ঋণ স্বীকার করেই লেখা শুরু করছি। কবি শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই অমোঘ শব্দবন্ধ আমার এই লেখার যথার্থ শিরোনাম বলে বিবেচনা করছি। বাংলা গানের এক সুষম ঐতিহ্যমণ্ডিত আবহমানের জন্ম যাঁর হাতে সেই রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে একটি ছয়শো পাতার বিশাল আয়োজন হয়েছে যে-পত্রিকাকে ঘিরে, সেই মুদ্রার এই সংখ্যাটি হাতে নিয়ে প্রথমেই এই শিরোনামটি আমার মনে এলো।

মুদ্রা কৃষ্ণনগরভিত্তিক একটি প্রকাশন সংস্থা। ধ্রুপদি বিষয় নিয়ে পত্রিকা প্রকাশ করা ছাড়া তাদের সমনামের একটি প্রকাশনাও আছে। কৃষ্ণনগরে তারা তাদের পুস্তক বিপণিও সম্প্রতি খুলেছে। সবমিলিয়ে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রকাশন। গতবছর তারা প্রকাশ করেছে রবীন্দ্রনাথের গান

নিয়ে এই সুবিশাল সংখ্যাটি। সম্পাদকীয় ভাষ্যে তারা স্পষ্টই জানিয়ে দিয়েছে, ‘রবীন্দ্রনাথের ১৬০তম জন্মবার্ষিকী

উপলক্ষে এই সংখ্যা রবীন্দ্রনাথকে নিবেদিত। রবীন্দ্রনাথের বহুমুখী প্রতিভার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সৃষ্টিধারা সংগীতকেই আমরা পত্রিকার বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছি।’  বলা বাহুল্য, শুরু থেকেই এভাবে তারা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আমরা আগ্রহান্বিত হই।

৪১টি সুচয়িত প্রবন্ধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তিনটি মূল্যবান সাক্ষাৎকার (সুধীর চক্রবর্তী, অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ও মোহন সিং)। কিছু লেখা অপরিহার্যভাবে পুনর্মুদ্রিত, তবে তাতে পত্রিকার গরিমা যথেষ্ট বৃদ্ধিই হয়েছে নিঃসন্দেহে।

‘রবীন্দ্রনাথ যে শুধু কবিই নন, সঙ্গীতকারও বটে, তা পাশ্চাত্যে জ্ঞাত নয়। প্রকৃত অর্থেই তাঁর কাজে কবিতা ও সঙ্গীতকে পৃথক করা যায় না। গান তাঁর সৃষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ,  যেখানে কথা ও সুর পরস্পরকে পূর্ণ করে।’ এই

কথাগুলি লিখেছেন আর্নল্ড বাকে তাঁর টোয়েন্টি সিক্স সংস অব রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থের ভূমিকায়। বলা বাহুল্য, এই চমৎকার ভূমিকাই পত্রিকার প্রথম লেখা। সোহম চক্রবর্তীর অনুবাদে লেখাটি আমাদের পেছন ফিরে তাকাতে বাধ্য করে। রবীন্দ্রনাথের গান তখনো সেইভাবে আমজনতার গান হয়ে ওঠেনি। সেই ১৯৩০ সালে লন্ডনের ‘ইন্ডিয়ান সোসাইটি’তে রবীন্দ্রসংগীতের মর্মবাণী ব্যাখ্যা করেছিলেন তিনি, যা বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অসামান্য পরিচয় দিয়েছে। পাশ্চাত্যের মানুষের কাছে তাঁর সেই ছাব্বিশটি গানের ডালি পৌঁছে যায় চিরকালের জন্যে। রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠেন স্বদেশাত্মার প্রতিমূর্তি হয়েও আন্তর্জাতিক।

আমি প্রথমেই এই পত্রিকার পুনর্মুদ্রিত অংশের লেখাগুলিতে মনোনিবেশ করেছি। নানা সময়ে নানা জায়গায় এই লেখাগুলির কিছু কিছু দেখলেও একসঙ্গে এইভাবে পাওয়াকে আমি আমার সৌভাগ্য বলেই গণ্য করেছি। রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে আজীবন চর্চা করে গেছেন এমন বেশ কয়েকজনের সুচয়িত এই রচনাসম্ভার। শৈলজারঞ্জন মজুমদার, অনাদি দস্তিদার, রাজ্যেশ্বর মিত্র, নীহারবিন্দু সেনসহ আছে বীরেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রফুল্লকুমার দাস, হিরণকুমার সান্যাল, সুধীর চন্দ, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের লেখা। লেখাগুলি অবশ্যই মূল্যবান। বারবার পড়বার মতো। সুধীর চক্রবর্তীর ‘পছন্দের ২৫টি রবীন্দ্রসংগীত’ লেখাটি আমাকে বেশ আকর্ষণ করে। বাকের ২৬টির পরে এই ২৫টি, বেশ কৌতূহল বোধ করি। বাকে গানগুলি বেছেছিলেন পাশ্চাত্যের শ্রোতাদের কথা ভেবে। আর এখানে সুধীর চক্রবর্তী জোর দিয়েছেন নিজের পছন্দের ওপরে। তবে তালিকা দিয়েই তিনি ক্ষান্ত হননি। গান ধরে ধরে তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন কেন সেগুলি তাঁর পছন্দের। বেশ একটা ঘোরলাগা সেই অনুভব। পড়তে পড়তে আমাদের পছন্দের তালিকাতেও সেগুলি জায়গা করে নেয়। সুধীরবাবুর লেখার সার্থকতা এখানেই।

এই সংখ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ লেখা হলো সর্বানন্দ চৌধুরীর ‘রবীন্দ্রগানের গায়কি : দিনেন্দ্রনাথ ও তারপর’ শীর্ষক রচনাটি। আমরা জানি একই গান বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কণ্ঠে নানারকমভাবে গীত হয়েছে। কোনটা সঠিক আর কোনটাই বা ভুল – এ নিয়ে আমরা ধন্দে পড়ে যাই। রবীন্দ্রনাথের গায়কির কিছু প্রমাণ আমরা পাই গ্রামোফোন রেকর্ডে, যদিও সেগুলি কবির উত্তরকালের গলা। তাছাড়া যান্ত্রিক ত্রুটিসর্বস্ব সেসব গানের মধ্যে দিয়ে তাঁর গান গাওয়ার রীতিকে সেভাবে অনুধাবন করা যায় না। দিনেন্দ্রনাথের বেলাতেও একই সমস্যা। তাছাড়া রেকর্ডকৃত তাঁর গানের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম। এতদসত্ত্বেও সর্বানন্দের লেখার গুণে রবীন্দ্রগানের গায়কি সম্পর্কে আমরা অবহিত হই। অবশ্য এ-ব্যাপারে বিভিন্ন সময়ে বাণীবদ্ধ গানগুলিতে নানাভাবে গায়নরীতির ভিন্নতা আমাদের কানে এসে বাজে। শ্রোতার সঠিক বোধ ও বুদ্ধিনির্ভর এসব গান কালজয়ী হয়ে আছে মূলত গানের কথা এবং তার সুরের অসাধারণ চলনের জন্যে। যোগ্য মানুষের যথার্থ বোধের উচ্চতাই এখানে তাই একমাত্র নিরিখ।

সুশোভন অধিকারী তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় ‘রবীন্দ্রনাথের গান দেখার জগৎ থেকে শোনার ভুবনে’ শীর্ষক লেখায় রবীন্দ্রসংগীত যে কেবল গাইবারই নয়, অনুভবেরও – সে-কথা বেশ জোর দিয়েই বলেছেন। সেই গান গাইতে গায়ক ও শ্রোতার মনে যে-চিত্রকল্পের জন্ম হয় সেখানেই এই গানের বিশুদ্ধতা। আসলে রবীন্দ্রনাথের গানের কথাকে সেইভাবে না বুঝলে তাঁর গান হয়ে যায় যান্ত্রিক। সুশোভন নিজে একজন চিত্রশিল্পী। তাই শিল্পের নন্দনতত্ত্বের বহিরঙ্গটি সেইভাবে বুঝতে পারেন। পাশাপাশি শ্রোতা হিসেবেও তিনি অতি উচ্চাঙ্গের। তাই রবীন্দ্রগানের দেখা ও শোনার ভুবনটি তাঁর অতিপরিচিত। সেই অনুভব থেকে এই লেখাটি অত্যন্ত মনোগ্রাহী হয়ে উঠেছে। সতেরো পাতার এই দীর্ঘ প্রবন্ধে লেখক অত্যন্ত ভাবগম্ভীর স্বরে রবীন্দ্রগানের চিত্রময়তাকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। তিনি তাই অক্লেশে লিখেছেন, ‘… গানের দিকে লক্ষ করলে দেখি, সেখানে বাণীর পরতে পরতে তিনি বুনে দিয়েছেন এমন কিছু অক্ষরমালা – যার গভীর রহস্য বাঙ্গালির চিত্রপটে আজও ছায়াবৃত হয়ে আছে। গানের শরীরে বসিয়ে দেওয়া সেই শব্দযন্ত্রের রহস্যভেদ করা দুষ্কর, দুর্লঙ্ঘ্য দ্বারপালের মতো সে অন্দরে প্রবেশের অনুমতি দেয় না। চকিতে দুয়েকটা বাক্য এমন ছলকে ওঠে যে কিছুতেই তার নাগাল পাওয়া যায় না।’ (পৃ ১০৪)

প্রখ্যাত রবীন্দ্রগানের গবেষক কিরণশশী দে তাঁর রবীন্দ্রসঙ্গীত সুষমা গ্রন্থে লিখেছেন, ‘… যাঁরা কেবল বিশেষভাবে গানের চর্চা করেন তাঁদের অধিকাংশের নজর থাকে কথার উচ্চারণের চাইতে সুরের উচ্চারণের দিকেই বেশি। ফলে সুর-চর্চায় তাঁরা নিঃসন্দেহে কৃতী হন, – স্ব স্ব কণ্ঠনৈপুণ্যের প্রশংসা পেলে তাঁদের শিল্পী-জীবনের তেমনি চরিতার্থতা আসে নানাভাবে। কিন্তু কথা সংবলিত গানের ভিতরে তো শুধু সুর নয়, সেখানে যে সুরের সঙ্গে কথার দিকেও গায়কদের নজর রাখতে হয় সমান ওজনে।’ (রবীন্দ্রসঙ্গীত সুষমা, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ১৯৭৫, পৃ ১০৪)।

প্রসঙ্গত এই পত্রিকায় মুদ্রিত অগ্নিভ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পূজামন্ত্রের স্বর’ প্রবন্ধটির কথা উল্লেখ করতেই হবে। লেখক একজন শিল্পী এবং একইসঙ্গে তিনি একজন শিক্ষক। ছাত্রছাত্রীদের কথা ভেবে তিনি রবীন্দ্রগানকে অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে ব্যাখ্যা করে এর সুর ও কথার অসামান্য সমন্বয়ের কথা এই নিবন্ধের শুরুতেই বলেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘…এ কথা স্বীকার করতে বাধ্য যে আমাদের মনে এবং কানে। এবং অবশ্যই প্রাণে সুরের মূর্ছনা হয়ত কথার আগে পৌঁছয়। অবশ্য এ কথা সুনিশ্চিতভাবে বলা যায় না, কারণ, কাব্য বোঝার প্রতিভা নিয়ে জন্মেছেন এবং খুব কম বয়সেই সেই গভীরতার জগতে স্থান করে নিয়েছেন, এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়। সুতরাং রবীন্দ্রনাথের কথা ও সুরের প্রাধান্য কোন গানের ক্ষেত্রে কতটা, সেটা বুঝবার জন্য রবীন্দ্রনাথের সৃষ্ট সব গানকেই একবার করে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে কণ্ঠে ধারণ করবার, অথবা অন্তত শোনবার প্রয়োজনীয়তা রয়েছেই।’ (পৃ ১৭৯-১৮০) অগ্নিভ বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় রবীন্দ্রসংগীতে রাগ-রাগিণীর ব্যবহার কতখানি সুপ্রযুক্ত হয়েছে তাও বুঝিয়ে দিয়েছেন। এমনকি বিভিন্ন সময়ে লেখা রবীন্দ্রগীতির তালিকা তৈরি করে দেখিয়ে দিয়েছেন গানের প্রথম স্বর এক হলেও অর্থ আলাদা হওয়ার জন্যে প্রকাশভঙ্গিতে এসেছে স্বরক্ষেপণের বৈচিত্র্য। গানগুলি তাই হয়ে ওঠে অত্যধিক মর্যাদাসম্পন্ন। গীতিনাট্যের গান মকস করে কীভাবে রবীন্দ্রনাথ অসামান্য সব গান রচনায় মগ্ন হয়েছেন তার এক মনোজ্ঞ আলোচনা করেছেন লেখক। প্রতিটি গান যে এক ধরনের পূজা, তারই উচ্চারণে তিনি খুঁজে পেয়েছেন মন্ত্রের মহিমা। তাই তাঁর লেখার শিরোনামও হয়েছে ‘পূজামন্ত্রের স্বর’।

শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘রবীন্দ্রনাথের গান ব্যক্তিগত প্রতিবেদন’ শীর্ষক লেখাটি নানা কারণে বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য। প্রথমত তিনি এই নিবন্ধে রবীন্দ্রসংগীতের একজন একনিষ্ঠ শ্রোতা হিসেবে নিজের কিছু অনুভব আর বৈদগ্ধ্যমণ্ডিত বক্তব্য নিবেদন করেছেন। বিশেষভাবে উল্লেখ্য ‘আলোকবৃত্তের বাইরে থাকা একজন বর্ষীয়ান শিল্পীর কথা’, যা তিনি লিখেছেন অত্যন্ত আকর্ষণীয় ভাষায়। এই শিল্পীর নাম বিজয়া চৌধুরী। সিলেটের ভূমিকন্যা এই বিদগ্ধ সংগীতশিল্পীর পঁচাশি বছর বয়সে বাণীবদ্ধ একটি সিডির আলোচনা প্রসঙ্গে শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর কিছু ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা শুনিয়েছেন, যা খুবই মূল্যবান। সিলেট থেকে কিছুদিন শিলংয়ে বাস করে শিল্পী কলকাতায় চলে আসেন পাকাপাকিভাবে। এসবই তাঁর আত্মস্মৃতি সিলেট কন্যার আত্মকথাতে (অনুষ্টুপ, কলকাতা, ২০০৮) বিধৃত। লেখক অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে বিজয়া চৌধুরীর গানের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথের একটি বিখ্যাত গানের (ভুবনজোড়া আসনখানি) জন্মকথা প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘…যে গান, ১৯১৬ সালে, সিঙ্গাপুর ছেড়ে হংকং যাবার পথে, চীনসাগরের উদ্দাম ভয়াল টাইফুন-ঝড়ের কবলে পড়া টলোমলো জাহাজের ডেকে, কাঠরার পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে, বেঁধেছিলেন রবীন্দ্রনাথ (১৮৪১-১৯৪১); লস্কর-নাবিকের হৈ-হল্লা, বৃষ্টি-বাতাসের আওয়াজ ছাপিয়ে, যে-গানের প্রান্তিক দু-চরণে, পঞ্চান্ন বছরের কবি, দুর্যোগের ওই রাত্রে কথা ও সুর একযোগে বানাতে বানাতে গেয়ে উঠেছিলেন ‘তোমার করুণ শুভ উদার পাণি/ আমার হৃদয় মাঝে দিক না আনি।’ – এই গান যেন বিজয়া চৌধুরীর গলায় ফুটে ওঠে তার সমস্ত মহিমা নিয়ে।’ শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা আমাদের প্রাণিত করে ওই শিল্পীর গান শোনার জন্যে। পাশাপাশি এতোদিন না শোনার গ্লানি কুশের অঙ্কুশের মতো বিদ্ধ করে।

রবীন্দ্রনাথের বহুমুখী প্রতিভার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো তাঁর গান। কেননা তিনি জানতেন, তাঁর সব সৃষ্টির ওপরে এই ‘গান’-এর জায়গা। সুধীর চক্রবর্তী যেমন বলেছেন, ‘নিজের কারুবাসনাকে দীর্ঘ ষাট বছরের নিরন্তর সক্রিয় প্রয়াসের মধ্যে দিয়ে নিয়ে গিয়ে তিনি একটি শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছে গেছেন।’ (পৃ ৫৮১-৫৮২) – আমরাও তাঁর সঙ্গে একমত হই এবং রবীন্দ্রনাথের গান সংক্রান্ত যাবতীয় কাজকে সেইভাবে গ্রহণ করতে চাই। কেননা আমরা জানি, তাঁর এই অপরূপ সৃষ্টিসমূহকে শুধু কানে শুনে নয়, বুঝতে হবে বোদ্ধা সমালোচকের সুচিন্তিত বিশ্লেষণ দিয়ে। এই গান যে শুধু কান দিয়ে শোনার নয়, অন্তর দিয়ে তার মর্মবাণী হৃদয়ঙ্গম করারও। তাই তো কপিরাইট উঠে যাওয়ার পরে তাঁর গান নিয়ে যথেচ্ছচারিতায় আমরা যেমন কষ্ট পাই, একইভাবে কষ্ট পেয়েছি বিশ্বভারতী সংগীত সমিতির অহেতুক মৌলবাদিতায়, অকারণ নিষেধাজ্ঞায়। অনেক উৎকৃষ্ট মানের গান থেকে একসময় আমরা যেমন বঞ্চিত হয়েছি তেমনি কিছু মানুষের খামখেয়ালিপনায় আজো এই গান তার প্রাণরস হারাচ্ছে। 

ছয়শো পাতার এই বিশালাকায় সংখ্যাটিতে অনেক প্রবন্ধের সংযোজন ঘটিয়েছেন সম্পাদক। বলা বাহুল্য, পত্রিকা নির্মাণে এরা এদের পূর্ব সুনাম অক্ষুণ্ন রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। পত্রিকাটি অবশ্যই সংগ্রহযোগ্য। তবু কিছু কথা থেকে যায়। কারণ রবীন্দ্রনাথের অন্যতম সেরা সৃষ্টি ‘তাঁর গান’ নিয়ে কথা বলতে গেলে এ নিয়ে আগে যেসব কাজ হয়েছে সেগুলির কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে। এ-ব্যাপারে প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, সুভাষ চৌধুরী, পুর্ণেন্দুবিকাশ সরকার, দেবেশ রায়, সমীর সেনগুপ্তসহ অন্যদের কাজের কথা মনে রেখে সংকলিত প্রবন্ধগুলির ব্যাপারে তারা আরো সতর্ক হলে ভালো হতো। কেননা পত্রিকায় মুদ্রিত সব লেখা তেমন মানসম্মত হয়নি। অনেক ভালো লেখার পাশাপাশি বেশ কিছু দুর্বল লেখাও এখানে আছে। অসাধারণ প্রচ্ছদ ও অঙ্গসজ্জার জন্যে শান্তনু দে প্রশংসার্হ। মুদ্রণ পরিপাট্যে তারা তাদের পূর্ব সুনাম অক্ষুণ্ন রেখেছেন।

Leave a Reply