আবদুল হক : সাহিত্য-সাহিত্যিক দর্শন

লেখক:

রবিউল হোসেন

বাঙালির সামাজিক ইতিহাসে আবদুল হক (১৯১৮-৯৭) শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়।১ মননশীল প্রাবন্ধিক হিসেবে তিনি অধিক পরিচিত হলেও সাহিত্যের সকল শাখায় তাঁর পদচারণা প্রশংসাযোগ্য। ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি, সমাজ, রাজনীতি, ইতিহাস, শিক্ষা, ধর্ম-দর্শন প্রভৃতি অর্থাৎ জীবনাচরণের সকল বিষয় তাঁর মননশীল রচনার বিষয়বস্ত্ত হয়েছে। উপর্যুক্ত বিষয়সমূহ সম্বন্ধে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপনে তিনি কোনো পূর্বনির্ধারিত মতবাদপন্থী হননি। বরং নিজেই নিজের মতবাদের প্রচারক হয়েছেন। তাঁর প্রচারিত মতবাদ সকলের কাছে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এ মতবাদ-চর্চা বর্তমান সংক্ষুব্ধ আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক মনে হয়। আবদুল হকের চিন্তা-চর্চার ক্ষেত্রসমূহ থেকে বর্তমান আলোচনায় আমরা ‘সাহিত্য-সাহিত্যিক দর্শন’ শিরোনামে লেখক থেকে প্রচারক হয়ে-ওঠা আবদুল হকের একটি বিশেষ দিকের পরিচয় দেওয়ার প্রয়াস পাবো।

বাঙালি মুসলমানের জাগরণের কাল থেকে যেসব লেখক-সাহিত্যিক নিজ সমাজভুক্ত জনগোষ্ঠীর মুক্তির লক্ষ্যে লেখনী ধরেছিলেন – তাঁদের কর্ম ও দর্শন ভবিষ্যৎ-পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে ‘আবদুল হক : সাহিত্য-সাহিত্যিক দর্শন’ শিরোনামে বর্তমান আলোচনার প্রয়াস। রচনাটিকে আপাতপক্ষে আবদুল হকের দৃষ্টিতে বিশ শতকের বাঙালি মুসলমান লেখকদের ভাষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদান মূল্যায়নের প্রয়াস মনে হতে পারে। কিন্তু আলোচনা থেকে আমরা বাঙালি হিন্দুর তুলনায় বাঙালি মুসলমানের পশ্চাৎপদতার কারণ সন্ধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের যেমন উত্তর পাই, তেমনি সমাজ-রাজনীতি-ধর্মদর্শন ও ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি প্রভৃতি বিষয়ে আবদুল হকের মনোভাব ও আমাদের করণীয় সম্পর্কে দিকনির্দেশনা পাবো, যা বাঙালির সমৃদ্ধ গতিপথ তৈরি করতে ভূমিকা রাখবে।

আবদুল হক রাজনীতিবিদ বা সমাজকর্মী ছিলেন না। এ-কারণে সমাজ সম্পর্কে প্রদত্ত তাঁর মতামত প্রবন্ধের আকারে সাহিত্য হয়ে উঠেছে। ফলে তাঁর রচনায় অনিবার্যভাবে উপস্থিত হয়েছে সমাজ ও সমাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনুষঙ্গসমূহ। এ-প্রসঙ্গে আলোচনায় তিনি বাঙালি মুসলমান সমাজের পশ্চাৎপদতার কারণ ও হিন্দু-মুসলমান বিরোধের অন্তর্নিহিত প্রকৃতিকে একসূত্রে গ্রথিত করেছেন। তাঁর অভিমত, যে-কারণে বাঙালি মুসলমান তার প্রতিবেশী হিন্দুর তুলনায় পশ্চাদগামী সেই একই কারণে জ্ঞান-চর্চা থেকে পিছিয়ে পড়ে তারা হিন্দুবিদ্বেষী। বাঙালি হিন্দু যেমন প্রতিবেশী মুসলমানকে না জেনে মুসলমানবিরোধী – অনুরূপভাবে বাঙালি মুসলমান জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে প্রতিবেশীর হৃদয়ে প্রবেশ করতে না পেরে বঞ্চিত। এভাবেই শিক্ষা-সাহিত্য-রাজনীতি-অর্থনীতি প্রভৃতি ক্ষেত্রে বৈষম্যের পরিণতি হয়েছে সাম্প্রদায়িকতা। অবশ্য আবদুল হকের আগে অনেকেই বাঙালি মুসলমানের সংশ্লিষ্ট সমস্যাসমূহ তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তবে আবদুল হকের চিন্তার মৌলিকত্ব হলো, তিনি আরো অগ্রসর হয়ে সমস্যা সমাধানের পথ নির্দেশ করে দিয়েছেন। ভবিষ্যৎ বাঙালির জন্যে আবদুল হক-চর্চা তাই অনিবার্য হয়ে উঠেছে।

উনিশ শতকে বাঙালি হিন্দুর মধ্যে যে-জাগরণের সূচনা হয়েছিল তা পূর্ণতা পায় বিশ শতকে বাঙালি মুসলমান সমাজের মধ্যকার জাগরণের ফলে। আবদুল হকের সত্তায় এ-উপলব্ধি ক্রিয়াশীল থাকায় যেসব বাঙালি মুসলমানের মধ্যে রেনেসাঁসের বৈশিষ্ট্য ক্রিয়াশীল ছিল তাঁদের অধিকাংশের সম্পর্কে তিনি কিছু না কিছু লিখেছেন।২ তাঁদের চেতনালোককে উন্মোচন ও বিশ্লেষণ করেছেন। এঁদের সম্পর্কে তাঁর লেখনী ধারণের আরো কারণ – তিনি মুসলমান সমাজে জন্মেছিলেন। এ-কারণে স্ব-সমাজের দুর্বলতাগুলো তাঁকে ভাবিত করতো। এরকম ভাবনার প্রকৃত রূপ তিনি খুঁজতে চেয়েছিলেন পূর্বসূরিদের সৃষ্টিকর্মের মধ্যে। সেজন্যে নিজের দর্শন প্রকাশ করার ক্ষেত্র হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছিলেন স্ব-সমাজের পূর্ববর্তীদের সৃষ্টিকর্মের ব্যাখ্যাকে।৩ যার ভেতর দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানদের বাঙালিত্বের প্রকৃত স্বরূপ।৪

বর্তমান রচনাটিকে তিন ভাগে বিভক্ত করে আলোচনা করা হবে। আবদুল হক চেতনায় ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজের’ উত্তর-সাধক হওয়ায় প্রথমাংশে সাহিত্য-সমাজ সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির মূল্যায়ন করা হবে। দ্বিতীয়াংশে মুসলমান সমাজভুক্ত এবং সমাজ দ্বারা অনুপ্রাণিত ব্যক্তিদের অবদান মূল্যায়নে তাঁর চিন্তার স্বাতন্ত্র্য দেখানোর চেষ্টা থাকবে। এবং শেষাংশে সেসব লেখক সম্পর্কে আবদুল হকের মূল্যায়ন স্থান পাবে, যাঁরা বাঙালি মুসলমানকে সংস্কৃতিচর্চায় অনুপ্রাণিত করেছিলেন। বাঙালি মুসলমানকে ধর্মান্ধ জনগোষ্ঠী থেকে বাঙালি হতে ভূমিকা রেখেছিলেন।

 

এক 

আমরা জানি, ১৯২৬ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকায় ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’ গঠিত হয়। যূথবদ্ধ প্রচেষ্টা চালিয়ে বাঙালি মুসলমান সমাজকে মুক্তি-পথের সন্ধান দেবার প্রথম সার্থক প্রয়াস     ‘সাহিত্য-সমাজ’ প্রতিষ্ঠা।৫ কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০) এবং আবুল হুসেন (১৮৯৬-১৯৩৮) ছিলেন সাহিত্য-সমাজের স্রষ্টা ও পরিচালক। সমাজের মুখপত্র শিখার (১৯২৭) চিন্তার প্রধান প্রেরণা আসত এঁদের কাছ থেকে। অবশ্য এঁদের সঙ্গে কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১), মোতাহের হোসেন চৌধুরী (১৯০৩-৫৬), মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫-১৯৬৯), আবদুল কাদির (১৯০৬-৮৪), কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) প্রমুখ সমাজের সংগঠন ও পরিচালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। শিখার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সে-সময়ে ‘শিখাগোষ্ঠী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। বাঙালি মুসলমান সমাজের সার্বিক অনগ্রসরতা থেকে মুক্তি দেওয়াই ছিলো এ-গোষ্ঠীর লক্ষ্য।

আবদুল হক চেতনায় শিখাগোষ্ঠীর দর্শন ধারণ করতেন। সমালোচকদের অনেকে এজন্যে তাঁকে ‘শিখাগোষ্ঠী’র যোগ্য উত্তর-সাধক ভাবতেন। তিনি নিজেও তাঁর কর্মে এসবের প্রমাণ রেখেছেন। সাহিত্য-সমাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সৃষ্টিজগতের মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। একই সঙ্গে তিনি ‘সাহিত্য-সমাজ’ ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সীমাবদ্ধতাগুলো বিচার করতেও কুণ্ঠিত হননি। ‘শিখার সন্ধানে’ শীর্ষক প্রবন্ধে সাহিত্য-সমাজের অবদান সম্পর্কে তিনি লিখেছেন –

বুদ্ধির মুক্তি ছিল এই সাহিত্য সংস্থার মূলমন্ত্র। আধুনিক জগতের চিন্তাধারার পরিপ্রেক্ষিতে এবং যুক্তিবাদের আলোকে বাঙালী মুসলিম সমাজের তৎকালীন সমাজ-চিন্তা, ধর্মচিন্তা ও মূল্যবোধগুলোর বিচার করাই ছিল সাহিত্য-সমাজের লক্ষ্য। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সম্বন্ধেও এবং মুসলমানদের সাহিত্য-সমস্যা সম্বন্ধেও তাঁদের বক্তব্য ছিল; কিন্তু লক্ষ করার বিষয়, প্রতিষ্ঠানগতভাবে সৃষ্টিধর্মী সাহিত্য মুসলিম সাহিত্য-সমাজের লক্ষ্যীভূত হয়নি।৬

উপর্যুক্ত উদ্ধৃতিটিতে আবদুল হক সাহিত্য-সমাজের অবদান প্রশংসা করলেও ‘কাজী মোতাহার হোসেন’ শীর্ষক অপর প্রবন্ধে তিনি শিখাগোষ্ঠীর সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে বলেছেন –

এই আন্দোলনের মধ্যে সার্বজনীনতার উপাদান যে ছিল না তা নয়, তবে এটা ছিল বিশেষভাবে বাঙালি মুসলিম সমাজের বুদ্ধির মুক্তির জন্যই। অন্য দেশের মুসলিম সমাজের ক্ষেত্রে তাঁদের যুক্তি বিশেষ খাটে না। এই বুদ্ধির মুক্তি যতটা না বৃহত্তর সমাজের জন্য তার চেয়ে বেশি ছিল ব্যক্তির জন্য, অন্তত ইতিহাস তাই প্রমাণিত করেছে।

সাহিত্য-সমাজ বছর দশেক টিকে ছিল, তারপর ঐ প্রতিষ্ঠানের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েন, এটা এক হিসাবে ভালোই হয়েছিল। কেননা, প্রতিষ্ঠান হিসাবে তাঁদের করার আর বিশেষ কিছু ছিল না, …।৭

আবদুল হকের মতে, শিখাগোষ্ঠীর লেখকরা রেনেসাঁসের ধারক ছিলেন। সাহিত্য-সমাজ যে ঐতিহাসিক মুহূর্তে গঠিত হয়েছিল – সে-সময়ে এটিই ছিল স্বাভাবিক। কেননা এ-সময় বহির্বিশ্বে এবং ভারতবর্ষের কিছু ঘটনা – রুগ্ণ তুরস্কের মধ্যযুগীয় খোলস ত্যাগ, খেলাফতের অবসান, ধর্মনিরপেক্ষ নবীন তুর্কি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা, আফগানিস্তানের বাদশাহ আমানুল্লার সমাজ-সংস্কার প্রচেষ্টাসহ সারা মুসলিমবিশ্বে নবজাগরণের জয়গান শোনা যাচ্ছিল। বাংলা সাহিত্যে নজরুল, ইমদাদুল হক ও রোকেয়ার আবির্ভাব; উনিশ ও বিশ শতকে হিন্দু-নবজাগরণ প্রভৃতি ঘটনার স্বাভাবিক পরিণতি ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’। এসব ঘটনার সঙ্গে পরিচিত আবদুল হক মনে করেন, সাহিত্য-সমাজের সঙ্গে যাঁরা জড়িত ছিলেন তাঁরা সবাই ছিলেন সচেতন মনের অধিকারী। এঁদের মূল্যায়নে প্রাবন্ধিক লেখেন –

তাঁদের দৃষ্টি ছিল রেনেসাঁর দৃষ্টি, চিন্তার গতানুগতিকতা থেকে এবং অন্ধ অনুবর্তিতা থেকে তাঁরা বাঙালী মুসলিম সমাজকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন; তাকে দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন সঙ্কীর্ণতামুক্ত সুস্থ-উদার বিশ্বমানবতার আকাশতলে, যেখানে বাঙালী মুসলমান বিশ্বজনীন চিন্তার অংশীদার, এবং আধুনিক জগতের প্রাগ্রসর সমাজ ও জাতিসমূহের সমপর্যায়ে সৃষ্টিচঞ্চল।৮   

সাহিত্য-সমাজের অনুসারীরা বুদ্ধির মুক্তির কথা বলেছিলেন এবং যুক্তিবাদের আলোকে তৎকালীন মুসলমান সমাজের চিন্তা ও মূল্যবোধগুলোকে নতুন করে দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সমাজের তাৎপর্য তখনকার মুসলমান সমাজ পুরোপুরি গ্রহণ করেনি। কেননা আমরা জানি, নতুন চিন্তার আভাস পেলে রক্ষণশীলরা চিরকালই শঙ্কিত হন – সেদিনও হয়েছিলেন।

সাহিত্য-সমাজপন্থীরা জাতীয়তাবাদী ছিলেন। এঁরা মুসলমান সমাজকে জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন – যা বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে কখনো জাগরূক ছিল না। থাকলে বাংলায় বাস করে অন্য দেশের সভ্যতা-সংস্কৃতির দিকে তাকিয়ে থাকতেন না। এঁরা পর্দার বিলোপ দাবি, সুদের সমর্থন, বাংলা ভাষা-সাহিত্য প্রীতি, চিত্রশিল্প-সংগীত-নৃত্য-নাট্যাভিনয় সমর্থন, মাদ্রাসা শিক্ষার সমালোচনা, সাম্প্রদায়িকতা প্রভৃতির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। যেগুলো ছিল বাঙালি মুসলমানের অন্ধকার যুগের সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। সাহিত্য-সমাজ এক্ষেত্রে সফল হোক বা না হোক – জীবন-চর্চার সকল ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ, ললিত কলার চর্চা, মোল্লাদের দৌরাত্ম্য-রোধ প্রভৃতি বিষয়ে আমাদের মনকে সংস্কারমুক্ত করেছে অনেকাংশে। সাহিত্য-সমাজের যোগ্য উত্তরসাধক আবদুল হক বিষয়সমূহ সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি আরো অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে গেছেন। তাঁর দর্শন বাঙালি মুসলমানের জাতীয়-চেতনা বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায়            রূপান্তরে অনুঘটকের ভূমিকা নিয়েছে। যার অনিবার্য ফল ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’।

 

২.১

বিশ শতকের বিশের দশকে পিছিয়েপড়া বাঙালি মুসলমান জনগোষ্ঠীকে জাগরণে শিখাগোষ্ঠীভুক্ত এবং গোষ্ঠীর চেতনা দ্বারা অনুপ্রাণিত যেসব কৃতবিদ্য লেখক সেদিন ভূমিকা রাখার প্রয়াস পেয়েছিলেন তাঁদের অবদান সম্পর্কে আবদুল হকের দৃষ্টিভঙ্গি এ-অংশে তুলে ধরা হবে। উল্লেখ্য, এখানে তাঁর আলোচ্য লেখকবৃন্দের সকলে মুসলমান। তবে আবদুল হকের বিচার্য লেখকবৃন্দের মুসলমানিত্বের পরিচয় প্রদান নয়। বরং সেই সকল লেখক তাঁর আলোচ্য হয়েছেন – যাঁরা মুসলমানিত্বের বাইরে এসে বাঙালিত্বের চর্চা করেছিলেন। বাঙালি মুসলমান সমাজকে বাঙালি জনগোষ্ঠীতে রূপান্তরে ভূমিকা রেখেছিলেন। এজন্যে তিনি সাম্প্রদায়িক নন বা যুগের হুজুগে মাতোয়ারা নন। সত্যিকারের তাত্ত্বিক পুরুষ।

 

দুই (এক)

’৪৭-উত্তর পূর্ব-পাকিস্তানে কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যের প্রাসঙ্গিকতা ও পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে অনাবশ্যক তর্ক-বিতর্কের সূচনা হয়। শাসকগোষ্ঠী এবং স্বাতন্ত্র্যবাদী সংস্কৃতিসেবীদের একাংশ রবীন্দ্র-বর্জন এবং নজরুলকে ‘জাতীয় কবি’র সম্মান দিয়ে রবীন্দ্রনাথের প্রতিপক্ষ বা বিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করাবার প্রচেষ্টা চালায়।৯ আবার কবি গোলাম মোস্তফা ১৯৫০ সালে নজরুলের কবিতায় ইসলামি গুণের অনুপস্থিতির কারণে তাঁকে আক্রমণ করেন। তিনি কাব্য-বিচারের ক্ষেত্রে ইসলামি ভাবাদর্শ অনুসরণকে পাকিস্তানি আদর্শ হিসেবে অভিহিত করে নজরুল-সাহিত্যের হিন্দু ভাবধারার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অংশটুকু বর্জন করতে বলেন।১০ এ-সময়পর্বে নজরুল-সাহিত্যের পক্ষে-বিপক্ষে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় আলোচনা-সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬৪ সালে ‘নজরুল একাডেমী’ প্রতিষ্ঠিত হয়।১১ সংগঠনটি পাকিস্তান রাষ্ট্রের পরিপ্রেক্ষিতে নজরুল-মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।১২ কিন্তু আবদুল হক প্রয়োজন-অপ্রয়োজনের বিতর্কে না জড়িয়ে নজরুল-সাহিত্যের অপরিহার্য দিকসমূহ নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন। ‘জাতীয় কবি’ বিতর্কে না জড়িয়ে নজরুল-প্রতিভার যথাযথ স্বীকৃতি দিয়েছেন। নজরুলের সৃষ্টিসম্ভার ও মানস-চেতনার প্রকৃত রূপ পাঠকের সম্মুখে উপস্থিত করেছেন। নজরুল-মূল্যায়নে এটিই তাঁর সার্থকতা ও নিরপেক্ষতা।

কাজী নজরুল ইসলাম শিল্পী। তবে সমাজকে তিনি কখনো বিস্মৃত হননি। তাঁর জাতীয়তাবাদী চেতনার একাংশ ভারতীয়, অন্য অংশ বাঙালি। তবে ভারতীয়ত্বের সক্রিয়তা বেশি। ভারতীয় জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রকাশ তাঁর সৃষ্টিসম্ভারের সর্বত্র। কিন্তু বাঙালি জাতীয়তার চেতনা অল্প হলেও প্রকাশ অভ্রান্ত। এ-বিষয়টি মূল্যায়নে আবদুল হক নিরাসক্ত থেকেছেন – কোনো মতবাদপন্থী হননি।

কাজী নজরুল ইসলাম দেশবাসীকে আর্থনীতিক ও রাজনীতিক শোষণ থেকে মুক্তির বার্তা শুনিয়েছেন। শোষকদের চরিত্র যে সকল কালে একই রকম থাকে – এ-সত্যটি অকুণ্ঠচিত্তে প্রকাশ করেছেন। তাঁর জাগরণের বার্তা অখন্ড ভারতের জন্যে হলেও বাঙালিকে তিনি দূতের ভূমিকায় দেখতে চেয়েছেন। নজরুলের বক্তব্য বিষয়কে স্পষ্ট করার প্রয়াসে আবদুল হক তাঁর যেসব কবিতা, গান ও গদ্য ব্যবহার করেছেন তা থেকে ‘যক্ষ রক্ষরা’ কবিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশটি এখানে তুলে ধরা হলো –

সাড়ি-মোড়া যেন আনন্দ-শ্রী দেখো বাঙলার নারী

দেখ নি এখনো, ওঁরাই হবেন অসি-লতা তরবারি।১৩

আবদুল হক ‘নজরুল ইসলাম ও বাঙালী জাতীয়তাবাদ’ শীর্ষক প্রবন্ধে কবিতাটির বিশ্লেষণ করেছেন এভাবে –

এই কবিতায় তিনি বিশেষভাবে বাঙালীদের কাঙ্ক্ষিত সশস্ত্র বিপ্লবের চিত্র এঁকেছেন বিদেশী শোষণের বিরুদ্ধে। তাঁর এই আকাঙ্ক্ষা সচেতন আকাঙ্ক্ষা।… শুধু শোষণের অবসান নয়, সার্বভৌম বঙ্গদেশ প্রতিষ্ঠা। (পৃ ৪৩)

১৩৪৯ সনের ৩ বৈশাখ নবযুগের সম্পাদকীয়তে নজরুল লেখেন – ‘বাংলা বাঙালীর হোক। বাংলার জয় হোক। বাঙালীর জয় হোক।’১৪ আবদুল হক বক্তব্যটির বিচার করেছেন এভাবে – ‘এখানে বাঙালী জাতীয়তাবাদের পূর্ণ প্রকাশ ঘটেছে।… প্রথম জীবনে তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদী, কিন্তু কবিজীবনের একেবারে শেষ পর্যায়ে সার্বভৌম বাংলার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন।’১৫ বস্ত্তত তাঁর আগমনে বাঙালি মুসলমান ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে দ্বিধা-সংশয় কাটিয়ে উঠতে সমর্থ হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে বাঙালি মুসলমান আত্মবিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করেছে। নজরুলকে আলোচনার বিষয়বস্ত্ত করার ক্ষেত্রে আবদুল হকের সার্থকতা এখানেই। কিন্তু বাংলাদেশ-পর্বে আবার নজরুলকে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার প্রচেষ্টা হলে তার বিরোধিতা করে তিনি ‘ফুলের জলসায়’ শীর্ষক প্রবন্ধে দুঃখ করে লেখেন –

তাঁর মৃত্যু-উপলক্ষে রেডিওতে-টেলিভিশনে যেসব অনুষ্ঠান প্রচারিত হলো তাতে মনে হয় তিনি ইসলামের কবি ছাড়া আর কিছুই ছিলেন না। এমন টুকরো টুকরো করে তাঁকে জনসমাজে পরিবেশন করা হবে আরো অনেক দিন, মনে হয়।১৬

‘নজরুলের সমাজ-চিন্তা’ শীর্ষক অপর প্রবন্ধে আবদুল হক কবির সংস্কারমুক্ত সমাজ-চিন্তার স্বরূপ আলোচনা করেছেন। আচার-সর্বস্ব, আড়ম্বরপূর্ণ মুসলমান সমাজের জাগরণ-প্রচেষ্টা প্রবন্ধটির বিষয়বস্ত্ত হয়েছে। ‘নজরুলের গল্প ও উপন্যাস’১৭ ও ‘নজরুলের নাটক’১৮ শীর্ষক রচনা দুটিতেও তিনি নজরুলের সৃজনশীল রচনা মূল্যায়নে উদার ও নিরপেক্ষ থাকতে পেরেছেন।

 

২.২

ভাববাদের সমালোচক, মুক্তবুদ্ধির প্রচারক, যুক্তিবাদী প্রাবন্ধিক আবদুল ওদুদ বাঙালি মুসলমানের চিন্তার জড়তা থেকে মুক্তি দেওয়ার চেষ্টাকারী প্রধানতম চিন্তানায়ক। ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজে’র পুরোধা ব্যক্তি ওদুদ ছিলেন জাত প্রাবন্ধিক। এছাড়া কবিতা, উপন্যাস, গল্প এবং অনুবাদে তিনি ভূমিকা রেখেছেন। শিষ্যতুল্য আবদুল হক ওদুদ প্রতিভার মূল্যায়নে একাধিক প্রবন্ধ রচনা করেছেন। মুসলমান সমাজের পশ্চাৎপদতার কারণ, হিন্দু-মুসলমানের বিরোধের উৎসসন্ধান, রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব, বিকাশ ও সমাজে এর কুফল প্রভৃতি সমকালীন জটিল ও অমীমাংসিত বিষয়সমূহ সম্পর্কে ওদুদের দৃষ্টিভঙ্গি ও আবদুল হকের মূল্যায়ন এসব প্রবন্ধের বিষয়বস্ত্ত হয়েছে। ‘কাজী আবদুল ওদুদ : বিচিত্র অনুরাগ’ শীর্ষক প্রবন্ধে ওদুদ প্রতিভার সামাজিক মূল্য নির্ণয়ে আবদুল হক বলেন –

চিন্তার প্রসারে ও গভীরতায়, মৌলিকতায় ও সাহসিকতায়, জ্ঞানের বিচিত্রমুখী অভিযাত্রায় এবং প্রবন্ধের রূপকর্মে তাঁর সময় অবধি তিনি বাঙালি মুসলিম সমাজে শীর্ষস্থানীয়।… সমগ্র বাংলা সাহিত্যেও তিনি শ্রেষ্ঠতম প্রাবন্ধিকের একজন। স্বসম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সামাজিক চিন্তার জড়তায় বহু-বিতর্কিত নির্ভীক এবং কঠিন আঘাত তিনি হেনেছিলেন লেখক জীবনের প্রথম পর্যায়েই।… ওদুদ সাহেব ছিলেন সচেতন মনের অধিকারী, নিবেদিতচিত্ত সাহিত্যিক।… তিনি সত্যিকার অর্থে সংস্কৃতিবান ছিলেন, তাঁর রচনাবলীর সর্বত্র তার পরিচয় ছড়িয়ে আছে।১৯

ওদুদ ছিলেন একান্তভাবে সাহিত্যিক – রাজনীতিক নন। তবে একজন সচেতন মানুষ হিসেবে তাঁর রচনায় রাষ্ট্রচিন্তার পরিচয় পাওয়া যায়। ইতিহাস মেনে চলাও তাঁর নীতি ছিল। তিনি ছিলেন অখন্ড ভারতীয় জাতীয়তাবাদী মুসলমান। সে-অর্থে পাকিস্তানবিরোধী। কিন্তু দেশভাগ হলে তিনি পাকিস্তান-ভারত উভয় অংশের কল্যাণ কামনা করেছেন। পাকিস্তান রাষ্ট্রে এসে ভোল পালটে সুবিধাবাদীদের দলে জায়গা নেননি। তাঁর চিন্তায় এক ধরনের বিশিষ্টতা ও সূক্ষতা ছিল। ‘কাজী আবদুল ওদুদ : রাষ্ট্রচিন্তা’ শীর্ষক প্রবন্ধে আবদুল হক ওদুদের রাজনীতি-দর্শন সম্পর্কে অভিমত দেন –

অন্যান্য চিন্তার মতো ওদুদ সাহেবের রাষ্ট্রচিন্তার মধ্যেও কিছুটা বিশিষ্টতা ছিল। নিজস্ব দৃষ্টিকোণ ছাড়াও এ বিশিষ্টতার একটা উল্লেখনীয় দিক হচ্ছে চিন্তার স্বাধীনতা; প্রয়োজনের মুহূর্তে তিনি রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধী উভয়েরই সমালোচনা করেছেন। তিনি রাজনীতিক ছিলেন না; তথাপি সমকালীন রাজনীতির আলোচনায় সময় সময় তিনি এরূপ প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন যা অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতার ছিল না।২০

তাঁর মতে, ওদুদের সাহিত্য-চর্চার মূল লক্ষ্য ছিল ‘বুদ্ধির মুক্তি’। আর রাষ্ট্রচিন্তায় – স্বচ্ছ, স্বাভাবিক এবং সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী। তবে এক অর্থে তিনি সাম্প্রদায়িক। তা হলো, তাঁর লেখনীর উদ্দেশ্যের ক্ষেত্র। তিনি তাঁর স্ব-সমাজের অর্থাৎ মুসলমান সমাজের কল্যাণকামী ছিলেন। এই বিশেষ অর্থে তিনি সাম্প্রদায়িক।২১

ওদুদ ঘুণে-ধরা ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন মুসলিম সমাজ-জীবনের পরিবর্তন চেয়েছিলেন। পরিবর্তন প্রক্রিয়ার মধ্যে হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য সমকালে বিতর্কের জন্ম দেয়। ‘মুস্তফা কামাল সম্বন্ধে কয়েকটি কথা’ এবং ‘সম্মোহিত মুসলমান’ শীর্ষক রচনা দুটিতে ওদুদের এরূপ মন্তব্য প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে দ্বিতীয় প্রবন্ধটিকে আবদুল হক ওদুদ-চিন্তার ঘোষণাপত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।২২

সমকালে প্রবন্ধটির জন্যে ওদুদের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ আনা হয়েছিল। কিন্তু আবদুল হক মনে করেন, প্রবন্ধটির মধ্য দিয়ে মুহাম্মদ (সা.)-কে সম্মান দেখানো হয়েছিল। তাছাড়া ওদুদ যে-সময়ে মুসলমান সমাজের অচলায়তন ভাঙতে আঘাত করেছিলেন – সে-সময়ে এরকম চিন্তা ধারণ করার মতো সাংস্কৃতিক বিকাশ মুসলমান সমাজে ছিল না। না থাকার কারণ বর্ণনায় হক  যে-যুক্তি দেন তাকে মুসলমান সমাজের পশ্চাৎপদতার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। আবদুল হক বলেন –

মুসলিম সমাজের পশ্চাদপদতার কারণ ইসলামী বিধিবিধান অথবা রক্ষণশীল মোল্লা সমাজ নয়, অনুকূল অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশের অভাব। আবার অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক পরিবেশ রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্য দেশের কথা বাদ দিয়ে বাংলাদেশের দিকে তাকালেও বোঝা যায়। সেরূপ অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হলে কারো অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা না করেই মুসলিম সমাজের জীবনযাত্রা এবং চিন্তা ও সংস্কৃতিচর্চা শাস্ত্রবাদী বিধিনিষেধকে পাশ কেটে যেতে পারে, যেমন পাকিস্তান আমলেই গিয়েছিল।২৩     

আবদুল হক ওদুদের চিন্তা-চর্চার নিরবচ্ছিন্ন সমর্থক ছিলেন না। ওদুদের দর্শনে অস্পষ্টতা দৃষ্ট হলে তিনি তাঁর গঠনমূলক সমালোচনায় মুখর হয়েছেন। ওদুদ যখন বলেন, ‘তাই ধর্ম যা জীবনের বিকাশের সহায়ক আর তাই অধর্ম যা তেমন সাহায্য করে না।’ তখন আবদুল হক ওদুদ প্রদত্ত মতের বিরোধিতা করে লেখেন, ওদুদ ধর্মের আনুষ্ঠানিকতার প্রতি লক্ষ রেখে ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলেছেন। ওদুদ যা বলেছেন, তা প্রকৃত ধর্মকে অনুধাবন না করে কেবল আচারনিষ্ঠ মুসলমানদের পর্যবেক্ষণ করে। আচারনিষ্ঠরা সংখ্যায় সবসময় বেশি। তাদের ধর্ম ইসলাম নয়, লোকায়ত ইসলাম।

আবদুল হকের মতে, ওদুদের সময়কাল ছিল হিন্দু-মুসলমানের বিরোধের কাল। তিনি এজন্যে এ-ধর্মের কিছু অংশ ও ধর্মের কিছু অংশ সরিয়ে সমন্বয়ের কথা ভেবেছিলেন। এবং সমাজে সাম্প্রদায়িকতার কারণ হিসেবে ধর্মকে দায়ী করেছিলেন। আবদুল হক ওদুদের এসব মতের বিরোধিতা করে বলেন –

হিন্দু-মুসলিম বিরোধের কারণ যে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ-সংঘাত হতে পারে, এবং ধর্ম এই বিরোধে একটা প্রতীক হিসাবে ব্যবহৃত হতে পারে, এ-তিনি ভাবেন নি। হিন্দু-মুসলিম বিরোধের যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাঁরা অনেকেই আনুষ্ঠানিক ধর্মের ধার ধারতেন না এটা তাঁর নজর এড়িয়ে গিয়েছিল। (পৃ ৫২)   

হিন্দু-মুসলমানের বিরোধের কারণ সংক্রান্তু উপর্যুক্ত বর্ণনায় হকের সমাজ-ভাবনার গভীরতা প্রকাশিত হয়েছে। আবদুল হকের মতে, গবেষকদের অনেকেই সাম্প্রদায়িকতার উৎসমূলে প্রবেশ করেন না। তাঁরা জানতে চান না এর মূলে আছে রাজনীতিক-আর্থনীতিক বৈষম্য। অথচ এসব কারণেই তাঁরা একে অপরের প্রতিপক্ষে পরিণত হন এবং ধর্মকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করান। এভাবে  ধর্ম-সাম্প্রদায়িকতার জন্ম হয় এবং রাজনীতি ও অর্থনীতি এর জোগান দিতে থাকে। তাই আর্থনীতিক মুক্তি এবং রাজনীতিক উদারতাই এ-অঞ্চলের মুসলমানের মুক্তির পথ হতে পারে। সাম্প্রদায়িক বিরোধ এড়ানোর উপায় প্রসঙ্গে প্রাবন্ধিক বলেন –

ধর্মকে সংশোধন করে নয়, রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন করতে পারলে এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দাবির মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে পারলে তবেই এরূপ ক্ষেত্রে বিরোধ এড়ানো সম্ভব। (পৃ ৫২)

ওদুদ ধর্মের আনুষ্ঠানিকতার বিলোপ প্রত্যাশী ছিলেন। তাঁর ধর্মচিন্তা প্রচলিত ধর্মবোধ নয় – ‘ধর্ম দ্বারা অনুপ্রাণিত অতি-উন্নত জীবন।’ এ বোধ থেকেই তিনি রাজনীতি-চিন্তায় ধর্মের অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছেন। আবদুল হক বিষয়টিকে ‘পিছুটান’ হিসেবে চিহ্নিত করে লেখেন –

সাধারণ মানুষ অতো কথা না বুঝে শেষ পর্যন্ত প্রচলিত ধর্মজীবনকেই বুঝবে। অতএব তিনি যতোই বাঞ্ছনীয় মনে করুন, তাঁর কল্পিত রাজনীতি শেষ পর্যন্ত তাঁর অনুরাগীদের কাছে ধর্মবর্জিত মনে হবে না, কাজী সাহেবের শুভ ইচ্ছার এই হতে পারে পরিণতি।২৪

 

২.৩

মুসলিম সাহিত্য-সমাজের অন্যতম সংগঠক আবুল হুসেন ছিলেন চিন্তায় অবিমিশ্র বাঙালি, জাতীয়তায় ভারতীয় এবং মানস-গঠনে বিশ্ববাসী। কালের ধারায় ভারত ও ভারতীয় জাতীয়তা খন্ডিত হয়েছে কিন্তু তাঁর এবং সাহিত্য-সমাজের চিন্তার অগ্রসরমানতা এবং মৌলবাদ বিরোধিতা এখনো সক্রিয়।

পূর্বেই বলা হয়েছে, একটা সময় ছিল যখন বাঙালি মুসলমান জীবনের যা কিছু উত্তম তার জন্যে আরব-পারস্যের দিকে তাকিয়ে থাকতো। মুসলিম সাহিত্য-সমাজ বিশেষ করে আবুল হুসেন তাদের এরূপ মানসিকতার বিরুদ্ধে আঘাত করে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প থেকে সমাজকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। মুসলিম সাহিত্য-সমাজের যোগ্য উত্তরসূরি আবদুল হক আবুল হুসেনের  চিন্তা-দর্শনের অনেকখানিই গ্রহণ করেছেন। আবুল হুসেনের অবদান মূল্যায়নে তিনি অভিমত দেন –

আবুল হুসেন ছিলেন একজন সাহসী এবং অগ্রণী চিন্তানায়ক। বাঙালি মুসলিম সমাজে যাঁরা মধ্যযুগীয় অচল চিন্তাধারার সমালোচনা করেছিলেন, চেয়েছিলেন সব চিন্তার সঙ্গে তাঁদের ধর্মীয় চিন্তারও প্রগতি হোক, সে প্রবণতাকে তাঁরা বলতে চেয়েছিলেন ‘বুদ্ধির মুক্তি’, আবুল হুসেন ছিলেন তাঁদের একজন।২৫

মুসলিম সমাজে সুদ গ্রহণের শাস্ত্রীয় নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করেছিলেন আবুল হুসেন। সমকালে বিষয়টি নিয়ে প্রচুর সমালোচনা হয়। অবশ্য পরবর্তীকালে মুসলমান সমাজে এ-বিষয়ে শিথিলতা পরিলক্ষিত হয়। বিষয়টি আবদুল হককে আলোড়িত করে। তিনি মন্তব্য করেন –

সুদ গ্রহণ ইসলামি শাস্ত্রে নিষিদ্ধ ছিল গোঁড়া এবং ‘সাচ্চা’ মুসলমানদের কথা; পরিহাসের কথা এই যে, ঐ প্রবন্ধ প্রকাশের ত্রিশ-বত্রিশ বছর পরে ইসলামি রাষ্ট্র পাকিস্তানে সুদ হালাল বলে গণ্য হয়েছিল, ব্যাংকিং-ব্যবসায় হয়েছিল অপরিহার্য। (পৃ ২৬)

ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলমান উভয় সমাজে সাম্প্রদায়িকতার জন্ম হয় অতীতমুখীনতার কারণে। আবুল হুসেন উভয় সম্প্রদায়কে সংস্কার বর্জন করে, অতীতমুখীনতা ত্যাগ করে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে আহবান করেছিলেন। কেননা তিনি বিশ্বাস করতেন, দেশের সামগ্রিক কল্যাণ সাধনে এর বিকল্প নেই। বস্ত্তত ভারত উপমহাদেশে আবুল হুসেনের চিন্তার ফল ফলেছে প্রাসঙ্গিকভাবেই। তাঁর চিন্তার অগ্রসরমানতার বিষয়টি মূল্যায়নে আবদুল হক বলেন –

তাঁর এই সব কথা বলার ষাট বছর (প্রবন্ধ লেখার সময় থেকে) পরে দেখা যাচ্ছে, শিক্ষিত বাঙালি মুসলিম সমাজের একটা বিরাট অংশই আজ ঐসব ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের ব্যাপারে গাফিলতি করছে। এবং স্বল্প শিক্ষিত ও অশিক্ষিত সমাজও এই মনোভাবের দ্বারা সংক্রমিত হয়েছে। (পৃ ২৯)

আবার সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে আবুল হুসেন যে প্রক্রিয়ায় ধর্মের আচার-নিষ্ঠার পরিবর্তন চেয়েছিলেন আবদুল হক তার সমালোচনা করেছেন। তিনি মনে করেন, আবুল হুসেন যেভাবে ইসলামের বিধিবিধান সংশোধন চেয়েছিলেন – যুগের তুলনায় তা ছিল ভুল। কেননা –

আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামকে গোঁড়া সমাজ কোনোক্রমেই বদলাতে চাইবে না, কিছু লোক চাইলেও তার প্রামাণ্যতার ঝামেলা অনেক, অতএত আনুষ্ঠানিকভাবে বদলাবার কথা না উঠিয়ে মানবিকভাবে সমাজের প্রয়োজনানুযায়ী যদি কোনো বিধিকে নিঃশব্দে বদলানো যায় তাহলে সমাজ এ সম্বন্ধে চুপচাপ থাকবে এই-ই মনে হয়। তার প্রমাণ এই বাংলাদেশেই আছে। পাকিস্তান আমল থেকে আজ পর্যন্ত অনেক ব্যাপারে, যেমন ব্যাঙ্ক-প্রদত্ত সুদ, মানব-চিত্রাঙ্কন, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মানুষের আলোকচিত্রের ব্যবহার, ভাস্কর্য ইত্যাদির ক্ষেত্রে আর আপত্তি করা হয় না। (পৃ ৩০)

অর্থাৎ, ধর্মভাবনায় আবদুল হক আবদুল ওদুদ ও আবুল হুসেনের স্পষ্ট বিরোধিতা করেছেন।

 

২.৪

ওদুদ ও আবুল হুসেনের মতো কাজী মোতাহার হোসেনও মুসলমান সমাজের দুর্দশায় ভাবিত হয়েছেন। আবার সমাজের সামান্য উন্নতিতেও শ্লাঘা বোধ করেছেন। তবে ধর্ম বিশ্বাসের বেলায় তাঁর দর্শন স্থির থাকেনি, আবার সাম্প্রদায়িকও হননি। ‘ধর্ম ও সমাজ’ শীর্ষক প্রবন্ধে মোতাহার হোসেন বলেন –

সমাজের প্রয়োজনেই ধর্মের উদ্ভব।… কোনো প্রতিভাবান ব্যক্তি সমাজের প্রয়োজনে যে-ধর্মের উদ্ভাবন করেন তা সেই সমাজ যে তৎক্ষণাৎ গ্রহণ করে তা নয়, তবে একদিন গ্রহণ করে, সকলে না করলেও হয়তো অধিকাংশ করে এবং নিজেদের মনের রঙে রাঙিয়ে নেয়। এক-একটি ধর্ম মানব-সমাজের               এক-একটি আদর্শ। কিন্তু সেই আদর্শ একদিন পুরনো হয়ে যায়। …বর্তমান যুগের সাধারণ লোকেও জ্ঞানের অনেক বিষয়ে পূর্বকালের মুনি-ঋষি, পয়গম্বর, অবতার প্রভৃতির চেয়ে অনেক উন্নত। (পৃ ৩৬)

এ-বিষয়ে আবদুল হকের অভিমত হলো, যে-কালে তিনি এসব কথা বলেছিলেন তখন তা বলা সহজ ছিল না। সমাজবিজ্ঞানের ইতিহাসে বিষয়টি নতুন না হলেও মুসলমান সমাজে তা ছিল নতুন। কিন্তু তিনি যখন জাতীয় সাহিত্য সৃষ্টির পক্ষে মত দেন তখন সে-প্রক্রিয়াটিকে আবদুল হক বিরোধিতা করেন।

 

২.৫

মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী (১৮৯৬-১৯৫৪) প্রাবন্ধিক, গল্পলেখক এবং জীবনীকার। প্রাবন্ধিক হিসেবে তিনি চিরস্মরণীয়। তাঁর প্রবন্ধগুলো একটি বিচারপ্রবণ যুক্তিনির্ভর সতর্ক মনের অভিব্যক্তি। তিনি ছিলেন মুক্তবুদ্ধি সম্পন্ন চিন্তানায়ক। তাঁর মানস-চেতনার পরিচয় প্রদানে আবদুল হক লেখেন –

জাতীয় জীবনের প্রায় সব রকম সমস্যার ক্ষেত্রে তাঁর বিচরণ ছিল। ধর্ম, ঐতিহ্য, রাজনীতি, ভাষা, সাহিত্য, সমাজ – সবকিছুই তিনি সংস্কারমুক্ত দৃষ্টিকোণ থেকে নিরীক্ষণ করেছেন এবং অনেক ক্ষেত্রেই এমন মতামত প্রকাশ করেছেন যা মনকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়ে যায়,  চিন্তাকে উদ্দীপ্ত করে এবং চেতনাকে প্রখরতর করে তোলে। তিনি ছিলেন মুক্ত-চিন্তা এবং মুসলিম সমাজে মুক্ত চিন্তার অন্যতম উদ্গাতা।২৬

বিভাগোত্তরকালে সৃষ্ট সাহিত্যে স্বাতন্ত্র্যবাদী চেতনার ঘোরবিরোধী ছিলেন ওয়াজেদ আলী। ‘ভাষা ও সাহিত্যের সংস্কার’ শীর্ষক প্রবন্ধে সাহিত্য রচনায় স্বাতন্ত্র্যবাদের নামে বিদেশমুখীনতার বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদ করেছেন। প্রবন্ধটি মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকার মাঘ ১৩৫৯ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। ভাষা ও সাহিত্যে তিনি স্বাদেশিকতার সমর্থক ছিলেন। তাঁর লেখার উদ্দেশ্য বর্ণনায় আবদুল হক লেখেন –

অগ্রসরমান চিন্তা-জগতের সঙ্গে আমাদের সমাজের পদক্ষেপ মিলিয়ে দিতে হবে, অথচ এই সমাজ কতকগুলি নির্দিষ্ট গন্ডির বাইরে পদক্ষেপ করতে সর্বদাই সশংক, কোনো নূতন দৃষ্টিভঙ্গীর কথা গভীরভাবে চিন্তা করতে অনভ্যস্ত।… আধুনিক মুক্তচিন্তা যুক্তিবাদীদের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে নির্বিরোধ। একই সংগে তিনি ছিলেন অন্যের মতামতের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল এবং নিজের মতামতে অটল অবিচল। (পৃ  ৯৪)

 

২.৬

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের একজন প্রথিতযশা ব্যক্তিত্ব। আবদুল হক তাঁর চিন্তাজগতের পরিচয় দিয়েছেন ‘চিন্তাচর্চায় শহীদুল্লাহ’ শীর্ষক প্রবন্ধের অবতারণা করে। শহীদুল্লাহর ধর্মজীবন বিশ্বাস ও আনুষ্ঠানিকতার সমন্বয়ে পরিপুষ্ট। ধর্মচর্চাকে তিনি সাধনার এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যান, যেখান থেকে অন্য ধর্ম-সম্প্রদায়ের অসম্মান অসম্ভব। তাঁর সমাজ ও সংস্কৃতি-চেতনা ছিল প্রগতিশীলতা ও রক্ষণশীলতার সংমিশ্রণে তৈরি। রাজনীতি-বিশ্বাসে তিনি ছিলেন ‘ইসলামি সমাজতন্ত্রে’র অনুরাগী। অবশ্য তিনি সমাজতন্ত্রকে অগ্রাহ্য করেননি, আবার গণতন্ত্রকেও সমর্থন করেছেন। ভাষা-ভাবনায় তিনি একসময় আরবির সমর্থক ছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর ঘোর বিরোধিতা করেন। শহীদুল্লাহর ভাষা-ভাবনা সম্পর্কে আবদুল হক বলেন, ‘বাংলা ভাষার স্বাভাবিক প্রবাহমানতাকেই তিনি বাঞ্ছনীয় জ্ঞান করেছেন। তিনি ছিলেন বাংলা ভাষা প্রেমিক। বাংলাদেশের সংস্কৃতি চর্চায় এইটেই তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান।’২৭

জাতীয়তাবাদ প্রশ্নে শহীদুল্লাহ উদারতার পরিচয় দিতে পেরেছিলেন। তাঁর জাতীয়তাবাদ দৈশিক – ধর্মীয় নয়। সাম্প্রদায়িকতাকে তিনি ঘৃণা করতেন। এবং সর্বদা অসাম্প্রদায়িক জাতি গঠনের স্বপ্ন দেখতেন। জাতীয় অনুষ্ঠান উদ্যাপনে সকলকে উৎসাহিত করতেন। বাঙালি মুসলমানের নাম বাংলায় রাখা সমীচীন জ্ঞান করতেন। তবে তাঁর চিন্তায় স্ববিরোধিতাও ছিল। তাঁরপরও তিনি স্মরণযোগ্য; কেননা – ‘কিংবদন্তীতে পরিণত একজন বিশিষ্ট মনীষী কখন কী ভেবেছেন সেদিক দিয়েই তাঁর এসব অভিমতের মূল্য।’ (পৃ ৮৪)

 

২.৭

এস ওয়াজেদ আলী (১৮৯০-১৯৫১) প্রথম বাঙালি জাতীয়তাবাদী তাত্ত্বিক। তবে তাঁর জাতীয়তাবাদ পুরোপুরি অসাম্প্রদায়িক ছিল না। ‘বাঙালী মুসলমানের সাহিত্য-সাধনার পথ’ (মাসিক মোহাম্মদী, পৌষ ১৩৩৬) শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি লেখেন, ‘আমাদের ধর্ম সবচেয়ে বড়, আমাদের ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত কালচারের ভবিষ্যৎ সবচেয়ে উজ্জ্বল – এই হবে আমাদের সাহিত্য-সাধনার মূলমন্ত্র।’২৮ অবশ্য ‘বাঙালী মুসলমান’ (সওগাত, শ্রাবণ ১৩৩৭) শীর্ষক অপর প্রবন্ধে তিনি বাংলাদেশের অতীত ঐতিহ্য নিয়ে গর্ববোধ করেন। হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতি কামনা করেন। ভবিষ্যতের বাঙালী শীর্ষক গ্রন্থে তিনি ভারতবর্ষকে কতগুলো খন্ড রাষ্ট্রে বিভক্ত করেন – যে-খন্ড রাষ্ট্রের কাঠামো হবে মানবসমাজের সংস্কৃতিগত ঐক্য, ভাষাগত ঐক্য, স্বার্থসম্বন্ধীয় ঐক্য এবং আদর্শমূলক ঐক্য এবং ভৌগোলিক ঐক্যের ভিত্তিতে।

আবদুল হক বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বলেন, এস ওয়াজেদ আলীই প্রথম স্বতন্ত্র বাংলাদেশের কথা বলেন। সে-অর্থে তিনিই প্রথম বাঙালি জাতীয়তাবাদী তাত্ত্বিক।

রাজনীতি-ভাবনায় এস ওয়াজেদ আলী ধর্মনিরপেক্ষতার পূজারি ছিলেন। তিনি সর্বদা হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি ও ভারতের মঙ্গল কামনা করতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল – প্রকৃত হিন্দু, প্রকৃত মুসলিম এবং প্রকৃত খ্রিষ্টানের মধ্যে বিরোধ হয় না। কিন্তু আবদুল হক বিষয়টির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। তাঁর ভাষায় –

একথা ঠিক নয়। নিজেদের ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য সম্বন্ধে তীব্রভাবে সচেতন ব্যক্তির পক্ষে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি সম্ভব নয়, ভারতীয় উপমহাদেশে এই হচ্ছে অভিজ্ঞতা। ঐ ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য-চেতনা থেকে রাজনীতিকে মুক্ত রাখতে পারলে এবং একটা দৈশিক জাতীয়তাবাদী অনুভব যথেষ্ট পরিমাণে প্রবল হলে তবেই অসাম্প্রদায়িক ধর্ম-নিরপেক্ষ রাজনীতি সম্ভব।২৯

 

তিন

এ অংশে আকরম খাঁ (১৮৬৮-১৯৬৮), নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন (১৮৬০-১৯২৩), সুফী মোতাহার হোসেন (১৯০৭-৭৫), ইমদাদুল হক (১৮৮২-১৯২৬), আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ                 (১৮৭১-১৯৫৩), রিয়াজ-অল-দিন মাশহাদী (১৮৫৯-১৯১৮), ফররুখ আহমদ (১৯১৮-৭৪), রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২), সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-৭৫), মোহাম্মদ লুৎফর রহমান (১৮৮৯-১৯৩৬), সৈয়দ আমীর আলী (১৮৪৯-১৯২৯), আহসান হাবীব (১৯১৭-৮৫), সা’দত আলী আখন্দ (১৮৯৯-১৯৭১) প্রমুখের রচনা ও জীবনাদর্শের মূল্যায়ন প্রসঙ্গে আবদুল হকের দৃষ্টিভঙ্গি বিচার করা হবে। উপর্যুক্ত ব্যক্তিবর্গ সামাজিক অবদান বিচারে দ্বিতীয়াংশে আলোচিত ব্যক্তিদের তুলনায় হয়তো শ্রেষ্ঠ নন। আবার আবদুল হকের দৃষ্টিও সেদিকের বিচার-বিশ্লেষণ করা নয়। এখানে তাঁর লক্ষ্য কেবল কালের প্রেক্ষাপটে অর্থাৎ বাঙালি মুসলমান সমাজের অগ্রগতিতে উপর্যুক্ত ব্যক্তিবর্গের অবদান মূল্যায়ন করা।

৩.১

মওলানা আকরম খাঁ ছিলেন যুক্তিবাদী ধর্মচিন্তাবিদ। মোস্তফা-চরিত, সমস্যা ও সমাধান গ্রন্থ দুটিসহ বিভিন্ন প্রবন্ধে তাঁর ধর্মচিন্তার পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি মুসলমান সমাজের পশ্চাৎপদতা ও কুসংস্কারাচ্ছন্নতার কারণ অনুসন্ধানে অত্যন্ত যুক্তিনিষ্ঠ মতামত প্রদান করে নিজের প্রাজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি মুসলিম সমাজের দীর্ঘকালীন স্থবিরতা ও দাসত্বের জন্যে দুটি কারণ নির্দেশ করেছেন – এক. বুজর্গানে দ্বীন একথা বলেছেন এবং দুই. অমুক কেতাবে লেখা আছে।

যা অন্তঃসারশূন্য চিন্তা ছাড়া অন্য কিছু নয়। এজন্যে তিনি লিখেছেন, ‘মুসলমান জাতির সংস্কার করিতে হইলে, তাহার মস্তিষ্কের সংস্কার আগে করিতে হইবে।’৩০ আবদুল হক বিষয়টিকে আরো এগিয়ে নিয়ে বলেন, ‘যুক্তিবাদের দ্বারাই এই সংস্কার সম্ভব।’ (পৃ ৬৮)

প্রাবন্ধিকের মতে, আকরম খাঁর যুক্তিবাদ সূত্রাবদ্ধ – কোরআন-সুন্নাহ কেন্দ্রিক। তথাপি তাঁর প্রয়াসে মুসলমান সমাজ নতুন দৃষ্টিভঙ্গি লাভের সুযোগ পেয়েছে। বাঙালি মুসলমান আধুনিক সমাজ গঠন ও সংস্কৃতির চর্চায় আগ্রহী হয়েছে। সংগীত, চিত্রকলা, সুদ (ব্যাংকিং) ও নারী অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা প্রকাশ করেছে।৩১

 

৩.২

নজিবর রহমান-রচিত পাঁচটি উপন্যাসের মধ্যে আনোয়ারা (১৯১৪) প্রধানতম। বিপুল জনপ্রিয় এ-গ্রন্থটি সমঝদার পাঠকের কাছে বরাবর সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে। যেসব কারণ উপন্যাসটির সমালোচনার জন্য দায়ী আবদুল হক ‘আনোয়ারা’ শীর্ষক প্রবন্ধে সেসব দিকের ইঙ্গিত করেছেন। প্রাবন্ধিক উপন্যাসটির কৃতিত্বগুলো বর্ণনার পাশাপাশি দুর্বলতাসমূহকে নিম্নোক্তভাবে উপস্থাপন করেছেন –

অবাস্তব ঘটনার সন্নিবেশ।

নীতিকথার বাহুল্য। সৎ ও অসতের সংঘাত এবং অসত্যের পরাজয় – এই হচ্ছে উপন্যাসটির বিষয়বস্ত্ত।

চরিত্র-চিত্রনে যুগের প্রভাব। অর্থাৎ যারা ভালো তারা বিশুদ্ধ রকমের ভালো আর যারা খারাপ তারা সম্পূর্ণরূপে খারাপ।

তারপরও তিনি নিম্নোক্ত বিষয় বিবেচনায় উপন্যাসটিকে আলোচনায় এনেছেন –

যে-কোনো কারণে হোক – এবং সর্বত্র অসঙ্গত কারণে নয় – এতদিন ধরে পঠিত হতে পারে এমন একটি উপন্যাস লেখা কৃতিত্বের কথা এবং আরও একটি বড় কথা – নজিবর রহমানের আগেও বাঙ্গালী মুসলিম সমাজকে নিয়ে দু-চারখানি উপন্যাস লেখা হয়েছে, কিন্তু সাহিত্য বলে গণ্য হতে পারে, অন্ততঃ আংশিকভাবে, এরূপ উপন্যাস লেখার প্রথম কৃতিত্ব এবং প্রথম গৌরব নজিবর রহমানেরই।৩২

 

৩.৩

কাজী ইমদাদুল হক সমাজচিত্রের সুস্থ উপস্থাপক ও সমাজ সংস্কারক। সমাজকে নিরীক্ষণ করার প্রবণতা তাঁকে বিশিষ্ট করেছে। সমাজ নিরীক্ষণের বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির জন্যে তিনি মুসলিম লেখকদের মধ্যে অগ্রগণ্য। আবদুল হক ঔপন্যাসিক ইমদাদুল হকের অমর সৃষ্টি আবদুল্লাহ (১৯২৮) উপন্যাসটি মূল্যায়ন প্রসঙ্গে লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি, কৃতিত্ব ও সীমাবদ্ধতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি ‘আবদুল্লাহ’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেন –

সমাজবীক্ষণ যদি আধুনিক কালের ঔপন্যাসিকদের প্রথম লক্ষণ হয়, তাহলে সে লক্ষণ তাঁর মধ্যে ছিল ষোল আনায়। তাঁর দৃষ্টি সর্বব্যাপক : সে দৃষ্টি থেকে কোনো কিছুই গোপন থাকেনি এবং কোনো কিছুই বাদ পড়েনি।৩৩ 

এছাড়াও তিনি ‘দু’জন কবি প্রসঙ্গে’ শীর্ষক প্রবন্ধে বাংলা কাব্যের অপেক্ষাকৃত অনালোচিত দুজন কবি সুফী মোতাহার হোসেন ও রিয়াজউদ্দীন চৌধুরীর কাব্য সাধনায় ‘নিষ্ঠা’র প্রশংসা করেছেন।৩৪ রিয়াজ-অল-দিন মাশহাদীকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী তাত্ত্বিক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেবার প্রচেষ্টা নিয়েছেন।৩৫ ‘আবুল হাশিম : রাষ্ট্রচিন্তা ও ধর্মদর্শন’ শীর্ষক প্রবন্ধে উপমহাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ আবুল হাশিমের চিন্তা ও দর্শন মূল্যায়নে সচেষ্ট থেকেছেন। বিশেষত মুসলিম সমাজে চিন্তার গতিশীলতা আনয়নের জন্যে ইজতেহাদের ওপর জোর দেওয়া, ভাষা-আন্দোলনকে সমর্থন করা, রবীন্দ্রবিরোধীদের বিরোধিতা, সাংস্কৃতিক প্রগতিশীলতা, মুসলিম রাজনীতিতে বামপন্থার প্রবেশ ঘটানো, পাকিস্তান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখা প্রভৃতি প্রসঙ্গে আবদুল হক আবুল হাশিমের            চিন্তা-দর্শনের প্রশংসা করেছেন। আবার রাষ্ট্রচিন্তায় পশ্চাৎপদতা ও সাম্প্রদায়িক চিন্তার কারণে তাঁর সমালোচনা করেছেন। লুৎফর রহমানকে ‘পূর্ণ অখন্ড মনুষ্যত্বের উদ্বোধন’কারী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।৩৬ সৈয়দ আমীর আলীকে তিনি দেখিয়েছেন প্রথম আধুনিক বাঙালি মুসলমান, মধ্যযুগসুলভ মানসিকতা ও স্থবিরতা-বিরোধী এবং যুক্তিবাদী হিসেবে। তাঁর চিন্তা-দর্শন মূল্যায়নে আবদুল হক বলেন, ‘ঢাকার মুসলিম সাহিত্য-সমাজের চিন্তাধারার কয়েকটি সূত্র তাঁর রচনাবলীতেই প্রথম ব্যক্ত হয়েছিল,…।’৩৭ অর্থাৎ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও বিধিনিষেধ পুনর্বিবেচনা এবং মাতৃভাষায় ইবাদতের উল্লেখ প্রভৃতি প্রসঙ্গে মুসলিম সাহিত্য-সমাজ আমির আলীর নিকট প্রেরণা গ্রহণ করে। আর ফররুখ আহমদ প্রতিভাশালী হয়েও দর্শন-ভাবনায় স্বাতন্ত্র্যবাদী হওয়ায় তাঁকে তিনি ‘কালের শিকার’ হিসেবে চিহ্নিত করে আমাদের সম্মুখে হাজির করেন।

বাঙালি মুসলমান লেখকদের কর্ম-মূল্যায়নে আবদুল হক নিরপেক্ষ ছিলেন। তিনি যা বিশ্বাস করতেন, সে-আলোকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের প্রদত্ত মতামত পর্যালোচনা ও নিজের দর্শন ব্যক্ত করেছেন। ব্যক্তিগত সম্পর্ক ব্যক্তি ও কর্ম মূল্যায়নে কোনো প্রভাব রাখতে পারেনি। ফলে উপর্যুক্ত ব্যক্তিবর্গের সাহিত্যকর্ম ও জীবন-দর্শন মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি, হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক, সমাজ, রাজনীতি, ধর্ম প্রভৃতি সম্পর্কে আবদুল হকের দৃষ্টিভঙ্গি।

আবদুল হক বাঙালি জাতীয়তাবাদের উদ্যোক্তা পুরুষ। মতবাদ প্রচার ও প্রতিষ্ঠা তাঁর সৃষ্টিকর্মের উদ্দেশ্য হওয়ায় অন্যান্য বিষয়ের মতো ‘সাহিত্য-সাহিত্যিক দর্শন’ মূল্যায়নেও তিনি সমকালে স্বাতন্ত্র্যবাদীদের নিকট সমালোচিত হয়েছিলেন। অবশ্য যে-কোনো নতুন চিন্তাধারার প্রচারক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের এটিই নিয়তি। কিন্তু কারো কারো ভাগ্যে এর চেয়ে বেশি দুর্ভোগ নেমে আসে। আবদুল হক এবং তাঁর মতাদর্শের ধারক পত্রিকা সমকাল (১৯৫৭) ও এর সম্পাদক সিকান্দার আবু জাফরের ভাগ্যে তা-ই জুটেছিল।

বাঙালি জ্ঞান-চর্চার ক্ষেত্রে কখনো বিশ্বনাগরিকতা বর্জন করেনি।৩৮ আবদুল হক এ সম্পর্কে সচেতন থেকে নিজে  সীমারেখা-বর্জিত জ্ঞানের সাধনা করেছেন এবং সকলকে তা করার আহবান জানিয়েছেন। উপর্যুক্ত দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে তিনি বাঙালি মুসলমান সাহিত্যিকদের চিন্তা ও কর্ম মূল্যায়ন করার ফলে বাংলা সাহিত্য সমালোচনায় বাঙালি মুসলমানের হীনমন্যতা অনেকখানি দূর হয়েছে। ফলে বাঙালি মুসলমান তার জাগরণের পথে আরো একধাপ অগ্রসর হতে পেরেছে এবং শতাব্দীকাল ধরে চলমান বাঙালি মুসলমানের cultural identity সংক্রান্ত দ্বিধা-দ্বন্দ্বের আরো একটি দিকের অবসান হয়েছে।

তথ্যনির্দেশ ও টীকা

১. আবদুল হকের জন্ম ১৩২৫ সালের ২৫ আশ্বিন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গোমস্তাপুর থানার উদয়নগর গ্রামে।

২. আহমাদ মাযহার, আবদুল হক, বাংলা একাডেমি, ঢাকা ২০০১, পৃ ৩১।

৩.       আহমাদ মাযহার, আবদুল হক, পূর্বোক্ত, পৃ ৯৮।

৪. ভূমিকা, আবদুল হক : শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ, আহমাদ মাযহার (সম্পা.), বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ঢাকা ২০০২।

৫. ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজে’র পূর্বে ১৯১১ সালে কলকাতায় ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সমিতি’ নামের একটি সংগঠন বাঙালি মুসলমানের মুক্তির লক্ষ্যে প্রথম যূথবদ্ধ প্রচেষ্টা  চালায়। সংগঠনটি নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও দেশভাগ পর্যন্ত সক্রিয় ছিল। এ সংগঠনের মুখপত্রের নাম ছিল বঙ্গীয় মুসলমান-সাহিত্য-পত্রিকা (১৯১৮)। বঙ্গীয় মুসলমান-সাহিত্য-পত্রিকার প্রকাশ বাঙালি মুসলমানের সামাজিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। পত্রিকাটি মাতৃভাষা বাংলা চর্চার ওপর প্রভূত গুরুত্ব আরোপ করে লেখক-সমাজকে সাহিত্যচর্চায় উৎসাহিত করে চলে এবং সফল হয়।

৬.       আবদুল হক, ‘শিখার সন্ধানে’, সমকাল, ৫ বর্ষ ৩-৫ ও ৬-৮ সংখ্যা, কার্তিক-পৌষ ও মাঘ-চৈত্র ১৩৬৮, পৃ ১৫৪। প্রবন্ধটি ‘ঢাকার মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’ শিরোনামে সাহিত্য ঐতিহ্য মূল্যবোধ (১৯৭৬) শীর্ষক গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়।

৭. আবদুল হক, ‘কাজী মোতাহার হোসেন’, চেতনার এলবাম এবং বিবিধ প্রসংগ, বাংলা একাডেমি, ঢাকা ১৯৯৩, পৃ ৩৪-৩৫।

৮.       আবদুল হক, ‘শিখার সন্ধানে’, সাহিত্য ঐতিহ্য মূল্যবোধ, মুক্তধারা, ঢাকা ১৯৭৬, পৃ ১৫৪।

৯.       মোরশেদ শফিউল হাসান, পূর্ব বাংলায় চিন্তাচর্চা ১৯৪৭-১৯৭০ : দ্বন্দ্ব ও প্রতিক্রিয়া, অনুপম প্রকাশনী, ঢাকা ২০০৭, পৃ ৫৯৯।

১০. উদ্ধৃত, আনিসুজ্জামান, ‘স্বরূপের সন্ধানে’, স্বরূপের সন্ধানে, সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা, ১৯৯১, পৃ ৭৩। আসলে মুসলিম জাতীয়তাবাদী চেতনায় আচ্ছন্ন তৎকালীন সমাজে বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা বলাই ছিল দুঃসাধ্য ব্যাপার। মাসিক মোহাম্মদী  পত্রিকায় ১৩৫৮ সালের আষাঢ় সংখ্যার আলোচনা বিভাগে ‘তামুদ্দনিক সংকট’ শীর্ষক লেখা থেকে সেদিনের অবস্থা অনেকটাই অনুধাবন করা যায়। যেখানে নববর্ষ, বসন্তোৎসব, রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী প্রভৃতি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানসমূহকে পাকিস্তান-বিরোধী অর্থাৎ ‘গয়ের এছলামী ভাবধারা’ প্রচারের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখানো হয়। এসবের পেছনে ভারতের হিন্দু মহাসভার ইসলামি তমদ্দুন ধ্বংসের ষড়যন্ত্র বা কমিউনিস্ট ভাবধারা প্রচারের চেষ্টা আলোচক লক্ষ করেছেন। (উদ্ধৃত, হাবিব রহমান, বাঙালি মুসলমান সমাজ ও বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন, মিত্রম, কলকাতা ২০০৯, পৃ ১৭২-১৭৩। সমালোচক বলেন, ‘বস্ত্তত এ ধরনের বক্তব্য কেবল মোহাম্মদী কর্তৃপক্ষের ছিল না, ছিল স্বয়ং সরকারেরও।’ (হাবিব রহমান, বাঙালি মুসলমান সমাজ ও বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন, পূর্বোক্ত, পৃ ১৭৩।)

১১.     রেজোয়ান সিদ্দিকী, পূর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন, বাংলা একাডেমি, ঢাকা ১৯৯৬,                পৃ ১৫১।

১২. সাঈদ-উর রহমান, পূর্ব বাংলার রাজনীতি-সংস্কৃতি ও কবিতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা ১৯৮৩, পৃ ১০৩।

১৩.উদ্ধৃত, আবদুল হক, ‘নজরুল ইসলাম ও বাঙালী জাতীয়তাবাদ’, সাহিত্য ও স্বাধীনতা, বাংলা একাডেমি, ঢাকা ১৯৭৪, পৃ ৪৩।

১৪. উদ্ধৃত, ‘নজরুল ইসলাম ও বাঙালী জাতীয়তাবাদ’, পূর্বোক্ত,  পৃ ৪৫।

১৫. ‘নজরুল ইসলাম ও বাঙালী জাতীয়তাবাদ’ পূর্বোক্ত, পৃ ৪৫।

১৬. আবদুল হক, ‘ফুলের জলসায়’, নিঃসঙ্গ চেতনা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, বাংলা একাডেমি, ঢাকা ১৯৮৪, পৃ ৬৪।

১৭. আবদুল হক, ‘নজরুলের গল্প ও উপন্যাস’, ক্রান্তিকাল, সমকাল প্রকাশনী, ঢাকা ১৯৬২, পৃ ১০৬।

১৮. আবদুল হক, ‘নজরুলের নাটক’, সাহিত্য ও স্বাধীনতা, প্রাগুক্ত, পৃ ৩৬।

১৯. আবদুল হক, ‘কাজী আবদুল ওদুদ : বিচিত্র অনুরাগ’, সাহিত্য ও স্বাধীনতা, পূর্বোক্ত, পৃ ৪৭-৪৮।

২০. আবদুল হক, ‘কাজী আবদুল ওদুদ : রাষ্ট্রচিন্তা, সাহিত্য ও স্বাধীনতা, পূর্বোক্ত, পৃ ৫০।

২১. সাম্প্রদায়িকতা ততটুকুই সমর্থনযোগ্য – যতটুকু চর্চা করলে অন্য সম্প্রদায়ের ক্ষতি না করে কেবল নিজ সম্প্রদায়ের উপকার করা যায়। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার ধর্ম হলো – অন্য সম্প্রদায় থেকে আহার সংগ্রহ করা। এ-অর্থে সাম্প্রদায়িকতা বর্জনীয়। উল্লেখ্য, ওদুদ সাম্প্রদায়িকতার কেবল প্রথম অংশের চর্চা করেছেন।

২২. আবদুল হক, ‘কাজী আবদুল ওদুদ’, নিঃসঙ্গ চেতনা ও অন্যান্য প্রবন্ধ, বাংলা একাডেমি, ঢাকা ১৯৮৪, পৃ ৪৪।

২৩. ‘কাজী আবদুল ওদুদ’, পূর্বোক্ত, পৃ ৪৮। এখানে শিল্পকলার চর্চা, ভাস্কর্য-শিল্পের চর্চা, ইনস্যুরেন্স, প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রভৃতির দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

২৪. আবদুল হক, ‘রাজনীতি প্রসঙ্গে কাজী ওদুদ’, চেতনার এলবাম এবং বিবিধ প্রসংগ, প্রাগুক্ত, পৃ ২১।

২৫. আবদুল হক, ‘আবুল হুসেন’, চেতনার এলবাম এবং বিবিধ প্রসংগ, পূর্বোক্ত, পৃ ২৪।

২৬. আবদুল হক, ‘মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী’, ক্রান্তিকাল, প্রাগুক্ত, পৃ ৯১।

২৭. আবদুল হক, ‘চিন্তাচর্চায় শহীদুল্লাহ’, সাহিত্য ও স্বাধীনতা, প্রাগুক্ত, পৃ ৮২।

২৮. উদ্ধৃত, আবদুল হক, ‘একজন বাঙালী জাতীয়তাবাদী’, নিঃসঙ্গ চেতনা ও অন্যান্য প্রবন্ধ, প্রাগুক্ত, পৃ ৭৭।

২৯. ‘একজন বাঙালী জাতীয়তাবাদী’, পূর্বোক্ত, পৃ ৭৮।

৩০. উদ্ধৃত, আবদুল হক, ‘মওলানা আকরম খাঁর ধর্মচিন্তা’, সাহিত্য ও স্বাধীনতা, প্রাগুক্ত, পৃ ৬৮।

৩১. ‘মওলানা আকরম খাঁর ধর্মচিন্তা’, পূর্বোক্ত, পৃ ৭৬।

৩২. আবদুল হক, ‘আনোয়ারা’, ক্রান্তিকাল, প্রাগুক্ত, পৃ ৮৩।

৩৩. আবদুল হক, ‘আবদুল্লাহ’, ক্রান্তিকাল, পূর্বোক্ত, পৃ ৮৪।

৩৪. আবদুল হক, ‘দু’জন কবি প্রসঙ্গে’, ক্রান্তিকাল, প্রাগুক্ত,                পৃ ৭৬।

৩৫. আবদুল হক, ‘আধুনিকতাবাদী পন্ডিত মাশহাদী’, নিঃসঙ্গ চেতনা ও অন্যান্য প্রবন্ধ, প্রাগুক্ত, পৃ ৭৫।

৩৬. আবদুল হক, ‘মোহাম্মদ লুৎফর রহমান’, সাহিত্য ঐতিহ্য মূল্যবোধ, প্রাগুক্ত, পৃ ৮২।

৩৭. আবদুল হক, ‘ইসলাম-প্রসঙ্গে সৈয়দ আমীর আলী’, সাহিত্য ঐতিহ্য মূল্যবোধ, পূর্বোক্ত, পৃ ১১৭।

৩৮. আবদুল হক, ‘আধুনিকতাবাদী পন্ডিত মাশহাদী’, নিঃসঙ্গ চেতনা ও অন্যান্য প্রবন্ধ, প্রাগুক্ত, পৃ ৭৫।