেন। এঁদের সহকর্মী হিসেবে সিদ্দিকী স্বদেশি আন্দোলনে যোগ দিয়ে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেন। এরপর পুথি সংগ্রহ ও আলোচনা এবং নানা ঐতিহাসিক উপকরণ সংগ্রহে মন দেন। তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ও পরিষৎ-পত্রিকায় তাঁর প্রবন্ধও প্রকাশিত হয়। তিতুমীরের প্রামাণ্য জীবনী-রচনা তাঁর এক গুরুত্বপূর্ণ অবদান। দেশবিভাগের পর দাঙ্গাপীড়িত হয়ে জন্মভূমি পশ্চিমবঙ্গ থেকে সপরিবার পূর্ববঙ্গের খুলনায় চলে আসেন। এখানেই চরম দারিদ্র্যের ভেতরে, অনাদরে, স্বীকৃতিহীন অবস্থায় তাঁর জীবনাবসান হয় ১৯৫৯ সালে। আনিসুজ্জামান তাঁর মূল্যায়ন প্রসঙ্গে বলেছেন : ‘আবদুল গফুর সিদ্দিকী বাঙালি মুসলমানের জীবনধারার এক গুরুত্বপূর্ণ ক্রান্তিকালের সাক্ষী ছিলেন। তিনি যখন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেন, বাঙালি মুসলমানের নবজাগরণ তখন শুরু হয়েছে। … তিনি এই মহৎ যুগের নীরব দ্রষ্টাই কেবল ছিলেন না, এই রঙ্গমঞ্চে তাঁর নিজেরও একটা ভূমিকা ছিল এবং সেই ভূমিকা তিনি বেশ কৃতিত্বসহকারেই পালন করেছেন।’ সম্পর্কে আত্মীয় এই বিস্মৃত সাহিত্যসাধকের স্মরণে তাঁর মৃত্যুর পরপরই আনিসুজ্জামান এই গ্রন্থভুক্ত প্রবন্ধটি রচনা করেন। একমাত্র এই রচনা থেকেই আবদুল গফুর সিদ্দিকীর জীবন ও কর্মের প্রামাণ্য উপকরণ পাওয়া যায়।
আনিসুজ্জামান পেশাসূত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। তাই তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরমহলের অনেক অজানা ও চমকপ্রদ খবরের সন্ধান মেলে। যাঁদের কথা লেখকের কলমে এসেছে, তাঁদের মধ্যে অন্তত চারজন উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেছেন। উপাচার্য যাঁরা ছিলেন, তাঁদের জ্ঞান-প্রজ্ঞা-মেধা-সততা-অবদান-সাহস-ব্যক্তিত্বের সঙ্গে হাল আমলের অনেক ওই পদাধিকারীর তুলনা করলে শরম পেতে হয়। আলোচনার সারিতে এঁদের বাইরে চার-পাঁচজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও আছেন। ছয়জন ওজারতিও করেছেন, – তার মধ্যে তিনজন শিক্ষক, দুজন আমলা, একজন রাজনীতিক। বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছা ও আনুক‚ল্যে এ আর মল্লিক ও মুজাফ্ফর আহমদ চৌধুরীকে মন্ত্রিসভায় যোগ দিতে হয়। বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পরও বন্দুকের নলের মুখে তাঁরা মন্ত্রিত্ব করতে বাধ্য হন এক অস্বাভাবিক পরিবেশে। আনিসুজ্জামান সাক্ষ্য দিয়েছেন, দুজনই অনুশোচনায় পীড়িত হয়ে মনে করেছেন, তাঁদের হাতে যেন বঙ্গবন্ধুর রক্ত লেগে রয়েছে। আবুল ফজলও এর কিছুকাল পরে দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়েই হয়তো মন্ত্রীর পদমর্যাদায় সামরিক শাসকের উপদেষ্টা হন। তাঁর এই অভাবনীয় স্খলনে আনিসুজ্জামানের মতো গুণগ্রাহী প্রিয়জনেরাও ব্যথিত ও হতাশ হন। তবে আবুল ফজল বিবেকের দায়ে মৃতের আত্মহত্যা লিখে তাঁর ভাবমূর্তি রক্ষার চেষ্টা করেন।
এ-বইয়ের তিনটি লেখা – আব্দুর রাজ্জাক, খান সারওয়ার মুরশিদ ও গিয়াসউদ্দিন আহমদকে নিয়ে – সবচেয়ে বেশি মন কাড়ে। জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন জীবন্ত জ্ঞানকোষ – খুব কাছ থেকে তাঁকে দেখেছেন লেখক। ছিলেন মজলিশি মেজাজের মানুষ, আড্ডার শিরোমণি – যা বলতেন সবই মুখে মুখে, লেখালেখিতে একেবারেই আগ্রহ ছিল না। দাম্পত্যসম্পর্ক রচনায় অনীহ বিচিত্রস্বভাবী এই মানুষটির আগ্রহ ছিল রান্না থেকে রাজনীতি এবং আরো অনেক কিছুতে। ঘনিষ্ঠ সাহচর্য ও নিবিড় পর্যবেক্ষণে আব্দুর রাজ্জাকের চরিত্রের নানা দিক উন্মোচিত হয়েছে তাঁর লেখায়। আব্দুর রাজ্জাকের চিন্তা-চেতনার একটা ছাপও লেখকের ওপরে পড়েছিল। আব্দুর রাজ্জাকের পড়াশোনার বৈচিত্র্য ও পরিধি ছিল অসামান্য। সাধারণ জীবনযাপনে ছিলেন অভ্যস্ত। কৃত্রিম মার্জিত স্বভাবের বিরোধী ছিলেন। স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন ঢাকার আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে। সাহিত্যগুরু কবি ঈশ্বর গুপ্ত সম্পর্কে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় একবার মন্তব্য করেছিলেন : ‘একটি প্রতিভা ইয়ার্কিতেই ফুরাইল’ – জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক সম্পর্কেও এই আক্ষেপোক্তি কি প্রযোজ্য নয়!
আনিসুজ্জামানের শিক্ষক ও পরে সহকর্মী ছিলেন খান সারওয়ার মুরশিদ। মার্জিত রুচির সংস্কৃতিবান এই শিক্ষকও বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে প্রগতিচেতনা ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে চারিয়ে দিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। ইতিহাসের শিক্ষক গিয়াসউদ্দিন আহমদের সঙ্গে ছাত্রাবস্থা থেকেই আনিসুজ্জামানের ছিল গভীর সখ্য-সম্পর্ক। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মী হিসেবে নানা কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে তা আরো নিবিড় হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আলবদর বাহিনীর হাতে নিহত এই তরুণ শিক্ষকের মর্মান্তিক পরিণতি লেখককে গভীরভাবে শোককাতর করেছিল।
পাঁচজন কৃতী নারীর কথাও এসেছে এই স্মৃতিচিত্রে : তাঁরা – শামসুন নাহার মাহমুদ, আখতার ইমাম, আনোয়ারা বাহার চৌধুরী, নাজমা জেসমিন চৌধুরী ও সেলিনা বাহার জামান। প্রথম তিনজন লেখকের বয়োজ্যেষ্ঠ, চতুর্থজন সরাসরি ছাত্রী ও পরে বন্ধুপত্নী। শেষের জন পরম স্নেহভাজন অনুজাতুল্যা। প্রথম, তৃতীয় ও পঞ্চম জন পরস্পর একই পরিবারভুক্ত আত্মীয়। শামসুন নাহার মাহমুদ ছিলেন বেগম রোকেয়ার আদর্শে অনুপ্রাণিত ও তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি। বাঙালি মুসলমান নারীসমাজের জাগরণ ও উন্নয়নে তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। তাঁর সকল কর্মকাণ্ডে সহায় ও প্রেরণা ছিলেন অগ্রজ আরেক কীর্তিমান পুরুষ রাজনীতিক-সমাজসেবক-ক্রীড়াবিদ-লেখক-সাময়িকপত্র সম্পাদক মুহম্মদ হবীবুল্লাহ্ বাহার। আনিসুজ্জামানের পর্যবেক্ষণে এই মহীয়সী নারীর বৈশিষ্ট্য ধরা পড়েছে এইভাবে : ‘শামসুন নাহারের ব্যক্তিত্বের মধ্যে একদিকে ছিল কঠোর নিয়মানুবর্তিতা, অন্যদিকে সুমধুর ব্যবহার। … রোকেয়ার সুযোগ্য উত্তরাধিকারী হিসেবে নারীমুক্তির জন্য তিনি কাজ করে গেছেন। … একদিকে যেমন তিনি শিশুর কল্যাণের জন্য উদ্বিগ্ন ছিলেন, অন্যদিকে মননচর্চার অনুকূল আবহাওয়া তৈরির জন্যও উন্মুখ ছিলেন। জীবনে যা কিছু তিনি অর্জন করেছিলেন, তা তাঁকে অহংকৃত করেনি, বিনয়ী করেছিল।’
এক সংগ্রামী নারীর নাম আখতার ইমাম। ছিলেন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক – পরবর্তী জীবনে লেখক হিসেবেও নাম করেন – সে-লেখা আত্মস্মৃতি বা ভ্রমণকাহিনি। মুসলিম সমাজে নারীর অসম্মান ও নিগ্রহের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। অকাল-বৈধব্য বরণের পর শ্বশুরবাড়ি থেকে সেকালের নিয়ম-অনুসারে তাঁকে ‘সাদা থান’ পরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তিনি তা ‘দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান’ করেছিলেন। অদম্য প্রতিজ্ঞায় তিনি নিজেই তাঁর ভাগ্য গড়ে তুলেছিলেন। আনিসুজ্জামান এই ব্যতিক্রমী নারীর মূল্যায়ন প্রসঙ্গে যথার্থই উল্লেখ করেছেন : ‘আখতার ইমামের পরিচয় বহন করবে তাঁর সারা জীবনের কর্ম ও সাধনা আর তাঁর লেখা বইগুলো। একটা যুগের প্রতিচ্ছবি আছে তাঁর লেখায়। কত ভাঙাগড়ার কাহিনি, সামাজিক ইতিহাসের কী মূল্যবান উপকরণ! তিনি তো শুধু ইতিহাসের নীরব সাক্ষী ছিলেন না। সেই ইতিহাস-রচনায় তাঁর নিজের ভূমিকাও সামান্য নয়।’
নাজমা জেসমিন চৌধুরী নিজের কৃতিত্বেই স্বতন্ত্র ও বিশিষ্ট। তিনি বিকশিত হয়ে উঠেছিলেন তাঁর নিজেরই মেধা, প্রতিভা ও সাধনায়। কিন্তু তাঁর সব কৃতির ওপরেই অনেকে ছায়া-কল্পনা করেছেন তাঁর খ্যাতিমান অধ্যাপক-স্বামীর – সম্ভবত এ-তাঁর জীবনের এক বড় ট্র্যাজেডি। তাঁর গবেষণা অভিসন্দর্ভ ‘বাংলা উপন্যাস ও রাজনীতি’ সস্তা ও আনুকূল্যে প্রদত্ত উপাধিপ্রাপ্তির বিপরীতে বিদ্বৎজন-প্রশংসিত এক মেধাবী গবেষণাকাজ। তাঁর সম্পর্কে কিছুটা বিষণ্ন কণ্ঠে ভারি খাঁটি কথা বলেছেন তাঁর শিক্ষক ও সুহৃদ আনিসুজ্জামান : ‘নাজমা অসামান্য মানুষ ছিল। সংসারে কিছু লোক আছে, যারা দেয় বেশি, পায় কম। আমার বিশ্বাস, নাজমা তাদের একজন। আমার আরও বিশ্বাস, নাজমা নিজেও জানত সে-কথা, তবু এ-নিয়ে তার কোনো ক্ষোভ ছিল না।’
সেলিনা বাহার জামানের পঠন-পাঠনের বিষয় ছিল গণিত; কিন্তু সাহিত্যে তিনি ছিলেন মগ্ন ও নিবেদিত – এই প্রেরণা পেয়েছিলেন পারিবারিক সূত্রে। বাহার-পরিবারের সঙ্গে আনিসুজ্জামানের ছিল ঘনিষ্ঠ যোগ। সেলিনা বাহার ছিলেন তাঁর ছাত্রীতুল্যা স্নেহের পাত্রী। তাঁর স্মৃতিচর্চা যে আনিসুজ্জামানের জন্যে কতটা বেদনা ও দুঃখের তার আভাস আছে এই রচনায়। ঐতিহ্যপ্রীতি, গুণগ্রাহিতা ও দুষ্প্রাপ্য তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ-সংগ্রহে সেলিনা বাহার ছিলেন অনন্য এক দৃষ্টান্ত। নজরুল-পাণ্ডুলিপি ও নজরুলের ধূমকেতু তাঁর উজ্জ্বল উদ্ধারের ফসল। তাঁর সম্পাদিত স্মারকগ্রন্থগুলোর কথাও এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য। অন্যদিকে ‘এত ব্যাপক সহানুভূতি, এত অন্যগতপ্রাণ, এত নিঃস্বার্থ দানস্পৃহা খুব কমই দেখেছি’ – আনিসুজ্জামানের এই মন্তব্য আক্ষরিক অর্থেই সত্য।
কোনো কোনো ‘আলেখ্য’ কলেবরে একটু বেশিই ছোট, যাতে পুরো মানুষটিকে ধরা যায় না, সামান্য স্পর্শেই যেন হারিয়ে যায়, যেমন – মন্মথনাথ নন্দী, মধুসূদন দে, আনোয়ারা বাহার চৌধুরী, রোকনুজ্জামান খান কিংবা আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। সম্পর্কের গভীরতার কারণে হাসান হাফিজুর রহমান লেখকের স্মৃতিচর্চায় যে আরো মনোযোগ দাবি করেন, তা মানতেই হবে। বইয়ের দু-একটি তথ্যে গরমিল চোখে পড়ে। আকরম খাঁর বইয়ের নাম, যতদূর জানি, মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস – মোছলেম বঙ্গের সামাজিক সমস্যা নয়। কোহিনূর-সম্পাদক প্রথমে তাঁর নাম লিখতেন এস কে এম মোহাম্মদ রওশন আলী – পরে এস কে এম বর্জন করে নামের শেষে চৌধুরী যোগ করেন। কিন্তু কখনো এস কে এম মোহাম্মদ রওশন আলী চৌধুরী লিখতেন, এমন খবর মেলে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কথা বলতে গিয়ে একই ঘটনার পুনরুক্তিও ঘটেছে।
পাঠক হতাশ হতে পারেন, এই বইতে আনিসুজ্জামানের প্রিয় শিক্ষক মুনীর চৌধুরী সম্পর্কে কোনো লেখা না পেয়ে। অবশ্য মুনীর চৌধুরীর স্মৃতি ও কৃতি নিয়ে ১৯৭৫-এ তাঁর একটি ক্ষীণতনু বই বেরিয়েছিল। পিতামহপ্রতিম ব্যক্তিত্ব জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ও এখানে অনুপস্থিত। তবে তাঁর একটি শিশুতোষ জীবনী (১৯৮২) আনিসুজ্জামান রচনা করেন। কবি সুফিয়া কামাল সম্পর্কেও লেখকের মনোযোগ প্রত্যাশিত ছিল। আরো অনেক চেনা মানুষের চরিত্র-চিত্র নানা উপলক্ষে নানা বই-পত্রিকা-স্মরণিকায় ছাপা হলেও এই বইতে তা শামিল হয়নি। এখানে সংকলিত অনেকের কথাই আনিসুজ্জামানের ঘটনা-পরম্পরার স্মৃতিপুস্তক কাল নিরবধি (২০০৩), আমার একাত্তর (১৯৯৭) ও বিপুলা পৃথিবীতে (২০১৫) কিছুটা বিশদ পরিমাণে পাওয়া যায়।
চেনা মানুষের মুখ ব্যক্তির স্মৃতিচর্চা ও হ্রস্ব-মূল্যায়নের এক রম্য যুগলবন্দি। লেখকের পরিমিতিবোধ, সত্যকথন ও নিরপেক্ষ দৃষ্টি বইটিকে ভিন্ন তাৎপর্যে মণ্ডিত করেছে। স্মৃতিচারণার কথক হিসেবে নিজেকে তিনি যথাসম্ভব আড়ালে রেখে নির্মোহ ভঙ্গিতে ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য বা ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন এবং তার তাৎপর্যও উদ্ঘাটন করেছেন। সমালোচনা-বিদ্ধ হতে পারেন জেনেও সত্যপ্রকাশের দায় না এড়িয়ে জানিয়েছেন বিতর্কিত সরকারি প্রতিষ্ঠান বি.এন.আর.-আয়োজিত সেমিনারেও প্রবন্ধ পড়েছেন তিনি। খণ্ড খণ্ড ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্মৃতিচিত্রণে তিনি তাঁর কালকে ইতিহাসের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন। নির্মেদ স্বাদু গদ্যে অনেকটা গল্পের বিন্যাসে আনিসুজ্জামান অতীত দিনের ধূসর ক্যানভাসে তাঁর কালের চেনা মানুষের যে-অন্তরঙ্গ ছবি এঁকেছেন তা পাঠককে মুগ্ধ ও স্মৃতিকাতর না করে পারে না।
২০২০-এর ১৪ মে কালান্তক করোনা-কালে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান নিজেই স্মৃতি হয়ে গেলেন। এখন তাঁর প্রিয় মানুষদের চেনা মানুষের মুখ বিষয়ে স্মৃতিচর্চার পালা।

Leave a Reply

%d bloggers like this: