সকল তত্ত্ব-ভাবনার মতো নারীভাবনারও পূর্বাপরতা আছে, ব্যাপ্তি ও বিকাশ আছে, অনিবার্যতা অথবা বাহুল্য আছে। নারীভাবনার একটা তাত্ত্বিক দিক যদি থাকে, যাকে নারীবাদের শিরোনামে ফেলা যায়, তাহলে তার একটি প্রায়োগিক দিকও আছে, যেখানে বাস্তবতার সঙ্গে একটা কঠিন সংগ্রামে অধিকাংশ নারীকে সংগ্রামরত দেখা যায়। এই দিকটি নারীবাদ সবসময় যে সঠিকভাবে পড়তে পেরেছে, তা নয়, এমনকি মার্ক্সবাদেও অব্যর্থ কোনো ব্যাখ্যা নেই সকল সংগ্রামের। অথবা আমাদের সময়ে মৌলবাদ যেভাবে নারীর প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তার হিসাব তথাকথিত উদারনৈতিক পশ্চিমের নারীরা দিতে পারবে না – এটি শুধু আমাদের এবং আমাদের তুলনীয় কিছু সমাজব্যবস্থার বিশেষ একটি দুর্যোগ। সামাজিক নারীভাবনায় এই প্রকট বাস্তব দিকটি যখন বড় বিবেচনা হয়ে দাঁড়ায়, যখন শিল্প-সাহিত্যে এর একটি বিলাসী রূপও চোখে পড়ে, যেখানে নারীকে, শতসংগ্রামের মধ্যেও হয়তো মা বা প্রেমিকার নিকষিত একটি অবয়ব দেওয়া হয়, যা আদর্শিক না হলেও একটি স্টিরিওটাইপ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ‘নারীর ললিত লোভন লীলা’ শুধু একটি রোমান্টিক আরাধ্য নয়, একটি সমাজ-নির্দিষ্ট স্টিরিওটাইপও বটে, যার একপ্রান্তে আছে মেটাফিজিক্স, অন্যপ্রান্তে পণ্যায়ন। রবীন্দ্রনাথ থেকে নিয়ে লাক্স সাবানের বিজ্ঞাপন নির্মাতা, সবাই একসময় এর দ্বারস্থ, ভিন্ন ভিন্ন কারণে। এজন্য সামাজিক নারীভাবনাও যেমন বিকাশমান, এককালের নারীর অবস্থান অন্যকালের নারীর অবস্থান থেকে ভিন্ন, নারীর নিজের সম্পর্কে এবং অন্য নারীদের সম্পর্কে ভাবনাচিন্তাও পরিবর্তনশীল, মৌলিক কিছু অনুধাবন বাদ দিয়ে।
শিল্পসাহিত্যে নারীভাবনাও তেমনি জঙ্গম। মেক্সিকোর শিল্পী ফ্রিদা কাহলোর চিন্তাভাবনার বড় অঞ্চল জুড়ে ছিল নারীর সামাজিক-সাংস্কৃতিক-ব্যক্তিক অবস্থানের বিষয়টি। তিনি নিজে ছিলেন তাঁর প্রিয় একটি বিষয়, মডেলও বটে। কাহলোর ছবি দেখলে মনে হবে নারী হিসেবে সমাজ তাঁকে যেভাবে দেখে ললিত ও লোভনীয় এবং যৌন-আকাক্সক্ষার একটি নিরিখে, তিনি তার থেকে অনেক দূরে একটি অবস্থানে নিজেকে দেখতে চাইছেন। কখনো তিনি হরিণী, কখনো মিথের কোনো চরিত্র, কখনো স্রেফ তিনি যা, তা-ই; কিন্তু তাঁর নিজের সম্পর্কে বয়ানটিতে আছে শক্তি এবং স্পর্ধার, ক্রোধ এবং বিতৃষ্ণার একটি প্রকাশ। ‘আমি আমার স্বপ্নগুলোকে নয়, আমার বাস্তবকে আঁকি।’ বাস্তব, অর্থাৎ কিছুটা নিজের মতো করে পুনর্নির্মিত বাস্তব। কাহলো আরো বলতেন, নারীশিল্পীরা একটা দ্বৈত বোঝা নিয়ে নারীকে আঁকে। প্রথমত, তার নিজের দৃষ্টি ও ভাবনার একটা প্রতিফলন একজন নারীশিল্পী ঘটাতে চান, যে-কোনো পুরুষশিল্পীর মতোই, কিন্তু এটি করতে গিয়ে পুরুষের তৈরি স্টিরিওটাইপ তাকে ভাঙতে বা অতিক্রম করতে হয়, যদি তিনি তা করতে আগ্রহী হন (অনেক নারীশিল্পী তো পুরুষ-কল্পিত পুরুষের হাতে নির্মিত নারীকে এঁকেছেন)। এই স্টিরিওটাইপ ভাঙাটা কঠিন কাজ, এটি তার দ্বিতীয় বোঝা, কিন্তু চ্যালেঞ্জের, কষ্টের, আনন্দের।
কাহলো-কথিত এই দুই বোঝা আমাদের দেশের নারীশিল্পীদের অনেকেই, প্রায় সকলেই, বয়ে চলেছেন। কিন্তু পুরুষশিল্পীদের কেউ কেউ যে এই বোঝার ভাগ নিচ্ছেন না, তা নয়। নারীকে নারীবাদের আদর্শে দেখেন এমন পুরুষের সংখ্যা নিশ্চয় কম নয়, শিল্পীর সংখ্যাও। নারীর জন্য তার নিজের সংগ্রামটা চালিয়ে যাওয়া কঠিন আগে যেমন, এখনো, যদিও তার আর্থ-সামাজিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে আমরা সকলেই স্বীকার করি। কিন্তু তার সংগ্রাম, তার প্রতিবাদ-প্রতিরোধ এক নিরন্তর সক্রিয়তার বিষয়। এই সক্রিয়তাকে সমাজ বাধা দেয়, নিরুৎসাহিত করে, কিন্তু এস এম সুলতানের ক্যানভাসে এর সহযোগী পুরুষেরাও। তাতে ক্যানভাসের চৌহদ্দিতে সাবঅল্টার্নের একটা শক্ত ভিত গড়া হলেও ক্যানভাসের বাইরের পৃথিবীতে এটি অনুপস্থিত। আমাদের শিল্পকলায়, অন্য অনেক প্রকাশের সঙ্গে। এই উপস্থিতি-অনুপস্থিতি, বাস্তব-সম্ভাব্যর দ্বৈরথ চলেছে শুরু থেকেই। অনেক আগে, যখন স্কুলে পড়ি, এক নকশি কাঁথায় গৃহস্থালির টুকিটাকি অনেক বস্তু, শিশুর পায়ের ছাপ, একটি নিঃসঙ্গ মাছের চিত্রময় মাঠের এক কোনায় সুইয়ের আঁকাবাঁকা ফোড়নে দুটি শব্দ উৎকীর্ণ দেখতে পেয়ে বিস্মিত হয়েছিলাম ‘মুক্তি চাই’। অল্পশিক্ষিত কারিগর ওই কাঁথার, হয়তো কোনো তরুণী গৃহবধূ, যার স্বপ্ন ছিল শিক্ষার আত্ম-উন্নতির, নিজের নিগড় পড়া জীবন ছিঁড়ে বেরিয়ে পড়ার একটি আকুতি এটি। কিন্তু শিল্পের নান্দনিক রূপের সঙ্গে একটা
সহ-অবস্থানে আবদ্ধ হয়ে আছে ওই চিৎকারটি। এটি আমাকে ভাবিয়েছে। কিন্তু ওই নারীর মুক্তি আদৌ সম্ভব হয়েছে কি না, কে জানে। সম্ভবত নয়।
শিল্পকলায় নারীভাবনার প্রধান প্রকাশগুলি তাই একদিকে আদর্শিক/ স্টিরিওটিপিক্যাল, অন্যদিকে নান্দনিক; একদিকে রীতিবদ্ধ, অন্যদিকে বাস্তব ও বয়ানধর্মী; একদিকে অপরাগত, অন্যদিকে আত্মকেন্দ্রিক (যেখানে কাহলোর মতো শিল্পী নিজেই নিজের বিষয়, এবং যে-বিষয়ে সার্বিক একটি নারীভাবনা প্রতিফলিত)। একদিকে আছে যৌনতা/ কামোদ্দীপনা অথবা পুরুষের বিপরীতে একটি অবস্থান নির্ণয়ের প্রয়াস; অন্যদিকে জটিল কোনো মনস্তাত্ত্বিক চিন্তার (কুড়ি শতকের ইউরোপে ফ্রয়েডীয় চিন্তা-ভাবনার প্রভাবে যার বিকাশ, এবং অন্য অনেক ইউরো-কেন্দ্রিক চিন্তার মতো শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত বাঙালির চিন্তাজগতে যার অনুপ্রবেশ) অথবা পরাবাস্তব ভাবনার; অথবা নারীবাদ এবং অন্যান্য সামাজিক/ অর্থনৈতিক ও শিল্প-সম্পর্কিত তত্ত্বের প্রতিফলন যেমন মার্ক্সবাদী বীক্ষণ এবং সম্প্রতি প্রতিষ্ঠা পাওয়া উত্তর-আধুনিকতার দর্শন। নারীভাবনায় ইউরোপে ধ্রুপদী কলাকাল থেকে নিয়ে রেনেসাঁস এবং রেনেসাঁস থেকে নিয়ে আমাদের সময়কাল পর্যন্ত যে-রোমান্টিকতা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি/ মূল্যবোধ/ রুচির প্রকাশ দেখা যায়, তার একটি সারাংশ নির্মাণ করলে তাতে পুরুষতান্ত্রিকতার প্রবল উপস্থিতি চোখে পড়বে, আবার নারীর নিজস্ব একটি অবস্থান গ্রহণের প্রয়াসও দৃষ্টিগোচর হবে। এই দুই চিহ্নের মাঝখানে ছায়া ফেলবে নানা প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন (গির্জা, রাজার ক্ষমতাকেন্দ্র, বাজার)। নারীকে জননী, জায়া, প্রেমিকা এবং আদর্শায়িত অনেক রূপে (মাতৃভূমি, দেবী, যিশুমাতা) দেখা হয়েছে, আবার একটি সীমাবদ্ধ অবস্থানে তাকে রেখে পুরুষের ক্ষমতার কাছে সমর্পিত এক নিম্নবর্গীয় হিসেবেও তাকে তুলে ধরা হয়েছে। এই চর্চাটি সর্বত্রই ঘটেছে জাপান অথবা চীন, অথবা ভারতীয় চিত্রকলায়। ভারতে অজন্তা-ইলোরার দেয়ালচিত্রে নারীকে কামসূত্রের প্রধান সঞ্চালকের আসনেই প্রায় বসানো হয়েছে, এবং দেবী ও মানবীর দ্বৈত অবস্থানে তাকে স্থাপন করার জন্য নারীর জন্য রহস্যময়ী, ছলনাময়ী, পরাভব-অসম্ভব ইত্যাদি নানা বিশেষণে দেখা হয়েছে। অজন্তা-ইলোরার দেয়ালচিত্র থেকে নিয়ে মুঘল মিনিয়েচার ছবির শিল্পীরা সবাই পুরুষ, এজন্য নানাভাবে পুরুষতান্ত্রিকতার কামনা-বাসনা, বিপন্নবোধ, পরাভূত হওয়ার শংকা এবং অরক্ষিত হয়ে পড়ার উদ্বেগ ধরা পড়েছে নারীর এসব চিত্রায়ণে। কাজেই শিল্পকলায় নারীর উপস্থাপনের ইতিহাসটি কখনো পুরুষতান্ত্রিকতার ইতিহাস থেকে, এবং সমাজপাঠ ও সামাজিক-অর্থনৈতিক, বিশেষ করে সামন্তবাদী থেকে নিয়ে পুঁজিবাদী নানা অর্থনৈতিক ক্ষমতাসূত্রের ইতিহাস থেকে আলাদা করে পড়া যাবে না। এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে নারীর হাতে নারীর চিত্রায়ণের পৃথক ইতিহাসটিকে, যার সঙ্গে পুরুষতান্ত্রিক চিন্তার কোথাও কোথাও মিল থাকলেও বিরোধটাই প্রধান। ‘নারীর লিখন’ বলে সাহিত্যতত্ত্বের যে সাম্প্রতিক কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি এখন পুরুষতান্ত্রিকতার নানা প্রকাশকে তদন্ত করছে, প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং এর পুনর্লিখন নিশ্চিত করছে, শিল্পকলাতেও এর মূল্যায়ন জরুরি। একজন নারীশিল্পী চিত্রকর অথবা ভাস্কর কীভাবে নির্ণয় করেন নিজের অবস্থান? প্রশ্ন করেন প্রতিষ্ঠিত এবং ঐতিহ্যের পর্যায়ে চলে যাওয়া পুরুষের চিত্রণকে? যদিও শিল্পীর নারী-পুরুষ বিভক্তি কোনো কোনো চিন্তায় (যেমন, উত্তর নারীবাদী তত্ত্বে) একটি বিপত্তি হিসেবে চিহ্নিত, যা নারীর অবস্থানকে দুর্বল করে শিল্পব্যাখ্যায়, বিশেষ করে শিল্পে নারীর অবস্থান নির্ণয়ে, এটি কার্যকর হতে পারে। বস্তুত ‘নারীর লিখন’ যে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দেয়, তার আলোকে প্রচলিত অনেক চিন্তার নতুন ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব হয়।
স্পষ্টতই চিত্রকলায় ও ভাস্কর্যে নারীর অবস্থান নির্ণয়টি একরৈখিক কোনো প্রয়াস হতে পারে না। বিষয়টি সমস্যাদুষ্ট, বহুমাত্রিক একটি প্রকল্প। একটি প্রবন্ধের পরিসরে এই প্রকল্পের মূল চিন্তা ও প্রকাশগুলিই শুধু তুলে ধরা যায়, এর বেশি কিছু নয়। আর, বাংলাদেশের চিত্রকলা ও ভাস্কর্যের আলোচনায় সুবিধাটি হলো এই যে, এর ব্যাপ্তিকাল পঞ্চাশ-ষাট বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায়, যেহেতু বাংলাদেশের শিল্প-আন্দোলনের আধুনিক পর্যায়টি শুরু হয় ১৯৪৮ সালে ঢাকায় চারুকলা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এর আগের ইতিহাসটি প্রায় সর্বতোভাবেই কলকাতা ও শান্তিনিকেতন-কেন্দ্রিক। এবং তাতে বাংলাদেশের শিল্পীদের অংশগ্রহণ ছিল না বললেই চলে। তারপরও যুক্ত বাংলার শিল্পঐতিহ্যে, বৃহত্তর ভারতীয় ঐতিহ্যের মতো, আমাদের একটি স্থান রয়েছে, কেননা, আমাদের আধুনিক শিল্প-আন্দোলন এসব ঐতিহ্যের পরম্পরাতেই ঘটেছে। কলকাতা আর্ট স্কুলে শিক্ষালাভ করেছিলেন জয়নুল-কামরুল-সফিউদ্দীন এবং কিছুদিন এস এম সুলতান। কলকাতাতেই প্রথম প্রদর্শিত হয়েছিল জয়নুল আবেদিনের দুর্ভিক্ষের চিত্রমালা, যা তাঁকে এনে দিয়েছিল সর্বভারতীয় খ্যাতি। তাঁদের মানসগঠনে তাঁদের শিক্ষকদের অবস্থান ছিল বিশাল। তবে ১৯৪৮-এর পর বাংলাদেশে যে শিল্প-আন্দোলন শুরু হয় তার প্রকাশে ছিল কলকাতা ও শান্তিনিকেতন থেকে ভিন্ন এক শিল্পচিন্তার প্রভাব, যে-শিল্পচিন্তা নতুন একটি দেশ, সমাজ ও জীবনব্যবস্থাকে রূপায়িত করেছিল।
তারপরও, ওই পরিসর বিবেচনাতেই কলকাতা ও শান্তিনিকেতন-কেন্দ্রিক শিল্পঐতিহ্যের আলোচনায় যাওয়া এই প্রবন্ধে সম্ভব নয়। তবে ওই আলোচনা না হলেও, এই লেখার শুরুতে শিল্পকলায় নারীভাবনার যে প্রধান সূত্রগুলির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তার মোটামুটি একটি প্রকাশ এই ঐতিহ্যে দেখা যায়। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন একদিকে প্রাচ্যবাদী চিন্তার নতুন প্রকাশে (এবং মুঘল দরবার-চিত্রের শৈলীগত প্রয়োগে) নারীকে রোমান্টিক (যদিও পুরুষের দৃষ্টিকোণ থেকে) একটি আদল দিয়েছিলেন, অন্যদিকে এক উত্তর-উপনিবেশী চিন্তার প্রতিফলন ঘটিয়ে ভারতমাতার মতো শক্তি ও প্রতিরোধের আইকন গড়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পূর্ণ নিজস্ব ঢঙে এক নাগরিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নারীকে দেখেছেন, তাকে হাজির করেছেন মনস্তাত্ত্বিক নানা মাত্রায়। যামিনী রায়ের নারী-চিত্রায়ণে একদিকে গ্রামীণ আদর্শভাবনা, অন্যদিকে রয়েছে কালীঘাটের পটে উৎকীর্ণ নারীর সামাজিক গতিশীলতা। এসব সূত্রের বাইরে আরো কিছু চিন্তাভাবনা হয়েছে নারীর উপস্থাপনায় যেমন নন্দলাল বসুর মহিমান্বিত মাতৃমূর্তি ‘সাতজন মা’, অথবা ১৯১৫ সালে পাশ্চাত্য পদ্ধতিতে আঁকা যামিনীপ্রকাশ গঙ্গোপাধ্যায়ের সমাজঘনিষ্ঠ ছবি ‘গৃহহীন মা’, অথবা রামকিঙ্কর বেইজের ভাস্কর্যে নারীকে চিরাচরিত কমনীয়তার বিপরীতে রুক্ষ এবং রুদ্ররূপে উপস্থাপন। তবে, পুনরাবৃত্তির বিপদ মাথায় নিয়ে আবারো বলা যায়, এ সবগুলো সূত্রই উপস্থিত বাংলাদেশের চিত্রকলায়, বরং সময়ের বিবর্তনে ও সমাজ-বদলের অমোঘ অভিঘাতে, ‘নারীর-লিখন’ পর্যায়টি যোগ হয়ে চিত্রকলা ও ভাস্কর্যে নারীর চিত্রায়ণকে সর্বার্থেই একটি নতুন ডিসকোর্সের স্থানে নিয়ে গিয়েছে।
দুই
বাংলাদেশের চিত্রকলা ও ভাস্কর্যের যে-কোনো আলোচনাতেই শুরুর পর্বটিকে গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপিত করতে দেখা যায়, যেহেতু এই পর্যায়েই সূচিত হয়ে যায় শিল্পের মূল প্রবণতাগুলি, এবং স্পষ্ট হয়ে ওঠে এর পরবর্তী সম্ভাবনাগুলি। ফলে, এই পর্যায়ের শিল্পীদের কাজে যে-গতিশীলতা এবং সমাজ ও ইতিহাসচিন্তার দেখা পাওয়া যায়, তাতে শুধু সমকালীন বীক্ষণগুলি নয়, সমাজবদলের জন্য অপরিহার্য একটি ভবিষ্যৎ-চিন্তারও প্রকাশ মেলে। সেজন্য জয়নুল আবেদিন বা কামরুল হাসানের নারী-ভাবনায় শুধু চল্লিশ-পঞ্চাশের নারীর স্থবির অবস্থানটি ফুটে ওঠেনি, বরং এক বৃহত্তর পৃথিবীতে পা রাখার তার আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁরা যে গ্রামীণ ঐতিহ্যে প্রণোদনা খুঁজেছেন সে-ঐতিহ্যে অবশ্য এই আকাঙ্ক্ষাটি সবসময়ই বর্তমান। গ্রামীণ নারীর নিজস্ব লিখন, যেমন নকশি কাঁথা – এই আকাক্সক্ষার প্রকাশ ঘটায়। জয়নুল-কামরুলের অনেক ছবিতে নারীর এই আকাক্সক্ষাটি প্রকাশিত।
তবে নারী-ভাবনা ও নারীর চিত্রায়ণে শুরু থেকেই পুরুষতান্ত্রিকতার প্রভাবটি অনস্বীকার্য। ১৯৪৮ সালে চারুকলা ইনস্টিটিউট স্থাপনে যাঁরা অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে কোনো নারী ছিলেন না। জয়নুল আবেদিন ও তাঁর সতীর্থরা ছিলেন উদার চিন্তার মানুষ, তাঁদের ভিতর সামাজিক বা গোত্রীয় কোনো সংকীর্ণতা কখনো কাজ করেনি; তাঁদের ধ্যান-ধারণা ছিল প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ; নারী-পুরুষ, জাতি-উপজাতি, উচ্চ-নিচ এসব বিভাজনের সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত এবং প্রকৃতভাবেই মানবতাবাদী ও সমাজঘনিষ্ঠ; কিন্তু চিত্রকলার যে-ঐতিহ্যে তাঁরা পাঠ গ্রহণ করেছিলেন, তাতে নারীর নান্দনিক-রোমান্টিক ভূমিকাটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ – তার সামাজিক/ রাজনৈতিক সক্রিয়তা, তার ক্ষমতায়ন, এসব ছিল দূরবর্তী চিন্তা। তবু, একটু আগে যেমন বলা হয়েছে, এই শেষোক্ত ভাবনাগুলোও তাঁদের ছবিতে ছিল, যদিও, সার্বিকভাবে নারীর রূপান্বেষণ ছিল তাঁদের কাম্য। এই রূপান্বেষণটি একটি মৌল প্রবণতা হিসেবে এখনো বিদ্যমান অনেক শিল্পীর কাজে, এবং আবশ্যিকভাবেই, এর পেছনের ভাবনাগুলি ধ্রুপদী ও শাশ্বতচিন্তায় সংহত।
জয়নুল ও কামরুল তাঁদের সমাজচিন্তায় নারীর একটি ভিন্ন অবস্থান চিহ্নিত করেছিলেন, এবং সেটি হচ্ছে তার মানবিক একটি রূপ। এটি রোমান্টিক রূপান্বেষণের বিপরীতে একটি ডায়ালেকটিক রচনা করে। এই রূপটিতে একত্র হয় নারীর সামাজিক অবস্থান, যা প্রথাগতভাবে নিম্নবর্গীয়; তার অসহায়ত্ব এবং একই সঙ্গে তার মানবিকতা। এস এম সুলতান এই ডায়ালেকটিকে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন, এবং তৈরি করেছিলেন তাঁর পূর্ণতার ডিসকোর্স। যে-দেশে মা’দের শরীরে অপুষ্টি এবং অসুখ চিরস্থায়ীভাবে বাসা বাঁধে, এবং অকালেই বার্ধক্য অথবা মৃত্যু হানা দেয়, সেখানে সুলতান আঁকলেন স্বাস্থ্যবতী মা, যিনি পেশিবহুল এবং শক্তিশালী, এবং তাকে স্থাপন করলেন এমন এক গৃহস্থালিতে যেখানে স্বামী-সন্তান এবং গৃহপালিত পশুটিও স্বাস্থ্যবান। যদিও তাদের দৈনন্দিন জীবনে দ্বন্দ্ব আছে, সংঘাত আছে, রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম আছে, তারপরও নারীর এই পূর্ণতার স্থানে উত্তীর্ণ হওয়ার মধ্য দিয়ে যে-বিশ্বাস সুলতান প্রতিফলিত করেন, তাতে সমাজবদলের একটি ইচ্ছা অত্যন্ত প্রবল হয়ে ওঠে। এই সমাজবদলের প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ পরোক্ষ হলেও লক্ষণীয় তাঁর নিম্নবর্গীয়তার চিহ্নগুলি সেখানে মুখ্য নয়। অর্থাৎ নারীর অবস্থানে সূচিত হয়েছে একটি পরিবর্তন, যাকে পুরুষতান্ত্রিকতা প্রশ্ন করে না, মেনে নেয় বরং। সুলতানের ছবি পুরুষ-শাসিত, কিন্তু যেখানে নারী চিত্রিত, সেখানে তার সামাজিক অবস্থানে এসেছে গুণগত প্রভেদ।
পুরুষতান্ত্রিকতার প্রকাশগুলি অস্বীকার করা কঠিন, বিশেষ করে যে-সমাজে নারীরা দ্বৈত-নিষ্পেষণের শিকার। রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন নারীর যে দ্বৈত ঔপনিবেশিকতার কথা উল্লেখ করেছিলেন (রাজনৈতিক ঔপনিবেশিকতা, যা পুরুষকে এবং অবশ্যই নারীকে অধীনস্থ করে একটি ভিনদেশী শক্তির কাছে; এবং ওই অধীনস্থ থাকার অবস্থা); সেই দ্বৈত পরাধীনতার নিগড়ে নারী এখনো বাঁধা। ১৯৪৭-এ স্বাধীন একটি দেশের জন্ম হয় বটে, কিন্তু পূর্ব বাংলা পরাধীন রয়ে যায় পশ্চিম পাকিস্তানের, আর নারীর স্বাধীনতা তো তখন রাজনীতিবিদরাও বিবেচনায় আনেননি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অবস্থা পালটেছে, কিন্তু বিশ্বায়নের এই যুগে পুঁজির উপনিবেশ বাংলাদেশকে নিয়ে গেছে নতুন এক পরাধীনতার ভেতরে, আর নারীর স্বাধীনতা এখন তাত্ত্বিকভাবে স্বীকৃত হলেও তার পরাধীনতা ঘোচেনি। বরং ধর্মীয় উগ্রবাদের যত প্রসার ঘটছে, নারী তার এ পর্যন্ত অর্জিত কিছু অধিকারকেও বিসর্জন দিয়ে চলে যাচ্ছে এক প্রাচীন পরাধীনতায়। পুরুষতান্ত্রিকতার প্রবল প্রভাব তাই জীবনের সর্বক্ষেত্রে : ভাষা থেকে নিয়ে সামাজিক সম্পর্কসমূহ, অর্থনীতি থেকে নিয়ে শিল্পকলার নানা প্রকাশে এই প্রভাব অনুভূত হয়।
তবে রোমান্টিক রূপান্বেষণে পুরুষতন্ত্রের কামনা-বাসনা ও নারী-সম্পর্কিত তার স্টিরিওটাইপ চিন্তা প্রতিফলিত হলেও এর নান্দনিক মাত্রায় বিষয়টি শিল্পীত হয়ে ধরা পড়ে। ফলে রূপান্বেষণটি একটি সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখা দেয়, যেখানে সামাজিক ও আদর্শিক নানা স্টিরিওটাইপ তৈরির ইচ্ছাটি আর গুরুত্বপূর্ণ থাকে না। এবং এর সঙ্গে যখন সমাজসচেতনতার মাত্রাটি যোগ হয়, তখন শিল্পের বিবেচনায় এটি একটি শুদ্ধরূপ পরিগ্রহ করে। জয়নুল আবেদিনের প্রসাধনরতা রমণী বা কামরুল হাসানের দুই বা তিন রমণীর অসংখ্য ছবি এই শুদ্ধরূপের প্রতিফলন। এটি অবশ্য সত্যি যে, জয়নুলের পাইন্যার মা যতখানি সংবেদী চিত্রায়ণ, প্রসাধনরতা রমণী ততটা নয়, কিন্তু একটু যত্ন নিয়ে দেখলে প্রসাধনরতা রমণীর মধ্যেই কর্মরতা নারীকে আবিষ্কার করা যাবে। বস্তুত জয়নুল ও কামরুল তাদের নারীদেরকে বেশির ভাগ কাজের ফাঁকে অথবা খানিক অবসরেই যেন চিত্রায়িত করেন, যেন একটি থেমে থাকার মুহূর্তে তাদের কাজের (সাধারণত গৃহস্থালির, তবে মাঝে মাঝে ক্ষেতে-খামারের) পুরো পরিধিটাই উঠে আসবে। যেন প্রসাধনরতা রমণীকে দেখে আমাদের ধারণা হবে, এই একটি মুহূর্ত কত গুরুত্বপূর্ণ তার কাছে; এবং প্রসাধনটা কোনো অভ্যাস নয়, সৌখিনতা নয়, যেন একটি মুহূর্তের অবকাশ, যেহেতু পুনরায় তাকে ফিরে যেতে হবে কাজের জীবনে।
জয়নুল ও কামরুলের ছবিতে আবহমান বাংলা ও বাঙালির জীবনের যে-ছবি ফুটে ওঠে, তাতে রোমান্টিকতার সঙ্গে বাস্তবতার সম্পর্কটাও ঘনিষ্ঠ। এ-দুজনের মধ্যে জয়নুলের ছবিতে বাস্তবতাটা অনেক বেশি প্রকট, যেহেতু তাঁর শিল্পী হিসেবে প্রকৃত অভিষেক ঘটে ভয়ানক বাস্তববাদী দুর্ভিক্ষের চিত্রমালার মধ্য দিয়ে। শিল্পীজীবনের শুরু থেকেই জয়নুল তাঁর চারদিকের জীবনকে উপজীব্য করেছেন তাঁর শিল্পের, এবং সেই জীবনকে তাঁর নিজস্ব শর্তে রূপায়িত করেছেন। যদিও অনেক ছবিতে জয়নুল বাস্তবতার নিগড়ে আটকেপড়া জীবনকে একটি প্রতিবাদ বা একটি প্রতিরোধের স্পর্শে উজ্জীবিত করতে চেয়েছেন (যেমন বিদ্রোহী শীর্ষক ছবিটিতে, যেখানে একটি ষাঁড় দড়ি ছিঁড়ে মুক্ত হতে চাইছে), তিনি তা বাস্তবের অনিবার্যতা মেনেই করেছেন। ফলে এই মুক্তির তথা পরিবর্তনের ইচ্ছা কোনো রোমান্টিক আদর্শবাদে রূপান্তরিত হয়নি, বরং বাস্তবের পথ ধরেই তা সম্ভবের প্রত্যাশা জাগায়। জয়নুলের নারীরা সমাজের ভেতরেই স্থাপিত, এবং এই সমাজ দ্রুত কোনো পরিবর্তন-প্রত্যাশী নয়। তাছাড়া এই সমাজের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা পুরুষেরই হাতে। কিন্তু নারীর ওপর একটি মুহূর্ত জুড়ে সম্ভাবনার কিছু আলো ফেলে
(যে-সম্ভাবনা তার ভাবনার বিস্তারে, কল্পনার উদ্ভাসে অথবা তার নিজস্ব বাস্তবতার ভিন্ন কোনো উপস্থাপনে মূর্ত হয়) জয়নুল নারীকে সেই জায়গায় নিয়ে যান, যেখানে সে পুরুষতন্ত্রের স্টিরিওটাইপ নয়, বরং একটি ভিন্ন ইমেজ। সেই ইমেজটি রবীন্দ্রনাথ কিংবা নজরুলও এঁকেছেন। অথবা জসীম উদ্দীন। এই ইমেজ নারীকে প্রথাগত পরিচয়ের বাইরে নিয়ে যায়, দেখা যায়, তার একটি ব্যক্তিত্ব প্রকাশিত, তার কল্পনার জগৎটি সমৃদ্ধ, তার সামাজিক সম্পর্কসমূহের সূত্রগুলি কিছুটা হলেও সে নির্দিষ্ট করে দিচ্ছে।
জয়নুলের এই ইমেজটি আছে কামরুল হাসানেও, তবে তা একটু বেশি রোমান্টিক যেখানে রোমান্টিকতার অর্থ হচ্ছে সময় থেকে সরে গিয়ে এক সময়হীনতার অন্বেষণ করা। চিরায়ত লোকজ-চিন্তার কাছে কামরুল গিয়েছেন এই সময়হীনতার খোঁজে। লোকজকলায় নারী একদিকে প্রচলিত সমাজব্যবস্থার ভেতর ক্ষমতাহীন, সহায়হীন; কাজেই ধরে নেওয়া যায়, তার অন্তর্গত জীবনটি অবহেলিত। কিন্তু অন্যদিকে এই অন্তর্গত জীবনকে কেন্দ্র করেই নারী এক সৃষ্টিশীল ক্ষমতার অধিকারী, যা তার দিকে দৃষ্টি ফেরাতে মানুষকে বাধ্য করে। দৈনন্দিন জীবনের হিসাব-নিকাশ, অভাব-অনটন, শোষণ-বঞ্চনা যখন জীবনকে ম্রিয়মাণ করতে থাকে, তখন পুরুষের ওপর এই অবস্থার ভার বহনের দায়িত্ব পড়ে অন্তত সেরকমই প্রমাণিত পুরুষের রেপ্রেজেন্টেশনে। কিন্তু আড়ালে এর একটা বড় অংশ বইতে হয় নারীকে, কিন্তু তা প্রকাশিত হয় না। পুরুষের রেপ্রেজেন্টেশন নারীকে আড়ালেই রেখে দেয়। এমনকি জাতীয়তাবাদী ইতিহাসচর্চার বিপরীতে সত্তর-আশির দশকে যে নিম্নবর্গীয় ইতিহাসচর্চা ইতিহাসের কিছু (কল্পিত) ‘ধ্রুব’ এবং ‘চূড়ান্ত’ ‘সত্যকে’ প্রশ্নবিদ্ধ করে, সেখানেও নারীর রেপ্রেজেন্টেশন সামান্যই। অতএব নারী অদৃশ্য। কিন্তু কামরুলের ছবিতে এই নিম্নবর্গীয় নারী সামনে আসে, তার সৃষ্টিশীল চিন্তাটি একটি শক্তির উত্থান ঘটায়। একটি ভিন্ন মাত্রায় নারীকে তা নিয়ে যায়। নারীকে তখন ‘পুরুষ-দৃষ্টি’ দিয়ে দেখা যায় না। তখন জেন্ডারের বিবেচনাটি গৌণ হয়ে যায়। এই গৌণতার সংযুক্তি কামরুলের (এবং জয়নুলের) ছবিতে নারীর উপস্থাপনাকে গুরুত্বপূর্ণ করে।
জয়নুল রাজনীতিকে শুধু রাজনীতি হিসেবে দেখেননি, বরং দেখেছেন একটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে। তাঁর কাছে বাঙালির অধিকারের সংগ্রাম যেমন ছিল রাজনীতি, তেমন ছিল দড়ি ছিঁড়ে ষাঁড়টির মুক্তি (যা প্রতীকী অর্থে বাঙালির সংগ্রামের বর্ণনায় সমান অর্থবহ), অথবা নারীর নিজস্ব জায়গাটুকু সুরক্ষিত রাখা। কামরুল বামপন্থার রাজনীতির সঙ্গে হার্দিক সম্পর্ক অনুভব করেছেন। এ-রাজনীতি অনুসরণ করেছেন, এবং ষাটের দশক থেকে রাজনীতিকে তাঁর কাজের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রণোদনা হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। এই রাজনীতি কল্যাণের, শ্রেয়বোধের এবং মানবাধিকারের। তাঁর নারীকে তিনি এই রাজনীতি-চিন্তার বাইরে রাখেননি। এস এম সুলতান যেমন নারীর ভেতর জেগে ওঠার শক্তি খুঁজেছেন, তেমনি খুঁজেছেন কামরুল। মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক রেমন্ড উইলিয়ামস ইংল্যান্ডের শ্রমিক শ্রেণির নানান প্রতিপক্ষের মধ্যে এমন এক বুর্জোয়া চিন্তাকে চিহ্নিত করেছিলেন, যা নারীকে নিম্নবর্গীয় পুরুষের চোখেও ভোগের বস্তু হিসেবে সীমাবদ্ধ করে রাখে (শিল্পকারখানায় কাজ করতে আসা শ্রমিকদের জন্য তাই দেহপসারিণীর জোগান দেওয়া, এবং ‘দেহপসারিণী’ কথাটিকেই, তথা পেশাটিকেই, অভাব এবং অসহায়ত্বের পরিবর্তে মনোরঞ্জনের সঙ্গে সংযুক্ত করা)। কিন্তু নারীকে একজন পুরুষ শ্রমিক যখন সহকর্মী ও সহযাত্রী হিসেবে দেখতে শেখে, এমনকি একজন যৌনকর্মীকেও, (যেহেতু পুঁজিবাদী সমাজে এই নারীর কোনো বিকল্প পথ খোলা রাখা হয় না,) তখন বুর্জোয়া ‘পুরুষ-দৃষ্টি’ পরাস্ত হয়, তার নিয়ন্ত্রণ ও পুনর্নির্মাণ-শক্তি নিঃশেষিত হয়। জয়নুলের ছবিতে নারী অনেক সময় সেই শক্তিশালী অবস্থানে তার রোমান্টিক নানা আবহ সত্ত্বেও অথবা এই আহক অতিক্রম করে আসীন হয়।
জয়নুল, কামরুল এবং সুলতান বাঙালির ইতিহাসের মধ্যেই বিচরণ করেছেন, কিন্তু তার হয়ে-ওঠার শর্তগুলি তদন্ত করেছেন। তাঁরা একটি ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন সে-ইতিহাসের। জয়নুলের চিন্তায় দেশজ ও বৈশ্বিক মাত্রা একসঙ্গে যোগ হয়েছিল (তিনি প্যালেস্টাইনের যোদ্ধাদেরও উপজীব্য করেছেন তাঁর চিত্রের); কামরুলের চিন্তায় চিরাচরিতের সঙ্গে সমকালীনতার একটি মেলবন্ধন রচিত হয়েছিল। সুলতান বর্তমানকে নিয়ে গেছেন একটি মিথের অঞ্চলে। এই বিষয়টি মনে রাখলে তাঁদের নারী-চিত্রায়ণের একটি আলাদা বৈশিষ্ট্য হয়তো আমরা উপলব্ধি করতে পারব। তখন এই তিন শিল্পী যে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ভেতর বসে, এর পছন্দের দৃষ্টিকোণ থেকে (নানা বর্ণনার নারী, সম্পন্ন গৃহকোণ, নারী-নির্দিষ্ট কাজ ও অবসর, নারীর সম্পর্কসমূহ, নস্টালজিয়া ইত্যাদি) ছবি এঁকেও ভিন্ন একটি অবস্থান তৈরি করছিলেন নারীর, অথবা সচেষ্ট ছিলেন তা করতে, সে-বিষয়টির একটি তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে।
তিন
পঞ্চাশের দশক থেকেই বাংলাদেশের চিত্রকলায় ঘটতে থাকে নানা পরিবর্তন এবং এর অনেকগুলোই ছিল ইউরোপীয় আধুনিক চিত্রকলার অনুবর্তী। ১৯৪৮-এর আগে ঢাকার কোনো চিত্রকলার ঐতিহ্য ছিল না – যা ছিল তা কিছু প্রতিকৃতি বা কনভারসেশন পিস, বিজ্ঞাপন-চিত্র ইত্যাদির। ভাবতে অবাক লাগে, এরকম একটি অবস্থান থেকে মাত্র দশটি বছরে বাংলাদেশে সক্রিয় শিল্পীর সংখ্যা – যাঁরা আবার ইউরোপীয় নানা ধ্যান-ধারণাপুষ্ট হয়ে আধুনিক চিত্রচর্চায় নিয়োজিত ছিলেন – একশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ছবির দর্শকও তেমন তৈরি হয়নি, গ্যালারি ছিল না, ছবি কেনাও সৌখিনতার পর্যায় থেকে বেরোতে পারেনি; অথচ ছবিতে পশ্চিমা উত্তর-প্রভাববাদ, প্রকাশবাদ, বিমূর্ত প্রকাশবাদের ছায়া পড়তে লাগল। পঞ্চাশের দশকেই তো অনেক শিল্পী বিদেশে গেলেন শিল্পশিক্ষা নিতে – সফিউদ্দীন আহমেদ, মোহাম্মদ কিবরিয়া, আমিনুল ইসলাম, মুর্তজা বশীর। আরো কেউ কেউ। তাঁরা কেউ ফিরলেন পশ্চিমের শৈলীচিন্তায় সমৃদ্ধ হয়ে, কেউ আনলেন নতুন টেকনিক, কেউ নিয়ে এলেন নতুন চোখে শিল্পকে দেখার অনুপ্রেরণা। কলকাতা শান্তিনিকেতন অনেক দূরে চলে গেল, ঢাকা তার নিজস্ব একটি ঐতিহ্য সৃষ্টি করতে নেমে পড়ল। সে-ঐতিহ্যে বিমূর্ততা প্রাধান্য পেল, যদিও ফিগারেশনের ঝোঁকটা কখনো কমেনি। অনেকেই সচ্ছন্দে কাজ করেছেন এ দুই প্রকাশে, অনেকেই একটিতে টেনে নিয়েছেন অন্যটিকে – আধা-বিমূর্ত, অথবা আভাসে অবয়বকে তুলে ধরার পদ্ধতির প্রয়োগ করেছেন তারা।
আধুনিকবাদী চিত্রকলার চর্চায় শুধু যে শৈলী বা টেকনিক বা পদ্ধতির আধুনিকায়ন ঘটেছে, তা নয়। বিষয়বস্তুরও বিবর্তন এসেছে। উনিশশো তিরিশের দশকে যেমন কবিতায় রবীন্দ্রনাথের রোমান্টিকতা ও মেটাফিজিক্সকে ছাড়িয়ে বাংলা কবিতা আধুনিক বৈশ্বিক কবিতার রাস্তায় হেঁটেছে, এবং প্রকাশ ঘটাচ্ছে নানা ‘আধুনিক’
চিন্তা-চেতনার-নাগরিক জীবনের সংকট, নির্বেদ-নিঃসঙ্গতা-নাস্তি, পারক্যবোধ ও বিশ্বাসহীনতা এবং অস্তিত্বের নানা সংকট, পঞ্চাশ-ষাটের চিত্রকলাতেও তার দেখা পাওয়া যাচ্ছিল। নাগরিকতা একটা অবস্থা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, কাজেই আধুনিক মানসের দ্বন্দ্ব-সংঘাত, ব্যক্তির নানা সংকট ও বিপর্যয়কে মূর্ত করেছেন কিবরিয়া, আমিনুল, মুর্তজা বশীর, হামিদুর রহমান, রশিদ চৌধুরী, দেবদাস চক্রবর্তীসহ অনেকে। এই নতুন সময়, সমাজ ও ব্যক্তিচিন্তায় নারীর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নারীর চিত্রায়ণে এসময় দেখা যাচ্ছে এক ধরনের নাগরিক পক্ষপাতিত্ব। এবং নারী বিধৃত হয়েছে একাধিক মাত্রায়। যেমন, পশ্চিমা চিত্র ঐতিহ্যে নগ্ন নারীদেহের প্রতি যে-আকর্ষণ, তার প্রকাশ দেখা যাচ্ছে। আবার একজন নগরবাসী হিসেবে নারী উপস্থিত হয়েছে পুরুষের মতো একই
‘বিকার-বিক্ষোভ-ক্লান্তির’ শিকার হয়ে। অথবা, পশ্চিমা পরাবাস্তব ছবিতে নারী যেমন রূপান্তরের অর্থাৎ বাস্তবের পরিচিত মাত্রা থেকে দূরে সরে গিয়ে একটি গুরুতর বাস্তবে বস্তুর বা ইমেজের গুণ ও পরিচিতিগত উত্তরণের একটি উপাদান হিসেবে হয়েছে। কোনো কোনো সময় নারীর অবস্থান পুঁজির পণ্যবাজারের ভেতরে, অর্থাৎ নারীর ওপর পড়েছে ‘পুরুষ-দৃষ্টি’। নারীর প্রতিকৃতি, লাস্যময়ী-রমণীয়া-কমনীয়া নারীচিত্র আঁকা হয়েছে। একই সঙ্গে জয়নুল-কামরুলের ঐতিহ্যে নারীকে উপস্থাপনের বিষয়টিও চলেছে। তবে এসময় নারীর চোখ দিয়ে নারীকে দেখার একটি নজির পাওয়া যায় নভেরা আহমেদের ভাস্কর্যে। তবে নভেরা ‘নারীর-লিখন’ চিন্তাটি মাথায় নিয়ে যে-ভাস্কর্য গড়তে বিশেষ করে নারীমূর্তি গড়তে বসেছেন, তা নয়। তবে তিনি একটি আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তাঁর ভাস্কর্যকে সাজিয়েছেন, সেখানে নারীর অবস্থানটিও সুচিহ্নিত। হেনরি মুরের আদলে তিনি ভাস্কর্য গড়ছেন, এ-কথা অনেকেই বলে থাকেন; তবে মুর থেকে অনুপ্রেরণা পেলেও নভেরা দেশীয় উপাদানের সাহায্যে এবং তাঁর নিজের সময় ও দেশকে বিবেচনায় রেখেই ভাস্কর্য গড়েছেন। তাতে নারী একই সঙ্গে নগরবাসী এবং গ্রামবাসী অর্থাৎ দুই তথাকথিত বিপরীত চেতনার ধারক। নভেরা বস্তুর ঘনত্ব এবং আয়তনকে গুরুত্ব দিয়ে দেখেছেন, তবে বস্তুকে ঘনত্বের কঠিন সীমাবদ্ধতা ও দার্ঢ্য থেকে মুক্তি দিয়ে তার অন্তর্গত গতিশীলতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এজন্য মুরের ভাস্কর্যের মধ্যে হার্বার্ট রিড যে ‘উড়াল-প্রবণতা’ দেখেছেন, নভেরার ভাস্কর্যেও তা দেখা যায়। যেন তারা ভর ও ঘনত্বের চাপে নিম্নমুখী নয়, অথবা তারা আয়তনের মাপজোখে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়া নিশ্চল কোনো নান্দনিকতা নয়। প্রথম দেখাতেই বরং মনে হবে, নভেরার ভাস্কর্য মাত্রা ও স্থান নির্দিষ্ট নয়; তাদের ভেতরে প্রাণ আছে। নভেরা যেসব নারীমূর্তি গড়েছেন, তাদেরও প্রধান পরিচয় এই গতিশীলতা, এই স্থান-কালের এবং ভর-মাত্রা-আয়তনের সীমাকে ছাড়িয়ে দূরে যাওয়ার প্রবণতা। সমাজে যেখানে নারীর স্বাধীনতা তখনো দূরবর্তী একটি চিন্তা, এবং উড়াল দেওয়ার বিষয়টি কল্পনার অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ, সেখানে নভেরার ভাস্কর্যে এই ‘উড়াল-প্রবণতা’, এই গতিশীলতা বিস্ময়কর বটে।
নভেরা দীর্ঘদিন বাংলাদেশে স্থিত ছিলেন না, দেশ ও দেশের বাইরে আসা-যাওয়ার মধ্যে ছিলেন, এবং একসময় চিরতরে দেশকে বিদায় জানিয়ে বিদেশে (ফ্রান্সে) স্থায়ী হলেন। কিন্তু নভেরার প্রভাব পড়ল না ভাস্কর্যচর্চায়। অনেক পরে লালারুখ সেলিম বা শামীম শিকদার অথবা আইভি জামান ভাস্কর্যকে গুরুত্বের সঙ্গে নিলেন, কিন্তু এর মাঝখানে কোনো নারী এই শিল্পকে গ্রহণ করলেন না। তবে এ-কথাটিও ঠিক, এই মাঝখানের সময়ে চিত্রকলাতেও নারীর অবস্থান ছিল নগণ্য। ফরিদা জামান, নাসরীন বেগম বা রোকেয়া সুলতানার আগে দু-একজন মাত্র নারী শিল্পী, তা-ও তাঁদের অবস্থান সুচিহ্নিত নয়। ফলে ‘নারীর লিখন’ ফেনোমেননটির জন্য বেশ কিছুকাল আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে।
নভেরার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আধুনিক – তিনি নিজের সময় ও দেশকে একটি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে স্থাপন করে ব্যক্তি ও সমাজের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে চেয়েছিলেন। এ-কাজটি করতে গিয়ে তিনি নিজের সংস্কৃতিচিন্তা ও পশ্চিমা ধ্যান-ধারণার মধ্যে একটি সমন্বয় সাধন করেছেন – এজন্য তাঁর কাজ উন্মূল নয়, তাদের মূল বরং প্রোথিত বাংলাদেশের মাটি ও সমাজে। তবে নভেরার কাজে পরোক্ষে হলেও যে নারীর লিখন উৎকীর্ণ তার ব্যক্তিক দিকটি উচ্চকিত নয়, সামাজিক দিকটিও নয় প্রকট। অর্থাৎ নারী একটি বৃহত্তর সমাজ ও শিল্পকাঠামোর ভেতরে অবস্থিত ইবসেনের নোরার মতো (এ ডলস হাউজ)। এই কাঠামো ভেঙে বেরিয়ে আসার কোনো আহ্বান সেখানে নেই। বরং বলা যায়, কাঠামোর ভেতরে থেকে নারী তার সময়বদলের চিহ্নগুলোকে দেখছে, নিজের অবস্থানটি পরীক্ষা করে দেখছে। নভেরার কাজে নারীর লিখন তাই প্রকৃত অর্থে নারীর নিজের কাছে নিজের অবস্থান নিয়ে কিছু প্রশ্ন করা – এর বেশি কিছু নয়।
যে-অর্থে নারীবাদীরা (হেলেন সিক্সো, যেমন) নারীর লিখনকে ব্যাখ্যা করেন, বাংলাদেশের চিত্রকলায় তার কাছাকাছি একটা অবস্থানে পৌঁছেছে নাজলী লায়লা মনসুর-দিলারা বেগম জলি-রোকেয়া-দীপা হক-নীলুফার চামান-ফারেহা জেবা-আতিয়া ইসলাম এ্যানি-তৈয়বা লিপি এবং বেশকিছু তরুণ শিল্পীর, যাঁদের মধ্যে সুলেখা চৌধুরীর কথা উল্লেখ করা যায়, কাজ। শিল্পী আরো আছেন, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে, তবে এ-প্রবন্ধটির উদ্দেশ্য যেহেতু বাংলাদেশের চিত্রকলায় নারীর চিত্রায়ণের মৌল কিছু প্রবণতাকে শনাক্ত করা, প্রবণতাগুলিই তাই গুরুত্বপূর্ণ। সকল শিল্পীর কাজের একটি খতিয়ান দেওয়া এ-প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়।
সত্তরের দশকের শেষ ও আশির দশকের আগে পর্যন্ত নারীর চিত্রায়ণটি ঘটেছে পুরুষশিল্পীর হাতে – ভাস্কর্যে নভেরার একমাত্র ব্যতিক্রম ছাড়া। যখন নারীশিল্পীদের প্রবেশ ঘটল দৃশ্যপটে, তখন এই চিত্রায়ণ বা রেপ্রেজেন্টেশন পালটে গেল। এই পরিবর্তনের প্রভাবটি কীভাবে পড়ল আমাদের চিত্রকলায়, বা এই পরিবর্তন কিসের ইঙ্গিতবহ ছিল, সে-ব্যাপারে একটু পরে আলোচনা করা যাবে। তার আগে ষাট-সত্তর থেকে নিয়ে পুরুষশিল্পীদের হাতে নারীর চিত্রায়ণে কী কী প্রবণতা দেখা গেছে, তা নিয়ে আলোচনা করা যায়। আগেই বলা হয়েছে, বিমূর্ততা ও প্রকাশবাদের নানা প্রভাবে বাংলাদেশের চিত্রকলায় অবয়বধর্মিতা কিছুদিন কিছুটা উপেক্ষিত ছিল। বাস্তববাদকে এড়িয়ে চলেছেন প্রধান অনেক শিল্পী। বস্তুত চারুকলা ইনস্টিটিউটের অ্যাকাডেমিক শিক্ষার বাইরে বাস্তববাদ কিছুটা অবহেলিতই ছিল। অবয়ব ছিল, কিন্তু অবয়বধর্মিতা ও বাস্তববাদ সমার্থক নয়। মুর্তজা বশীর তাঁর এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছিলেন, তাঁর বামপন্থী রাজনৈতিক/ সামাজিক চিন্তা-ভাবনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ বাস্তববাদী চিত্রচর্চাতে তিনি প্রথমে দ্বিধান্বিত ছিলেন, কেননা তাঁর সতীর্থ প্রায় সকলেই বিমূর্ততার চর্চা করতেন। অবশ্য বশীর বাস্তববাদ ও অবয়বধর্মিতায় তাঁর শিল্পের উৎকর্ষ খুঁজেছেন – এমনকি বিমূর্ততাকেও বাস্তববাদের দাবির সঙ্গে সমন্বিত করেছেন।
বিমূর্ত শিল্পের ‘আধুনিক’ পরিচয়টি স্বতঃসিদ্ধ, যেখানে রেপ্রেজেন্টশন বিষয়টিই সমস্যাসংকুল। এর বাইরে যাঁরা অবয়বধর্মী কাজ করেছেন, বাস্তববাদী কাজ করেছেন, তাঁদের কাজেও নারীর চিত্রায়ণে ষাট ও সত্তরের দশকে তিনটি মূল প্রবণতা চোখে পড়েছে। এগুলো হলো :
নারীকে নাগরিক জীবনের একজন অংশীদার হিসেবে, আধুনিকতার সমস্যাপীড়িত একজন ব্যক্তি হিসেবে দেখা;
নারীকে প্রেম-কাম, মাঝে মাঝে যৌনতার অনুষঙ্গে স্থাপন করে মনস্তাত্ত্বিক একটি মাত্রায় বা ইরোটিক একটি আবহে স্থাপন করা;
নারীকে তার সামাজিক অবস্থানের ভেতরে রেখে তার নিজস্ব জায়গাটিতে আলো ফেলা। এটি করতে গিয়ে কোনো কোনো শিল্পী (যেমন কাইয়ুম চৌধুরী) গ্রামীণ একটি প্রেক্ষাপট বেছে নিয়েছেন।
এর বাইরেও নারীর চিত্রায়ণে আরো কিছু প্রবণতা লক্ষণীয়, যেমন আদিবাসী নারীদের অথবা লোকঐতিহ্যের নারীদের (বেহুলা, মহুয়া, মলুয়া) ও সমাজের বাইরে প্রান্তিক অবস্থানের নারীদের (বেদে, সন্ন্যাসিনী, সাপুড়ে ইত্যাদি) এবং প্রাচ্যবাদী চিত্রকলার ইমেজে নারীদের চিত্রায়ণ। তাছাড়া নারীর প্রতিকৃতি আঁকাটাও একটা ধারা বটে।
উপরে উল্লিখিত প্রথমোক্ত প্রবণতার বিষয়টি লক্ষ করা যায় কিবরিয়ার আধা-ঘনত্ববাদী কিছু ছবিতে, আমিনুল ইসলামের ছবিতে (এবং ড্রইংয়ে) দেবদাস চক্রবর্তী বা নিতুন কুন্ডুর কোনো কোনো ছবিতে। ষাটের শেষে সত্তরের শুরুতে যাঁরা ছবি আঁকতে শুরু করেন যেমন মনিরুল ইসলাম বা শহিদ কবীর, তাঁরাও এ-ধরনের চিন্তার প্রকাশ ঘটিয়েছেন, যদিও শহিদ কবীর একসময় যে প্রতিবাদী চিন্তা থেকে ছবি আঁকতেন তাতে নারীকে সমাজ ও রাজনীতির ‘ভিকটিম’ হিসেবে দেখা হয়। আধুনিক জীবনের বিকার-বিক্ষোভ-পীড়িত নারী অবশ্য তেমন পরিব্যাপ্ত আইকন নয় আধুনিক চিত্রকলায়, যেহেতু আধুনিক ধারায় যাঁরা ছবি এঁকেছেন, অথবা সাহিত্য-রচনা করেছেন, তাঁদের একটি বড় অংশই তাঁদের কাজকে পুরুষপ্রধান করেছেন। ষাট-সত্তরের দশক থেকে তীব্রতা পাওয়া নারীবাদী সাহিত্য ও সমাজতত্ত্বে এই পুরুষকেন্দ্রিক রেপ্রেজেন্টেশনকে প্রশ্ন করা হয়েছে, একে তদন্ত করে দেখা হয়েছে, এবং এই প্রবণতার কারণগুলি জানার চেষ্টা করা হয়েছে। মার্ক্সবাদী চিন্তক রেমন্ড উইলিয়ামস অবশ্য বলেন, পুঁজি-শাসিত সমাজে নারীকে তার অবস্থান দেওয়া হবে না, কেননা মূলধারার উৎপাদন ও বণ্টন প্রক্রিয়াটি পুরুষ নিজের হাতে রাখতে চায়। সেজন্য শিল্প-কারখানায় একই কাজে নিয়োজিত একজন পুরুষকর্মী থেকে নারীকর্মী অর্ধেক বেতন পাবে, অর্ধেক সুযোগ-সুবিধা পাবে। পুঁজি নারীকে পণ্য হিসেবে দেখতে আগ্রহী এবং পণ্যের প্রবক্তা ও ক্রেতা হিসেবে, পণ্য উৎপাদনের পেছনের শক্তি হিসেবে নয়। আধুনিক সাহিত্য ও চিত্রকলাও এই চিন্তার ভিতরে অবস্থান নিয়েছে, যেহেতু এর রচয়িতারা অধিকাংশ পুরুষ।
বাংলাদেশের চিত্রকলায় নারীকে পুঁজিবাদের চোখ দিয়ে দেখার প্রবণতা নেই – যদিও দৃশ্যশিল্প হিসেবে মাঝে মধ্যে নারীর রেপ্রেজেন্টশনে নগ্নতার বিষয়টি দেখা যায়। তবে নগ্নতার ঐতিহ্য শুধু পশ্চিমা ছবির নয়, ভারতীয় চিত্রঐতিহ্যে এটি পুরনো একটি ধারা। বস্তুত নগ্নতার সঙ্গে যৌনতাও একটি পুরনো ঐতিহ্য (অজন্তার দেয়ালচিত্র, রাধা-কৃষ্ণের ঝুলন/ রসযাত্রার চিত্রঐতিহ্য, অসংখ্য মূর্তিশিল্প ইত্যাদি)। তবে আধুনিক চিত্রকলায় নগ্নিকার স্টাডি পশ্চিমা একটি ধাঁচ অনুসরণ করেছে। তারপরও, দু-এক শিল্পীর কাজ বাদ দিলে, নারীর নগ্নতা থেকেও নগ্নতার নন্দনতত্ত্বটি গুরুত্ব পেয়েছে।
নারীকে প্রেম-কামের অংশীদার করার বিষয়টি প্রায়-সকল শিল্পীর কাজে চোখে পড়ে, যাঁরা কোনো না কোনো সময় অবয়বধর্মী ছবি এঁকেছেন – অথবা এঁকে চলেছেন। জয়নুল, কামরুল থেকে নিয়ে সৈয়দ জাহাঙ্গীর, কালিদাস কর্মকার থেকে নিয়ে রফি হক – খুব কম শিল্পীই আছেন যাঁরা নারীর ছবি এঁকেছেন, কিন্তু তাঁদের প্রেম ও কামের দিকটির ওপর জোর দেননি। নরনারীর যুগল ছবি আঁকাটা ফর্মের দিক থেকেও আকর্ষণীয়। মুখোমুখি অবস্থানে প্রেমিক-প্রেমিকা ছবির কম্পোজিশনের জন্য সুবিধাজনক। অথবা একা একজন নারীও। এজন্য সৈয়দ জাহাঙ্গীর অথবা মাহমুদুল হক অথবা চন্দ্রশেখর দে একক নারী এঁকে তাতে কিছু প্রেম বা কামের স্পর্শ দিয়েছেন। এবং তাঁদের মতো অসংখ্য শিল্পী এরকম এঁকেছেন। নারীকে উল্লম্ব রেখায় আঁকা, অথবা উপবিষ্ট অথবা শায়িত অবস্থায় আঁকার মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা প্রায় সকল শিল্পীই নিজস্ব পদ্ধতিতে নিষ্পত্তি করেছেন।
তবে নারীকে সামাজিক অবস্থানে নানা ভূমিকায় দেখার চেষ্টা করেছেন অনেক শিল্পীই। এরকম একটি সহজদৃষ্ট অবস্থান হচ্ছে গৃহস্থালির নারী। কাজী আবদুল বাসেতের আঁকা গৃহস্থালির নারী অথবা কলসি কাঁখে নারী একটি পুরনো ঐতিহ্যেরই রূপায়ণ এবং এটি দীর্ঘদিন চলে এসেছে। এখন অবশ্য অ্যাকাডেমিক চর্চার বাইরে খুব কম শিল্পীই কলসি কাঁখে নারী অথবা ধান ভানারত নারী আঁকবেন না, কেননা, নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পালটেছে। তবে দ্বিতীয় আরেকটি দৃষ্টিভঙ্গি, নারীকে ‘ভিকটিম’ হিসেবে দেখা, এখনো বিদ্যমান, এবং এটি অটুট থাকবে আরো দীর্ঘকাল – যতদিন নারীরা ভিকটিম হতে থাকবে – যদি না বাস্তববাদী বা অবয়বধর্মী ছবির দিন শেষ হয়ে যায় (তার সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না)। নারীর ভিকটিম অবস্থাটি জয়নুল-কামরুল থেকে নিয়ে সাম্প্রতিক অনেক শিল্পীই আঁকছেন। এর পেছনে সহমর্মিতা যেমন আছে, ক্রোধও তেমনি আছে, এবং সাম্প্রতিক অনেক শিল্পীর কাজে যেমন, বিদ্রƒপ ও স্যাটায়ারের সঙ্গে সমাজ/ সমাজপতি/ রাষ্ট্রপক্ষের কাছে জওয়াব চাওয়ার ও তাদের অভিযুক্ত করার একটি বিষয়ও আছে। হামিদুর রহমান এঁকেছেন বানভাসি নারীর কষ্ট, কাইয়ুম চৌধুরী এঁকেছেন ২০০১ সালের নির্বাচনের পর নারীদের ওপর বিশেষ করে সংখ্যালঘু নারীদের ওপর নেমে আসা বিপর্যয়ের ছবি। হামিদুর রহমানের ছবিতে নারীকে একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হিসেবে দেখানো হয়েছে, যদিও মানুষের হাতে আছে ওই দুর্দশা লাঘবের সামর্থ্য। আর কাইয়ুম চৌধুরী সরাসরি অভিযুক্ত করেছেন সরকার ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে, তুলে ধরেছেন সমাজের এই চরম লজ্জাকে। কাইয়ুম চৌধুরী এ-সময়ের অনেক তরুণ শিল্পীর মতো, নারীর ভিকটিমহুডকে মেনে নিতে নারাজ – তাঁর ছবিতে তারুণ্যের ক্রোধ আছে, যদিও এই ক্রোধ বয়স-নির্বিশেষে বিবেকের। তবে তাঁর প্রকাশটি জোরালো। পাশাপাশি আরেকটি পরিবর্তনের কথা বলা যায় নারীর চিত্রায়ণে। আদিবাসী নারীদের ছবি, সেই জয়নুল-সফিউদ্দীন আহমেদের সময় থেকেই একটা রেওয়াজ ছিল। জয়নুল এঁকেছেন সাঁওতাল রমণীর ছবি, সফিউদ্দীনের কাঠ খোদাইতে তারা আছে, আবার সৈয়দ জাহাঙ্গীরের ছবিতে চাকমা রমণীর প্রতিকৃতি রয়েছে। কিন্তু এসব চিত্রায়ণে যে-প্রবণতাটি প্রধান, সেটি হচ্ছে রোমান্টিকতা। তারা মূলধারার নারী নয়, তাদের জীবন খুবই নান্দনিক, এবং বিচিত্র, এজন্য রোমান্টিক অনুষঙ্গে তাদের ফুটিয়ে তোলাটা একটা হাসিখুশির ও পরিতৃপ্তির ভাব জাগায়। কিন্তু জয়নুল-সফিউদ্দীনের সময় থেকে নিয়ে এ পর্যন্ত অনেক শোষণ গেছে সাঁওতালদের ওপর, তারা ক্রমে প্রান্তিক অবস্থানে চলে যাচ্ছে, এবং তারা হারাচ্ছে তাদের জমিজমা, তাদের সংস্কৃতি এবং জীবনযাত্রার স্বাচ্ছন্দ্য। তেমনি সৈয়দ জাহাঙ্গীরের সময়ের চাকমারা এখন একটা কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। তারা অধিকারবঞ্চিত, তারা ক্রমেই পরিণত হচ্ছে সংখ্যালঘুতে, নিজভূমিতেই পরবাসীর মতো তাদের জীবন। কাজেই কনকচাঁপা চাকমা যখন তাদের আঁকেন, সেই আঁকায় কোনো রোমান্টিকতা থাকে না। কনকচাঁপার চাকমা রমণী কোনো কোনো সময় উৎসব বা গার্হস্থ্য জীবনের ফ্রেমে উঠে আসে, তাদের কখনো কখনো নগ্নবক্ষাও দেখান তিনি – তবে এটি পাহাড়ি জীবনযাপনের নিজস্ব ঐতিহ্য, পশ্চিমা-ধাঁচের নগ্নতার প্রকাশ নয়; কিন্তু কনকচাঁপার ছবিতে সেই কষ্টটা ধরা পড়ে, যা চাকমা নারীকে (ও পুরুষকে) পীড়িত করছে। তাঁর ছবিতে চাকমা নারী ভিকটিম, এবং এই ভিকটিম-অবস্থার ক্ষোভ, ক্রোধ এবং কষ্টও তাঁর ছবিতে প্রতিধ্বনিত।
নারীকে রোমান্টিকভাবে উপস্থাপনার আরো একটি ঐতিহ্য হচ্ছে প্রাচ্যবাদী শিল্প। এই ছবিতে একটি আদর্শিক রূপে নারীর প্রকাশ – তার দেহভঙ্গিমা, তার চোখের গড়ন, বেশবাস অথবা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের লীলায়িত সুষমা – সবই এক প্রাচীন রোমান্টিকতার আবহে অভিষিক্ত। এই ধারার পরিচর্যা হয়েছে বাংলাদেশে – আবদুস সাত্তারের নারী আদি প্রাচ্যবাদী নারীই। তবে নাসরিন বেগম যখন তাকে আঁকলেন, সেই নারীর মধ্যে অনেকটা পরিবর্তন এলো। তার ইচ্ছাগুলো, তার সীমিত অবস্থানটি পরিষ্কার হলো। এজন্য নাসরিন প্রাচ্যবাদী শৈলীকে ভাঙলেন, এর রং সংস্থাপনের রীতিটাতেও পরিবর্তন আনলেন। তবে প্রাচ্যবাদিতার স্বরূপটি এমনি যে, সেখানে আধুনিক নারীকে স্থাপনের প্রয়াসটি সমস্যাসংকুল হতে বাধ্য।
রোমান্টিকতার আরেকটি ধারায় অনেক শিল্পী গিয়েছেন আমাদের লোকঐতিহ্যে, পুঁথি এবং রূপকথার অঞ্চলে, এবং সন্ধান করেছেন নারীর রেপ্রেজেন্টেশনকে। এই ধারার দুটি প্রকাশ এখন চোখে পড়ে। একটি ধারায় আছেন আবদুস শাকুর, যিনি মহুয়া ও মলুয়ার গীতলতা, তাদের সাহিত্য-আরোপিত, চরিত্রগত গুণাগুণ তাঁর চিত্রায়ণে হাজির করেন। প্রচলিত ধারার বাইরে যাননি শাকুর, নতুন কোনো ‘যুগোপযোগী’ ব্যাখ্যাও এসব চরিত্রের নেই তাঁর ক্যানভাসে। অন্য ধারায় চোখে পড়ে বেহুলার মতো বহুমাত্রিক চরিত্রকে আধুনিক কোনো অনুষঙ্গে উপস্থাপনার প্রয়াস। তরুণ ঘোষ বা ঢালী আল মামুন এই ধারায় কাজ করেছেন।
তরুণ ঘোষ একটি সমাজচিন্তার ভেতর বেহুলার প্রাসঙ্গিকতা খুঁজেছেন, ঢালী তাঁর চিত্রায়ণে আরো র্যাডিক্যাল ব্যাখ্যা দেন। কিন্তু উভয়ের কাজে বেহুলার চরিত্রটি মিথের অঞ্চল থেকে সমসাময়িকতার অঞ্চলে পা রাখে – প্রতীক হয়ে ওঠে।
পুঁজিবাদী সমাজে নারীকে যখন পণ্যের মোড়কে হাজির করা হয় তখন তা সমাজের প্রচলিত নীতি ও শ্রেয়বোধকেই বিপন্ন করে তোলে। যে কয়েকটি ক্ষেত্রে এই প্রবণতা বেশি দৃশ্যমান, তার মধ্যে আছে দৃশ্যমাধ্যম – বিশেষ করে সিনেমা, এবং বিজ্ঞাপন। সিনেমার নায়িকাদের যেভাবে উত্তেজক নানা ভঙ্গি এবং পোশাকে দেখানো হয়, শিশির ভট্টাচার্য্যরে কিছু কাজে তাকে বিদ্রƒপ ও স্যাটায়ারের সাহায্যে পুনঃউপস্থাপন করা হয়েছে। নারীর পণ্যায়ন শিশিরের কাজে একটি নতুন চিন্তার সূত্র ধরে বিম্বিত হয় – এবং সূত্রটি হচ্ছে পুঁজির সঙ্গে ক্ষমতার নিবিড় সম্পর্ক, যা কোনো নীতিবোধকে স্বীকার করতে রাজি হয় না। পুঁজি ও ক্ষমতার মিলনে, শিশিরের ভাষায়, যে-‘খেলা’র শুরু হয়, তাতে রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারী থেকে নিয়ে ভাঁড় পর্যন্ত নিজ নিজ ভূমিকা পালন করে যায়, এবং এই খেলায় নারীর অবস্থানটি আরো শোচনীয় হয়ে ওঠে। শিশিরের সমসাময়িক অনেক শিল্পী নারীর এই নতুন সংকটকে তদন্ত করেছেন, এবং এর ফলাফল যখন তাঁদের কাজে তুলে ধরেন, তখন ওই স্যাটায়ারের সঙ্গে কৌতুক, ক্ষোভ এবং আয়রনির একটি সংযুক্ত প্রকাশ তাতে দেখা যায়।
চার
তবে নারীর অবস্থানের সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রকাশটি ঘটেছে কয়েকজন নারীশিল্পীর কাজেই। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, কারণ তাঁরা অনেকে নিজস্ব অভিজ্ঞতা এবং উপলব্ধি থেকে এসব ছবি এঁকেছেন। আমাদের স্মরণ আছে, নভেরা আহমদ ‘নারীর লিখনে’র চিন্তা থেকে তাঁর নারীমূর্তি না গড়লেও তাতে নারীর একটি আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়েছে। আর রোকেয়া-দীপা হক-জলি-এ্যানি-নীলুফার-তৈয়বা-সুলেখার মতো শিল্পীরা তো সচেতনভাবেই চাইছেন নারীর নিজস্ব লিখনটি ফুটিয়ে তুলতে। কনকচাঁপা চাকমার ছবিতে চাকমা নারী যেমন আগের সেই প্যাস্টোরাল অনুষঙ্গে বিধৃত হতে পারে না – যেহেতু তানভীর মোকাম্মেলের কর্ণফুলীর কান্নার প্রেক্ষিতে প্যাস্টোরালিজমের দিন কবেই শেষ হয়ে গেছে – তেমনি কুড়ির শতকের শেষ দিকে এসে নারীর অবস্থান আর কখনো আগের মতো নেই। নারীবাদী চিন্তা-ভাবনার সক্রিয় অনুসারী না হলেও যে-কারো চোখে ধরা পড়বে তাদের ক্ষয়িষ্ণু অবস্থানটি। যত ধর্মীয় উগ্রবাদ বাড়ছে, তত সংকুচিত হচ্ছে নারীর পরিসর। বস্তুত গত চার বছরে নারীকে ছেড়ে দিতে হয়েছে তার অনেকখানি মুক্ত অঞ্চল। এখন যেটুকু আছে, তা চলে যেতেও সময় লাগার কথা নয়। কাজেই নিজের অবস্থানটি, নিজের একান্ত ব্যক্তিগত স্পেসটি সুরক্ষার জন্য তাকে ভাবতে হবে। আর, একসময় উন্নয়ন সাহিত্যে যে ‘নারীর ক্ষমতায়ন’ নামে একটি সক্রিয়তার কথা বলা হতো, তা যেন অনেকটাই পুরুষের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। পুরুষ নারীকে ক্ষমতা দেবে – এই প্যারাডাইমটি একটি অথর্ব চিন্তা। এর বিপরীতে এখন নারীই নিশ্চিত করবে নারীর ক্ষমতায়ন – এই চিন্তাটি সক্রিয়। অর্থাৎ বাংলাদেশেও নারীরা তাদের নিজেদের ক্ষমতায়ন নিয়ে ভাবছে; পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা তাদের যে রেপ্রেজেন্টেশনের ছাঁচে ফেলে বেশ চকচকে ভাবে উপস্থাপিত করেছে, তাকে ভেঙে নতুন রেপ্রেজেন্টেশনের পথ খুঁজছে নারীরা। নারীর লিখন তাই এখন একটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক এজেন্ডার নাম, যদিও এটি সাড়ম্বরে, কোনো প্রকল্পের মাধ্যমে ঘটবে না। ঘটবে প্রতিটি নারীর নিজস্ব চিন্তায় একটি গুণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে।
কিন্তু তার আগে যে অসম, বিরোধী এবং নিষ্পেষণ ও শোষণমূলক অবস্থায় নারীরা আছে, সে-সম্পর্কে কিছু স্পষ্ট চিন্তা থাকতে হবে, এবং কেন, কীভাবে এই অবস্থার সৃষ্টি হলো, কারা এর জন্য দায়ী এবং তাদের (এবং তাদের চিন্তা-ভাবনার) প্রতিরোধ কীভাবে সম্ভব, সে-ব্যাপারেও স্বচ্ছ ভাবনার প্রয়োজন আছে। এই কাজটি আমাদের সাহিত্যে হচ্ছে, সামাজিক ডিসকোর্সে হচ্ছে, শিল্পকলায় হচ্ছে। এরকম কিছু উদাহরণ দিয়ে এই প্রবন্ধটি শেষ করা যায়। নাগরিক জীবনের ক্লান্তি ও নির্বেদ, এবং সেইসঙ্গে অর্থহীনতা, একটি স্থির কেন্দ্রের অভাব অথবা স্থির কেন্দ্র বলে কিছু নেই, সেই বোধ থেকে উৎপাদিত অবসাদ এসব অনুভূতি অথবা অনুভূতিহীনতা যখন জীবনকে সীমাবদ্ধ করে তোলে, তখন মানুষের নানা সম্পর্কে তার ছায়া পড়ে। নগর জীবনে নারীর কী অবস্থান? দাম্পত্য সম্পর্কগুলিই বা কেমন? এই বিষয়গুলির ওপর সংবেদী দৃষ্টি বুলিয়েছেন নাজলী লায়লা মনসুর, তাঁর অনেক কাজে। নারী থাকে সেই অবসাদগ্রস্ত জীবনে একটি ছায়ার মতো; কখনো রিকশায় চড়ে সে যায় কোনো অনিশ্চিত গন্তব্যে, কখনো নিজের ঘরে অপরিচিতের মতো দিনযাপন করে, কখনো পার্কে বসে থাকে নিশ্চল বস্তুর মতো। নারীর এই অবস্থা আসলে সমাজের সার্বিক গতিহীনতারই প্রতিফলন। কিন্তু নাজলী একটি আখ্যানের কাঠামোয় যখন তাকে সাজান, অনেক বেশি শক্তি নিয়ে আমাদের সামনে তা ধরা দেয়।
প্রতিদিনের জীবনে নারীকে যে নানা অবস্থান গ্রহণ করতে হয়, তার ছবি আঁকেন রোকেয়া সুলতানাও। তাঁর ম্যাডোনা সিরিজটি নারীকে অনেকগুলি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে, এবং নাগরিক নানা সংকট – নিরাবেগ, ইন্দ্রিয়সর্বস্বতা থেকে নিয়ে নারীকে ক্রমাগত একটি ক্ষুদ্র আয়তনে বন্দি করে ফেলার প্রবণতা তাঁর ছবিতে প্রতিফলিত হয়। দিলারা বেগম জলিও নারীর ক্রমাগত সংকুচিত হতে থাকা স্পেসটুকুকে সামনে নিয়ে আসেন, তাঁর ছবিতে নারীর অন্তর্গত নানা যন্ত্রণার পাশাপাশি দ্রোহ এবং স্বপ্নকথার বর্ণনা উঠে আসে। নাসরীন বেগমের একটি কাজে (গার্ডেন-৩) নারীর গৃহকোণে নির্বাসিত হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়। আবার দীপা হক রাতের নারীদের উপজীব্য করে ছবি আঁকেন, তাতে একটা দ্রোহ ছায়া ফেলে। নাইমা হকের ছবিতে সামাজিক অবস্থানে নারীর প্রসঙ্গটি আসে, এবং তাতেও নারীর ঊণজনে বৃত্তাবদ্ধ হওয়ার কথাটি থাকে। নীলুফার চামানও আঁকেন নারীর প্রতিবাদ ও দ্রোহের কথা, যেমন তৈয়বা বেগম লিপি তৈরি করেন নারীর নিজস্ব ভুবনের নানা গল্প। সেই গল্পে নারী কখনো পুতুল, কখনো কঠিন কোনো গার্হস্থ্য ফ্রেমে বন্দি মানুষ। আবার ফারেহা জেবা নারীকে বড় পরিসরে স্থাপন করে দেখাতে চান, বৈশ্বিকভাবেও নারীরা নিগৃহীত, তার নিজস্ব সৃষ্টিশীলতা, তার স্বকীয়তা চাপা পড়ে যায় পুরুষতন্ত্রের দাবিসমূহের নিচে। এবং এ ব্যাপারে ফ্রিদা কাহলো তাঁকে প্রণোদনা দেন। আতিয়া ইসলাম এ্যানি নারীকে কিছু পরিচিত আইকনের আড়ালে (যেমন মোনালিসা) অরক্ষিত এবং পুরুষ দৃষ্টির অধীনে বন্দি এক বিপন্ন সত্তা হিসেবে তুলে ধরেন। তার নারী ও সমাজ এই বিপন্নতাকে মূর্ত করে তোলে। সুলেখা চৌধুরী কাপড় ঝুলানোর হ্যাঙারের মতো গার্হস্থ্য কিছু বস্তুকে প্রতীকের আদলে নিয়ে আসেন নারীর ঝুলন্ত অবস্থার বর্ণনা করতে। নারী এখন দড়িতে লটকানো বস্তু – তার সকল স্বাধীনতা অন্তর্হিত। এবং শুধু শহুরে নারী নয়, গ্রামের একটি সাধারণ মেয়েও যে নারীর অরক্ষিত অবস্থার কত শক্তিশালী প্রতীক হতে পারে ফরিদা জামানের কাজ তার সাক্ষী। তার সুফিয়া চরিত্রটি এরকম এক বিপন্ন কিশোরী, যার ওপর দায় বর্তায় সমাজের একশ অসংগতি, অন্যায় আর অবিচারের একটি ধারাপাত রচনার।
আধুনিকতার বেশ কিছু রীতিবদ্ধ প্রকাশ, চিন্তা-চেতনা ও অভিপ্রায় যখন আধুনিকতার শুরুর উদ্দেশ্যগুলিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে থাকল; নানা আদর্শবাদ, চূড়ান্তবাদ, একত্ববাদের প্রচলন ঘটতে থাকল; পুঁজিবাদ, জাতীয়তাবাদী (এবং আধিপত্যবাদী) ইতিহাসচর্চা এবং উপনিবেশিকতার চর্চা বৈধতা পেতে থাকল এবং আধিবিদ্যাগত ঈশ্বরচেতনা পরিব্যাপ্ত একটি রূপ পেল, তখন একে রুখে দিয়ে কিছু প্রবণতা সক্রিয় হয়ে উঠল, যাদের নানাভাবে ব্যাখ্যা দেওয়া হলেও উত্তর-আধুনিকতার বর্ণনাটি শেষ পর্যন্ত এর একটি পরিচয় হয়ে দাঁড়াল। বাংলাদেশের উত্তর-আধুনিকতার কিছু প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, এবং এসব প্রবণতার আধুনিকতার অনেক নির্মাণকে ভিতর থেকে ভেঙে ফেলা হচ্ছে। নারী পুরুষ অসম বিভাজন তেমনি একটি বিষয়, যা আধুনিকতা অনেক সময় বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে মেনে নিয়েছে। পুঁজিবাদে এই বিভাজন স্বতঃসিদ্ধ। সমাজতত্ত্বে এটি যেন স্বীকৃত। সেজন্য এই বিভাজনের চিহ্নগুলি পুনঃপরীক্ষা করলেন অনেক শিল্পী। উচ্চশিল্প-নিম্নশিল্পের পার্থক্যটিও তাঁরা ঘোচালেন। বিভিন্ন শিল্পধারার সংমিশ্রণ ঘটালেন সহজেই। ক্যানভাস, ভাস্কর্যের নানা উপাদান, ভিডিওগ্রাফি এবং স্থাপনাশিল্পের সংযুক্তি ঘটালেন। এরকম একটি অবস্থায় শিল্প যখন নিজেই ভাঙছে বিভিন্ন অচলায়তন, তখন সেই শিল্পের জন্য নারীর জন্য একটি অবস্থান গ্রহণ সহজ হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের অনেক নারীশিল্পী উত্তর-আধুনিকতার অনুষঙ্গগুলি ব্যবহার করে রীতিবদ্ধ পুরুষতান্ত্রিক সমাজকে অবনির্মাণ করছেন, ভেতর থেকে ভাঙছেন। এই কাজটি ক্রমশ গতিশীল হচ্ছে, এবং এর ফলে হয়তো একসময় নারীর লিখন একটি স্বীকৃত পন্থা হয়ে দাঁড়াবে, এবং পুরুষ-দৃষ্টিতে কিছুটা হলেও এর প্রভাব পড়বে।
পঞ্চম বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা, বৈশাখ ১৪১৫, এপ্রিল ২০০৮


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.